-“আজকের দিনটা ওয়ান অফ দ্যা মোস্ট স্পেশ্যাল ডে অভ মাই লাইফ। আ'ম থ্যাংকফুল টু ইউ শরৎ, ফর মেকিং মাই ডে। অ্যান্ড আই লাভ টু ওয়ার্ক অন দ্যিস প্রোজেক্ট। থ্যাংকস ফর গিভিং মি দিস অপারচ্যুনেটি। এই প্রোজেক্টটায় আমার প্রোমোশন কনফার্ম।”
পুরো ম্যাসেজটা দেখাল শরৎ প্রিয়কে। প্রিয় কিছু বলছে না। সে অপ্রস্তুত ভঙ্গিমায় এদিক-ওদিক চাইছে। শরৎ প্রিয়র দু-বাহুতে ধরে বলল,
-“বি নরমাল। বসো এখানে, পানি খাও। আমি বোঝাচ্ছি বিষয়টা।”
প্রিয় বসল, শরৎ পানির বোতলটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“আমার কলিগ শর্মি। ও সবকিছুতেই একটু নার্ভাস থাকত আগে, নার্ভাসনেসে কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারত না। এজন্য ওকে কাজও দেওয়া হতো বেছে বেছে। এখন ওর নার্ভাসনেস কাটলেও, ওকে কেউ ভরসা করে কোনো বড়ো ধরনের কাজ দিতে পারে না।
গতদিন ইয়াকিন ভাই সিলেটের নতুন প্রোজেক্টটা আমাকে দিলে, আমি সেটা নিই। তারপর আজ সবকিছু গুছিয়ে, বাকিটা শর্মিকে হ্যান্ড-ওভার করে দিই। আপাতত শর্মি ছাড়া সবার হাতেই অসম্ভব কাজের প্যারা, তাই ইয়াকিন ভাই না করতে পারেননি। শর্মিও এতে নিজেকে প্রুভ করার একটা সুযোগ পাবে। আমিও আগামী মাসখানেকের নামে আপনার কাছে ব্যস্ত হব না। বুঝেছেন, ম্যাডাম? আজ সেসবে এত সময় গেল, ফিরতেও দেরি হয়ে গেল। সরি। কানে ধরে। দেখেন এদিকে।”
প্রিয় তাকাল। দেখতে পেল শরৎ হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে আছে, কানে হাত তার। চেহারায় অসম্ভব কিউটনেস। আর ঠোঁটে ছোট্ট বুলি,
-“মিসেস নীরজ শিকদারকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্য মিস্টার নীরজ শিকদার একটু সরি। বেশি সরি নয়, কেননা আপনার লাল-টমেটোর মতো ফেইসটা অসম্ভব আবেদনময়ী, আমার ভালো লেগেছে। আর আমি বার বার দেখতে চাই, বার বার রাগাতে চাই।”
প্রিয় হেসে ফেলল। শরৎ গাল টিপে দিলো প্রিয়র,
-“এভাবেই হাসবেন। আপনার হাসি সুন্দর।”
শরৎ উঠে পড়লে প্রিয়ও পিছু নেয়,
-“খেয়ে এসেছেন না?”
-“না, প্রিয়। আপনি এখানে আমার অপেক্ষায় থাকবেন, আর ওদিকে আমি খেয়ে উঠব? আমাদের না ভাগাভাগির সম্পর্ক? একা একা কীভাবে কী করি?”
কথাটা বলে শরৎ অদ্ভুত ভঙ্গিমায় চমৎকারভাবে হাসল। প্রিয়র সেই হাসিটা কী যে ভালো লাগল!
—————
আয়াত রমনার কৃষ্ণচূড়া বেছানো রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। শুভ্র গায়ে তার লাল টকটকে চুড়িদার। ওড়না গলায় জড়ানো। দুই হাতে ওড়নার দুই প্রান্ত ধরে মাঝে সাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে পাখা মেলার ভঙ্গিমায় ওড়াল দেওয়ার তাগিদে। মাঝে মাঝে আঁড়াআঁড়িভাবে পিছে মুড়ে প্রহরকে দেখছে। বরাবরই প্রহরকে দেখতে পাচ্ছে একই মুখাবয়বে। ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল,
-“অমন সঙের মতো দাঁড়িয়ে কেন?”
প্রহরের সোজাসাপটা জবাব,
-“তোকে দেখতে ভালো লাগছে।”
আয়াত বিষম খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রহর হাতের পানির বোতলটা তার দিকে এগিয়ে দিলো। সে পানি খেয়ে বুকে হাত দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-“ওভাবে বলিস না, ভাই। মনে হয় তোর ওপর জিন ভর করেছে।”
প্রহর চোখে হাসল। চোখের কার্ণিশে সামান্য ভাঁজ এলো। কিছুক্ষণ পর আয়াতের ফোনে তার বাবা মোশাররফ সরদারের কল আসে। আয়াত কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মোশাররফ সাহেব বলেন,
-“আম্মু, কোথায় আছ তুমি?”
আয়াত হেসে হেসেই বলল,
-“এই তো, ফ্রেন্ডদের সাথে একটু ঘুরতে এসেছি।”
-“বাসায় ফেরো জলদি।”
-“কেন, বাবা?”
-“একটু প্রয়োজন আছে।”
-“কী প্রয়োজন?”
-“বেশি প্রশ্ন কোরো না, এসো জলদি।”
আয়াতের মুখ গোমড়া হয়ে এলো। কল কেটে ফোন ব্যাগে ঢোকাতেই প্রহর বলল,
-“কিছু হয়েছে?”
-“বাবা ফিরতে বলল।”
-“আচ্ছা, চল তোকে পৌঁছে দিয়ে আসি।”
আয়াত ঠোঁট উলটে বলল,
-“কিন্তু আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।”
প্রহর আশে-পাশে একবার তাকাল, মানুষের আনাগোনা এদিকটায় নেই একদমই। ব্যাপারটা নিশ্চিত করে সে আয়াতের নিকটে এলো। মাঝসিঁথিতে ছোট্ট করে চুমু খেলো সময় নিয়ে। আয়াত কেঁপে উঠল। চোখ বন্ধ করে ফেলল। পরক্ষণেই একটি দীর্ঘায়িত হাসি তার ঠোঁটে এসে এঁটে গেল। ফিসফিসিয়ে বলল,
-“এমন বিদায় সহস্রবার চাই।”
প্রহর সেভাবে ঠোঁট ছুঁইয়েই হাসল। সামান্য সরে এসে আয়াতের মাথার পেছনের দিকের চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে দিলো। আয়াত প্রসন্ন হেসে বলল,
-“তোর ওপর আজ খুব প্রেম প্রেম পাচ্ছে, প্রহর। চল বিয়ে করে ফেলি। লাল ঘোমটার আড়ালে তোর লাল টুকটুকে বউ! ভাবতে পারছিস? জাস্ট ইম্যাজিনটা কর!”
প্রহর হেসে বলল,
-“করলাম ইম্যাজিন।”
-“কেমন লাগবে আমাকে?”
-“খুব সুন্দর লাগবে।”
আয়াত প্রহরের একহাতের বাহু ধরে বাচ্চামো করে বলল,
-“শ্বশুরবাড়ি যাবার বয়সে বাপের বাড়ি যেতে হচ্ছে। আমার কষ্টটা বুঝতে পারছিস?”
প্রহর কিছু বলল না। আয়াত তখন বলল,
-“শোন, ফোনের ধারেই থাকিস। আমি গিয়েই কল দেবো। আজ সারারাত আমার সাথে প্রেমালাপ করতে হবে। ঘুমের নাম নিবি তো সোজা নাইজেরিয়া পাঠিয়ে দেবো।”
-“ঠিক আছে।”
মলিন মুখে আয়াত বলল,
-“চল, দিয়ে আয় আমাকে।”
প্রহর বাইকে করে আয়াতকে বাড়ির সামনে অবধি এসে নামিয়ে দিলো। আয়াত নেমে আর পিছে তাকাল না। সোজা চলে গেল। প্রহর বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে রইল। হাত-পা অসার হয়ে আসছে তার। পাশে একটা টঙের দোকান ছিল, প্রহর সেখানে ঢুকে গেল সোজা। দোকানিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-“মামা, এক প্যাকেট বেনসন দেন তো।”
দোকানি বেনসনের প্যাকেট দিতেই প্রহর পকেট থেকে পাঁচশত টাকার একটা চকচকে নোট এগিয়ে দিলো। দোকানি সে নোট নিয়ে আলোর দিকে ধরে এদিক-ওদিক দেখল। এরপর তা রেখে দিয়ে একটা দুইশত টাকার কোঁচকানো নোট প্রহরকে ধরিয়ে দিলো। অন্যান্য দিন হলে প্রহর এই নোটটা চেঞ্জ করিয়ে নিত। আজ নিল না। সেভাবেই পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। সিগারেটের প্যাকেট উলটে পালটে দেখে, ভেতর থেকে একটা বের করল। দোকানের সরু দড়িতে বাঁধা লাইটারটি নিয়ে একটা সিগারেট জ্বালাল। ঠোঁটে ছোঁয়াল সেটা। ধোঁয়া উড়ছে, পৃথিবী তার নিকট ধোঁয়াটে লাগছে।
অন্তর্মুখী মানুষদের সাথে বাহ্যিক দুনিয়ার লেনদেন একটু কমই বটে। তারা মনের কথা মুখে আনতে প্রচণ্ড দ্বিধা করে। তারা বুকের ভেতর পাহাড় পোষে, বাইরে থেকে সহজ-শান্ত-সরল! তাদের জীবনধারা একটু কঠিন। তারা ইন্টার্যাক্ট করতে পারে না সহজে।
অথচ এই অন্তর্মুখী মানুষের মাঝে এক ধরনের বিশেষ ক্ষমতা আছে, যা আমাদ্ব্র জানার বাইরে। তাদের ইএসপি সাংঘাতিক হয়। ইএসপি হলো এক্সট্রা সেনসরি পারসেপশন বা অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা; যেটাকে আমরা সহজে সিক্সথ সেনস্ও বলতে পারি। তারা প্রকৃতির সাথে কানেকশন রেখে চলে। তাদের গ্যেসিং সেনস্ অমায়িক। তারা মানুষের হাবভাব বোঝে। তারা ভবিতব্য সম্পর্কে আগাম টের পেতে পারে।
যেমনটা প্রহর পাচ্ছে আজ ক'সপ্তাহ ধরে! খুব টের পাচ্ছে। আর সবচেয়ে ইন্ট্রেস্টিং ব্যাপার হলো, যেই ঘটনা ঘটবে বলে সে অনুমান করছে, সেই ঘটনা আজ ঘটবে, আর আজকের সন্ধ্যাতেই ঘটবে। সে ভুল হলে, একটু পর তার প্রয়োজনীয়তা পড়তে পারে। খুব চাইছে, সে আজ ভুল হোক। তার সেনসিং পাওয়ারটা নষ্ট হয়ে যাক, তার সব ধরনের পারসেপশন ভুল বের হোক। খুব চাইছে সে।
সিগারেটের আগুনের তাপ যখন হাত স্পর্শ করল, প্রহর তবুও ধরে রাখল। সময় নিয়ে সেটা ফেলে আরেকটা ধরাল। তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। সিগারেটের প্রতি ঝোঁক তার বছর কয়েক হবে। তবে সে নিয়ন্ত্রণে থেকেছে। দিনে ৩টার অধিক কখনও নেয়নি। তবে বিগত সপ্তাহ ধরে সে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
ঘন্টা গেলেও যখন আয়াতের কল এলো না, প্রহর ধোঁয়া উড়তে থাকা সিগারেটটার দিকে তাকিয়ে হাসল। তার অনুমান ২০%, ৩০%, ৫০%, ৮০%, ৯৫% এ গিয়ে থামল। আর ৫% এর আশা নিয়ে সে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল, সন্ধ্যা নামতে লাগল।
—————
আয়াত রুমে ঢুকতেই মোশাররফ সাহেব এসে বললেন,
-“আম্মু, একটু কথা ছিল তোমার সাথে।”
-“বলো। কিন্তু, তোমাকে এত ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেন?”
মোশাররফ সাহেবের সাদা কাবলিটা কুঁচকে আছে, স্লিভস অগোছালোভাবে গোটানো, চুল-দাড়িও এলোথেলো। বড়ো করে একটা শ্বাস ফেলে তিনি বললেন,
-“তোমার আমজাদ আঙ্কেল আছেন না?”
-“হ্যাঁ, তোমার বন্ধু। তিনি না?”
-“হ্যাঁ। ও স্ট্রোক করেছে গতরাতে। আমি কাল থেকে হসপিটালেই ছিলাম। এখন ও কথায় কথায় বলছে, ছেলেকে আজই বিয়ে দেবে। আমি খুব করে বলেছিলাম, সুস্থ হলেই আয়োজন করে বিয়েটা দেবো। ও মানতেই চাইছে না। তাই জলদি তোমাকে ডেকে নিলাম।”
আয়াত বুঝতে পারছে না ব্যাপারটা। চোখ পিটপিট করে বলল,
-“এখানে আমি কী করতে পারি?”
-“তোমাকে আমি অনেকদিন আগেই বলেছিলাম আমার বন্ধুর ছেলের সাথে তোমার বিয়ের কথা। তোমার আপত্তি ছিল না, কেবল সময় চেয়েছিলে। এখন পরিস্থিতি অনুকূলে। রেডি হও, একটু পর বিয়ে পড়ানো হবে।”
আঁতকে উঠল আয়াত,
-“আশ্চর্য! এভাবে কীভাবে কী? কে মরল না বাঁচল, তাতে আমি কেন নিজের লাইফের এত বড়ো ডিসিশনে আসব?”
অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে মোশাররফ সাহেব একবার মেয়ের দিকে তাকালেন৷ পা ভেঙে এলো তার, বসে পড়লেন সোফায়। দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেছেন তিনি। বার বার ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছেন। বিরবির করছেন,
-“আমি ওদিকে কথা দিয়ে রেখেছি! বিয়ের ব্যবস্থা করতে বলেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজি চলে আসবে, ওর ছেলে মাহিন আর ভাবিও চলে আসবে। আমি মুখ দেখাব কীভাবে!”
আয়াত ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। অপ্রস্তুত হয়ে বসার দরুন ওড়নায় লেগে শেল্ফ থেকে গ্লাসের শো-পিসটা পড়ে ভেঙে গেল। শব্দ পেয়ে শক্ত-সামর্থ্য চেহারার মোশাররফ সরদারও সামান্য ঘাবড়ে উঠলেন ক্ষণিকের জন্য। দু-বার শ্বাস টেনে আয়াতের কাছে চলে এলেন তিনি। পাশে বসে বললেন,
-“আমাকে বিশ্বাস করো না, আম্মু? তোমার জন্মের সময়ই তোমার মা মারা যায়। তারপর থেকে তো তোমার গোটা দুনিয়া আমিই। তোমাকে সহস্র সুযোগ দিয়েছি জীবন উপভোগের। বিনিময়ে পেয়েছি তোমার বিশ্বাস। এখানে না-হয় বাবাকে আরেকটু বিশ্বাস করো? আই প্রমিস আম্মু, বাবা তোমাকে একটুও ঠকাবে না।”
আজ হুট করেই বুকের ভেতরে ‘মা’ শব্দটা খুব তীব্রভাবে লাগছে আয়াতের। অভ্যন্তরে ভীষণ দূর্বল কিসিমের অথচ বাহ্যিকতায় সর্বোচ্চ শক্তপোক্ত মেয়েটি আজ না পারছে রাগতে, না পারছে কাঁদতে। কেবল স্তব্ধ হয়ে একদৃষ্টে মেঝেতে তাকিয়ে আছে। পায়ের নখ দিয়ে টাইলস খুড়ছে সে। হাত দুটো মুঠো হয়ে আছে, নখগুলো হাতের তালুকে রক্তাভ বানিয়ে ছেড়েছে। সে এক্ষুণি উঠে চলে যাবে এখান থেকে। প্রহর? প্রহরকে ছাড়া সে কীভাবে থাকবে? অন্তত একবার তার বাবাকে বলা উচিত প্রহরের কথা।
সে তাকাল মোশাররফ সাহেবের দিকে। তার বাবার চোখ ভেজা। সে উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে। এক নিমিষেই নিজের পুরো শৈশব আয়াতের চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে কীভাবে মানা করবে এই মুহূর্তে? এখন তার বাবাকে যদি প্রহরের কথা বলে, কখনও মানা করবেন না তিনি। একদমই মানা করবেন না। রাজি হয়ে যাবেন একবাক্যে। কিন্তু বিনিময়ে ভীষণ অসম্মানিত হতে হবে তাঁকে। মেয়ের স্বার্থে এটুকু অসম্মান তিনি শতবার কাঁধে নিতে পারেন। কিন্তু আয়াত তার বাবাকে অসম্মানিত হতে দেখতে পারবে?
ছোট ছোট আঙ্গুলে যেই বাবার হাত ধরে সে চলতে শিখেছে, তার বিপরীত পথ কী করে ধরবে? আবারও বলতে চাইল প্রহরের কথাটা। একবার বলে দেওয়া উচিত। বাকিটা পরে দেখা যাবে। যা হওয়ার হবে, প্রথমে তো তার ভালোবাসা! একবার বললেই কী সুন্দরভাবে সবটার সমাধান এসে যাবে!
ঠিক তখন মোশাররফ সাহেব আয়াতের মুঠো করে রাখা হাত ধরে বললেন,
-“আম্মু, বাবাকে আরেকটু বিশ্বাস করো। মাহিন ছেলে হিসেবে ভালো খুব। কথা দিচ্ছি, কখনও অসুখী রাখবে না তোমাকে।”
নাহ! এভাবে শুধু শুধু কষ্ট পাওয়া। আয়াত মুখ খুলল বলার জন্য, “বাবা, আমি প্রহরকে ভালোবাসি।”
জড়তা অথবা সংকোচ কিংবা বাবার ঋণ! আয়াতের কথাগুলো শব্দ পরিবর্তন করে ফেলল,
-“আমি রাজি।”
মোশাররফ সাহেব স্বস্তি পেলেন। মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে চলে গেলেন। আয়াত চোখ বন্ধ করে ফেলল। মিনিট পাঁচেক সময় নিয়ে প্রহর আর তার এই অবধি কাটানো এত শত মুহূর্তগুলো ভাবতে লাগল। কী সুন্দর সময়গুলো! আচ্ছা, ও যাওয়ার পর কি প্রহর আবারও সেই আগের মতোই হাদারাম সেজে যাবে? ফিক করে হেসে ফেলল সে।
চোখ খুলে দেখল, সামনে রুমু দাঁড়িয়ে ফোঁপাচ্ছে। আয়াতকে ওর দিকে তাকাতে দেখেই রুমু বলল,
-“আমি আঙ্কেলরে বলি গিয়ে, প্রহর ভাইয়ার কথা? আপু, তোমার কষ্ট আমার সহ্য হচ্ছে না। কান্না পাচ্ছে।”
আয়াত হাত বাড়িয়ে রুমুকে কাছে আসার নির্দেশ দিলো। রুমু এসে পা ভাঁজ করে আয়াতের সামনে বসে পড়তেই, আয়াত ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
-“কিচ্ছু বলা লাগবে না।”
-“আপু, কেন বলা লাগবে না? প্রহর ভাইয়া কষ্ট পাবেন, তুমি কষ্ট পাবা! আমি তো মরেই যাব।”
-“বাবা বলেছে, আমি অসুখী থাকব না।”
-“তুমি ভেতর থেকে মরে যাবা, আপু। প্রহর ভাইয়াও মরে যাবে।”
-“পাগলি! কেউ মরবে না। সবাই ভালো থাকবে।”
রুমুর কান্না থেমে গেল। নিশ্চিত আয়াত পাগল হয়েছে। নয়তো এসব সে বলে কীভাবে? আয়াতের জায়গায় সে থাকলে, অন্তত কয়েকবার তো জ্ঞান হারাতোই! অথচ প্রকৃতি আজ কী খেলা দেখাচ্ছে! রুমু আবারও কেঁদে ফেলল। আয়াত রুমুকে বলল,
-“কাঁদিস না। কান্নাকাটি বিরক্ত লাগছে।”
রুমুর কান্না থামার বদলে আরও বেড়ে যাচ্ছে। আয়াত উঠে আলমারি থেকে মায়ের শাড়ি-গয়নাগুলো বের করল। ফ্রেশ হয়ে শাড়ি পরে নিল। চুলগুলো বিনুনি করল একটা। কানে ছোট গোলপাশা আর হাতে মায়ের দুটো মোটা বালা পরল। সাজতে ইচ্ছে করছে না ঠিক। তবে যতটা না সাজলে বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সুখী হওয়ার নাটকটা না করা যায়, ততটা সেজে নিল সে। টঙের দোকান থেকে আয়াতের গতিবিধি লক্ষণীয় নয়। তবে প্রহর বসে বসে তা কল্পনা করে নিচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা সাদা রঙের প্রাইভেট কার প্রহরের সামনে দিয়ে সোজা আয়াতদের বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। প্রহর স্থির চোখে তা দেখল। আকাশে রাত নামল এরপর। মনেও রাত নামল।
আয়াত বলেছিল, বাড়ি গিয়েই কল দেবে প্রহরকে। সে দেয়নি। প্রহর কি অপেক্ষা করছে? সারাজীবন হিমু সেজে তাকে রূপার মতো অপেক্ষা করাল। আজ কি সে অপেক্ষা করবে? হিমুরা তো অপেক্ষা করে না। তারা পরিণতি দেখে। ব্যাপারটা বেশ জানে আয়াত। তবুও একবার কল করল।
প্রহর জানে কলটা কার। সে পকেট হাতড়ে ফোন বের করে কন্ট্যাক্ট নেইম না দেখেই কল রিসিভ করে কানে তুলল। ওপাশ থেকে শব্দ আসছে না। প্রহর স্থিরভাবে বারান্দার দিকে তাকিয়ে রইল। আয়াত পর পর ক'টা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল। সময় নিয়ে প্রহর বলল,
-“একটু বারান্দায় আয়।”
আয়াত তৎক্ষণাৎ বারান্দায় ছুটে গেল। অন্ধকারের মাঝেও তার চোখ গিয়ে আটকাল কিছুটা দূরে টঙের দোকানের সামনে বাইকে হেলান দিয়ে বসে সিগারেট ফুঁকতে থাকা এক অসম্ভব রকমের মন কেমনের কারণের দিকে।
বারান্দায় বঁধুবেশে তার প্রেয়সীর আগমন যেন বুকের ভেতর তীব্র ঘুর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হলো। প্রহর ডাকল,
-“সাওদাহ্!”
কেঁপে উঠল আয়াত,
-“হুঁ...”
-“সুন্দর দেখাচ্ছে তোকে।”
আয়াত কিছু বলল না। সেভাবেই তাকিয়ে রইল। রুমু তখন এসে বলল,
-“আপু, তোমাকে ডাকতেছে সবাই। সময় হয়ে গেছে। চলো।”
আয়াত সেদিকে তাকাল না। তবে রুমুর কথার শব্দগুলো প্রহরের কানে এসে লেগেছে। সময় হয়ে গেছে? সবাই ডাকছে? আজ তার ব্যক্তিগত মানুষটা এতগুলো মানুষের মধ্যমণি হবে। সবাই দেখবে। সবাই প্রশংসা করবে। আর রাতে আরেকজন ছুঁয়ে দেবে। প্রকৃতির নিয়ম! কী সুন্দর!
প্রহর সিগারেটে সুখটান দিয়ে ধোঁয়া আকাশে ওড়াল, বড়ো শীতল আওয়াজে বলল,
-“চাঁদ আমার, তুমি অন্যের আকাশকে শোভিত কোরো।
ভালোবাসা আমার, তুমি ভালো থেকো।”
আয়াত ফট করে কল কেটে দিলো। প্রহর ফোন পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে হাতের সিগারেট ফেলে দিলো। আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে নিল এরপরই। পুরোটা সময় একবারের জন্যও দৃষ্টিটা বারান্দা থেকে সরায়নি। আয়াত সরে গেল। বারান্দার গ্লাস আটকে দিলো, এরপর পর্দা টাঙিয়ে ফেলল।
প্রহরের অনুমান শক্তিকে পুরোপুরি নির্ভুল বানিয়ে সে সাড়ে সাত বছরের ভালোবাসা ছেড়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক মানুষকে স্বামী হিসেবে তিনবার কবুল করে নিল। এ-দিকে সে অন্য কারো জন্য সাজল, ও-দিকে প্রহর সিগারেটের দ্বিতীয় প্যাকেটটিও প্রায় খালি করে ফেলল।
হয়তো আয়াত যদি আজ একবার মোশাররফ সাহেবকে নিজের ভালোবাসার কথাটা বলত, গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। কিন্তু এতে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। যা আয়াত ডিঙিয়ে যেতে পারেনি। যে বাবা তার সব ইচ্ছে-অনিচ্ছের প্রাধান্য দিয়েছে, তার চোখে জল সে দেখতে পারেনি। ছোটবেলায় যেই বাবা মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছে, সেই বাবার মাথা নিচু হয়ে যাবে—এমনটা সে ভাবতে পারেনি। যেই বাবা সর্বদা তাকে নিজের চেয়ে ওপরে রেখেছে, তার চেয়ে বেশি সে নিজেকে ভালোবাসতে পারেনি। অতঃপর তার পঁচিশ বছরের ভালোবাসার কাছে সাড়ে সাত বছরের ভালোবাসা নত হলো।
এখানে দোষ তার শতাংশের। ভালোবাসাকে যদি আমৃত্যু ভালো থাকা হিসেবে নিশ্চিতই সে না করতে পারে, তবে কেন ভালোবেসেছিল? এই ভুলটার অনুশোচনা তার হওয়া উচিত। তাই শাস্তি হিসেবে বেছে নিল অন্যের সংসার। তারপর মনে মনে নিজের মনকেই সে চরম একটা অভিশাপ দিয়ে ফেলল, “মেহেরিন আয়াত সাওদাহ্, তুই পুরুষের মন ভেঙেছিস, তোর জীবনটা গুড়িয়ে যাক।”
ঠিক প্রহরের সামনে দিয়েই বউ সেজে সেই সাদা রঙের গাড়িটিতে করে আয়াত চলে গেল। সিগারেটের আরেকটি প্যাকেট পকেটে পুড়ে নিয়ে সে-ও শহরের অলি-গলিতে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে লাগল৷ আজ রাতে তার এত যত্নের নারীটিকে অন্য পুরুষ মলিন করে দেবে। প্রহর বাইকের স্পিড আরও বাড়িয়ে দিলো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………