মহা সমারোহে যেই বিবাহ অনুষ্ঠানটি শুরু হলো সেটির রাজকীয়তা প্রাসাদ জুড়ে ছড়িয়ে গেলো এক লহমায়।
হেমলক পিয়ার্স ভুল করেও একটিবার তাকায়নি রানির দিকে। একটিবার ঘাড় উঠিয়ে দেখিনি চারপাশে কী হচ্ছে। যতটা সশব্দে তার আগমন ঘটেছিলো ততটাই নীরবে সে অংশগ্রহণ করেছে বিবাহতে।
রানি নিষ্পলক তাকিয়ে রইলেন। তার টান টান দেহভঙ্গি, পলকহীন চক্ষুযুগল দেখে বিস্ময় ধরছিলো না কারো। কোনো নারী এমন করেও যে নিজের স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহ দেখতে পারে তা রানিকে না দেখলে উনারা জানতেনই না বোধহয়। কানাঘুষো, ফিসফিসানি তা নিয়ে কম হচ্ছে না। স্বয়ং রাজমাতা অব্দি কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছেন নিজের কন্যার এহেন সিদ্ধান্তে।
তিনি যতবারই রানির দিকে তাকিয়ে অনুভূতিহীন একটি নারীকে দেখছেন ততবারই তার বুকে ভাঙন হচ্ছে। মহারাজ যখন তার পুত্রসন্তান হচ্ছিলো না বলে দ্বিতীয়বার বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন, তখন তিনি গোটা তিনদিন আহার গ্রহণ করতে পারেননি, নিদ্রাযাপন করতে পারেননি। তার পুরো ব্রহ্মাণ্ড মিথ্যে, নিষ্ঠুর হয়ে গিয়েছিলো। এরপর অদৃষ্টকে তিনি মেনে নিয়েছিলেন ধীরে ধীরে। আজও মহারাজার সঙ্গে দ্বিতীয় রানিকে দেখলে তার অন্তর চূর্ণ হয়। এই বয়সে এসেও স্বামীর ভাগ বণ্ঠনে তার হৃদয় ভেঙেচুরে যায়। অথচ রানি কামিনীকাঞ্চন কি-না এত শান্ত স্বাভাবিক থাকতে পারছেন? একটা শব্দও মুখ থেকে বের করেননি। মানতেই হবে, এই রানির দম রয়েছে। এমন নারী তিনি দ্বিতীয়টি দেখেননি।
রাজমাতাকে গভীর ভাবনায় মগ্ন দেখে রাজা মৃদু ধাক্কা দিলেন, “কী ভাবছো এত গভীর ধ্যানে?”
নিজের অতীতকালের কথা মনে পড়ে রাজমাতার চোখগুলো চিকচিক করে উঠেছে। রাজার ধাক্কায় তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। মাথাটা নাড়িয়ে ক্ষীণ স্বরে বললেন, “মৃন্ময়ীর এতদিনের কোনো সিদ্ধান্তে আমার কোনো বাধানিষেধ, অসন্তুষ্টি ছিলো না। কিন্তু আজকের সিদ্ধান্তে আমার চিত্ত বড়ো বিচলিত হয়েছে।”
“আমার রাজকন্যার জয় এটি! উদযাপন করো, রানি। নিজের কন্যার আনন্দ উপভোগ করতে হয়।” রাজা বেশ আনন্দচিত্তে উত্তর দিলেন। গর্বে যেন তার বুক ভরে যাচ্ছে। তার কন্যা জয় লাভ করেছেন এটা নিয়ে অসন্তুষ্ট হওয়ার কোনো পথই নেই।
রাজমাতা হতাশ হলেন বেশ, “আমার কন্যা যার স্বামীকে নিচ্ছে সেই কন্যাটিও কারো না কারো সন্তান, মহারাজ। সেই মেয়েটির মুখটির দিকে তাকিয়ে এত অপরাধী লাগছে নিজেকে!”
রাজমাতার কথাটি তেমন পছন্দ হলো না হয়ত রাজার। তিনি মুখ কুঁচকে ফেললেন, “তুমি এমন করছো যেন পৃথিবীতে আর কোনো রাজা, মহারাজারা দ্বিতীয়বার বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হননি! অদ্ভুত কথা বলছো, রানি।”
রাজার বিরক্তিতে হতাশ হাসলেন রাজমাতা। মৃদু মাথা নাড়িয়ে সেই হাসি বজায় রেখেই বললেন,
“একাধিক রাজা মহারাজারা দ্বিতীয় বিবাহ করে আসছেন বলে এই নয় যে এটি নারীর কাছে পীড়াদায়ক নয়! তার মানে এটিও নয় যে, কোনো স্ত্রী তার স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহ সহজে মেনে নিতে পারবে। একজন করুক আর একাধিকজন করুক এই অনুভূতি প্রতিটা স্ত্রীর কাছে যন্ত্রণারই। এই বিবাহের অনুভূতি প্রথম স্ত্রীকে কেমন পীড়া দেয় তা আপনি বুঝবেন না, মহারাজ। বুঝলে আমাকেও সেই পীড়া দিয়ে যেতে হতো না। পুরুষদের তো অধিক নারীতে ঐশ্বর্য বাড়ে কিন্তু একটি নারীর ভেতর দিয়ে যে সেই দৃশ্য মহাবিশ্বের প্রলয়ের মতো ভাঙন ধরায় তা আপনারা কখনোই বুঝবেন না। পুরুষদের কথা না-হয় বাদই দিলাম, আমার কন্যার মতো নারীরাই তো বুঝল না। কী সুন্দর হাসতে হাসতে অন্যের সংসার, স্বামীর ভাগ নিয়ে নিচ্ছে দেখুন! নারীই যদি নারীকে না বোঝে পুরুষের আর কী দোষ দিবো, বলুন?”
রাজমাতার হাসতে হাসতে অবলীলায় বলা কথাগুলো ভীষণ আশ্চর্য করল রাজাকে। এতটাই আশ্চর্য যে তিনি থম মেরে গেলেন। এর আগে কখনোই তিনি বুঝতেই দেননি, রাজার দ্বিতীয় বিবাহ তাকে ঠিক কতটা দুঃখ দিয়েছিলো। আজ রাজা বুঝছেন, রাজমাতার চোখের টলমল করা অশ্রু সেই পুরোনো পীড়ার সাক্ষী দিচ্ছে।
রানি ধীরে ধীরে পা ফেলে পিছে সরতে সরতে সকলের অগোচরে সেই কখন যে প্রাসাদের বাহিরে এসে দাঁড়ালেন! কেউ খেয়াল করল না ঠিক। খেয়াল করল কেবল একজন। রানির ছায়া, রানির পরম শুভাকাঙ্ক্ষী হ্যাব্রো।
সে-ও এসে দাঁড়ালো রানির পিছু পিছু। রানির শরীর যেন টলছে। নিজের ভেতর নেই তিনি। কেবল মন্থর স্বরে হ্যাব্রোকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“ক্যামিলাস রাজ্যে ফিরে চলো, হ্যাব্রো। নতুন বধূর বরণের আয়োজন তো করতে হবে ওদের পৌঁছানোর আগে। ফিরে চলো।”
হ্যাব্রো ব্যাকুল চোখে রানির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজেকে আর কতটুকু কষ্ট দেওয়ার পর মানুষটা শান্ত হবেন কে জানে!
—————
ক্যামিলাসের প্রাসাদ দিনের আলোর সাথে পাল্লা দিয়ে সজ্জিত হয়েছে। ভোর হতেই কলরবে ছেয়ে গিয়েছে প্রাসাদ। হেমলকের দ্বিতীয় বিবাহের সংবাদটি হ্যাব্রোই দিয়েছে। রানিতো এসেই কক্ষে গিয়েছিলেন আর কোনো দেখা ছিলো না তার। কিন্তু প্রাসাদে সাজসজ্জার যেন কোনো ত্রুটি না থাকে সেটি বার বার হ্যাব্রোকে বলে গিয়েছিলেন।
প্রাসাদে উপস্থিত ক্যামিলাসের আত্মীয়, শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভেতর যেন বিস্ময় ধরে না। রানি এ কেমন ঘটনা ঘটালেন! প্রাসাদের আনাচে-কানাচেতে সেই আলাপের যেন নিস্তার নেই।
অপরাহ্ণের বেলা ফুরাতেই হ্যাব্রো আর ধৈর্য রাখতে পারল না। সারাদিনে রানি একটিবারও কক্ষ ছেড়ে বের হননি। রানির স্বাস্থ্য ও হৃদয়ের কথা ভেবে তার অন্তর বড্ড ভীত হতে লাগল। তাই না চাইতেও সে রানির কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কিছুটা বসে যাওয়া কণ্ঠে ডাকল,
“রানি, আসব?”
পর পরই রানির অনুমতি ভেসে আসল। কক্ষের ভেতর প্রবেশ করে হ্যাব্রোর চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার উপক্রম। রানি স্বয়ং ধূপ, প্রদীপ, বাহারি পুষ্প দিয়ে কক্ষের রূপই যেন পরিবর্তন করে ফেলেছেন। তীব্র সুবাসে মাথা ভার হয়ে আসার উপক্রম।
রানি শেষের প্রতীপটি সঠিক স্থানে রাখতে রাখতে উৎফুল্ল স্বরে শুধালেন,
“দেখোতো, হ্যাব্রো। ঠিক আছে না? আজ তো ওদের শুভরাত্রি, নতুন বধূসহ এই কক্ষেই রাত্রিযাপন করবে। কক্ষটা ঠিকঠাক লাগছে না?”
হ্যাব্রো যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। বার কয়েক ঢোক গিলে সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। এমনিতেই হেমলকের বিবাহ বিষয়টি সে মেনে নিতে পারছে না। এই জীবনের সকল জঘন্যতম ঘটনা সে মেনে নিতে পারলেও এটা কোনোক্রমেই পারছিলো না। কিন্তু রানি..
