আদিল মির্জাস বিলাভড - পর্ব ৬১ - নাবিলা ইষ্ক - ধারাবাহিক গল্প

আদিল মির্জাস বিলাভড - নাবিলা ইষ্ক
          শীতের রাত এমনিতেই বেশ দীর্ঘ হয়, দিনগুলো হয় তুলনামূলকভাবে ভীষণ ছোটো। অথচ আজ রোযার মনে হলো, এই রাতটা বুঝি কিছুতেই শেষ হতে চায়নি। অস্বাভাবিক রকম দীর্ঘ, অতিমাত্রায়ই বড়ো। এই রাতই বোধহয় ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো রাত। মিনিট বিশেকের বেশি হবে না, চোখ দুটো বুঝেছিল মাত্র। কিন্তু অস্বস্তিতে সেই সামান্য ঘুমটুকুও টিকল না। ধীরে ধীরে রক্তিম চোখ মেলে তাকাল রোযা। চোখ দুটো বোধহয় বেশ ফুলে গেছে, জ্বলছে টনটন করে। মনে হচ্ছে, চোখের পাতার ওপর কেউ ভারী পাথর চাপিয়ে রেখেছে। সঙ্গে সঙ্গে হাত-পা নাড়াতেও পারল না সে। শরীরজুড়ে এমন অবসন্নতা এলো যেন কোনো হলুদ রঙের ট্রাক তাকে পিষে দিয়ে গেছে। ঘুম তো হয়নি-ই, তার ওপর মাথার ভেতরটাও কেমন ভনভন করছে। 

ঘরের সিলিং ফ্যানটা স্তব্ধ হয়ে আছে ঠিক তার মতোই। রোযার শরীরে যদি এতটুকু শক্তিও অবশিষ্ট থাকত, তাহলে এই মুহূর্তে তার প্রথম কাজ হতো পাশে ঘুমিয়ে থাকা লোকটার মাথায় একটা বালিশ ছুড়ে মারা। অসভ্য! বেলেহাজ! বর্বর পুরুষমানুষ একটা! মনে মনে বকতে বকতে নড়াচড়া করতে গিয়ে রোযা বুঝল, পুরুষালি দুটো হাত সিঁকলের মতো তাকে আটকে রেখেছে। তার দুর্বল শরীরটাকে টেনে নিয়ে শক্তপোক্ত বুকের সঙ্গে এমনভাবে পিষে রেখেছে যেন তার হাড়গোড় ভেঙে ফেলবে! 

দুজনের গায়ের ওপর টানা ভারী কালো কম্ফোর্টার। কনকনে শীতের ভোরে কম্ফোর্টারের উষ্ণতার চেয়েও তীব্র উষ্ণতায় তাকে ঘিরে রেখেছে তার পাশের শক্ত শরীরটা। আদিলের স্থির, গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে রোযা। মাথাটা তার বুকে ঠেকানো থাকায়, স্বাভাবিক ছন্দে ওঠানামা করা বুকের গতিটুকুও অনুভব হচ্ছে। ঘটে যাওয়া অঘটন মনে পড়তেই যেমন লজ্জা পেলো রোযা, তেমনি রাগে নাক ফুলা্ল। বুকের ওপর থেকে ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল। আদিলের দিকে চেয়ে চোখ রাঙাতে চাইল সে। অথচ ঘুমন্ত মুখটার দিকে দৃষ্টি পড়তেই কেমন চোখের কুচকুচে কালো মণিতে মুহূর্তেই নেমে এলো একরাশ মুগ্ধতা। মুহূর্তে রোযা আদিলের বুকের ওপর ভর দিয়েই সামান্য উঠে এলো তার মুখের কাছাকাছি। ঘুমন্ত মুখটা আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য।  

চাঁদ ডুবে গেছে। সূর্যও কেবল উঁকি দিতে শুরু করেছে। ভোরের মৃদু আলো এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে আদিলের ঘুমন্ত মুখ। ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে ঠিক আদিল মির্জা বলে মনে হয় না। যে আদিল মির্জা হেঁটে গেলে আশপাশের পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। এখন তাকে শুধুই, সাধারণ একজন আদিল মনে হচ্ছে। শান্ত, স্থির একজন। অবিন্যস্ত চুলগুলো কপালের ওপর ছড়িয়ে থাকায় ভীষণ ইয়ং লাগছে। কথায় কথায় ভ্রুর মাঝখানে যে কঠিন ভাঁজটা পড়ে থাকে, সেটাও এখন নেই। মসৃণ হয়ে আছে কপালটা। লম্বা নাকের ওপর ছোট্ট তিলটাও রোযার চোখ এড়াল না। উল্টো আকর্ষণ কাড়ল তার। কী খাড়া নাক মানুষটার! ঠোঁট দুটো ভীষণ চিকন। 

রোযা শুনেছিল, চিকন ঠোঁটের পুরুষেরা নাকি ভীষণ রাগী হয়, স্বল্পভাষীও হয়। আদিলের ক্ষেত্রে প্রবাদটা যেন অদ্ভুতভাবে মিলে গেছে। রোযা ধীরে ধীরে হাত বাড়াল, কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেবে বলে। কিন্তু হাতটা মাঝপথেই থেমে গেল। নিজের ফর্সা হাতে ফুটে থাকা আঙুলের ছাপগুলো চোখে পড়ল। কী বিভৎস দেখাচ্ছে! মুহূর্তেই কপালের চুল সরানোর কথা ভুলে গিয়ে আদিলের নাকের ডগায় আলতো করে একটা গুঁতো দিতে ইচ্ছে পোষণ করলেও, শেষ পর্যন্ত অবশ্য তা করল না। শুধু আঙুলের ডগা দিয়ে হালকা করে ছুঁয়ে দিলো নাকটা। পরপর একেক করে ছুঁয়ে দিলো পুরো মুখ। একসময় শুধু ড্যাবড্যাব করে দেখল। হঠাৎ পিনপতন নীরবতা ভেঙে গেল ভীষণ গম্ভীর, গভীর, খসখসে এক কণ্ঠে -

'এত কী দেখছো? চোখেমুখে কিছু লেখা?’

সঙ্গে সঙ্গে ভড়কে গেল রোযা। তার কোমরে থাকা হাতটা আরও জোরালোভাবে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। পিষে ধরল পুরুষালি শক্তপোক্ত বুকের সাথে। যেন বুকের খাঁজ ভেদ করে ঢুকিয়ে নেবে তাকে। আদিল ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। সেই ধূসর চোখের গভীর দৃষ্টিতে রোযার লাজ মুহূর্তেই তড়তড় করে বেড়ে গেল। শিরশির করে উঠল সর্বাঙ্গ। এতক্ষণ যা এড়িয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ করেই তাদের অবস্থান, তাদের এতটা কাছাকাছি থাকা, সবকিছু ভীষণ স্পষ্ট হয়ে উঠল। মাত্র একমুহূর্তের জন্য দৃষ্টি সরিয়ে নিলেও, পরক্ষণেই আবার তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে ফেলল রোযা -

‘হুম! আপনি আমার, তাই লেখা।’

এমন জবাব মোটেও আশা করেনি আদিল। গতকাল থেকে ঘটে যাওয়া কোনো কিছুই সে আশা করেনি। অথবা হয়তো কোথাও না কোথাও আশা করেছিল, শুধু ভাবেনি সেসব সত্যিই একদিন বাস্তব হয়ে ধরা দেবে। দুটো কথায় তাকে এমনভাবে বাকরুদ্ধ, অসহায় করে দেওয়ার ক্ষমতা আর কার আছে? এই নারীটি ছাড়া আর কার? আদিলের ভাসা ভাসা চোখদুটোর দৃষ্টি ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল। সেই দৃষ্টির ভার বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারল না রোযা। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা বেপরোয়া ছন্দে ছুটতে লাগল। হঠাৎ ডান হাত দিয়ে সর্বনাশী চোখ দুটো ঢেকে ফেলল সে। চোখ বন্ধ করে ফিসফিসিয়ে বলল -

‘তাকাবেন না। আপনি তাকালে আমি সম্মোহিত হয়ে যাই। এলোমেলো হয়ে পড়ি।’

বিপরীতে সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর এলো না। তাতে রোযার গলায় উঠে আসা হৃৎপিণ্ডটা ধীরে ধীরে যেন নিজের জায়গায় ফিরে গেল। কোনো সাড়া না পেয়ে চোখের ওপর থেকে হাত সরাল সে। আর তখনই বুঝল, আদিল তাকিয়েই আছে একইভাবে, একই গভীরতায়। রোযার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। পরমুহূর্তেই পাগলাটে হাওয়ার তোড়ে ভাসল সে। হাওয়ার বেগে তাকে নিজের শরীরের নিচে পিষে ধরল আদিল। রোযার ভড়কানো চোখমুখে বিরামবিহীন নামা বৃষ্টি্র মতনই চুমুর বর্ষণ নামাল মুখ জুড়ে। সেই চুমু ক্রমশ মুখ থেকে নিচে নামতে থাকল। রোযা সেই অনুভূতি সামলানোর সময়টুকুও পেলো না। 

‘সারাজীবন সম্মোহিত, এলোমেলো হয়ে থাকুন তবে, সামলে নেওয়ার দায়িত্ব আমার।’

রোযা দু-হাতে কোনোরকমে খামচে ধরল বেসামাল আদিলের চওড়া উন্মুক্ত কাঁধ। কিছু বলতে চাইল অথচ সে সুযোগ পেলোই না। তাকে দেওয়া হলো না পালানোর পথ, কিছু বলার সময়। একজোড়া উত্তপ্ত ঠোঁট এসে বন্ধ করে দিলো তার জবান। ঘরের দেয়ালে দেয়ালে ভেসে বেড়াল পূর্ণতার সে তৃপ্ত কণ্ঠ -

'রোজ-আ আজ আমি পরিপূর্ণ। এই জীবন পরিপূর্ণ।'

—————

শীতের রাতটা বিফলে যেতে দেয়নি শান্ত। কিছু গোপনীয় গোয়েন্দা লাগিয়ে দিয়েছে চারিপাশে। চোখকান আজকের জন্য বাকিদের ব্যবহার করেছে। কড়া গার্ডে রেখেছে কটেজ। নিজে মেইন কটেজের পাশের ঘরগুলোর একটায় গিয়ে নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার কিছুক্ষণ পর এলেন আর ক্লান্তও গিয়ে সামিল হয়েছে তার ঘুমের রাজ্যে। হাপুসহুপুস করে ঘুমিয়ে একেবারে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে শান্ত। 

সূর্য ডুবে আছে মেঘের আস্তরণে। আধো অন্ধকার, মনে হচ্ছে সন্ধ্যা নেমেছে। অথচ এখন সকাল নয়টা প্রায়! শান্ত ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নিলো। গার্ড একটা ডেকে জেনে নিয়েছে, বস এখনো বের হয়নি। তাই সুযোগটুকু কাজে লাগাতে স্ত্রীকে ভিডিও কল দিয়েছে। ঝুমুর দিনকে দিন একটা হাড়েবজ্জাত হচ্ছে। ম্যাডামের সঙ্গে ওকে দেখা করতে দেওয়াটাই হয়েছে চরম ভুল। শান্ত বাড়ি ফিরতে পারবে না, এটা ভালো করেই জানে ঝুমুর। তারপরও ইচ্ছে করে খোলামেলা পোশাক পরে ক্যামেরার সামনে এসে তাকে লোভ দেখাবে! এতো সহজ শান্ত শিকদারকে লোভে ফেলা? সে কি বিড়াল, যে মাছ দেখলেই লোল ঝরবে? ছোঁকছোঁক করবে? শান্ত খুব গম্ভীর মুখে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আড়চোখে ক্যামেরার সামনে বসা সুন্দরী নারীটিকে দেখল। তারপর অতিমাত্রায় গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল -

‘দিন দিন অশালীন হচ্ছিস। কাপড় পরলে আবার শরীর দেখা যাবে কেন?’

শান্তর কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করল না ঝুমুর। সুন্দর, নগ্ন পা দুটো তুলে আয়েশ করে বসল। হাতে থাকা আঙুরের থোকা থেকে একটা একটা করে আঙুর মুখে পুরতে পুরতে ভীষণ উদাসীন গলায় বলল -

‘নিজের ঘর, নিজের বরের সামনেও শরীর ঢাকা পোশাক পরতে হবে, তাই তো? বুঝেছি!’

শান্তর চোখ দুটো গিয়ে আটকে রইল সেই দৃশ্যেই। লোভনীয় ঠোঁটজোড়া দেখে বড়ো করে ঢোক গিলল সে। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে চাপা স্বরে বলল -

‘আমি যখন কাছে থাকব, তখন পরলে আপত্তি নেইতো।’

ঝুমুরের চোখে দুষ্টুমি ঝিলিক দিয়ে উঠল। নিজেকে ভীষণ স্বাভাবিক রাখতে চেয়ে বলল -

‘এই কাপড়গুলোসহ শরীর দেখা যায় এমন সব পোশাক আজই পুড়িয়ে ফেলব। ঠিকাছে?'

শান্ত হড়বড়িয়ে তোয়ালে ফেলে ফোনটা হাতে তুলে নিল। গলার সমস্ত গাম্ভীর্য মুহূর্তেই উধাও। বিড়ালের মতো মিউমিউ করে বলল -

‘মজা করছিলাম, টিয়াপাখি। তোমার স্বামী মজা করছে।’

ঝুমুর আড়চোখে ক্যামেরার দিকে তাকাল, 'তাই? পরব তবে?’

বলতে বলতেই ঝুমুরের ফর্সা কাঁধটা আরও খানিকটা উন্মুক্ত হয়ে গেল শান্তর ছোঁকছোঁক দৃষ্টির সামনে। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে দাঁতে দাঁত চেপে বলল -

‘তুই ইচ্ছে করে জ্বালাচ্ছিস, না? ঝুমুর!'

ঝুমুর এমন ভাব করল যেন কিছুই শুনতে পায়নি। গম্ভীর মুখে বলল -

‘কী বললেন? আবার বলুন তো!’

শান্ত সঙ্গে সঙ্গে মুখ সামলে নিল, 'কিছু না, পাখি। আপনি উড়ুন। আমি এসে আপনাকে দানা খাওয়াব।’

ঝুমুরের মুখটা থমকে গেল মুহূর্তে। হুশিয়ারি বাণী টুকু ঠিক বুঝে নিয়েছে! তাইতো চোখ দুটো ছোটো ছোটো করে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সে মুখ ভেংচে দিল। শান্ত স্থির চোখে কিছুক্ষণ স্ত্রীকে দেখে এবার কণ্ঠটা নরম করল -

‘সাবধানে থাকিস। প্রয়োজন ছাড়া বের হবি না। বের হলে গাড়ি নিয়ে যাবি, আমাকে জানিয়ে যাবি। কার্ড দিয়ে এসেছি না? যা ভালো লাগে কিনবি। ওটায় আনলিমিটেড টাকা আছে। ইউ ক্যান বায় এনিথিং!'

মুহূর্তেই ঝুমুরের মুখটা নরম হয়ে গেল। গোলগাল মুখখানা যেন আরও ছোট্ট হয়ে এলো, 'শান্ত শিকদারকে কেনা যাবে আমার জন্য? চব্বিশঘণ্টা আমার সাথে থাকবে!'

শান্তর দৃষ্টি স্তম্ভিত হলো। নির্নিমেষ চেয়ে থাকল অনেকক্ষণ! ঝুমুর এই সুযোগে ঝটপট কল কেটে দিয়েছে। শান্ত ধীরেধীরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করতে করতে পিছু ফিরেই থমকে পড়ল। এতক্ষণ এলেন আর ক্লান্ত বেশ মনোযোগ দিয়ে তার ব্যক্তিগত আলাপ শুনেছে! শান্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সরে যেতে চাইলেই এলেন হো হো করে হেসে গেল। শান্তর পিছুপিছু বেরিয়ে যেতে যেতে বলল -

‘কীরে, ছোঁচা বেড়াল!’

শান্ত বরাবরই বীর পুরুষ সেজে বেড়ায়। কিন্তু স্ত্রী নামের একমাত্র ব্যক্তিটির সামনে মাঝেমধ্যে যে তাকে বিড়ালের ভূমিকাতেও নামতে হয়, সেটা মানতে সে মোটেই রাজি নয়। এর মধ্যেই ক্লান্ত এসে একহাতে শান্তর ঘাড় জড়িয়ে ধরে মিটিমিটি হেসে জিজ্ঞেস করল -

‘বিয়ের পরে সবাই বুঝি এমন বউ ভয় পায়?'

শান্ত অসহায় মুখে তাকাল। কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার ষষ্ঠ ইঙ্গিত কিছু জানাল। মুহূর্তে তার মুখের ভাব বদলে গেল। দ্রুত এসে দাঁড়াল কটেজের সামনে। সকালের সূর্যটা তখন কালো কালো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে। ঘন কুয়াশা না থাকলেও, এখনো হালকা কুয়াশা বিদ্যমান। এই মুহূর্তে কটেজের দরজা খোলার তীব্র শব্দ হলো। এলেন আর ক্লান্তও সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আদিল বেরিয়ে আসতে আসতেই ডাকল -

'শান্ত!'

‘ইয়েস, বস…’

আদিল আশেপাশে তাকাতে তাকাতে জানতে চাইল, ‘ওদিকের কী খবর? এন কোনো খবর পাঠিয়েছে?’

‘হ্যাঁ, গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দেয়ার আছে ওর!’

আদিল একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে এসে দাঁড়াল প্রাঙ্গনের ঘাসের ওপরে। পেটানো উদোম শরীরে শুধু একটা ঢোলা প্যান্ট কোমরে ঝুলে আছে। শান্ত কথা বলতে বলতে আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছে আদিলের শরীরের দিকে। আদিল প্রথমে লক্ষ্য করেনি। কথা বলতে বলতে দেখছিল নতুন গাড়িটা, হঠাৎই শান্তর ওমন কৌতুককর চোখমুখ দেখে ভ্রু তুলে তাকিয়ে বুঝল, এলেন, ক্লান্ত সহ বাকিরাও আড়ে আড়ে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে। 

‘কী হয়েছে?’

বলতে আদিল তাকাল নিজের বুকের দিকে। ফর্সা বুকে নখের আঁচড় পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে চিনচিন করে উঠল পিঠ। পিঠের বিভৎস অবস্থা না দেখেও বুঝল আদিল। গায়ে মাখল না অবশ্য। বরাবরই পাতলা চামড়া তার। অথচ শান্ত হঠাৎ ডাকল -

‘বস!’

আদিল তাকাল, ‘হুম?...’

 ‘সাদা ছিলো বিছানার চাদর…’

আদিল বুঝল না লাইনের মানে। ডান ভ্রু তুলল প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চেয়ে। অথচ পেছনে এলেনের মুখের অবস্থা অবর্ণণীয়। ও আস্তে করে আরও পিছিয়ে সরে গেলো এই শান্ত নামক উজবুকের থেকে। আদিলকে ভড়কে শান্ত গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল হঠাৎ -

‘সাদা ছিলো বিছানার চাদর, কালা হয়ে করলা আদর… 
সাদা ছিল বিছানার চাদর, কালায় করল রে আদর,
ভালো আর থাকতে দিলো না, ও বন্ধুরেএএ….
শাক্ষি রটানো ঘটনা….
ঘটনা এম্নি ঘটে না ও বন্ধুরে,
এক হাতে তালি বাজে না….’

শান্ত গাইতে গাইতে আদিলের চারিপাশে ঘুরে দৌড় লাগিয়েছে। আদিল গম্ভীর কণ্ঠে ডাকল, ‘শান্ত!!’

ক্লান্ত ঠোঁটে ঠোঁট টিপে রেখেছে। এলেন নির্বিকার আছে, তবে কাছ থেকে লক্ষ্য করলে বোঝা যাচ্ছে চোখে হাসির ঝলক। শান্ত দূর থেকে বলল -

‘বস, কিছু মিন করিনি। গানটা মনে পড়ল। মমতাজ ছিল লিজেন্ডারি সিঙ্গার। আই রেসপেক্ট হার! আমি তাকে মনে করি হঠাৎ হঠাৎ।’

আদিল থমথমে মুখে দু কদম বাড়াতেই শান্ত আরও লাফিয়েঝাপিয়ে দশ কদম পিছিয়ে গিয়েছে। আদিল আদেশ ছুঁড়ল -

‘এদিকে আয়!’

শান্ত সামান্য ভড়কাল। জ্বলজ্বলে চোখে আদিলের পেছনে চেয়ে বলল, ‘ম্যাডাম!’

আদিল তাকাল সঙ্গে সঙ্গে পেছনে। কেউ নেই! সামনে তাকিয়ে দেখল শান্ত নেই। হাওয়ার বেগে পালিয়েছে। এলেন আর ক্লান্ত দূরত্ব রেখেছে বস থেকে। মনে মনে গালি দিচ্ছে বদমায়েশটাকে। নিজে পালিয়ে তাদের ফাঁসিয়ে দিয়ে গিয়েছে! অগত্যা এলেন এগিয়ে গেল বসের সামনে। সবকিছুর আপডেট দিতে দিতে পার্সোনাল ফোন বাড়িয়ে দিলো। আনোয়ার খন্দকার কল করেছেন কয়েকবার। তার আজই এসে পৌঁছানোর কথা সেন্টমার্টিন। আদিল কল ব্যাক করে কানে ধরল। কথা বলছিল সে। তখুনি এলেন আস্তে করে আওড়াল -

‘ম্যাডাম আসছেন!’

আদিল কথা বলতে বলতে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। রোযার পরনে একটা নতুন গোলাপি রঙের কারুকার্য বিহীন শাড়ি। শাড়ির ওপরে সাদা চাদর জড়িয়ে রেখেছে। মুখ বাদে শরীরের একটা অংশও দেখা যাচ্ছে না। অথচ আদিলের পিঠে দৃষ্টি পড়তেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল তার। বাজপাখি ট্যাটুর আশেপাশে নখের আঁচড়ের দাগগুলি ভেসে আছে। আদিল অবশ্য সেসব খেয়াল করেনি। কথা শেষ করে ফোন ধরিয়ে দিলো এলেনের হাতে। সে এগিয়ে আসতে আসতে চিন্তিত কণ্ঠে বলল -

‘উঠেছো কেনো?’

কাছাকাছি আসতেই রোযা ঠান্ডা হাতটা ধরল। চো রের মতন কণ্ঠ নামিয়ে চোখ রাঙাল, ‘আপনি এমনভাবে বেরিয়েছেন কেনো?’

আদিল বুঝল, তারপরও না বোঝার অভিনয়। রোযার কোমর জড়িয়ে শুধাল, ‘কেমন ভাবে?’

রোযার গাল দুটো লাল হয়ে উঠছে ক্রমশ। নাক ফুলিয়ে তাকাল তবে কিছু বলতে পারল না। আদিল হাসল বোধহয়। মাথাটা নুইয়ে তাকাল রোযার র ক্তিম চোখ দুটোতে -

‘জানতাম না নিজের সম্পত্তি ভেবে কেউ এভাবে আঁচড়ে নিজের সিলমোহর বসিয়ে রাখবে!’

রোযা চোখ রাঙাল। আদিল হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো সুন্দর চোখ দুটো। রোযা আওড়াল, ‘ওই গাড়িটা কার?’

চোখের সামনে ভীষণ গাঢ় লাল রঙের একটি গাড়ি। গাড়ির নাম অ্যাস্টন মার্টিন ডিবি টুয়েলভ ভোলান্তে। রোযা রাতে খেয়াল করেনি। মাত্র খেয়াল করে সামান্য চমকেছে। আদিলের আন্ডারে কখনো সে লাল রঙের গাড়ি দেখেনি। রোযার ছিলো, যা ভেঙেচুরে দিয়েছিল মানুষটা। রোযার প্রশ্নে আদিলের বেশ স্বাভাবিক উত্তর -

‘তোমার।’

রোযা আশ্চর্য হলো। আদিলের দিকে আড়চোখে চেয়ে ফের গাড়ির দিকে তাকাল। মুখ গোমড়া করে ফেলল -

‘গাড়ি দিয়ে কি করব? আমি কি চালাতে পারব?’

আদিলের হাত চলে গিয়েছে রোযার মাথায়। সিল্কি চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে আওড়াল -

‘কেনো পারবে না?’

রোযার চোখমুখ চকচক করে উঠল মুহুর্তে। প্রত্যাশা নিয়ে তাকাল আদিলের চোখে, ‘চালাতে পারব একা? একা এটা চালিয়ে বেরুতে পারব?’

‘পারবে…’

রোযা আশ্চর্য হতে পারল না। পরপরই আদিলের বাকিটুকু কথা শোনা গেলো, ‘সাথে গার্ড থাকবে।’

রোযার উজ্জ্বল মুখে আঁধার নামল। আদিল বলে, ‘যাও দেখো, পছন্দ হয়?’

রোযা এগুলো গাড়ির কাছে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিল। শান্ত হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এলো কাছে। বলল -

‘ম্যাডাম, দাঁড়ান…..’

রোযার চোখের সামনে শান্ত গিয়ে গাড়ির ভেতরের বোতামে চাপ দিতেই গাড়িটির নরম ছাদটি ধীরে ধীরে পেছনের দিকে ভাঁজ হয়ে নামতে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছাদটা গুটিয়ে গিয়ে গাড়ির পেছনের অংশে মিলিয়ে গেল। ছাঁদ বিহীন খোলা গাড়িটা দেখে রোযার মুখের তাজ্জবতা মিলিয়ে গিয়ে একরাশ আনন্দ ভর করল। ফিরে তাকাল জ্বলজ্বল চোখে। দু গাল ভরে হেসে মুগ্ধ কণ্ঠে বলল -

‘ভীষণ পছন্দ হয়েছে!’

আদিল ঢোক গিলল অগোচরে। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল জ্বলজ্বল করা চোখমুখ। দেখল রোযা গাড়িতে উঠে বসেছে। গাড়ি স্টার্ট করল। গাড়ি ধীরে ধীরে চালিয়ে হঠাৎ জোরে চালিয়ে এগুল অদূরে দাঁড়ানো আদিলের দিকে। শান্ত আর এলেন হকচকিয়ে গেলেও আদিলের দৃষ্টি নড়ল না, শরীর টলল না। রোযা একেবারে আদিলের কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে থামাল গাড়িটা। পরপরই পেছনে নিয়ে আদিলের চারিপাশে গাড়ি দিয়ে রাউন্ড মারল। পুরোটা সময় আদিলের দৃষ্টি ছিলো ড্রাইভিং করা রোযার ওপরেই। 

‘হয়েছে, বেরিয়ে আসোওও!’

রোযা বাইরের দিকে তাকিয়ে আবদার ধরল, ‘সেন্টিমার্টিনের রাস্তায় ঘুরতে যাওয়া যাবে না?’

শান্ত একটা কালো শার্ট, বড়ো ওভারকোট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের বেরুনোর কথা আছে। অথচ ম্যাডামের আবদার শুনেই বুঝল দেরি হবে। ঠিক তাই ঘটল! আদিল শার্ট পরে তার ওপরে অভারকোট জড়াল। সবাইকে ইশারা করে উঠে বসল গাড়িতে। রোযা ড্রাইভিং সিটের পাশে বসেছে। আদিল ড্রাইভিং সিটে বসেছে। ছাঁদ খোলা রেখেই ধীরেসুস্থে কটেজ থেকে বেরুল গাড়িটা। পেছনে আরও চারটা গাড়ি সমানে বেরুল তালে তাল মিলিয়ে। 

—————

সেন্টমার্টিনের সমুদ্রঘেঁষা নির্জন রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে গাঢ় রক্তিম Aston Martin DB12 Volante। গাড়িটির ছাদ নামানো, ফলে ঠান্ডা বাতাসের তীব্রতা ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর। এতো বেলাতেও কুয়াশার অস্তিত্ব পড়ে আছে সেন্টমার্টিন জুড়ে। সমুদ্রটা রাস্তার একেবারে পাশেই। আবছা আলোয় ঢেউগুলো বারবার তীরে এসে আছড়ে পড়ছে। এদিকে মানুষের কোলাহল নেই, কেবল ঢেউয়ের শব্দ আর গাড়ির মৃদু ইঞ্জিনের গর্জন। 

রোযা চারিপাশটা উপভোগ করতে করতে তাকাল স্টিয়ারিং সামলানো আদিলের নির্বাক মুখের দিকে। সচরাচর তাকে ড্রাইভ করতে দেখে না রোযা। আজই বোধহয় প্রথম দেখল। হঠাৎ করেই ভীষণ আরাম করে হেলে বসে নিজের পা দুটো তুলে দিলো আদিলের ঊরুতে। ফর্সা, পায়ের তলায় রক্ত জমাট বাঁধা পাজোড়া পরপরই রুক্ষ একটা হাত এসে ছুঁলো। 

একহাতে স্টিয়ারিং সামলাতে সামলাতে আদিলের অন্য হাত ধরে রেখেছে পাজোড়া। রাস্তা থেকে একমুহূর্তের জন্য দৃষ্টি সরিয়ে রাখল রোযার ওপরে। চাদর সরানোতে দেখা গেল ফর্সা শরীরে বসানো তার সারারাতের সিলমোহর। ছোপছোপ দাগগুলো গলা জুড়ে আছে। রোযা ভুলবশতও দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখল না। তখুনি অদূরে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে আদেশ করল -

‘একটা ডাব এনে দিন তো। সেন্টমার্টিন এলাম, ডাব খেলাম না তা কীভাবে হয়!’

আদিল বিনাবাক্যে থামাল গাড়ি। পেছনে শান্ত, এলেনও দাঁড়িয়ে পড়েছে বেশ দূরত্ব রেখে। দ্রুত বেরিয়ে এসেছে ওরা। এদিকে আসতে চাইলে আদিল হাত উঠাল। হাতের ইশারা পেয়ে সব থমকে আছে। আদিল গাড়ি থেকে নেমে নিজে গিয়ে নিয়ে এলো একটা বড়ো ডাব। ডাবে পাইপ ভরে এগিয়ে দিলো তা। রোযা দুহাতে ডাব নিয়ে পাইপে চুমুক বসিয়ে বলল -

‘কী মিষ্টি!!’

আদিল উঠে বসেছে ড্রাইভং সিটে। গাড়ি চলছে পুনরায়। রোযা একটু খেয়ে ডাবটা বাড়িয়ে ধরল আদিলের মুখের সামনে। বলল -

‘খেয়ে দেখুনতো…..মিষ্টি না?’

আদিল মুখ নামিয়ে চুমুক বসাল। একঢোক গিলল। আওড়াল, ‘আমার খাওয়া সবচেয়ে মিষ্টি ডাব।'

তার ধিমি আওয়াজটুকু সমুদ্রের স্রোতের আওয়াজের সাথে মিশে গেল। রোযার চোখের পাপড়ি কাঁপল। বুঝল তার ভেতরের সব কাঁপতে কাঁপতে ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিক সে যে স্বাভাবিক নেই। এইযে তার ডাব ধরা আঙুলগুলো কাঁপছে, বাজেভাবে কাঁপছে তার হৃৎপিণ্ড। 

—————

হৃদি সারাদিন ছটফট করে কাটিয়েছে। মন খারাপ করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। মা ব্যতীত তার জীবনটাই থমকে পড়ে। কিচ্ছু ভালো লাগে না। দিনও যেতে চায় না। এতো অশান্তি লাগে। এতো খারাপ লাগে। ভীষণ কান্না পায়! এসব বাচ্চাটা কাকে বোঝাবে? ঘুমন্ত অবস্থাতেই রোযার কাপড়চোপড় জড়িয়ে ঘুমানো হৃদি অস্পষ্ট কণ্ঠে ডাকে -

‘মম!’
জবাব এলো সাথে সাথে, ‘জি, মা! ঘুম হয়নি আমার মায়ের?’

ফট করে চোখ মেলে তাকাল বাচ্চাটা। এক চিৎকারে হামাগুড়ি খেয়ে ঝাপিয়ে পড়ল মায়ের শরীরে। রোযা হাসতে হাসতে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে চুমু খেলো মুখ জুড়ে -

‘আমার সোনাপাখিটা! আই মিসড ইউ সো মাচ!’

হৃদি কান্না আটকে বুকে মুখ গুঁজে আওড়াল, ‘আই মিসড ইউ মোওওর।’

‘তাই? দেখি, মুখ দেখিইই!’

হৃদি বাধ্য বড্ড। ছলছল চোখদুটো তুলে তাকাল। রোযা মাথা নুইয়ে চুমু খেলো চোখ দুটোতেও, ‘খাওয়াদাওয়া করছি্লে না কেনো মা?’

‘খিদে পায়নি।’

‘এখনো পায়নি বুঝি?’

হৃদি দুহাতে গলা জড়িয়ে মায়ের কাঁধে পড়ে রইল। ফিসফিস করে বলল, ‘এখন পেয়েছে।’

রোযা হাসে। মেয়েকে কোলে নিয়েই রুম থেকে বেরিয়ে আসে। করিডোর দিয়ে হেঁটে এসে ধরে সিঁড়ি। গ্রাউন্ডফ্লোরে এসেই মেয়েকে নিয়ে বসল ডাইনিংয়ে। নিজ হাতে খাইয়ে দিলো সময় নিয়ে। খেতে খেতে হৃদির রাজ্যের প্রশ্ন -

‘ড্যাড কোথায়?’

‘ড্যাড একটু পরে ফিরবে মা, সে কাজে গিয়েছে।’ 

সেই কণ্ঠের জবাব শুনে হৃদি কিছু না বুঝলেও পেছনে দাঁড়ানো নূরজাহান সামান্য হকচকিয়ে উঠল। কিছু একটা বুঝল মন। আশার আলো দেখল। হৃদিকে খাইয়ে রোযা ওকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। পেছনে নূরজাহান, মরিয়ম বেগমও আছেন।তিতান-থোর শুয়েছিল। রোযাকে দেখেই ঘেউঘেউ করে ছুটে এলো। রোযা বসে দুটোকে আদর করে দিচ্ছিল। ওদের আদর করতে করতে হঠাৎ বলল -

‘যখন আমি ক্যাফেতে কাজ করতাম তখন দুটো কুকুর পেয়েছিলাম। আজ মনে পড়ল ওদের রঙও এমন ছিল। কালো, সাদা। ওরা বেঁচে থাকলে বুঝি এমন বড়ো হয়ে…’

রোযার কণ্ঠ থেমে গেল হঠাৎ। থমকাল দৃষ্টি, আদর করতে থাকা হাত দুটো। তিতান, থোর ঘেউঘেউ করে যাচ্ছে। রোযার মস্তিষ্কে ভাসল সব। ক্যাফে, আদিল মির্জা, তিতান-থোর! মুহূর্তে হৃৎপিণ্ড বিশ্রীভাবে লাফিয়ে উঠল। যা ভাবল তাতে শ্বাসপ্রশ্বাস কিছুক্ষণ চলল না। হঠাৎ চোখ জ্বালাপোড়া করে উঠল। তীব্র অনুভূতিতে দমবন্ধ হয়ে এলো। হৃদি বুঝল না। অবুঝ কণ্ঠে ডাকল -

‘মম! হোয়াটস রঙ?’

মুখ লোকাল রোযা। চোখ দুটো মুছে ফেলল। বড়ো করে শ্বাস টেনে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রাখল। আলতোভাবে শুধু তিতান, থোরের মাথা বুলিয়ে দিলো। পরমযত্নে! 

—————

আদিল ফিরল না সে রাত। ক্লান্ত এসে জানাল, ব্যস্ত আছে। আজ ফিরতে পারবে না। রোযাও লক্ষ্য করেছিল মানুষটা কিছু নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। ব্যস্ততা ফেলে রোযার দব আবদার সে রেখেছে। কখনো না নেই। তারপরও রোযা আনচান মন নিয়ে সারারাত অপেক্ষায় ছিলো, ছটফট করছিল। একবিন্দু ঘুমাতে পারেনি। পরদিন সারাবেলাও তার অপেক্ষারত কেটে গেল। যত সময় যাচ্ছিল অনুভূতিরা তাকে গিলে খাচ্ছিল। তখন বিকেল ঘনিয়ে এই সন্ধ্যা নামবে বলে। রোযা সুন্দর হলুদ রঙের জর্জেটের শাড়ি পরে তৈরি হয়েছে। নূরজাহান এলো রুমের সামনে -

‘ম্যাডাম, স্যার এসেছে।’

রোযা চোখের পলকে উঠে দাঁড়াল চেয়ার থেকে। বেরিয়ে এলো হাওয়ার গতিতে। সিঁড়ির সামনে এসেই দেখতে পেলো মুখটা। একদিন দেখতে পায়নি, অথচ মনে হলো এই মুখ সে কয়েকমাস দেখেনি। আদিল তিন তলার সিঁড়িগোড়ায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে শান্ত, এলেন ওদের সাথে। ভীষণ রুক্ষ চোখমুখের অবস্থা! পরনে স্যুট, অথচ হাতে-পায়ে র ক্তের দাগ। রোযার উপস্থিতি লক্ষ্য করে সেভাবেই তাকিয়েছিল। অথচ রোযার র ক্তিম চোখ দুটো দেখে মুহূর্তে নির্বাক আদিল মির্জা চমকে উঠল সাথে সাথে…. কানে এসে বিঁধল বিচলিত প্রশ্ন। দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে ওঠার শব্দও ভেসে বেড়াল -

'কী হয়েছে? কেঁদেছো কেনো?'
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp