নিভৃতে বাঁধিয়ো প্রিয়া - পর্ব ২৬ - লাবিবা ওয়াহিদ - ধারাবাহিক গল্প

          সময় কিংবা ভাগ্যের স্রোত কখন কোন দিকে ঘুরে যায় তা টের পাওয়া মুশকিল। আমরা যা ভাবি না, পরিকল্পনা করি না তাই ঘটে যায় আমাদের জীবনে। যেমনটা উপরওয়ালা লিখেছেন, চেয়েছেন তেমনই। ওনার চাওয়ার উপর মানুষের হাত থাকে না। 

আট সপ্তাহ। প্রেগন্যান্সির আট সপ্তাহ হয়ে গিয়েছে, এমনটাই জানাল ডাক্তাররা। ইসমাতের জ্বরের তাপমাত্রা বেশি, হুঁশ নেই। গায়ের কম্পন এখনো আছে। তাকে বিশেষ ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আরেকটু ঠান্ডায় থাকলে তার হাইপোথার্মিয়া হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, যা ভ্রুণের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সৌভাগ্যক্রমে ইসমাত অত বেশি ঠান্ডায় দীর্ঘক্ষণ থাকেনি, এবং হাসপাতালেও তাকে সঠিক সময়ে আনা হয়েছে। 

ডাক্তাররা ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাহিদকে আপডেট দিচ্ছে। ইসমাত এখন বিপদমুক্ত, ঘুমোচ্ছে। সাহিদ তখনো শক থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। এখনো হাতে তার রিপোর্টটা। তাদের দুজনের কারোই বাচ্চার পরিকল্পনা ছিল না, তবে আকাঙ্খা ছিল না এমনও না। ইসমাত জীবনভিত্তিক কোনো প্রকার পরিকল্পনা করেনি কখনো। সবটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে চলেছে সে। যখন শাশুড়ি তাকে বাচ্চার জন্য চাপ দিত, সে উত্তর দিত না। কারণ সে সবার আগে সম্পর্কে একটা বোঝাপড়া চাইত, একটা সুন্দর ঘনিষ্ঠতা চাইত। তার চাইতেও বড় কথা, এক সুস্থ পরিবার.. যেখানে ওরা বাবা-মা হলে তাদের বাচ্চাকে সবটা দেওয়ার সামর্থ্য রাখবে। টাকা-পয়সার থেকেও পারিবারিক শিক্ষা, সুখ-শান্তি বেশি প্রয়োজন.. যেটা নিয়ে সাহিদের প্রতি সন্দেহ ছিল প্রবল। যখন সাহিদ আর তার সম্পর্কটা মাসের পর মাসে গভীরতা পায়, আন্ডাস্ট্যান্ডিং বাড়ে তখনই এই সুসংবাদটা এলো।

সাহিদের অনুভূতি কেমন হচ্ছে সেটা সে কখনো মুখে প্রকাশ করতে পারবে কিনা জানে না। তার মা তাকেও বাচ্চার জন্য কানপড়া কম দেয়নি। কিন্তু ইসমাত কী চায় তা ভেবে সে কখনো বলেনি। তার জন্য বাবা হওয়াটা দ্রুত হলেও ইসমাতের জন্য সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল। বাচ্চার ব্যাপার নিয়ে যে ওরা এক স্থানে বসে নিরবিলি আলোচনা করবে সেই সুযোগও আসেনি। এজন্য সাহিদ চায়নি কোনোকিছু ইসমাতের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিবে। মা হওয়া মুখের বিষয় না। মনোবল, মানসিক প্রস্তুতি, ইচ্ছাশক্তিও থাকা দরকার, বিশেষ করে একজন নতুন মায়ের। এজন্য সাহিদ তাকে সময় দিয়েছে, ততদিন অবধি চুটিয়ে প্রেম চলেছে ওদের মধ্যে। প্রেমেই ব্যস্ত ছিল ওরা এই পুরো কয়েকটা মাস। কিন্তু, এত ভাবনা.. এতকিছু সত্ত্বেও আজ নতুন এক খবরের সাথে দাঁড়াতে হলো।

সাহিদ প্রচণ্ড সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগল। একা একা এই ভার সামলাতে না পেরে সে তৎক্ষণাৎ মাকে কল লাগাল। বাংলাদেশ সময় তখন রাত এগারোটা। শাহেলা কল রিসিভ করতেই সাহিদ সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করল,
--"বাবা হওয়ার খবরে কি আমার অত্যন্ত খুশি হওয়া উচিত মম?"

শাহেলা আঁতকে উঠলেন। কিছু মুহূর্ত সময় লাগল মস্তিষ্ক সচল হতে। পরপর চোখ-মুখ চকচক করে উঠল ওনার। মাহফুজ সাহেব পাশেই বই পড়ছিলেন, স্ত্রীর হঠাৎ হাসির শব্দ শুনে পাশে তাকালেন। শাহেলা অত্যন্ত উচ্ছ্বাস এবং খুশির সাথে বলল,
--"আমি দাদী হবো?"

সাহিদ এতক্ষণে খুশি অনুভব করতে পারল। সাথে এও অনুভব করল ওর গলা কাঁপছে। বুকের বা পাশটায় হাত চেপে বলল,
--"হ্যাঁ মম। আমি ড্যাড হবো! আই কান্ট বিলিভ.. হাউ মম! আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।"

মাহফুজ সাহেব নড়েচড়ে বসলেন স্ত্রীর প্রফুল্ল দেখে। ওনার মুখেও হাসি ফুটেছে। আল্লাহ বুঝি সত্যিই মুখ ফিরে তাকালেন? শাহেলা ততক্ষণেফোন স্পিকার অন করে দিয়েছেন, মাহফুজ সাহেব স্পষ্ট শুনলেন ছেলের গলার কম্পন, চাপা খুশি। ওনার মনে পড়ে গেল ছাব্বিশ বছর আগের কথা। যখন সাহিদ আসার খবর পেলেন ওনারও একই ভাবে গলা ভেঙে এসেছিল, এ নিয়ে ওনার মরহুম মা কি যে হাসাহাসি করেছিলেন। আজ বুঝি সেই একই খুশি ওনার ছেলে অনুভব করছে। মাহফুজ সাহেব প্রশ্ন করলেন,
--"ইসমাত কোথায়?"

--"আমরা হাসপাতালে আছি।"

শাহেলা আঁতকে উঠলেন,
--"কেন? ও ঠিক আছে তো?"
--"হ্যাঁ মম, ফিভার হয়েছিল। হাসপাতালে আনার পরই এই খবর পাই। শিজ নাও স্লিপিং।"

শাহেলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মাহফুজ সাহেব হাসপাতালের নাম জেনে তৎক্ষণাৎ কল লাগালেন শাবাবকে। ছেলেটা একা একা কি করছে, ভরসা হচ্ছে না ওনার। 

শাহেলা আরও অনেক কথা বলতে লাগল সাহিদের সাথে। সাহিদকে শোনাল কত আল্লাহকে ডাকার পর তিনি সাহিদকে পেটে ধরেছিলেন, ওনাদের সেই দুঃখে ভরা সময়গুলো বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। এসবে কখনো আগ্রহ না পাওয়া সাহিদ আজ সব মনোযোগ দিয়ে শুনছে। একটা সন্তান জীবনে কতটা দামী শাহেলা সাহিদকে খুব করে অনুভব করালেন। আল্লাহ কীভাবে তাদের ওই দুঃখের সময় থেকে টেনে তুলেছেন তাও বর্ণনা করলেন। এমনকি মাহফুজ সাহেব তখন কীভাবে শাহেলার যত্ন নিয়েছিলেন তাও বিস্তারিত জানান সাহিদকে। ওটাতেই সাহিদ বেশি আগ্রহ পেল। মাহফুজ সাহেব পাশ থেকে বললেন,
--"এই মাসগুলো খুব সেন্সিটিভ বউমার জন্য। খবরদার যদি কোনো স্ট্রেস দিয়েছ ওকে। নইলে আমি ফ্রান্স এসে তোমাকে লোকসম্মুখে জুতো খুলে মা র ব।"

--"ড্যাড! আমি নিউলি পাপা হচ্ছি, এটা বুঝি তোমায় জেলাস করাচ্ছে? যে এই গুড নিউজেও আমাকে জুতো খুলে মা রার হুমকি দিচ্ছ? আমি আজকে নিজের সাথে প্রমিস করলাম। আমার বেবিকে আমি জীবনেও তোমার মতো জুতা খুলে মা রার হুমকি দিব না।"

সাহিদের কথাতে ওর বাবা-মা দুজনেই হেসে ফেললেন। সাহিদ তাদের হাসিকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে প্রচন্ড ইগো নিয়ে বলল,
--"আই'ল বি আ বেস্ট ড্যাড!"

--"আমিও এমনই বলেছিলাম। এর ফলস্বরূপ তোমায় কখনো ফুলের টোকাও দেইনি। এরপর কি হলে দেখলে তো? উগ্র তো তুমি কম হওনি! ছেলে-মেয়েদের শাসন অতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত যেখান থেকে সন্তান উগ্র বা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হওয়ার বদলে ভালো-মন্দ শিক্ষায় সে মানুষের মতো মানুষ হবে। তুমি যেদিন তোমার সন্তানকে ঠিক-ভুল শেখাতে পারবে, সেদিন তুমি হবে আ সাকসেসফুল ড্যাড!"

—————

ইসমাত এখনো ঘুমাচ্ছে। ঘুমন্ত মুখটায় গালে হাত দিয়ে একমনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সাহিদ অনেক কিছুই ভাবল। এখানে এসেছে প্রায় পাঁচ মাস হয়ে গিয়েছে। তাদের বিয়ের দুই বছর হতেও কয়েক মাস বাকি। সাহিদ চিন্তা করল কতক্ষণ, ইসমাতকে তার ভালো লাগার শুরুটা কবে হয়েছিল? তার জন্মদিনে নাকি জন্মদিনের আগে? সে নিজের কাছে মিথ্যে বলবে না, তার ইগো তাকে বহুদিন অন্ধ করে রেখেছিল। এই অন্ধত্ব ভেঙেছিল মূলত এক্সিডেন্টের মাধ্যমে। এরপরের সময়টা খুবই ধীর ছিল, ইসমাতের প্রতিটা যত্ন, প্রতিটা আক্ষেপ ভরা কথা.. তাকে শাসন থেকে শুরু করে আপাদমস্তক মেয়েটাকেই সে নিজের বিশ্বাস, ভরসা নির্ভরতা, সুখ দিয়ে বসল। অবাধ্য মনটাও। সে এখনো ছোট ছোট বিষয়ে ইসমাতকে খোঁজে। যেমনটা তাদের বিয়ের এক্সিডেন্টের আগের সময়টা ছিল। ইসমাতকে সে সহ্য করতে পারত না, কিন্তু সেই অসহ্যের পাথরে কবে ফুল ফোঁটা শুরু হলো কবে তা কি আর সময় দিয়ে বলা সম্ভব? এই ফুল ফোঁটার শুরুটা ইদানীং হলে নিতান্তই মিথ্যে বলা হবে। কারো কারো প্রেমে পড়ার জন্য এক মুহূর্তের যথেষ্ট হয়, আবার কারো সপ্তাহ, মাস কিংবা বছর। তার এই শুরুটা হয়তোবা তার জন্মদিন থেকেই, যা সাহিদ কখনো উপলব্ধি করতে পারেনি। অথবা মানতে পারেনি তার মতো ইগোইস্টিক মানুষও প্রেমের মতো বোকা ফাঁদে ফেঁসে যাবে। তবে সে ইসমাতের ব্যাপারে জানে না। ইসমাতও যে তার মতো দূর্বলতা লুকাতে ভীষণ পটু। আগে যেই বিষণ্ণতা দেখত ইসমাতের মুখে, এখন সেই একই মুখে সে সুখ উপলব্ধি করে।

বাবা হওয়াটা তার জন্য এখন চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে আনন্দগুলো অনুভব করতে পারছে ঠিকই, কিন্তু একে ভাষায় কী করে প্রকাশ করতে হয় তা জানা নেই। সে ইসমাতের দিকে তাকাতে তাকাতেই আপনমনে নিজের ফোন দেখল। রিলস অপশনে কাকতালীয় ভাবেই বেবির ভিডিও এলো। সে দেখে গেল। একটা রিলস থেকে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অনেকগুলো রিলস সে অচিরেই দেখে গেল। বাচ্চার ছোটো মুখ, ছোট ছোট হাত পা, তার আঙুল, বাবুর মুখের হাসি, প্রথম হাঁটা, মৃদু গোঙানোর মিষ্টি শব্দ কিছুই যেন বাদ রইল না। বাবুর নেশায় সে বুদ হয়ে রইলো যেন। বুকের কোনো ভারী, শক্ত কিছু বুঝি নেমে গেল। তার বিশ্বাস হচ্ছে না, এরকম ছোটো বাবুই কি তাদের ঘরে আসতে চলেছে? এই সুন্দর সংবাদ এত সুন্দর পজিটিভিটি ছড়াবে তার মন-মস্তিষ্কে কে-ই বা জানত?

সকালের নরম আলো ইসমাতের চোখের ওপর পড়তেই ওর ঘুমে ব্যঘাত ঘটল। মুহূর্তেই আলোটা চোখের ওপর থেকে সরে গেল, মিইয়ে গেল ওর ভ্রুঁর ভাজ। পরপর ধীরে-সুস্থে চোখ খুলতেই দেখল সাহিদ তাকে আলো থেকে বাঁচাতে হাত এগিয়ে রেখেছে। মুহূর্তেই চোখাচোখি হলো দুজনের। সাহিদ ইসমাতকে তাকাতে দেখে স্বস্তি পেল। এগিয়ে গিয়ে ইসমাতের কপালে গভীর চুমু দিল। ফিসফিস করে বলল, "এভ্রিথিং অলরাইট?"

ইসমাত চোখ বোজা অবস্থাতেই মাথা নাড়ল। একটু দূর্বল লাগছে, মাথাও ধরে আছে। এছাড়া সব ঠিক আছে। আবারও ওদের চোখাচোখি হলো। ইসমাত ওই অবস্থাতেই পরখ করল সাহিদের মুখ। চোখের নীচে কালি পড়লেও সেভাবে ক্লান্ত লাগছে না। তবে কোনো কারণে খুশি ঠিকই বোঝা যাচ্ছে। মৃদু গলায় বলল,
--"রাতে ঘুমাওনি?"

সাহিদ ইসমাত চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলল, 
--"ঘুমের চাইতেও তুমি বেশি জরুরি, মাই লাভ।"

--"নিজের যত্ন না নিলে আমার যত্ন নিবে কেমন করে?"

সাহিদ বাঁকা হাসল।
--"হুউ? ওটা আমার হবে না 'আমাদের' হবে।"

ইসমাতকে চিন্তিত দেখাল। সে কথাটা ঠিক ধরতে পারেনি। সাহিদ তা বুঝতে পেরে ইসমাতের দিকে ঝুঁকে এলো।
--"উই হ্যাভ আ গুড নিউজ, ইসমি।"

ইসমাত ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই সাহিদ মিটিমিটি হেসে বলল,
--"বাচ্চাদের জিনিসপত্র কেনা শুরু করতে হবে। বাবা হিসেবে কোনো কিপটেমি করলে চলবে না।"

বলেই ইসমাতের পেটে হাত রাখল। ইসমাত নির্বাক, বিমূঢ়। তার বুঝি বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো। সে প্রেগন্যান্ট? পরিকল্পনাহীন বিষয়টা তার জন্য অকল্পনীয় হয়ে ধরা দিল? ইসমাতের ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। সাহিদ সেই ঠোঁটে আলতো করে চুমু দিল।
--"আ'ম নট কিডিং। ইটস ট্রু।"

বলেই পরপর আরও দু'বার ঠোঁটে চুমু খেল সে। মুহূর্তেই লক্ষ্য করল ইসমাতের নির্বাক চোখ ছলছল করছে। ঠান্ডা হাতটা সাহিদের হাতের ওপরই রাখল সে, পেটে। এজন্যই বুঝি দুই সপ্তাহ যাবৎ তার এত অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিচ্ছিল? সে ভাবত কাজের প্রেশারেই বুঝি দূর্বল লাগে, ঘুম পায়, মাথা ব্যথা করে। অনেক সময় খাবার দাবারেও বেশ অশান্তি পোহাতে হতো। অথচ... এসবের পেছনে এই কারণ থাকতে পারে সে সত্যিই বুঝতে পারেনি। তার অন্যতম কারণ কাজের প্রেশারটা। আউটলেট উদ্ভোদন হবে জানুয়ারির পাঁচ তারিখ, আজ এক তারিখ চলছে। 

ইসমাত ছলছল চোখ নিয়ে বলল,
--"আল্লাহর পরিকল্পনা বুঝি এত সুন্দর হয়, সাহিদ? এটাকেই কি মায়ের অনুভূতি বলে? প্রত্যেক মা-ই কি শুরুতে এরকম সুখ সুখ অনুভূতির সম্মুখীন হয়? আমি আগে জানলে এত দেরী যে করতাম না।"

সাহিদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, ইসমাত তাহলে এই বিষয়ে চাপ নিচ্ছে না। আসলেই জীবন প্ল্যানমাফিক চলে না। জীবন আমাদের এমন এমন সংবাদ দিয়ে চমক দেয়, সেটা অনেক সময় মিশ্র অনুভূতির তৈরি করে। সাহিদ হেসে ইসমাতের পেটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
--"কত ফানি হবে তাই না, যখন আমাদের বাচ্চা শুনবে তাদের বাবা মায়ের থেকেও ছোটো।"

ইসমাত চোখে জল নিয়েও হাসল। সাহিদ কেবিনের একপাশে তাকাতেই হঠাৎ চমকে গেল। সে বুঝি ঝাপসা করে সাব্বিরকে দেখতে পেয়েছে। সাব্বিরের মুখে প্রশান্তির হাসি। কল্পনাটা বুঝি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সাহিদ ইসমাতকে বুকে আগলে নেয়। সেই স্থানে তাকিয়ে আপনমনে ভাবল,
--"সাব্বির, দ্যাখ! আমি বাবা হবো। তুই আমার এই সংসারের স্বপ্নটাই দেখতি তাই না? দেখ, তোর ইগোইস্টিক বন্ধুটা আজ সবচেয়ে সুখের মুহূর্তে আছে। তোর দোয়া, চাওয়া বিফলে যায়নি। তুই যেখানেই থাক অনেএক ভালো থাক, আর দেখে যা তোর বন্ধু কত খুশি তার পরিবার নিয়ে। ঠিক যেমনটা তুই চাইতি।"

সময় কাটতে লাগল। সাহিদ ইসমাতকে চেকআপের উপর রাখছে। সাথে এক্সট্রা কেয়ার, নেহার আসা-যাওয়া তো আছেই। হাসপাতালেই নেহা সুসংবাদ পেয়ে ফলমূল এনেছিল। যেহেতু সে একজন গাইনি ডাক্তার, সেক্ষেত্রে সে ইসমাতের ঘরোয়া ব্যাপারে অনেক নির্দেশনা দিতে পারছে। একটা প্রোপার ডায়েট রুটিনও সে করে দিয়েছে। ইসমাতকে সাহিদ একদমই অফিস করত্র দেয় না। যদি ইসমাতের একান্তই প্রয়োজন হয়, সে ঘরে বসেই কাজ করে। 

ওদের আউটলেট উদ্ভোদন হয়েছে আজ তিন মাস। বাচ্চার খবর আসার পর থেকে সাহিদের অফিসের প্রতি গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কাঁধে দায়িত্ব এসেছে, এই দায়িত্ব হেলাফেলা করার মতো ছেলে আজকের এই সাহিদ নয়। নেহা সারাদিনই ইসমাতের সাথে থাকে তার বাচ্চাদের নিয়ে। মাহফুজ সাহেব একা এসে ইসমাতকে দোয়া দিয়ে গেছেন। উনি যে কত খুশি ওনার বংশধর আসতে চলেছে শুনে। ইফরাও আবারও ভিসার কাজ শুরু করেছে। তার ইচ্ছে সে ইসমাতের শেষ সময়গুলোতে পাশে থাকবে। 

সাহিদ তো অফিস থেকে এসে সবার প্রথমে ইসমাতকে খুঁজবে। এরপর ওর পেট ধরে বসে থাকবে। ইসমাতকে শুনিয়ে শুনিয়ে বাবুকে গল্প শোনাবে, এতে ইসমাত খুব রাগ করে। ওর ইদানীং এত মুড সুইং হয়। সাহিদের তো মনে হয় ইসমাত কোনো আঠারো বছরের নারী। একটা শিশুসুলভ ভাব এসেছে তার মধ্যে। এটা যে হরমোনাল ব্যাপার তাও সে ভালো করেই জানে। অফিসে বসে অবসর পেলেই সে রোজ প্রেগন্যান্সি নিয়ে ঘাটাঘাটি করে, আবার নেহা তো আছেই তাকে জানানোর জন্য। 

এইতো, আজ ইসমাত রাগ করেছে। সাহিদ সেই রাগ ভাঙাতে খুব ভাব নিয়ে রান্নাঘরে গেছে। আজ সে রান্না করে ফাটিয়ে ফেলবে। দেখিয়ে দিবে ইসমাতকে, সে অকর্মা নয়। কিন্তু সে গুড়ে বালি। ধামধুম শব্দ আসছে রান্নাঘর থেকে। ইসমাত ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে ছয় মাস ছুঁইছুঁই বড়ো পেটটা নিয়ে গেল রান্নাঘরের দরজায়। কিছু সময়ের ব্যবধানে এই রান্নাঘরকে গোরুর ঘর বলতে দ্বিধা হচ্ছে না। সাহিদ ময়দাতে মাখামাখি। চুপিচুপি মোবাইলে খাবার অর্ডার দিচ্ছে, তাকে দিয়ে যে রান্না হবে না তা সে মেনে নিয়েছে। 

মেয়ে মানুষ আর যাইহোক, নিজের রান্নাঘরের অবনতি দেখতে পারে না। ইসমাতেও ক্ষেত্রেও তাই হলো। সে চেঁচাল সাহিদের ওপর। সাহিদ ফাঁকা প্রমিস ছুঁড়েও লাভের লাভ হলো না। ইসমাত নিজের কাজ নিজেই করল সব! সাহিদ ইসমাতের পিছে পিছে ঘুরল সাহায্যের জন্য, কিন্তু তার সেই চেষ্টাও ব্যর্থ গেছে।

ডাক্তাররা ইসমাতকে সবসময় বলেছে সে যেন খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া স্থির হয়ে না বসে। যত নড়াচড়া করা যায়, এতে করে বাচ্চার জন্য ভালো। ইসমাত তাই করে। সে আর তার বাচ্চা এখনো সুস্থ আছে, কিন্তু প্রথম প্রেগন্যান্সি হওয়ার কারণে ইসমাতের মধ্যে বেশ ভয় কাজ করে। ইসমাত যখনই ভেবেছিল সাহিদকে আরও কটা কথা শোনাবে তখনই সে পিছে ফিরল। পিছে ফিরে যখন তার ময়দামাখা মুখ দেখল ইসমাতের রাগ গলে গেল। সে মুহূর্তেই হো হো করে হাসতে শুরু করে দেয়। সাহিদ বুঝতে পারে না কেন হাসছে। ইসমাত তাকে টেনে আয়নার সামনে নিয়ে যায়। সাহিদ নিজের এই রূপ দেখে অবাক! ময়দা মেখে কি অবস্থা করেছে নিজের। ইসমাতের হাসি তখনো থামছে না। সাহিদ রেগে বলল,
--"দিস ইজ নট ফানি ইসমি!"

ইসমাত হাসতে হাসতেই এগিয়ে গেল সাহিদের কাছে। আরও টিজ করল ছেলেটাকে। পরপর নিজের হাতেই সাহিদের মুখ পরিষ্কার করে দিতে দিতে বলল,
--"বোকা ছেলে! বাবুর জন্য এত এফোর্ট দেওয়ার দরকার নেই।"

সাহিদ মিইয়ে গেল,
--"কে বলেছে বাবুর জন্য করছি? এসব তোমার জন্য।"
--"বাবুর জন্য নয়?"

--"বউ খুশ তো দুনিয়া খুশ— এই প্রবাদে আমি বিশ্বাস করি।"

--"কে শিখাল এই প্রবাদ?"

--"রুশান।"

ইসমাত হো হো করে হাসল। রাতে ইসমাতের খুব অস্বস্তি হলো, ঘুমাতে পারছে না সে। নেহা জানিয়েছে যত সময় ঘনিয়ে আসবে, শুতে গেলে ঠিক ততই নড়াচড়ায় অসুবিধে হবে। ইসমাত কোনো রকমে এপাশ ফিরতেই দেখল সাহিদ একমনে তার দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ ওকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইসমাত ধড়ফড়িয়ে উঠল, সাহিদ তৎক্ষণাৎ বউকে সামলে নেয়। ইসমাত তার বুকে চড় দিয়ে বলল,
--"অসভ্য! এভাবে সাড়া-শব্দহীন চেয়ে আছ কেন? এভাবে কেউ ভয় দেখায়?"

সাহিদ বুঝল ইসমাত ভয় পেয়েছে। ফিসফিস করে বলল,
--"ওহ, বউ ভয় পেয়েছে বুঝি? আসুন তবে, আদর দিয়ে ভুলিয়ে দেই।"

বলেই ইসমাতের বুলি বন্ধ করে দিল সে। 

—————

আজ বহুদিন পর ইসমাত বেড়ানোর জন্য বের হয়েছে। নয়তো তার চেকআপ ছাড়া বেরই হওয়া হয় না। সাহিদ ইসমাতকে এক হোটেলে নিয়ে গেল। ওখানে ওরা আজ রাতে থাকবে। ইসমাত নামটা দেখেছিল, তবে ভুলে গিয়েছে। তার চোখের সামনেই সাহিদ এখন সুইমিংপুলে সাতার কাটছে। ইসমাত তাকে সুইমিং করতে দেখে নিরিবিলি আকাশ পাতাল ভাবছে। তার মনে পড়ছে দেশের কথা। তার প্রচন্ড ভর্তা খেতে ইচ্ছা করছে, ইলিশ মাছও। কিন্তু এখানে এসব পাওয়া মুশকিল। নেহাকে জানালে নেহা বলেছে আগামীকাল ব্যবস্থা করে দিবে। বাঙালি খাবারের যত আবদার ছিল সবই নেহা মিটিয়েছে এই কয়েক মাসে। নেহা গাইনি ডাক্তারের পাশাপাশি পাক্কা রাঁধুনীও। সে অবশ্য এখন পুরোদমে সাংসারিক। বহুদিন প্রেক্টিস না থাকায় এখানে কোনো হাসপাতালে জয়েন করার সুযোগ করতে পারেনি।

ইসমাত নিজের উঁচু পেটের দিকে তাকাল। এখন ওর সাত মাস চলছে। আপনমনে সাহিদকে বলল,
--"বাবুর তিন মাস হলেই আমরা দেশে ফিরে যাব। প্রিয়জন ছাড়া এই দূর-দেশে দমবন্ধ লাগে।"

সাহিদ সুইমিং ছেড়ে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। দুই হাতে মেঝেতে প্রসারিত। ইসমাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
--"উম.. ফাইন! আসুক আগে বেবি। চলে যাব। এখানের কাজ শাবাব ব্রো দেখবে। দেশে গেলে আমিও দেখি আমার একাডেমিক পড়াশোনাও কমপ্লিট করব।"

সাহিদের সিদ্ধান্ত ইসমাতের পছন্দ হলো।
--"হুঁ, শেষে এসে ঝুলে আছ। এবার তো ইতি টানা দরকার। গ্যাপ গেল তোমার উলটো।"

সাহিদ এতক্ষণে খেয়াল করল ইসমাতের পায়ে হিল। যদিও অত উঁচু বা চোখানো না, তবে এই হিলে কোনো পার্থক্য পেল না সাহিদ। সে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,
--"তুমি হিল পরেছ কেন?"
--"আজ ইচ্ছা করছিল।"

--"রেগে যাচ্ছ কেন?"

--"রাগব না? এই সেন্সিটিভ সময়ে এমন গাফিলতি চলে?"
--"এটা আহামরি হিল না। আমি নিজেকে সামলাতে জানি।"

--"তোমার সাহস তো কম না.."
--"তো কি হয়েছে?"
--"খুলো, রাইট নাও। বাবুর কিছু হলে.."

ইসমাত রেগে তাকাল।
--"বাবু কিছু হলে কি করবে? মারবে আমাকে? এত সাহস আছে তোমার? আমার চেয়ে তোমার বাবুর প্রতি দরদ বেশি?"

সুইমিংপুলে থাকা সাহিদ কিছুটা মিইয়ে গেল। বুঝল, হিল পরাটাও তার বউয়ের মুড সুইং এর অংশ। সাহিদ মুহূর্তেই সুইমিংপুল থেকে উঠে আসল, সময় নিয়ে গা মুছল। ইসমাত তখনো সাহিদের উত্তরের অপেক্ষায়। সাহিদ চেঞ্জিংরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে এসে কোনো প্রকার কথা ছাড়াই হাঁটু গেড়ে বসল, একদম ইসমাতের পায়ের কাছে। কোনো বাক্য ব্যয় না করে হুট করেই তার পা থেকে হিল খুলে ইসমাতকে কোলে তুলে নিল। তাও আবার এক হাতে। সে আঁতকে উঠে সাহিদের ঘাড় শক্ত করে ধরল, এই বুঝি পড়ে যাবে।

--"হচ্ছে কি সাহিদ? পুট মি ডাউন! আমি এখন ভারী হয়ে গেছি। তুমি পারবে না.."

সাহিদ স্বাভাবিক ভাবেই ইসমাতকে নিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে বলল,
--"এতটাও ভারী হননি। আপনার থেকে দ্বিগুণ ওজনের ভার কান্ট্রোল করতে পারি। এন্ড হেয়ার, আওয়ার বেবি.. ইটস টু টাইনি।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp