শরতের আকাশে মায়ের আগমনী - আদিত্য ভৌমিক - অনু গল্প

গল্পের ডায়েরির প্রত্যেক সদস্যকে আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। শারদ সংখ্যা ১৪৩৩, লিখেছেন আদিত্য ভৌমিক। লেখক-কে অশেষ ধন্যবাদ এইরকম একটা বার্তার...
শরতের আকাশে মায়ের আগমনী - আদিত্য ভৌমিক
          শরৎ এলেই প্রকৃতি যেন নিজের অজান্তেই একটু বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে। নীল আকাশের বুকে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের ধারে দুলতে থাকা কাশফুল, ভোরের বাতাসে শিউলির মিষ্টি গন্ধ সবকিছু মিলিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত আনন্দের আবেশ। আর সেই আবেশের মাঝেই বাঙালির হৃদয়ে জেগে ওঠে এক চিরচেনা অপেক্ষা মা আসছেন।

দুর্গাপূজা শুধু একটি উৎসব নয়; এটি যেন বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা, স্মৃতি আর শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর অনুভূতির নাম।

শহরের এক ছোট্ট পাড়ায় থাকত অয়ন। বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু জীবনের নানা ব্যস্ততায় তার শৈশবের অনেক আনন্দই যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। বছরের অন্য সময় উৎসব এলেও তার মনে তেমন কোনো আলোড়ন উঠত না। কিন্তু শরৎ এলেই তার মনটা কেমন যেন বদলে যেত।

একদিন ভোরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অয়ন দেখল, আকাশটা অদ্ভুত নীল। দূরে কয়েকটি সাদা মেঘ ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। পাশের বাড়ির ছাদে শিউলি ফুলের গন্ধ এসে লাগছে। রাস্তায় কয়েকজন কাশফুল হাতে নিয়ে ফিরছে।

অয়ন মৃদু হেসে বলল,
মা আসছেন...

এই দুটি শব্দ উচ্চারণ করতেই তার বুকের ভেতর জমে থাকা কত স্মৃতি যেন একসঙ্গে জেগে উঠল।

ছোটবেলায় দুর্গাপূজার দিনগুলো ছিল তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়। নতুন জামা, নতুন জুতো, পাড়ার পূজামণ্ডপ, ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ, সন্ধ্যার আরতি সবকিছুতেই ছিল এক অন্যরকম আনন্দ।

তার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ত মায়ের কথা।

প্রতিবার পূজার আগে মা তাকে নিয়ে বাজারে যেতেন। নতুন জামা কিনে দিতেন। অয়ন বারবার জামাটা বের করে দেখত, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরে ধরত আর মাকে জিজ্ঞেস করত,
মা, আমাকে কেমন লাগবে?

মা হেসে বলতেন,
আমার ছেলেকে সব জামাতেই সুন্দর লাগে।

সেই কথাগুলো আজও অয়নের কানে বাজে।

সময় বদলেছে। অয়ন বড় হয়েছে। জীবনের প্রয়োজনে মানুষগুলো একে একে দূরে সরে গেছে। কেউ অন্য শহরে, কেউ অন্য দেশে। কেউ আবার চিরদিনের মতো চলে গেছে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে।

তবুও দুর্গাপূজা এলেই মনে হয় সবাই যেন আবার ফিরে আসছে।

পূজার কয়েক দিন আগে পাড়ার ছেলেরা মণ্ডপ সাজাতে শুরু করল। বাঁশের কাঠামো উঠল। রঙিন আলো লাগানো হলো। সন্ধ্যার পর মণ্ডপের চারপাশ আলোয় ঝলমল করতে লাগল।

অয়ন প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে যেত।

একদিন প্রতিমা দেখতে গিয়ে সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এই মুখের মধ্যে যেন পৃথিবীর সব মায়ের মুখ লুকিয়ে আছে।

কেউ সন্তানকে হারিয়ে কাঁদছে, কেউ দূরদেশে থাকা সন্তানের অপেক্ষায় দিন গুনছে, কেউ অসুস্থ সন্তানের মাথায় হাত রেখে প্রার্থনা করছে, আবার কেউ নিঃশব্দে নিজের কষ্ট লুকিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করছে।

অয়নের চোখ ভিজে উঠল।

সে মনে মনে বলল,
“মা, তুমি শুধু মৃন্ময়ী প্রতিমা নও। তুমি আমাদের ঘরের মায়ের চোখের জল, বাবার নীরব চিন্তা, সন্তানের জন্য অপেক্ষা করা বৃদ্ধ মায়ের দীর্ঘশ্বাস, আর হারিয়ে যাওয়া আপনজনের স্মৃতির মধ্যে বেঁচে থাকা এক অমলিন ভালোবাসা।”

ষষ্ঠীর দিন সকালে পাড়ার পরিবেশ বদলে গেল। চারদিকে যেন উৎসবের ঢেউ। ঢাকের শব্দে ঘুম ভাঙল অয়নের।

দূর থেকে ভেসে আসছিল ঢাকের সেই পরিচিত আওয়াজ ঢুম ঢুম, ঢুম ঢুম...

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, বহু বছর আগের সেই ছোট্ট ছেলেটি আবার ফিরে এসেছে। নতুন জামা পরে মায়ের হাত ধরে পূজামণ্ডপে যাচ্ছে।

মণ্ডপে গিয়ে সে দেখল, বৃদ্ধা সরলা দেবী এক কোণে বসে আছেন। প্রতি বছর তিনি পূজার সময় নাতির অপেক্ষা করেন। নাতি বিদেশে থাকে। বহু বছর ধরে পূজায় আসতে পারেনি।

অয়ন কাছে গিয়ে বলল,
ঠাকুমা, কাকে দেখছেন?

বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
ওই যে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে, মা এবার আমার নাতিটাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন।

কথাটা বলেই তিনি চুপ করে গেলেন।

অয়নের বুকটা কেঁপে উঠল।

সে বুঝল দুর্গাপূজার আনন্দের আড়ালে কত মানুষের অপেক্ষা লুকিয়ে থাকে।

কারও অপেক্ষা প্রিয় মানুষের জন্য, কারও অপেক্ষা হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির জন্য, কারও অপেক্ষা একটি ফোনকলের জন্য, আবার কারও অপেক্ষা শুধু একটু ভালোবাসার জন্য।

সপ্তমীর সকালে অয়ন ফুল হাতে মণ্ডপে গেল। চারপাশে তখন ভিড়। কেউ অঞ্জলি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে।

কিন্তু অয়নের চোখে আজ অন্যরকম কিছু।

সে দেখল, একজন বাবা তার ছোট্ট মেয়ের চুল ঠিক করে দিচ্ছেন। একটি মা সন্তানের জামা পরিষ্কার করে দিচ্ছেন। কয়েকজন বৃদ্ধ বন্ধু বহুদিন পর একসঙ্গে বসে গল্প করছেন।

অয়ন ভাবল এটাই তো পূজার আসল সৌন্দর্য।

পূজা মানে শুধু নতুন পোশাক নয়। শুধু আলো, সাজসজ্জা বা মণ্ডপ নয়। পূজা মানে মানুষকে কাছে পাওয়া। অভিমান ভুলে একে অপরের হাত ধরা। বহুদিনের দূরত্বকে কয়েক মুহূর্তের জন্য মুছে দেওয়া।

অষ্টমীর দিন অয়ন অঞ্জলির জন্য ফুল হাতে দাঁড়াল।

পুরোহিত মন্ত্র পড়ছেন। চারপাশে শঙ্খধ্বনি। ঢাকের শব্দ। ধূপের গন্ধ। মানুষের কণ্ঠে একসঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে “জয় মা দুর্গা।”

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, জীবনে সে যত কষ্ট পেয়েছে, যত মানুষকে হারিয়েছে, যত না-পাওয়া তার হৃদয়ে জমে আছে সবকিছু যেন মায়ের চরণে রেখে দিতে পারলে একটু শান্তি পাওয়া যায়।

সে প্রার্থনা করল

“মা, আমাকে বড় কিছু দিও না। শুধু আমার আপন মানুষগুলোকে ভালো রেখো। যাদের হৃদয়ে কষ্ট আছে, তাদের একটু হাসি দিও। যারা একা, তাদের পাশে একজন মানুষ দিও। যারা দূরে আছে, তাদের আপনজনের কাছে ফিরিয়ে দিও। আর যাদের আপনজন পৃথিবীতে নেই, তাদের স্মৃতিগুলোকে ভালোবাসার আলোয় ভরে দিও।”

প্রার্থনা শেষে চোখ খুলে অয়ন দেখল, তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছোট্ট শিশু মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসছে।

সেই হাসির মধ্যে সে যেন সমগ্র পৃথিবীর আনন্দ দেখতে পেল।

নবমীর রাত।

পূজামণ্ডপ তখন আলোয় ঝলমল করছে। ঢাকের তালে তালে মানুষ আনন্দে মেতে উঠেছে। কেউ নাচছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে।

অয়ন একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল।

হঠাৎ তার ফোনে একটি বার্তা এল।

বহুদিন দূরে থাকা একজন প্রিয় মানুষ লিখেছে

“পূজায় সবাইকে খুব মনে পড়ছে। ভালো থেকো। মা দুর্গা যেন আমাদের সবাইকে আবার একসঙ্গে করেন।”

বার্তাটি পড়ে অয়নের চোখে জল এসে গেল।

সে আকাশের দিকে তাকাল।

নীল আকাশে তখন পূর্ণিমার আলো। মণ্ডপের আলোর সঙ্গে মিশে চারপাশ যেন স্বপ্নের মতো লাগছে।

অয়ন মনে মনে বলল,
“হয়তো এটাই মায়ের আশীর্বাদ। মানুষ দূরে যায়, কিন্তু ভালোবাসা দূরে যায় না।”

দশমীর সকাল।

আজ মণ্ডপে অন্যরকম নীরবতা।

গত কয়েক দিনের হাসি, আনন্দ, ঢাকের শব্দ সবকিছুর মধ্যে আজ যেন বিদায়ের সুর।

মায়ের বিসর্জনের প্রস্তুতি চলছে।

অয়ন প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এত তাড়াতাড়ি কেন বিদায়?

কেন প্রতিবার মা আসেন, আমাদের আনন্দে ভরিয়ে দেন, তারপর আবার চলে যান?

তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ বললেন,
কাঁদছ কেন বাবা?

অয়ন উত্তর দিল,
মা চলে যাচ্ছেন।

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
মা কোথায় যান? মায়ের তো আসা-যাওয়া নেই। তিনি থাকেন মানুষের বিশ্বাসে, ভালোবাসায় আর মনের ভেতর।

কথাটা অয়নের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গেল।

প্রতিমা যখন বিসর্জনের পথে এগিয়ে গেল, চারপাশে তখন একসঙ্গে ধ্বনি উঠল

“আসছে বছর আবার হবে।”

অয়নও কণ্ঠ মিলিয়ে বলল

“মা, আবার এসো।”

কিন্তু এবার তার কথার অর্থ শুধু আগামী বছরের পূজা নয়।

সে চাইছিল, মায়ের সঙ্গে যেন মানুষের ঘরে শান্তি ফিরে আসে। অভিমান ভেঙে যাক। পরিবারগুলো আবার একসঙ্গে বসুক। দূরত্ব কমে যাক। বৃদ্ধ বাবা মায়ের পাশে সন্তানরা ফিরে আসুক। একাকী মানুষগুলো ভালোবাসা পাক।

কারণ, দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটাই অশুভের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না; ভালোবাসা, মানবিকতা, ক্ষমা আর সত্যের শক্তিতেও অন্ধকারকে পরাজিত করা যায়।

বিসর্জনের পর সন্ধ্যায় অয়ন একা মণ্ডপের সামনে এসে দাঁড়াল।

আলো অনেকটাই নিভে গেছে। চারপাশে নীরবতা।

কিন্তু তার মনে আর কোনো শূন্যতা নেই।

সে জানে, মা চলে যাননি।

মা আছেন শিউলির গন্ধে, শরতের সাদা মেঘে, ঢাকের শব্দে, অঞ্জলির প্রার্থনায়, মায়ের স্নেহে, সন্তানের ভালোবাসায়, চোখের জলে এবং মানুষের হৃদয়ের গভীরে।

পরদিন সকালে আবার সূর্য উঠবে। কাশফুল দুলবে। শরৎ পেরিয়ে হেমন্ত আসবে। তারপর শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম সময় তার নিজের নিয়মে এগিয়ে যাবে।

কিন্তু একটি শরৎ মানুষের মনে চিরকাল থেকে যাবে।

কারণ কিছু উৎসব ক্যালেন্ডারের পাতায় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু হৃদয়ের পাতায় কখনো শেষ হয় না।

দুর্গাপূজাও তেমনই এক উৎসব।

মা আসেন, আমাদের ঘর আলোয় ভরিয়ে দেন, আমাদের মনে সাহস দেন, ভালোবাসতে শেখান, আপনজনকে কাছে টানতে শেখান। তারপর বিদায় নেন শুধু একটি কথা মনে করিয়ে দিয়ে

“অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলো একদিন আসবেই।”

আর তাই প্রতি শরতে যখন আকাশে সাদা মেঘ ভাসে, কাশফুল দোলে, শিউলির গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, দূর থেকে ঢাকের শব্দ ভেসে আসে তখন বাঙালির হৃদয় আবার বলে ওঠে

মা আসছেন।

মা আসছেন আমাদের ঘরে, আমাদের মনে, আমাদের ভালোবাসায়।

আর আমরা অপেক্ষা করে থাকি একটি নতুন ভোরের, একটি নতুন আশার, একটি নতুন ভালোবাসার।

শুভ মহালয়া।
শুভ দুর্গোৎসব।
জয় মা দুর্গা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp