জৈতুন রাজ্যের রাজপ্রাসাদ জুড়ে উন্মাদনায় বসে আছেন বিভিন্ন রাজ-রাজারা। মৃন্ময়ী ও রানি কামিনীকাঞ্চনের ভেতর হতে যাওয়া প্রতিযোগিতা এখন আর সামান্য মাত্রায় নেই। তাদের বাজিতে রাখা বিষয়বস্তু খেলাটিকে একটি অসামান্য মাত্রাতেই নিয়ে গিয়েছে। একজন নিজের পুরো রাজ্যই খেলাতে লাগিয়ে দিয়েছে আর আরেকজন নিজের সংসার। রাজ্য অব্দি বিষয়টি মেনে নেওয়ার মতো ছিলো কিন্তু সংসার! এমনও হয় কখনো? হয়েছে? এ-ই বোধহয় প্রথম এমন আশ্চর্যজনক কাণ্ড সকলে দেখবে। এই অভিজ্ঞতা নিবে সামনে থেকে।
চাপা গুঞ্জন হচ্ছে বেশ। টান টান উত্তেজনা লোমহর্ষক রূপ নিয়েছে। রানি ও রাজকন্যা দু'জনেই যথারীতি তৈরি হচ্ছেন নিজেদের প্রতিযোগিতার জন্য। জৈতুন রাজ্যের রাজা বা রাজমাতা কেউ-ই নেই উপস্থিত। তাদের ভেতরে উৎকণ্ঠা বেশি পরিলক্ষিত ছিলো। রানি কামিনীকাঞ্চন সম্পর্কে ধারণা তাদের ছিলোই কিন্তু তাদের রাজকন্যা এহেন হটকারিতায় কেন নামলো সেটিই তারা বুঝে উঠতে পারছেন না।
রাজকন্যা মৃন্ময়ীর কক্ষটিতে মাত্রাতিরিক্ত শীতল। সে পায়চারি করছে কক্ষজুড়ে। কখনো এদিক পানে আসছে তো কখনো ওদিকে। ভেতর ভেতরে কী নিয়ে যে বেশ ভাবনায় মগ্ন তা বোঝা যাচ্ছে ঢের। তার কক্ষে ইনান ণেকিতান দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাজকন্যার এই চঞ্চল পদচারণ সে দেখছে শীতল চোখে। কোথাও যেন তার এসব স্বাভাবিক লাগছে না। অসন্তুষ্ট হয়েছেও বেশ।
“তোমার এহেন সিদ্ধান্ত উচিত হয়নি বলেই আমার বোধ হচ্ছে, রাজকন্যা মৃন্ময়ী।” ইনান ণেকিতানের বলিষ্ঠ কণ্ঠে পদাচরণ থামল না মৃন্ময়ীর। বরং সে তার গতি অব্যাহত রেখে শুধাল,
“কেন? তোমারও বোধ হচ্ছে আমি হেরে যাব এবং রাজ্যহারা হবো?”
“কী মনে হচ্ছে, কী না, সেসব আলোচনা এখানে মুখ্য নয়। কিন্তু রানি এখানে তোমার আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন। তাকে শুধু শুধু এই প্রতিযোগিতায় টেনে নিয়ে আসার তোমার উচিত হয়নি বোধহয়। রানি ক্যামিলাস রাজ্যে গিয়ে ঘোড়া দৌড়ে প্রসিদ্ধ রাজা হ্যাভেনকেও কিন্তু হারাতে ভুল করেননি। সেখানে তুমি পুনরায় একই ঘটনা ঘটালে!”
“সেদিন রাজা হ্যাভেনের নিজের প্রতি যতটুকু আত্মবিশ্বাস ছিলো আজ আমারও ততটুকুই রয়েছে। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকা খারাপ নয়। নিজেকে প্রমাণ করতে চাওয়াও খারাপ নয়, তাই না?”
মৃন্ময়ী এবার থামলো। সরাসরি দাঁড়াল ণেকিতানের বরাবর। ণেকিতান রাজকন্যার এমন আত্মবিশ্বাসে আর মন্তব্য রাখার প্রয়াস চালালো না। কারণ রাজকন্যা নিজেই প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে পুরোপুরি। আর থামানো সম্ভবও নয়। কিন্তু সে রাজকন্যার শর্ত নিয়ে কিছুটা নারাজ। এমন শর্ত কেউ কাউকে দেয়?
“তুমি প্রতিযোগিতা করো সেখানে আমার বিশেষ বক্তব্য নেই। কিন্তু তুমি রানিকে এ কেমন শর্ত দিলে? তার সংসার নিতে চাওয়ার অর্থ কী তা সকলের কাছেই স্পষ্ট। তার সংসার চাওয়ার কী এমন প্রয়োজন ছিলো তোমার? তোমার জন্য একাধিক রাজারা, রাজপুত্ররা তো এসেছিলেন তাহলে হেমলকই কেন?”
ইনান ণেকিতানের কণ্ঠে এবার বিরক্তি স্পষ্ট। রাজকন্যা এমন শর্ত আরোপ করে যে মহা ভুল করেছে। এমন শর্ত কোনো স্বাভাবিক মস্তিষ্কের নারী অরূপ করতে পারে না। তাছাড়া ওটা রানি কামিনীকাঞ্চনের সংসার। যে নারীটি কাউকে নিজের জীবনে গ্রহণ করেনি ঐ একজন পুরুষকে ব্যতীত সেই সাধনার সংসারে মৃন্ময়ীর এমন লোভ নিন্দনীয় বড়ো।
“তোমার মতে তো রানি জয়ী হবেনই যেহেতু তিনি সর্বসময়ের বিজয়ী। তাহলে আমি সংসার চাইলাম না সাম্রাজ্য তাতে কী আসে যায়, ভ্রাতাশ্রী?”
মৃন্ময়ীর হেলা করা বাক্যে রুষ্ট ণেকিতান বেরিয়ে গেলো। মেয়েটা চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্সকে পছন্দ করতো তা সে জানে কিন্তু পছন্দ করলেই কি সব পেতেই হবে? এই যে সে বহু বর্ষ যাবত রানির জন্য মরিয়া হয়ে ছিলো সে কি এভাবে রানিকে পেতে চেয়েছে? চায়নি। বরং রানির জন্য সব ত্যাগ করেছে। এমনকি রানিকে একটু দেখতে চাওয়ার তীব্র আকাঙ্খাও! অথচ মৃন্ময়ী!
ণেকিতান বেরিয়ে যেতেই মৃন্ময়ী দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ তাকালো বাহিরের বিস্তর গগণপটে। মাঝে মাঝে ললাটের লিখন মেনে নেওয়া এমনই অসন্তুষ্টজনক হয়। কিন্তু মেনে নিতে হবে যেহেতু তাই আর এত হিসেবনিকেশ করে লাভ নেই।
—————
রানির কক্ষ তীব্র শীতল। বাহিরে যতটা গুঞ্জন তারচে দ্বিগুণ শীতল তার আশপাশটা। হেমলক হতবিহ্বলের ন্যায় বসে আছে পালঙ্কে। তার কিছুটা দূরে দাঁড়ানো হ্যাব্রো। রানি আরামকেদারায় বসে বহুক্ষণ যাবতই ভাবনায় নিমজ্জিত। তিনি প্রতিযোগিতা নিয়ে ভাবছেন না পরিকল্পনা নিয়ে তা বোঝা দায়। বাহির থেকে দেখে কেউই বুঝতে পারবে না হয়ত।
বহুক্ষণ পর হেমলক মুখ খুলল। বহু ভাবনা, যুক্তিতর্ক নিজের ভেতর খণ্ডন করার পরই সে বাধ্য হলো কথা বলতে।
“তুমি এই প্রতিযোগিতায় আমায় বাজি রাখতে একটিবার ভাবলে না, কামিনী? একটিবার?”
হেমলক কখনো রানির নাম উচ্চারণ করেনি এর আগে। কখনো তার কণ্ঠ থেকে রানির শ্রুতিমধুর নামটি বের হয়নি। আজ উচ্চারণ করেছে সে। আজ অদৃষ্টের খেলায় তার কণ্ঠে নামটি এসেছে।
রানির শরীরের সঙ্গে যেন তীব্র ভাবে ধাক্কা খেলো সেই নামটি। তিনি তৎক্ষণাৎ চোখ মেলে ফেললেন। বিস্মিত হলেও নিজেকে সামলে নিলেন দুদণ্ড অপেক্ষা না করেই। যথাসম্ভব তার কম্পনরত চিত্তকে শান্ত করলেন। নাম শোনার পর তার কণ্ঠে যেই আবেগ এসে মিশেছিলো সেটি গিলে নিয়ে সহজ ভঙ্গিতে বললেন,
“ভাবনা ছাড়া আমি কিছুই করি না।”
রানির শান্ত স্বরের উত্তরে এবার হেমলক হেসেই ফেলল। তবে সেটি আনন্দের নয়। হতাশার। তীব্র দুঃখের। কিছুটা তাচ্ছিল্যেরও হয়ত, “এই তোমার ভাবনা? যে ভাবনায় নিজের সংসারকেও একটি খেলায় বাজি রাখার মতো মনে হয় এমন ভাবনার প্রশংসা করব না নিন্দা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।”
“আপনার কোনটি করলে চিত্ত শান্ত হবে? সেটিই করুন।”
“তুমি আমায় নিয়ে শর্ততে রাজি হওয়ার আগে অন্তত আমায় জিজ্ঞেসতো করতে পারতে? স্বামী হিসেবে না হোক মানুষ হিসেবে এতটুকু মতামত প্রদানের অধিকার আমার আছে। তাই না?”
“সংসারটাতো আমার তাই না? তাহলে মতামত কেন? তাছাড়া জয় তো মৃন্ময়ীর না-ও হতে পারে!”
“আর হয়ে গেলে! সেটা নিয়ে ভাবছো না?”
“না, ভাবছি না। কারণ আমি জানি আমি কী করছি ও করব। আমার প্রতি আমার তীব্র ভরসা রয়েছে।”
এই বাক্যে রানির কণ্ঠ বেশ কঠিন কঠিনই শোনালো। হেমলক যে আর কিছু বলবে তার সময় দিলেন না রানি। অনায়াসেই কেদারা ছেড়ে উঠে বেরিয়ে গেলেন। কক্ষ জুড়ে রইল কেবল হেমলক ও হ্যাব্রো। যেখানের হ্যাব্রোর ভূমিকা কেবলই বোবা পঙ্খীর মতোই!
হেমলক তীব্র হতাশ হলো রানির প্রস্থানে। হ্যাব্রোর দিকে এক পলক তাকালো। হ্যাব্রোর চোখও অসহায় লাগছে। তারও বা কী করার আছে? এত সীমিত তার অধিকার যে রানিকে সাথ দেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারবে না। এমনকি রানির নিজের ডেকে না একাকীত্বকে দেখা ছাড়া তার করারও কিছু নেই।
—————
খেলা যথারীতি তীব্র উন্মাদনা নিয়েই আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। চারপাশ থেকে ঘিরে রাখা ভিড়ে কেবল প্রবল হয়ে ফুটে উঠেছে তীব্র উন্মাদনা। এই প্রতিযোগিতার বিষয়টি প্রাসাদ অব্দি আর নেই, ছড়িয়ে গিয়েছে কাছেপিঠের প্রজাদের অব্দি।
লোমহর্ষক উন্মাদনা, আতঙ্কিত নয়ন নিয়ে সকলে প্রতিযোগিতা দেখছে। তীব্র ধ্যান সেখানে। খেলায় মৃন্ময়ীকে যতটা চঞ্চল দেখাচ্ছে তারচেয়ে অধিক শান্ত দেখাচ্ছে রানিকে। এর আগে কখনো তিনি এতটা শান্ত হয়ে জনসমাগমে থাকেননি। এত শীতল নড়চড় তার! চোখ দু'টো এক ধ্যানেই খেলায় ডুবন্ত। যেন চোখের এক পলক ভুলে সমস্ত সমাপ্ত হয়ে যেতে পারে। দু'জনে প্রায় সমান সমান ভাবেই অংশগ্রহণ করে এগুচ্ছে। কিন্তু মৃন্ময়ীর ঘুঁটির চেয়েও রানির ঘুঁটি চাল বেশি অভিজ্ঞ ও সুচারু। চাল দেখলেই অকপটে বোঝা যাচ্ছে ঠিক কতটুকু ভেবে তিনি প্রতিটা খেলার ঘর হতে ঘুঁটি নাড়াচ্ছেন।
সময় অতিবাহিত হচ্ছে নিজ গতিতে। রুদ্ধশ্বাস একেকজনের কণ্ঠ অব্দি। শ্বাস ফেলার ফুরসত নেই। মনে হচ্ছে শ্বাস ফেললেই কিছু একটা অঘটন ঘটে যাবে।
জৈতুন রাজ্যের রাজার হাল প্রায় বেদিশা। কন্যাটি যে তার এ কেমন ভুল করল! খেলা দেখলে স্পষ্টই এখন বোঝা যাচ্ছে বাজিমাতটা কে করবে। আর কয়েক চালেই তারা রাজ্য হারিয়ে বসবেন!
নিজের স্বামীকে এতটা হাঁসফাঁস করতে দেখে রাজমাতা বোঝানোর প্রয়াস করলেন। সকলের অগোচরে বললেন,
“আপনি এমন উতলা হচ্ছেন কেন, মহারাজ? ধৈর্য ধরুন।”
রাজা ধৈর্যতো ধরলেনই না বরং রাগলেন খানিক, “ধৈর্য ধরব, রানি? আমার রাজ্য হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম আর আমি ধৈর্য ধরব? এহেন কথা তুমি নির্বোধের মতো উচ্চারণ করতে পারলেও আমি পারছি না।”
“মরিয়া হচ্ছেন কেন এত, মহারাজ? আমাদের কন্যাও তো জয়ী হতে পারে! তাছাড়া হেরে গেলে না-হয় আমরা রানিকে মিনতি করব রাজ্যটি যেন আমাদের দিয়ে যান? তিনি নিশ্চয় এতটাও অমানবিক নয়!”
“আর একটা গুটি এদিক সেদিক হলেই রানি জিতে যাচ্ছেন, এখনও আমায় আশা রাখতে বলছো, রানি? এখনও? আর প্রশ্নটি কি রানুর অমানবিকতা আর মানবিকতার? তার কাছ থেকে অনুনয় করে রাজ্য রাখলেও আমাদের সেই সম্মান আর থাকবে? করুণার রাজ্যে তুমি গর্ব করে বাঁচতে পারবে?”
রাজার দিকটা স্পষ্ট হলো। রাজমাতাও যে এমন ভাবছেন না তা নয়। কিন্তু ভাবলেও বা কী? যেই খেলা শুরু হয়েই গিয়েছে, যা আর হাতে নেই তা থামিয়ে কোনো লাভ আছে? তিনি নিজেও তো মৃন্ময়ীকে বোঝালেন কিন্তু মেয়েটা কথা শুনলে তো! অন্য এক রানির সপত্নী হওয়ায় এত ঝোঁক মেয়েটার! তবে কি মেয়েটা রাতের পর রাত জাগ্রত থেকেছিলো এই চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্সের জন্যই? একটিবার নামটিও উচ্চারণ করেনি মেয়েটা। এত চতুর!
যথারীতি চাপা গুঞ্জন প্রায় শুরু হয়ে গিয়েছে। এটি সুস্পষ্ট ভাবেই দৃশ্যমান যে খেলায় জয় হবে কার। সকলের মুখে মুখে রানি কামিনীর নাম উচ্চারিত হচ্ছে। সে মহা প্রলয়ের দারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে খুব ধীরস্থিরে রানি এক পলক তাকালেন মৃন্ময়ী বিভ্রান্ত দৃষ্টির দিকে। মৃদু হাসলেন। এতটাই সুক্ষ্ম যে কারো দৃষ্টিতেও হয়ত পড়ল না সেই হাসি। সকলের উৎকণ্ঠা সমাপ্ত করে রানি শেষ ঘুঁটিটি নাড়লেন। হ্যাব্রোর দৃষ্টি থমকে গেলো। বিস্মিত হলো, বিস্ময় নিয়ে তাকাল রানির হাতের ক্ষুদ্রতম নড়াচড়ার দিকে। সকলে শ্বাস চেপে রাখল যেন বুকে এক মুহূর্তের জন্য।
ঠিক এরপর সশব্দে, তীব্র চিৎকারে ফেটে পড়ল রাজপ্রাসাদ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………