মাথার উপর তারকাখচিত আকাশ। নাহিদ শুয়ে আছে ব্রহ্মপুত্রের উন্মুক্ত প্রান্তরে। মাথার নিচে এক হাত রেখে নিথর হয়ে পড়ে আছে তার দীর্ঘ দেহ। চোখদুটো আকাশের দিকে স্থির। কিছুদূরে বাদামি মার্বেলের মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে কয়েক জোড়া চোখ। ওগুলো সম্ভবত শেয়াল। কাছের ন্যাড়া শিমুল গাছ থেকে ভেসে আসছে এক জোড়া নিশাচরের বেদনার্ত কণ্ঠস্বর। জোনাক পোকার বিরামহীন ঝিমঝিম আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছে, এই ধু-ধু প্রান্তরে নাহিদ কতটা একলা। কতটা অসহায়। ঘন দূর্বাদলে অচল বস্তুর মতো শুয়ে থাকা নাহিদের অবশ্য এসব নিয়ে বিকার নেই। মাথায় তার খেলা করছে সহস্র এলোমেলো ভাবনা। অবুঝ শিশুর অর্থহীন বুলির মতোই অকারণ সেসব চিন্তা। অসীম অন্ধকারে সঙ্গীহীন শয্যায় শুয়ে থেকে নাহিদের ক্রমেই নিজেকে ভারহীন জড়বস্তু বলে বোধ হয়। ভাবে, এই পৃথিবীতে আসা তার জন্য কেন এতো অপরিহার্য ছিল? সৃষ্টিকর্তা কি আশ্চর্য উপায়ে এই পৃথিবীতে, এই মাটির কাছাকাছি জন্ম দিয়েছেন তাকে। কিন্তু যদি না জন্মাতেন? নাহিদ মনে মনে ভারি চমকায়! সে-ই তো, যদি নাহিদ না জন্মাতো এই পৃথিবীতে? সবাই কী জন্মায়? অনেকেই তো জন্মাতে পারে না। মরে যাওয়া ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ‘না জন্মানো’ ব্যাপারটা কী আরও রূঢ় নয়? এই পৃথিবীতে, এইযে ব্রহ্মপুত্রের এই প্রান্তরে নাহিদ বলে কেউ থাকতো না। এই দূর্বাদলের উপর কেউ নীরব শুয়ে থাকতো না। তুচ্ছ একজন মানুষের মৃত্যুতেও মানুষ ব্যথিত হয়। কিন্তু কারো না জন্মানোতে কী কারো দুঃখ হয়? নাহিদ না জন্মালে, নাহিদ নামের একজন মানুষ জন্মাতে পারেনি, এই ভয়ংকর দুঃসংবাদ এই পৃথিবীর কেউ কোনোদিন জানতে পারতো না৷ কেউ তার জন্য একটুখানি দুঃখ করতো না। এটা কী যথেষ্ট ভয়ংকর ব্যাপার নয়? জন্মিয়েও অবশ্য খুব একটা লাভ হয়েছে বলে নাহিদের মনে হয় না৷ সে না জন্মালে যেমন কেউ দুঃখ করতো না; জন্মানোর পরও এই পৃথিবীর কারো খুব সুখের কারণ নাহিদ হতে পারেনি। তার না-জন্মানোতে পৃথিবী যেমন উদ্বেগহীন থাকতো। তার মৃত্যুতেও এই পৃথিবী থাকবে নিরুদ্বেগ। নাহিদের এলোমেলো দার্শনিক ভাবনায় সাময়িক চিড় ধরিয়ে ধাতব যন্ত্র পতনের মতো ঝংকার তুলে বেজে উঠল তার মুঠোফোন। নাহিদ সচকিত হলো। বুকের উপর অলস পড়ে থাকা হাতটা সরিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে উদ্ধার করল মোবাইল টেলিফোন। কিছুক্ষণ প্রতিক্রিয়াহীন শোয়ে থেকে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ফোন উঠাল। রুক্ষ কণ্ঠে বলল,
‘ বল।’
ফোনের ওপাশ থেকে রিফার রিনরিনে কণ্ঠ ভেসে এলো,
‘ ভাইয়া তুমি কোথায়?’
এই পৃথিবীর কারো প্রতিই নাহিদের বিশেষ কোনো টান নেই। প্রগাঢ় স্নেহ, ভালোবাসার অনুভূতিগুলো নাহিদের কাছে অস্পষ্ট। তারপরও এই এক ছোটবোনের প্রতি যথেষ্ট রূঢ় হতে পারে না নাহিদ। বোনের চপল কণ্ঠ কানে আসা মাত্র কোনো এক আশ্চর্য উপায়ে নরম হয়ে যায় তার কণ্ঠস্বর। নাহিদ বিতৃষ্ণা হটিয়ে শান্ত কণ্ঠে শুধাল,
‘ কেন?’
‘ বাসায় কখন আসবে? বারোটা বেজে গিয়েছে। আম্মু তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।’
‘ আম্মুকে অপেক্ষা করতে নিষেধ কর। আমি আজ আর বাসায় যাব না৷ সম্ভবত নানুবাড়ি চলে যাব।’
‘ কিন্তু তুমি কোথায় আছ?’
নাহিদ ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
‘ আছি বন্ধুদের সাথে। যন্ত্রণা করিস না। ফোন রাখ।’
রিফা ফোন রাখল না। কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে বলল,
‘ তুমি পাড়ার ওই সিদ্দিক, মোবারক এদের সাথে ভাইয়া? তোমাকে কত বার বলেছি ওদের সাথে মিশবে না। ওরা খারাপ ছেলে। ওদের সাথে মিশো বলেই সবাই বলে তুমি গাঁজা খাও। মদ খাও। কেন মিশো তুমি ওদের সাথে?’
নাহিদ উত্তর দিল না। নীরবে কল ডিসকানেক্ট করে দিল। বোনের কল কাটার দুই মিনিটের মাথায় আবারও ফোন বাজল। এবার কথা বলছেন মা৷ নাহিদ ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,
‘ বলো আম্মু।’
‘ তুই কোথায়? বাসায় আসছিস না কেন? আব্বা ভালো আমার, এক্ষুনি বাসায় আয়। তোর আব্বু জানলে ঝামেলা করবে।’
নাহিদ বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ তোমার স্বামী জিজ্ঞেস করেছে আমি কোথায় আছি? আমি বেঁচে থাকি, হারিয়ে যাই বা মরে যাই। কোনো কিছুতেই তোমার স্বামীর কোনো যায় আসে না আম্মু। আজাইরা প্যারা দিচ্ছ কেন? খেয়ে ঘুমাও যাও৷’
‘ তুই কোথায় আছিস এখন?’
‘ আছি এক জায়গায়৷’
‘ ওই সিদ্দিকদের সাথে আছিস? কুত্তার বাচ্চা, তোর বাপ এক কুত্তা। তুই হইছিস আরেক কুত্তা। আমার জীবনটা শেষ করে দিলি তোরা দুই কুত্তা মিলে। তোরে কতবার বলেছি, ওদের সাথে মিশবি না? শুনছ না কেন তুই?...’
উত্তেজিত হলে শাহিনূরের মুখের ভাষায় যে ভয়ংকর অশালীন শব্দগুলো উঠে আসে সেগুলো মাঝেমাঝেই বাকরুদ্ধ করে দেয় তাকে। নাহিদ মায়ের তীব্র গালিগালাজের সামনে হতাশ কণ্ঠে বলল,
‘ আমি ওদের সাথে নেই।’
শাহিনূর ফুঁসে উঠে বলল,
‘ তাহলে কার সাথে আছিস তুই? আমাকে বলদ মনে হয় তোর? আমি চিনি না তোকে? দশ মাস তোর মতো কুত্তাকে পেটে ধরছি। তোর কুত্তামি স্বভাব আমি জানব না?’
নাহিদ এবার কোনো প্রত্যুত্তর করার চেষ্টা করল না। শাহিনূর ছেলের নীরবতা বুঝতে পেরে হঠাৎই আবার কোমল হয়ে এলেন। কোমল কণ্ঠে বললেন,
‘ কালকে নানাবাড়িতে যাস বাবা। আজ বাসায় চলে আয়। তোর আব্বুর সামনে কিছুক্ষণ ভদ্র ছেলেটি হয়ে থাক। তুই ওমন বখাটেপনা করিস বলেই তো তোর আব্বু রাগ করে। সব সময় তো নানাবাড়িতেই থাকিস। এই দুইদিন বাসায় থাক আব্বা।’
নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শুষ্ক কণ্ঠে বলল,
‘ তোমার স্বামীর সাথে তোমার এতো সুখের সংসার আর দেখতে ইচ্ছে করে না আম্মু। সুখ দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত৷ তাই নানুবাড়ি গিয়ে বারবার দুঃখ দেখে আসি। বারবার ফোন দিয়ে জ্বালাবে না তো। ফোন রাখো।’
মায়ের কল ডিসকানেক্ট করে আবারও নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল নাহিদ। পারিবারিক এই অশান্তি আর ভালো লাগছে না তার। মনে হচ্ছে, কত বছর ধরে বয়ে চলেছে আস্ত এক জীবনের বোঝা। জীবনানন্দের মতো পৃথিবীর বুক চিড়ে হেঁটে চলেছে হাজার বছর ধরে। কবি হাজার বছর হাঁটার পর পেয়েছিলেন নাটোরের বনলতা সেনের সাক্ষাৎ। নাহিদের জীবনে কোনো বনলতা নেই। নারীদের প্রতি তার তীব্র আকর্ষণের সাথে আছে অদ্ভুত এক উদাসীন্য। নারীরা তাকে স্বস্তি দিতে পারে না। মিষ্টির কাছেও কখনও শান্তি পায়নি নাহিদ। শান্তি পায়নি আরও অজস্র নারীদের থেকে যারা নাহিদের যৌবন উপভোগ করতে চায় সুতীব্র উত্তেজনায়। নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বুকের ভেতর বোধ করে আশ্চর্য এক শূন্যতা। দিশেহারা নাবিকের মতো হতাশায় তলিয়ে যায় হৃদয়। সেই হতাশার চোরাবালি থেকে আরও একবার বেরিয়ে আসতে হয় মুঠোফোনের যান্ত্রিক অত্যাচারে। নাহিদ বিরক্ত হয়ে ফোন তোলে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আগুনের ঘোলার তেজ নিয়ে ভেসে আসে সৌধর কণ্ঠস্বর,
‘ কোথায় আছিস তুই,শালা?’
নষ্ট একটা গালি দিয়ে আবার প্রশ্ন করে,
‘ ফোন দিলে ফোন তুলিস না কেন? ইগনোর মারাও আমারে? তোমার ইগনোরেন্সেরে আমি…’
নাহিদ ফাজলামো করে বলল,
‘ রাগ করে না বউ। ব্যস্ত ছিলাম।’
সৌধর পক্ষ থেকে এবার গালির বহর ছুটল। দুনিয়ার তাবৎ গালি নাহিদের নামে উৎসর্গ করে মুখ গম্ভীর করে শুধাল,
‘ কোথায় আছিস?’
নাহিদ হেঁয়ালি করে বলল,
‘ আছি, কোন এক উন্মুক্ত প্রান্তরে।’
সৌধর মেজাজ আবার খারাপ হলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘ তোর উন্মুক্ত প্রান্তর আমি ছুটাব বান্দির পুত। নাটক জুড়া দিছ তুমি। দেবদাস হবা?’
প্রত্যত্তুরে হাসল নাহিদ। ফিচেল কণ্ঠে বলল,
‘ হতাম৷ কিন্তু চন্দ্রমুখী হিসেবে তোকে পেয়ে আমি হতাশ। একটা রূপবতী চন্দ্রমুখী পাওয়া গেলে দেবদাস হয়ে তার নেশায় ডুবে থাকতাম। তোমারে দিয়ে আমি করব কী? তাই প্ল্যান চেঞ্জ।’
সৌধ রাগ ধরে রাখতে না পেরে বলল,
‘ তোর মতো ন*-র পোলা আমি কম দেখছি। শালা…’
সৌধকে উত্তেজিত হতে দেখে হাসে নাহিদ। সৌধ বহু কষ্টে নিজের ক্রোধ সংবরণ করে বলল,
‘ সমস্যাটা কী তোর বল তো? কখন কোথায় থাকছিস কোনো খবর পাচ্ছি না। ফোন বন্ধ রাখছিস। নিজে থেকেও যোগাযোগ করছিস না। এদিকে আদিব হোসেন তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটা কাজ করলাম। আর সেই কাজটা এখন ফেলে রেখে ভুংভাং হয়ে ঘুরছিস তুই। ক্যারিয়ার নিয়ে টেনশন নাই। তোর ফ্রিল্যান্সিং এর কাজকর্মও সব স্টপ। ভার্সিটিতে সেমিস্টার পরীক্ষা শুরু হবে দুইদিন বাদে। অথচ তোর দেখা নাই। পরীক্ষাটা কী না দেওয়ার পায়তারা করছিস নাকি দোস্ত?’
নাহিদ হেঁয়ালি করে বলল,
‘ ঠিক ধরেছিস। তেমনই পায়তারা করছি। ভাবছি, এইবার পরীক্ষাটা দিব না। একটা সেমিস্টার গ্যাপ গেলে কিছু যাবে আসবে না।’
সৌধ আশ্চর্য হয়ে বলল,
‘ মানে কী! সেমিস্টার ফী দিয়েছিস। আর পরীক্ষা দিবি না? কতোগুলো টাকা নষ্ট হবে চিন্তা করেছিস? তারওপর সময়…!’
নাহিদ বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ দূর ব্যাটা! বউয়ের মতো ঘ্যানঘ্যান করিস না তো।’
ফোনে নাহিদকে বুঝানো সম্ভব নয় বিধায় এই বিষয় নিয়ে আর কথা বাড়াল না সৌধ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ আচ্ছা যা। না দিলি পরীক্ষা৷ ঢাকায় কবে আসবি?’
নাহিদ হালকা চালে বলল,
‘ জানি না।’
‘ জানিস না! আদিব হোসেনের সাথে প্রায় দুই মাস আগে আমাদের মিটিং হওয়ার কথা ছিল নাহিদ। এভাবে পোস্টপোনড করে নিজের কত ক্ষতি করছিস বুঝতে পারছিস।’
নাহিদ বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ চিল থাক ভাই। আবিদ হোসেন উড়ে যাবে না। আর উড়ে গেলেও অন্য বহুত অপশন আছে আমাদের হাতে।’
সৌধ বন্ধুর কথায় প্রতিবারের মতো এবার আর আশ্বস্ত হতে পারল না। খেয়াল করল, নাহিদের কণ্ঠে আগের সেই বারুদ আর নেই। সৌধর বুকের কোথাও হাওয়া দিয়ে যায় অদ্ভুত এক শূন্যতা। বুঝে পায় না, নাহিদ! তার পরিচিত নাহিদ দিনদিন এমন অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে কেন? ফোনের দুই পাশে দুই বন্ধু একই সাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে ফোন রেখে আবারও একদৃষ্টে আকাশের দিকে চেয়ে রইল নাহিদ। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই বুঝল, বুকের ভেতরে নদীর পাড় ভাঙার মতো ভেঙে চলেছে অবিরাম। কিছু একটা বড় গোলমাল হয়ে গিয়েছে সেখানে। কিন্তু কী সেই গোলমাল? বুঝে উঠতে পারে না নাহিদ। শুধু বুঝে এই বিশ্রী ছন্দপতনকে গুছিয়ে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি তার নেই। কোথাও যাবার তাড়া নেই। আগ্রহ নেই। আগের সেই জোশ। কিছু করে ফেলার দূরন্তপনা। সেই দূরদর্শী সাহস। সেগুলোর কিছুই আর খুঁজে পায় না নাহিদ। সেগুলো যেন ছুটি নিয়ে হারিয়ে গিয়েছে অনেক অনেক আলোকবর্ষ দূরে। রেখে গিয়েছে কেবল ফোকলা একটা শরীর। যে কেবল চায় বিশ্রাম, বিশ্রাম আর বিশ্রাম। নাহিদ সেই ফোকলা শরীরকে বিশ্রাম দিয়ে অদ্ভুত এক চৌম্বকীয় আকর্ষণে স্থির চেয়ে রইল তারকাখচিত আকাশ পানে। বুক বেয়ে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস।
—————
ধূসর সন্ধ্যা মহানির্বাণ লাভ করেছে; ঘন হয়েছে আঁধার। সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি হয়ে আকাশে উড়ছে পেঁজা তুলোর মতো টুকরো টুকরো মেঘ। সেই অন্ধকার শামিয়ানার নিচে, আঁধার মুখে দাঁড়িয়ে আছে মিষ্টি। গায়ের আসমানী শাড়িতে আজ বিকেলেও তাকে দেখাচ্ছিল এক টুকরো স্নিগ্ধ আকাশ। অথচ সন্ধ্যা নামতেই আদুরে মুখটিতে নামল আষাঢ়ে মেঘের ধূসরতা। দাঁত আর অধরের সংঘর্ষে অশ্রু গোপন করার বৃথা চেষ্টা যেন আরও অভিমানী করে দিচ্ছে তার মুখাবয়ব। গতকাল সারা রাত্রি মুঠোফোনের উচ্ছ্বসিত প্রেমের পর আজ বিকেলে ঈশানের সাথে বাইরে যাবার পরিকল্পনা ছিল মিষ্টির। ঈশানের সঙ্গে দেখা হবার উত্তেজনায় দুরুদুরু বুকে ঘুরে বেড়িয়েছে সমস্ত দিন। পড়াশোনা নিয়ে খুব সচেতন হওয়া সত্ত্বেও ফাঁকি দিয়েছে ভার্সিটির গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস। দুপুরের পর থেকে নিজেকে সাজিয়েছে অপরূপ ইন্দ্রাণীর সাজে। গায়ে জড়িয়েছে ঈশানের পছন্দের শাড়ি। ঈশানও বেশ উত্তেজিত ছিল সারাদিন। কিন্তু গোধূলি আকাশ ছুঁতেই হঠাৎ পরিকল্পনা পাল্টে গেল। প্রেমিকের আহ্বানের জন্য প্রস্তুত মিষ্টিকে ঈশান কল দিয়ে জানাল,
‘ মিষ্টি? আমরা অন্য কোনোদিন বেরুবো। আজ ভাইদের সময় দিতে হচ্ছে। আলমগীর ভাই বলল, একজনকে রক্ত দিতে হবে। মন খারাপ করো না কেমন?’
ব্যস! কথাটা শেষ করেই ফোন কাটল ঈশান। রাগ, অভিমান আর মন খারাপে আঁধার ঘনালো মিষ্টির হৃদয়ে। ঈশান রাজনীতিতে এক্টিভ ছেলে মিষ্টি জানে। কিন্তু, সবসময় তার থেকে রাজনীতি, রাজনৈতিক ভাই-ব্রাদারদের প্রতি ঈশানের এই গুরুত্ব অভিমানী করে তুলে তাকে। নিজেকে অস্তিত্বহীন মনে হয়। সেই থেকে মুখ ভার করে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে মিষ্টি। ছাদের কোণায় নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে উপলব্ধি করেছে, কত মূল্যহীন সে ঈশানের জীবনে৷ নয়তো, বিকেলে রাগ করে ফোন কাটবার পর কেন একটিবারও ফোন করবার প্রয়োজন বোধ করল না ঈশান? একবারও মনে পড়ল না প্রেয়সী তার অভিমানে কাতর? তাকে একটু আদর দেওয়া প্রয়োজন? মিষ্টি অর্ধেক রাত নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থেকে অভিমানী মন নিয়ে মৌনিকে ফোন লাগাল। মৌনিকে ফোনে পাওয়া ভার। দশ থেকে বারো বার ফোন দেওয়ার পর তাকে পাওয়া গেল। প্রিয় বন্ধুর কণ্ঠ শুনেই আবেগী হয়ে গেল মিষ্টির অভিমানী চোখ। প্রেমিকের নামে অজস্র বিচার দিল সে বন্ধুর কাছে। মৌনি মন দিয়ে সমস্ত অভিযোগ শুনল। বন্ধুকে অবমাননা করার অপরাধে কিছুক্ষণ উল্লুক, গাধা, ম্যানহল বলে গালিগালাজ করল ঈশানকে। এক ফাঁকে মিষ্টির প্রাক্তন নিয়েও আফসোস ঝারল। অভিমান করে বলল,
‘ আমার এতো সুদর্শন ভাইকে রেখে এই কালাচাঁদকে পছন্দ করে অবহেলা ছাড়া কী পেলি বল তো? ব্যাটা ম্যানহল কোথাকার! এর থেকে আমার ভাই ফার বেটার। সে এটলিস্ট তোকে অপেক্ষা তো করাতো না!’
নাহিদ অপেক্ষা করাতো না বটে! স্বীকার করল মিষ্টি। কিন্তু ঈশানের মতো সব হারানো অনুভূতিও তো পেতো না সে নাহিদের থেকে। ঈশান নাহিদের মতো সুদর্শন নয়। ঈশানের মধ্যে ভর্তি আলফা মেল ইগো। প্রচন্ড পজেসিভনেস। মিষ্টিকে সে ডোমিনেট করতে ভালোবাসে। তারপরও সব ছেড়ে ঈশানের জন্যই পাগল হয় মিষ্টির মন। ঈশানের দৃষ্টিতে পুলক জাগে। হাতে হাত রাখলে জাগে কী স্বর্গীয় অনুভব! নাহিদের সাথে এই প্রগাঢ় অনুভূতি কভু ছিল না তো! অবশ্য, নাহিদের সাথে কখনও হাতে হাত রাখা হয়নি মিষ্টির। তাদের এতো বছরের সম্পর্কে নাহিদ কখনওই তাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেনি। প্রেমিকদের মতো নষ্ট কথা বলেনি। নাহিদের প্রতি মিষ্টির ক্ষোভ নেই, প্রেম নেই, আহ্লাদ নেই। নাহিদের সাথে যে তার কী ছিল তাই জানে না মিষ্টি। শুধু জানে, নাহিদকে কখনও ভালোবাসেনি সে। ভালোবাসা ওমন হয় না। মিষ্টিকে আসল ভালোবাসার অনুভব দিয়েছে ঈশান। যে ঈশান তাকে দুঃখ দেয়, ব্যথা দেয়, প্রবলভাবে কাছে টানে। মিষ্টি উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। ঈশানকে ভালোবাসা নিয়ে তার মনে কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু একটা সূক্ষ্ম অপরাধবোধ দলছুট পাখির মতো দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে তার বুক জুড়ে। থেকে থেকে সেই অপরাধবোধ কী ভীষণ ভারী ঠেকে বুকের ভেতর! মিষ্টি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আকাশে। ওই বিশাল আকাশ কী শুষে নিতে পারবে তার এই দমবন্ধ যাতনা?
—————
ঘড়িতে মধ্যরাত। প্রশিক্ষণরত ক্যাডেটদের ব্যারাকগুলোতে ভর করেছে আদিম নীরবতা।
বিরহী প্রেয়সীর ছিঁড়ে যাওয়া মুক্তোর মালার সমস্ত মুক্তো বুকে জড়িয়ে একলা সজাগ রয়েছে আকাশ। তাকে সঙ্গ দিচ্ছে শাওন৷ অন্ধকার ঘরে কাঠের পুতুলের মতো স্থির বসে থেকে না জানি কত কী ভাবছে সে। জ্বলজ্বলে চোখদুটো নিবদ্ধ হয়ে আছে পায়ের কাছে। তার শক্ত চোয়াল বলে দিচ্ছে খুব গভীর, বিপদজনক কিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে তার মাথায়। সেই বিপদজনক সিদ্ধান্তের কথা ভাবতেই মায়ের সরল মুখটা ভেসে উঠল চোখের তারায়। মা! মায়ের শাওন ছাড়া তো আর কেউ নেই। এই ভয়ংকর কাজটা করে ফেললে অনেক কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। মায়ের স্বপ্ন প্রচন্ড এক ধাক্কা খাবে। তারপর…তারপর কী হবে? শাওন আর ভাবতে পারে না। তার মস্তিষ্কের একটি অংশ দখল করে আছে মৌনি। এই পৃথিবীর কেউ কখনও জানবে না, মৌনি একটা নেশা। এই নেশা কেউ আসক্ত হলে সেখান থেকে বেরুনো কী মুশকিল! শাওনও বেরুতে পারছে না। চেষ্টা যে করেনি এমনও নয়। চেষ্টা করেছে বহুবার৷ অন্যকারো কাছে গিয়ে মৌনিকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। নিজের সাথে যুদ্ধ করে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে মাসের পর মাস। কিন্তু কিছুতেই কিছু লাভ হয়নি। উদাস মৌনি নিজ থেকে কখনও যোগাযোগের চেষ্টা না করলেও শাওনই সব ভুলে উন্মাদের মতো ফিরে এসেছে বারবার। মৌনির একটি কথা! মৌনির মুখে তার নাম! মৌনি ভালো না বেসেও যে শান্তি তাকে দেয় সেই শান্তি আর কোথাও কেউ দিতে পারেনি কখনও। কেউ মৌনিকে ছাপিয়ে গিয়ে আরও বৃহৎ হয়ে উঠতে পারেনি। এই দোষ কী শাওনের? শাওন দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে থাকে দীর্ঘক্ষণ। নিজের পরিণতির সুস্পষ্ট ছবি চোখের সামনে ভাসতে থাকা সত্ত্বেও মৌনিকে এক নজর দেখার লোভ সে এড়িয়ে যেতে পারছে না। এই অসহায়ত্ব কাকে বুঝাবে শাওন? মৌনির তৃষ্ণা যে কী জ্বালাধরা সে কথা মৌনির প্রেমিক ব্যতিত আর কার পক্ষে জানা সম্ভব? বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে শাওন। মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে ঘুরছে একটাই নাম, মৌনি! মৌনি! মৌনি! তার কেন মনে হচ্ছে, তাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্ব থেকেও এগিয়ে গিয়েছে আরও এক ধাপ? শাওনের বুকের ভেতর ছুটে উত্তেজনার ঢেউ। বুকের তুফানের সাথে পেরে উঠতে পারবে না জেনেও সাবধান করে বিবেক,
‘ এমন ভুল করো না। এমন সুইসাইডাল সিদ্ধান্ত কোনো সুবিবেচক মানুষ নিতে পারে না। ট্রেনিং ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া গুরুতর সামরিক অপরাধ। তোমার জীবন শেষ হয়ে যাবে, শাওন। ভুলে যেও না, তোমার মায়ের দায়িত্ব তোমার কাঁধে। তাকে কী জবাব দিবে একটাবার ভেবেছ?’
শাওন চিন্তিত হয়। আবেগে অন্ধ মন এবার তাকে প্রবোধ দেয়,
‘ মৌনি! মৌনি তোমার পথ চেয়ে বসে আছে। ওকে একবার দেখার জন্য। ওর মুগ্ধ দৃষ্টির জন্য এতটুকু করতে পারবে না তুমি? যদি না-ই পারো। তবে কেমন ভালোবাসলে তুমি শাওন?’
শাওন ভাবুক হয়। বিবেক ক্ষিপ্ত হয়ে বলে,
‘ এতটুকু! এই অন্যায়ের জন্য তার সামরিক জীবনের সমাপ্তি ঘটতে পারে। ভবিষ্যতের চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থেকে হাত ধুতে হতে পারে। কোর্ট মার্শালে কারাদণ্ড হতে পারে, অর্থদণ্ড হতে পারে। ভবিষ্যতে যেকোনো সামরিক বা সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য অযোগ্য ঘোষিত হতে পারে। কতকিছু ঘটতে পারে তার কোনো ধারণা আছে তোমার, বেকুব মন?’
মন নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলল,
‘ ঘটুক।’
বিবেক পরাস্ত হতে নারাজ। বিবেক আর মনের এই অন্ত দ্বন্ধে ক্লান্ত শাওন জড়বস্তুর মতো পড়ে রইল বিছানায়। পায়ের কাছের জানালাটা হাট করে খোলা। শাওন খোলা জানালা দিয়ে নিষ্পলক চেয়ে রইল তারকাখচিত আকাশে। আকাশে আজ তারার মেলা। আচ্ছা, মৌনিও কী দেখছে এই একই আকাশ?
—————
মৌনির আকাশ আজ মেঘে ঢাকা। অন্ধকার আকাশে দলছুট হয়ে উড়ছে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। সম্ভবত আশেপাশে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। বৈশাখের গরমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে থেকে থেকেই উড়ে আসছে ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা। মৌনি ইজেল, ক্যানভাস নিয়ে বসেছে বারান্দায়। চিত্রপটে উঠে এসেছে একটি তারকাখচিত আকাশ। কোনো এক যুবক বড়ো বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে সেই আকাশে। তার চোখে আকুতি। কীসের আকুতি মৌনি জানে না। মেঘলা আকাশের নিচে বসে হঠাৎ তারকাখচিত আকাশের ছবিই বা তার কেন আঁকতে ইচ্ছে হলো, সে-ও মৌনি জানে না। কেবল জানে, এই দৃশ্য আঁকবার তাড়না বড়ো তীব্র। এই যুবকের ব্যথা বড়ো বাস্তব। মৌনি তুলির আঁচড় থামিয়ে নিশ্চুপে তাকিয়ে থাকে ওই ছবিটির দিকে। নিজের আঁকা যুবকটির প্রতিই বড়ো মায়া হয়। প্রশ্ন জাগে, আহা! কীসের এতো দুঃখ তার? কীসের এতো বিষণ্ণতা? মৌনির বিষণ্ণতা ভালো লাগে না। দুঃখ ভালো লাগে না। ছেলেটির মাথায় পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। ফিসফিস করে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘ এভ্রিথিং উইল বি ওকে, বয়। এভ্রিথিং উইল বি ওকে।’ মৌনি তুলির ঢগায় রং মাখিয়ে ছেলেটির বিষণ্ণ মুখে একটু স্বস্তি আনার চেষ্টা করে। মৌনির চেষ্টায় যেন আরও কাতরতা ফুটে উঠে ছেলেটির চেহারায়। সেই চেহারার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর কেমন হু হু করে উঠে মৌনির। ক্যানভাসে তুলি চালাতে চালাতে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠে,
‘ শরীরের মন ভালো নাই
মনের নাই শরীর ভালো
প্রেমে আর নাই রে মধু
মধুতে নাই প্রেম রসালো।
ভালো কী আর আছে ভালো
এই খবর কই পাই?
খবর ভালো নাই রে আমার
খবর ভালো নাই।’
মৌনি গান শেষ করে অবাক বিস্ময়ে দেখে অবচেতনেই ক্যানভাসের এক কোণায় সে একে বসেছে এক নারীর প্রতিবিম্ব। মৌনি ভাবুক চোখে তাকিয়ে থাকে সেই দৃশ্যপটের দিকে। ভেবে পায় না, পুরুষের সব বিষণ্ণতার ঔষধ কী তবে মজুদ আছে নারীর কোমল স্পর্শে? সেই বিষণ্ণ পুরুষ কী পৌঁছাতে পারবে তার প্রিয় নারীর সান্নিধ্যে? হয়তো হ্যাঁ। হয়তো না। মৌনি ইজেল-ক্যানভাস ফেলে এবার গভীর চোখে আকাশের দিকে তাকায়। তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। মনে হয়, কে যেন আকুল হয়ে ডাকছে তাকে। কে ডাকে? কার এতো মন খারাপ? মৌনির মন খারাপ ভালো লাগে না। বিষণ্ণতা ভালো লাগে না। তারপরও অদৃশ্য কারো মন খারাপে ধীরে ধীরে বিষণ্ণ হয়ে আসে তার হৃদয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে, ' ভালো হয়ে যাক। তোমার সমস্ত মন খারাপ ভালো হয়ে যাক, প্রিয়।'
একই আকাশের নিচে বসে থাকা চারটি বিক্ষিপ্ত হৃদয়। কী অদ্ভুত কাকতালীয়তায়, একই সাথে তাকিয়ে আছে আকাশে। দ্বিধা, প্রশ্ন, হতাশা পেরিয়ে তারা সকলেই প্রার্থনা করছে স্বস্তি। প্রিয় আকাশ, তুমি কার হৃদয়ে স্বস্তি হয়ে নামবে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………