— ইদ্দত মানে বোঝো? নাকি সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান ধরে বসে আছো, হ্যাঁ? কী নির্লজ্জ তুমি! ভাশুর হই তোমার—এইটুকু সম্পর্কের মর্যাদাটুকুও কি তোমার বোধে নেই?
— ভাশুর ছিলেন। এখন তো জামাই।
— জাস্ট শাট আপ! তুমি এতটা নির্লজ্জ, বেহায়া মেয়ে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। সত্যি করে বলো তো, তুমি কি আমার ভাইকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলে? শুনেছি, তোমাদের নাকি ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এখন আমার কাছে ব্যাপারটা অন্যরকম মনে হচ্ছে। এ কেমন ভালোবাসা! ওয়াক থু…
আর তুমি ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানো না? একজন নারী অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায় সেই সন্তান ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত আরেকটি বিয়ে করতে পারে না—এটুকুও জানো না? কেন রাজি হলে তুমি?
— কোথায় আরেকটা বিয়ে করলাম!
— মানে?
ইনান থমকে গেল। সে ইদ্দতের কথা জিজ্ঞেস করেছে, অথচ মেয়েটা সেই প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে শুধু আরেকটা বিয়ের কথাটাই ধরেছে। যেন ইচ্ছে করেই তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অন্যদিকে কথা ঘুরিয়ে দিচ্ছে।
— আমি ইদ্দতের কথা বললাম, আর তুমি বলছ কোথায় আরেকটা বিয়ে করলে! আর ইউ ইনসেন?
— না, না… আরেকটা না—সেকেন্ড বিয়ে। এসব কথা এখন উঠছে কেন? বর্তমানে আপনি আমার জামাই, আমি শুধু এটুকুই জানি। সেম কথা যদি আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করি, আপনিও কেন রাজি হয়েছেন? আপনি তো পুরুষ মানুষ, আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করা এত সহজ?
এটুকু কথা বলতে গিয়েও যেন জড়িয়ে গেল তার জিহ্বা। কথাগুলো অস্পষ্ট করে থতমত খেয়ে উত্তর দিল সে।
এমন কথায় ইনান রাগে গজগজ করতে লাগল। ইচ্ছে করছে, এই মেয়েটার গাল দুটো চপেটাঘাতে লাল করে দিতে। মেয়েটা যদি এই মুহূর্তে সামনে থাকত, এতক্ষণে হয়তো একটা চড় ঠিকই পড়ে যেত।
— আপনি পৌঁছে গেছেন? আর…
কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না তার আগেই ইনান কিছু না বলে ঠাস করে কল কেটে দিল। রাগে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে সে। সামনে কিছু পেলে হয়তো সেটাই ভেঙে ফেলত। হাতে ধরা কফির পেপার কাপটাও রাগের বশে ঠাস করে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। সকাল সকাল মেজাজটাই খারাপ করে দিল! ধেত!
মনে মনে আওড়াতে লাগল,
— কেন রাজি হয়েছি সেটাই তো দেখার বিষয়। আম্মা সব জানা সত্ত্বেও যেহেতু রাজি, তার মানে কিছু তো একটা আছে এখানে।
অন্যদিকে, পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মুচকি হাসি। মুখটা মাস্কে ঢাকা, তবুও হাসির কারণে চোখ দুটো যেন খেলে উঠেছে, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। হাতে ধরা মোবাইলটাও সে শক্ত করে মুঠোবন্দি করে রেখেছে।
তখনই ইনানের চোখ পড়ল সামনে থাকা বিশাল কাচের দরজায়। কাচে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই মেয়েটির প্রতিফলন। মেয়েটির চোখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠেছে।
ইনান শুধু দেখল, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া জানাল না।
—————
সকাল সকাল সায়েরা বেগম নূরাইয়ার জন্য নাস্তা নিয়ে এলেন। খাবারগুলো সামনে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলেন,
— কী নূরাইয়া, ইনানের সঙ্গে কথা হলো?
— হ্যাঁ মা। তিনি এয়ারপোর্টে পৌঁছেছেন। এখন অ্যাপার্টমেন্টের জন্য রওনা দেবেন হয়তো।
— ওহ, আচ্ছা। তাহলে তো ভালোই। কিছুদিন যাক, আমরাও তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব।
— ঠিক আছে, মা।
— নাও, খাবারগুলো শেষ করো। নতুন অতিথি আসতে চলেছে। এখন থেকে তোমাকে আরও বেশি হাসিখুশি থাকতে হবে। পাশাপাশি নিজের প্রতিও যথেষ্ট যত্নশীল ও সতর্ক থাকতে হবে, বুঝেছ?
— জি মা। আপনি যা বলবেন, তাই করব।
— আর শোনো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে। প্রতিদিন একবার কুরআন তিলাওয়াত করবে। সারাক্ষণ আল্লাহর জিকির করবে। এখন তোমার প্রধান কাজ শুধু এগুলোই। এর বাইরে আর কিছু নয়।
নূরাইয়া হাসিমুখে তার শাশুড়িকে আশ্বস্ত করল, সে সবকিছুই মেনে চলবে।
সায়েরা বেগম উল্টো দিকে ঘুরে চলে যেতে যেতে ভাবলেন, আরেকজনের খবর বের করতে হবে এখনই।
তখনই নূরাইয়া তাকে থামিয়ে দিল।
— শুনুন, মা।
— হুম্, বলো।
— আপনি ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে এমন বিয়েতে কেন রাজি হলেন? এটা তো জায়েজ না।
নূরাইয়ার কথায় সায়েরা বেগম একটু চুপ থেকে কিছু একটা ভেবে উত্তর দিলেন,
— আমার চেয়ে তো তুমি আরও ভালো জানো, আম্মু। যেখানে তুমি রাজি, সেখানে আমি কী বলব?
এমন কথায় নূরাইয়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সায়েরা বেগম তার কাছে এসে তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
— এখন এসব চিন্তা বাদ দাও। সব ঠিক হয়ে যাবে।
বলেই চলে গেলেন।
নূরাইয়ার মুখেও চিন্তার চাপ। তার শাশুড়ি শরিয়ত জানা সত্ত্বেও কেন রাজি হলেন এমনটা করতে? তিনি কি কিছু আঁচ করতে পেরেছেন?
না, না… এটা হতে পারে না। তিনি কীভাবে বুঝবেন? সেও তো তার ছেলের জন্যই রাজি হয়েছেন। এসব ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিতেই হাসি ফুটে উঠল নূরাইয়ার মুখে। সামনে রাখা খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— সব করব। আমার নাঈমের অস্তিত্ব পৃথিবীতে আসতে চলেছে—তার জন্য আমি সবকিছু করতেই রাজি। সেই তো হবে আমার আসল হাতিয়ার।
একটু থেমে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে নূরাইয়া ফিসফিস করে বলল,
—হয়তো নিজে মরব, নয়তো তাকে মারব।
—————
— এই! আপনি আমার তিজ বরাবর মারলে আমি কি চুপচাপ বসে থাকব নাকি!
— আপনার যেহেতু তিজ আছে, আমারও হাত-পা আছে। একদম! আমিও মেরে দেব, হুঁ!
মেয়েটির এমন কথায় ইনান শরীর ঘুরিয়ে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে বলল,
— মারো দেখি। জানটা কত বড়, সেটাই তো দেখতে চাই।
— একি! মারতেও বলেন, আবার হুমকিও দেন?
— একদম থাপড়িয়ে থোতা মুখ ভোতা করে দিব, বেয়াদব।
— এই বেডা, আমার মুখ ভোতা করার আগে আপনি ভালো করে দেখুন টিকিটের নম্বর আগে।
ইনান আবারও টিকিটের নম্বরটা ভালো করে মিলিয়ে দেখল। একই নম্বর। কোনো ভুল নেই।
হাতে থাকা টিকিটটা মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
— নাও, তুমি মিলিয়ে দেখো।
মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গেই ফুঁ দিয়ে টিকিটটা নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিল। দেখারও প্রয়োজন মনে করল না। মেয়েটির এমন কাণ্ডে ইনান কয়েক সেকেন্ড হতভম্বের মতো নিজের টিকিটটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভ্রু কুঁচকে মেয়েটির দিকে তাকাল।
— এ কী! আমার টিকিটটাও ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলে? এটা কি তোমার কাছে ময়লা কাগজ মনে হচ্ছে? বাহ! সাহস তো কম না!
মেয়েটি কোনো জবাব না দিয়ে নিজের টিকিটটা সাইড ব্যাগ থেকে বের করে ইনানের সামনে মেলে ধরল।
— আপনি দেখুন, নানা ভাই?
মেয়েটির কথায় ইনানের চোখ কপালে উঠল।
— হোয়াট? নানা ভাই? এই মেয়ে, কোন দিক দিয়ে আমাকে তোমার নানার বয়সী মনে হয়? স্টুপিড!
— আমার মুখ, আমি যা ইচ্ছে বলব। তাতে আপনার কী, নানা ভাই!
ঠিক তখনই একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট এগিয়ে এসে বললেন,
— আপনারা এমন ঝগড়া করছেন কেন?
মেয়েটি কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ইনান বলে উঠল,
— এই ভাই, আগে আপনি দেখেন তো আমাকে কোন দিক দিয়ে নানার বয়সী লাগে?
মেয়েটির মুখে সঙ্গে সঙ্গেই বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল। তার ছোড়া তীর যে একেবারে ঠিক জায়গায় গিয়ে বিঁধেছে, সেটা বুঝতে পেরে যেন ভীষণ আনন্দ পেল সে।
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট লোকটি ইনানের দিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে বললেন,
— না তো! আপনি তো একজন ইয়াং ম্যান। নানার বয়সী কেন লাগবে?
— তাহলে ঠিক আছে।
মেয়েটি এবার আর দমল না। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— এই, এসব ইয়াং ম্যান, লেওড়া ম্যান বাদ দিন। আমার যেমন মনে হবে আমি তেমনই বলব! বুঝেছেন? সরুন তো এবার সামনে থেকে।
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট এবার একটু বিরক্ত হয়ে বললেন,
— আপনাদের এই বলাবলি বাদ দিয়ে নিজের নিজের জায়গায় বসুন। প্লেন কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে দেবে। এয়ারপোর্টে নেমে আবার ঝগড়া করবেন। প্লিজ, যার যার সিটে বসুন।
তখন ইনান তীব্র রাগে বলে উঠল,
— বসব কোথায়, তোর মাথায়? শালা আবাল। তোরা দুজন মিলে কিন্তু আমার মেজাজ গরম করছিস। এমনিতেই মেজাজ অনেক হাই আছে, বলে দিলাম।
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট কিছুটা শান্ত গলায় বললেন,
— হাইপার হবেন না, স্যার। মূল বিষয়টা বলুন।
ইনান সঙ্গে সঙ্গে দুটো টিকিট সামনে ধরে বলল,
— সিট নম্বর এক হয় কীভাবে, হ্যাঁ? তোদের এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে কিন্তু আমি মামলা দেব, দেখিস!
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ভ্রু কুঁচকে বললেন,
— মানে?
টিকিট দুটো হাতে নিয়ে পাশাপাশি মিলিয়ে দেখতেই ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের চোখ কপালে উঠল। দুটো টিকিটেই একই সিট নম্বর—8E। তিনি কিছুক্ষণ অবিশ্বাসের চোখে টিকিট দুটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। এমনটা কীভাবে হতে পারে? এটা তো অসম্ভব!
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট দ্রুত টিকিটিং এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানালেন। ওদিক থেকে জানানো হলো, তাদের কোনো ভুল হয়নি।
রুবায়েত নামের যাত্রীর সিট নম্বর 8E। আর মাহরিয়া নামের যাত্রীর সিট নম্বর 8F। কিন্তু মাহরিয়ার টিকিটে 8E দেখাচ্ছে!
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট এবার মাহরিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ম্যাম, আপনার টিকিটের সিট নম্বর নাকি 8F…
মাহরিয়া সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
— আমি কী জানি! আমি যেটা পেয়েছি, সেখানেই তো বসব, তাই না? আমারটায় তো 8E লেখা। এখন সেখানে 8F দেখালে আমি কী করব? আমি এখানেই জানালার পাশেই বসব।
— আপনার সিরিয়াল অনুযায়ী সেটা মাঝের সিট।
— সেখানে আমি বসব না। উনাকে বলুন, উনি সেখানে গিয়ে বসুন।
ঠিক তখনই একজন বৃদ্ধ লোক এগিয়ে এসে বললেন,
— মা, তোমার সিটে আমার স্ত্রীকে বসতে দাও। আমাদের দুজনের টিকিট কাটতে একটু দেরি হয়ে যাওয়ায় একসঙ্গে টিকিট আসেনি। ও একা ভয় পায়।
মাহরিয়া সঙ্গে সঙ্গে ইনানের দিকে ইশারা করে বলল,
— উনাকে বলেন, উনি যদি আমাকে এখান থেকে না উঠান, আমিও আপনাদের বসতে দেব।
ইনান একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে এসব কাণ্ড দেখছিল। মাথাটা প্রচণ্ড ধরেছে। সে শুধু মাথা নেড়ে বলল,
— ওকে।
এরপর পুরো বিমানের সিটগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে দেখল। একটা সিট খালি আছে—সেটা মাহরিয়ার পাশের সিট।
ইনান মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল,
— আমি তো এই অভদ্র মেয়ের সঙ্গে কখনোই বসব না।
বলেই পাশের এক যাত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাই, এখানে আসবেন? আমি আপনার জায়গায় বসব।
লোকটি সঙ্গে সঙ্গে হাত নেড়ে ইশারায় জানিয়ে দিল, সে যদি এখান থেকে উঠে যায়, তাহলে তার গার্লফ্রেন্ড তাকে খতম করে দেবে।
এতে ইনানের রাগ যেন আরও চড়ে গেল।
— হ্যাত তেড়ি তো!
গালিটা মুখে এসেও আর বাড়াল না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই মাহরিয়ার পাশের সিটটাতেই গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। মনে হলো কোনো ঝড় তাণ্ডব চালালো। বসতেই মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিল। কেবিনের বাতির আলো মুখে পড়ছে দেখে একটা বই নিয়ে মুখের ওপর দিয়ে দিল।
অন্যদিকে মাহরিয়া সেদিকেই তাকিয়ে এক হাত থুতনিতে রেখে মিটিমিটি হাসতে লাগল। কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটা মনে পড়তেই তার হাসিটা যেন আরও চওড়া হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ আগেও এয়ারপোর্টের ওয়েটিং জোনে বসে ছিল দুজন। ইনানের হাত থেকে তখন টিকিটটা নিচে পড়ে গিয়েছিল। মাহরিয়া সেটা তুলে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই ইনান দ্রুত টিকিটটা তুলে নেয়। তবে তার আগেই টিকিটের নম্বরটা মাহরিয়ার চোখে পড়ে যায়।
ইনান তখন বিরক্ত গলায় বলেছিল,
— আমার জিনিসে অন্য কারও হাত দেওয়া পছন্দ করি না। পড়ে গেছে আমার জিনিস, আমি নিজেই উঠাতে পারি।
কথাটা মাহরিয়ার একদমই ভালো লাগেনি। এমনভাবে বলেছে, যেন সে কোনো বিরাট পাপ করে ফেলেছে! তাই মনে মনে একটা দুষ্টু বুদ্ধি এলো তার মাথায়। সুযোগ বুঝে নিজের টিকিটের সিট নম্বর 8F-এর ‘F’-এর ওপর কলম দিয়ে একটি দাগ টেনে E বানিয়ে দিল। ফলে নিজের টিকিটের আসল সিট নম্বর 8F হয়ে গেল 8E।
ইনান কিছুক্ষণ আগে যখন তার টিকিটটা বাড়িয়ে দিয়েছিল মাহরিয়ার দিকে, সে ইচ্ছে করেই সেটি না ধরে ফেলে দিয়েছিল। এখন সেই দুষ্টুমির ফল নিজের চোখের সামনে দেখে মাহরিয়া থুতনিতে হাত রেখে হাসি চেপে রাখতে পারল না।
মনে মনে ভাবল,
— বেশ হয়েছে! এত ভাব নিয়ে কথা বলার ফল এবার বুঝুক।
এসব ভাবতে ভাবতেই মাহরিয়ার মনে হলো, নামাজের সময় হয়ে গেছে। তাই সে অজু করে এসে ইশারায় নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটতে লাগল। আকাশের রঙও বদলাতে শুরু করেছে। মাহরিয়া মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল তার স্বপ্নের জায়গাটার দিকে। জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল। অজানা এক ভালো লাগায় বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভরে উঠল তার।
অন্যদিকে ইনান মুখের ওপর বইটা দিয়েই যে ঘুম দিয়েছিল, এখনও ঠিক সেই অবস্থাতেই আছে। ঘুমের মধ্যে তার কোনো নড়াচড়াও নেই। চারপাশের কোনো কিছুর প্রতিই যেন তার কোনো খেয়াল নেই।
মাহরিয়া একবার আড়চোখে ইনানের দিকে তাকাল। তারপর আবার জানালার বাইরে চোখ রাখল। প্রায় এক ঘণ্টার আকাশযাত্রা শেষে বিমানটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করল।
বিমান থেকে নেমে নিজের লাগেজ আর সাইড ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এলো মাহরিয়া। অন্যদিকে ইনানও দ্রুত নিজের লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
—————
— বেশি রাগ উঠলে হাতের ফোন ভাঙতে হয়, নানা। এটাও জানেন না।
নূরাইয়ার সাথে রাগারাগি করার পর ইনান গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিল। পিছন থেকে এমন কণ্ঠে থেমে গেল সে। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট শিহাব তো ভয়ই পেয়ে গেল—এটা আবার কে বলল!
শিহাব তার স্যারের পাশে মাথাটা একটু কাত করে তাকাতেই দেখতে পেল, একটি মেয়ে কালো বোরকা পরা। মুখে মাস্ক, পাশে একটা লাগেজ আর একটা সাইড ব্যাগ। রমণীটি যে হাসছে, সেটা শিহাব বুঝতে পারছে। কিন্তু হাসির কারণটা কিছুতেই বুঝতে পারছে না।
তাই শিহাব কিছু বলতে নিলেই ইনান আঙুল তুলে তাকে চুপ করিয়ে দিল। তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তর দিল,
— ফোন কি তোর বাপের টাকা দিয়ে কিনছি শালি?
— একি, দুলাভাই! আপনি আমার বোনকে বিয়ে করলেন কখন?
— একদম চুপ। তোকে কাল রাত থেকে সহ্য করছি আমি। এটা তোর সাত কপাল। এই রুবায়েত নবাব ইনান কিন্তু এসব সহ্য করে না। আমি আর টলারেট করব না, বলে দিলাম। দূর হ, চোখের সামনে থেকে। তুই তোর রাস্তায় যা। তুই সম্মান পাওয়ার যোগ্য না, তাই তোকে তুমি থেকে তুই করে বললাম বেলাজা মেয়ে কোথাকার।
বলে যেতে নিলেই মাহরিয়া বলতে লাগল,
— এক্সকিউজ মি। মিস্টার ইনান নানা, নাকি দুলাভাই? ওয়াট এভার… এত সহজেই অসম্মানের বস্তু বানিয়ে দিলেন। আর আপনার মতো অসম্মানজনক কাজ করলে তাকে কী বলবেন, হ্যাঁ? বেশি বড় বড় কথা বলবেন না। আমার বয়েই গেছে আপনার সম্মানের জন্য। আমিও মাহরিয়া নওশীন… ন…
বাকি টুকু বলার আগেই ইনান গাড়িতে উঠে বলল,
— বাল…ছাল! শুনতেই চাই না।
গাড়িতে বসতেই গাড়িটা মুহূর্তেই চলে গেল।
— আজ থেকে প্রতিনিয়তই শুনবেন। আর আমার কাজ শেষ, এবার আপনি আমাকেই খুঁজবেন।
গাড়িটি চলতে শুরু করল। ইনান কপাল কুঁচকে খুব তীক্ষ্ণভাবে মনোযোগ দিয়ে কাল রাত থেকে এই পর্যন্ত সবকিছু ভাবছে। এরই মধ্যে অনেক কিছুই তার খটকা লাগছে।
তার ধ্যান ভাঙল শিহাবের কথায়—
— কী হলো, বস?
— এই, কতবার বলেছি বস বলবি না!
— ওহ, বড় ভাই…
— কালকের মধ্যে এই মেয়েটির সকল ইনফরমেশন আমার চাই।
— জি, ভাই। শুধু নামটা বলেন। মুখ তো দেখিনি
— মুখ তো আমিও দেখিনি।কি যেন মাইরিয়া নাকি মাহরিয়া ছিল।
— আচ্ছা বস হয়ে যাবে।
গাড়িটি অ্যাপার্টমেন্টের দিকে না গিয়ে সোজা চলে গেল সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। সেখানে ইনানের একটি সেমিনার ছিল। আগে সেটাই অ্যাটেন্ড করতে হবে।
—————
— কোথায় যাবেন, ম্যাম?
— সুবিদবাজার লন্ডনী পাড়া যাব।
—————
সময় গড়িয়ে সকাল দশটা।
সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজের সেমিনার হলে ট্রান্সফার হয়ে আসা শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি পরিচিতিমূলক সেমিনার শুরু হওয়ার অপেক্ষায়। হলজুড়ে নতুন শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যস্ততা। মঞ্চেও চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
সামনের সারিতে অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে বসে আছে ইনান। গম্ভীর মুখে সবার দিকে চোখ বুলাতে বুলাতে হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে আটকাল একদম মাঝখানে বসে থাকা বোরকা পরা একটি মেয়ের ওপর। পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে সে। এক হাতের কনুই চেয়ারের হাতলে রেখে, তালুতে থুতনি ঠেকিয়ে রেখেছে। মুখটা সম্পূর্ণ ঢাকা, শুধু চোখ দুটোই খোলা।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—ইনানের দৃষ্টি মেয়েটির দিকে যেতেই দেখা গেল, মেয়েটির চোখজোড়া যেন আগে থেকেই শিকারীর মতো তাকিয়ে আছে তার দিকে।
দুজনের চোখে চোখ পড়তেই হঠাৎ থমকে গেল ইনান।
·
·
·
চলবে……………………………………………………