আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ৬২ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
রাহা আরও জড়সড় হয়ে যেতেই অভ্র মৃদু হেসে বলল,

—আর আমার তো যা যা দেখার, সবই দেখা শেষ। এখন এত লজ্জা পাচ্ছিস কেন?

—উফ! চুপ করুন।

অভ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি মেশানো এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে রাহাকে নিয়ে ঝর্ণার নিচে দাঁড় করিয়ে দিল। নিজেও তার পাশেই গিয়ে দাঁড়াল। অভ্রের পরনে কেবল কোমরজুড়ে জড়ানো একটি টাওয়াল।
ঝর্ণার অবিরাম জলধারা দুজনকেই মুহূর্তের মধ্যে ভিজিয়ে দিতে লাগল। প্রথম পানির শীতল স্পর্শ গায়ে লাগতেই রাহা আচমকা চিৎকার করে উঠল। ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে অজান্তেই অভ্রের বাহুতে নখ বসিয়ে ধরল।তার শরীরজুড়ে আগের রাতের ভালোবাসার স্পষ্ট চিহ্নগুলো লালচে হয়ে ফুটে আছে। পানির স্পর্শে সেগুলো আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতেই রাহার মুখ কুঁচকে গেল। অন্যদিকে অভ্রের পিঠের অবস্থাও বেশ করুণ—রাহার নখের আঁচড়ে জায়গায় জায়গায় লালচে দাগ স্পষ্ট।

রাহা ব্যথায় অস্থির হয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠল,

—আহহ! সহ্য করতে পারছি না! জ্বলে যাচ্ছে! বজ্জাত লোক! বলেছিলেন, আমাকে কষ্ট দেবেন না। এগুলো কী, হ্যাঁ? আমি ব্যথায় মরে যাচ্ছি!

—আর তুই আমার কী অবস্থা করেছিস, সেটা দেখ!

বলেই অভ্র ঘুরে দাঁড়াল।

রাহার চোখ মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল। অভ্রের পিঠজুড়ে অসংখ্য আঁচড়ের দাগ—কোথাও লালচে, কোথাও স্পষ্ট নখের চিহ্ন। দেখে বোঝাই যাচ্ছে, রাতের ঘটনায় সেও কম কাণ্ড ঘটায়নি।

রাহা বিস্মিত চোখে জিজ্ঞেস করল,

—এগুলো কীভাবে হলো?

অভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলল,

—কালকে একটা পেত্নী ভর করেছিল। সে-ই এমন করেছে।

রাহা সরল বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলল,

—আসলেই?

অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল,

—নাহ। নকলেই।

রাহা বিরক্ত হয়ে বলল,

—মজা করছেন কেন?

অভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,

—আর তুই গাধামো করছিস কেন? এগুলো তুই করেছিস, গাধী।

পরক্ষণেই তার চোখেমুখে ফুটে উঠল করুণ অনুতাপ। নিজের অজান্তেই সে অভ্রের পিঠের দাগগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল—সত্যিই কি সে এতটা আঁচড়ে দিয়েছে?

রাহার সেই অসহায় মুখটা দেখে অভ্রের ঠোঁটের কোণে আবারও মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
রাহাকে ভালোভাবে শাওয়ার করিয়ে বিছানায় এনে বসিয়ে দিল অভ্র। তারপর নিজে গেল শাওয়ার নিতে। আজ যেন অনেকদিন পর নিজের ভেতরটা সম্পূর্ণ প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে তার। দীর্ঘ সময় ধরে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে রইল সে। শরীরের ক্লান্তি ধুয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনটাও অদ্ভুত এক স্বস্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল।আজ তার ভীষণ শান্তি লাগছে।
প্রচণ্ড শান্তি।যে প্রশান্তি তার জীবনে একমাত্র তার ‘ফেইরি টেইল’ই এনে দিতে পারে—আর কেউ নয়।

অভ্র ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই তার দৃষ্টি আচমকাই থমকে গেল।
রাহা ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। গায়ে জড়ানো পার্পেল রঙের মসৃণ সিল্কের শাড়ি, সঙ্গে সাদা ব্লাউজ—সাদার ওপর ছড়িয়ে থাকা সূক্ষ্ম স্টোনের কারুকাজ যেন তার সৌন্দর্যকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সদ্যস্নাত ভেজা চুলের ডগা বেয়ে টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে জলের বিন্দু, যা এসে মিশছে তার কোমল ত্বকে।

গলার লালচে দাগগুলোও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
অভ্রর চোখ আটকে রইল সেই দৃশ্যেই।
এতটা মিষ্টি, এতটা স্নিগ্ধ লাগছে রাহাকে যে, সদ্য স্নান করা এই মেয়েটাকে তার কাছে মনে হলো—ভোরের শিশিরে ভেজা কোনো জীবন্ত ফুল। যার সৌন্দর্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে শুধু নির্মলতা আর অদ্ভুত এক মায়াবী আকর্ষণ।

আজকের এই সকালটার জন্যই তো অভ্র কতদিন ধরে অপেক্ষা করেছে।
অসংখ্য দিনের লুকিয়ে রাখা আকাঙ্ক্ষা, বুকের গহিনে যত্ন করে পুষে রাখা স্বপ্ন—আজ যেন একে একে বাস্তবতার রূপ নিচ্ছে। অবশেষে সেই দিন এসেছে। ফাইনালি, তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে।এমন একটি সকালই তো সে চেয়েছিল।
প্রতিদিন।

অভ্র দরজায় হেলান দিয়ে নিঃশব্দে কতক্ষণ যে রাহার দিকে তাকিয়ে রইল, নিজেও টের পেল না। দুধে-আলতা মেশানো কোমল শরীর, ভেজা চুল, স্নিগ্ধ মুখ—সব মিলিয়ে রাহাকে দেখে তার ভেতরটা কেমন এক অদ্ভুত, মাতাল করা অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল।কিছুক্ষণ পর আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না অভ্র।নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গিয়ে আচমকাই পেছন থেকে রাহাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। তারপর তার ঘাড়ে মৃদু এক চুম্বন এঁকে নিচু, আবেশমাখা কণ্ঠে বলে উঠল,

“দুধে আলতা গায়ের বরণ, রূপ যে কাঁঞ্চা সোনা,
আঁচল দিয়া ঢাইকা রাইখো, চোখ যেন পড়ে না।
আমি প্রথম দেখে পাগল হইলাম,
মন যে আর মানে না।”

গানটা শেষ হতেই অভ্র রাহাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তার এক হাত গিয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরল রাহার কোমর। কুচিগুলো আলতো করে ঠিক করে দিল, কেননা সেগুলো ভালোভাবে গোঁজা হয়নি।অভ্রর দৃষ্টি থেমে গেল রাহার নাকের সাদা ডায়মন্ডের নাকফুলটায়। সকালের আলোয় ছোট্ট পাথরটা ঝিকমিক করে উঠছে। অভ্র মৃদু হেসে সেই নাকফুলের ওপর টুপ করে একটুখানি চুমু এঁকে দিল।তারপর পাশের ড্রয়ার খুলে বের করল একজোড়া ঝকঝকে স্বর্ণের নূপুর।কোনো কথা না বলে নিচু হয়ে বসে অত্যন্ত যত্নে রাহার এক পায়ে নূপুর পরিয়ে দিল। তারপর অন্য পায়েও। নূপুরের ক্ষীণ ঝংকারে যেন ঘরটাও মুহূর্তে আরও মায়াময় হয়ে উঠল।নূপুর পরানো শেষ করে অভ্র দু’পায়ের ওপর স্নেহভরা দুটি চুমু এঁকে উঠে দাঁড়াল।
অভ্রর এমন অকৃত্রিম যত্ন আর নিঃশব্দ ভালোবাসায় রাহার চোখের কোণে কখন যে অশ্রু জমে উঠেছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।

সে তো এতটাও কল্পনা করেনি।
এতটা আদর...
এতটা যত্ন...
এতটা ভালোবাসা...
মুহূর্তটাকে নিজের স্বপ্ন বলেই মনে হচ্ছিল রাহার। অথচ সেই স্বপ্নের মাঝেও বুকের এক কোণে অজানা এক আশঙ্কা নিঃশব্দে মাথা তুলল।

এত সুখ কি সত্যিই তার কপালে সইবে?
এই ভালোবাসা, এই যত্ন, এই অঢেল মায়া—সবকিছু কি সত্যিই তার ভাগ্যে লেখা আছে?

ঠিক তখনই অভ্র কোনো কথা না বলে রাহাকে ধীরে করে চেয়ারে বসিয়ে দিল।হেয়ার ড্রায়ারটা বের করল। তারপর রাহার পেছনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ধৈর্য আর মমতায় তার ভেজা চুলগুলো শুকিয়ে দিতে লাগল।আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছে অভ্র, আর হেয়ার ড্রায়ারের উষ্ণ বাতাসে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি ভেজা গোছা।রাহা নিঃশব্দে বসে রইল।চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুগুলো এবার আর আটকে রাখতে পারল না।

কারণ, কখনো কখনো ভালোবাসা শব্দে প্রকাশ পায় না—
প্রকাশ পায় এমন কিছু ছোট ছোট যত্নে,
যেগুলো সারাজীবন বুকের ভেতর অমলিন হয়ে থেকে যায়।

এতক্ষণে তাদের খাবারও এসে পৌঁছাল।
অভ্র খাবারের প্যাকেটগুলো নিয়ে টেবিলের ওপর গুছিয়ে রাখল। এরপর আর সময় নষ্ট না করে নিজেও দ্রুত পোশাক বদলে নিল। আজ তাদের আবার খানবাড়িতে ফিরতে হবে—তাই রওনা দেওয়ার প্রস্তুতিও সেরে নিতে হবে।

অভ্র খাবারগুলো সামনে এনে বসতেই রাহাও উঠে এগিয়ে এল। অভ্র কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল—মেয়েটা এবার কী করতে চাইছে?

কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখল, একটা তোয়ালে হাতে নিয়ে রাহা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
অভ্র তখন ডিভানে বসা। রাহা নিঃশব্দে তার দুই পায়ের মাঝখানে এসে বসে পড়ল। তারপর অত্যন্ত যত্নে অভ্রের ভিজে, লেপ্টে থাকা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে আলতো হাতে মুছতে লাগল।

মৃদু অভিমান মেশানো কণ্ঠে বলল,

—আমার খেয়াল তো ঠিকই রেখেছেন। নিজের কোনো খেয়াল আছে আপনার?

অভ্র কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল। রাহার কোমল যত্নে তার মুখের কঠোরতা ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল। চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠল একরাশ মুগ্ধতা।

—আমার খেয়াল রাখার জন্য তো তুই আছিস, জান।

কথাটা বলেই অভ্র হ্যাঁচকা টানে রাহাকে নিজের উরুর ওপর বসিয়ে নিল। তারপর তার গলায় ফুটে থাকা নিজের দেওয়া বেদনাময় ভালোবাসার চিহ্নগুলোর ওপর অত্যন্ত নরমভাবে ঠোঁট ছোঁয়াতে লাগল।অভ্রের এমন আচরণে রাহার শরীরজুড়ে আবারও শিহরণের কাঁপন বয়ে গেল। সে অপ্রস্তুত হয়ে অভ্রকে আঁকড়ে ধরতেই অভ্রও তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিল।

কিন্তু রাহার শরীরের জখমগুলোর দিকে চোখ পড়তেই অভ্রের দৃষ্টিতে ধীরে ধীরে বদল এল। কোমল স্পর্শগুলো ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছিল; নিজের আবেগের লাগামটাও যেন ধীরে ধীরে তার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই নিজের হুঁশ ফিরে পেল অভ্র।
রাহা দ্রুত তাকে থামিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,

—অভ্র ভাই, আর পারব না। প্লিজ, চলুন আগে খেয়ে নিই। পেট ব্যথা করছে।

কথাটা শুনে অভ্র থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত রাহার দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে নিজেকে সামলে নিল।
রাহার এমন কথায় অভ্র মুহূর্তেই থেমে গেল। নিজের আবেগকে সংযত করে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে বলল,

—ফার্স্ট টাইম, তাই একটু... না, না—বেশিই বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিলাম, জান। আমাকে এভাবে হ্যান্ডেল করার জন্য... আই অ্যাম রিয়েলি গ্রেটফুল টু ইউ।

তারপর রাহার দিকে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে বলল,

—চল, আগে খেয়ে নে। তারপর পেইনকিলার খেয়ে নিবি।

কিন্তু রাহাকে মোটেও স্বাভাবিক লাগছে না। মুখটা কেমন বিবর্ণ, শরীরটাও নেতিয়ে পড়েছে। অভ্রের মনে হলো, জ্বরও চলে আসতে পারে।
রাহার এমন দুর্বল অবস্থা দেখে অভ্র আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। তাকে টেনে নিজের কোলে তুলে নিল। তারপর এক হাত দিয়ে মাথাটা আলতো করে বুলিয়ে দিতে দিতে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,

—অনেক বেশি খারাপ লাগছে, জান?

রাহা কোনো উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। তার শরীরটা যেন সম্পূর্ণ অবসন্ন হয়ে অভ্রের বুকে এলিয়ে পড়েছে।
রাহাকে এই অবস্থায় রেখে বাড়ি কিংবা অফিস—কোনোটাতেই যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সমস্ত ব্যস্ততা, কাজকর্ম, দায়িত্ব—সবকিছুর ঊর্ধ্বে এখন রাহার এই দুর্বল শরীরটাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অভ্র দ্রুত ফোনটা হাতে তুলে ডাক্তারকে কল করল।

ডাক্তার রাহাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতে হঠাৎই অদ্ভুত দৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকালেন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিতেই অভ্রের ভ্রু কুঁচকে গেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত স্বরে বলে উঠল,

—আপনি ডাক্তার হয়ে আমার বউকে না দেখে আমাকে চোখ দিয়ে ইভটিজিং করছেন কেন?

ডাক্তার যেন কথাটা শুনে রীতিমতো থ হয়ে গেলেন।

—ছিঃ! কী সব বলছেন? আমি তো অবাক হচ্ছি—মেয়েটার কী হাল করেছেন আপনি! এতটা ডেসপারেটও কেউ হয়?

অভ্র সঙ্গে সঙ্গে তেড়ে উঠল,

—কেন? আপনার হাজব্যান্ড কি আপনাকে সাজিয়ে রেখেছিলেন নাকি? জ্বর আসছে—মেডিসিন দেন, শেষ। এত কথা বলেন কেন? যত্তসব!

ডাক্তারের মুখের ভাব একেবারে বদলে গেল। তিনি মনে মনে শুধু বললেন,

এ কেমন লোকরে বাবা!

অভ্র অবশ্য নির্বিকার। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল—

—আমি এমনিই । এখন মনে মনে যা বলার, বলে নিন। তারপর ওষুধ দিয়ে বিদেয় হন।

কথাটা বলেই হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে আবার বলল,

—আর ওয়েট! আরেকজন আছে। তাকেও একটু দেখে যাবেন তো।

বলেই অভ্র ঠোঁটের কোণে এক চওড়া, রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলল।
মনে মনে তখন তার একটাই ভাবনা— প্ল্যান একদম সাকসেসফুল!

—————

অভ্র রাহাকে যত্ন করে খাইয়ে, ওষুধও খাইয়ে নিল। তারপর তাকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে দোলনায় এসে বসল। দোলনাটা ধীরে ধীরে দুলতে লাগল, আর অভ্র মমতাভরা আঙুলে রাহার চুলের ভেতর বিলি কেটে দিতে লাগল।অভ্রর বুকের উষ্ণ আশ্রয়ে আর সেই শান্ত, ছন্দময় দোলনায় রাহার সমস্ত ক্লান্তি যেন ধীরে ধীরে গলে গেল। একসময় প্রশান্তির আবেশে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। কিছুক্ষণ পর নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ল সে।রাহার ঘুমের মায়ায় অভ্রর চোখেও কখন যে ঘুম নেমে এলো, সেও টের পেল না।প্রায় তিন ঘণ্টা পর দুজনের ঘুম ভাঙল।

এতক্ষণ অভ্র রাহাকে পাঁজাকোলা করে নিজের বুকের সঙ্গে একান্ত আপন করে জড়িয়ে রেখেই দোলনায় বসে ছিল। রাহার ঘুম ভাঙতেই তাকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা ছাদে চলে গেল অভ্র।
ছাদের খোলা আকাশের নিচে রাহাকে বুকের মধ্যে আগলে নিয়ে ধীর পায়ে পুরো ছাদজুড়ে হাঁটতে লাগল সে। পাশাপাশি চলতে লাগল তাদের অবিরাম গল্প—কখনো হাসি, কখনো দুষ্টুমি, কখনো নিছকই দুজনের আপন কথোপকথন।

আর রাহা?

অভ্রর বুকের ওপর বিড়ালছানার মতো গুটিসুটি হয়ে পড়ে থেকে তার প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনছে। মাঝেমধ্যে অভ্রর কোনো কথায় খিলখিল করে হেসে উঠছে সে।এই নির্মল, প্রাণখোলা হাসিটাই তো অভ্র এতক্ষণ ধরে মিস করছিল।রাহার মুখে এই হাসি দেখার আকাঙ্ক্ষাতেই যেন তার সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত অস্থিরতা।হাঁটতে হাঁটতেই একসময় রাহা মৃদু স্বরে বলে উঠল,

— আমি বাড়ি যেতে চাই।

অভ্র এক মুহূর্তও দেরি করল না। রাহাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে আগলে নিয়ে মৃদু হেসে বলল—

— আচ্ছা, যাওয়া যাক।

—————

সকাল সকাল বুকের ওপর অস্বাভাবিক এক ভার অনুভূত হতেই মাহাদী ধড়মড় করে চোখ মেলে তাকাল।চোখ খুলেই যা দেখল, তাতে মুহূর্তের মধ্যেই তার সমস্ত ঘুম যেন উধাও হয়ে গেল—আয়াত তার বুকের ওপর গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে!

মনে হলো, আচমকাই যেন ৪৪০ ভোল্টের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছে মাহাদী। ঝটকা খেয়ে সে প্রায় ছিটকে উঠে বসল।নিজের এমন অবস্থা, তার ওপর আয়াতের এভাবে নির্দ্বিধায় নিজের সঙ্গে লেপ্টে থাকা—সব মিলিয়ে মাহাদীর মাথায় যেন মুহূর্তেই আকাশ ভেঙে পড়ল।

এটা কীভাবে হলো?

প্রশ্নটা মাথায় আসতেই মাহাদী দুহাত দিয়ে নিজের কপাল চেপে ধরল। মাথাটা এমনিতেই ভার হয়ে আছে, তার ওপর সকালের এই অপ্রত্যাশিত বিপত্তি যেন অস্বস্তিটাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।
কোনোমতে আয়াতকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে মাহাদী আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সোজা পা বাড়াল ওয়াশরুমের দিকে।
এই মুহূর্তে তার একটাই প্রয়োজন—একটা দীর্ঘ, ঠান্ডা শাওয়ার।প্রায় আধাঘণ্টা ধরে ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়ে রইল মাহাদী। মাথার ভেতরের সমস্ত অস্বস্তি, অস্থিরতা আর বিরক্তি যেন ঠান্ডা পানির ধারার সঙ্গে ধুয়ে ফেলতে চাইছে।
অবশেষে শাওয়ার শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এল সে।

কিন্তু ঘরে পা রাখতেই আবারও থমকে গেল।

আয়াত বিছানার ওপর বসে আছে। একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে—চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির, যেন মাহাদীর প্রতিটি নড়াচড়া গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছে।

মাহাদী কয়েক সেকেন্ড নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ভ্রু কুঁচকে তাকাল আয়াতের দিকে।

মাহাদী আর কোনো কথা না বাড়িয়ে এদিক-ওদিক দৃষ্টি বুলিয়ে দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিতে লাগল। পোশাক পরা শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে আয়াতের কণ্ঠ ভেসে এল—

— কোথায় যাচ্ছেন এত সকালে?

মাহাদী এক মুহূর্তের জন্যও থামল না। বরং এমন এক নির্বিকার ভঙ্গি করল, যেন আয়াতের সঙ্গে তার আদৌ কোনো পরিচয় নেই।
শীতল কণ্ঠে বলল,

— তুমি কে? এখানে কী করছ?

কথাটা বলেই আর এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল মাহাদী।
আয়াত বিস্ফারিত চোখে কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে কপাল কুঁচকে এল।
এমন করল কেন?

সত্যিই কি মাহাদী তাকে চিনতে পারছে না? নাকি ইচ্ছে করেই না চেনার ভান করছে?
মনে হলো, লোকটা যেন তাকে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষ হিসেবেই দেখল!

কিন্তু আয়াতও কম যায় না। মাহাদী এখন ভার্সিটিতে যাবে—সেটা সে ভালোভাবেই জানে। তাই আর সময় নষ্ট না করে নিজের মাথার ভেতর দ্রুত একটা পরিকল্পনার ছক এঁকে ফেলল।
এই লোকটার স্মৃতিশক্তি কীভাবে ফিরিয়ে আনতে হয়, সেটা আয়াত বেশ ভালোভাবেই জানে।
ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে সেও ফ্রেশ হতে চলে গেল।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

— ভিতরে আসুন।

অনুমতি পেয়ে দরজা ঠেলে একজন ডাক্তার ভেতরে প্রবেশ করলেন।

আয়াত তাকিয়েই কিছুটা অবাক হয়ে বলল,

— আপনি?

ডাক্তার বিনীতভাবে উত্তর দিলেন,

— জি। অভ্র স্যার আমাকে পাঠিয়েছেন।

আয়াতের ভ্রু কুঁচকে গেল।

— কেন?

— আপনাকে চেক করতে।

কথাটা শুনে আয়াত আরও অবাক হয়ে গেল।

— মানে? আমার আবার কী হয়েছে? আমি তো একদম ঠিক আছি।

ডাক্তার এবার বিষয়টা পরিষ্কার করে বললেন,

— না, মানে... রাহা ম্যামের জ্বর এসেছে। তাই অভ্র স্যার আপনাকে চেক করতে পাঠিয়েছেন।

রাহার জ্বর এসেছে শুনেই আয়াতের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। মুহূর্তেই কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল।

— রাহার জ্বর এসেছে?

কথাটা নিজের মনেই যেন পুনরাবৃত্তি করল সে। তারপর ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বলল—

— আমি ঠিক আছি। আপনি যান। ধন্যবাদ।

ডাক্তার আর কিছু না বলে মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

দরজা বন্ধ হতেই আয়াতের মুখের চিন্তার ছাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

রাহার জ্বর...
অন্যদিকে মাহাদীর অস্বাভাবিক আচরণ...
দুটো বিষয়ই যেন তার মাথার ভেতর একসঙ্গে ঘুরপাক খেতে লাগল।

—————

রিসোর্ট থেকে বের হওয়ার সময়ই হঠাৎ দেখা হয়ে গেল দুই বন্ধুর।রাহাকে গাড়ির ভেতর বসিয়ে রেখে অভ্র বাইরে বেরিয়ে এল। মাহাদীকে সামনে পেতেই একবার পা থেকে মাথা পর্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে নিল।
তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,

— কিরে? তোর ব্রত শেষ হলো তো? কেমন ছিল ফার্স্ট নাইট, ব্রো?

মাহাদী সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিতে মুখ শক্ত করে ফেলল।

— জাস্ট শাট আপ, অভ্র!

অভ্র যেন তার রাগে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং আরও খোঁচা দিয়ে বলল,

— তুই চুপ শালা! ভালোবাসিস না, ভালোবাসিস না বলেও শেষমেশ ঠিকই বাসর রাতে বিড়াল মেরে দিলি!

মাহাদীর চোখ-মুখ মুহূর্তেই রাগে কঠিন হয়ে উঠল।

— সব তোর প্ল্যান ছিল। তুই ইচ্ছা করেই পানিতে ড্রাগ মিশিয়েছিলি!

অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

— এর জন্যই তো তোর টেস্টোস্টেরন হরমোনে নাড়া দিয়েছে!

কথাটা বলেই অভ্রর দৃষ্টি হঠাৎ মাহাদীর পেছনের দিকে চলে গেল।

— তা, আয়াত ঠিক আছে তো? তাকে রেখে কোথায় যাচ্ছিস?

আয়াতের নাম শুনতেই মাহাদীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। রাগে দুহাত মুঠো করে ফেলল সে।
মনে মনে শুধু একটাই কথাই ঘুরপাক খেতে লাগল—

কেন যে কালকে ওই পানিটা খেতে গেলাম!

অভ্রর সাজানো পরিকল্পনায় পা দেওয়ার জন্য নিজের ওপরই তখন ভীষণ বিরক্ত লাগছিল তার।
অভ্র আগেই সবকিছু নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করে রেখেছিল। তাদের রুমে রাখা দুই গ্লাস পানিতেই গোপনে ড্রাগ মিশিয়ে দিয়েছিল সে।
আয়াত তখন ওয়াশরুমে যাওয়ার সুযোগে মাহাদী তীব্র তৃষ্ণায় প্রথম গ্লাসটা তুলে এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলেছিল। কিন্তু তাতেও তৃষ্ণা মেটেনি। ফলে কোনো কিছু না ভেবেই দ্বিতীয় গ্লাসের পানিটাও সাবাড় করে দেয়।দুটো গ্লাসের পানিই একসঙ্গে খেয়ে ফেলার কারণেই মাহাদীর শরীরে নেশার প্রভাব এত দ্রুত ও তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

অন্যদিকে আয়াত পুরোপুরি হুঁশে ছিল। অভ্রর পরিকল্পনার আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে সেও তখন সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল।

মাহাদী বিরক্তি চেপে বলল,

— জানি না কোথায়। সর, আমি ভার্সিটিতে যাব।

অভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

— মেয়েটার কোনো খেয়াল না রেখেই তুই ভার্সিটিতে যাচ্ছিস?

মাহাদী বলল,

— আই ডোন্ট কেয়ার।

কথাটা ছুড়ে দিয়েই গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট করল সে। পরমুহূর্তেই গাড়ি নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
অভ্র কিছু বলার আগেই দেখতে পেল, আয়াতও রুম থেকে বেরিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

আয়াত কাছে এসেই উৎকণ্ঠিত স্বরে বলল,

— রাহা নাকি অসুস্থ?

অভ্র সংক্ষেপে উত্তর দিল,

— হুম, কিছুটা। গাড়িতেই আছে। বাড়ি যাব। চলো, তোমাকেও নামিয়ে দিই। তোমার গুণধর স্বামী তো ভার্সিটিতে চলে গেল।

আয়াতের চোখে মুহূর্তেই এক ঝিলিক খেলে গেল।
শান্ত গলায় বলল—

— আমি বাসায় যাব না, ভার্সিটিতে যাব।

আয়াত এবার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
— একজনের স্মৃতি ফেরানো খুব দরকার, অভ্র ভাইয়া।

আয়াতের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে অভ্রর ঠোঁটেও ধীরে ধীরে রহস্যময় এক হাসি ফুটে উঠল।
সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বলল,

— ঠিক আছে। চলো, আমি নামিয়ে দিচ্ছি।

—————

ভার্সিটিতে ততক্ষণে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে।
কিন্তু আয়াতের মাথায় তখন অন্য চিন্তা। মাহাদীকে আজ শিক্ষা দিতেই হবে।রাগে-ক্ষোভে দ্রুত পা চালিয়ে প্রথমে স্টোররুমে ঢুকে একটা মাইক হাতে তুলে নিল আয়াত। তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা চলে এল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠের মাঝখানে।মাইকটা হাতে নিয়ে চারপাশে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল,

— কে কোথায় আছেন, সবাই একটু মনোযোগ দিয়ে শুনুন!
তার কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই পুরো মাঠজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো।

— আমার স্বামী, আমার সোল পার্টনার, আমার বেড পার্টনার—মিস্টার আইজান শিকদার মাহাদী! যার বর্তমানে মেমোরি লস হয়েছে। কোনো সহৃদয় ব্যক্তি যদি তাকে কোথাও দেখতে পান, তাহলে দয়া করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন!

ঘোষণাটা শেষ হতেই চারপাশে যেন মুহূর্তের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল।
ক্লাসরুম থেকে একে একে বেরিয়ে আসতে লাগল শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও কৌতূহল সামলাতে না পেরে মাঠের দিকে এগিয়ে এলেন।কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুরো মাঠ ভর্তি হয়ে গেল শিক্ষক-শিক্ষার্থী আর কৌতূহলী দর্শকে।
আর মাঠের মাঝখানে মাইক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা আয়াতের মুখে তখন একটুও লজ্জা নেই—বরং চোখেমুখে ফুটে আছে দৃঢ় সংকল্প।

— সকাল সকাল এই মেয়েটা কীসব বলছে এসব!

চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থী ফিসফিস করে উঠল।

— কালকে শুধু একটা ক্লাস জেনেছে, আর আজকে পুরো ভার্সিটিকে জানিয়ে দিচ্ছে! তাও আবার এভাবে মাইক হাতে নিয়ে!

কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ শিক্ষার্থীদের ভিড়ের মধ্যে নড়াচড়া শুরু হলো।মাহাদী এসে গেছে।
তাকে আসতে দেখেই শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুপাশে সরে গেল। মুহূর্তের মধ্যে মাঠের মাঝখানে তৈরি হলো সরু এক পথ।
মাহাদী দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে আসতেই আয়াত মাইকটা নামিয়ে রাখল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে তার দিকে ছুড়ে দিল একটা ফ্লাইং কিস।

আয়াত নির্বিকার ভঙ্গিতে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি স্বরে বলে উঠল,

— আপনি কে, স্যার?

একটু থেমে ভীষণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আবার বলল—

— আমার হাজবেন্ডের খোঁজ দিতে এসেছেন?

মাহাদী স্থির দৃষ্টিতে আয়াতের দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই দৃষ্টি এতটাই কঠোর, এতটাই ধারালো যে মুহূর্ত আগেও যারা ফিসফিস করে কথা বলছিল, তারাও আচমকা মুখে কুলুপ এঁটে ফেলল।চারপাশে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা।
মাহাদীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে থাকার পর অবশেষে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,

— একদম চুপ! কী শুরু করেছিস তুই?

তার কণ্ঠের তীব্রতায় চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হলো।

— তোর কোনো আইডিয়া আছে, বেয়াদব মেয়ে, তুই কী করছিস?

আয়াত অবশ্য এতটুকুও বিচলিত হলো না।
বরং ঠোঁটের কোণে সেই দুষ্টু হাসিটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।আয়াত সঙ্গে সঙ্গে মুখটা গোমড়া করে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

— একি! আমাকে শুধু শুধু বকছেন কেন, স্যার? আমি তো আমার মেমোরি লস হওয়া জামাইকে খুঁজতেই এসেছিলাম।
রাতের কাজ শেষ— আর সে কিনা সকালে আমাকে দেখেও চিনতে পারছে না! এটা কোনো কথা হলো? আপনি নিজেই বলুন!

মাহাদী কপাল কুঁচকে একবার চারপাশে তাকাল। এতক্ষণে মাঠজুড়ে জমে থাকা কৌতূহলী ভিড়ের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,

— সবাই ক্লাসে যান। এখনই!

মাহাদীর কণ্ঠের দৃঢ়তায় মুহূর্তেই নড়েচড়ে বসল সবাই। অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকারাও দ্রুত শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ক্লাসরুমে পাঠিয়ে দিলেন।
ভিড় কিছুটা ফাঁকা হয়ে গেলে ভার্সিটির সিনিয়র প্রফেসর আয়াতকে ইশারায় কাছে ডাকল।

— এই মেয়ে, তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি নতুন। এসব কী হচ্ছে, হ্যাঁ? এখানে এসে এভাবে মাইক হাতে নিয়ে কী শুরু করেছ?

আয়াত একেবারে নির্লজ্জ ভঙ্গিতে মিষ্টি হেসে মাথা নাড়ল।

— জি স্যার, আমি নতুন।

একটু থেমে চোখ টিপে যোগ করল—

— না না... নতুন বউ!

মাহাদীর কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো।

আয়াত তখন তার দিকে ইশারা করে একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল—

— তাও আবার এই যে, এই মানুষটার!

কথাটা বলেই দুষ্টুমি মেশানো হাসি ফুটল তার ঠোঁটে।

— কালকে আমাদের ডট ডট.... রাত গিয়েছে।

শেষ কথাটা ইচ্ছে করেই অসম্পূর্ণ রেখে দিল আয়াত।

মাহাদীর মুখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।

আর আয়াত?

তার মুখে তখন এমন এক নিষ্পাপ অভিব্যক্তি, যেন সে একেবারেই নির্দোষ!

— ডট ডট মানে কী?

পাশ থেকে আরেকজন ম্যাডাম কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করতেই আয়াত মুখ খোলার আগেই আরেকজন ম্যাডাম মৃদু স্বরে বলে উঠলেন,

— মানে... স্যার, বাসর রাত।

কথাটা শুনতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিনিয়র শিক্ষক আচমকা কেশে উঠলেন। চারপাশের পরিবেশটাও মুহূর্তে কেমন অস্বস্তিকর নীরবতায় ঢেকে গেল।
সিনিয়র শিক্ষক এবার মাহাদীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন—

— মিস্টার মাহাদী, আপনি বিয়ে করেছেন?

একটু থেমে ভ্রু কুঁচকে আবার বললেন,

— যদিও কালকে কিছু কানাঘুষা শুনেছিলাম। ভেবেছিলাম আজ আপনাকেই জিজ্ঞেস করব। কিন্তু এখন তো নিজের চোখেই সব দেখে ফেললাম!

তারপর আয়াতের দিকে ফিরে কঠোর অথচ খানিকটা বিব্রত স্বরে বললেন,

— এই মেয়ে, তুমি তোমার স্বামীর মান-সম্মান এভাবে প্রকাশ্যে ডুবিয়ে দিচ্ছ কেন?

আয়াত সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদী ভঙ্গিতে আঙুল তুলে মাহাদীর দিকে দেখিয়ে বলল,

— আমি আয়াত, স্যার। মিসেস আইজান শিকদার মাহাদী। আমার একটা নাম আছে! আর আপনারা এই “স্যার”কে জিজ্ঞেস করুন—সকাল হতে না হতেই আমাকে চিনতে পারে না কেন? রাতে তো ঠিকই কাছে...

কথাটা শেষ করার আগেই মাহাদীর বজ্রকঠিন ধমক চারপাশ কাঁপিয়ে দিল—

— আয়াত!

তার সেই এক ধমকেই উপস্থিত স্যার-ম্যাডামরা পর্যন্ত চমকে উঠলেন। মুহূর্তে পুরো পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।মাহাদী দ্রুত আয়াতের দিকে এগিয়ে এসে তার হাত শক্ত করে চেপে ধরল।

দাঁতে দাঁত চেপে নিচু স্বরে বলল,

— বাড়ি চল।

তারপর সিনিয়র শিক্ষকের দিকে ফিরে মাহাদী খানিকটা অসহায় ভঙ্গিতে বলল,

— স্যার, আজকের মতো ম্যানেজ করে নিন। কাল থেকে রেগুলার থাকব। প্লিজ।

সিনিয়র শিক্ষক কিছুক্ষণ মাহাদীর দিকে, তারপর আয়াতের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আর আয়াত?মুখে তখনও সেই দুর্বিনীত, বিজয়ী হাসি—যেন পুরো ভার্সিটিতে নিজের পরিচয় দেওয়ার মিশন সে সফলভাবেই সম্পন্ন করে ফেলেছে।

তখন সেই সিনিয়র শিক্ষকও গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,

— আপনি একজন যথেষ্ট বুঝদার মানুষ, মিস্টার মাহাদী। আশা করি আপনার স্ত্রীকেও বুঝিয়ে-শুনিয়ে সামলে নিতে পারবেন। আজ যেহেতু ওর প্রথম বার এমন করলো, তাই এবারের মতো আমরা তাকে ছাড় দিলাম।

মাহাদী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নত করে বলল,

— ওকে, স্যার।

আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আয়াতকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল সে।
কিন্তু দু’পা যেতেই আয়াত হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করে উঠল।

— ছাড়ুন আমাকে! আমি আপনাকে চিনি না!

মাহাদী দাঁত চেপে ধৈর্য ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু আয়াতের অবিরাম ছটফটানিতে শেষ পর্যন্ত তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
আর কোনো উপায় না দেখে আচমকাই আয়াতকে কাঁধে তুলে নিল সে।

— এই! কী করছেন আপনি? নামান আমাকে!

আয়াত কাঁধের ওপর থেকে হাত-পা ছুড়ে প্রতিবাদ করতে লাগল।
আর এদিকে—চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থী, শিক্ষক—সবাই যেন একই দৃশ্যে পাথর হয়ে গেছে।
কারও মুখে কথা নেই।সবাই শুধু হা করে তাকিয়ে আছে মাহাদীর কাঁধে ঝুলে থাকা আয়াতের দিকে!
মাহাদী অবশ্য কারও দিকে ফিরেও তাকাল না। কাঁধে আয়াতকে নিয়েই দৃঢ় পদক্ষেপে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

আর পেছনে পড়ে রইল পুরো ভার্সিটির স্তম্ভিত, বিস্মিত মুখগুলো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp