শুক্লপক্ষের পরিশেষে - পর্ব ৪৮ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

শুক্লপক্ষের পরিশেষে - নবনীতা শেখ
          প্রিয়র কল কেটে দেওয়ার পর শ্রেয়ান সেই নির্জন রাস্তাটির ফুটপাথ ধরে একপাশে বসে বসে আকাশ দেখছিল। কল দেওয়াটা যে কত বড়ো বোকামি ছিল, তা ভেবে কপাল চাপড়াচ্ছিল। শেষবার প্রিয়র কাছে ছবি পাঠিয়ে কী বিশ্রী কাণ্ডটাই না ঘটিয়েছিল! এতটা ইমম্যাচিউরিটি সে দেখিয়েছিল ভাবতেই রাগে মাথা খারাপ হয়ে যায়। সেসব ভাবনার মাঝে প্রিয়র কল আসে।

শ্রেয়ান কিছুটা অবাক হলো প্রথমত, এরপর বার দুয়েক প্রলম্বিত শ্বাস ছেড়ে কল রিসিভ করল। দু-পাশে থমথমে নিস্তব্ধতা। অনেকটা পর শ্রেয়ান পুনরায় শ্বাস ফেলে শুধাল,
-“কেমন আছ?”

প্রিয় প্রত্যুত্তরে বলল,
-“ভালো আছি৷ তুমি কেমন আছ?”
-“আছি।”
-“কী করছ?”
-“এই তো, রাস্তায় বসে আছি।”
-“কেন? কত রাত! বাড়ি ফেরোনি?”
-“ইচ্ছে করছে না।”

তারপর দুজনেই কথা হারাল। অনেকটা সময় পর প্রিয় শুধাল,
-“কল দিলে যে হঠাৎ?”
-“এমনিই।”
-“এমনি কল দিলে কি চলবে? আমি বিবাহিত, আমার পাশে আমার স্বামী থাকে।”
-“সরি, ভুল হয়ে গেছে। খেয়ালে ছিল না এত কিছু।”
-“খেয়ালে রাখতে হবে, শ্রেয়ান। যাক সেসব। তোমার স্ত্রী কেমন আছে?”
-“ভালো আছে।”
-“ভালো রেখেছ তো?”

শ্রেয়ান এ-পর্যায়ে মলিন হাসল,
-“আমি কাউকে ভালো রাখতে পারি না। আমার দ্বারা কেউ ভালো থাকে না।”

প্রিয় জানতে চাইল,
-“কিছু বলো তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে, শুনি।”

শ্রেয়ান ধুলোমাখা রাস্তায় সোজা শুয়ে পড়ল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,
-“ওকে কোনোদিন সেভাবে লক্ষ করা হয়নি।”

প্রিয় রসিকতা করে বলল,
-“বললে এক মিথ্যে! ইন্টিমেট হওনি?”
-“হয়েছি।”
-“লক্ষ না করেই?”
-“করেছি লক্ষ, তবে কীরকম ও—এটা বর্ণনা করার মতো কখনও ভাবিনি ওকে।”
-“আজ ভাবো একটু, শুনি।”

শ্রেয়ানকে ভাবার জন্য প্রিয় সময় দিলো। গুনে গুনে ছয় মিনিট ভেবে শ্রেয়ান বলল,
-“ভীষণ মিষ্টি একটা মেয়ে ও। দেখতেও সুন্দর। মায়ের চাচাতো বোনের মেয়ে তুশি। প্রথমে ভেবেছিলাম ঠিক বনিবনা হবে না। মায়ের সাইডের কাজিনগুলো বেশ গায়েপড়া ছিল, ওভার স্মার্ট ছিল। ওকেও তেমনই ভেবেছি। বিয়ের পর দেখলাম, ও কিছুটা ভিন্ন। ওর মাঝে ম্যাচিউরিটি একটুও নেই, সামান্য চঞ্চল। রাগটাগ এ-অবধি দেখিনি। তবে ভীষণ ছিঁচকাঁদুনে ও। আমি সামান্য কড়া নজরে তাকালে ছাদে গিয়ে কেঁদে আসে। রাতে ওর ফুলো মুখ দেখে মা আমাকে হাজারটা প্রশ্ন করে। আমি অসহায় চোখে তখন ওর দিকে কেবল তাকাই, কিছু বলতে পারি না আর। 

রাতে আগে আগে গিয়ে সাইড ঘেঁষে শুয়ে পড়ে। আমিও আমার সাইডে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যে টের পাই, ও এদিকে আসছে। আস্তে আস্তে আমার সাথে মিশে যাচ্ছে। এরপর একসময় আমার পিঠে মুখ রেখে ফোঁপানো শুরু করে দেয়। জানো, প্রিয়শ্রী? আমাকে নিয়ে ওর হাজারো অভিযোগ। আমি সেসব শুনি, তবে কেন যেন ওর কান্না সহ্য করতে পারি না। ওর কান্না ভালো লাগে না। 

ওর ফোঁপানো শুনেই তাই ওর দিকে ঘুরে ওকে বুকে নিই। বুকে মুখ লুকিয়ে ও শব্দ করে কাঁদতে থাকে। বাড়ির কেউ শুনে ফেললে কী একটা অবস্থা হবে ভেবেছ? আমি ওকে শান্ত করতে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকি। এক পর্যায়ে অভিযোগ ঝাড়া শুরু করে সে। ঠিক বাচ্চাদের মতো বলে—‘আপনি আমাকে শুধু কষ্ট দেন, আমার ভালো লাগে না, আপনি এরকম কেন করেন? আপনি একটু ভালোভাবে কথা বললেই তো আমার এত কষ্ট লাগে না। শুধু শুধু আমাকে কান্না করান। আমাকে কাঁদিয়ে এত শান্তি পান?’
বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উলটে এসব কথা বলে। আমার হাসি পায়, আমি হাসতে পারি না। আমি মলিন দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। মাঝে মাঝে বলেও ফেলি—আর কষ্ট দেবো না।

ও পরদিন উঠে সব ভুলে যায়। আহ্লাদী হয়ে পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। মালি কাকার বউয়ের সাথে বাগানের সাইডে বসে ফুলের মালা বানায় প্রায়শই। তারপর ফুল দিয়ে সেজে আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন লাগছে?’
আমি কিছুক্ষণ ওকে দেখি। আমি অস্বীকার করতে পারব না—আমার বউটা আহামরি সুন্দর না হলেও, স্নিগ্ধ মারাত্মক। আমি চোখ ফেরাতে পারি না। মনে হয় কিছুটা সময় ওকে না দেখলে আমার সাংঘাতিক ভুল হয়ে যাবে। আমি মনের চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে তাকিয়ে থাকি। শেষে বলি, ‘সুন্দর লাগছে।’
আমার মুখস্ত জবাবের বিনিময়ে ওর মুখস্ত প্রত্যুত্তর ঠিক যেন সর্বদা ঠোঁটের আগায় থাকে, ‘আপনাকেও সুন্দর লাগছে।’

মিষ্টি করে হাসে, তারপর চলে যায়। আমি কেমন যেন ঘরমুখো হয়ে যাচ্ছি, প্রিয়শ্রী। বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে। ভবঘুরে লাইফটা থেকে ঠিক কখন যে বিচ্ছিন্ন হয়ে এসেছি, বলতে পারি না। দায়িত্ববোধ ভীষণ বাজেভাবে আমাকে চেপে ধরেছে। ব্যস্ততা, প্রিয়শ্রী, ব্যস্ততা! আমি এখন সত্যিকারভাবেই ব্যস্ত। তুমি বিশ্বাস করবে না, আমি শেষ কবে ড্রিংক করেছি, মনে নেই। আমি শেষ কবে তুশি ছাড়া অন্য মেয়ের দিকে তাকিয়েছি, মনে নেই। আমি ভালো হয়ে যাচ্ছি।”

প্রিয় মুগ্ধ হয়ে শুনল। বুকের কোণার ধারালো ব্যথাটাকে অগ্রাহ্য করে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে বলল,
-“কষ্ট দিয়ো না মেয়েটাকে। ও মোটেও কোনো ধরনের কষ্ট ডিজার্ভ করে না।”

শ্রেয়ান হেসে উঠল,
-“প্রিয়শ্রী, শোনো!”
-“বলো।”
-“পুরুষ তার শখের নারীকে হারানোর পর থেকে দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। তুমি আমার কতটা শখের ছিলে, আমি তোমার পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হবার পর তা টের পেয়েছি। ছিলাম আমি আগে এক অমানুষ। নয়তো কি তোমাকে ধরে রাখার ইচ্ছে না দেখিয়ে থাকতে পারতাম?”

প্রিয় দোল খেতে থাকা দোলনাটা থামিয়ে ফেলল মেঝের সাথে পায়ের ঘর্ষণে। থেমে থেমে বলল,
-“এই পরিবর্তনটা আগে হলে মন্দ হতো না, তাই-না?”

শ্রেয়ান চোখ বন্ধ করল। কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অজানা অনুভূতির সাথে অশ্রু, 
-“তবে আজ তোমার আর আমার দুটো ভিন্ন সুখের গল্প হতো না। আমরা ভালো আছি খুব, প্রিয়। তাই-না?”

প্রিয় মলিন হাসল,
-“হ্যাঁ, ভালো আছি।”

তারপর দু-জনেই চুপ। প্রকৃতি চুপ। সময় চুপ। শ্রেয়ান গুনগুন করল, 
ওরা সুখের লাগি চাহে প্রেম
    প্রেম মেলে না..
    শুধু সুখ চলে যায়
    শুধু সুখ চলে যায়
    এমনই মায়ার ছলনায়..

প্রিয় বলে উঠল,
-“সুখ যায়নি, শ্রেয়ান। সুখ যায়নি। আমাকে তুমি নিজ দায়ে হারিয়েছ, প্রকৃতি তোমায় তার চেয়েও চমৎকার কিছু ফিরিয়ে দিয়েছে। সেই চমৎকার কিছু একটাকে ঠুকরিয়ো না। সে তোমার অপেক্ষায় আছে, সে এখনও তোমার অপেক্ষায় আছে। তার কাছে ফেরো। স্রষ্টা তোমায় ভালো রাখুক।”

শ্রেয়ানের মাথায় কথাটা ধরল সময় নিয়ে। সে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়াল, ফোন কানে নিয়েই গাড়িতে উঠে বসল। ড্রাইভ করতে করতে প্রিয়কে বলল,
-“আমি তোমাকে কখনও ভুলতে পারব না, প্রিয়শ্রী। কখনও ভুলতে চাই না। আমি তোমায় যেসব ভুলে হারিয়েছি, আমি সেসব ভুল আমৃত্যু মনে রাখব। আমি সেসব ভুলগুলো শুধরে নেব তুশির ক্ষেত্রে। ও পাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষকে।”

প্রিয় দোলনাটা গতিশীল করে বলল,
-“সাবধানে ড্রাইভ করো।”
-“প্রিয়শ্রী?”
-“হুম।”
-“পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুল তুমি, শোনো! তুমি অন্যের ঘরকে সুরভিত করো, যেভাবে আমার জীবন এসে থমকেছে অন্যের সুঘ্রাণে। তুমি আমায় ক্ষমা কোরো, তুমি ভীষণ ভালো থেকো।”
-“তুমিও ভালো থেকো, শ্রেয়ান। আমায় ক্ষমা করো, আমি তোমায় ক্ষমা করতে পারব না।”

হাসল শ্রেয়ান,
-“না করলে। আমি ডিজার্ভ করি। কিছু মানুষের আমৃত্যু ঘৃণা বয়ে বেড়ানোটা আমি ডিজার্ভ করি। তুমি শুধু ভালো থেকো, আমার তাতেই চলবে। আমিও ভালো থাকব। তুশি মেয়েটা আমায় ভালো রাখবে।”
-“আমি জানি।”

তারা অদ্ভুত কিছু ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে। তারা মানুষকে খুব সহজেই ভাঙতে পারে, তারা মানুষকে ভীষণ শক্ত দণ্ডের ন্যায় এক নিমিষেই তৈরি করতে পারে। যেমনটা শ্রেয়ান ভেঙেছে প্রিয়কে, শরৎ তৈরি করেছে; শ্রেয়ানের ক্ষেত্রে প্রিয় ও তুশিও একই ভূমিকা পালন করেছে।

—————

প্রিয় রুমে ফিরল বেশ সময় নিয়ে। তখন মেজাজটা ফুরফুরে হয়ে আছে ওর। এসে বেডে বসে ল্যাম্পটা অফ করল। সময় নিয়ে সোজাসুজিভাবে শুয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতেই শরৎ এসে জড়িয়ে নিল প্রিয়কে। প্রথমে কপালে চুমু, এরপর দুই চোখে চুমু, নাকের ডগায় চুমু, দুইগালে চুমু, থুতনিতে চুমু, ঠোঁটে চুমু। তারপর দু'ইঞ্চি ওপরে থেকে মুখোমুখি তাকিয়ে রইল। প্রিয় পিটপিট করে চোখ খুলে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“এভাবে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে কেউ শিকার করতে আসে? গর্জন তো করে আসবেন, আমি হরিনী বেচারি একটু প্রস্তুতি নিতাম!”

শরৎ একই ভঙ্গিমায় ফিসফিস করল,
-“প্রস্তুতি? উঁহু, দরকার নেই।”
-“বললেই হলো?”
-“প্রিয়, আপনি এত টেস্টি কেন? ইয়াম্মি ইয়াম্মি।”

প্রিয় হেসে ফেলে বলল,
-“কিছু মিছু গিললেন নাকি, মশাই?”
-“ইউ মিন নেশাদ্রব্য?”
-“ইয়েশ!”
-“আপনি থাকতে ওসবের কী দরকার? লেট মি টেস্ট ইউ এগেইন।”

শরৎ আবারও চুমু খেল প্রিয়র ঠোঁটে। এলোমেলোভাবে উঠে পড়ল প্রিয়র ওপর। তার দু'পা প্রিয়র দু'পাশে, দু'হাত প্রিয়র হাত দুটোকে আটকে ফেলল। নিঃশ্বাসের বেগ এলোমেলো। প্রিয়র বুকের ওঠা-নামা শরৎ টের পাচ্ছে ভীষণভাবে। এক হাত উঠিয়ে প্রিয়র ঠোঁটে স্লাইড করল শক্তভাবে। সেই হাতটা কানের সাইডে গুঁজে শরৎ প্রিয়র ঠোঁটের ভাঁজে ঠোঁট রেখে বলল,
-“ওয়ানা সি মাই ম্যাডনেস? ওয়ানা?”

প্রিয় কম্পনরত ঠোঁট শরতের ঠোঁটকে ছুঁয়ে ধীরতায় শব্দ করল,
-“ইয়েসসস..”

এরপর চুমু। একটা চুমু কেবল শুধু চুমু নয়, একটা চুমু কখনও সখনও মনের বিষকেও ভাগাভাগি করে নেওয়ার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। তারপর দীর্ঘ সময়ের আশ্লেষের চুম্বন শেষে প্রিয় যখন হাঁপিয়ে উঠল, শরৎ গলা ও কাঁধে ছোট ছোট চুমুতে প্রিয়র অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলতে লাগল। প্রিয়র হাত উঠে এলো শরতের চুলে, মুঠো করে ধরে ফেলল শরতের জংলীপনা সহ্য করার তাগিদে। শরতের পাগলামি ক্রমশ বাড়তেই লাগল। প্রিয়র দুইহাতের কব্জিতে শরতের হাতের গ্রিপ শক্ত হয়ে উঠল। ছোট ছোট চুমু টুকরো টুকরো কামড়ে পরিণত হয়ে উঠল। শরতের হাত উঠে এলো প্রিয়র পিঠের দিকটায়, কামিজের চেইন খুলে জামার গলাটা কাঁধ বরাবর নামিয়ে দিলো। প্রিয় শরতকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিলো। উঠে বসল শরতের পেটের ওপর। শরতের সমগ্রমুখে চুমু খেতে খেতে আস্তে-ধীরে নিচে নামল। খালি লোমশ বুকে এসে গভীরভাবে শ্বাস টানল। শরতের স্মেলটা তার কী যে ভালো লাগে! খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। ভাবনার সাথে তাল মেলালো সে। শরতের বুকটা কামড়ে ভেজাতে লাগল। প্রিয়র কাঁধে শরতের নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে। আবারও মেতে উঠেছে আদিম খেলায়। শীৎকৃত ধ্বনিতে মুখোরিত হতে লাগল রাতটা। প্রিয় ক্রমাগত এটা-সেটা বিরবির করছে। তবে যা শরতের মন-মস্তিষ্কে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলল, তা হলো প্রিয়র বলা একটি কথা,
-“নীরজ, ভালোবাসাকে ভালোবাসার আগে, তোমায় ভালোবাসি। কারণ তুমি আমার ব্যক্তিগত মানুষ।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp