ডেসটিনি - পর্ব ৩৯ - সুহাসিনি মিমি - ধারাবাহিক গল্প

ডেসটিনি - সুহাসিনি মিমি
'ক...কমান্ডার সাহেব!'

অস্ফুট, অস্পষ্ট শব্দটি আপনাআপনি মুখ থেকে বেরিয়ে এলো প্রিয়ন্তীর।বুকের ভেতরটা অতর্কিত এক কালবৈশাখী ঝড়ে তোলপাড় করে উঠল তৎক্ষণাৎ। অথচ! উল্টো পাশে ব্যক্তিটি বড্ড স্বাভাবিক। নির্লিপ্ত তার হাবভাবখানা। প্রিয়ন্তীকে দেখেও না দেখার ভান করল সে।মেয়েটার স্তব্ধ চাহুনি অতিক্রম করে পা বাড়াল অন্যপাশে।প্রিয়ন্তী হতবাক। অতি মাত্রায় আশ্চর্য। হারিয়ে বসেছে মুখের ভাষা।কাজলকালো ডাগর চোখ দুটো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে চেয়ে দেখল মানবের পথ অতিক্রম করা। 

অদূরে মেহ্গনি গাছের নিচে প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে গোল হয়ে বসেছে অর্ণব, ফাহিম আর সেহরোজ।কি একটা বিষয়ে কথা বলছিল যেন। তাজধীর গিয়ে সেখানে বসল।যোগ দিলো বন্ধুদের সঙ্গে। ​প্রিয়ন্তী তখনও চরম বিস্ময় নিয়ে হাঁ করে সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে। মনের বিভ্রান্তি সামলাতে না পেরে সে আস্তে করে চোখ ফিরিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিতালীর দিকে তাকাল এবার। ​মিতালী চোখের ইশারায় এমন একটা ভাব করল যেন সে এর বিন্দুবিসর্গও জানে না! নির্দোষ একটা মুখ করে অন্যদিকে মুখ সরাল তৎক্ষণাৎ। 

মিতালীর এই ভাবসাব মোটেও বিশ্বাস হলো না প্রিয়ন্তীর। ওর ভাবি নিশ্চিত সবটা জানে! সব জেনেবুঝেই ওকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে! কিন্তু চারপাশে কাজিনদের দল ঘেরা হয়ে থাকায় মিতালীকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছে না ও। 

​চার বন্ধুর আলোচনা তখন তুঙ্গে। যদিও বেশিরভাগ পকপক করছে একা অর্ণব'ই। কথা বলার মাঝে হুট্ করে ওর চোখ পড়ে একপাশে। মিতালীর ওপর। অর্ণব খানিকটা অবাক বলে উঠে,

'আরে! ওইটা মিতালী না? ও এখানে কী করছে?'

কথা শেষ করে তাকাল তাজধিরের দিকে। তাজধীর অর্ণবের কথার পিঠেই চোখ তুলে তাকাল সেখানে। অর্ণব তাজধীর কে চুপ থাকতে দেখে নিজেই হাতের ইশারায় ডাকল তখন,

'মিতালী!এইযে এদিকে। এদিকে আসো!'

অর্ণবের হাঁকডাক শুনে মিতালী ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ঝুলালো।শক্ত করে চেপে ধরল ননদের হাত। প্রিয়ন্তী সাথে সাথেই অবাক হয়ে চাইল। প্রাণপন চেষ্টা করল নিজের হাত ছাড়াতে। 

'কোথায় যাচ্ছি?'

'চলো।'

'আমি যাব না।'

'চলো বলছি।'

'ভাবি!'

কিন্তু শুনল না মিতালী ! প্রিয়ন্তীর কোনো বারণ, কোনো কাকুতি-মিনতি তোয়াক্কা না করে জোর করেই টেনে নিয়ে চলল ও।​প্রিয়ন্তীর ছটফটানি উধাও হলো অর্ণবদের গোল হয়ে বসে থাকা বৃত্তটার সামনে এসে। চট করে দাঁড়িয়ে পড়ল মিতালী। সাথে ঝুলন্ত পুতুলের মতো প্রিয়ন্তীও।​অর্ণব বিষম খাওয়ার মতো চমকে উঠল সহসা। ছানাবড়া চোখে চেয়ে বলল,

'তুমি এখানে কী করছ মিতালী?কার সঙ্গে এসেছো এখানে?'

​মিতালী হেসে সহজ গলায় জবাব দিল,

'কনের ভাবি হই আমি, ভাইয়া!'

​অর্ণবের মুখটা দেখার মতো হলো তখন। চোখ কপালে তুলে তাজ্জব হয়ে বলল,

'কী?!'

​বিষম খেয়ে বসল বেচারা অর্ণব। অবিশ্বাসে তাজধীরের দিকে তাকাল ও। ওর মাথায় কিছুই ঢুকছে না! চোখের পলক না ফেলে তাজধীরকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,

'কিরে! ব্যাপার কী? কনের ভাবি মানে? তুই কি আগে থেকেই জানতিস নাকি? জানলে আমাদের বলিসনি কেন?'

​তাজধীর একদম শান্ত,স্বাভাবিক।লোকটার চেহারায় বিন্দুমাত্র বিস্ময় নেই। ​অর্ণবের নজর গিয়ে পড়ল মিতালীর পাশে কাচুমাচু হয়ে, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার ওপর।বিস্ময়ভূত চোখ গুলো ছাড়াল এবার বিস্ময়ের মাত্রা। অত্যাধিক আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইল শুধু। পরপর তাকাল পাশে বসে বন্ধুর পানে। তাজধীর আড় চোখে চেয়ে ছিল প্রিয়ন্তীর দিকে। অর্ণব চাইতেই চকিতে দৃষ্টি সরালো সে। অর্ণব সেসব পরখ করে ঠোঁট কামড়ে ধরল। শুনতে পেল,

'ও আমার ননদ, প্রিয়ন্তী।'

​এবার অর্ণব পুরোপুরি নিশ্চিত হলো! মেয়েটারে নাম শুনতেই সমস্ত জড়তা কাটল ওর। পাল্টালো মুখের ভাব। অগোচরে বাঁকা হাসল সে। এক গাল হেসে বলে উঠল,

'আরেহ! মিস প্রিয়ন্তী! আপনি দেখি তাহলে আমাদের বেয়ান সাব! বাহ্, আসুন আসুন, আমাদের পরিচয় করিয়ে দেই। আমি অর্ণব, ও ফাহিম, আর ঐ যে বসে আছে ঐটা আমাদের পাত্র,সেহরোজ। আর এই যে মহাশয় আমার পাশে আয়েশ করে বসে আছে তাকে তো চিনেন নিশ্চই? চিনারই কথা! আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় বন্ধু তাজধীরা। সম্পর্কে আপনার ডাবল বেয়াই। আরেকটা সম্প...

মুখের কথা মুখেই ঝুলে রইল। পায়ের ব্যথায় গিলে ফেলল কথাটুকু।ব্যথায় চেহারা নীল হয়ে গেছে অর্ণবের। তাজধীর চোখের ইশারায় মিতালী কে সরে যেতে বলল। ভাইয়ের ইশারায় মিতালী দ্রুত প্রিয়ন্তীর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

'চল প্রিয়, ওপাশে কাজিনরা ডাকছে।'

প্রিয়ন্তীকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে গেল মিতালী। 
​ওরা চোখের আড়াল হতেই অর্ণব এবার ব্যথায় কঁকড়ে উঠল,

'আহহ্! এই শালা পাও ছাড়! দিয়েছে আমার নরম তুলতুলে পা'টা চেপটা করে!'

​তাজধীর বিরক্তিতে পা সরিয়ে নিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করল। আগের মতোই নির্বিকার ভঙ্গিতে আঙ্গুল চালাতে লাগল স্ক্রিনে।​অর্ণব একহাতে পা ডলতে ডলতে কৌতূহল নিয়ে তাজধীরের মুখের কাছে ঝুঁকে এলো কিঞ্চিৎ।

'ইনিই কি তিনি?'

​তাজধীর স্বভাবতই চুপচাপ।গম্ভীর হয়ে ফোনে ব্যস্ত রইল কেবল।​পাশ থেকে ফাহিম চট করে বলে উঠল,

'উনিই কি তিনি মানে?'

​অর্ণব হাতের ইশারায় ফাহিমকে একপ্রকার ধমকে উঠে বলল,

'তুই চুপ থাক তো! মাঝখানে একদম নাক গলাবি না। আমি যাকে বলছি সে ঠিকই বুঝেছে!'

​তারপর আবার তাজধীরের দিকে তাকিয়ে তাগাদা দিল ও-কে,

'এই, বল! ইনিই কি তিনি?'

​তাজধীর ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখেই নিম্মস্বরে জবাব দিল,

'হুম।'

ঝড় তুফান ছাড়াই বিশাল বড় বাজ পড়ল অর্ণবের মাথায়। চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠল আকস্মিক,

'মানে ইনিই আমাদের ভাবি?'

​তাজধীর অর্ণবের হাত ধরে টেনে ধরে সজোরে চেয়ারে বসিয়ে দিল ওকে। কড়া চোখে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল,

'হূঁশ! আস্তে। চারপাশে মানুষজন আছে।শুনতে পাবে।'

 তাজ্জব হয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে বলল অর্ণব,

'শুনতে পাবে মানে? আরে ভাই, এটা তোর নিজের বউ! মানুষজন শুনতে পেলে তোর কিসের সমস্যা? আর সবচেয়ে বড় কথা বউ যদি এই ভিটার পাশেই শ্বশুরবাড়িতে থাকে, তবে তুই শ্বশুরবাড়িতে না উঠে আমাদের সাথে এখানে এসে কেন বসে আছিস?হু?'

​তাজধীর ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বরফশীতল গলায় উত্তর দিল,

'কারণ মিতালী ছাড়া আপাতত এ ব্যাপারে আর কেউ কিছু জানে না।'

​'কীহহহ!'

ফাঁকা ঢুক গিলল অর্ণব। বিভ্রান্তিতে নড়েচড়ে বসল। কোনো হিসেব-নিকাশই ওর মাথায় মিলছে না আপাতত। ​আমতা আমতা করে বলল,

'ম-মানে? বিয়ে করেছিস, নিজের মুখে বউ বলে স্বীকার করছিস, অথচ আবার ঠান্ডা মাথায় বলছিস মিতালী ছাড়া আর কেউ কিচ্ছু জানে না! এই শালা... তুই মেয়েটাকে কিডন্যাপ করে তুলে নিয়ে গিয়ে জোর করে বিয়ে করিসনি তো আবার?'

​ফাহিম আর সেহরোজ দুজনেই হাঁ করে অর্ণবের কাণ্ডকারখানা দেখছিল। অর্ণব হাত-পা নেড়ে তাজধীরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে আবার বলে উঠল,

"এখন বুঝলাম! এই জন্যই তো বলি! সেদিন মাঝরাতে তুই আমার ঘুম বিসর্জন দিয়ে কেন উনার জীবনী নিয়ে পড়ে ছিলি।এই ছিল এর পিছনে? নিজের বুদ্ধি আর ঘুম বিসর্জন দিয়ে বায়োডাটা কালেক্ট করলাম বন্ধুর কিডন্যাপ এর জন্য? ফোর্সে জানলে থাকবে আর এই চাকরি?'

ফাহিম অধৈর্য হয়ে উঠল,

'এই অর্ণব! তুই কী সব উল্টাপাল্টা আবোলতাবোল বলছিস বল তো? তাজধীর কেন কিডন্যাপ করতে যাবে?এক্সাক্টলি হয়েছেটা কী বলবি তো?'

'শালা তুই চুপ থাক তো! তোকে না বলেছি মাঝখানে একদম নাক গলাবি না? আগে আমার নিজের মাথাটা ঠান্ডা হতে দে! এই হিটলারটার পেট থেকে টেনে টেনে সব কটা সত্যি কথা বের করি, তারপর সহজ বাংলায় তোকে পুরো জট খুলে বুঝাচ্ছি! একদম কথা বলবি না আর!'

​অর্ণব আবার তাজধীরের দিকে ঘুরল। কাঠ কাঠ হয়ে বলল,

'বল! মুখ খোল।তুই কি সত্যি সত্যি জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিস?'

​তাজধীর ফোনটা পকেটে ভরে রাখল। ঘাড় কাত করে চাইল অর্ণবের দিকে। গম্ভীর গলায় জবাব দিলো,

'এরকম কিছুই না। যা হয়েছে, ইটস জাস্ট এন অ্যাকসিডেন্ট!'

'অ্যাকসিডেন্ট?! তোর সাথে অ্যাকসিডেন্ট হয়—সেটাও আমাকে মানতে হবে? যে লোক হেঁটে গেলে চারপাশের বাতাস পর্যন্ত সিভিল ডিফেন্সের মতো অ্যালার্ট হয়ে যায়, যার ছায়াকেও লোকে সালাম ঠোকে, তার জীবনে নাকি অ্যাকসিডেন্ট হয়! আর সেই অ্যাকসিডেন্টের ঠেলায় তুই সটান বিয়ের মতো একটা বিশাল কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললি?এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? এই শালা! এটা অ্যাকসিডেন্ট নাকি তুই নিজে দাঁড়িয়ে প্ল্যান করে অ্যাকসিডেন্ট ঘটাইছিস?কোনটা?'

​ফাহিম অর্ণবের জামার হাতা ধরে টেনে বলল,

'আহা অর্ণব! তাজধীর যখন বলছে ওটা একটা এক্সিডেন্টাল পরিস্থিতি ছিল, তখন এত পেঁচাচ্ছিস কেন? বাদ দে না!'

'তুই একে চিনিস না ফাহিম! একে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি! এই হিটলারের মাথার ভেতরে কী টাইপের নিউক্লিয়ার বোমা ঘোরে, তুই তার এক পার্সেন্টও জানিস না!আমি এটা ইহজন্মেও বিশ্বাস করব না!বল। সত্যি করে বল, কী চাল চেলেছিস তুই? কী করেছিস মেয়েটার সাথে?'

​তাজধীর এবার চোখের চাহুনি খানিকটা কড়া করল। কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে ধমকে উঠল এবার,

'অর্ণব! থামবি তুই? মুখ বন্ধ কর!'

'না, থামব না! মানলাম... মানলাম আমাদের ভাবি দেখতে মারাত্মক সুন্দর! মানে একদম রূপকথার পরীর মতো মায়াবী চেহারা। তাই বলে তুই আনকন্ট্রোল হয়ে মেয়েটাকে ডাইরেক্ট তুলে বিয়ে করে ফেলবি?এতটা অধৈর্য কবে থেকে হলি তুই তাজধীর?'

​তাজধীর এবার ধীরস্বরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসল। অর্ণবের এই অনবরত ফালতু অনুমান আর বকবকানি ধৈর্য্যর সীমা ছাড়াচ্ছে ওর। ধারালো কণ্ঠে বলল,

'আমি নিজেকে কখনো আনকন্ট্রোল করি না, অর্ণব। আর কাউকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করার মতো লেইম চিন্তাভাবনাও আমার নেই। পরিস্থিতি এমন ছিল যেখানে বিয়েটা করা ছাড়া অন্য কোনো অপশন ছিল না।'

​অর্ণব চোখ সরু করে বলল,

'অপশন ছিল না মানে? তোর কাছে? হায় আল্লাহ!একটা রশি পাঠাও। এটাকে পার্সেল করে দেই তুমি উঠিয়ে নাও তোমার কাছে। এও দিন দেখার ছিল আমার? এটাও বিশ্বাস করতে হবে এখন?'

​তাজধীর বিরক্তিতে চ শব্দ করে উঠল। 

'আমি যা করেছি, ভেবেচিন্তেই করেছি। আপাতত আমি পরিবারের কাউকে এ বিষয়ে জানাইনি। সময় আসুক। সঠিক সময়ে আমি নিজেই সবাইকে সবটা খুলে বলব। এবং যথাযথ সম্মান দিয়ে নিজের বাড়িতে তুলে নিয়ে যাব। ততক্ষণ পর্যন্ত এই বিষয় নিয়ে একটা শব্দও যেন তোর মুখ থেকে আর বের না হয়! যদি একটা কথা বাইরে ফাঁস হয়, অর্ণব... তবে তোকে কী করব সেটা তুই ভালো করেই জানিস!'

 অর্ণব ফাঁকা ঢুক গিলল। বুঝে গেল হিটলার বন্ধু তার এবার চরম মাত্রায় সিরিয়াস! আর এক ইঞ্চি এদিক-ওদিক হলে ওর বারোটা বেজে যাবে!
​অর্ণব মুখটা জিপারের মতো বন্ধ করার অভিনয় করে দুই হাত তুলে বলল,

'ওকে ভাই, ওকে! একদম মুখে কুলুপ এঁটে ফেললাম! তোর গোপন বিয়া আর তোর গোপন বউ দুটোই তোর কাছেই থাকুক! তবে, তোকে দিয়ে জীবনও এমন কিছু কল্পনাও করিনি ভাই। হায় আমারই পোড়া কপাল।'

​সেহরোজ বসা ছিল চুপচাপ। এইযে কতক্ষন যাবৎ একাধারে পকপক করে গেল সে তার একটারও দ্বিমত পোষণ করেনি সেহরোজ। যেন তার অস্তিত্বই নেই সেখানে। অর্ণব এবার সেহরোজের দিকে চোখ তুলে চাইল। ছেলেটা এক মনে কোথায় যেন তাকিয়ে আছে। চোখের পলকটা পড়ছেনা অব্দি। অর্ণব ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে চাইল। দেখল মিতালীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলায় ব্যস্ত প্রিয়ন্তী কে। অমনি খুক খুক করে কেশে উঠল অর্ণব। বিস্মিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,

'কিরে শালা! নারী-বিদ্বেষী, চিরকাল নারীদের থেকে একশো হাত দূরে থাকা পারসন! বিয়ে করতে আসতে না আসতেই দেখি মেয়েদের চোখ দিয়ে একদম গিলে খাচ্ছিস ব্যাটা! অন্তত কার দিকে তাকাচ্ছিস, সেই খবর তো রাখ? ভাবি হয় ওটা তোর, শালা!'

আকস্মিক থতমত খেয়ে বসল সেহরোজ। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠল রাগে। চট করে দৃষ্টি সরিয়ে নিঃক্ষেপ করল তাজধীরের পানে। তাজধীর ওর দিকেই ভ্রু কুচকে চেয়ে আছে। সেহরোজ দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। ফ্যাকাসে মুখোভঙ্গি বানিয়ে ধমকে উঠল অর্ণব কে,
'বাল!মুখে যা আসে তাই বলতে হবে? আ আমি কেন ওদিকে দেখব? যত্তসব! ইডিয়েট একটা!'

গজগজ করতে করতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সেহরোজ। থাকল না আর সেখানে। গটগট করে চলে গেল ভিতরের দিকে। সেহরোজ যেতে তাজধীর ও উঠে দাঁড়াল। ফোন বের করে কাউকে একটা মেসেজ করে সরে দাঁড়াল একপাশে। অর্ণবের মাথায় হাত তখন। এখানে আসার পর থেকে কী হচ্ছে না হচ্ছে ওর মাথায় ঢুকছে না কিছুই। ফাহিমের হাতে ছিল একটা জুসের গ্লাস। ওটাই ধুম করে কেড়ে নিলো সে। স্ট্রোতে মুখ লাগিয়ে হতাশ চিত্তে বিড়বিড় করে উঠল,

'যাহ বাবা! এরা শেষমেশ ভায়রা ভাই হয়ে গেল?'

—————

​প্যান্ডেলের অন্য প্রান্তে গোল হয়ে বসেছে কাজিনমহল।পরপর মিতালী হঠাৎ দু-তিনটে হাঁচি দিয়ে উঠল একসাথে,

'হ্যাঁকচ্ছো! হ্যাঁকচ্ছো!'

​প্রিয়ন্তী পাশে দাঁড়িয়ে থালায় মেহেদির বাটি গুছাচ্ছিল। ভাবির পরপর হাঁচির শব্দ শুনে ও তড়িঘড়ি করে মিতালীর পাশে এসে বসল। মিতালীর কপালে হাত রেখে উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল,

'কী হয়েছে ভাবি? তোমার কি ঠান্ডা লাগছে?'

​একহাতে কপালটা চেপে ধরল মিতালী। অস্বস্তি গুটিয়ে বলল,

'তেমন কিছু না। বোধহয় আবহাওয়া চেঞ্জ এর কারণে এমনটা হয়েছে।গলাটাও শুকিয়ে আসছে খুব। একটু পানি খাওয়াতে পারবে?'

​প্রিয়ন্তী ব্যস্ত হয়ে আশেপাশে তাকাল। সব খানেই কোল্ড ড্রিঙ্কস আর ঠান্ডা ফ্রিজড পানির বোতল রাখা। এমনিতেই ঠান্ডা, তারউপর ঠান্ডা পানি খেলে আরো ঠান্ডা লাগবে ভেবেই ও ভিতরের দিকে পা বাড়াল।   

​'তুমি বোসো।আমি এখনই আসছি!'

​শাড়ির আঁচলটা সামলে নিয়ে দ্রুত পায়ে হাওলাদার বাড়ির ভিতরে ছুটল ও। ​বিয়ের বাড়ি উপলক্ষে ভেতরের করিডোর আর ঘরগুলোতে লোকজনের আনাগোনা কিছুটা কম। এমনিতেই এ বাড়িতে মানুষ থাকে হাতেগুনা কয়েকজন মাত্র। যাওয়ার পথে সুমি বেগম কে দেখতে পেল প্রিয়ন্তী। ভদ্রমহিলা ওকে আগে থেকেই চিনেন। ডাকলেন আদুরে গলায়,

'আরেহ প্রিয় মা না? কেমন আছো তুমি? সেইজে ছোটো বেলা দেখেছি, মাশাআল্লাহ কতটা বড় হয়ে গেছো দেখছি।'

'আস্সালামুআলাইকুম আন্টি! ভালো আছেন?'

'এইতো মা আছি আলহামদুলিল্লাহ। কবে এসেছো তোমরা? পাভেল এসেছে? শোনলাম পাভেল নাকি বিয়ে করেছে? বউ এনেছে সাথে?'

'জি আন্টি। ভাবি বাইরেই আছে।'

'আচ্ছা আচ্ছা। তাহলে গিয়ে আমাদের ছেলের বউকে দেখে আসি আগে।'

ভদ্রমহা বেরিয়ে গেলেন। প্রিয়ন্তী এ বাড়ির সবাইকেই চিনে। সুমি বেগম বাবার বাড়িতে আসলে সেহরোজ কখনো আসতো না। দাদা দাদির আদরের ক্ষনি ছিল সেহরোজ। কখনো চোখের আড়াল করতো না তারা। সেহরোজ ছোটো থাকতে সুমি বেগম কেবল দুবার নিয়ে এসেছিলো। একবার দেড় বছর বয়সে, পরের বার সেহরোজ এর যখন চার বছর তখন। এরপর আর আসা হয়নি। যততবার এসেছেন সুমি একাই এসেছেন। দুদিন থেকে আবার চলে গেছেন। 

প্রিয়ন্তী এ বাড়িতে দু একবার এসেছিলো আগে।তাই আন্দাজ করে বাড়ির দরজা পেরিয়ে কিচেনের দিকে অগ্রসর হলো। ​দরজা বরাবরই বাড়ির কিচেনটা। এর মাঝে দুটো রুম পরে। প্রিয়ন্তী ঐসব পেরিয়ে সামনে আগাতেই আচমকা একজোড়া শক্তপোক্তহাত খামচে ধরল ওর হাতের কব্জি। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই টেনে নিলো দ্বিতীয় রুমতার ভিতরে। মুখের ওপর সজোরে বন্ধ হলো দরজাটা। 

​কেউ একজন দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল ওকে। 
​প্রিয়ন্তীর বুক কামারের হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে। ঘরটা আধো অন্ধকারে ডুবে। বাইরে প্যান্ডেলের নানা রঙের মরিচবাতি আর লাইটের আলো জানালা গলে ভেতরে এসে পড়েছে। সেই আবছা আলো-ছায়ার প্রিয়ন্তী নিজেকে আবিষ্কার করল দরজার কাঠের সাথে একদম শক্তভাবে চেপে রাখা অবস্থায়!​ওর দু-পাশে দরজার কাঠে দুটো বিশাল হাত টেকানো। প্রিয়ন্তীকে পুরো নিজের শরীরের বলিষ্ঠ ছায়াতলে বন্দি করে দাঁড়িয়ে আছে বলিষ্ঠদেহি এক পুরুষ অবয়ব!

​ ভুরভুর করে ভেসে ওর নাকে এসে নাকল সেই পুরুষের মিষ্টি ঝাঁঝাল পারফিউমের সুবাস। সেই সুবাস প্রিয়ন্তীর নাসারন্ধ্রে পৌঁছাতেই ওর বুকের ধুকপুকানি দ্বিগুণ হয়ে গেল!​ চোখ বড় বড় করে চাইল উপরে। আবছা আলোয় ফুটে উঠেছে অতীব পরিচিত একটা মুখায়ব। যেই চেহারাটা একটু আগেও ওকে দেখে না দেখার ভান করছিলো। 
​তাজধীর প্রিয়ন্তীর একদম মুখের কাছে ঝুঁকে এল। ওর গরম নিঃশ্বাস এসে আছড়ে পড়ল প্রিয়ন্তীর কাঁপতে থাকা মুখশ্রীর ওপর। লোকটা খানিকটা রুক্ষ কণ্ঠেই বলে উঠল আচমকা,

​'এতটা দুঃসাহস হয় কী করে আপনার?'

​তাজধীরের সুগঠিত চওড়া বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে প্রিয়ন্তী। থমকে গেছে ওর চোখের পলক। শরীরময় অবশ প্রায়। এতটা কাছাকাছি! এতটা কাছাকাছি কখনোই আসা হয়নি দুজনের। ​সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছয় ফুটের ওপর লম্বা এই পুরুষটির কাছাকাছি আসায় জড়সড় করে দিলো ওকে। গলা শুকিয়ে কাঠ! বুকের ভেতরের কম্পন সামলে নিয়ে প্রিয়ন্তী জড়তা মিশ্রিত, কাঁপাকাঁপা অস্ফুট গলায় শুধাল,

​'ম...মানে?'

​তাজধীর ওর দিকে আরও এক ইঞ্চি ঝুঁকে এল। নিস্প্রান গলায় সুধাল,

​'আপনাকে বলেছিলাম না কোথাও গেলে আমাকে ইনফর্ম করতে? করেননি কেন?'

একে একে মনে পড়ল গত এক মাসের ঘটা সমস্ত কাহিনী। সব জড়তা আর মাতাল অনুভূতি এক লহমায় ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। চোখের কোণে জমাট বাঁধল নোনা অভিমানের এক বিশাল পাহাড়!
​এক মাস! পুরো একটা মাস মানুষটা ওকে আলাদা একটা মেসেজ পর্যন্ত পাঠায়নি! শুধু পরীক্ষার দিনগুলোতে মাঝরাতে নিয়ম রক্ষা করার মতো জাস্ট চারটে শব্দের একটা মেসেজ পাঠাতো।সে উত্তর দিলেও সিন করে রেখে দিত। নতুন করে কোনো কথা বলত না। সেই মানুষটা আজ সামনে এসে এতটা কড়া গলায় জবাবদিহি চাইছে?

​প্রিয়ন্তী চিবুক উঁচিয়ে তাজধীরের দিকে তাকাল। দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিলো,

​'সেই সুযোগ দিয়েছেন আপনি?'

'দেয়নি বলছেন?'

​'জি!দেননি।যোগাযোগ করেছেন কি আপনি? যে ইনফর্ম করব?'

​তাজধীর ঝুকে এলো আরেকটু। সময় নিয়ে অবলোকন করল অর্ধাঙ্গিনীর ক্ষোভ মিশ্রিত আদলখানা। প্রিয়ন্তী মুখ অন্যত্র ফিরিয়ে জানাল,

​'একটা মেসেজের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি এতদিন। আর এখন সামনে এসে এমনভাবে চোখ রাঙাচ্ছেন যেন আমি কত বড় অপরাধ করে ফেলেছি! আপনার ওই চার অক্ষরের ফর্মাল মেসেজ ছাড়া তো আর কোনো খোঁজ পাইনি। সারা দিনে-রাতে জাস্ট একবার নিয়ম করে মেসেজ দিতেন। উত্তর দিলে ওখানেই ইতি! আর কোনো খোঁজখবর নেই। সেখানে আমি কেন নিজ থেকে আপনায় জানাবো?'

​'আপনার অনার্সের ফাইনাল এক্সাম চলছিল, প্রিয়ন্তী। আমি যদি রাতে মেসেজে আপনার সাথে অহেতুক উল্টাপাল্টা কথাবার্তা শুরু করতাম, তবে আপনার মন ও ধ্যান-জ্ঞান পড়াশোনা ছেড়ে অন্যদিকে চলে যেত। আর তার ফলে যদি আপনার পরীক্ষা খারাপ হতো, তখন তার পুরো ব্লেমটা আপনি কাকে দিতেন? নিশ্চই এই আমাকে দিতেন?'

​প্রিয়ন্তী তাজ্জব হয়ে তাজধীরের দিকে তাকাল। লোকটার যুক্তির ছাঁচ দেখে ওর শরীর জ্বলছে।

​'বাহ্! চমৎকার লজিক তো আপনার! ব্লেম দিতাম মানে কী? সামান্য একটু খোঁজ নেওয়া, মানুষটা কেমন আছে বা কী করছে সেটা জানা এসব নাকি পড়াশোনা নষ্ট করে? আর সত্যিটা বলুন তো, আপনি কি সত্যিই আমার পড়াশোনার কথা ভেবে চুপ ছিলেন? নাকি অহেতুক কথা এড়াতে চেয়েছেন?'

​'তোহ আপনি ঠিক কী আশা করছিলেন ম্যাম?আপনার সঙ্গে এখন সারা রাত জেগে জেগে মিষ্টি মিষ্টি প্রেম-আলাপ করব?'

'আপনাকে কী আমি বলেছি একবারও আমার সাথে রাত জেগে প্রেম-আলাপ করতে? আপনি সবসময় এমন বাঁকাভাবে কথা বলেন কেন বলুন তো? সাধারণ একটা খোঁজ নেওয়াকেও আপনি কীভাবে এমন বিচ্ছিরি আর নেগেটিভলি নিলেন? কোন সোজা কথা কি আপনার মুখ দিয়ে বের হয় না? সব কিছুতেই কেন নেগেটিভিটি খোঁজেন আপনি?'

'কি করব বলেন? আপনাকে দেখলে আমার পজিটিভ চিন্তাভাবনা গুলো রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে নেগেটিভ মোড়ে সংযোগ হয়ে যায়।'

ঝুকে এলো তাজধীর। রমণীর কান ছুঁই ছুঁই হয়ে কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে আওড়াল ফির,

'ডু ইউ নো ওয়াট নেগেটিভ থটস কাম টু মাই মাইন্ড হোয়েন আই সি ইউ?' (জানেন আপনাকে দেখলে আর কি কি নেগেটিভ চিন্তা আসে?'

শিরশির অনুভূতিরা আষ্টে পিষ্টে চেপে ধরল প্রিয়ন্তীকে। মেয়েটা বরফ হয়ে জমে গেল যেন। লোকটার উষ্ণ নিঃশাস ওর তপ্ত ঘাড়ে উপচে পড়ছে। শক্ত করে শাড়ির আঁচলটা খামচে ধরল রমণী।শ্বাস ফেলল ঘন ঘন।​প্রিয়ন্তীর সেই হতবাক ও বিহ্বল ভাবটা বেশ উপভোগ করল তাজধীর। আরও খানিকটা হেলে পড়ল প্রিয়ন্তীর দিকে।​নিম্মস্বরে বলল,
'না থাক, বাদ দিন। এটা না হয় অন্য কোনো একদিন বলব। তাছাড়া...

আরেকটু ঝুকে এলো মানব। দুজনের মাঝে ব্যবধান কেবল এক ইঞ্চি। প্রিয়ন্তীর কানের লতি ছুঁই ছুঁই হয়ে হাঁসকি টোনে আওড়াল,

'ফোনে কথা বলে মেকি প্রেম করে রাত জাগাতে ইচ্ছুক বা ইন্টারেস্টেড নই আমি। আমি স্বশরীরে সামনাসামনি রাত জাগানোটা প্রেফার করি বেশি। ইউ নো হোয়াট আই মিন?'

​প্রিয়ন্তীর শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে।নিঃশাস হয়েছে এলোমেলো।শুখিয়ে যাওয়া ঠোঁটদুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে কোনো রকম আওড়াল,

'ভা ভাবি পানি চেয়েছে। পানি নিয়ে যেতে হবে আমাকে!'

প্রিয়ন্তী পাশ কাটিয়ে সরে যেতে চাইল এবার। এই লোকটার কাছাকাছি থাকা যাবেনা আর। সরার চেষ্টা করল। কিন্তু তাজধীর সরল না। 

'কিন্তু আমার কথাটা তো এখনো শেষ হয়নি। আপনার শাস্তি তো এখনো বাকি আছে!'

​প্রিয়ন্তী চমকে উঠে মুখ তুলে তাকাল। কাজল-কালো দু-চোখে মাত্রাতিরিক্ত বিস্ময়, আতঙ্ক ফুটিয়ে শুধাল,

'শা-শাস্তি?! কিসের শাস্তি?'

​মোলায়েম গলায় বলল তাজধীর,

'আপনি আমাকে না জানিয়ে, কোনো অনুমতি না নিয়ে হুট করে গ্রামে চলে এসেছেন। তার শাস্তি!'

​প্রিয়ন্তী চিবুক উঁচিয়ে অভিমানী কণ্ঠে জবাব দিল,

'আমি না বলেছি তো কী হয়েছে? আপনি তো আর না জেনে বসে থাকেননি! আপনার গোপন এজেন্ট তো আছেই। তার কাছ থেকে তো ঠিকই প্রতি মুহূর্তের আপডেট পেয়েছেন, জেনে নিয়েছেন আমি কোথায় যাচ্ছি আর কী করছি! সেখানে আমার বলা আর না বলায় কী-ই বা যায় আসে?'

'আমি আমার এজেন্টের কাছ থেকে নয়। সরাসরি আমার ওয়াইফের মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম।'

তাজধীর যেন পন করেই রেখেছে সে প্রিয়ন্তী কে যেতে দিবেনা। ওদিকে প্রিয়ন্তী ভয়ে শেষ। একেতো গ্রাম। তারউপর কেউ যদিও এভাবে দুজন একই রুমে দেখে ফেলে অঘটন ঘটে যাবে তখন। ও তাড়া দিয়ে বলল তখন,

'ভাবি পানির জন্য অপেক্ষা করছে। আমাকে এখন যেতে দিন!'

'যেতে দিতে পারি। তবে এক শর্তে।'

​প্রিয়ন্তী অস্থির হয়ে বলল, 

'কী শর্ত?'

'আজ রাতে আপনি আমার সাথে দেখা করবেন। আমি যেখানে বলব, সেখানে আপনাকে আসতে হবে।'

​কথাটা শোনামাত্রই প্রিয়ন্তীর চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল! সে তাজ্জব হয়ে হাঁ করে তাজধীরের দিকে তাকিয়ে রইল। তব্দা খেয়ে বলল,

'আপনি কি পাগল হয়েছেন?! এটা গ্রাম! হাওলাদার বাড়ি আর সিদ্দিক বাড়ির মাঝখানে কত শত চোখ ঘোরে আপনি জানেন? তা ছাড়া আমাদের এই সম্পর্কের কথা আপাতত মিতালী ভাবি ছাড়া এই দুই পরিবারের আর একজন মানুষও জানে না! যদি কেউ দেখে ফেলে, তবে কী কেলেঙ্কারি হবে চিন্তা করতে পারছেন?'

অটল জেদ চেপে ​ রাশভারী কণ্ঠে জবাব দিল লোকটা,

​'ওসব আমার ওপর ছেড়ে দিন। কে দেখবে আর কে জানবে, সেটা আমি হ্যান্ডেল করব। কিন্তু আপনাকে আসতে হবে। রাজি না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে এই ঘর থেকে এক পা-ও এগোতে দিচ্ছি না।'

​কোনো উপায় না পেয়ে প্রিয়ন্তী শেষমেশ চরম হার মেনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,

'ঠিক আছে, রাজি! আসব। এবার অন্তত পথটা ছাড়ুন, দয়া করে!'

​তাজধীর সরে দাঁড়ালো। সরে দাঁড়াতেই প্রিয়ন্তী এলোমেলো অস্থির হয়ে দরজা খুলে দৌড়ে বেরিয়ে গেল বাইরে। ​প্রিয়ন্তী যেতেই একহাত তুলে কপালের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো টেনে পেছনে ঠেলল তাজধীর। অধর ঘেঁষে পরিলক্ষিত হলো এক প্রশান্তির, তৃপ্তির হাসি। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। অমনি সটান গিয়ে মুখোমুখি হলো অর্ণবের!​অর্ণব দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক তিন-চার হাত দূরে। ডান হাতে তার অরেঞ্জ জুসের অর্ধেক খালি গ্লাসটা। বাঁ হাতটা ঢুকানো ট্রাউজারের পকেটে।

অর্ণবের চোখ দুটো এই মুহূর্তেই মার্বেলের থেকেও বড় আঁকার ধারণ করেছে। মুখটা হাঁ হয়ে ঝুলে আছে।  
​হুট করে অর্ণবকে এভাবে জ্যান্ত সিসিটিভি ক্যামেরার মতো গোল গোল চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাজধীর চরম মাত্রায় ভড়কে গেল!​ মুখের সেই বিজয়ের বাঁকা হাসিটা নিমেষে উবে গিয়ে সেখানে জমা হলো চরম অস্বস্তি।​টি-শার্টের কলারটা সোজা করে টানল সে। এরপর নিজের অজান্তেই অস্ফুট কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠল,

​'শিট...!'
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp