চাঁদের রূপালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে জুলফার ওপর। তার পরনে একটি সাদা রঙের শাড়ি, যার ওপর সোনালি সুতোয় কাজ করা নক্ষত্রের মতো ছোট ছোট ফুল। শাড়ির আঁচল বাতাসে দুলছে। গলায় ঝিলমিল করছে একটি সরু সোনার হার। খোলা চুল কাঁধ ছুঁয়ে পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। মুখজুড়ে অপূর্ব লাবণ্য। চাঁদের আলোয় আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। চোখে ভয়, লজ্জা।
নাভেদ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে জুলফার দিকে। মুগ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করে, 'আপনিই কি সেই রাতের নিকাবধারী?'
জুলফা চোখ নামিয়ে নিচু স্বরে বলে, 'হু, আমি...আমিই ছিলাম সেখা....'
সে কথা শেষ করতে পারে না। নাভেদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে আরও সংকুচিত হয়ে যায়।
নাভেদ আগ্রহভরে জানতে চায়, 'কিন্তু কেন? কেন আপনি গোপনে আমার ঘোড়াকে খাবার দিতেন?'
সেদিন রাতে নাভেদ হাত ছাড়তেই সে প্রাণপণে পালিয়ে গিয়েছিল। পরের দুদিন সে আর সেদিকে যায়নি। তৃতীয় দিন শুনতে পায়, নাভেদ তার ব্যবসা গুটিয়ে বাজার ছেড়ে চলে গেছে। তারপর আর কখনো নাভেদের দেখা পায়নি।
জুলফা নরম স্বরে বলে, 'আমি আপনার ঘোড়াটিকে খুব পছন্দ করতাম।'
নাভেদের চোখে কৌতূহল ঝিলিক দিয়ে ওঠে। প্রশ্ন করে, 'আর এখন? প্রতি রাতে আমার বেহালার সুর শোনার পেছনে কী রহস্য? কেন আপনি এভাবে নিঃশব্দে এসে দাঁড়ান?'
জুলফা তখন আরও বেশি অস্বস্তি বোধ করে। সে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। কণ্ঠস্বর কাঁপে যখন বলে, 'আপনার বেহালার সুর... ভালো লাগে।'
'লুকিয়ে চুরিয়ে কেন শুনেন? আমাকে একবার জানালেই তো পারতেন।'
জুলফা নত চোখে বলে, 'ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, আপনি হয়তো আমার আচরণকে অপরাধ মনে করবেন।'
'অপরাধ! বরং আমি কৃতজ্ঞ। আপনি আমার সুর এতটা পছন্দ করেছেন জেনে আমি অভিভূত। আপনি সামনে বসেই শুনতে পারেন। যদি আপত্তি না থাকে, ভেতরে আসুন। আপনার জন্য একটা বিশেষ সুর বাজাতে চাই।'
জুলফার সারা শরীরে তখন শিহরণ। হঠাৎ করে তার মনে পড়ে, সে মধ্যরাতে নিজের স্বামীর বাড়িতে দাঁড়িয়ে একজন পর-পুরুষের সঙ্গে কথা বলছে! যাকে সে গোপনে মন দিয়েছিল। এই উপলব্ধি তাকে মুহূর্তে সচেতন করে তোলে। একদিকে নাভেদের প্রতি তার আকর্ষণ, অন্যদিকে স্বামীর প্রতি দায়বদ্ধতা। হৃদয় চাইছে নাভেদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে, কিন্তু বিবেক বলছে এটা ঠিক হবে না। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, 'আজ... আজ নয়।'
তারপর দ্রুত পায়ে মহলে ঢুকে পড়ে। বুকের ভেতর তখনও গুমরে উঠছে আবেগ। প্রতিটি কদমে অনুভব করছে অদৃশ্য একটা টান। যেই টান তাকে পিছনে ফিরে যেতে বলছে।
ঘরে ঢুকতেই শব্দরের ঘুমজড়ানো কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, 'কোথায় গিয়েছিলে?'
জুলফার বুক ধড়াস করে ওঠে। মুহূর্তের জন্য মনে হয়, তার সমস্ত গোপন ভাবনা, নাভেদের সঙ্গে সাক্ষাত, অনুভূতি সব প্রকাশ হয়ে গেছে। তৎক্ষণাৎ সে নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দেয়, 'ভালো লাগছিল না। তাই একটু হাঁটছিলাম।'
শব্দর কিছু বলে না। জুলফার রাতের হাঁটাহাঁটি তার কাছে নতুন নয়। জুলফা বিছানায় শুয়ে পড়ে। শব্দর ধীরে ধীরে তার দিকে সরে এসে কোমরে জড়িয়ে ধরতে চাইলে জুলফা তৎক্ষণাৎ নিজেকে সরিয়ে নেয়।
'কী হলো?' শব্দর জিজ্ঞেস করে।
জুলফা উত্তরে বলে, "গরম লাগছে।"
শব্দর আবার চেষ্টা করে। এবার সে জুলফার হাত ধরতে চায়, "এত রাতে হাঁটতে গিয়েছিলে। ক্লান্ত লাগছে না?"
জুলফা হাত সরিয়ে নিয়ে বলে, "একটু ক্লান্ত লাগছে। আমি...আমি পানি খেয়ে আসি।"
শব্দরের মনে হয়, জুলফার মন ভালো নেই। সে উঠে এসে জুলফাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে। জুলফা তখন মাথায় ধরে বলে, "মাথাটা একটু ব্যথা করছে। আপনি ঘুমান, আমি খোলা বাতাসে আরেকটু হাঁটি বারান্দায়।"
"ঠিক আছে। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানিও।"
জুলফা মাথা নাড়ে। সে জানে, তার এড়িয়ে যাওয়া শব্দরকে কষ্ট দিচ্ছে। কিন্তু সে নিজেও সূচের মতো তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছে। শব্দরের স্পর্শ তার কাছে অসহ্য ঠেকছে। অবশ্য সবসময়ই অসহ্য লাগত। জুলফা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়৷ রাতের আকাশে তারাগুলো মিটমিট করে জ্বলছে। দূরে কোথাও একটা শিয়াল ডাকে। সারারাত সে অস্থির অবস্থায় কাটায়। কখনো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে রয়। কখনো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। আবার কখনো বা পানি খাওয়ার অজুহাতে রান্নাঘরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। যতবার শারিরীক চাহিদার তাড়নায় শব্দর তাকে কাছে টানতে চেয়েছে, জুলফা কোনো না কোনো বাহানায় দূরে সরে গেছে। সে নিজেকে মনে মনে অপরাধী ভাবছে, কিন্তু সেই অপরাধবোধও তাকে শব্দরের কাছে ফিরিয়ে আনতে পারছে না।
ভোর হতে না হতেই শব্দর গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে। জুলফার চোখে ঘুম নেই। তার চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছে নাভেদের মুখ। সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
বাইরের তাজা হাওয়ায় ফুসফুস ভরে যায়, সেই শ্বাসও নাভেদের স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত।
কানে ঢোলের মতো বাজছে নাভেদের কথাটা, 'আপনার জন্য একটা বিশেষ সুর বাজাতে চাই।'
জুলফা চোখ বন্ধ করে কল্পনা করে নিজেকে একটি সুন্দর বাগানে, যেখানে নাভেদ তার বেহালা নিয়ে বসে আছে। চারপাশে ফুল ফুটেছে, পাখিরা গান গাইছে৷ নাভেদের আঙুলের স্পর্শে বেহালা থেকে উঠছে স্বর্গীয় মনমাতানো এক সুর। জুলফা সমস্ত অস্তিত্ব সেই সুরের সাথে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সুন্দর কল্পনাটির সঙ্গে মনের কোনো কোণে আরেকটা চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, সে মহাপাপ করছে। কিন্তু সেই অপরাধবোধের চেয়েও বড় ছিল নাভেদের প্রতি তার অনুভূতি। সে জানে, এই অনুভূতি অবৈধ, অনৈতিক। তবুও সে নিজেকে সামলাতে পারছে না। প্রতিটি পাপী পাপ করার সময় জেনে-বুঝেই পাপ করে।
জুলফাও জানে, তার এই অনুভূতি একটি পাপ। তবুও সেই পাপের মধ্যেই সে খুঁজে পাচ্ছে শান্তি।
দুপুরের রোদ্দুর যতই চড়তে থাকে, ততই জমিদার বাড়ির রান্নাঘরে ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। জুলফা নিজের ঘর ছেড়ে ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে যায়। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নিজেকে আর চার দেয়ালে বন্দি করে রাখবে না। তাছাড়া বিবাহিতা নারীর প্রতি নাভেদ কখনোই দুর্বলতা দেখাবে না। কিছুদিন পরই চলে যাবে । তাহলে কয়েকদিন জমিদার গিন্নি হিসেবে সামনাসামনি থাকলেই বা কী এমন ক্ষতি হবে? ঘরে থাকতেও আর ভালো লাগছে না তার।
রান্নাঘরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জুলফার চোখ পড়ে ললিতার ওপর। মহিলা বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ফেলেছে৷ জুলফার উপস্থিতি তার কাছে অযাচিত বিরক্তির কারণ। ললিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলেন, 'দেখো দেখো কে এসেছে! নতুন বউ আজ রান্নাঘরে পা দিয়েছেন! এতদিন কোথায় ছিলেন? রাজকন্যার মতো ঘুমাচ্ছিলেন বুঝি?"
জুলফা নীরবতা বজায় রাখে, কোনো উত্তর দেয় না। সে হাঁড়ি-পাতিলগুলো দেখতে থাকে, যেন ললিতার কথা কানেই যায়নি।
ললিতা আরও খিটখিটে স্বরে বলেন, "কী গো, জিভ খসে পড়েছে নাকি? কথা বলছ না কেন?'
জুলফা শান্ত কণ্ঠে উত্তর দেয়, 'আমি শুধু রান্নার তদারকি করতে এসেছি।"
ললিতা এবার বিদ্রূপের হাসি হেসে বলেন, "তদারকি! দিনমজুরের মেয়ে এসেছে, তাই শুধু তদারকি। হাতে হাত দিয়ে কাজ করা তো আপনার কাজ নয়। তাই না?"
জুলফা একটা হাঁড়ির ঢাকনা তুলে ভেতরের তরকারি দেখার চেষ্টা করে। হঠাৎ করে ললিতা জুলফার হাত ধরে জোরে টেনে সরিয়ে দিলেন সেখান থেকে। তার চোখে মুখে রাগ... ঈর্ষা। তিনি গর্জন করে বলেন , "এই যে! কী করছো? তোমার অত বড় দায়িত্ব নেই। যাও, গিয়ে আয়নায় মুখ দেখো। আর তোমার স্বামীকে খুশি রাখো। এই বাড়িতে তোমার এটুকুই কাজ। রান্নাঘরে থাকলে তোমার কোমল হাতে ময়লা লেগে যাবে।"
জুলফা আর চুপ করে থাকে না। চোখ তুলে বলে, "আপনি কি মনে করেন? আপনার আচরণ আমাকে ভয় দেখাচ্ছে?"
"ওমা! তুমি দেখি কথা বলছো? তাহলে জিভ খসে পড়েনি?"
"শুধু কথা নয়, আমি নিজের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন। এই বাড়িতে আমারও সমান অধিকার আছে।"
"অধিকার! তুমি কী মনে করো, এই কদিনে এ বাড়ির মালিক হয়ে গেছো? জমিদার বাড়ির বউ হওয়া এত সহজ? "
"মালিক হওয়ার কথা কে বলছে, ভাবিজান? আমি শুধু সম্মান চাইছি। সবসময় আপনি আমাকে অপমান করেন। এই বাড়িতে আমিও একজন সদস্য, তাই নয় কি?"
"সদস্য! তুমি এখানে অতিথি মাত্র। যতদিন শব্দরের মন জুড়ে থাকবে, ততদিনই এখানে তোমার স্থান।"
জুলফা এবার একটু হেসে বলে, "ভাবিজান, আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন যে আমিও এই বাড়ির আরেক জমিদারের স্ত্রী? আমার অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।"
ললিতার মুখ লাল হয়ে ওঠে। তিনি চোখ পাকিয়ে, রাগে গরগর করতে করতে বলেন, "তাই নাকি? দেখি কতদিন টিকতে পারো! আর মনে রেখো, এই বাড়িতে আমিই প্রথম বউ।"
"সেটা আমি জানি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনি আমাকে অপমান করতে পারবেন।"
ললিতা হঠাৎ করে হাঁড়ির ঢাকনা জোরে নামিয়ে রাখেন। শব্দটা পুরো রান্নাঘরে প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি দাঁত কিড়মিড় করে বলেন, "দেখো মেয়ে, তোমার সাহস তো কম নয়! আমার সঙ্গে গলা চড়িয়ে কথা বলছো? ভুলে যাচ্ছো আমি কে? আমি বনেদি ঘরের মেয়ে, এ বাড়ির বড় বউ। তুমি জানো না এই বাড়িতে আমি কত বছর আছি।"
"বছর গুনে লাভ নেই, ভাবিজান। প্রশ্ন হলো, এই বছরগুলোতে আপনি কী শিখেছেন? সম্মান দিতে, না শুধু নিতে?"
রান্নাঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা দাসীরা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এতদিন যারা ললিতার অত্যাচার নীরবে সহ্য করে এসেছে, তারা এখন যেন একটু আনন্দই পাচ্ছে এই দৃশ্য দেখে। দাসীদের দৃষ্টি ললিতার চোখেও পড়ে। লজ্জায় লাল হয়ে উঠে মুখ। নিজের অবস্থান এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে! তিনি চিৎকার করে উঠেন, "চুপ করো!"
জুলফা থামে না। সে বলে, "তাহলে আপনিও আমাকে সম্মান করুন। আমি এখানে কারও দাসী হতে আসিনি। আমি এসেছি বাড়ির বউ হয়ে, পরিবারের সদস্য হয়ে।"
ললিতা জুলফার দিকে এক পা এগিয়ে এসে বলেন, "তুমি কি আমাকে শিক্ষা দিচ্ছো?"
জুলফা পিছু হটে না। সে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে থাকে। নির্ভয়ে বলে, "না, আমি শুধু আমার অধিকার দাবি করছি। আমি এই বাড়ির প্রতিটি কোণে যাব। আর আপনি যদি আমাকে সম্মান না দেন, আমিও আপনাকে সম্মান দেখাতে বাধ্য নই।"
ললিতা এবার সম্পূর্ণভাবে হতভম্ব হয়ে গেলেন। চোখে মুখে শুধু রাগ নয়, আতঙ্কও ফুটে উঠে। এতদিন যে ক্ষমতা তিনি অবলীলায় ভোগ করে এসেছেন, তা যেন হাতের মুঠো থেকে পিছলে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, এই অপমান ঘটছে তার দাসীদের সামনে। যারা এতদিন তাকে দেবী জ্ঞান করে এসেছে, তারাই আজ তার এই অসহায় অবস্থা দেখছে।
ললিতার চিৎকার করে বলেন, "তুমি... তুমি..." কথা শেষ করতে পারেন না। তার আগেই চোখে জল এসে যায়। রাগে, অপমানে, হতাশায় পাথর হয়ে যান৷ দাসীরা এখন আর কৌতূহলী নয় বরং বিস্মিত। ললিতাকে তারা কখনো এমন অসহায় অবস্থায় দেখেনি।
এই সময় লাঠির শব্দ শোনা যায়। ঠক্ ঠক্ করে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে সুফিয়ান রান্নাঘরে প্রবেশ করেন। তার পিছনে শব্দর। সুফিয়ানের চোখে মুখে বিরক্তির ছায়া। তিনি গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করেন, "কী হচ্ছে এখানে? এত চেঁচামেচির কারণ কী?"
জুলফা তাড়াতাড়ি মাথার আঁচল টেনে দিয়ে বলে, "ভাইজান, আপনার স্ত্রী প্রতিদিন আমাকে অপমান করছেন। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।"
ললিতা তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করেন, "মিথ্যা কথা! এই মেয়ে আমাকে অপমান করছে!"
সুফিয়ান লাঠি দিয়ে মেঝেতে জোরে আঘাত করেন। শব্দটা সারা রান্নাঘরে প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি গর্জন করে বলেন, "দুজনেই চুপ করো! এ কী কাণ্ড হচ্ছে আমার বাড়িতে? তোমরা কি ভুলে গেছ কোন বংশের বউ তোমরা?"
সুফিয়ানের গর্জনে ললিতা, জুলফা দুজনেই চমকে উঠে।
সুফিয়ান বলেন, "লজ্জা করে না তোমাদের? জমিদার বাড়ির বউ হয়ে এমন আচরণ! দাসীদের সামনে কলহ করছো? এ কেমন শিক্ষা পেয়েছো তোমরা? আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে ঐতিহ্য রেখে গেছেন, তা কি এভাবেই ধ্বংস করবে?"
ললিতা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, "এই মেয়ে..."
সুফিয়ান কঠোর স্বরে বাধা দিলেন, "চুপ করো ললিতা! তুমি এ বাড়ির প্রবীণ নারী... বড় বউ। তোমার কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করিনি। তোমার দায়িত্ব ছিল নতুন বউকে শেখানো, পথ দেখানো। কিন্তু তুমি কী করছো?"
জুলফা এবার কিছু বলার চেষ্টা করে, "ভাইজান, উনি প্রতিদিন..."
সুফিয়ান তাকেও থামিয়ে দিলেন, "তুমিও চুপ করো জুলফা!"
তিনি একটু থেমে শ্বাস নিলেন নিজেকে শান্ত করতে। তারপর বলতে শুরু করেন, 'শোনো, দুজনেই। আমাদের বংশের মর্যাদা শুধু টাকা-পয়সা নিয়ে নয়। আমরা জমিদার, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আমরা মানুষ। লোকে আমাদের সম্মান করে শুধু জমিদার বলে নয়, আমাদের আচরণের জন্য। কিন্তু তোমরা প্রতিদিন যা করছো, তা দেখলে লোকে কী বলবে? বলবে জমিদার বাড়িতে শিক্ষা-দীক্ষা নেই, সংস্কার নেই।"
ললিতা ও জুলফা চুপ করে থাকে।
সুফিয়ান বলছেন, "ললিতা, তুমি এ বাড়ির কর্ত্রী। তোমার দায়িত্ব নতুন বউকে শেখানো, তাকে অপমান করা নয়। তোমার মধ্যে দিয়েই তো এ বাড়ির ঐতিহ্য বহন করবে পরের প্রজন্ম। আর জুলফা, তুমি নতুন এসেছো। বড়দের সম্মান করতে শেখো। সম্মান পেতে হলে সম্মান দিতে হয়।"
জুলফা নিজের সম্পর্কে বলতে চায়, "কিন্তু ভাইজান, আমাকেও তো সম্মান..."
"সম্মান অর্জন করতে হয়, জুলফা। নিজের আচরণ দিয়ে। চেঁচামেচি করে নয়। শ্বশুর বাড়িতে এসেছো, এখানকার রীতি-নীতি শেখো। তারপর দেখবে, সবাই তোমাকে সম্মান করছে।"
সুফিয়ান দুজনের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন।
"আমাদের কুলমর্যাদা শুধু বাইরের লোকের কাছে নয়, নিজেদের মধ্যেও। তোমরা যদি এভাবে কলহ করো, তাহলে সেই মর্যাদা ধুলায় মিশবে। আমি চাই না আমার জীবদ্দশায় এমন হোক। বাড়িতে অতিথি এসেছে, আর তোমরা চেঁচামেচি করছো। এটা কি শোভা পায়? আর যদি এরকম হয়, তবে দুজনকেই বাড়ি থেকে বের করে দেব। আমার কাছে এ বাড়ির মর্যাদা সব কিছুর উপরে।"
সুফিয়ান ধীরে ধীরে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে সেখান থেকে চলে গেলেন। তার পদশব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পরও রান্নাঘরে ছড়িয়ে থাকে গুরুগম্ভীর নীরবতা।
নাভেদ বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ কানে আসে নারীদের চিৎকার। চোখ দুটো কৌতূহলে বড় হয়ে যায়, কান খাড়া করে শব্দের উৎস খুঁজতে থাকে। মহলের ভেতরে কিছু হচ্ছে! একজন অপরিচিত অতিথি হিসেবে ভেতরে ঢুকতে সংকোচ বোধ হয় তার।
বাইরে বসে সিদ্দিক নামের এক লোক মন দিয়ে জুতো সেলাই করছিল। নাভেদের বিস্ময়-মাখা মুখ দেখে সে চতুর হাসি হেসে বলে, " মশাই, এটা রোজকার ব্যাপার। আমাদের দুই জমিদারনী যখনই মুখোমুখি পড়ে, তখনই শুরু হয়ে যায় তাদের লড়াই। উনাদের ঝগড়া দেখলে মনে হয় দুটো বাঘিনী খামচাখামচি করছে। হা হা হা! এমন মজার তামাশা আমরা সবাই রোজই দেখি!"
নাভেদ আপনমনে হাসে। সিদ্দিক কাজ শেষ করে বাড়ির ভেতর যেতে নেয় হঠাৎ বাড়ির সামনে একটি চকচকে মোটরগাড়ির আগমন তাকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। সেই যুগের পল্লীগ্রামে এমন দৃশ্য ছিল অতীব দুর্লভ। গাড়ির দরজা খুলতেই সিদ্দিকের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। গাড়ি থেকে নেমে এসেছে দুই তরুণ-তরুণী।
যুবকটির পরনে ইস্ত্রি করা সাদা শার্ট, তার সাথে মানানসই কালো রঙের প্যান্ট। পায়ে চকচকে পালিশ করা জুতা। তরুণীর পোশাক আরও বৈচিত্র্যময়। পরনে হাঁটু পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের একটি রঙিন ফ্রক, যার ওপর নানা রকম ফুলের নকশা। কোমরে একটি চওড়া বেল্ট। পায়ে উঁচু হিলের জুতা আর মাথায় একটি ছোট্ট, সুন্দর হ্যাট। মেয়েটি পরীর মতো সুন্দর।
সিদ্দিক হতবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। এমন পোশাক তার চোখে পড়েনি কখনও। বাঙালি ছেলেমেয়েদের এহেন সাজসজ্জা ছিল তার কাছে কল্পনারও অতীত। তরুণীর মুক্ত চুল বাতাসে উড়ছে, আর যুবকের হাতে ধূমায়িত সিগারেট দেখে সিদ্দিকের চোখ আরও বিস্ফারিত হয়। বিস্ময়াভিভূত সিদ্দিক নিজের মনেই ফিসফিস করে বলে, "ওরে বাবা! এরা কোথা থেকে এল?"
·
·
·
চলবে……………………………………………………