রানি এসব কী করছেন? কীভাবে এসব করছেন? মানুষটার অন্তর ফেটে যাচ্ছে অথচ তবুও এসব করছেন। কেন? কী দায় তার? হেমলককে শাস্তি দেওয়ার বিপরীতে নিজেকে তিনি এমন নরকযন্ত্রণা কেন দিচ্ছেন? নিজের হাতে এই কাজগুলো করে নিজেকে তিনি যন্ত্রণার সর্বশেষ স্তরে কেন নিয়ে যাচ্ছেন?
হ্যাব্রোর প্রতিত্তোর না পেয়ে রানি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হলো? কিছু কম লাগছে? কথা বলছ না কেন?”
হ্যাব্রো আর সহ্য করতে পারল না যেন। রানির নিজের প্রতি করা অন্যায় আর তার দেখার ক্ষমতা হলো না হয়ত। সে দু-হাত জোর করে ফেলল। কম্পনরত স্বরে, অসহায়ের মতো করে বলল,
“দয়া করে আর এমন করবেন না, রানি। নিজেকে এত যন্ত্রণা দিবেন না। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আর না।”
হ্যাব্রোর ভঙ্গুর স্বরের বিপরীতে রানির ঠোঁটের হাসি আরও একটু চওড়া হলো যেন। খুব ব্যস্ততার সঙ্গে শুধালেন,
“একটা শুভ কার্যে তুমি এত বাঁধা দিচ্ছো কেন, হ্যাব্রো?”
এই স্বাভাবিক রানি, রানির বাচনভঙ্গি যেন হ্যাব্রোকে আর স্থির থাকতে দিলো না। রাগে, দুঃখে তার শরীর কাঁপতে লাগলো। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। সে ধপ করে বসে পড়ল মেঝেতে। অনুনয় করে বলল,
“নিজেকে আপনি কীসের শাস্তি দিচ্ছেন, রানি? এ কীসের শাস্তি বরণ করে নিচ্ছেন? এত নিষ্ঠুর হবেন না নিজের ক্ষেত্রে। আমি আর সহ্য করার ক্ষমতায় নেই। আপনার এই মহা আড়ম্বরপূর্ণ দুঃখ আমি আর মেনে নিতে পারছি না।”
“কেন পারছ না, হ্যাব্রো? এমনটা যে হতেই হতো।”
“আপনি হেমলক পিয়ার্সকে শাস্তি দেওয়ার নামে নতুন জীবন দিলেন, অথচ নিজের কথা ভাবলেন না একটিবার?”
“ধীরে বলো, হ্যাব্রো। এই কথা যেন কেহ, কখনো শুনতে না পারে, জানতে না পারে। রানি কামিনীকাঞ্চনের অহং চূর্ণ হয়ে যাবে তবে। সে অপরাধীকে শাস্তির নামে মুক্তি দিয়েছে এই কথা যেন কেউ না জানে। রানি কামিনীকাঞ্চনের তাহলে আর দম্ভ করার কিছু থাকবে না যে। সবাই জেনে যাবে, রানি কামিনীকাঞ্চন পুরুষের সংজ্ঞা ভুলে পুরুষকে ভালোবেসেছে। রানি কামিনীকাঞ্চনও কোনো পুরুষের চোখে কাম ব্যতীত প্রেম দেখেছে। রানির যেই জৌলুশ পুরুষের না হওয়ার সেই জৌলুশ চূর্ণ করে তিনিও কারো হয়ে গিয়েছে। এই কথা যেন কেউ না জানে, হ্যাব্রো। জানলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। হেমলক পিয়ার্সের জন্য আমি যেই উত্তম জীবন পরিকল্পনা করেছি তা ধ্বসে যাবে। বলো না এসব, বলো না।”
হ্যাব্রো আঁখিতে অশ্রু লেপ্টে তীব্র বিস্ময় নিয়ে তাকালো। তাহলে সে ঠিকই ভেবেছিলো? রানির এসকলই কেবল পরিকল্পনা ছিলো? শাস্তির নামে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন?
“কেন করলেন এমন, রানি? সংসার করা কি যেতো না একেবারেই?”
হ্যাব্রোর অসহায় কণ্ঠের বিপরীতে রানি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন না। রয়েসয়ে বসলেন নিজেও মেঝেতে। প্রদীপ গুলোতে একে একে আরো জ্বালাতে জ্বালাতে বললেন,
“আমার সংসারের সাধ বহু আগেই আমি ছেড়ে এসেছিলাম, হ্যাব্রো। আমি তখন এমন নিষ্ঠুর ছিলাম না। মোমের মতো মোলায়েম ছিলাম, সদ্য পরিস্ফুটিত হচ্ছিল জীবন। পিতা বলে যাকে জানলাম তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ জীবনে আমি একটু ভালোবাসা খুঁজছিলাম। মরিয়া হয়ে উঠে ছিলাম। কখন আমার বিবাহ হয়। ভেবেছিলাম স্বামীতো সর্বস্ব, নিশ্চয় আমি এবার ভালোবাসা পাবো! কিন্তু পাইনি, জানো? সে-ও আমার দেহকে চাইল। যত নির্দয় ভাবে একটি মেয়েকে তছনছ করে দেওয়া যায় সে করল। আমার একটি স্তন কেটে নিলো। তার শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হলাম আমি। একটি ভ্রুণ ভূমিষ্ট হতে পারল না। তাকেও হত্যা করল। অথচ আমার পাশে দাঁড়ানোর কেউ ছিলো না। এমনকি পিতা ডাকা মানুষটাও না। তখন অবাক হয়েছিলাম, কারো পিতাও এমন হয়? এত যাতনার পর আমার ঠাঁই হয়েছিলো বদ্ধ কক্ষে। অন্ধকার জীবন। এরপর বদ্ধ কক্ষে পরিত্যক্ত আমি নতুন করে নিজেকে খুঁজতে শুরু করলাম। খুঁজতে গিয়ে দেখলাম ভালোবাসা নামক কিছুই আরে বুকে অবশিষ্ট নেই। সেই প্রথম নিজের জন্য নিজে দাঁড়ালাম। এতটা নির্দয় কখন হয়ে ওঠেছি বুঝেই উঠতে পারিনি! নিজের স্বামীকে নিজের হাতে হ ত্যা করেছিলাম। নিজের পিতাকেও করেছিলাম। ঘৃণা এত প্রবল হয়েছিলো যে হ ত্যা না করে শান্তিই পাচ্ছিলাম না। যখন ওদের হত্যা করলাম তখন সেই সংবাদ রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ল, আমি বসলাম সিংহাসনে। দেখলাম, প্রেম দিয়ে আমি যা অর্জন করতে পারিনি তা ভয় দেখিয়ে হলো। সবাই আমায় জানতে লাগলো, শ্রদ্ধা করতে লাগলো, ভয় পেতে লাগলো। সেই ছোটো আমি কয়েকদিনের ব্যবধানে এতই বড়ো হয়ে গেলাম যে কখন নিজেও জানতে পারলাম না। অথচ এতটা বড়ো যে আমি কখনোই হতে চাইনি!”
কথা থামল রানির। শক্ত কণ্ঠ তার কোমল হয়ে এসেছে। বাহিরের শোরগোল ছাপিয়ে কক্ষ তীব্র নিস্তব্ধতায় রূপ লাভ করল। হ্যাব্রো কিচ্ছুটি বলল না। সে বুঝে গিয়েছে, আজ রানির বলার দিন। হয়ত এই শেষবারই রানি বলবেন এরপর আর কখনোই এই বিষয়গুলো আর কেউ জানবে না। কারণ মানুষ শেষ ধাক্কার পর ভয়ঙ্কর ভাবে বি স্ফো রিত হয়ে এতটাই শক্ত হয়ে যায় যে তাকে আর ভাঙতে পারার সক্ষমতা কারো থাকে না। রানির ক্ষেত্রেও তা-ই হবে হয়ত!
রানি পুনরায় দম নিলেন। বুক ভরে শ্বাস নিলেন শব্দ করেই।
“আমার জীবনটা কত অদ্ভুত দেখো, হ্যাব্রো! হেমলক পিয়ার্স আমার সাথে প্রতারণা করেছিলেন কারণ আমার মাতা সুরসুন্দরী। আচ্ছা এখানে কি আমার কোনো দোষ ছিলো? আগে বুঝতে না পারলেও এখন বুঝি, আমার পিতা মূলত কেন এত অত্যাচার আমায় করেছিলেন। কারণ আমার মাতা সুরসুন্দরী ছিলেন, আর আমি তার মতো দেখতে ছিলাম। অথচ দেখো, সেই মাতা সদ্য জন্মানো আমাকে এ্যাজেলিয়া রাজ্যে ফেলে গিয়েছিলেন বিন্দুমাত্র আমার কথা না ভেবেই। মায়া না করেই। আর এদিকে কি-না তার কন্যা হওয়ার জন্য আমার পুরো জীবন জুড়ে অভিশাপ বয়ে যেতে হলো! মাতাকেও বিশেষ দোষ দিই না। কীইবা দোষ দিবো বলো? তিনি রাজা কেশবচন্দ্রের প্রেমে মরিয়া হয়ে সম্ভ্রম, সম্মান সব খুইয়ে ছিলেন। তার বদলে পাননি কিছু। তাই আমি কেশবচন্দ্রের অংশ বলেই তিনি আমাকে সেই নরকে রেখে গিয়েছিলেন, যেই নরকযন্ত্রণা তাকে উন্মাদ করে দিয়েছিলো। হয়ত এজন্যই রেখে গিয়েছিলেন, যেন রাজা কেশবচন্দ্রের রক্ত পাওয়া কন্যাটিও একই যন্ত্রণায় তড়পায়। শিশুটি যত তড়পাবে ততই তিনি স্বস্তি বোধ করবেন বা করতে চেয়েছিলেন। তার মানসিক স্তর আমাকে সন্তান ভাবায়নি, ভাবিয়ে ছিলো প্রতিশোধের অস্ত্র! দুর্ভাগ্য দেখো, পিতা আমার সাথে নির্মম হলেন আমার জন্মদায়িনীর উপর প্রতিশোধে, মাতা নির্মম হলেন জন্মদাতার উপর প্রতিশোধের জের ধরে এমনকি স্বামীও একই কারণে প্রতারণা করলেন! সব দোষ ঘুরেফিরে পড়ল আমার জন্মতেই! কেন? আমার কী দোষ ছিলো বলো? আমার কী এমন কর্মফল ছিলো যে আমি মাতারও হলাম না, পিতারও হলাম না শেষমেশ হলাম না স্বামীরও? এই জন্মদোষের পেছনে আমার কি কোনো হাত ছিলো? ছিলো না। অথচ সব আমাকেই সহ্য করতে হলো! কেন? কেন? কে দিবে এই উত্তর?”
রানি এবার ফুঁপিয়ে উঠলেন। চোখ ভেসে গেলো নোনা জলে। পারছেন না যেন চিৎকার করে কাঁদতে।
হ্যাব্রোর ভেতরে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। গাল ভিজে গিয়েছে তারও। সে নিজের মুখ চেপে রেখেছে। রানির জীবনের কিছু কিছু সত্যি সে জানলেও আজ এ যেন এক ভিন্ন গল্প শুনছে। রূপকথার গল্প। যেই রূপকথার গল্পে ছোটো রাজকন্যাটিকে ছিঁড়ে খেয়েছে দানবীয় রাক্ষস।
“হ্যাব্রো, বিধি এমনই ললাট লিখলেন আমার, না পেলাম জলে ঠাঁই না পেলাম ডাঙায়। সংসার, মানুষ, আপন শব্দগুলো আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো তবুও তো আপন ভেবেছিলাম সখীকে, সে-ও প্রতারণা করল। এরপর ভাবলাম যে এত নিখুঁত ভাবে ভালোবাসছে আমায় স্বামী রূপে, সে বোধহয় শেষমেশ আমার লোক! স্রষ্টা বোধহয় আমাকে এবার অবশেষে সব প্রেম ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন! অথচ হলো কী?
আমার সংসার করার সাধ ছিলো না। জীবনকে এতভাবে দেখতে দেখতে আমি সংসারের সাধের উর্ধ্বে চলে গিয়েছিলাম। আর পাঁচটা সাধারণ নারীর মতো প্রেম প্রদর্শন আমায় দিয়ে হতো না, আহ্লাদ করতে পারতাম না কিন্তু হেমলক পিয়ার্সের প্রেমকে আমি সত্যি ভেবে নিয়েছিলাম বহু বর্ষ বাদে। ভেবেছিলাম যাক, নতুন করে হয়ত অকারণে কেউ ভালোবাসবে আমায়। কিন্তু দেখো, হলো কী শেষে? সে-ও না-কি আমার সাথে প্রতরণার জেরে সম্পর্ক বুনেছে! আমি বিশ্বাস করিনি জানো? আমার রাজ্যের এত প্রজা তার প্রতিহিংসার জন্য মৃত্যুবরণ করেছে এটা আমি বিশ্বাস করিনি। যার বুকে এত প্রেম সে কেমন করে এত হিংস্র হতে পারে বলো? কিন্তু রাজবৈদ্য জানালো, এটা সত্যি। হ্যাঁ হ্যাঁ, সত্যি। আমাকে শেষ করে দিতে হেমলক পিয়ার্সও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার যেই ছোটো ছোটো যত্নকে আমি ভালোবাসলাম সেসবই তো গড়ে উঠেছিলো ছলের উপর। আমাকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার ছলের উপর। আমার ভালোবাসা গড়ে উঠলো মিথ্যেকে কেন্দ্র করে। ভাবো, এতটাও দুর্ভাগ্য কারো অদৃষ্টে লিখতে পারেন বিধি? তুমি বললে চাইলেই আমি সংসার করতে পারতাম। কীভাবে সংসার করতাম? হেমলকের যেই যত্নকে আমি ভালোবেসেছিলাম তাতো ছল ছিলো তার। সেই ছল জেনেও সংসার করতাম? তার জন্য আমার এত এত প্রজার মৃত্যু হলো, তারপরও আমি সংসার করতে পারতাম? আমি ভালোবাসা চিরজীবন খুঁজে গিয়েছি এটা যেমন সত্যি তেমন সত্যি হেমলকের প্রতারণা, একটু একটু করে সাজানো আমার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের খেলা। এই মিথ্যের উপর বসতি গড়া যেতো? প্রেমে এত অন্ধ হয়ে যেতাম কী করে বলো? আমার প্রজাদের মৃত্যুর শাপ আমায় ভালো থাকতে দিতো?”
রানির কান্না দমে এসেছে। কণ্ঠ নির্মল। প্রশ্ন করে হ্যাব্রোর দিকেই তাকিয়ে আছেন স্পষ্ট।
হ্যাব্রোর কণ্ঠ ভারি হয়ে গিয়েছে, “অন্য শাস্তিও দেওয়া যেতো! ছেড়ে দিতেন তাকে। তাহলেও তো দু'জনে কম কষ্ট পেতেন অন্তত। আমি ভাবতে পারিনি উনি শেষ অব্দি বিবাহ করবেন! আর রাজকন্যা মৃন্ময়ী! উনি কীভাবে পারলেন এমনটা করতে!”
“বিবাহ ওকে করতেই হতো। আমি সমস্তটাই এভাবে গুছিয়ে ছিলাম যে। তোমার কী মনে হয় এগুলো এক মুহূর্তে ঘটেছিলো? না, মোটেও নয়। রাজকন্যা মৃন্ময়ীর এই স্বয়ম্ভর সভা, এই আমন্ত্রণ, এই পাশা খেলা সবই আমার পরিকল্পনা। রাজকন্যা মৃন্ময়ী কেবল সহযোগী হয়েছে। প্রথমে মৃন্ময়ী কিন্তু রাজি হয়নি। আমার পরিকল্পনায় ও সাথ দিতে চায়নি কারণ হেমলক পিয়ার্স যে আমাকে ভালোবাসে। আমি ওকে বলেছিলাম রাজি হতে। কারণ আমি হেমলক পিয়ার্সকে শাস্তির সঙ্গে মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম। হেমলক আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। হয়ত এটা করাও যুক্তিযুক্ত ছিলো। শৈশবে নিজের মাতাকে সে শেষ হতে দেখেছিলো আমার মাতার কারণে। তাই প্রতিহিংসাপরায়ণ হওয়া স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু সে চাইলে পরবর্তীতে আমায় সবটা বলতে পারতো না? স্বীকার করেই না-হয় নিতো, কিন্তু সেটা করেনি। হ্যাঁ, আমি চাইলে তাকে ছেড়ে দিতে পারতাম, কিন্তু সে কি ছাড়তো আমায়? ছোটো থেকে একটা মানুষ ভালোবাসা পায়নি, ভালোবাসার অভাবে ভুগেছে তাকে আমি ছেড়ে দিলেও সে আমায় ছাড়তো না। এতে লাভ কী হতো? বাকি জীবনটাও তাকে প্রেমহীন কাটাতে হতো। যে মানুষটার গোটা শৈশব ধ্বংস করেছে আমার মাতা, আমি চাইনি তার বাকি জীবনটুকু ধ্বংস হোক আমার জন্য। জানো?
মৃন্ময়ী তার প্রিয় রং এর নাম জানে, ফুল চেনে, খাবার জানে, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে পারে… আমি যে পারি না। তাই ভাবলাম শাস্তির নামে নাহয় হেমলক পিয়ার্সকে প্রেম দণ্ডে দণ্ডিত করা হোক। তার মাতা অভিশাপ দিয়েছিলেন আমার মাতাকে, যেন আমার মাতার ভবিষ্যত প্রজন্মসহ শাপিত থাকে। সেই অভিশাপের কিছুটা যে মোচন করতে হতো। একমাত্র হেমলককে প্রেমময় একটি জীবন দিলে হয়ত সেই অভিশাপের বিন্দুমাত্র হলেও আমি কাটিয়ে উঠতে পারব। তাই নিয়েছি এই সিদ্ধান্ত। আমি জানতাম হেমলক পিয়ার্স মানবে না তাই প্রথমে তাকে আমি অনুশোচনায় ডুবিয়েছি। কারণ মানুষ যখন অনুতপ্ত অনুভব করে, নিজের অন্যায় নিয়ে অনুশোচনায় ভুগে তখন তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। সে তখন চায় কেবল দায়মুক্ত হতে। হেমলক চাইলেই শাস্তি অস্বীকার করতে পারতো। যেহেতু রানি কামিনীকাঞ্চন ওকে বদ্ধ কক্ষে শাস্তি দিয়েছেন তার অর্থ তিনি এই অন্যায়টির কথা ব্রহ্মাণ্ডের কাউকেই জানতে দিতেন না। হেমলক চাইলেই শাস্তি অস্বীকার করে সরে যেতে পারতো। কিন্তু ও এতকিছু ভাবতেই পারেনি। ওর সেই সক্ষমতাই আমি শেষ করে দিয়েছিলাম অনুশোচনায় দগ্ধ করে। এমনিতেই আমার সাথে প্রতারণা করেছে এই অনুশোচনা জেঁকে ধরেছিলো তাকে, তার উপর যদি সে কথা না রাখতো তাহলে আমার প্রকাশ্যে দেওয়া কথার অবমাননা হতো এবং আমার আবারও একটি দুর্নাম হতো। সে নতুন করে আমাকে আর দুর্নাম দিতে চায়নি তাই বিবাহ করাকেই শ্রেয় মনে করেছে। হ্যাব্রো, আমি বহুদিন রাজনীতি করি, বহু মানুষ আমায় জয় করার চেষ্টা করেছে। এতটুকু মানব মস্তিষ্ক পরিচালনা করার ক্ষমতা আমার নেই ভেবেছো? আমি যা পরিকল্পনা করি, তা সফল করতে পুরো ব্রহ্মাণ্ড এক হয়ে যায়। কারণ তারাও জানে, রানি কামিনীকাঞ্চন কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয় না। কখনোই না।”
হ্যাব্রো কিছু বলে না। থেমে যান রানিও। নিজেকে সামলান। মনে মনে বিড়বিড় করেন কত কী! তিনি হেমলকের আরও একটি অন্যায়ও যে লুকিয়ে গেলেন। হ্যাভেনের মৃত্যুকালীন সময়ে হেমলক দেখেছিলো কিন্তু সে হ্যাভেনকে বাঁচানোর নামমাত্র চেষ্টা করেনি, এই অন্যায়ের কথাটি রানি নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতিকেও আর বললেন না। তিনি চান না হেমলককে কেউ ঘৃণা করুন। তিনি চান হেমলকের যেন সবচেয়ে বেশি প্রেম মেলে। নয়ত অপরাধবোধ নিয়ে তার জীবন কাটাতে হবে।
সে সব ঝেড়ে ফেলে রানি তার অশ্রুসজল চোখে জোরপূর্বক হাসি আনলেন। হ্যাব্রোর সিক্ত মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বললেন,
“সকলেই তো আমার সঙ্গে প্রতারণা করল, অবশিষ্ট রইলে তুমি। বলো, তুমি করছো কবে?”
হ্যাব্রো হাত দু'টো জোর করে নিলো সঙ্গে সঙ্গে। তড়িৎ স্বরে বলল,
“কখনোই না। আমি আমার অতীত ভুলিনি, রানি। অন্য রাজ্যের সাধারণ একজন বণিকের দাস ছিলাম। আপনার ঘোড়াটি জখম হয়েছিলো বলে আমি তার ক্ষততে সামান্য প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছিলাম বলে আপনি আমাকে এই রাজ্যে নিয়ে এসেছিলেন। আমার পিতা-মাতা কেউ ছিলো না। কূল, জাত কিচ্ছুটি ছিলো না। সেই আমাকে ভরসা করে আপনার একমাত্র সেনাপতি বানিয়েছিলেন। আমি যদি আপনার সঙ্গে প্রতারণা করি তবে পৃথিবীতে আর বিশ্বাসের কোনো স্থান থাকবে না। এই কথা উচ্চারণও করবেন না কখনো। আপনার পদতলে আমি আমায় সঁপেছি।”
রানির এবার সত্যি সত্যি বুক হালকা হয়ে যায়। হ্যাব্রোর আনুগত্য দেখে প্রাণ জুরোয়,
“হয়েছে হয়েছে, যাও। বাহিরে শোরগোল হচ্ছে, মনে হয় ওরা এলো। বড্ড কথা বলছ আজকাল।”
এবার হ্যাব্রোও হাসে। জীবনে সে যে কাজটি করেনি কিন্তু করার আকাঙ্ক্ষা রেখেছিলো সেটি আজ করে বসে। রানিকে বিস্মিত করে সে রানির পায়ের কাছে মাথা নত করে একটি প্রণাম করে। এরপর দ্রুতই উঠে বেরিয়ে যায়। রানি মুহূর্তের জন্য হতবিহ্বল হয়ে গেলেও পরক্ষণেই হেসে দেন। চোখের এক ফোঁটা আনন্দ অশ্রু হাসে তার সঙ্গে। দিনশেষে সব হারানো মানুষেরও অনেককিছু মেলে। হয়ত চোখের দৃষ্টিতে তা ধরে পড়ে না কিন্তু সেই পাওনা বৃহৎ হয়। জন্ম জন্মান্তরের সাধনাতেও পাওয়া যায় না এমন কিছু। এই যে মাথা ঠেকানো শ্রদ্ধা, আনুগত্য আর ইতিহাস।
—————
ক্যামিলাসের রাত্তিরের অন্ধকার মোচন করেছে অগণিত আলোকরশ্মি। হেমলক পিয়ার্সের দ্বিতীয় বিবাহ উপলক্ষে যে আয়োজন হয়েছে তার জুড়ি মেলা ভার।
রানি তার এক হাতে বরণ ডালা নিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে যেতে লাগলেন। নতুন বধূকে বরণ করার ভারটা তিনি অচিরেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন যে!
প্রাসাদের সদর পেরুবার আগেই রানির পায়ের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও এক জোড়া পা। রানি থেমে যান। পলক ফেলে তাকাতেই দেখেন রাজকন্যা লিলি দাঁড়িয়ে আছে। আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে সে হড়বড়িয়ে বলল,
“এত বড়ো সর্বনাশটা না-ই করতেন নিজের!”
রানির ঠোঁটে যেন রাজ্যের হাসি আজ। হাসতে হাসতে শুধালেন,
“বাহ্ রে! তুমি তো আমায় বিশেষ পছন্দ করো না রাজকন্যা লিলি। তাই তোমার জন্য পছন্দসই ভ্রাতার বধূ আনলাম। তবুও অভিযোগ?”
“পছন্দ করি না তা ঠিক। কিন্তু চেয়েছিলাম তো আপনিই থাকুন। তবে কেন? ভ্রাতা আপনি বলতে অন্ধ ছিলো। তারপরও!”
“পুরুষদের নিয়ে অত ভেবো না, রাজকন্যা লিলি। তারা ঠিকঠাক এক রাত্রি অন্য নারীর সাথে কাটালেই সেই নারীর হয়ে যায়। তোমার ভ্রাতাও তা-ই হবে। আমি মুছে যাব তার হৃদয় থেকে। মৃন্ময়ীর সেই ক্ষমতা আছে।”
লিলি আজকের নরম কণ্ঠের রানিকে দেখে হতাশ হলো। গটগটিয়ে চলে গেলো রাজপ্রাসাদের বিরাট দোরের দিকে। নতুন বধূ আসায় বেশ ভিড় জমে গিয়েছে সেখানটায়। রানি পুনরায় হাসলেন। মানুষের শক্ত হওয়ার সর্বশেষ ধাপ বোধহয় হাসি। নিজের দুঃখকে রানি সেই হাসিতে রূপান্তর করেছেন।
উলুধ্বনি বাজলো, বাদ্যযন্ত্র বাজলো, রাজকীয় সাজসজ্জা নিয়ে উপস্থিত হলেন রানি। এমন করে কেউ আগে নিজের স্বামীর বিবাহকে উদযাপন করেছিলেন কি-না কে জানে? হেমলকের মাথাটি নতই রইল। রাগে, ক্ষোভে না অভিমানে ঠিক বোঝা গেলো না। রানি বরণ করলেন। মহা আনন্দে নিজের স্থান ত্যাগ করে বরণ করলেন।
হ্যাব্রো দূরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর চোখ ভরে দেখল রানির এই একাকীত্বকে। রানি কী না পারেন? শেষ অব্দি এটাও করলেন। হৃদয় ধ্বংস হচ্ছে তার অথচ তবুও তিনি মাতলেন কেমন খেলায়!
এভাবেও ভালোবাসা যায়? নিজেকে সবভাবে ভেঙেচুরে উড়িয়ে দেওয়া যায়?
পরিশিষ্টঃ—
সূর্যের তীর্যক রশ্মি এসে এ্যাজেলিয়ার প্রাসাদ ছুঁয়ে যাচ্ছে। রৌদ্রতাপে পুড়ে যাবে যেন পথ, পথান্তর। রানি দাঁড়িয়ে আছেন তার বিস্তর বারান্দায়। নিচে তার অগণিত সৈন্য সামান্ত। রানির ঠিক পেছনে দাঁড়ানো হ্যাব্রো।
সৈন্য সামান্ত ও তাদের পরিবার বর্গের সঙ্গে একাধিক প্রজাদের মাঝে রানির বজ্রকণ্ঠ ঝনঝন করে উঠল,
“প্রিয় প্রজারা,
আমরা আমাদের বণিকদের উদ্ধার করতে যাচ্ছি। সেই রাজ্যও আমরা দখল করব। আপনারা আমার সাথ দিবেন কেবল। আমি শেষ রক্তবিন্দু অব্দি আমার সৈনিকদের রক্ষা করব। আমি জানি, তাদের জন্য তাদের পরিবার অপেক্ষা করবে। আপনারা কেবল ভরসা রাখবেন। আপনাদের রানি আপনাদের জন্য সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করবে। রানি কামিনীকাঞ্চনের প্রতিজ্ঞা রইল, সে এই রাজ্যের প্রতিটি প্রজার হয়ে থাকবেন।”
প্রজাদের জনস্রোত রানির ভাষণের পর জয়জয়কার শুরু করল। মুখরিত ধ্বনিতে ভেসে আসতে লাগলো,
“জয় রানি কামিনীকাঞ্চনের জয়। জয়, জয়।”
রানি সেই স্রোতের দিকে তাকিয়ে দাম্ভিক হাসলেন। হ্যাব্রোকে তাড়া দিয়ে বললেন, “চলো হ্যাব্রো, আমাদের সময় হয়ে যাচ্ছে। যদিও আমাদের ফেরার জন্য কেউ অপেক্ষা করে থাকবে না, কেউ নেই পথ চেয়ে থাকার, তবুও রাজ্যের স্বার্থে আমাদের ফিরতে হবে। চলো।”
হ্যাব্রোকে রানি তাড়া দিলেও হ্যাব্রো নড়লো না। বরং হাতের পেছনে রাখা একটি শক্ত লোহার বন্ধনী এনে এগিয়ে দিলো রানির দিকে। রানি তা দেখে ভ্রু কুঁচকালেন। বুঝতে পারলেন না ঠিক। হ্যাব্রো বন্ধনীটি রানির হাতে তুলে দিতে দিতে বলল,
“আমাদের ফিরতে হবে এ জন্য যে, এই রাজ্য আরও একটি দারুণ প্রজন্মের শাসনের জন্য পথ চেয়ে আছে। সেই প্রজন্মকে তো তাই সুস্থ, সবল রাখতে হবে তাই না বলুন? এটা বিশেষ কায়দা করে বানানো উদরের জন্য। আপনার গর্ভে থাকা আরও একজন রানি কামিনীকাঞ্চন যেন এবার সঠিক জীবন পায় সেটা দেখার দায়িত্ব আমার। সে কোনো আঘাত পাবে না তার মাতার মতো। তাকে কোনো আঘাত ছুঁতে পারবে না। এটা মামাশ্রী হ্যাব্রোর প্রতিজ্ঞা, রানি।”
·
·
·
সমাপ্ত……………………………………………………