জৈতুন রাজ্যের রাজপ্রাসাদ জুড়ে তীব্র বাদ্যযন্ত্রের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে শব্দ তুখোড় ভাবে কর্ণগোচর হচ্ছে হেমলকের। তার চোখ-মুখ দেখলে বোঝার উপায় নেই সে এই মুহূর্তে রাগান্বিত হয়ে আছে না-কি হতাশ।
বাহিরের কলরবের মাঝেও তাদের কক্ষটি এক খণ্ড নিস্তব্ধ ব্রহ্মাণ্ডে রূপ নিয়েছে। কক্ষে উপস্থিত রানি, হ্যাব্রো ও হেমলক। অথচ তাদের ভেতরে কোনো কথোপকথন নেই, কোনো শোরগোল নেই, কোনো বাক-বিতণ্ডা নেই। যেন সকলে মুখে কুলুপ এঁটেছে।
বাহির থেকে এবার বাদ্যযন্ত্রের শব্দ ছাপিয়ে ভেসে আসছে রাজকন্যার নামটি। সকলে রাজকন্যার নাম নিয়ে জয়ধ্বনিতে মুখরিত।
হেমলকের কানে সেই শব্দ বিষাক্ত রকমের লাগছে। মনে হচ্ছে যেন উষ্ণ গরল তার দেহের ভেতরে প্রবেশ করছে। সে আর সহ্য করতে পারল না এই জয়ধ্বনি। তীব্র রাগ, ক্ষোভে ফেটে পড়ল,
“তুমি, তুমি ইচ্ছে করে এটা করলে, রানি কামিনীকাঞ্চন। ইচ্ছেকৃত তুমি আমাকে তোমার খেলায় বিসর্জন দিলে।”
রানি কামিনীকাঞ্চন এই তীব্র ক্ষোভের বিপরীতে একদম শান্ত বহমান সমুদ্রের মতো করেই তাকিয়ে রইলেন। যেন হেমলককে তার বলার নেই কিচ্ছুটি।
হেমলক নিজের এই ক্রোধ ধরে রাখতে পারল না। কক্ষের বেশ কিছু জিনিসপত্র তার ক্রোধের বশীভূত হয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো। সেই তাণ্ডব যদিও প্রাসাদের কারো কর্ণ অব্দি পৌঁছালো না। তীব্র শব্দের সঙ্গে মিশে গেলো সেই বিশ্রী ঝনঝনে শব্দটিও।
“তুমি শেষ ঘুঁটিতেই বাজিমাত করতে পারতে। চাইলেই এই জয় তোমার হতো। তুমি চাওনি। কেন চাওনি? আমাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য, তাই না? আমার প্রতি তোমার এত ঘৃণা? আমাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য এমন একটা নিকৃষ্ট হার হারলে জীবনে? হ্যাঁ?”
হেমলকের গর্জন যেন কক্ষের প্রাচীর ভেদ করে ঘুরপাক খাচ্ছে। হ্যাব্রো তাদের এই একান্ত মুহূর্তে থাকতে স্বস্তিবোধ করছে না কিন্তু হেমলক তাকে এখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। রানি খেলায় হারার পরই লোকটা যেন দিকবিদিকশুন্য হয়ে গিয়েছে। কী করছে, কী বলছে নিজেও জানে না।
রানি হেমলকের সেই ক্ষুরধার কণ্ঠের বিপরীতে স্থবির ভঙ্গিতে কথা বললেন। এতটাই শান্তশিষ্ট ভঙ্গিতে যেন কিচ্ছুটি হয়নি। কোনো অঘটন ঘটেনি, কোনো অস্বাভাবিক কিছু ঘটে যায়নি তার জীবনে। সমস্তই স্বাভাবিক রয়েছে একদম যেমন স্বাভাবিক তিনি চেয়েছিলেন।
“চিৎকার বন্ধ করে তৈরি হোন। অপরাহ্ণের পরের প্রহরেই শুভ মুহূর্ত।”
হেমলক আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। সামলাতে না পারাটাই যে স্বাভাবিক। এদিকে তার জীবন জুড়ে ভাঙন বয়ে যাচ্ছে অথচ রানি তাকে নতুন করে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছেন! এত পাষণ্ড এই নারী? এত নিষ্ঠুর? এত হৃদয়হীনা!
হেমলক এবার ধৈর্যহারা হয়ে চেপে ধরল রানির দুই বাহু। এত শক্ত করে চেপে ধরল যেন ভেতরের হাড় ভেঙেই যাবে।
“প্রতিশোধ নিচ্ছো তুমি? হ্যাঁ? প্রতিশোধ? অহংকারী, নিষ্ঠুর রানি।”
কথার তালে তালে হাতের চাপ আরও শক্ত করল সে। হ্যাব্রো দূর থেকে দেখেই বুঝতে পারছে ঠিক কতটা শক্ত ভাবে ধরেছে সে রানিকে। ক্রোধে লোকটা স্থান, কাল, পাত্র ভুলেছে। নয়ত রানির বাহুতে এমন করে হাত দিতে পারে?
হ্যাব্রো এক পা এগিয়ে কেবল বলতেই নিলো, “ধীরে, রানির লাগছে…” কিন্তু বলতে পারল না পুরো কথাটি। রানি তাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন। তার বাহুতে থাকা হেমলকের পুরুষালি হাতদুটোকে কঠিন ভাবে ঝেড়ে ফেললেন। এতক্ষণের শান্ত মুখটি তার এবার কঠোর হয়ে গেলো। ঠিক এই মুহূর্তের অপেক্ষা-ই করছিলেন বোধহয় তিনি। ঠিক এই প্রহর, এই ক্রোধের। এবার রানির কণ্ঠ কঠোর হলো। উঁচুতে উঠল খানিক,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, প্রতিশোধই নিয়েছি, প্রতিশোধ। রানি কামিনীকাঞ্চন সব ফেরত দেয়, চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্স। সব। সেটা প্রেম হোক কিংবা প্রতারণা।”
হেমলকের ক্রোধান্ধ দৃষ্টিতে এখন জেঁকে ধরেছে বিস্ময়। রানির কণ্ঠ বদল ও বাক্য তার অন্তরে গিয়ে ধাক্কা খেল। রানি প্রতিশোধ নিয়েছেন তার সাথে? প্রতিশোধ? প্রতারণা করেছেন? সেটিও নিজের মুখে উচ্চারণ করলেন!
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বলল, “প্রতারণা!”
“হ্যাঁ, প্রতারণা। প্রথম শ্রবণ করলেন এই শব্দটি? আজ প্রথম? অথচ এই শব্দের জালে আপনি আমার পুরো জীবনকে জড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। জড়িয়ে ফেলেওছেন। আর এখন এমন আচরণ করছেন যেন নতুন শুনেছেন শব্দটি।”
রানির দাম্ভিক কণ্ঠে শান্ত হয়ে গেলো হেমলক। বিভ্রান্ত দেখালো তাকে। শুকনো ঢোক গিললো আড়ালেই। রানিকে বোঝানোর চেষ্টা করে বলল, “তুমি যা জেনেছো, বুঝেছো তা সব সত্যি নয়, রানি। তুমি আমায় বলতে দাও।”
“আপনার বলার সময় ও মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে, হেমলক পিয়ার্স। আজ আর আপনার বলার সুযোগ নেই। আজ আমার বলার দিন। আজ খেলা আমার হাতে। এত দিন আমার সঙ্গে বাস করেও যখন বলার অবসর হয়নি আজ আর না-ই বলুন।”
রানির তাচ্ছিল্য বাক্যে হেমলক ব্যথিত হলো, “তুমি যেমন ভাবছো সবটা তেমন নয়, রানি!”
“সবটা কেমন তবে, হেমলক পিয়ার্স? সবটা কেমন? আপনি বহু বর্ষ ধরে আমার সঙ্গে প্রতারণার খেলা সাজাননি? সাজাননি আমার পতনের পরিকল্পনা?”
হেমলক রানির প্রশ্নের বিপরীতে মাথা নত করল। অপরাধীর মতো বলল, “সাজিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা কি স্বাভাবিক ছিলো না?”
“স্বাভাবিক? কেন স্বাভাবিক ছিলো? কারণ আপনার মাতার মৃত্যুর দায় ছিলো সুরসুন্দরীর। যিনি আমায় জন্ম দিয়েছিলেন। তার দায়ে আপনি আমায় শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন। ঠিকই আছে, ধরে নিলাম আপনার চাওয়া যৌক্তিক। তবে, সেক্ষেত্রে হলেন তো আপনি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতারণার যে খেলা আপনি সাজিয়েছিলেন আজ ধরে নিন আপনার সেই খেলার শেষ চালটি আমি চাললাম। প্রতারণার বিপরীতে প্রতারণাই তো দিতে হবে, তাই না?”
রানির তীর্যক চাহুনি হেমলকের দিকে। তার স্পষ্ট দৃষ্টি, কুটিল স্বর হেমলককে আরও অপরাধী করল। সেই দৃষ্টিকে উপেক্ষা করতে পারল না হেমলক। অনুনয় করে বলল, “হ্যাঁ আমি মানছি আমি প্রতারণা করেছি। আমি ক্ষতি করতে চেয়েছিলাম তোমার। কিন্তু পরবর্তীতে তো আমি তোমায় ভালোবেসে ফেলেছিলাম। সেখানে কোনো খুঁত ছিলো না বিশ্বাস করো। সেখানে কোনো ছল ছিলো না।”
হেমলকের অনুনয়ের বিপরীতে রানি হেসে খুন হলেন। যেন কী ভীষণ হাসির কথা তিনি শুনে নিয়েছেন! এরচেয়ে হাস্যকর কিছু পৃথিবীতে নেই।
“ছল থেকেই যার শুরু তার ভালোবাসাকে আমি বিশ্বাস করব? আবারও? এতটা বোকামো রানি কামিনীকাঞ্চন কখনো করেছে? আপনি আমায় ক্ষতি করতে চেয়েছিলেন তা-ও না-হয় আমি মেনে নিতাম কিন্তু আপনি আমার প্রজাদের অব্দি ছাড়েননি। এত বড়ো পরিকল্পনা, ছল ইহজীবনে আমার সঙ্গে কেউ করেনি। কেউ না। আর আপনি ভাবলেন আমি আপনার সেসবকে ধরবই না? গুরুত্বই দিবো না?”
রানির কণ্ঠস্বর এখন আর স্বাভাবিক নেই। আগের রানির মতোই উগ্র, তীব্রতর। হেমলক রানির পায়ের কাছে হাঁটু ভেঙে বসল। দু’হাত জোর করে ভগ্নস্বরে বলল,
“আমি ভুল করেছি, রানি। আমি অপরাধী আমি জানি। আমি যে তখন তোমায় চিনতে পারিনি। আমি বুঝিনি, তুমি তোমার মাতার মতো নও। কিংবা তোমার মাতার অন্যায়ের দায়ভার তোমার নয়। শিশুকাল থেকে মাতাহীন, মমতাহীন বড়ো হয়েছি। বুকে তোমার মাতার প্রতি ধীরে ধীরে ঘৃণা পুষে পর্বত করেছিলাম। কিন্তু সেই পর্বতের আমি ধ্বস করাতাম কার জীবনে? তাই তোমায় বেছে নিয়ে ছিলাম। ভেবেছিলাম তোমায় নরক যন্ত্রণা দিয়ে তড়পে তড়পে হত্যা করব। তুমি যত তড়পাবে তত আমি আনন্দিত হবো। সেজন্যই প্রথমে তোমার বিপরীতে ছল করলাম। হ্যাভেনের অজুহাতে তুলে নিয়ে এসেছিলাম। চেয়েছিলাম হ্যাভেন তার উন্মাদনার সুযোগ নিক তোমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু না, হ্যাভেন তা করল না। এবং সেদিনই তোমার তেজ দেখে আমি বুঝেছিলাম সামান্য অস্ত্রে তোমায় নিধন করা সম্ভব নয়। তাই পরবর্তীতে বেছে নিয়েছিলাম তোমার রাজ্যকে, প্রজাদের। সেই সময় সাহায্যের অজুহাতে আমি তোমার প্রাসাদে এইজন্য প্রবেশ করেছিলাম যেন সামনে থেকে তোমায় ধীরে ধীরে রপ্ত করে এরপর ধ্বংস করতে পারি। তোমার রাজকোষ থেকে শুরু করে সমস্ত গোপন সংবাদ যেন নিতে পারি। তোমারও তখন প্রজাদের ছোঁয়াচে ব্যাধি, রাজকোষে সংকট যেটা কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্টি আমিই করেছিলাম। ভেবেছিলাম দুর্বল হয়ে পড়বে তুমি। কিন্তু যখন দেখলাম তুমি ভেঙে পড়ার মধ্যে একজন নও, তুমি লড়াই করার একজন তখন আমার ধারণা বদলাতে লাগলো। যামিনীর প্রতি তোমার বিশ্বাস, তোমার নৈতিকতা, তোমার নিজস্ব তৈরি নিয়ম, তোমার অহং, জৌলুশ আমায় দিকভ্রান্ত করল। ছলের জন্য এসে, তোমার ধ্বংস করতে এসে কখন আমার প্রতিশোধপরায়ণ আত্মাটিই ধ্বংস হয়ে গেলে বুঝালামই না। যখন তোমাকে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলাম তখনও চেয়েছিলাম তোমার পতন ঘটাতে। তোমায় বাঁচিয়েও ছিলাম ধীরে ধীরে মারতে কিন্তু আমি পারিনি। ধীরে ধীরে যখন বুঝলাম তুমি তোমার জন্মদাত্রীর বিপরীত তখন থেকেই আমি সরে আসলাম প্রতিশোধ থেকে। তখন থেকেই প্রতারণা ভুলে আমি প্রেমের হলাম। আমি মানছি, আমি ভুল করেছি। কিন্তু এত বড়ো শাস্তি দিও না তাই বলে!”
হ্যাব্রো হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল। আজকের সমস্ত ঘটনা সে অবগত নয়। হেমলক পিয়ার্স যে রানির এত বড়ো শত্রুদের একজন সে কল্পনাতেও ভাবেনি। হেমলক পিয়ার্সের আচরণ কখনো তা বুঝতেই দেয়নি!
হ্যাব্রো একবার হেমলক আরেকবার রানিকে দেখছে। তার ভেতরেই বিশ্বাসের এমন ধ্বস নেমেছে না জানি রানির কেমন বোধ হচ্ছে! তিনি এগুলো সহ্য করছেন কীভাবে?
“রানি, অনুরোধ তোমায়, আমাকে এত বড়ো শাস্তি দিও না। আমার ভুলের বিপরীতে এই শাস্তি দিও না।”
“ভুল? কোনটা ভুল? অন্যায়কে ভুল সম্বোধন করলেই অন্যায়ের দায় কমে যায় না, হেমলক পিয়ার্স। আপনি আমার মাতার জের ধরে আমায় শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন এতটুকু অব্দি ভেবে না-হয় আমি মেনে নিতাম। কিন্তু আপনি আমার প্রজাদের বেছে নিয়েছিলেন আমার শাস্তির জন্য। আপনার এই ছলের জন্য মৃত্যু হয়েছে আমার একাধিক প্রজার। এখনো আমার রাজ্য পুরোপুরি এই ব্যাধি থেকে সেরে উঠতে পারেনি। এখনো তড়পাচ্ছে আমার প্রজারা। এই অন্যায়ের ক্ষমা চাচ্ছেন? এই অন্যায়ের ক্ষমা? আমার প্রাণের কথা আমি ছেড়ে দিলাম। সুরসুন্দরীর মতো মাতা যার আর রাজা কেশবচন্দ্রের মতো পিতা যার তার প্রাণতো অভিশপ্তই সেটা না-হয় বাদই দিলাম। কিন্তু আমার প্রজাদের? তাদের কী দোষ ছিলো? আমি তাদের রানি বলেই তাদের এমন মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে হলো? আমি রানি বলেই!”
রানির কণ্ঠ শেষ বাক্যটিতে মৃদু কাঁপল বোধহয়। হেমলক একই অবস্থানেই থেকে রানির হাত দুটো চেপে ধরল। এখন আর সে স্থির রইল না। পুরুষদের দম্ভ ভেঙেচুরে কাঁদতে আরম্ভ করল। ক্রন্দনরত স্বরে আকুতি করে বলল,
“না, না, না রানি, তুমি নিজেকে দোষারোপ করো না। তোমার দোষ নেই মোটেও। তুমি রানি হিসেবে চমৎকার। অন্যায়তো আমার যে আমি ভুল ভেবেছিলাম এবং ভুল করেছিলাম। তোমার যে এখানে কোনো দায় নেই।”
হেমলকের সেই কান্না হ্যাব্রোর বুকে অব্দি লাগল। বিভ্রান্ত করে দিলো রানির আদর্শ সেনাপতিকেও। সে বুঝেই উঠতে পারল না হেমলককে ঠিক কোন উপমা দিবে। কোন দায় দিবে? অপরাধীর না অসহায়তার?
অথচ রানি স্থির রইলেন। কণ্ঠ আগের তুলনায় আরও তীক্ষ্ণ হলো,
“আমি রানি হিসেবে কেমন তা আমি অবগত। এবং অবগত বলেই আজ আমি এই সিদ্ধান্ততেই উপনীত হয়েছি যে, আপনার সঙ্গে আমি আমার বৈবাহিক সকল সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া কিংবা সংসার করার মতো মানসিকতায় আর নেই তা ত্যাগ করলাম। এই বদ্ধ কক্ষের ভেতর আমার সেনাপতিকে সাক্ষী রেখে আমি সেই সম্পর্ক ছিন্ন করলাম। আমার সাথে অন্যায় করেছিলেন অতটুকু অব্দি ছাড় দেওয়া যেতো কিন্তু আপনি আমার প্রজাদের যেই অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন তার শাস্তি না দিয়ে তো আমি রানি কামিনীকাঞ্চন আপনায় মুক্ত করতে পারব না। তাই আপনার শাস্তিই হবে আজ এই ভরা রাজ্যে আমার কথার মূল্য রাখতে সেই যজ্ঞানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে রাজকন্যা মৃন্ময়ীর সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। আমার প্রজাদের প্রতি এটিই আমার ন্যায়বিচার হবে যে, তাদের প্রাণ কেঁড়ে নেওয়া কিংবা তাদেরকে ভোগান্তিতে ফেলা মানুষটাকে তাদের অগোচরেও আমি ছাড় দিইনি। রানি কামিনীকাঞ্চনের সঙ্গে প্রতারণা করলে এটা ফেরত পেতেই হবে। আমার মাতার কর্মের দায় আমার নয় যে আমি আপনার এহেন অন্যায় ক্ষমা করবো। আমার সাথে অন্যায় করা আমার পিতা ছাড় পায়নি, হ ত্যা করেছি তাকে। আমার পূর্ব স্বামী ছাড় পায়নি, তাকেও হ ত্যা করেছি। ছাড় পায়নি আমার প্রাণপ্রিয় সখী। ছাড় পায়নি সখীর রাজ্য হতে বংশ। ছাড় পায়নি আপনার রাজ্যের রাজমাতা, মামাশ্রীও। আমার বিচার সামনের মানুষটির সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক সেটি দেখে না, হেমলক পিয়ার্স। আমার বিচারবোধ দেখে কেবল অন্যায়। এবং সেই অন্যায়ের জের ধরেই হয় শাস্তি। সে আমার যত কাছের কেউই হোক না কেন। আপনি যদি তৃতীয় পক্ষ বলার পূর্বেও আমায় জানাতেন আপনার অন্যায়ের কথাটি তবুও আমি ভেবে দেখতাম। কিন্তু আপনি স্বীকার অব্দি করেননি। বহু দিন এক সঙ্গে থেকে, এত না-কি ভালোবেসেও এতটুকু স্বীকার করার বোধ আপনার হয়নি। তাহলে এ আর কেমন প্রেমই বা রইল? এ প্রেমে আমি আর কী-ই বা বিশ্বাস করব? আজ যেহেতু আপনার শাস্তি ধার্য হয়েই গিয়েছে সেহেতু আপনাকে সেটি বহন করতেই হবে। রানি কামিনীকাঞ্চনের শাস্তি থেকে কেউ ছাড় পায় না। স্বয়ং আমি নিজেও নিজেকে ছাড় দিই না সেখানে তো আপনি খুব দূরের। এটাই আমার ন্যায়, হেমলক পিয়ার্স।”
রানি শ্বাস নিতে লাগলেন একটু উত্তেজিত ভাবেই। হেমলক অসহায় হয়ে বলল, “আমি তো তোমার স্বামী, রানি!”
“তো? স্বামী, সংসার দিয়ে রানিকে বাঁধতে এসেছেন আপনি? আমায় বাঁধতে চাচ্ছেন? আমি বহু দিন আগেই সেসব সম্পর্কের উর্ধ্বে চলে গিয়ে, হেমলক পিয়ার্স। আমি সাধারণ ঘরের সংসারী আর পাঁচটা নারী নই যে স্বামীকে প্রভু ভেবে তাদের এম তীব্রতর ও ঘৃণতম অন্যায়কে ক্ষমা করে দিব। আমি রানি কামিনীকাঞ্চন, আমার কাছে সংসার ও স্বামীর পূর্বে আমার প্রজা। তাদের অব্দি পৌঁছানোর দুঃসাহস যে করে তাকে আমি ছাড়ি না। কখনোই না। প্রভুত্ব দেখিয়ে আমি সংসারের জন্য অন্ধ হয়ে যেতে পারি না। আমার নৈতিকতা আমায় কখনো অন্ধত্ব দেয়নি। আমি এই সমাজের প্রথা আমার ভেতর ধারণ করিনি এই জীবনে কভু। আপনি আমায় চিনতে ভুল করেছেন। অনেক বড়ো ভুল।”
হেমলককে আর কিছু বলতে না দিয়েই রানি তার হাত সরিয়ে বেরিয়ে গেলেন হনহনিয়ে। হেমলক সেই যাওয়ার পানে তাকিয়ে আকুতি ভরা নয়নে, আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো। সে এটা কোনক্রমেই মেনে নিতে পারছে না। অনুশোচনা ও রানির প্রতারণায় তার অন্তর ভেঙেচুরে একাকার। সে অন্যায় করেছে, হ্যাঁ, অন্যায় করেছে সে। সে রানিকে চাইলেই জানিয়ে দিতে পারতো কিন্তু করেনি। রানির কাছে নিজেকে মহৎ রাখতে অন্যায় গুলোকেও প্রকাশ্যে আনেনি। রানি তার প্রাণ নিতে পারতেন তাই! নিলেন না। কারণ রানি জানেন হেমলক প্রাণের মায়া করে না। তাই এমন শাস্তি দিলেন। এত কঠোর, নিষ্ঠুর তার রানি। এত কঠিন! প্রজাদের ন্যায় দিতে গিয়ে নিজের স্বামীকেও ছাড়লেন না? এত নির্দয়!
—————
যজ্ঞানুষ্ঠান মহা সমারোহে আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। মৃন্ময়ী সেখানে বসে আছে লাজুকলতা হয়ে। জৈতুন রাজ্যের রাজার তো আনন্দের সীমা নেই। তার কন্যার এই জয় এই বিবাহকেই যেন রঙিন করে দিয়েছে আরও।
কিন্তু অবস্থানরত সকলের ভেতরেই চাপা গুঞ্জন চলমান। যেই খেলাটায় চাইলেই রানি জিততে পারতেন সেটা তিনি ইচ্ছেকৃত কেন হারলেন? এই খেলাতো রানির হাতেই ছিলো! তার এই হার কেউই মেনে নিতে পারছে না। কারণ এই হার যে ইচ্ছেকৃত হয়েছে তা অভিজ্ঞরা তখনই বুঝে ফেলেছিলো। রানি যে ইচ্ছেকৃত রাজকন্যাকে জিতিয়ে দিয়েছেন তা-ও তারা বুঝে গিয়েছে৷ কিন্তু রানি এমনটা করলেনই বা কেন? রাজকন্যার সঙ্গে ভালো সম্পর্কের জের ধরে করলেন? জৈতুন রাজ্যের প্রতি দয়া দেখিয়ে করলেন? না-কি অন্য কারণে!
যজ্ঞানুষ্ঠান থেকে কিছুটা দূরত্বে রানি দাঁড়িয়ে আছেন সাবলীল ভঙ্গিতে। কিছুক্ষণ আগে হয়ে যাওয়া সেই তাণ্ডবের চিহ্নমাত্র নেই রানির মুখমণ্ডলে। যেন সব স্বাভাবিক। তার পাশে দাঁড়ানো হ্যাব্রো অব্দি অস্থির। হেমলক আদৌ এখানে আসবে বলেতো তার মনে হয় না। সে আজ চায়ও যেন তাদের রানির কোনো আজ্ঞা এই প্রথম কেউ অমান্য করুক। কেউ শাস্তি গ্রহণ না করুক। কিন্তু পরক্ষণেই রানির প্রতিশ্রুতির কথা ভেবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। হেমলক পিয়ার্সের আগমনে যে আজ রানির জীবনের আরও একটি মানুষ হারাবে আর আগমন না ঘটলে যে প্রতিশ্রুতি ভাঙবে রানির! তা-ও বা কেমন করে হয়?
দ্বিধান্বিত হলো হ্যাব্রো জীবনে এই প্রথম। রানি এ কেমন সিদ্ধান্ত নিলেন? হেমলক পিয়ার্সের শাস্তির নাম করে সবচেয়ে বড়ো শাস্তিটা তিনি নিজেই বরণ করে নিলেন!
শুভ লগ্ন বহমান। অথচ দেখা নেই হেমলকের। এবার একে একে সকলের আলাপের বিষয়বস্তু হয়ে উঠল হেমলকের অনুপস্থিতি। ঋষিগণ তাড়া দিতে লাগলেন। শুভ মুহূর্ত পেরিয়ে গেলে যে রাজকন্যার ক্ষতি হয়ে যাবে!
জৈতুন রাজ্যের রাজাও এ পর্যায়ে অধৈর্য হলেন, “রানি কামিনীকাঞ্চন, হেমলক পিয়ার্স কোথায়? সময় যে চলে যাচ্ছে!”
প্রতিত্তোরে রানি স্থবির, শান্ত, শীতল। হ্যাব্রো রানির পাশে চঞ্চল ভাবে পায়চারী করতে করতে ফিসফিসিয়ে বলল, “রানি, হেমলক পিয়ার্সতো আসবেন না মনে হচ্ছে। এখন তো আপনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে একটা হম্বিতম্বি হবে!”
রানি চোখ বন্ধ করলেন। শ্বাস তার স্বাভাবিক।
তখনই তীব্র বাদ্যযন্ত্র ও উলুধ্বনির শব্দে মুখরিত হলো চারপাশ। মৃন্ময়ীর ঠোঁটের হাসি বিস্তৃত লাভ করল। পুরো প্রাসাদে ধূপের ঘ্রাণ ও উলুধ্বনির সেই শব্দ শ্রুতিমধুর হয়ে সকলের হৃদয়ে বিঁধল।
রানি হাসলেন খুব সুক্ষ্ণ ভাবে। ব্রহ্মাণ্ডকে প্রবঞ্চনা দিয়ে রানির চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এতটা সাবধানেই পড়ল যেন স্বয়ং স্রষ্টা ব্যতীত কেউই বুঝলেন না মানব অন্তরের সবচেয়ে বড়ো পর্বতটি ভেঙেচুরে হয়ে গিয়েছে লোকালয়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………