নবোঢ়া - পর্ব ১২ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

নবোঢ়া - ইলমা বেহরোজ
          পালঙ্কের ওপর জুলফা মুখ ফিরিয়ে বসে আছে, তার সারা শরীর পাথরের মতো শক্ত। চোখে-মুখ রাগে গমগম করছে। শব্দর ধীরে ধীরে জুলফার দিকে এগিয়ে আসে। 

অপরাধীর মতো বলে, "জুলফা, তুমি আমার স্ত্রী, আমার সর্বস্ব। আমি আর কখনোই তোমার সম্মান ক্ষুণ্ণ করব না।"

জুলফা নির্জীব মূর্তি হয়ে বসে আছে। শব্দর সাহস করে তার হাত ধরে অনুনয়ের সুরে বলে, "আমাকে ক্ষমা করো। আর কখনো আমি এমন ভুল করব না।"

জুলফার মুখে রাগের ছায়া এখনও অটুট। সেই তিক্ত ভাবটা নিয়েই উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ায়। বসন্তের মৃদু বাতাস তার এলোমেলো চুলে খেলা করছে। শব্দর পেছন থেকে এগিয়ে এসে জুলফাকে কোলে তুলে নিতেই জুলফা থতমত খেয়ে যায়।

শব্দর বলে, "দয়া করুন বেগম সাহেবা, রাগ ত্যাগ করুন। আর কখনো আপনাকে কষ্ট দেব না।"

এতেও কোনো লাভ হয় না। জুলফা হাত-পা ছুঁড়ে কোল থেকে নেমে শব্দরকে ঠেলে দিয়ে আবার পালঙ্কে গিয়ে বসে। 

শব্দর কিছুক্ষণ তার দিকে একাগ্র দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তারপর পুনরায় কাছে যাওয়ার উপক্রম করতেই...জুলফা মুখ খুলে, "ক্ষমা করলাম। আর এমন ভুল করবেন না।"

শব্দর জুলফার হাত চেপে ধরে অনুশোচনার স্বরে বলে, " আর কখনো তোমার সম্মানে আঘাত করব না। তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী। আমি কি ইচ্ছে করে তোমাকে দুঃখ দিতে পারি? এমন ভুল আর কখনো হবে না।"

জুলফা বালিশ ঠিক করতে করতে ঘুমকাতুরের মতো শুয়ে আস্তে আস্তে বলে, "খুব ঘুম পাচ্ছে। শুয়ে পড়ুন।"

শব্দর ধীর স্বরে বলে, "এখনই ঘুমিয়ে পড়বে? জুলফা, এই জুলফা?" 

জুলফা সাড়া দেয় না। শব্দর উদ্বিগ্ন হয়ে ঘরময় পায়চারি করে। মনে নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করে, জুলফা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত ছিল! 

শব্দরও শুয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ জীবনে সে কখনও প্রকৃত প্রেমের স্বাদ পায়নি। এক তরফা ভালবাসার অনুভূতিও তার অজানা ছিল। তারপর একদিন এই ছোট মেয়েটিকে দেখার পর থেকে তার প্রাণে একটা সুন্দর অনুভূতি জেগে উঠে। সেই অনুভূতি এখন তার অন্তরের গভীরে শিকড় গেড়েছে। সে জানে, জুলফা এখনো তার ভালবাসাকে পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তাদের মধ্যে বয়সের ব্যবধান একটা বড় বাধা। এতে সে জুলফার কোনো দোষ দেখে না। তাকেই এই ছোট মনটিকে বিশ্বাস ও সম্মান দিয়ে ধীরে ধীরে জয় করে নিতে হবে। এই চিন্তা নিয়েই শব্দর জুলফাকে তার আলিঙ্গনে আরও শক্ত করে জড়িয়ে রাখে। ধীরে ধীরে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, পাড়ি জমায় ঘুমের দেশে। 

শব্দরের নিঃশ্বাসের ছন্দ যখন ধীর হয়ে আসে, জুলফা চোখ খোলে। তার মনের গহনে তখন শুধুই নাভেদের চিন্তা। যার জন্য হৃদয়ের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে। সে তখন ইচ্ছে করেই শব্দরের সঙ্গে কথা বাড়ায়নি। কথা বাড়ালে শব্দর আরও ঘনিষ্ঠ হতে চাইত। আর সেটা এখন জুলফার কাছে সবচেয়ে অসহনীয়বোধ হবে। শরীরে শরীরে ভালোবাসা কি কখনও মনের টান ছাড়া পূর্ণতা পায়? যার প্রতি হৃদয়ের কোনো আকর্ষণ নেই, তার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন কাটানো যে কত নিষ্ঠুর হতে পারে, তা শুধু তারাই বোঝে যারা এই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে। 

কিন্তু কতদিন? কতদিন এভাবে চলবে? একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক চিরে। সে তো এই স্বামী, এই সংসারে মানিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। নাভেদকে দেখার পর থেকে সেই মানিয়ে নেওয়ার দরজাটা কে যেন বন্ধ করে দিয়েছে!

জুলফা উৎকর্ণ হয়ে কিছু শুনতে চেষ্টা করে। আজ কেন বেহালার সুর শোনা যাচ্ছে না?সে অপলক নয়নে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। 

এই জীবনটা কি এমনই চলতে থাকবে? একদিকে স্বামী, অন্যদিকে নাভেদের প্রতি ভালোবাসা: দোটানায় সে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে মনে হচ্ছে একটা সুতোয় বাঁধা পতঙ্গ, যে উড়তে চায় অথচ পারে না। তার চোখ দিয়ে অজান্তে দু'ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। 

হঠাৎ মনে একটা উদ্ভট চিন্তা খেলে যায়। আচ্ছা, এমন কী হতে পারে না যে নাভেদও তাকে সমান তীব্রতায় ভালোবেসে ফেলবে? তারপর দুজনে মিলে দূর কোনো অজানা জায়গায় পালিয়ে যাবে? যেখানে কেউ তাদের চিনবে না, যেখানে তারা শুধু তাদের ভালোবাসার জগতে বিচরণ করতে পারবে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই সারা শরীরে একটা উষ্ণ অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে।

জুলফা চোখ বন্ধ করে কল্পনার জগতে ডুবে যায়। তার অন্তরের গভীর থেকে একটা কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয় , "নাভেদ পাটোয়ারী যদি একবার হাত বাড়িয়ে ডাকে, তবে ওই মুহূর্তেই উড়ে যাব তার কাছে। এই পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাকে আটকাতে পারবে না। না সমাজের বাঁধন, না পরিবারের দায়িত্ব, না এই বিয়ের বন্ধন, কিছুই না। তার একটি ইশারায় আমি সব কিছু ভুলে যাব, সব বন্ধন ছিন্ন করব। আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত শুধু তারই হয়ে যাবে। এই জগতের কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। কেউ না।"

—————

ভোরের আলো ফুটতেই রাইহা ঘুম থেকে উঠে বিশাল সুটকেসটা থেকে বের করে একটা হালকা নীল রঙের মিনি স্কার্ট আর সাদা ব্লাউজ। পোশাকটি পরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। স্কার্টটি হাঁটুর অনেক উপরে এসে থেমেছে আর ব্লাউজটি কোমরের কাছে এসে শেষ হয়েছে। চুলগুলো বাঁধে উঁচু করে। সে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামে, তখন বাড়ির পরিচারক মনির মিঞা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে, "মা গো! এ কী দেখলাম!" 

বাগানে পা রাখতেই ঘাস কাটা থেকে সিদ্দিক মুখ তুলে তাকায়। রাইহাকে ছোট পোশাকে দেখে তার হাত থেকে কাঁচি পড়ে যায়। বিড়বিড় করে "আস্তাগফিরুল্লাহ্‌! আস্তাগফিরুল্লাহ!" বলে গামছা দিয়ে চোখমুখ ঢেকে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করে। 

রান্নাঘরের দিক থেকে আসা গৌতমের মা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, "ভগবান! ভগবান!" জপতে জপতে পালিয়ে বাঁচে। যেন ভয়ংকর কিছু দেখেছে।

রাইহা এসব প্রতিক্রিয়ার দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। সে জানত, তার এই পোশাক এখানকার মানুষদের কাছে অপরিচিত। সে শহুরে মেয়ে, অনেকটা সময় ইংল্যান্ডে কাটিয়েছে। সে প্রগতিশীল, শিক্ষিত, স্বাধীনচেতা।  

হঠাৎ চোখে পড়ে নাভেদকে। সবুজ ঘাসের গালিচায় নাভেদ যোগাসনে মগ্ন। তার ঘামে ভেজা শরীরে রোদের আলো পড়ে ঝিলিক দিচ্ছে। পা দুটো সামনে সোজা করে বসে আছে, হাত দুটো মাথার ওপরে তুলে আকাশকে ছুঁতে চাইছে। চোখ বন্ধ, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি।
রাইহা অবাক হয়ে লক্ষ্য করে নাভেদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ। চওড়া কাঁধ, সুগঠিত বুক, আর হাতের মাংসপেশিগুলো দেখে মনে হচ্ছে কোনো ভাস্করের হাতে গড়া। পেছনে বাঁধা বাবরি চুলগুলো এতটাই গোছানো যে কোনো হাওয়াতেই নড়ছে না। এই দেশে, গ্রামের পরিবেশে এমন একজন স্বাস্থ্য সচেতন, আকর্ষণীয় পুরুষের সন্ধান পাবে তা সে কল্পনাও করেনি। 

নাভেদ যখন চোখ খুলে তাদের চারচোখের মিলন ঘটে। নাভেদের চোখে বিস্ময়ের ঝিলিক। শুনেছিল, জাওয়াদ নাকি বিলেত থেকে এক সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে এসেছে। এই মেয়েটিই নিশ্চয় সেই বিলেতি হবু বউ।

রাইহা ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে। তার চোখে কৌতূহল। নাভেদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করে, "আমি কি জানতে পারি, আপনি জাওয়াদের কে হোন?"

নাভেদের চোখ যেন কপালে উঠে যায়। এ কী! মেয়েটা এমন সাবলীল বাংলায় কথা বলছে! কথার ধরনে মনে হচ্ছে সে জন্মের পর থেকেই বাংলা বলে। নাভেদ নিজের বিস্ময় চেপে রেখে উত্তর দেয়, "আমি এই বাড়ির একজন অতিথি। জমিদারদের সাথে আমার ব্যবসায়িক সম্পর্ক।"

"ওহ, তাই নাকি! কী মজার ব্যাপার! আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো এখানকার কেউ। আপনার যোগব্যায়াম দেখে মনে হচ্ছে আপনি বেশ নিয়মিত।"

"হ্যাঁ, আপনি কি..."

"আমি রাইহা। জাওয়াদের, বন্ধু। লন্ডন থেকে এসেছি।"

নাভেদ মাথা নাড়ে, "তাই বলুন। লন্ডনি! আমি নাভেদ। আপনার বাংলা শুনে অবাক হয়েছি। এত সুন্দর বাংলা উচ্চারণ!"

"থ্যাংক ইউ৷ আসলে আমার বাবা-মা দুজনেই বাঙালি। লন্ডনে থাকলেও বাড়িতে আমরা সবসময় বাংলাতেই কথা বলি। তবে আমার দাদি ছিল ফরেনার।"

"আপনার মতো প্রবাসী বাঙালিদের দেখলে খুব ভালো লাগে। যারা নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ভুলে না।"

রাইহা মুচকি হেসে বলে, 'আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি বেশ আধুনিক চিন্তার মানুষ।"

নাভেদ একটু লজ্জা পেয়ে বলে, "এমন কিছু নয়। বরং আমি বেশ পুরোনো ধাঁচের মানুষ। তবে হ্যাঁ, স্বাস্থ্য নিয়ে একটু সচেতন।"

জুলফা বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে, চোখের কোণ দিয়ে বাগানের দৃশ্য দেখছে। নাভেদের সাথে রাইহার হাসি-গল্প দেখে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠছে। শঙ্খিনীকে কাছে ডেকে গলায় তীব্র জ্বালা নিয়ে বলে,
"দেখছিস শঙ্খিনী? ঐ মেয়েছেলেটার কাণ্ড! নাভেদ পাটোয়ারীর সাথে কী হাসাহাসি করছে।"

"বেগম সাহেবা, ওরা শুধু কথা বলছে।"

"কথা! তুই বুঝবি না। কিছুদিন পর জমিদার বাড়ির বউ হবে! এখন থেকেই এত বেহায়াপনা! লজ্জা-শরম বলে কিছু নেই! পর পুরুষের সাথে এভাবে কথা বলে কোনো ভদ্রঘরের মেয়ে? দেখ না, কী ছোট জামা পরেছে।" 

—————

সকালের সোনালি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে বাগানের ফুলগুলোর ওপর। রঙিন প্রজাপতিরা উড়ে বেড়াচ্ছে ফুল থেকে ফুলে। রাইহা তন্ময় হয়ে ফুল তুলছে।

হঠাৎ ভেসে আসা ঢং ঢং শব্দে চমকে উঠে সে। বারান্দায় টাঙানো পুরনো দেয়াল ঘড়িটা নয়টা বাজার ঘোষণা করছে। তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে পা বাড়ায় সে।

খাসমহলের দরজা খুলতেই বজ্রাঘাত হয়। সামনেই দাঁড়িয়ে সুফিয়ান ভূঁইয়া। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দেহটাকে লাঠির সাহায্যে সোজা রেখেছেন। তবে চোখে এখনো বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। রাইহার বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। সুফিয়ান ভুঁইয়ার চোখ পড়ে রাইহার পোশাকের ওপর। মিনি স্কার্ট দেখে যেন আগুন জ্বলে উঠে চোখে। মুহূর্তের মধ্যে কপালের শিরাগুলো ফুলে ওঠে। গর্জন করে উঠেন তিনি, "এ কী! এ কী বেহায়াপনা! কোন সাহসে তুমি এমন পোশাক পরে আমার বাড়িতে ঢুকছো?"

রাইহা ভয়ে পাথর হয়ে যায়, মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না। মনে হচ্ছে একটা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মধ্যে আটকে পড়েছে সে।

সুফিয়ান ভুঁইয়া প্রায় চিৎকার করে উঠেন, "জাওয়াদ! জাওয়াদ!"

জাওয়াদ তখনও ঘুমের ঘোরে ছিল। বাবার চিৎকারে ধড়মড় করে উঠে বসে। বিরক্তির ছায়া নেমে আসে মুখে। 

ধীরে সুস্থে সিঁড়ি নেমে আসে নিচে।

রাইহাকে এক পলক দেখে, বাবার দিকে ফিরে বলে, "কী হয়েছে ? এত চেঁচামেচি করছেন কেন?"

"চেঁচামেচি? তুমি জিজ্ঞেস করছো কেন চেঁচামেচি করছি? এই মেয়ে..." রাইহার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেন, "এই মেয়ে এভাবে অর্ধনগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর তুমি জিজ্ঞেস করছো কেন চেঁচামেচি করছি? বংশমর্যাদা কি ধুলোয় মিশিয়ে দিবে?"

জাওয়াদ বিস্ময় নিয়ে তাকায় রাইহার দিকে। তার চোখে বিব্রত ভাব। কিছু বলতে যাচ্ছিল, সুফিয়ান ভুঁইয়া তখন আবার গর্জে উঠেন, "ললিতা! ললিতা! কোথায় তুমি? এদিকে এসো, দেখো তোমার ছেলের কীর্তিকলাপ!"

ললিতা ছুটে এসে বলেন, "কী হলো? আবার কী হলো?'

সুফিয়ান ভুঁইয়া রাইহার দিকে ইশারা করে বলেন, "দেখো! দেখো তোমার ছেলের কাণ্ড! এই মেয়েটাকে এনেছে বাড়িতে। কী পোশাক দেখেছো? আমাদের বাড়িতে এসব চলবে না।"

ললিতা হতভম্ব হয়ে তাকান রাইহার দিকে। ইতিমধ্যে বাড়ির দাস-দাসীরা ছুটে এসেছে। তারা দূরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে। "ওমা! কী বেহায়া মেয়ে!" 

"কী সর্বনাশ! ছোট জমিদারের বউ কী পরেছে!"

রাইহার নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না কী করবে। পালিয়ে যাবে? না দাঁড়িয়ে থাকবে? মাটি ফেটে তার ভেতরে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে৷ 

সুফিয়ান ভুঁইয়া আবার গর্জে উঠেন, "এই মেয়ে এখনই এই পোশাক পরিবর্তন করবে। ভদ্র মেয়ের মতো পোশাক পরবে। নয়তো..." তিনি একটু থামেন, তারপর আরও কঠোর স্বরে বলেন, "নয়তো এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। আমার বাড়িতে এসব অশ্লীলতা বরদাস্ত করা হবে না।"

জাওয়াদ রাইহার কাছে গিয়ে বলে, "যাও, ঘরে গিয়ে আরেকটু বড় পোশাক পরে নাও।"

রাইহা মাথা নত করে চলে যেতে লাগে। সুফিয়ান ভুঁইয়ার পাশ কাটানোর সময় তার বুক ধড়ফড় করছিল। সে ভাবতেই পারেনি যে জাওয়াদের বাবা পোশাকের জন্য এতটা রেগে যাবেন। মানুষ বোধহয় খুনির সঙ্গেও এমন আচরণ করে না।

জাওয়াদ ঘুরে চলে যাচ্ছিল, মনে মনে ভাবছিল কীভাবে এই জটিল পরিস্থিতি থেকে পালানো যায়। হঠাৎ বাজ পড়ে, "দাঁড়াও!" 

সুফিয়ান ভুঁইয়ার গর্জনে থমকে দাঁড়ায় জাওয়াদ। দাস-দাসীরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলেকে এখন কটু কথা শুনতে হবে সেই শঙ্কায় ললিতার মুখ শুকিয়ে আসে। 

জাওয়াদ ঘুরে দাঁড়ায়। তার মুখে একটা অলস, বিরক্ত ভাব। সে বলতে চাইছে - "আবার কী?"

সুফিয়ান ছেলের দিকে তাকান। বলেন, "বিয়ে করার জন্য আর কোনো মেয়ে পেলে না তুমি? একটা রক্ষণশীল, সংস্কৃতিপূর্ণ, বাঙালি মেয়ে চোখে পড়ল না তোমার? আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের মূল্যবোধ সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে তুমি বেছে নিলে...এর থেকে তুমি বাড়ির কোনো কাজের..."
হঠাৎ তিনি থেমে গেলেন। তার চোখ চারপাশে ঘুরে বেড়াতে থাকে, হঠাৎ, একটি মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি আটকে যায় কোণের দিকে। সুফিয়ান আবার কথা শুরু করেন, "এরথেকে গুলনূরকে বিয়ে করতে চাইলেও একটু স্বস্তিতে শ্বাস নিতে পারতাম। অন্তত সে তো আমাদের সংস্কৃতি বোঝে, আমাদের মতোই বাঙালি।"

কথা শেষ হতেই একটা তীব্র শব্দ ভেসে আসে। কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ার আওয়াজ। চমকে উঠে সবাই দ্রুত ঘাড় ফেরায়। একটি তরুণী মাথায় রঙিন ওড়নার আড়াল টেনে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে-মুখে বিব্রত ভাব, সে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চাইছে। মেয়েটির পায়ের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাটির বাসনের টুকরো, যেগুলো এই মাত্র তার হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এমন সময় ললিতা কথা বলে উঠেন বিদ্যুৎ চমকানোর মতো, "ওর নাম গুলনূর না, রেণু।" 

সুফিয়ান তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করেন, "না, ওর নাম গুলনূর।" 
ললিতা ছাড়বার পাত্রী নয়। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, "ওর নাম রেণু। রেণু বলবেন।" 

সুফিয়ান এবার রেগে টং হয়ে গেলেন। তিনি হাতের লাঠি দিয়ে মেঝেতে জোরে আঘাত করে বলেন, "তুমি কারো নাম কেড়ে নিতে পারো না। ও গুলনূর, ও'কে গুলনূর বলবে।" 

এই বিতর্কের মাঝে, রেণু - যার আসল নাম গুলনূর - নীরবে দাঁড়িয়েছিল। তার পায়ে ভাঙা বাসনের ধারালো কোণ লেগে রক্তের ধারা নেমে আসছে পায়ের পাতা থেকে। 

জাওয়াদ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় মেয়েটির দিকে। বলে, "তুমি ঠিক আছো ?" 

গুলনূর দ্রুত হাতে ভাঙা বাসনের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নেয়। তারপর সেগুলো ওড়নায় জড়িয়ে নিয়ে, একটা মূল্যবান সম্পদ বহন করছে এমনভাবে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে কেটে পড়ে। পেছনে রেখে যায় তার ভবিতব্য।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp