জানালার পাশে বসে আছে জুলফা। চোখে জমে থাকা অশ্রু তার দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দিয়েছে। মনের ভেতর চলছে তুমুল ঝড়। প্রতিটি মুহূর্তে মন কেঁদে উঠে মনে মনে কাতর প্রার্থনা করছে, ‘ও খোদা, কেন আমাকে এমন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করলে? কোন পথে হাঁটব আমি?’
বাইরে ধীরে ধীরে সন্ধ্যার নীলাভ আঁধার নেমে আসছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার মৃদু করুণ গুঞ্জন। জুলফার মনও সেই সুরের মতো বিষণ্ণ ও অস্থির। নিচের অতিথি ঘরে আছে নাভেদ! তার যৌবনের স্বপ্নপুরুষ। সেই বাবরি চুল, সেই মোহনীয় হাসি সব কিছু কত স্পষ্ট তার স্মৃতিপটে। সে নিচে নামতে ভয় পাচ্ছে, পাছে নাভেদের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে পড়ে। নাভেদের সান্নিধ্যে গেলে তার সমস্ত সংযম ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
‘না, আমি নিচে যাব না,’ জুলফা নিজেকে বলে। ‘রান্নাঘরেও পা বাড়াব না। এই ঘরেই থাকব, যতদিন না উনি বিদায় নেন।’
দিনের পর দিন গড়িয়ে যাচ্ছে। জুলফার অদ্ভুত আচরণে বাড়ির সবাই বিব্রত, বিশেষ করে ললিতা। তিন দিন ধরে জুলফা নিজের ঘর আর বারান্দার গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ।
তৃতীয় দিনের সকালে, সূর্যের আলো যখন বাড়ির প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন হঠাৎ ললিতার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে আসে।
‘আরে ও জমিদার বউ! এত বড় একটা বাড়ির কর্ত্রী হয়ে এভাবে ঘরকোণে লুকিয়ে থাকা কি সাজে? নামো, নামো শিগগির! রান্নাঘরে এসো। চোখ কানা নাকি? দেখছ না বাড়িতে অতিথি এসেছেন?’
জুলফা নিশ্চুপ। ললিতাও সহজে হার মানার পাত্রী নয়। তিনি আরও জোর গলায় বলতে লাগলেন, ‘দেখো তো কেমন নখরা করছে! মনে হচ্ছে কোন রাজকুমারী এসে বসে আছে! শোনো মেয়ে, তোমার বাবা যে দিনমজুর ছিল, সেটা কি ভুলে গেছ নাকি? জমিদার বাড়ির বউ হয়েছ বলে কি মাথায় অহংকার ঢুকে গেছে? তোমার দায়িত্ব-কর্তব্য সব ভুলে বসে আছ?’
জুলফার নীরবতা ললিতাকে আরও উত্তেজিত করে তোলে। তিনি আরও তীব্র স্বরে বলেন, ‘ও মহারানী! কানে কি শুনতে পাচ্ছো না? নাকি মূল্যবান কানে সোনার দুল পরে কান বন্ধ করে রেখেছ? এই সংসারের সব কাজকর্ম কি আমরা একাই সামলাব? আর তুমি শুধু সাজগোজ করে বসে থাকবে?’
জুলফার নিরুত্তর ভাব দেখে ললিতার মেজাজ চরমে ওঠে। তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েন, ‘যাও, যাও! বসেই থাকো তোমার সোনার পিঁজরায়। দেখি কতক্ষণ এভাবে চালাতে পারো। মনে রেখো, তোমার এই অবাধ্য আচরণের শাস্তি তুমি পাবেই। ভুলো না, এই বাড়িতে তোমার আসল পরিচয় কী আর আমরা কারা।’
ললিতার কটু কথাগুলো জুলফার হৃদয়ে তীক্ষ্ণ ছুরির মতো বিঁধছে। সে নিজের অনুভূতিকে প্রাণপণে দমন করে, নীরবে সহ্য করে যায় সমস্ত অপমান। সন্ধ্যা নামার পর, শব্দর উদ্বিগ্ন হয়ে জুলফার ঘরে আসে। ধীরে ধীরে জুলফার কাছে বসে কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে আমার রানীর? তিনদিন ধরে নিজেকে ঘরে বন্দি করে রেখেছো। কোনো সমস্যা হয়েছে?’
জুলফা গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে কিঞ্চিৎ নাটকীয় সুরে বলে, ‘আপনাকে একটা কথা বলা হয়নি।’
‘কী কথা?’
‘আমি যখন যাত্রাপালায় নাচ করতাম, তখন নাভেদ পাটোয়ারীকে সেখানে দেখেছিলাম। তিনি আমাকে চিনতে পারবেন কি না জানি না, কিন্তু যদি চিনে ফেলেন, তাহলে আপনার ভাইজান জেনে যাবেন আমার আসল পরিচয়। এই ভয়ে আমি তটস্থ হয়ে আছি। আপনার সম্মান রক্ষার্থে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছি।’
শব্দরের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে, ‘নাভেদ পাটোয়ারী দুই-তিন সপ্তাহ থাকবে। এতদিন কীভাবে নিজেকে বন্দি করে রাখবে?’
জুলফা তখন শব্দরের হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে, চোখে চোখ রেখে বলে, ‘আমি পারব। যখন মনে হবে আর পারছি না, তখন সুরঙ্গ দিয়ে বাগানে নয়তো বনে চলে যাব। তাছাড়া ছাদ তো আছেই।’
‘এটা তো তোমার জন্য খুব কষ্টকর হবে।’
জুলফ স্বামীর চোখে চোখ রেখে বলে, ‘আপনার জন্য এই কষ্ট আমার কাছে কিছুই না। আপনার মর্যাদা রক্ষা করাই আমার প্রথম কর্তব্য। আমি জানি, আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে আমি যে কোনো কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত আছি।’
শব্দর স্ত্রীর কথায় ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়। জুলফা দিন দিন যেন আরও বেশি করে আদর্শ স্ত্রীর রূপ ধারণ করছে। এ জীবনে তার আর কী প্রয়োজন? এমন একনিষ্ঠ, ত্যাগী স্ত্রী পেয়ে সে ধন্য। সে আবেগে অভিভূত হয়ে জুলফার কোমল হাতটি নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিয়ে মৃদু স্বরে বলে, ‘তুমি যা ভালো বোঝ, তাই করো। আমি সবসময় তোমার পাশে থাকব ছায়ার মতো।’
জুলফা মৃদু হেসে শব্দরকে আশ্বস্ত করলেও তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে বেদনার ঝড়। মনের ভেতর একটা কথা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে, যদি সে নিচে যায়, যদি নাভেদের সামনে পড়ে, তাহলে সব ভেঙেচুরে যাবে। নাভেদকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার সমস্ত সংযম ভেঙে পড়বে, সে ভুলে যাবে নিজের সংসার, ভুলে যাবে স্বামীকে। তার এই আদর্শ স্ত্রীর ভূমিকা, এই ত্যাগের মুখোশ সবই শুধু নাভেদের প্রতি তার অদম্য ভালোবাসাকে লুকিয়ে রাখার একটা প্রয়াস মাত্র।
সূর্যের সোনালি আলোয় ঝলমল করছে জমিদার বাড়ির বিশাল ছাদ। ছাদের কোণায় একটি ছোট চাতাল, যেখানে বসে আছে জুলফা। তার পাশে দুই দাসী। জুলফার কোমল পায়ে লাল আলতা পরানোর কাজ চলছে। আঙুলে আঙুলে ছড়িয়ে পড়ছে গাঢ় লাল রঙের আলতা।
ছাদ থেকে চোখ মেলে তাকালে দূরে দেখা যায় সবুজ বন। বাঁ দিকে জমিদার বাড়ির সুসজ্জিত বাগান, যেখানে রঙবেরঙের ফুল ফুটে আছে। দক্ষিণ দিকে গ্রামের বাড়িঘর, মাঠ-ঘাট সব নজরে পড়ে। এক নজরে পুরো গ্রামটাকে দেখা যায় এখান থেকে।
জুলফার চোখ পড়ে নীচের দিকে। একজন অচেনা লোক ঘোড়া নিয়ে জমিদার বাড়ির ভেতরে ঢুকছে আর সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে পাঞ্জাবি, পায়জামা পরা নাভেদ। সে আগন্তুকের সঙ্গে করমর্দন করে কথা বলতে বলতে ঘোড়াটাকে নিয়ে আস্তাবল ঢুকে পড়ে।
উৎসুক হৃদয়ে জুলফা তার খাসদাসী শঙ্খিনীকে জিজ্ঞাসা করে, ‘নতুন লোকটা কে?’
শঙ্খিনী জবাব দেয়, ‘নাভেদ বাবুর কর্মচারী।’
কিছুক্ষণ পর, আস্তাবলের দরজা খুলে যায়। জুলফা সেদিকে তাকায়। তার হৃদয়ের স্পন্দন থেমে যায় মুহূর্তের জন্য। নাভেদ বেরিয়ে এসেছে। তার শক্ত হাতে ধরা ঘোড়ার লাগাম। সূর্যের আলোয় তার বাবরি চুল চিকচিক করছে। এক লাফে সে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে ঘোড়ার পাশে হালকা চাবুক মারতেই ঘোড়াটি সঙ্গে সঙ্গে ধূলি উড়িয়ে, মাটি কাঁপিয়ে দৌড়াতে শুরু করে।
অতীত।
সকালের মিষ্টি রোদ্দুরে হাওরের কুয়াশা কেটে যেতেই জুলফার দল তানপুরা বাজারের পথে পা বাড়ায়। বাজারে পৌঁছে তারা নিপুণ হাতে সাজায় তাদের রঙিন পসরা। ঝকঝকে কাঁচের চুড়ি, পুঁতির মালা, কানের দুল, নাকফুল সবই আছে।
বৈশাখি তার মধুর কণ্ঠে খদ্দের ডাকছে।
‘আইছেন গো বইনেরা, দেইখেন আমাগো লাল-নীল চুড়ি! কি চুন্দর মানায় আপনেগো হাতে!’
‘ও ভাইছাব, আইছেন! দেখেন এই চোনার মতন ঝলমলে হার! আপনের বউরে দিলে খুছি হইবে!’
জুলফা আর মান্নান খদ্দেরদের সাথে দর-কষাকষি করছিল। হঠাৎ একটা গুঞ্জন উঠল বাতাসে। কেউ একজন উচ্চস্বরে বলছে, ‘বাজারের মাঠে ঘোড়া দৌড় হচ্ছে!’
জুলফার চোখে কৌতূহল জ্বলে ওঠে। ঘোড়দৌড় সে কখনো চোখে দেখেনি! উত্তেজনায় মাকে বলে, ‘আম্মা, আমি একটু ঘোড়দৌড় দেখে আছি।’
মা মুখের দিকে তাকানোর আগেই রঙিন ঘাগড়া পরনে, ব্লাউজের ওপর ওড়না উড়িয়ে জুলফা ছোটে বাতাসের বেগে। কেমন দেখতে ঘোড়াগুলো? কত জোরে ছোটে?
আকাশে রোদের ঝিলিক আর মাঠের সবুজ ঘাসের মিলনে একটা উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। জুলফা দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় সেই আনন্দঘন পরিবেশের দিকে। মাঠের চারপাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে সীমানা রেখা এঁকে দিয়েছে। ভিড়ের মাঝে নিজের জায়গা করে নেয় জুলফা।
চারিদিকে চোখ বুলাতে বুলাতে হঠাৎ করেই তার চোখ আটকে যায় একজনের ওপর। সেই যে প্রথম দেখায় মন কেড়ে নিয়েছিল, তারপর হারিয়ে গিয়েছিল অনেক দূরে, নাম না জানা সেই পুরুষ! নাভেদের চেহারা দেখে জুলফার বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সাদা রঙের ঘোড়সওয়ারের পোশাকে তাকে একজন রাজপুত্রের মতো লাগছে। মাথায় সুরক্ষা টুপি থাকলেও নিচে থেকে উঁকি দিচ্ছে কালো বাবরি চুল। সেই চুল বাতাসে উড়ছে কালো মেঘের মতো। তার ঘোড়াটিও খুব সুন্দর, গাঢ় বাদামী রঙের। চারদিকে মানুষের কোলাহল। অথচ জুলফার কানে সব অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তার চোখ, মন, হৃদয় সব জুড়ে শুধু নাভেদের উপস্থিতি। মাঠের এক কোণে অন্যান্য প্রতিযোগীরা নিজেদের ঘোড়া নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কেউ ঘোড়ার পিঠে চড়ে অভ্যাস করছিল, কেউ বা ঘোড়ার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
ঘোড়দৌড়ের শুরুর বাঁশি বেজে উঠতেই প্রতিযোগীরা শুরুর লাইনে সারিবদ্ধ হয়। নাভেদের ঘোড়া উদ্দাম হয়ে উঠেছে, সে শক্ত হাতে লাগাম ধরে আছে। জুলফার বুক দুরু দুরু করছে।
বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াগুলো ধূলো উড়িয়ে, মাটি কাঁপিয়ে ছুটতে শুরু করে।
নাভেদ ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। জুলফার হৃদয়ও নাভেদের সঙ্গে সঙ্গে ছুটে চলেছে।
ঘোড়দৌড়ের শেষ পর্যায়ে নাভেদ আরও জোরে ছুটতে শুরু করে। জুলফার মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে আসে, ‘এইতো আরেকটু, এইতো’ সে নিজেও বুঝতে পারে না কখন সে হাততালি দিতে শুরু করেছে। চারপাশের মানুষজন তার দিকে তাকাচ্ছে, অথচ তার কোনো হুঁশ নেই।
সূর্যাস্তের রঙিন আভায় রাঙা হয়ে উঠেছে ঘোড়দৌড়ের মাঠ। উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠার পর অবশেষে শেষ হয় প্রতিযোগিতা। ধুলোর মেঘ কেটে যেতেই দেখা যায়, একজন অশ্বারোহী বিজয়ীর মুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। জুলফার হৃদয় তখনও দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে
সে একজন দর্শকের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে, ‘ভাই, যে বিজয়ী হলো তার নাম কী?’
লোকটি হাসিমুখে উত্তর দেয়, ‘নাভেদ পাটোয়ারী। বাইরের লোক। শুনলাম বাণিজ্যের কাজে এখানে এসেছেন।’
‘বাণিজ্য? কেমন বাণিজ্য?’
লোকটি বলে, ‘আমার যতদূর জানা, উনি এখানকার আড়তদারদের সঙ্গে চুক্তি করতে এসেছেন।’
জুলফার মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে আসে, ‘নাভেদ।’
সে নাভেদের দিকে তাকিয়ে অনুভব করে, তার দেহের প্রতিটি কোষে একটা তীব্র অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে। যে অনুভূতি তাকে নাভেদের দিকে টেনে নিতে চাইছে।
চারপাশের প্রায় সব তরুণীর চোখেই নাভেদের প্রতি একই আকর্ষণ। তাদের চাহনিতে নাভেদকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সেই দৃশ্য দেখে জুলফার বুকের ভেতর হুহু করে ওঠে। নিজের দিকে তাকায়। সে তো একজন সাধারণ বেদে মেয়ে। তার সরল জীবন, অনাড়ম্বর পোশাক, আর সহজ-সরল কথাবার্তা এসব নিয়ে সে কীভাবে এই উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত সমাজে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে? নাভেদের মতো একজন প্রতিভাবান ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা তার নেই।
কিন্তু প্রেম তো কোনো সীমানা মানে না। সামাজিক মর্যাদা, অর্থ-বিত্ত এসব তো প্রেমের কাছে তুচ্ছ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………