হ্যালো ওয়াইফি - পর্ব ১২ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

হ্যালো ওয়াইফি - নবনীতা শেখ
          গত সন্ধ্যের ঘটনা। ইভেন্টে ওয়াশরুমের সাইনবোর্ড খুঁজতে খুঁজতে বলরুম থেকে বেরিয়ে এসেছিল মৌরি। একটা করিডোর ধরে এগিয়ে গেলে, সামনে দুটো পথ নজরে আসে। একটু আগে ওয়েট্রেসটা কোনদিকে যেতে যেন বলেছিল? মৌরি মনে করার চেষ্টা করল। তারপর ডানদিকে এগোল। 
কিন্তু সামনেই ছিল একটা আধখোলা লাউঞ্জ। সে ফিরতি পথ ধরতে গেলেই পরিচিত এক আওয়াজ তার পা থমকে দেয়৷ না চাইতেও আড়ে দাঁড়িয়ে দেখে সে। শোনার চেষ্টা করে।

লাউঞ্জের ভেতরের জায়গাটা অনেকটা মিনিমাল। মৌরির বাবা বাদেও সেখানে বসে রয়েছেন আরও দুইজন ভদ্রলোক। তাদের হাতে কফির মগ। ভেতর থেকে মোস্তফা সাহেবের কণ্ঠ ভেসে আসে,
-“না, ওকে পাইনি।”

সামনের ভদ্রলোক বললেন,
-“খোঁজা থামিয়ে দিয়েছেন?”
-“সৌরভ সাহেব, যে হারিয়ে যায়, তাকে খোঁজা যায়। কিন্তু যে নিজে থেকে লুকায়, তাকে খোঁজা যায় না। ও এখন আমার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে অবস্থান করছে। ওকে তখনই ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যখন ও চাইবে। আপাতত আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করতে পারছি না।”

সৌরভ হাসান কফির মগে চুমুক দিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন,
-“এমন হবার কোনো সম্ভাবনা আছে যে, ও কোনো ছেলের সাথে পালিয়েছে?”
-“না। ওর কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই।”
-“না মোস্তফা সাহেব, সেটা বলছি না। চাইল্ডহুডে তো ওর একটা ছেলের সাথে বিয়ে পড়ানোর কথা ছিল... কী যেন নাম ছিল? আরমান সাহেবের ছেলের?”

মোস্তফা সাহেব ধীর কণ্ঠে বললেন,
-“হিশাম।”
-“হ্যাঁ, ওই হিশাম৷ বিয়েটা হয়েছিল?”

মোস্তফা সাহেবের কপালের রগ ফুলে ওঠে কোনো গভীর খেয়ালে। তিনি কফির মগে আরেকবার চুমুক দিয়ে বলেন,
-“হয়েছিল। তবে হিশামের সাথে নয়।”

বিস্ময়ে চমকে ওঠে মৌরি। তার হাত থেকে ফোন পড়ে যায় মেঝেতে। নিস্তব্ধ আবহে তীব্রভাবে শব্দ হয়ে ওঠে তখন। রুমের ভেতরে অবস্থান করা তিনজন ব্যক্তিই সচকিত হয়ে ওঠে। একজন ডেকে ওঠে সজোরে, 
-“কে?”

মৌরি ফোনটা তুলে সেখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব প্রস্থান ঘটায়, পরবর্তী পথ ধরে প্রবেশ করে ওয়াশরুমে। দরজা আটকে ফেলে সে। চোখে-মুখে একাধারে পানি দিতে থাকে। তার নিশ্বাস আটকে আসতে থাকে অধীরে। হাত-পা কাঁপতে থাকে থর থর করে। গলা শুকাতে লাগে। 
পার্স থেকে ইনহেলার বের করে ক্রমাগত ঝাঁকাল সে। ঠোঁটের ফাঁকে নিয়ে ধীরে শ্বাস টেনে ইনহেলারের ওপর চাপ দিতে লাগল। 

তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো সত্যকে এক অকস্মাৎ মিথ্যেয় রূপান্তরিত হতে দেখে তার খুব কষ্ট হলো। খুব। 

—————

-“কাউকে ঘৃণা করা এতই সহজ? স্পেশ্যালি তাকে, যে জীবনের পুরোটা জুড়ে দখল করে থাকে?”

মৌরি এর উত্তরে বলে,
-“স্পেশ্যালি তাকে ঘৃণা করা সহজ, যার কাছে আমি মূল্যহীন।”

নওশাদের চোখে-মুখে তখন নির্বিকারত্ব ছিল। তবু তার মস্তিষ্কে কী ঘুরপাক খাচ্ছিল, কেউ জানে না। সে বলল,
-“তাহলে কেন তাকে খুঁজছো? কেন তোমার সকল অনুভূতি তার প্রতি উৎসর্গ করেছো?”

মৌরি শুকনো গলায় বলল,
-“উত্তর খুঁজতে।”
-“কোন প্রশ্নের?”
-“এটাই, যে—কেন আমাকে ধোঁকায় রাখা হলো!”

এর বিপরীতে নওশাদ কোনো প্রশ্ন করল না তাকে। নিজ থেকে সহজ হতে দিলো। তবে মেয়েটা শান্ত হলো না। আগের চেয়েও উত্তেজিত হয়ে বলল,
-“আমার লাইফটা...কেমন যেন... আচ্ছা! যখন নিজের জীবনের এগারোটা বছর মনে-প্রাণে একজনকে স্বামী মেনে অপেক্ষা করে যাওয়ার পর, হুট করে একদিন সামনে আসে—তার সাথে তো বিয়েই হয়নি। তখন কেমন লাগে? তখন কেমন লাগে, যখন এক অদ্ভুত প্রশ্ন মাথাটা কুড়ে কুড়ে খেতে থাকে যে, বিয়েটা হয়েছিল কার সাথে?”

মৌরি আবারও বলতে বলতে থেমে গেল আর নওশাদ এবারও নির্বিকার রইল। তার কাছে এই প্রশ্নগুলোর একটাও কোনো ধরনের আগ্রহ, কৌতূহল কিংবা জানার সামান্য ইচ্ছেও সৃষ্টি করছে না। যেন সে সব জানে, আর যেন সেটুকুও তার জানা—যা মৌরি এখনও জানে না। 

সে মৌরির দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিলো। আর এই মুহূর্তে এটা সবচেয়ে জরুরি ছিল। মৌরি পানি পান করে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে লাগল। তার অ্যাজমা আছে। প্যানিকড হওয়া যাবে না।

মৌরির কণ্ঠ ভেসে এলো গাড়িটিকে রোডের সাইডে টেনে ব্রেক কষার পর,
-“আই নেভার লাভড হিশাম। নেভার, এভার। আমার কোনো ফিলিংসই ছিল না ওই নামটা নিয়ে। আমার একটু একটু করে সাজানো অনুভূতির সংসারের সবটুকু ছিল সেই লোকটাকে নিয়ে, যাকে আমি তিনবার কবুল করেছিলাম। অ্যান্ড ফানফ্যাক্ট, আমি তার নামটুকুও জানি না।”

এ পর্যায়ে মৌরি চুপ হয়ে গেলে নওশাদ বলে উঠল,
-“জানলে তার সাথে সংসার করা শুরু করে দেবে?”

মৌরি রক্তিম চোখে তাকাল,
-“জানলে তাকে খুন করে ফেলব। তাকে, হিশামকে, সবাইকে। পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে দেবো আমি। আমার লাইফের এগারোটা বছর এই সত্যটা জানতে নষ্ট করেছি আমি? এইটা যে, আমি মূল্যহীন? আমি তুচ্ছ? আমি অনাকর্ষণীয়? আমি কোনো পুরুষেরই আরাধ্য নই? না হিশাম এসেছে আর না সেই লোকটা। কেন? কেউ তো আসতে পারত, আমাকে সত্যিটা বলত!”

নওশাদ স্নেহমাখা গলায় বলল,
-“যদি বলি, সত্য এটুকু নয়? যদি বলি, যা ঘটেছে, তুমি একাংশও জানো না? আর যদি বলি, সবকিছু আরও বেশি কমপ্লিকেটেড?”

মৌরির মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। তার চোখে তখনো আগুন জ্বলছিল। সে দৃঢ় প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলল,
-“তাহলে আমি জানার চেষ্টা করব।”

নওশাদ মৃদু স্বরে বলল,
-“গুড।”
-“আর আমি জানি, আপনি আমাকে সাহায্য করতে পারেন। পারেন না?”
-“পারি।”

মৌরি উইন্ডোর বাইরে তাকিয়ে বড়ো করে শ্বাস ফেলল। শহরের বাইরে তারা। বাড়ি ফিরছে। প্রশান্ত হাওয়া বইছে নিস্তব্ধ হাইওয়ে দিয়ে। মৌরি হালকা স্বরে বলল,
-“একটু বাইরে বেরোতে পারি? আমার ঠাণ্ডা বাতাস প্রয়োজন। একটু হাঁটতে চাই..”
-“আচ্ছা।”

মৌরি বাইরে বেরোল। অনির্দিষ্টভাবে হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ করল, তার কিছুটা পেছনে, ঠিক তার ডানদিকে আরও দুটো পদক্ষেপ তার সাথে পা মিলিয়ে এগোচ্ছে। সে লম্বাটে শ্বাস টানল। নিচু কণ্ঠে বলল,
-“আপনি দুঃখ চেনেন, আজমীর?”

নওশাদ শান্ত গলায় জবাব দিলো,
-“চিনি।”
-“আপনার জীবনের দুঃখ কি আমার চেয়েও বেশি?”
-“না।”
-“কীভাবে?”

মৌরি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। নওশাদ বলল,
-“সৃষ্টিকর্তা কাউকে তার সহ্যসীমার বাইরে দুঃখ দেন না। আমি সহ্য করতে পারছি, তুমি পারছ না। এজন্য তোমার দুঃখ বেশি।”
-“আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়, আপনি মিথ্যা বলেন, আপনার চোখ ছলনা করে আমার সাথে। মনে হয়, আপনি অনেক কিছু লুকোচ্ছেন।”

নওশাদ নিশ্চুপ রইলো। মৌরি ফের বলল,
-“আমি জানি না, আমার আগামী দিনটা কেমন হতে যাচ্ছে। তবে আজকের দিনের মতো কঠিন যে হবে না, সেটুকু নিশ্চিত।”

নওশাদ ধীরস্বরে বলল,
-“যেখানে নিশ্বাসের বিশ্বাস নেই, সেখানে দুনিয়াবি কোনো কিছুর ওপরই নিশ্চয়তা দিতে নেই। ভেঙে যাবে... তোমার বিশ্বাস, তুমি ও তোমার নিশ্চয়তা। কালকের দিনটা আজকের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রাখা উচিত তোমার।”

মৌরি ঠোঁট উলটে তাকাল, ভ্রুয়ের মাঝে তার লম্বাটে ভাঁজ, চাহনি করুণ,
-“আর কী বাকি আছে আমার সাথে খারাপ হওয়ার?”

নওশাদ শূন্য অভিব্যক্তিতে বলল,
-“তুমি জানো না, তোমার সাথে আর কতটা খারাপ হতে পারে।”
-“আমি জানি। সর্বোচ্চ খারাপে এটা হতে পারে যে, এগারো বছর আগে বিয়েটা আমার আপনার সাথে হয়েছিল। এছাড়া তো আর কিছু না। তাই না?”

মৌরি অস্থিরচিত্তে এটুকু বলে সম্পূর্ণভাবে পিছে মুড়তে গেলেই আচমকা পা মোচকে গেল তার। জুতোর হিল গেড়ে পড়েছিল ভাঙা রাস্তার ভেতর। 

হাইওয়ের একপাশের টঙের দোকানের সামনে সে রাতে মৌরি পায়ে আঘাত পেল। নওশাদ ব্যস্ত হয়ে উঠল। মেয়েটাকে বসালো ওখানে রাখা এক চেয়ারে। ঠিক সামনে, হাঁটুর ভরে সে মাটিতে বসল। মৌরির পায়ে থেকে হিলের সরু স্ট্র‍্যাপটা খুলতে লাগল যত্নের সাথে। 

মৌরি নওশাদের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকটা সময় নিয়ে। পরবর্তীতে নওশাদ যখন তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল কিছু একটা, তখন সে না চোখ সরালো তার চোখ থেকে, না শুনতে পেল সেই প্রশ্নটা। বড্ড অন্যমনস্ক গলায় বলে উঠল, 
-“আমার কেন যেন আপনাকে দেখলে একজনের কথা খুব মনে পড়ে। আপনি তার মতো দেখতে নন। তবু... তবু মনে হয়, আপনারা একইরকম দেখতে। একই চোখ, একই নাক, একই ঠোঁট, চিবুকের ভাঁজ, একই রকমের স্বভাব ও ব্যক্তিত্ব। সে-ও শুরু-শুরুতে আপনার মতো শান্ত ছিল, নম্র ছিল।”

নওশাদ নরম চোখে তাকিয়ে থাকল। ধীর গলায় জানতে চাইল,
-“কে সে?”

মৌরি অস্ফুটে বলল,
-“হিশাম।”

ঠোঁট চেপে হেসে ওঠে নওশাদ। শব্দে প্রহেলিকা নিয়ে খেলে সে বলে,
-“এইমাত্র বললে, ওয়োর্স্ট যা হবে, তা আমার সাথে তোমার বিয়ে। এখন আমাকে হিশামের মতো লাগা শুরু হলো?”

মৌরি ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
-“আপনি অদ্ভুত। আপনি দুর্বোধ্য। খুব চেষ্টা করি, কিন্তু বুঝে উঠতে পারি না।”
-“আমাকে বোঝার এত চেষ্টাই বা কেন তোমার? তুমি না ম্যারিড?”

অনিশ্চিত এক কারণবশত মৌরির খুব রাগ লাগল। আক্রোশে দিশেহারা হয়ে পড়ে সে বলল,
-“বিয়ের গুষ্টির তুষ্টি। আজ থেকে আমি সিঙ্গেল। দেয়ার ইজ নো ম্যান ইন মাই লাইফ। আজ থেকে আমি পুরুষ বিদ্বেষী।”
-“বাট নাউ, তুমি একটা পুরুষকেই ডেইট করছো।”
-“এখন থেকে করছি না। পুরুষের গুষ্টিরতুষ্টি।”

নওশাদ উচ্চস্বরে হাসতে থাকল। মৌরি রাগ ধীরে ধীরে নেমে গেল। সে লক্ষ করল, নওশাদ হাসলে তার চোখের কোণায় ভাঁজ পড়ে। তার স্মাইল লাইনের নিচে, লিপসের সাইডে ছোট ছোট কিছু গর্ত হয়। ঠিক হিশামের মতো....

মৌরির ছোট্ট মস্তিষ্কে তখন এক অজানা সন্দেহ এসে দলা পাকায়। নওশাদের পাসপোর্টে যে ডেট অভ বার্থ পেয়েছিল, সেখান থেকে হিশাম আর নওশাদের বয়স একই প্রমাণিত হয়। তারা দেখতেও অনেকটা এক রকম৷ শুধু ভিন্ন চোখের মণি। নওশাদের গাঢ় বাদামি, আর হিশামের ছিল কালো। এছাড়া দিনকে দিন সবকিছু ধীরে ধীরে একসুতায় গাঁথছে। মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

তবু কিছু শঙ্কা থেকে যায়। নওশাদের পাসপোর্টে তার আসল নাম নওশাদ আজমীর দেওয়া ছিল। সে কীভাবে হিশাম আশহাদ হয়? 
কিন্তু, নওশাদ এগারো বছর পর ইতালি থেকে ফিরেছে আর হিশাম এগারো বছর ধরেই নিরুদ্দেশ।

তবু, হিশামের সাথে মৌরির বিয়ে তো হয়নি। অন্য কারো সাথে হয়েছিল।

কিন্তু....
নওশাদ কেন তাকে এই ফেইক ডেটের জন্য জোর করল? কেন এসব আজগুবি শর্ত দিলো তা স্বাভাবিকভাবেই কাপলদের মধ্যকার সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে?

এত এত কনফিউশান। মৌরি জানে, সে এর উত্তর নওশাদের থেকেই পাবে। হয় তার মুখ থেকে, নয়তো তার অজান্তে তার ওপর নজরদারি করে। অপেক্ষা শুধু সময়ের। 

আর যদি নওশাদ আজমীর ওই দুই বান্দার মধ্যে একজন হয়, যার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল আর যার সাথে তার বিয়ে হয়েছিল! তবে গুলিটা ঠিক বুক বরাবর ছুঁড়ে মারবে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp