শুক্লপক্ষের পরিশেষে - পর্ব ৫২ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

শুক্লপক্ষের পরিশেষে - নবনীতা শেখ
          নীহিন ঢাকায় বেড়াতে এসেছে আজ বিকেলে, সাথে আরহা আর নিশানও এসেছে। বিকেলটা আড্ডায় জমে-টমে গেলেও, রাতে শোয়া নিয়ে বাঁধল বিরাট ঝামেলা। দুটো বেডরুমের একটায় মেয়েরা থাকবে, অন্যটায় ছেলেরা। এই সিদ্ধান্তে সবাই রাজি হলেও দ্বিমত পোষণ করল শরৎ।

তার সোজা কথা, বউ ছাড়া সে ঘুমাবে না। যে ঘরে বউ নেই, সে ঘর আবার কেমন ঘর? এর চেয়ে বরং সে ওয়াশরুমে রাত্রিযাপন করবে৷ আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বাকি সদস্যরা শরতের এমন আক্ষেপ করে বলা “ওয়াশরুমে রাত্রিযাপন” বিষয়টাও মেনে নিল হাসিমুখে! বয়সের ভারে শরৎ পারে না গড়াগড়ি খেয়ে কেঁদে কেঁদে বলতে, “আমার বউ লাগবে, বউ না দিলে উঠব না।”

রাতে এত এত চিন্তার মাঝে শরতের মুখটা একদম রস চিপে আলাদা করা তালের মতো চুপসে ছিল। তাদের বেডরুমে থাকবে নীহিন, আরহা আর প্রিয়। আর অন্য রুমটায় নিশান ও শরৎ। শরৎ অসহায় মুখে একবার প্রিয়, অন্যবার নিজেদের বেডরুম দেখে পালাক্রমে শ্বাস ফেলছিল। 

রাতের দিকে বসার ঘরে সবাই বসে মুভি দেখতে লাগল। শরতের মুখটা সেই শুরু থেকেই গম্ভীর। সে না হাসছে, না কথা বলছে। ব্যাপারটা ধরতে পেরে নিশান ঠোঁট টিপে হেসে যাচ্ছে। তার খুব ইচ্ছে করছে বড়ো ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলতে,
-“চিন্তা করবেন না, বড়ো ভাই। আমার বিশ্বাস আপনি আপনার বউকে অতিশয় শীঘ্রই কাছে পাবেন।”

ব্যাপারটা কেমন যেন রসিকতার পর্যায়ে এসে পড়েছে। প্রিয় ফিক করে হেসে ফেলল। শরৎ রেগে-মেগে ওর দিকে চোখ কটমট করে তাকাতেই প্রিয় শব্দ করে হেসে উঠল। গা বাঁচানোর তাগিদে শোবার রুম গোছানোর বাহানায় প্রস্থান ঘটাল, যেন ওই নজর থেকে সরতে পারলেই আপাতত সে বাঁচে। 

রুমে এসে হাঁফ ছেড়ে বসে পড়ল। পর পর বুকে হাত রেখে খিলখিল করে হাসতে লাগল। জীবন তাকে কী সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত দিচ্ছে! এক পৃথিবী সমান ভালোবাসা হারানোর পর জীবন তাকে গোটা মহাবিশ্ব সমান ভালোবাসা দিয়েছে। কী সৌভাগ্য তার! চারদিকে শান্তি, শান্তি ও কেবল শান্তি!

এর মাঝে কল এলো প্রিয়র ফোনে। ভিডিয়ো কল। প্রিয় মিহি হেসে কল রিসিভ করে সামনে ধরল। ওপাশ থেকে প্রহর বলল,
-“কী করিস, আপু?”
-“কিছু করছি না। তুই? কেমন ঘুরছিস?”
-“ভালো, মাত্র হোটেলে ফিরলাম। ভাইয়া কই?”
-“তোর ভাইয়া ড্রয়িং রুমে বসে আছে। বাড়ি থেকে নীহিনেরা এসছে না! ওদের সাথেই।”
-“ও আচ্ছা।”
-“হ্যাঁ।”

তারপর দুইজনেই চুপ। প্রহর কথা খুঁজে পাচ্ছে না, প্রিয়ও কিছু বলতে পারছে না। প্রিয় সরাসরি জিজ্ঞেস করতে চাইছে না। প্রহর নিজ থেকে কীভাবে বলবে তা বুঝে উঠছে না। অবশেষে প্রহর অনেক ভেবে বলল,
-“আচ্ছা আপু, প্রকৃতির চমক এত বিশ্রী হয় কেন?”

প্রিয় হেসে বলল,
-“কারণ প্রকৃতি অকস্মাৎ চমকে দিতে ভালোবাসে। এখন সে ঠিক সময়ে ঠিক চমক দিলে আমরা খুশি হই, ওদিকে ভুল কিছু হয়ে গেলেই বিশ্রী ঠেকে যায় ব্যাপারটা।”
-“তোর কাছে সব প্রশ্নের উত্তর আছে, তাই না আপু?”
-“সব প্রশ্নের উত্তর নেই, তবে তোর প্রশ্নের উত্তর থাকলেও থাকতে পারে। জিজ্ঞেস করতে থাক, দেখি আছে কি না।”

প্রহর হেসে মাথার পেছনের চুলগুলো চুলকে নিয়ে বলল,
-“আমি কি ধরে রাখতে জানি না?”

প্রিয়র চোখে অবসন্নতা লেপটে গেল,
-“তোকে আমি ধরে রাখা শেখাইনি, বাবু। ছোট থেকে সবকিছু আমিই করে এসেছি। তোকে কেউ বকলে আমি মেরে এসেছি, তোকে কেউ কষ্ট দিলে আমি তাকে এর ফলাফল দেখিয়ে এসেছি, তোর কিছু করা লাগেনি। তুই এজন্য ছোট থেকেই আমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলি। বন্ধুবান্ধব ছিল না তোর। আর আমি তো ছিলাম, আছি, থাকব! আমাকে ধরে রাখার মতো কোনো প্রয়োজন তোর ছিল না। তাই শিখিসনি। এখানে তোর দোষ কী করে দিই?”

প্রহর আবারও জিজ্ঞেস করল,
-“আমি তাকে দোষ দিতে পারছি না কেন?”
-“কারণ তোর নিজের এখানে অধিক দোষ।”
-“আমার?”
-“হুঁ।”
-“কী দোষ?”
-“আমি কী করে জানব? তুই ভাব!”

প্রহর ভাবতে বসল। এখানে অবশ্যই তার বেশি দোষ। সে আগে থেকেই টের পাচ্ছিল। সে তো পারতোই আয়াতকে রেখে দিতে। কিংবা সে বিকেলে যখন তারা রমনায় ছিল, চাইলেই তো ফিরে না যেতে দিয়ে আটকে রাখতে পারতো! সে কি পারতো না? তবে কেন তা না করে আয়াত কী করে না করে, তার ভরসায় বসে রইল? ভুলকাজ!

প্রহর সরাসরি বলল,
-“আপু, সাওদাহ্‌র বিয়ে হয়ে গেছে।”

বুকের ভেতরটায় কাঁপন ধরে গেল প্রিয়র। দৃঢ় চোখের পাতা কিয়ৎক্ষণের জন্য বুঁজে এলো। পর পর খুলে গেল৷ এবার সে শান্ত। বুকের ভেতর চলতে লাগা অশান্ত ঝড়ের বহিঃপ্রকাশ বাইরে দিয়ে দেখা গেল না। তবে চোখ দুটো লাল হয়ে এলো। অসম্ভব শান্ত চোখ দুটো রক্তাভ। স্বাভাবিকভাবেই শুধাল,
-“কবে?”
-“যেদিন এলাম, ওদিন।”
-“তোকে বলে করেছে?”
-“বিয়ের মিনিট দশেক আগে জানিয়েছিল।”
-“ডিড শি চিট অন ইউ?”

প্রহর হো হো করে হেসে বলল,
-“না। বেসিক্যালি আই ডিড।”
-“কীভাবে?”

পুরো ঘটনাটা কয়েক শব্দে বর্ণনা করল প্রহর। প্রিয়র হতাশামিশ্রিত শ্বাস ধরা ছুঁতে লাগল। তারপর বলল,
-“তুই কি কখনও আয়াতকে ভালোবেসেছিলি?”
-“ভালোবেসেছিলাম কি না জানি না, তবে নিজস্বতা ভেবেছিলাম। নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলাম।”
-“আর নিজের কাছে রাখার জন্য কতটুকু কী করেছিলি?”
-“নাত্থিং!”

হো হো করে হেসে উঠল প্রহর। প্রিয় আবারও বলল,
-“একটা মানুষ পাগলের মতো ভালোবেসে গেলে বিনিময়ে আমরা তাকে একটুখানি সান্ত্বনামূলক ভালোবাসা দেখাই। আয়াত তোর থেকে এতটুকুও ভালোবাসা দেখেনি। তুই অস্বীকার করবি?”
-“এত সত্য কথা অস্বীকার করে পারা যায়?”
-“না, যায় না। তুইও অস্বীকার করবি না।”
-“ঠিক আছে।”
-“মেয়েটা তোকে ভালোবেসেছিল, খুব ভালোবেসেছিল। বুঝতে পারছিস ব্যাপারটা?”
-“পারছি। আর তা আমার বুকটার ওপর সহস্র ধারালো সুচ হয়ে বিঁধছে।”
-“আর কয়টা দিন পরে লক্ষ-কোটি সুচ বেশি বিঁধবে তোর বুকে। কেননা তুই তাকে তার চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিস কিন্তু বিন্দু সমান প্রকাশ করিসনি।”

আরেকটা তীক্ষ্ণ সত্য! প্রহর তা জানে, জানে বলেই কষ্ট কম পাচ্ছে। এই যন্ত্রণাটার প্রাপ্য সে। একপাক্ষিক মেয়েটা কষ্ট পাবে, তা কেন হয়? প্রহর তাকাল প্রিয়র ক্লান্ত চোখে। তার হাসিটায় কতখানি বিষাদ মিশে আছে, তা কেন প্রিয় ধরতে পারছে? 

প্রিয়র পূর্বের কথার জবাবে প্রহর বলল,
-“তাই হোক আমার সাথে।”
-“তুই কষ্ট পাচ্ছিস খুব?”
-“পাচ্ছি, তবে খুব না, অল্প।”
-“অল্প কেন?”
-“নিজ দোষে মুখ থুবড়ে পড়ার পর কাঁদার অবকাশ থাকে না।”
-“তবে মন পুড়ছে?”
-“পুড়ছে তো।”
-“ভাই আমার, তোর কষ্ট আমার সহ্য হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে ওর বরকে মেরে ওকে নিয়ে আসি।”

প্রিয়র ছেলেমানুষী কথায় প্রহর হাসবে কি না বুঝতে পারছে না। এদিক-ওদিক চেয়ে বলল,
-“আপু, মানুষ সব পায় না তো। তাই না?”
-“হ্যাঁ, তাই।”
-“এজন্যই অনুপম গেয়েছিলেন, সব পেলে নষ্ট জীবন।”
-“হুম।”
-“অপ্রাপ্তি সুন্দর। আমাদের অনেক সুন্দর স্মৃতি ছিল। বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট না?”

প্রিয় শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল। জীবনের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারলে জীবন কী সুন্দর! নয়তো এর চেয়ে বিশ্রী দ্বিতীয়টি নেই। সে মেনে নিতে পারেনি বলেই জীবনের বেশ বড়ো একটা সময় জীবন্মৃত ছিল। অথচ প্রহর!

প্রিয় বিরবির করল,
-“ভাই আমার, তোর পৃথিবীটা সুন্দর হোক।”

নীহিন এলো রুমে, প্রিয়র দিকে এগিয়ে গিয়ে একহাত জড়িয়ে ধরে বলল,
-“ভাবি, ভাই ডাকছে। চলো চলো।”
-“ডাকছে?”
-“হ্যাঁ।”
-“আচ্ছা, যাচ্ছি।”

প্রহর নীহিনকে দেখে মুচকি হেসে বলল,
-“হাই নীহিন, কী খবর?”

প্রিয় নীহিনের হাতে ফোন ধরিয়ে বলল,
-“কথা বলো!”

এরপর চলে গেল। নীহিন কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। ইতস্তত করতে করতে বলল,
-“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। প্রহর ভাই, আপনি কেমন আছেন?”
-“ভালো আছি।”
-“দিনকাল ভালো যায়, প্রহর ভাই?”
-“হ্যাঁ, যাচ্ছে। তোমার ব্যাপার বলো?”
-“এই তো!”
-“পড়াশোনা কেমন চলছে?”
-“জি ভালো।”
-“এক্সাম কেমন দিলে?”
-“বেশ ভালো।”
-“অ্যাডমিশনের প্রিপারেশন?”
-“নিচ্ছি, প্রহর ভাই।”

এরপর আর কেউ কথা বলল না। প্রহর চুপিচুপি বারান্দার ধারে চলে এলো। এখান থেকে সমুদ্রটা বেশ দারুণভাবে দেখা যাচ্ছে। প্রহর ব্যাক ক্যামেরা ওপেন করে বলল,
-“নীহিন, আজ কিছু কথা বলব তোমায়, মন দিয়ে শোনো।”
-“হ্যাঁ, বলুন না, প্রহর ভাই!”
-“তুমি ভীষণ বুঝদার একজন মেয়ে। তোমার থেকে শেখার অনেক বিষয় আছে। আজ যেটা বলব, সেটা তুমি জানো। তবে আমার বলে স্বস্তি লাগবে বলে বলছি।”

প্রহর থামল, তারপর আবার ডাকল,
-“নীহিন, শুনছ?”
-“বলুন, শুনছি।”
-“ওই যে, সমুদ্রের জল দেখতে পাচ্ছ?”
-“পাচ্ছি।”
-“ওটা জীবন।”
-“আচ্ছা।”
-“আর ঢেউগুলো হচ্ছে কষ্ট।”
-“আচ্ছা।”
-“তীরটা হচ্ছে তোমার বুক। ঠিক আছে?”
-“ঠিক আছে।”
-“দেখতে পাচ্ছ? কষ্ট বার বার তোমার বুকে আছড়ে পড়ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে। আবারও আসছে, আবারও যাচ্ছে। একটা চক্রের মতো চলছে।”
-“আর সুখ?”
-“সেটা স্বয়ং তোমার কাছেই আছে। দুঃখ এলে সাময়িকভাবে তা ভুলে যাবে। তারপর আবারও সুখ পাবে। কেবল হতাশ হবে না। জীবন সুন্দর।”
-“ঠিক আছে, প্রহর ভাই। মনে রাখব।”

প্রহর হাসল,
-“মনে রাখার বিষয় এটা না। এটা বোঝার বিষয়। বুঝতে পেরেছ?”
-“পেরেছি, প্রহর ভাই।”
-“শোনো। জীবন চক্রের মতো। চন্দ্রচক্রের মতো ধরো। শুক্লপক্ষ, কৃষ্ণপক্ষ বোঝো?”
-“আপনার থেকে বুঝতে ভালো লাগছে, প্রহর ভাই। আপনি বুঝিয়ে দিন।”
-“ঠিক আছে। শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ হচ্ছে চাঁদের পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময়কাল। পূর্ণচাঁদ আস্তে-ধীরে অমাবস্যায় রূপ নেয়, এই সময়কাল হলো কৃষ্ণপক্ষ। আবার অমাবস্যা পনেরো তিথি পর পরিপূর্ণ চাঁদের আকৃতি ধারণ করে, এটা শুক্লপক্ষ। কৃষ্ণপক্ষের প্রথম রাতটা ভরা চন্দ্রিমার, শেষে আঁধার। শুক্লপক্ষের শুরুতে আঁধারিয়া, শেষে পূর্ণচাঁদ। নীহিন, তুমি বলো। এই চক্রের হিসেবে তুমি সুখ-দুঃখকে কীভাবে মাপবে?”

নীহিন ভেবে বলল,
-“সুখ-দুঃখ চক্রাকারে আসতেই থাকবে। কখনও চলবে কৃষ্ণপক্ষ, কখনও শুক্লপক্ষ। কৃষ্ণপক্ষে চন্দ্রক্ষয় হবেই, চাঁদ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে লাগবে। শেষে গিয়ে বিলীন হয়ে যাবে। অমানিশা আসবে। এখানে হতাশার কিছু নেই। অপেক্ষায় থাকতে হবে শুক্লপক্ষের, শুক্লপক্ষের পরিশেষের। পরিশেষে পূর্ণচাঁদ। পরিশেষে সুখ।” 

প্রহর হেসে বলল,
-“তোমার জীবনেও কেউ সুখ নামাতে আসুক।”

নীহিন প্রশস্ত হেসে বলল,
-“আমি অপেক্ষায় আছি সেই মানুষটার, প্রহর ভাই। সে শীঘ্রই আসুক।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp