ভালোবাসি সুচরিতা - পর্ব ২৩ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

ভালোবাসি সুচরিতা - মম সাহা
          বাহিরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় রয়েছে নোমান, ইমন, টুইটুবানি ও প্রেমা। জোহরার অপেক্ষা করছে ওরা। জোহরা গিয়েছে ওর বাবা যাবের শিকদারকে ডাকতে। এই বিকেলে ওরা ঘুরতে বের হবে। কাল এখান থেকে চলে যাবে বিধায় আজ চারপাশটা ভালো করে দেখে নিতে চাচ্ছে। 

 জোহরার পরনে শাড়ি। বেশিরভাগ সময়ই ও শাড়ি পরে। শাড়ি পরতে ভালোও বাসে বেশ। ওর কাছে মন খারাপ, মন ভালো সবকিছুই উদযাপন করতেই শাড়ি প্রয়োজন। নয়ত মনে হয় জীবন থেকে কী যেন বাদ পড়ে যাচ্ছে। 

  শাড়ির কুঁচি পটু ভাবে সামলে ও গিয়ে দাঁড়ায় বাবার ঘরের সামনে। দরজায় টোকা দিতে উদ্যত হতেই খেয়াল করল দরজাটি খোলা। পর্দা টানা দেখে বোঝা যায়নি। 
যাবের শিকদার শুয়ে আছেন বিছানায়। কপালে হাত রেখে পা নাড়াচ্ছেন বিধায় জোহরা বুঝতে পারল বাবা যে ঘুমাননি৷ জোহরা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকল। চারপাশটা এত শুনশান যে পা ফেললে তার শব্দও শোনা যায়৷ অথচ বাবা আজ কোনো রা করছে না। তার উপস্থিতি বুঝেও ইচ্ছে করেই কি চুপ করে রয়েছেন? নাকি টেরই পাননি! 

  জোহরা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়ালো বাবার মুখোমুখি কিছুটা দূরেই। ধ্যান দিয়ে বাবার মুখটিতে খেয়াল করতেই চকচক করতে দেখলো বাবার চোখের এক কোণে থাকা অশ্রু বিন্দু। 
ও কি ভুল দেখল! চোখের বিভ্রম কি এমনই হয়? নয়ত বাবা কাঁদছেন এমন কিছুও দেখা হতো জীবনে? মা মারা গেলো যখন তখন বাড়িসুদ্ধ সকলেই কেঁদেকেটে পাগলপ্রায় অথচ বাবা ছিলেন নিশ্চুপ। সবাইকে সামলেছেন। নিজের প্রাণপ্রিয় সহধর্মিণীকে হারিয়েও যে মানুষ কাঁদেননি তার চোখ আজ জল কীসের?

  জোহরা নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারে না আর। বিস্ময় চেপে থাকে না কণ্ঠে। হতবিহ্বলের মতো ও ডেকে উঠে,
 “বাবা! তুমি কি জেগে আছো?”

  মেয়ের ডাকে যাবের শিকদার ভূতগ্রস্তের মতো কেঁপে উঠেন। এমন ভাবে কাঁপেন যে জোহরা অব্দি সেই কম্পন দেখতে পায়। জোহরা থমকায়, “কী হয়েছে, বাবা?”

 দ্রুত নিজেকে সামলে নেন যাবের শিকদার। নিজের চশমাটা বিছানা হাতড়ে খুঁজে বের করে পরে নেন। মুখ-চোখ ভারি উনার। কিন্তু ঠোঁটে এক চিলতে হাসি টানলেন। বললেন,
 “কিছু হয়নিতো। কখন এলে এখানে?”

বাবার প্রশ্নে জোহরা অবাক হয় বৈকি। সে এতক্ষণ যে এখানে ছিলো তা বাবা বোঝেনইনি! কী এমন ভাবনায় ব্যস্ত ছিলেন বাবা? জোহরা যদিও অনেকক্ষণ আগেই এসেছিলো তবে সে সেটি স্বীকার করল না। বাবাকে বিব্রত করতে চাইল না সত্যটুকু বলে। তাই সাবলীল ভাবেই মিথ্যে উত্তর দিলো,
 “এইতো মাত্র এলাম। আমরা সবাই ঘুরতে বের হচ্ছি তো। তুমি যাবে কি-না জিজ্ঞেস করতে এসেছিলাম।” 

 মেয়ের গোছানো মিথ্যেটা বাবা মোটেও ধরতে পারলেন না। তাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন যেন তিনি। মাথা নাড়িয়ে জানালেন,
“যাও, যাও। তোমরা ঘুরে এসো। আমি থাকছি এখানেই।”

“একা থাকবে, বাবা?”

 “মা রে, মানুষের জীবন জুড়েই তো একাকীত্ব সেখানে সাময়িক একা থাকাটা কোনো বিষয়ই নয়। একা থাকাটাও একটি আনন্দদায়ক বিষয়। যাও তোমরা।”

 জোহরা অন্যান্য সময় হলে বাবাকে জোর করতো নিশ্চিত। জোর করে হলেও নিয়ে যেত সঙ্গে। কিন্তু এই মুহূর্তে ওর মোটেও জোর করার ইচ্ছে জাগল না। হোক লোকটা তার বাবা কিন্তু মানুষটা তো আলাদা একজন ব্যক্তি। মানুষটারও কিছু সময় ব্যক্তিগত ভাবে কাটাতে ইচ্ছে হতেই পারে। কিছু হিসেবনিকেশ একাকী শেষ করার শখ থাকতে পারে। শুধু শুধু অবিভাবকের দায়ভারে তার সেই একাকী সময়টাকে নষ্ট করে কী লাভ?
 ও মাথা নাড়াল। বাবাকে রেখেই বেরিয়ে গেলো ঘর ছেড়ে। কিন্তু বুকে আর সেই আগের আনন্দটা অনুভব করতে পারল না। বাবার চোখের ঐ চিকচিক জলের দৃশ্যটা বার বার দুঃস্বপ্নের মতো চোখের উপর যন্ত্রণা দিতে লাগল।

—————

পুরো ঘরজুড়ে ভুরভুর করে বেরুচ্ছে সুঘ্রাণ। সুগন্ধি আতরটা মেজবাহ্ এত বেশি মাখে যে সেই ঘ্রাণ ঘর ছড়িয়ে দূর অব্দি পৌঁছে যায়। ওর আতরের এত বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। বিভিন্ন দেশ-বিদেশের পারফিউমসহ সেখানে ঠাঁই পেয়েছে। মেজবাহ্’র আলাদাই শখ যেন এটা। 

  ঘরের দরজা খোলা বিধায় রেণুকা বেগম অনায়াসেই চাইলেই ঢুকতে পারতেন ছেলের ঘরে। কিন্তু তিনি তা করলেন না। বাহিরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন ছেলের অবস্থান। এরপর বেশ ভদ্র ভাবেই ডাকলেন, “আসব?”

 মেজবাহ্ চুলে হাত বুলাচ্ছিলো। মায়ের কণ্ঠ পেতেই সে আয়নায় তাকালো। যেখানো দরজায় দাঁড়ানো মায়ের প্রতিবিম্বটি ফুটে উঠেছে স্পষ্ট ভাবেই। সেদিকে তাকিয়েই মেজবাহ্ এক গাল হাসল। আয়নায় চোখাচোখি হলো মায়ের সাথে। সে অনুমতি দিলো আন্তরিক ভঙ্গিতে,
 “আসো, আম্মু।”

 রেণুকা বেগম ছেলের হাসির বিপরীতে হাসি ফিরিয়ে দিলেন। ঘরে এলেন ভীষণ ধীর পায়ে। এসেই সেন্টার টেবিলের সাথে থাকা চেয়ারে বসলেন পায়ের উপর পা তুলে। চোখ রাখলেন ছেলের দিকেই,
 “কোথাও বের হচ্ছো?”

“হ্যাঁ, এখানে এসেছি শুনে চা বাগানের যেই ম্যানেজার রয়েছে উনি যেতে বললেন কতবার। ভাবলাম গিয়ে দেখা করে আসি।”

 “সে তো আমরাও যাবো। ডিনারের দাওয়াত রয়েছে তো সবারই।”

“তোমরা যেও সাতটা-আটটার দিকে। আমি একটু দেখা করে আসি।”

  রেণুকা বেগম কপাল কুঁচকালেন, “কেন? ডিনারে যাবে না আর?”

আয়নার সামনে কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে মেজবাহ্'র। সেন্টার টেবিল থেকে ঘড়িটি উঠিয়ে হাতে লাগাতে লাগাতেই উত্তর দিলো,
 “নাহ্। এটা তো তোমার জানা বিষয়ই, আম্মু।”

“জানা বিষয় তবুও বারবার জিজ্ঞেস করি। পরিবারের উপর একজন মানুষের ঠিক কতদিন অভিমান থাকতে পারে সেটিই মেপে দেখি।”

  “ঠিক অভিমান নয়, আম্মু। হতাশা। অভিমান হলে কবেই ভেঙে যেত।”

“হতাশা!”

 “হ্যাঁ, হতাশা। তোমার হয় না দেখে অবাক হই। তুমিই তো নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কত কথা বলো। নারীদের অধিকার নিয়ে বলো। অথচ তোমার ঘরের নারীরা কতটুকু অধিকার পাচ্ছে!”

“তুমি যেই নারীকে নিয়ে সোচ্চার সে কিন্তু দিব্বি সংসার করছে। তুমিই হলে ঘর ছাড়া।”

  মায়ের কণ্ঠে সুপ্ত অভিমানটি ধরে ফেলে মেজবাহ্। মাথা নাড়িয়ে হাসে, “সেটাই তো স্বাভাবিক, আম্মু। যে সারাজীবন মুক্তির জন্য লড়ে সে বাদে গোটা পৃথিবী মুক্তি পায় অথচ সে পায় কারাগার। দুনিয়ার নিয়মই এমন।”

রেণুকা বেগম নিজের চতুর ছেলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ছেলেটা এত বেশিই বুঝদার যে উনারা কথায় পারেন না কখনো। যুক্তিতে পারেন না। তাই ছেলের মনমর্জি মেনে নিতে হয়।

মা ছেলের কথোপকথন শেষ হয় না তার আগেই ঘরে উপস্থিত হয় সিকান্দার। যদিও এসেছিলো হন্তদন্ত হয়ে কিন্তু মেজবাহ্'র মা'কে দেখতেই সে নিজের ব্যতিব্যস্ত ভাবখানা ছেড়ে স্বাভাবিক হয়ে গেলো। খুব ধীরে সালাম করল রেণুকা বেগমকে। আন্তরিকতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
 “আপনার কিছু লাগবে, মেম?”

 রেণুকা বেগম বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। হাসি মুখ বজায় রেখেই উত্তর দিলেন,
 “মেম কী হ্যাঁ? আন্টি বলবে। তুমি আর মেজবাহ্ কি আলাদা নাকি আমার জন্য? আর আমার কিছু লাগবে না। তোমরা কথা বলো, আমি যাই।”

 সিকান্দার ভীষণ মিষ্টি করে মাথা নাড়ালো। এই নারীটিকে ওর এত বেশি ভালো লাগে! এত আদর করে কথা বলেন। আধুনিকা ভীষণ। 
 সিকান্দার দরজা অব্দি এগিয়েও দিলো তাকে। রেণুকা বেগম উনার টিবাংলোতে ফিরে যেতেই সিকান্দার তার আগের ব্যস্ততায় ফিরে এলো। মেজবাহ্'র কাছে এসে তড়িঘড়ি করে বলল,
 “ভাই, ভাবীরে তো দেখলাম বাংলো থেকে বের হতে।”

“রিমঝিম? বের হোক। আমার কী?”

 “বের হয়েছেন ভালো কথা তবে লুকিয়ে বের হয়েছেন। কেমন যেন চোর চোর ভাব।”

 এ পর্যায়ে মেজবাহ্'র ভ্রু কুঁচকে আসে, “চোর চোর ভাব বলতে! আর কোন দিকে গিয়েছে?”

 “দক্ষিণের পথটা ধরেছেন। আমি খেয়াল করেছি।”

মেজবাহ্'র আচমকা মনে পড়ল দক্ষিণের দিকটায় ওদিন রাতে ও গিয়েছিলো। রিমঝিমের কথাতেই ছুটে গিয়েছিল। এরপর আর রিমঝিমের সাথে দেখা হয়নি এবং ও সেই প্রশ্নের উত্তরও নিতে পারেনি যে, এতিম একটা মেয়ের বাবা এলো কোথা থেকে। আজ পুনরায় সেই বিষয় উঠতেই চট করে মেজবাহ্'র সেদিনটার কথা মনে পড়ে গেলো। 
 ও পি স্ত ল ও মানিব্যাগটা পকেটে গুঁজতে গুঁজতে বলল,
 “তুই যা ম্যানেজারের বাড়িতে। আমি একটু আসছি।”

সিকান্দার পথ আটকালো, “আপনি একা কোথায় যাবেন, ভাই? আমিও যাই?”

 “বউদের মতো তোর এত প্রশ্ন কেন করতে হয়? তোর জন্য তো দেখছি আমি কোথাও যেতেও পারব না।”
 ঠাট্টা করেই কথাটি বলে মেজবাহ্। সিকান্দার লজ্জা পায়। মুখ ঘুরিয়ে পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। মেজবাহ্’কে উস্কে দিতে বলে,
 “বউ বানিয়ে নিলেও পারেন। আমার কোনো নিষেধ নেই।”

মেজবাহ্ অবাক হয়ে যায় ওর কথা শুনে। পরক্ষণেই ধমকায়, “সিকান্দার…”

 সিকান্দারকে আর পায় কে? ও ছুট লাগায় দ্রুত। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে থাপ্পড় খাওয়ার ইচ্ছে নেই ওর। তাই নিজের প্রাণ বাঁচাতেই ছুটে।

—————

  জোহরারা চা বাগান পরিদর্শনে বের হলেও ও ছিটকে গিয়েছে ওর দল থেকে। ছিটকে যাওয়ার কারণ আছে। প্রেমাটা অরণ্য পাগল মেয়ে। জায়গার প্রতি ঘোর বেশি ওর। জোহরাও তাই। প্রেমা হাঁটতে হাঁটতে সর্বপ্রথম ওদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। এরপর বিচ্ছিন্ন হয় ওকে খুঁজতে ইমন ভাই। ওদের দু'জনকে অনেকক্ষণ না পেয়ে টুইটুবানি আর নোমান ভাই যায় খুঁজতে। জোহরা খোঁজাখুঁজিতে যায় না। ওর প্রেমাকে ঢের জানা আছে। মেয়েটার চোখ জুড়ে কৌতূহল বেশি। নিজে ঠিক ঠিক সবই দেখে নিবে। অথচ ওকে খোঁজার ধান্দায় ঘোরা বাদ যাবে ওদের। তাই জোহরা নিজের মতোই হেঁটে যাচ্ছে। ইমন ভাইয়ের ক্যামেরাটা ওর সঙ্গে কি-না তাই আর থামবার নাম নেই। 

  হাঁটতে হাঁটতে চা বাগান ছেড়ে একটি ছোটো পাহাড়ি রাস্তায় চলে এসেছে প্রায়। রাস্তার পাশেই বিশাল জঙ্গল। বিকেলে সূর্যাস্তের দৃশ্যটি উপর থেকে দেখার লোভেই পাহাড়ের পথ দিয়ে ও হাঁটছে। চারপাশে অজানা কত পাখি ডাকছে। চারপাশটা কলরবে মুখরিত। এত সরব মনে হচ্ছে! অথচ একটু পর অন্ধকার নামলেই এই জায়গাটি নীরব হয়ে যায়। ঝুপ করে নেমে আসে একাকীত্ব। যেন এই শ্রীমঙ্গলের চেয়ে একা কোনো রাজ্য নেই। এমন নিঃস্ব কোনো অঞ্চল বিধাতা সৃষ্টিই করেননি।

 জোহরার ক্যামেরা দিক ঘুরছে। খচ্ খচ্ করে ও ছবি তুলছে কতগুলো তার ইয়েত্তা নেই। এতটাই ছবি তোলায় বুঁদ হয়ে গিয়েছিল যে ওর পেছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে তা বুঝতেও পারেনি। 
 মেজবাহ্'র চোখ দু'টো ছোটো ছোটো হয়ে আছে। সামনের ছবি তোলায় মগ্ন মেয়েটির কোঁকড়াচুল গুলো ওর পরিচিত ঠেকছে। এমন কি শাড়ি পরার ভঙ্গিটাও। মেয়েটা পথ জুড়ে এমন করে দাঁড়িয়ে আছে যে ও পাশ কাটিয়ে যেতেও পারছে না। তাই না চাইতেও ডাকতে হলো মেয়েটিকে,
 “এই যে মিস, একটু জায়গা দিন।”

 আচমকা, এক টুকরো হাওয়ায় পরিচিত ডাকটি পেতেই জোহরা চমকে গেলো। ক্যামেরাটি হাত ফসকে গেলো মুহূর্তেই। তবে ওর সৌভাগ্য এতটাই বেশি ছিলো যে মেজবাহ্ সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে ধরে ফেলল সেই ক্যামেরা। তীর্যক চোখে তাকালো মেয়েটির মুখের দিকে। 

 বিকেলের সেই এক মুঠো সুস্পষ্ট আলোয় মেজবাহ্ একটি চেহারা দেখতে পেলো। একটি মেয়েলি মুখ। একটি গোলাপি ঠোঁট, সেই ঠোঁটের উপরের অবাধ্য একটি মায়াবী তিল। একটি টিকালো নাক, গোল মুখ, লাবণ্য ভরা দু'টো চোখ। 
এরপর…
 এরপর মেজবাহ্'র কী হলো ও কিচ্ছু জানে না। কেবল কানে ভাসে একটি কণ্ঠ। ওর প্রিয় নারীর কণ্ঠ। ওর কাঙ্ক্ষিত শুক্রবারটি ও যেই নারীকে উৎসর্গ করেছিলো সেই নারীর কণ্ঠ। 

 মেজবাহ্'র অন্তর বিস্ময়াভিভূত হয়ে যায়। এই মুখটি থেকে ওর চোখ ফিরতে চায় না। কানে কেবল একটি কণ্ঠই গুঞ্জন তুলে। কিন্তু কেন? সেই কণ্ঠের সাথে এই মুখটির কী সম্পর্ক? কীসের যোগাযোগ? 

 জোহরার বুকে কি আর ভিন্ন কিছু হয়? একই অনুভূতি চেপে ধরে ওকেও। জমে যায় এক মুহূর্তে ও। এই মানুষটাকে দেখার লোভে ও পথে বের হলেই উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে চারপাশটা। ডাহুকের মতো খুঁজতে থাকে নীড়। কৌতূহল নিয়ে সবার মুখটি দেখে যেন এই মুখটির দেখা পায়। 
 অথচ সেই মুখটিই আজ ওর সামনে। একদম কাছে। 

 প্রাপ্তবয়স্ক মেজবাহ্ নিজেকে সামলায়। ওর বুকে এক খণ্ড কেমন হওয়া অনুভূতিকে নিয়ে দিকভ্রান্ত হয়। দিকভ্রান্তর মতোই শুধায়,
 “আপনাকে আমার বড্ড চেনা চেনা লাগছে। আমরা কি পরিচিত?”

টেলিফোনের কণ্ঠটি জোহরার একদম সামনে, একদম কাছে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ছে। অথচ জোহরা বুঝতেই পারে না ওর কী করণীয়। ওর কি উত্তর দেওয়া উচিত? উত্তর দিলে বুঝে যাবে না লোকটা? বুঝে গেলে কী করবে?
 জোহরা খেঁই হারিয়ে ফেলে। অদৃশ্য একটি শক্তি যেন গলা চেপে ধরেছে ওর। তাই ও মাথা নাড়ায় কেবল। অর্থাৎ, পরিচিত নয়।

 মেজবাহ্'র যেন বিশ্বাস হয় না তার সামনে থাকা অল্প বয়সী মেয়েটির কথা। সে আবারও প্রশ্ন করে,
 “আমাদের কি আগে কখনো দেখা হয়েছে? কিংবা কথা?”

 জোহরা অথৈ সাগরে পড়ে। অস্বীকার করতে কষ্ট হয় তবুও ও ডানে-বামে মাথা নেড়ে অস্বীকার করে। 

মেজবাহ্ আরও প্রশ্ন করতে চায় কিন্তু তার আগেই হাওয়ায় ছুটে আসে একটি গু লির শব্দ। বুলেটটা যেন ওদের কাছ ঘেঁষেই বেড়িয়ে গিয়েছে। এতটা জোরেই শব্দ হয় যে সঙ্গে সঙ্গে কান চেপে ধরে জোহরা। ভয়ে বুকটা ওর কাঁপছে। 
 মেজবাহ্ পকেট থেকে সাথে সাথেই ব ন্দু কটি বের করে পেছনের দিকে ছুঁ ড়ে গুলি। ওর ধারণা হয়ে যায় এই নিশানাটা কে ছিলো। 

 জোহরা ভয়ে কাঁপছে। মেজবাহ্ কয়েকটা গু লি ছুঁড়তে ছুঁড়তেই জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়ে। চেঁচিয়ে আসতে বলে জোহরাকেও। কিন্তু মেয়েটা যেন পাথর হয়ে গিয়েছে। এইসব শব্দ ও গত দুই বছর যাবত সহ্য করতে পারে না। এই সিলেটেই গত দুই বছর আগে ও যেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে এরপর থেকে এসব শব্দ যেন ওর জীবনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 জঙ্গলে গাছের আড়ালে গিয়েও মেজবাহ্ ফেরত এসেছে। মেয়েটাকে তার অদ্ভুত লাগছে। গুলির শব্দ শোনার পর কেউ দাঁড়িয়ে থাকে? গোটা চা বাগানের পাখিগুলো অব্দি আকাশে উন্মাদের মতো উড়তে শুরু করেছে, শোরগোল করছে আর এই মেয়ে কি-না দাঁড়িয়েই আছে!

 ডান দিকে গু লি ছুঁড়তে ছুঁড়তে মেজবাহ্ নিজের বাম হাত দিয়ে জোহরার একটা হাত টান দিয়ে হেঁচকা গাছের আড়ালে নিয়ে আসে। 
 জোহরার শরীরের জোরে হওয়া কম্পন ও সহ অনুভব করতে পারছে। মেয়েটা হয়ত ভয় পেয়েছে ভীষণ। চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে।

 ততক্ষণে গু লির শব্দ আরও বেড়েছে। সব কয়টার নিশানাই এ দিকে। শত্রুপক্ষের ঘ্রাণ চেনার শক্তি মেজবাহ্ শেখ ছাড়া আর কারই বা আছে? নিশ্চয় ওকে একা দেখেই আক্রমণটা শুরু করেছে। ভাগ্যের জোরে গায়ে লাগেনি গু লিটা।

মেজবাহ্'র বুকে চুপটি করে আছে জোহরা। ভয়েই চেপে আছে সেঁটে। ওর বুক কাঁপছে ভয়ঙ্কর গো লা গু লির শব্দে। শান্তির রাজ্য চা বাগানটি ধারণ করেছে একটি রণক্ষেত্রে। 

 মেজবাহ্ একহাতে ওকে জড়িয়ে নিয়েছে। যদিও মানুষটা জানে না তার এক হাতে জড়িয়ে থাকে মেয়েটিই তার প্রিয় নারী কিন্তু জোহরা তো জানে। তাই ওর বুক আরও বেশি কম্পন তৈরি করেছে। এত কাছে, এতটা পাশে ও কখনো ভেবেছিলো থাকবে? তাও এমন একটা ভয়ঙ্কর পরিবেশে? 

 মেজবাহ্ জোহরার কোমড়ে হাত শক্ত করে চেপে রেখে কিছুটা জোরেই জিজ্ঞেস করল, "ভয় পাচ্ছেন না তো? আমি আছি। ভয় পাবেন না। পেছনেই থাকুন আমার।"

 জোহরা প্রতিত্তোর করল না। ওর ভয় করছে না এখন আর। এমন করে কেউ যদি বলে 'আমি আছি' তবে জোহরা তৃতীয় বি শ্ব যু দ্ধও অবলীলায় দেখতে পারবে। এ আর কী এমন!

 গোলাগুলির শব্দ নিকটে আসতেই জোহরার হাত টেনে মেজবাহ্ আরও জঙ্গলটার ভিতরে প্রবেশ করল। একপ্রকার টেনেই নিয়ে গেলো মেয়েটাকে। এখানে রেখে গেলে এই মেয়ের বাঁচার সুযোগ নেই। 

 একেতো সন্ধ্যে হওয়ার পূর্ব সময়। ধরণীতে আলো ম্লান হয়েছে। তার উপর গভীর জঙ্গল হওয়ায় আলো যেন হারিয়েই যাচ্ছে ধীরে ধীরে। 
 পাতার ফাঁকফোকড়ে যতটুকু এসে পৌঁছাচ্ছে আরকি। 

 মেজবাহ্ ওর হাতের মুঠোয় থাকা মেয়েটির দিকে আরেক পলক তাকালো। এত অল্প আলোতেও মেয়েটির ভয়ার্ত মুখটি স্পষ্ট দেখতে পেলো ও। এরপর আচমকাই বলল,
 “আপনি কি আমার সুচরিতার শহরে থাকেন? ঢাকাতে থাকেন? আপনার টেলিফোন নাম্বার কি এইট, সিক্স, ওয়ান, ওয়ান, জিরো, জিরো (861100)?”
 এতটা অদ্ভুত ভাবে কেউ অপরিচিত মানুষকে প্রশ্ন করে? তা-ও মেজবাহ্ শেখের মতো মানুষ! এটি কি অসম্ভব বিষয় না?

 জোহরা ঢোক গিলে। অস্বীকার করার আর পথ নেই। এতটা বিশ্বাসী কণ্ঠে কেউ সামান্য পথচারীকে প্রশ্ন করে না। নিশ্চয় বুঝেই করছে প্রশ্নগুলো। 

   জোহরার চমকে যাওয়া দেখে মেজবাহ্ যেন বাঁকা হাসল। জোহরা ঠিক তা ঠাহর করতে পারল না। তবে অন্ধকারে শুনল কেবল কথা,
 “মিথ্যে কেন বলছেন? আমিতো আপনাকে চিনি। দেখেছি। বছর দুই আগে। অস্থির বিছনাকান্দির ভয়ঙ্কর পরিবেশে এমন গভীর জঙ্গলেই। পাংশুটে মুখে একটি মেয়ে কাঁপছিলো…”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp