-" আনিকা এটা কেমন দুষ্টুমি? কাল তোমার জন্য ভোর কত গুলো বকা শুনলো মারও খেলো ভাইয়ের হাতে। ভোরের হাত ধরে স্যরি বলো? আর তুমি এমনি এমনি বকা শোনো না। খুব দুষ্টু হয়েছ। এরকম চললে বোডিং স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবো বলেদিলাম? আর ভাই আমি কোন মুখে স্যরি বলবো। ভাই আমি.."
অরুন তাকে থামিয়ে দিল।
-" কি বলছিস এসব! না তোকে স্যরি বলতে হবে। না মামনিকে। ওরা বাচ্চা মানুষ ভুল হতেই পারে।বুঝিয়ে বললেই হয়। আর মামনিকে কিছু বলবি না বলে দিলাম। ও ভুল বুঝতে পেরেছে।আর কখনও মিথ্যে বলবে না। তাই না মামনি?"
আনিকা কেঁদেই দিল! কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
-" কখনো বলবো না। স্যরি ভোর। স্যরি চাচ্চু স্যরি আব্বু।"
অরুণ তাকে আদর করে বললো,
-" মামনি কাঁদছ কেন? কেউ বকে নি তোমায়। কাঁদে না লক্ষিটি। কাঁদলে আনিবুড়ি কে পঁচা লাগে তো। কাঁদে না। নেক্সট ফ্রাইডে ভোর আমি তুমি পার্কে যাবো ঘুরতে। অনেক মজাও করবো।যাবে না তুমি? "
আনিকা চোখ মুছে মাথা নাড়িয়ে জানায় সে যাবে! অরুণ আনিকার গাল মুছে সেথায় চুমু দিল। ভোর এতক্ষণ সব দেখছিল তীক্ষ্ণ চোখে। এবার অরুণের সামনে দাঁড়িয়ে কোমড়ে হাত রেখে ঝগড়ার ভঙিতে বলে,
-" এই আনি বুড়ি তুই আমার আব্বুর আদর খাচ্ছিস কেন? হুম?"
আনিকা পিট পিট করে ভোরকে দেখে হেসে অরুণের গলা জড়িয়ে বলে,
-" আমার বড় চাচ্চু হয় তাই।"
আরিয়ান ভোরকে কোলে বসিয়ে আদর করে বলে
,
-" নাও তোমাকেও আদর করে দিলাম।"
ভোর আদর পেয়ে হেসে কুটিকুটি। আসমা বেগম সোফায় বসে নাতি নাতনি ও ছেলেদের খুনসুটি দেখতে থাকে।সবাই হাসি খুশি!।আরিয়ান ভোরকে জিজ্ঞেস করে,
-" তোমার এক্সাম কবে থেকে হবে যেন? আনিকার তো স্যাটারডে থেকে।"
অরুণ ছেলের দিকে তাকায়। পরীক্ষার কথা তো সে কিছুই জানে না। ভোর তাকে কিছু বলে নি তো। ভোরের মুখ এইটুকুনি হয়ে যায়। বেশ আদর খাচ্ছিল এখন এক্সামের কথা বলে মুড টা নষ্ট করার কি দরকার ছিলো? এই চাচ্চুটাও না। তার পর বাবার সামনেই বলতে হলো। অরুণ চোখ ছোট ছোট করে চেয়ে ছেলেকে বলে,
-" কই আমাকে তো এক্সামের ব্যাপারে কিছু বললে না? কবে থেকে এক্সাম? ডেট দিয়েছে?"
ভোর চোখ পিটপিট করে হেহে করে হেসে বলে,
-" আমাদের স্কুলেও স্যাটারডে থেকে হবে।আব্বু তোমাকে বলবো মনেই ছিল না। আমি সব পড়া কমপ্লিট করেছি তো। মিস টুম্পা পড়িয়েছেন সব।"
অরুণ মুখটা পুনরায় গম্ভীর বানিয়ে নেয়। তার খোঁজ নেয়া উচিত ছিল। বাচ্চারা তো এক্সাম দেখে ভয় পাবেই। আর ভোর প্রথমবার এক্সাম দেবে। পড়াশোনা এমনি মোটামুটি পাড়ে। তবে গার্ডিয়ান হিসেবে তার সম্পূর্ণ ধ্যান দেয়া উচিত ছিল।
—————
টিভিতে কাপিল শর্মা শো চলছে। সেলিব্রিটি নিয়ে জমজমাট শো। কাপিল শর্মার সেন্স ওফ হিউমার ভালো। লোক হাসাতে পারে বেশ। লতা পাতা দুজনেই শো দেখছে আর হাসিতে ফেটে পড়ছে। পাতা খাচ্ছে আর শো দেখছে। বেশি হাসার ফলে বার বার খাবার গলায় আটকাচ্ছে তাই পানির জগ নিয়েই বসেছে তবুও শো দেখতেই হবে। দু বোন খুব মজে আছে টিভির শোতে। তাদের মজায় বাগরা দিতে কলিং বেল বেজে ওঠে।দু বোন একে অপরের দিকে চায়। বাবা ভাই এসেছে বোধহয়! কিন্তু প্রশ্ন হলো কে গিয়ে দরজা খুলবে এই আনন্দ ভঙ্গ করে! পাতা যেহেতু খাচ্ছে তাই লতা কাঁদো কাঁদো মুখ বানিয়ে চলে যায় দরজা খুলতে। পাতার মনোযোগও সেদিকেই। দরজা খুলতেই আতিকুর ইসলাম,লুবমান , রুম্পা ও লাবিব ভিতরে ঢুকে। আতিকুর ইসলামের হাতে আইসক্রিমের ব্যাগ।লাবিব নানার আরেক হাত ধরে। লুবমানের কোলে রুম্পা ঘুমিয়ে।লতা ভাইয়ের কোল থেকে লতাকে কোলে নেয়।
-" আমার আম্মুটা ঘুমিয়ে পড়েছে দেখছি। কখন ঘুমিয়েছে?"
লুবমান হাত ঝাঁকিয়ে বলে,
-" গাড়িতেই!,আপু তোর মেয়ে বাজারে যা দেখবে তার জন্যই কান্না শুরু করে দেবে। রাস্তায় কুত্তার বাচ্চা গুলোকে দেখে সে কি কান্না। তাদের ধরবে আদর করবে।"
বলেই হাসতে থাকে । লতা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বলে,
-" মামার মতোই হয়েছে তো তাই। আব্বু আমাদের জন্য কি এনেছো?"
আতিকুর রহমান আইসক্রিমের পলি দেখিয়ে সোফায় বসে হাসি মুখে বলেন,
-" সবার জন্যই আইস্ক্রিম এনেছি। যে যার যার টা নিয়ে নাও। জলদি নইলে গলে যাবে তো।"
বলে সামনে তাকায়। পাতা ভাতের প্লেট নিয়ে বসে। এঁটো হাত তার। এভাবে আতিকুর রহমান সামনে বসায় ইতস্তত বোধ করে। লজ্জাও পায় খানিকটা। চৌদ্দ পনের বছর পর্যন্ত যাকে খালু ডেকে এসেছে হুট করে আব্বু ডাকা ব্যপারটা অনেক অস্বস্তি জনকছিলো। পাতা এবাড়ি আসার পর প্রথম প্রথম তো তার সামনেই যেতো না। লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতো। ভয় হতো, বকা না দেয় আবার। আতিকুর রহমান কখনো ডেকে এনে সে ভয় ভাঙায় নি। পারলে তাকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা যায় চলেছে। পাতা ভাতের প্লেট নিয়ে উঠে যেতে নিলে আতিকুর রহমান ডাক দেয় তাকে,
-" শোনো?"
পাতা ঢোক গিলে পিছনে ফিরে তাকায়। আতিকুর রহমান খুব দরকার ছাড়া পারত পক্ষে তার সাথে কথা বলে না।
-" জি আব্বু?"
আতিকুর রহমান পলি থেকে একটা কোন আইসক্রিম বের করে পাতার দিকে বাড়িয়ে বলে,
-" তোমার ভাগেরটা।"
পাতার চোখ জ্বলছে। চোখের পানি বেঈমানি না করে বসে। পাতা ডান হাত এঁটো থাকায় বাম হাতে প্লেট ধরেছিল। এখন ডান হাতে প্লেট নিয়ে ডান হাত খানিকটা বাম হাতে ঠেটিয়ে আইসক্রিম হাতে নেয়। মুচকি হাসে তার ফেভারিট বাটার স্কচ ফ্লেভারের। নিশ্চয়ই লুব ভাই বলেছিল।
-" ভাগের আইসক্রিম তো দিলে। আমার ভাগের ভালোবাসা,যত্ন, স্নেহ কখন দিবে আব্বু? আপু ভাইয়ের মতো কেন আদর করে ডাকো না? বকা দাও না? ভালোবেসে খাইয়ে দাও না? মাথায় হাত বুলিয়েও দাও না। ভাই আপুর জ্বর হলে কত আদর কর! জল পট্টি দিয়ে সারারাত শিয়রে বসে থাকো অথচ আমার বেলায় ওষুধ এনে দিয়েই দায়িত্ব শেষ? ওদের পছন্দের খাবার সদাই আনো! আমারটা কেন আনো না? আনবে কি করে জানোই তো না! আপুর চাকরি হলে পুরো এলাকাবাসীকে মিষ্টি বিতরন করেছিলে আমার বেলায় কেন দাও নি? আপু ভাইয়ের সাথে কত কথা বলো। আমার সাথে কেন বলো না? আমার ভাগের আইসক্রিমের সাথে আমার আমার ভাগের ভালোবাসা যত্ন স্নেহটাও চাই আব্বু? তোমরা আমাকে চাও নি। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে এসেছি সেটার দায়ভার তোমাদেরও। কিন্তু এতে আমার কি দোষ আব্বু? এতে তো আমার হাত নেই ,তাই না? আমি কেন আব্বু আম্মুর ভালোবাসা থেকে বঞ্ছিত?কেন শুধু দায়িত্ব হয়ে পড়ে আছি?"
কম্পমান গলায় কথাগুলো বলে পাতা উত্তরের অপেক্ষায় থাকে না। অশ্রু চোখে চলে যায়। সে জানে কোনো উত্তর পাবে না সে। আর না ভালোবাসা,যত্ন, স্নেহ; সে তো শুধু দায়িত্ব। ইশ তার যদি নির্ভরযোগ্য কোনো যাওয়ার জায়গা থাকতো! সেখানেই চলে যেত। এভাবে থাকতে তার আর ভালো লাগে না।
আতিকুর ইসলাম কিছু বলে না। চুপচাপ বসে। মুখাবয়ব গম্ভীর হয়ে গেছে।লতা এসে বাবার কাঁধে হাত রাখলো। আতিকুর প্রতিক্রিয়া দেখায় না। লাবনী আক্তার গোসলে আছেন তাই তার দেখা নেই। লুবমান চুপ করে বসে পড়ে সোফায়। সকালে বাবার বকা শোনার পর এখন আর বলার মতো সাহস নেই। তবে অবাক হয়েছে পাতা এভাবে সরাসরি বাবার কাছে নিজের আকুলতা প্রকাশ করবে। তবে খুশিও হয়েছে। কঠোর বাবার মন যদি একটু গলে। ভালোবাসা, যত্নের কাঙালীনি যদি একটু ভালোবাসার ছোঁয়া পায়। লতা বাবার কাঁধে হাত রেখে বলে,
-" আব্বু পাতা তো তোমারই মেয়ে, তোমারই অংশ। আমি জানি প্রকাশ না করলেও ওর জন্য তোমার মনে সফট কর্নার আছে। মেয়েটাকে একটু বুকে টেনে নাও?
ও খুব ভালোবাসে তোমাদের!।
আতিকুর ইসলাম এবার মুখ খুললেন,
-" লতা মা? জামাই কবে আসবে?"
লতার কপালে ভাঁজ পড়ে। এতো বড় ঘটনা ঘটে গেল আর বাবা নির্লিপ্ত।
-" কয়েকদিন পড়েই। আব্বু, আমি কি বললাম?"
-" রাতুল বাবা এবার আসলে পাতার বিয়েটা সেরে ফেলবো। আমি রহিমের সাথে কথা বলছি। আশিকের সাথেও বলব যদি হাতে কোনো ভালো ছেলে থাকে? অনেক হয়েছে, রোজ রোজ ঝামেলা ভালো লাগে না।"
বলেই হন হন করে রুমে চলে যায়।লতা লুবমান একে অপরের দিকে চায় অসহায় হয়ে।
—————
ব্যস্ত রাস্তা। শা শা করে গাড়ি চলছে। দুই রাস্তা, একটা যাওয়ার জন্য, আরেকটা আসার জন্য, মাঝখানে ইট বাঁধাই করে গাছ লাগানো। মাঝে মাঝে পোল যেখানে ঝুলছে অহরহ বৈদ্যুতিক তার, কেবলের তার , ওয়াই-ফাইয়ের কানেকশন ইত্যাদি ইত্যাদি, সেখানে কাকের দল কা কা করে চিল্লাতে ব্যস্ত। গ্রামে কাকের ডাককে অশুভ মানা হয়। অথচ শহরে অনবরত কা কা করে তাহলে তো শহুরে মানুষের উপর অশুভ টু দি পাওয়া ইনফিনিটি হওয়ার কথা।
অরুণ বিরক্ত হয়ে বসে আছে গাড়ির ভিতর। ফ্রন্ট সিটে আভারি ,ড্রাইভার ড্রাইভিং সিটে। আর ভোর জানালার গ্লাস একটু খুলে বাইরের দিকে মুখ করে আশেপাশে নজর রাখছে। গাড়ি চলছে না; থেমে আছে,নষ্ট হয় নি ভোর থামিয়ে রেখেছে। তার বায়না সে পাতা মিসের সাথে যাবে স্কুটারে চড়ে! তাই পাতা মিসের খোঁজে দাঁড়িয়ে আছে। অরুণের বকা ধমক কিছুই কানে যায় নি তার । জেদ ধরে বসে আছে!।
-" ভোর? এটা কোন ধরনের ছেলেমানুষী? মিস পাতাবাহার যদি আমাদের আগে রওয়ানা হয়ে চলে গিয়ে থাকে?আর বাইকে চড়ার শখ তো। আমি বাইক কিনবো আজই। তাও তোমার পছন্দ মতো। এখন চল? ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দাও?"
ভোর বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
-" আঙ্কেল ইস্টার্ট দিবেন না। আব্বু আরেকটু ওয়েট করি না? মিস এইতো আসবে। উনি এখনো যান নিই আ'ম সিওর। প্লিজ আব্বু?"
অরুণ ধমক দিয়ে বলে,
-" আর এক সেকেন্ডও না। দিনে দিনে অবাধ্য হচ্ছো ভোর। গাড়ি স্টার্ট দাও তো।"
ড্রাই স্টার্ট দেয়। ভোর গোমড়া মুখে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়, এই আশায় মিস পাতা এখুনি আসবে। অরুণ ছেলেক টেনে বসিয়ে দেয় সিটে ভোর জানালায় সেঁটে যায় পুনরায়। একটা স্কুটি নজরে আসে। মিস পাতার মতো শাড়ি পরিহিত না। তবে স্কুটি টা একই! ভালো করে খেয়াল করতেই বুঝতে পারে ওটা পাতা মিসই। শুধু ড্রেসাপ ব্যতিক্রম। ভোরের খুশি দেখে কে?
'ইয়ে' বলে পাতাকে ডাকতে থাকে।
-" মিস ? পাতা মিস? আব্বু ওই দেখ মিস? আমি বলেছিলাম না তোমায় এখুনি আসবে।"
বলতে বলতে গাড়ি সামনে চলে যায় । স্কুটি পিছনে। অরুণ পেছনে তাকিয়ে বলে,
-" আব্বু ওটা মিস পাতাবাহার নয়, অন্য কেউ!"
-" না আব্বু ওটাই মিস। শুধু ড্রেস আলাদা। বাইক আর মিস একই। মিস ? এই মিস? আমি ভোর? শুনতে পাচ্ছেন? আঙ্কেল ইস্পিড আস্তে কর না!"
ড্রাইভার মিররে অরুনের দিকে চায়, কমাবে কি না? অরুন সায় জানায়। স্পিড ধীর হয়। পাতার স্কুটির পাশাপাশি চলতে থাকে। অরুণ সেদিকে চায়। ভায়োলেট কালারের গোল জামা পড়নে। বড় ওড়না মাথায় ঢেকে হেলমেট পড়েছে।চেনাই যাচ্ছেনা পাতাবাহারকে। ভোর চিনলো কি করে?ভোর পাতাকে ডাক দেয়। পাশাপাশিই পাতার শুনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে ফিরছে না কেন? একদম সামনে তাকিয়ে আশেপাশে নজরই নেই। ভোর মাথা বের করে ডাক দিলো,
-" মিস ? এই মিস? শুনছেন না কেন? মিস এইদিকে? তাকান?"
অরুণ ছেলেকে ভিতরে আনে। দেখেছো কি কান্ড। চলন্ত গাড়িতে মাথা বের করে দেয়। তাকে ধমক দিয়ে বলে,
-" এক থাপ্পড় লাগাবো তোমায়। মাথা বের করেছো কেন? কোন এক্সি..! চুপচাপ ভেতরে থাকো। গ্লাস উপরে তোলো।"
ভোরকে কোলে তুলে নেয় অরুণ। কলিজা তার! এদিক সেদিক হলে? আর এই পাতাবাহার শুনছে না কেন? অপসিট রাস্তার মানুষ শুনতে পাচ্ছে। কানে তুলা দিয়ে রেখেছে নাকি? অরুন গ্লাস হালকা নামিয়ে ডাক দিলো,
-" মিস পাতাবাহার? শুনতে পাচ্ছেন? আশ্চর্য আমি জানি শুনতে পাচ্ছেন। সামনে স্কুটি স্ট্যান্ড করুণ।"
Page 2
স্নিগ্ধ সকাল। সারাদিন তীব্র গরম থাকলেও সকালটা যেন স্বস্তিদায়ক। আতিকুর ইসলাম রোজ সুবাহে সাদিকেই বিছানা ত্যাগ করে। মসজিদে নামাজ কায়েম করে হাঁটতে বের হয়। বেশ সময় নিয়েই রাস্তার ধারে হাঁটেন তিনি! আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নামাজ শেষেই হাঁটতে বের হয়েছেন। রাস্তার দু ধারে ফসলি জমি। সাথেই কিছু দূরত্ব পর পর এক তলা দুই তলা বাস ভবন, মুদি দোকান, হোটেল, চা স্টল। রাস্তার কিনারায় সারি সারি বেঁধে কড়ি গাছ লাগানো। মাঝে মাঝে দু একটা কৃষ্ণচূড়া শিমুল গাছও আছে। শহর থেকে খানিকটা দূরে হওয়ায় যানবাহনের ভিড় ততটা নেই। তবে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক। আতিকুর ইসলাম আশেপাশে নজর দিয়ে হাঁটতে থাকে। গরম লাগছে তবে হালকা বাতাসে সেটা সহ্যনিয়। তাদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরত্বেই চা স্টল আছে সাথেই হোটেল যেখানে খিচুড়ি, ভাত, রুটি পরোটা পুরি সিঙাড়া ইত্যাদি পাওয়া যায়। সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় আতিকুর ইসলাম হোটেলের সামনে দাঁড়ায়।গরম তেলে সিঙাড়া ভাজছে হোটেলের এক কর্মচারি। অল্প বয়সী ছেলে।আরেক মধ্যবয়সী লোক পরোটা বেলছে আর ভাজছে । তিনি ভাবলেন গরম গরম সিঙ্গাড়া নেয়া যাক বাচ্চাদের জন্য। হোটেল মালিক ভিতরে বসে খোদ্দেরকে আপ্যায়ন করছে। আতিকুর ইসলামকে দেখে অল্প বয়সী ছেলেটাকে ধমকে বলে,
-" এই পল্টুর বাচ্চা? কাস্টমার আইছে চোক্ষে পড়ে না? কি লইবো জিগাইতে দুঃখু পাও? আতিক ভাই ভিতরে আসেন। বসেন? কি নিবেন?"
আতিকুর ইসলাম পকেটে হাত ঢুকিয়ে বললেন,
-" দশটা সিঙাড়া দাও গরম গরম।প্যাকেট করে দিও।"
হোটেল মালিক হেসে মাথা নাড়িয়ে বলে,
-" এইতো দিতাছি।গরম গরম ভালো লাইগবো খাইতে। তা বাড়ির সবাই কেমন সব ভালো চলতেছে?"
আতিকুর রহমান গম্ভীর মুখে জবাব দেন,
-" হুম ভালো।"
-" আপনার ছোট মাইয়ার বিয়া ঠিক হইছে কি? মেয়েটা বড়ই ভালো। নম্র ভদ্র কথাবার্তা। কখনো খারাপ কিছু চোক্ষে পড়ে নাই। এই তো সামনে বাড়ির এক মাইয়া প্রতিদিনই দেহি এক পোলার লগে হাসতে হাসতে যায়। তোমার মাইয়াটা সেই দিক দিয়ে ভালোই।প্রায় প্রত্যেকদিনই আমাগোরে হোটেল থাইকা রুটি পরোটা নেয়।রুটি টিফিন বাক্সে ভইরা লইয়া যায় তো তাই দেহি।"
আতিকুর ইসলাম অবাক হয় বেশ খানিকটা। সে জানে পাতা মেয়েটা ভালো। এভাবে তার প্রশংসা করায় খানিকটা ভালোই লাগলো। সাথে খানিকটা চিন্তিতও হয়।এখান থেকে রুটি নিয়ে যায় মানে? তখন খেয়াল আসে লাবনী রান্না করে দেড়িতে। মেয়েটা কেক বিস্কুট হাবিজাবি বাসি খাবার খেয়েই বেরোয়।কখনো না খেয়েও যায়। দুপুরে কি খায় খেয়ালই আসে নি! আজ জানতে পারলো হোটেল থেকে নিয়ে যায়। মনটা কেমন যেন করলো।মেয়ের মতো ভালো না বাসুক।আদর না করুক খানিকটা মায়া তো কাজ করে। সে জন্যই হয়তো রহিমকে জোর গলায় বলতে পারে না ' নিঃসন্তান ছিলে বলে মেয়েকে সারাজীবনের জন্য নিয়েছিলে। বলেছিলে মেয়ের মতোই আদর যত্নে ভালোবেসে বড় করবে।এখন পিছু হটলে তো হবে না। দায়িত্ব নিয়েছো তো পালন করবে আমি রাখতে পারবো না।' বলতে পারেনি সে। তারই যে অংশ! ওইবাড়িতে অযত্নে লাথি, গুঁতা, কটু কথার বান খেয়ে থাকার চেয়ে তার বাড়িতেই থাকুক। লতা, লুবমানের মত ভালোবাসা না দিক। কখনো কটু কথা বা ধমকে কথা বলে নি। ভালো না বাসুক ঘৃণাও করে নি। যত্ন না করুক অযত্নেও রাখেনি। চাইলে বুকে টেনে নিয়ে ভালোবাসতে পারতো। কেন যেন পারে নি! আর না পারবে। এখন শুধু একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে মন থেকে দোয়া করে সাথে ক্ষমাও চাইবে।
আতিকুর রহমান কিছু বললেন না। হোটেল মালিক কথার জবাব না পেয়ে চুপ করেই রইলেন। আতিকুর ইসলামকে চেনেন, স্বল্পভাষী সাথে কঠোর। তবে কোনো খারাপ রেকর্ড পান নি এপর্যন্ত। আতিকুর সিঙাড়ার প্যাকেট নিয়ে পাঁচটা ডাল পরোটাও নিলেন । টাকা পরিশোধ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
পাতা স্কুলের জন্য রেডি হয়ে বেরিয়েছিল সবে ব্যাগ কাঁধে ড্রয়িংরুমে যেতেই আতিকুর সামনে পড়ে। পাতা কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে আতিকুর ইসলাম ডাক দেয়,
-" পাতা? না খেয়ে যাচ্ছো কেন? খেয়ে যাও।"
পাতার পা আপনা আপনি থেমে যায়। এ বাড়িতে থাকার সময় গড়িয়ে তার নয় দশ বছর হবে হয়তো। আতিকুর ইসলাম তাকে সম্মোহন হীন ডেকেছে। পাতা বলে ডাকে নি। তবে আজ ডেকেছে।সে প্রায়ই না খেয়ে স্কুলে , কলেজে ভার্সিটি যেত। কখনো বলে নি এ কথা হাতে বিশ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে এও বলে নি কিছু কিনে খেও। তবে মাস শেষে লতা লুবমানের মতো হাত খরচ দিতো। ওদের তুলনায় তাকে কম দিতো না। বরং একশ দেড়শ বেশিই দিতো। পাতা মনটা কেঁদে ওঠে।
খুশি হয় খানিকটা। সে ঘার ফিরিয়ে বলে,
-" রান্না হয় নি এখনো। বাইরে কিছু খেয়ে নিব। আসি আব্বু?"
আতিকুর ইসলাম পাতার দিকে সিঙাড়া পরোটার প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলে,
-" এখানে সিঙাড়া, পরোটা আছে গরম গরম খেয়ে যাও। সবার জন্যই এনেছি"
পাতা অবাক হয়! আতিকুর ইসলাম আগে কোনো কিছু আনলে লতার হাতে দিত। লতার বিয়ের পর লাবনী আক্তারের হাতে। তাদের হাত থেকেই পাতা পেত।এই প্রথম বার তার হাতে। পাতা ইতস্তত বোধ করে। আতিকুর ইসলাম বুঝতে পেরে পাতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল। লাবনী আক্তার রান্না করছিল। স্বামীকে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
-" কিছু লাগবে আপনার?"
আতিকুর ইসলাম গম্ভীর স্বরে বললেন,
-" কাল থেকে তারাতাড়ি রান্না বসাবে। কেউ যেন খালি মুখে না বেরোয়। ভরা টিফিন বক্স নিয়ে যেন বের হয় কাল থেকে। আজ নুডুলস বানিয়ে দাও নিয়ে যাবে নি।"
লাবনী আক্তার আশ্চর্য হয়েছেন বটে তবে প্রতিত্তরের সাহস পায় না। রান্না ঘরে থেকেই একটু আগের পাতা ও আতিকুর ইসলামের সকল কথপোকথন তার কানে আসে অবাকই হয়েছে সাথে একটু খুশিও। ড্রয়িং রুমে বসে পাতাও সব শুনতে পায়! তার চোখ ভোরে ওঠে একটুখানি যত্নে।
—————
পাতার সকালটা অন্যান্য দিনের তুলনায় ভিন্ন ভাবে কেটেছে। একটু ভালোবাসা একটু যত্নে তার মনটা নেচে উঠছে বারংবার। ইশ প্রত্যেকটা দিনই যদি এমন হতো! বাবার এই অল্প অল্প যত্নই যদি তার নসিবে প্রাত্যহিক জীবনে ঘটে?তাহলে কতই না ভালো হতো। সে খুশি মনে স্কুটি চালিয়ে যাচ্ছে। পাশের গাড়ি থেকে ভোরের ডাকও কানে এসেছে তার। তবে সে সাড়া দেবে না। ভোর ছোট কাল যেটা করেছে সেটা হয়তোবা সে জানেই না। তবে মি. ভোরের আব্বু কাজটা মোটেও ঠিক করেননি। শালা নাক উঁচু,অভদ্র,ম্যানারলেস! এরই মাঝে অরুণ সরকারের কন্ঠ কানে বাজে।
-" মিস পাতাবাহার? শুনতে পাচ্ছেন? আশ্চর্য আমি জানি শুনতে পাচ্ছেন। সামনে স্কুটি স্ট্যান্ড করুন।"
তাকে ডাকছে! আশ্চর্যের বিষয়! অন্যসময় তো সামনে পড়লেও ভদ্রতার খাতিরে হাই হ্যালো টুকু বলে না। আজ দাঁড়াতে বলছে। সে যাই হোক এই ম্যানারলেস অরুণ সরকারের থেকে তাকে শতহাত দূরে থাকতে হবে। সে অরুনের কথার তোয়াক্কা না করে স্কুটি থামানোর বদলে স্পীড বাড়িয়ে দেয়। ভোরদের গাড়ি ওভার টেক করে এগিয়ে যায় সামনে।
অরুণ সরকার গাড়িতে বসে ছেলেকে কোলে নিয়ে। পাতাকে এগিয়ে যেতে দেখে ভাবে যে সামনে স্টপেজে হয়তো থামবে। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণিত করে পাতা স্কুটি নিয়ে শা শা করে পথ ধরে এগোতে থাকে। অরুণ খানিকটা অসন্তুষ্ট হয়। সে তো বললো থামতে। অথচ পুঁচকে মেয়েটা তার কথা শুনেও অগ্রাহ্য করলো। বেয়াদব।
-" আব্বু মিস থামলো না কেন? উনি কি শুনতে পায় নি? আঙ্কেল গাড়ি জোরে চালাও তো? আব্বু ?মিস কি আমার সাথে রাগ করেছে? কাল ওভাবে চলে আসায়?"
অরুণের কপালে ভাঁজ পড়ে। ওহ মিস পাতাবাহার কালকের ঘটনায় গাল ফুলিয়ে আছে। বাহ এই টুকুনি পুঁচকে মেয়ের আবার ইগোও আছে। নট ব্যাড !
ড্রাইভার একটু আগাতেই অরুণ ও ভোর দেখে পাতার স্কুটিটা দাঁড়িয়ে আছে। অরুণ ভাবে হয়তোবা ভোরের জন্যই দাঁড়িয়েছে। ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললে গাড়ি থামিয়ে দেয়। ততক্ষণে ভোরও দেখতে পেয়েছে তার মিসকে। গাড়ি থামতেই দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে। অরুণ ছেলের উদ্বিগ্নতা দেখে হাসে অল্প। সেও নেমে পড়ে। ভোরের হাত ধরে সামনে এগোতে নিলেই দেখতে পায় পাতার স্কুটিতে দুটি মেয়ে উঠলো। ভোরের স্কুলেরই। ফোর ফাইভের হবে।উঠলেই পাতা স্কুটি স্টার্ট করে চলে যায়। ভোর কাঁদো কাঁদো হয়ে বাবার দিকে চায়!
-" আব্বু মিস ওই মেয়েগুলোকে নিয়ে গেল। আমায় নিলো না।"
অরুণ ছেলেকে কোলে তুলে গাড়িতে উঠে বসে। ড্রাইভার গাড়ি চালানো শুরু করে। আভারি ভোরের গোমড়া মুখ দেখে বলে,
-" ভোর বাবা তোমার ম্যাডাম হয়তো তোমায় দেখে নাই! মন খারাপ কইরো না।"
অরুণ ছেলেকে আদর করে বলে,
-" আব্বু? আমি বাইক কিনবো আজকেই। আব্বু প্রমিজ। মন খারাপ কোরো না। মিস পাতাবাহারকে বকে দেব ঠিকাছে?"
ভোর চোখ পিটপিট করতে থাকে। অরুণ মুখ ঘুরিয়ে সামনে আনতেই কেঁদে দেয়। অরুণ বুকে জড়িয়ে নেয়। ছেলেটা তার বড্ড আবেগী। কষ্ট সহ্যই করতে পারে না। যে তাকে ভালোবাসে তাকেও ভোর মন থেকে ভালোবাসে। তার থেকে সামান্য অবহেলাও সহ্য করতে পারে না। মিস পাতাবাহারকে কড়া কয়েকটা কথা শুনাতে হবে। তার ছেলেকে কাঁদিয়েছে বলে কথা।
-" আব্বু ? কাঁদছো কেন? কথায় কথায় কাঁদতে নেই। তোমার মিস হয়তো শুনতেই পায় নি। পেলে অবশ্যই নিয়ে যেত। আব্বুকে তো সে খুব ভালোবাসে তাই না? কাঁদে না আমার সোনাটা। আব্বু? তোমার জন্য আজ রাতে অনেক গুলো আইসক্রিম নিয়ে আসবো। সব ফ্লেভারেরই আমরা রাতে কার্টুনও দেখবো একসাথে আচ্ছা? এই আব্বু?"
ভোর কান্না থামায়। মিস হয়তো শুনতে পায়নি।অরুণ টিস্যু দিয়ে ছেলের নাক মুখ পরিষ্কার করে দেয়। ছেলেটার ঠান্ডার ধাত আছে। অল্পতেই ঠান্ডা লাগবে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে পাতার প্রস্থানের দিকে চায়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………