মৌমিতার শরীরটা খারাপ। ঘুম হয় না। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। চুল পড়া কমেনি। স্বাস্থ্যটাও ভেঙে গেছে। রাবেয়ার দুশ্চিন্তা এখন এই বড় মেয়েটাকে নিয়ে। আজ সকাল থেকেই সে একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। মুখসহ হাত-পা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
“মৌ?” রাবেয়া নিচুস্বরে ডাকলেন মেয়েটাকে, “রিপনকে বাইরে থেকে কিছু আনতে বলবো? এতো অল্প করে খেলে তো শরীর চলবে না মা।”
মৌমিতা ধীরে ধীরে চোখ খুললো, “খিদে নেই।”
“খেতে হবে।”
মেয়েটা উঠে বসলো, এতোটুকুতেই তার মাথাটা একেবারে ঘুরে উঠলো যেন। স্থির হতে একটু সময় নিলো সে। রাবেয়া অসহায় হয়ে চেয়ে রইলেন। তিনি কিছু বলতে যাবেন, তখনই দরজা খোলার আওয়াজ এলো।
শাহানা ভেতরে ঢুকলেন, “মারুফ ভাই ঘুমাচ্ছেন?”
তাকে দেখে মা-মেয়ে উভয়েই একটু নড়েচড়ে বসলেন।
“আমি এখন বের হচ্ছি তো, তাই ভাবলাম আরেকবার দেখা করে যাই। এখানে আমার ভাইয়ের বাড়ি, ওখানে যাচ্ছি।”
রাবেয়া মাথা নাড়লেন, “ওহ। আপনারা তো বোধহয় ঢাকায় থাকেন এমনিতে—”
“জ্বী। তবে আমার শ্বশুরবাড়িও রাজশাহী। ঈদ ছাড়া তেমন কেউ আসতে চায় না এখানে। তাই ভাইয়ের বাসায় উঠেছি।”
“আপা আপনি বসেন।”
“না, এখন তো যাচ্ছিই। আপনার ছোট মেয়েটা কোথায়? ওর সাথে দেখা হলো না।”
“ও ফুপুর বাড়ি গেছে। এখানে থাকার জায়গা কম তো।”
“হ্যাঁ। তবু ডাবল বেডের কেবিনে অনেক সুবিধা আছে।” শাহানা একটু এগিয়ে এলেন, “মৌমিতার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে। খুব দুশ্চিন্তা করে নাকি?”
মেয়েটা যেভাবে মাথা নিচু করে বসে ছিলো, সেভাবেই রইলো। রাবেয়া তার শুকনো মুখখানির দিকে তাকিয়ে জোর করে হাসলেন, “করে। কিছু খেতেও চায় না। সেজন্য শরীরটা খারাপ হয়ে গেছে।”
শাহানা আরও কাছে ঘেঁষলেন, মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “মারুফ ভাইকে কাল রিলিজ দিবে শুনলাম। আজকে মৌকে একটু ডাক্তার দেখান। এখানেই যেহেতু আছেন আজকের দিনটা। ওর বোধহয় রুচি কমে গেছে। জোর করে তো আর খাওয়া যায় না।”
শাহানা চলে যাওয়ার আগে আরও কিছু কথা বললেন রাবেয়ার সাথে। সেগুলো মৌমিতার কান অবধি পৌঁছালেও যেন সে কিছুই শুনলো না। সামনের চৌকিতে ঘুমিয়ে থাকা আব্বার দিকে তাকিয়ে রইলো শূন্য দৃষ্টিতে। রাবেয়া বেরিয়ে গেলেন, শাহানাকে বিদায় জানাতে। তারা চোখের আড়াল হতেই মেয়েটা আবার শুয়ে পড়লো। চোখ বন্ধ করলো।
শরীরটা আসলেই খুব খারাপ হয়ে গেছে। আরও খারাপ হোক! সে হুট করে মারা গেলেও কি বাদল জানতে পারবে? একটু হলেও কি অনুশোচনা হবে ছেলেটার?
মৌমিতা আর শুয়ে থাকতে পারলো না, উঠে বসলো। যে মানুষটা তাকে নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবছে না, এমন উদাসীনতা দেখাচ্ছে, তার কথা ভেবে কেন নিজেকে আরও কষ্ট দিবে সে? কিন্তু বাদলকে সে যতোটুকু জানে, এমন উদাসীনতা অন্তত মৌমিতার প্রতি দেখায়নি কখনও। মাঝে মাঝে নিরুদ্দেশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটা নিয়ে রাগ করে থাকার উপায় রাখেনি। কোনো ঝামেলা বাঁধিয়েও কতো উপায়ে যে 'দুঃখিত' বলেছে! কিন্তু এখন কী হলো?
রাবেয়া কেবিনে ঢুকলেন, “মৌ? রিপনকে দোকানে পাঠিয়েছি। নাস্তা আনুক। দুপুরের খাবারের তো দেরি আছে।”
মৌমিতা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা দোলায়।
—————
রিসিভার কানে ধরে মেয়েটা একটা শুষ্ক ঢোক গিললো। সে কথা বলার পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই কেউ বলে উঠলো, “আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। বাদলকে দিতে পারবেন একটু? তিনশো চার নম্বর রুম।”
“কোন ব্যাচ?”
“ব্যাচ... ফোর্থ ইয়ার।”
“কয়েকটা ডিপার্টমেন্টে সেমিস্টার ব্রেক চলছে আপু। অনেকেই বাড়ি গেছে।”
মৌমিতার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো। অনেকের খবর কে চেয়েছে! নির্দিষ্ট করে একজনের কথা জানতে চাওয়ার পরেও অলসতা দেখাচ্ছে লোকটা! মেয়েটা কটমট করে বললো, “আচ্ছা, থাকেন!”
সে টেলিফোন কেটে দিলো। তারপর সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো দেয়ালে হেলান দিয়ে। অবসাদ একেবারে জেঁকে বসলো তার ভেতরে।
বাদলের ছুটি চলছে। সে খুলনায় ফিরে গেছে, নাকি এখনও নাটোরেই আছে—কিছুই জানা গেলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গেলে তো চিঠিটা তার কাছে পৌঁছানোর কথা। আর যদি পৌঁছে থাকে, ছেলেটা একবারও কল দিলো না কেন? আর যদি মেসেই থাকে, এতোবার করে ফোন দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি কেন? সব বাদ। আজ নাহয় শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক।
মৌমিতা নিজের হাতের দিকে তাকায়। টেলিফোন করার মতো পর্যাপ্ত টাকা বাকি নেই। আবার কেবিনে যেতে হবে। সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে সেদিকেই পা বাড়ায়।
ডিউটি রুমের সামনে নাসরিনের সাথে কথা বলছে সুজয়। এ দৃশ্য দেখে মেয়েটা আর এগিয়ে যেতে পারলো না। ছেলেটার পরিচয় জানার পরে এই কাজকর্ম নিয়ে ভাবতে গিয়ে সবটা আরও বেমানান লাগলো। সুজয়েরও বিয়ে প্রায় ঠিক হয়ে আছে। তবু একজন নির্দিষ্ট মেয়ে মানুষ সারাক্ষণ তার আশেপাশে ঘুরবে কেন? দু'জনের মাঝে এতোই যখন ভাব, তাহলে সুজয় নাসরিনকেই বিয়ে করুক না! এতে উভয় পক্ষেরই তো লাভ।
মৌমিতা এক পা এগিয়ে এলো। চেষ্টা করলো যেন তাদের দৃষ্টি এদিকে না পড়ে। কেবিনে যেতে হবে। কিন্তু সুজয়দের সামনে দিয়ে যাওয়ার কোনোই ইচ্ছা নেই তার। অগত্যা সে আবারও দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালো।
নাসরিনের পাশে একজন পুরুষ কর্মচারীকে দেখা গেলো এবার। সুজয় তিন নম্বর কেবিনের দিকে নির্দেশ করে কিছু একটা বললো তাদেরকে। মৌমিতা ভ্রু কুঁচকায়। এই ছেলে কি নজরদারি করছে? বোঝার উপায় নেই।
কর্মচারী লোকটা একটু উচ্চস্বরে কথা বলে, তবে স্পষ্ট শোনা যায় না। তারই কোনো একটা কথায় সুজয় মুচকি হাসলো। মৌমিতার মনে পড়লো না, তাকে সে আগে কখনও হাসতে দেখেছে কিনা।
ছেলেটা নিশ্চয়ই খুব বেশি হাসে না। যারা কম হাসে, তাদের হাসির মাঝে কি বিশেষ কিছু থাকে?
মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে তাকায়। দরজার কাছে লোকজন জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে মৌমিতা।
বাদল যে খুব অল্প হাসে, এমন নয়। কিন্তু সে যতোবারই হাসে, মেয়েটার মনে তোলপাড় হয় ততোবারই। এই অনুভূতি কখনোই পুরোনো হয় না। তার রাগ, হাসি, অভিমান—সবই ভালো লাগে মেয়েটার! ছেলেটাকে ঘিরে থাকা সবকিছুই ভালো লাগে। এতোগুলো বছরেও ঐ ভালো লাগার তীব্রতা এতোটুকুও কমেনি।
মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে অন্য কাউকে কীভাবে বাদলের জায়গায় বসানো সম্ভব? আর যদি মনের মাঝে জায়গা দেয়াই সম্ভব না হয়, তাহলে সেই মানুষের সাথে পুরো জীবন কাটিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা বোকামি নয় কি?
মৌমিতা হনহন করে এগিয়ে গেলো সামনে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনকে একেবারে উপেক্ষা করলো। তবে তার মস্তিষ্ক নতুন এক হিসেব কষতে শুরু করলো। যা সে আগে খেয়াল করেনি। বাদল উচ্চতায় সুজয়ের চেয়ে একটু লম্বা। এই ছোট ছোট মানুষগুলোই বেশি তৎপর হয় দ্রুত বড় হওয়ার জন্য! মার্জিয়াটাও ধেই ধেই করে বড় হয়ে গেলো, শারীরিক উচ্চতার দিক দিয়ে সে মৌমিতাকে ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই।
কেবিনের ভেতরে ঢুকে মেয়েটা ক্লান্ত ভঙ্গিতে চৌকির একপাশে বসে পড়ে। রাবেয়া তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় ছিলা?”
“বাইরে।”
“তোমার তো বেশি ঠাণ্ডা লাগে, তাই একটা মোটা চাদর আনতে বলেছি আপাকে।”
“ওহ। কখন আসবেন?”
“এতোক্ষণে আসার কথা। বললেন তো, দুপুরের আগেই আসবেন।”
—————
ঘড়িতে বারোটা বাজতে কিছুক্ষণ দেরি। তখনই মার্জিয়া খন্দকার হাসপাতালের এই কেবিনে এসে পৌঁছায়। মারুফের ঘুম ভেঙেছে তখন। ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে। মেয়েটা তার সামনে দাঁড়িয়ে কোমল স্বরে বলে, “আসসালামু আলাইকুম আব্বা। কেমন আছেন?”
মারুফ মনোযোগ দিয়ে গায়ের কাঁথাটা নাড়াচাড়া করছিলেন। পরিচিত স্বরটা কানে প্রবেশ করতেই তিনি মেয়ের দিকে তাকালেন। উত্তর দিলেন না।
“ভালো আছেন?”
এবার উপর-নিচে মাথা দোলালেন তিনি, মৃদু হেসে বললেন, “ছোতো মা।”
“জ্বী...” মার্জিয়ার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, সে একটু দূরে সরে দাঁড়ায়। দ্রুত চোখের পাতা ফেলে চোখ ফেটে বেরোতে চাওয়া অশ্রুকে আবার ভেতরে পাঠানোর চেষ্টা করে। রাবেয়া তার দিকে একবার তাকালেন। তারপর পানির সাথে ওষুধ গুলিয়ে নিতে নিতে ব্যস্তভাবে বললেন, “আপারা আসেননি?”
“এসেছেন। ওদিকে আছেন।” মেয়েটা গিয়ে বোনের পাশে বসে, নিচুস্বরে বলে, “রতন ছাগলটাও আসতে চেয়েছিলো। ফুপু মুখের উপর না করে দিয়েছেন। বাড়ি পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে আসলাম।”
মৌমিতা ভাবলেশহীন হয়ে বললো, “ভালো হয়েছে।”
“কিসের ভালো? তোমার চেহারা আজকে আরও খারাপ হয়েছে।”
রাবেয়া সুযোগ বুঝে বলে উঠলেন, “খায় না তো! দেখো কী রকম শুকিয়েছে।”
মার্জিয়া তার আপার পরনের পোশাক টেনে ধরে, “আসলেই অনেক শুকিয়েছে। এই জামাটাও ঢিলে হয়ে গেছে।”
মৌমিতা একটু সরে বোনের নাগালের বাইরে গিয়ে বসে। বিরক্ত হয়ে বলে, “এখানকার খাবার ভালো লাগে না।”
“ফুপু খাবার এনেছেন আজকেও—”
“আমার আর ভালো লাগছে না হাসপাতালে থাকতে। রুচিটাই নষ্ট হয়ে গেছে। যে-ই খাবার আনুক, আমি খেতে পারবো না।”
রাবেয়া মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ। নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা—”
তার কথা শেষ না হতেই মার্জিয়া উৎফুল্ল হয়ে বলে, “ইশ! কতো বছর পর আপনার মুখে প্রবাদ শুনলাম।”
“ফালতু কথা না বলে এদিকে আসো। তোমার আব্বাকে এখন ওষুধ খাওয়াতে হবে।”
মার্জিয়া উঠে গেলো মাকে সাহায্য করতে।
মারুফ ট্যাবলেট গিলতে পারেন না। পানিতে গুলিয়ে খাওয়ানো হয়। সেটাও খেতে চান না। বেশ বিশ্রী একটা তেতো স্বাদ আসে। তাই ওষুধ খাওয়ানোর সময় দুটো মেয়ের মধ্যে কাউকে না কাউকে উপস্থিত থাকতে হয়। সন্তানের অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেন না। আজও তেমনই হলো।
মুখে ওষুধ নিয়েই মারুফ চোখ-মুখ কুঁচকে ফেললেন। খুব কষ্ট করে ঢোক গিললেন। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো।
সবকিছু কতো দ্রুত বদলে যায়!
এই তো সেদিনই, বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো মার্জিয়া। আব্বা ট্রেনের টিকেট কাটলেন। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার সময় জানালার পাশে গিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। তারপর যখন ট্রেন চলতে শুরু করলো, আব্বাও হাঁটতে শুরু করলেন। জানালার পাশে হাঁটতে হাঁটতেই কতো পরামর্শ দিলেন। সাবধানে থাকতে বললেন, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে বললেন।
ট্রেনের গতি হঠাৎ করেই খুব বেড়ে গিয়েছিলো। মারুফ জোরে হেঁটেও তাল মেলাতে পারছিলেন না। মার্জিয়ার খুব মায়া লেগেছিলো তখন। প্ল্যাটফর্ম পুরোপুরি দৃষ্টির অন্তরালে যাওয়ার আগেই সে জানালা থেকে উঁকি দিয়ে দেখেছিলো, আব্বা স্টেশনে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন।
সেদিন কি মেয়েটা জানতে পেরেছিলো, আব্বার সঙ্গে এরপর যখন দেখা হবে, তখন পুরো মানুষটাই বদলে যাবেন?
লোকটার বাম হাত-পা প্রায় অবশ হয়ে এসেছে। কথা বলতে পারেন না। হাঁটাচলা করতে পারেন না।
তিনি কি আর কোনোদিনই মেয়েটাকে স্টেশনে পৌঁছে দিতে যাবেন না? অযথাই টাকা খরচ করে হাতে কেক কিংবা পাউরুটির প্যাকেট দিয়ে বলবেন না কখনোই... “রাখো মা। অনেক দূরের রাস্তা। মনে করে পানি খেও।”
মার্জিয়ার ভাবনায় ছেদ পড়লো। মমতাজ কেবিনের ভেতর ঢুকতে না ঢুকতেই বলে উঠলেন, “কী অবস্থা তোমাদের?”
তাকে দেখে বেশ আনন্দিত মনে হলো। রাবেয়া উত্তর দিলেন, “আছি, আলহামদুলিল্লাহ। ওনাকে ওষুধ খাওয়ালাম। একটু পরেই খাবার খাওয়াতে হবে।”
মার্জিয়া আবার গিয়ে মৌমিতার পাশে বসলো।
“রিপন কোথায়? বাইরে গেছে নাকি?” সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন মমতাজ, “মৌয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে, একবারও বললে না?”
রাবেয়া অপ্রস্তুত হলেন, “ওভাবে কিছু ঠিক হয়নি আপা। কথা চলছিলো। তখন থেকেই তো মৌয়ের আব্বা অসুস্থ।”
“এখন তো আরও ভালোভাবে কথা বলা যাবে। পাত্র একেবারে হাতের কাছেই...”
মার্জিয়া আড়চোখে আপার দিকে তাকায়, তার চেহারায় বিভ্রান্তি। পাত্র হাতের কাছে মানে? বাদল ভাই কি একেবারে হাসপাতালেই উদয় হয়েছে নাকি? অবশেষে তার দর্শন পাওয়া যাবে?
“আমি রতনের কাছ থেকে শুনলাম গতকাল। মাহফুজ ভালো ছেলে। ভালোই একটা সম্বন্ধ পেয়েছো।”
এবার মার্জিয়া বড় বড় চোখ করে পাশ ফিরে তাকায়। তার অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দেখে মৌমিতা বিরক্ত হয়ে বলে, “কী?”
“মাহফুজ? ঐ ডাক্তারটা?"
মৌমিতা এই প্রশ্ন এমনভাবে এড়িয়ে গেলো যেন শুনতেই পারেনি। ফুপুর দিকে তাকিয়ে রইলো কৃত্রিম মনোযোগ দেখিয়ে। মমতাজ বলতে লাগলেন, “পারলে বিয়েটা ঠিক করে ফেলো রাবেয়া। যতো তাড়াতাড়ি হয়, ততোই ভালো। মারুফের একটা চিন্তা কমে যাবে তাহলে। আর মৌ তো অনার্স পাশ করেছে। চাকরিতে ঢুকতে আর সময় লাগবে না।” তিনি ঘুরে মৌমিতার দিকে তাকালেন, “আহারে! মেয়েটার স্বাস্থ্য খুব খারাপ হয়ে গেছে।”
রিতাও তার মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে, ভ্রু কুঁচকে বলে, “মৌ, তুমি ডাক্তার দেখাচ্ছো না কেন? এখন তো হাতের কাছেই সবকিছু। মামাকে রিলিজ দেওয়ার পর এতোদূর এসে ডাক্তার দেখাতেও পারবা না। তোমার না মাঝে মাঝে আয়রন কমে যায়? ঠিকমতো খাও না।”
মৌমিতা মাথা নেড়ে ক্লান্ত স্বরে বলে, “না আপা। ডাক্তার দেখাতে হবে না। বাসায় গিয়ে একটু ভালোভাবে চললেই—”
“দেখি।” রিতা কাছে এসে দাঁড়ায়, মৌমিতার চোখের নিচটা একটু টেনে ধরে দেখে, “তুমি আয়রন টেস্ট করাও। একদম ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।”
“আচ্ছা।”
“এখনই যাও। পরে আর হবে না। একদম বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। রিপোর্ট দিতে আরও দেরি হবে।”
“কিন্তু এখন তো যোহরের আজান দিবে আপা। আমি নাহয়—”
“সেজন্যই তো বলছি। আরেকটু দেরি হলেই আর স্যাম্পল নিবে না। সবাই চলে যাবে।”
মেয়ের কথায় সম্মতি জানিয়ে মমতাজ বলে উঠলেন, “হ্যাঁ মৌ। যাও। রিপোর্ট দিতে এমনিতেও অনেক সময় লাগে। এখনই গিয়ে রক্তটা দিয়ে আসো।”
মনে মনে বেশ বিরক্ত হলো মৌমিতা। প্রসঙ্গ বদলানোর উপায় খুঁজতে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলো। দেখলো, রাবেয়াও তাকে যেতে বলছেন ইশারায়। মারুফের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে মেয়েটা কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাসরিন তাকে দেখামাত্রই চমকে উঠলো, তারপর ডিউটি রুমের দিকে রওনা দিলো।
মৌমিতা হতবিহ্বল হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ। তার পরিবারকে আসলেই নজরে রাখা হচ্ছে নাকি? কী কারণে? ডা. মাহফুজ কি ঐ মেয়েটাকে এই কাজেই নিয়োগ দিয়েছে? বিয়ে ঠিক না হতেই এতো খবরদারি!
সে লম্বা একটা শ্বাস ফেললো। করিডোর ধরে খুব ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো। যোহরের নামাজের সময়সহ দুপুরের খাবারের বিরতি দেয়ার কথা। এতোক্ষণে হয়তো কেউ নেই। সবাই চলে গেছে।
মৌমিতা নিচতলায় চলে আসে। প্যাথলজি কক্ষে ভিড় নেই বললেই চলে। সে ক্যাশ কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি দেওয়ার পর ব্লাড কালেকশন সেন্টারের দিকে ঘুরে তাকায়। কেবল একজন টেকনিশিয়ান উপস্থিত। লোকটা চেয়ারে বসে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে হয়তো। মৌমিতা সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে বলে ওঠে, “ডিউটি আওয়ার তো শেষ আপু।”
“আমি... আরকি—”
লোকটা চেয়ারের দিকে ইশারা করে বলে, “আচ্ছা বসেন।”
মেয়েটা বসার পর তার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে চোখ বুলায় টেকনিশিয়ান। তারপর বলে, “হাত দেন।”
ছোট একটা শ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসে মৌমিতা। খুব মন্থর গতিতে জামার হাতা গোটাতে শুরু করে। তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠের ডাক শোনা যায়, “বাবলু ভাই?”
মেয়েটা চমকে ওঠে। তার ভেতরটা অযথাই ঝাঁকুনি দেয়। সে মূর্তির মতো সটান হয়ে বসে থাকলেও, আড়চোখে দেখার চেষ্টা করে, মানুষটা এদিকেই আসছে কিনা।
সুজয় এসে একেবারে ল্যাবরেটরির ভেতর ঢুকে পড়লো। বাবলু নামের লোকটার উদ্দেশ্যে বললো, “লাঞ্চ ব্রেক দিয়েছে। যাবেন না?”
“এই তো যাচ্ছি, খালি একজন পেশেন্ট বাকি—”
“আপনি যান। আমি দেখছি।”
বাবলু একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়, “তুমি ব্লাড নিতে পারবা?”
“না পারার কী আছে? আপনি যান। আপনার কলিগরা সবাই ওয়েট করছে।”
মেয়েটা মনে মনে বলে, “এ আবার কেমন আদিখ্যেতা!”
বাবলু নামের লোকটা এবার খুশিমনে নিজের ব্যাগটা তুলে নিলো। টেবিলের কিছু জিনিসপত্র ঠিকঠাক করে রাখলো। সে উঠে যেতেই সুজয় তার আসনে বসে। টেবিলে রাখা কাগজটা হাতে নিয়ে খুঁটে খুঁটে দেখতে থাকে। সে বাবলুর থেকে অনেকখানি সময় বেশি নিচ্ছে কেবল কাগজে চোখ বুলাতে। মুখস্থ করছে নাকি!
মৌমিতা কোনো কারণে তার দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে না। ছেলেটা তাকে নিয়ে এতো রক্ষণশীলতা দেখাচ্ছে কেন—সেটাও বুঝতে পারছে না।
সুজয় বললো, “হাতটা এখানে রাখেন।”
মুখে অস্বস্তির ছাপ নিয়েই মেয়েটা ডান হাত তুলে রাখলো টেবিলের উপর। সুজয় কোনো পূর্বসংকেত না দিয়েই তার হাতটা ধরে নিজের দিকে টানলো। মৌমিতা তাল সামলাতে গিয়ে কিছুটা ঝুঁকে আসে। সুজয়ের এই পেশাদার স্পর্শেও তার শরীরে বৈদ্যুতিক ঝাঁকুনি অনুভূত হচ্ছে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পুরোপুরি নিহত হওয়ার আগেই হাতটা সরিয়ে নেওয়া উচিত। তবে তা সম্ভব হলো না। এবার নিজের পাশাপাশি এই ছেলেটার উপরেও বিরক্ত হলো সে।
সুজয় তার আঙুলগুলো ভাঁজ করে দিয়ে বললো, “হাত শক্ত করে মুঠো করেন।"
মৌমিতা জোর খাটালো, দুর্বল হাতখানি মুষ্টিবদ্ধ করতে গিয়ে পুরো বাহু কাঁপতে লাগলো। তার কনুইয়ের একটু উপরেই রাবারের ব্যান্ডটা বাঁধলো সুজয়। কনুইয়ের ভাঁজে চাপ দিয়ে শিরা খুঁজে বের করলো। সেখানে ঠাণ্ডা অ্যালকোহলে ভেজানো তুলো ঘষে একটা সিরিঞ্জ হাতে নিলো। মৌমিতা নাক কুঁচকে বসে রইলো। একটা ঝাঁঝালো কড়া গন্ধ আসছে। সহ্য করা যাচ্ছে না কেন যেন।
রক্তনালীতে সুঁই প্রবেশ করানোর আগে সুজয় বলে ওঠে, “আপনি নাকি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছেন না?”
মেয়েটা ত্বকের মাঝে পিঁপড়ের কামড়ের মতো একটা সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভব করলো। সিরিঞ্জের স্বচ্ছ নলের ভেতরে গাঢ় লাল রক্ত জমা হচ্ছে। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে মৌমিতা এক মুহূর্তের জন্য ছেলেটার মুখের দিকে তাকায়। উত্তর দিতে চেয়েও কিছু বলতে পারে না। প্রশ্নটা সহজ, উত্তরটা আরও সহজ। কিন্তু এই সহজ কাজটাই হঠাৎ খুব কঠিন মনে হতে থাকে। সে সর্বাত্মক চেষ্টা করে একটা যৌক্তিক উত্তর দেওয়ার। তখনই তার ভাবনার স্রোতটা আরেকদিকে প্রবাহিত হয়। নাসরিন তাহলে গুপ্তচর! সে ছাড়া এসব খবর আর কে পাচার করবে?
“হাত ছেড়ে দেন।”
মৌমিতা মুঠো আলগা করে। মাথাও নিচে নামায় একটু।
সুজয় কি আর কিছু জানতে চাইবে না? সবসময় এমন চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রশ্ন করতে হবে কেন? তাদের মাঝে কি আর কোনো সম্পর্ক নেই? সে যেভাবে ছুটে এসে বাবলু নামের লোকটাকে বিদায় করলো, হবু স্ত্রীর হাত অন্য কাউকে ধরতে দেবে না বলে; সেই অধিকারবোধটুকু এখন দেখাতে সমস্যা কোথায়?
সে যদি নিজে থেকে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে না যায়, তাহলে মৌমিতা নিজের কথা বলবে কী করে? কীভাবে জানাবে, তার মনে যে অন্য কারও বসতি গড়ে উঠেছে বহু আগেই!
কনুইয়ের ভাঁজে একটা তুলো রেখে মৌমিতার হাতটা ভাঁজ করে ধরলো সুজয়। তারপর একটা ছোট কাগজে খসখস করে কী যেন লিখতে লাগলো। মেয়েটা উঠে যেতে উদ্যত হলে সে শান্তভাবে বললো, “দাঁড়ান।”
মৌমিতা ঐ শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে আবার বসে পড়লো। উদগ্রীব হয়ে রইলো তাকে থামানোর কারণটা জানতে। সুজয় সন্তর্পণে তার হাতটা টেনে নেয়, তুলো সরিয়ে একটা অ্যাডহেসিভ ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয় ক্ষতস্থানে।
“যান।”
মেয়েটা তড়িৎগতিতে উঠে দাঁড়ায়। হনহন করে বাইরে চলে আসে।
এখানে মন খারাপ করাটা খুবই অমূলক ব্যাপার। তবু তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। সে পেছনে ঘুরে তাকায় আরেকবার। সুজয় কাউন্টারে গেছে, সেখানকার লোকটার সাথে কথা বলছে।
মৌমিতা সিঁড়ির কয়েক ধাপ উপরে উঠে ওদিকেই তাকিয়ে রইলো। চোখের পলকও ফেললো না ঠিকঠাক। নিজের এই কাজটাকে তার নিজের কাছেই ভীষণ দৃষ্টিকটু মনে হলো। সে মাথা ঘুরিয়ে নিলো, রেলিংয়ে হাত রেখে চুপচাপ দোতলায় উঠতে শুরু করলো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………