আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৩২ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          চুলায় চায়ের পানি ফুটছে। জানালার ধারে জুঁই ফুলের ঝাড়। কাল রাতের বৃষ্টিতে জুঁইয়ের ভেজা পাপড়ি এসে পড়েছে জানালার পাটাতনে। খোলা জানালা দিয়ে ফুরফুরে বাতাসের সাথে আসছে জুঁই ফুলের তীব্র সুবাস৷ মিথি রান্নাঘরের কেবিনেটে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। জুঁই ফুলের সরু ডালে সকালবেলার কোলাহল নিয়ে বসেছে দুষ্টু চড়ুইয়ের দল। ঢাকা শহরের বুকে এখনও চড়ুই পাখির গান হয়, জানা ছিল না মিথির। আপাতত খালামণির মিরপুরের বাড়িতে সে কখনও চড়ুই পাখি দেখেনি। চড়ুই পাখির ঝাঁক দেখা যায় দাদাজানের ময়মনসিংহের বাড়িতে। শোবার ঘরের ভেন্টিলেটরে খড়কুটো দিয়ে বাসা বাঁধে। ভোরে ঘুম ভাঙলে মাঝে মাঝেই দেখা যায়, ঘরের ভেতর থেকে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাচ্ছে ছোট্ট এই পাখি। সাব্বিরের এই আটপৌরে ভাড়া বাড়িটা বড় আশ্চর্য। দেওয়ালে দেওয়ালে বাড়ি বাড়ি সুবাস মাখা। বেশিক্ষণ থাকলেই ইচ্ছে হয়, কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে নিজের মতো সাজিয়ে ফেলি। বানিয়ে ফেলি নিজের ঘর। কিন্তু কোথাও আবার ভীষণ বাধা। এতো বাধা পেরিয়ে এই বাসায় তাদের একটা ঘর হওয়া কখনওই সম্ভবপর নয়। তারপরও মিথি মাঝে মাঝেই রান্নাঘরে আসে৷ কোমরে আঁচল গুঁজে চায়ের পানি ফুটায়। বাসী মুখে এক কাপ চা খেয়ে ছুটে যায় নিজের কাজে। বাড়ির মালিক হয়তো-বা তখন বেরিয়েছে প্রাতঃকালীন ভ্রমণে৷ প্রি-প্রডাকশনের কাজ গুছিয়ে, কাস্টিং ডিরেক্টর, সেট ডিজাইনার, লোকেশন ম্যানেজার সকলের সাথে দীর্ঘ বৈঠক, ছুটাছুটি শেষে মিথি যখন রাত করে বাড়ি ফিরে তখন হয়তো-বা গৃহস্বামী নিজের ঘরে শুয়ে বই পড়তে পড়তে মাত্রই নিদ্রায় গিয়েছেন। মিথির যদিও-বা ছুটি নেই। তারপরও ছুটির দিনগুলোতে সাব্বির চলে যায় শহরের বাইরে বিভিন্ন এতিমখানার বাচ্চাদের ফ্রি চিকিৎসা দিতে। একই বাড়িতে থেকেও দু'জন মানুষের মধ্যে সাক্ষাৎ হয় না সপ্তাহের পর সপ্তাহ। এই দেখা না হওয়া কী কেবলই ব্যস্ততা? না। এই ব্যস্ততা কেবলই দুজন দুজনকে এড়িয়ে যাওয়ার বাহানা৷ সেদিন রাতে একসঙ্গে রাস্তা হেঁটে ফেরার পর আজ দুই সপ্তাহ হতে চলল, সাব্বিরের সাথে মিথির কোনো দেখা সাক্ষাৎ হয়নি৷ একই বাড়িতে, পাশাপাশি ঘরে তাদের বাস অথচ দেখা হয়নি! আশ্চর্য ব্যাপার না? আশ্চর্য বটে! বুয়াও আশ্চর্য হয়। রান্নাঘরের মেঝেতে বটি পেতে তরকারি কুটতে কুটতে সে অবাক হয়ে শুধায়,

‘ আপনে আর স্যার দুইজনে দুই ঘরে থাকেন আপা?’ 

কমলার মায়ের কৌতূহলী প্রশ্নে জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকায় মিথি। এই বাড়িতে আসার পর আজই প্রথম কমলার মায়ের সঙ্গে দেখা। সে মিথির ফেরার কথা জেনেছে বোধ করি উপর তলার উকিলের বউয়ের কাছে। মিথির আসার কথা শুনে থাকলেও মিথিকে চোখের সামনে দেখে আকাশের চাঁদ পেয়ে যাওয়ার মতো খুশি সে। তার উপস্থিতিতে কেউ এতো উচ্ছ্বসিত হতে পারে কল্পনা করেনি বলেই হয়তো কমলার মায়ের অতি আবেগ দেখে প্রথমদিকে কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল মিথি। মিথি প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করল,

‘ কেন এমন মনে হলো?’ 

কমলার মা সবজি কাটতে কাটতে আকর্ণ হেসে সরল গলায় বলল,

‘ মনে হওয়ার কোনো কারন নাই। এভাই জিগাইলাম। আমি কামে আইস্যা রান্ধন বসাইয়া সবার আগে ঘর হুড়ি। স্যার ফিইরা আওনের পরের দিন ঘর হুড়তে গিয়া দেখি পাশের দুয়ার বন্ধ। ছিটকানি খুলতে গেছি তখনই স্যার তার ঘরতে বারাইয়া কইল, এই ঘর খোলা যাবে না। এই ঘরে আপনার ম্যাডামের কাজের জিনিসপত্র আছে। তার অনুমতি ছাড়া ঘরে ঢোকা উচিত হবে না। স্যারের ঘরেও আপনার কোনো জিনিস দেখলাম না। হের লাইগ্যা জিগাই।’ 

মিথি ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে ফুটন্ত পানিতে চা পাতি দিতে ব্যস্ত হয়ে গেল৷ একটু সময় নিয়ে বলল, 

‘ আমার কাজের তো কোনো টাইমটেবিল নেই বুয়া। খুব ভোরে যেতে হয় আবার রাতে ফিরি। আপনার স্যার পাঞ্চুয়াল মানুষ। সময়ের কাজ সময়ে করেন। রাতে-ভোরে তার ঘুমের ব্যাঘাত না হয় এজন্য আমার জিনিসপত্র সব পাশের ঘরে রেখেছি। এতে দু'জনেরই সুবিধা।’ 

বুয়া মিথির এতো ঘুরানো উত্তর বুঝল না। মিথি-সাব্বির আলাদা ঘুমায় না তা মেনে নিয়েই বুকের উপর থেকে পাথর নেমে গেল। গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,

‘ ভালা। একসঙ্গে থাকাই ভালা। বিয়ার পর জামাই-বউ আলাদা থাকুন উচিতও না। যদিও আমাগো স্যার মাটির মানুষ। জীবনে চোখ তুলে তাকাইয়া কতা কইতে দেখি নাই। তারপরও পুরুষ মানুষ তো? হারা দিন চোখের সামনে কেউ গতর দিয়া থাকলে অঘটন না ঘইট্যা যাব কই?’ 

মিথি বুয়ার কণ্ঠে রহস্য টের পেয়ে ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল। নিজের জন্য এক কাপ রেখে বুয়াকে এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মিথির এই সৌজন্যতায় মুগ্ধ বুয়া গৃহকর্ত্রীকে খুশি করতে বিশ্বস্ত দাসীটির মতো ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে বলল,

‘ উপর তলার বৃষ্টি আপার কতা কই আপা। আপনাগো বিয়ার আগে থাইকা স্যারের উপরে এই ছুঁড়ির খারাপ নজর। আপনে যাওনের পর স্যারের যখন অসুখ হইল? এই ছুঁড়ি স্যারের ঘরে ঢুইক্যা… ও মায়ে মায়ে গো…সেই দিশ্য তো আমি এহনও ভুলতে পারি না আপা।’ 

মিথির সহজ মুখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে এলো। থমথমে কণ্ঠে শুধাল,

‘ কী করেছে?’ 

মিথির প্রতিক্রিয়া বুয়ার খুবই পছন্দ হলো। তরকারি কুটায় সাময়িক ইস্তেফা দিয়ে আগ্রহ নিয়ে বলল,

‘ আর বইলেন না আপা। হেইদিন আমি একটু দেরি কইরা কামে আইছি। আইয়া দেখি সারাঘরে কোনো টু শব্দ নাই। খালি স্যারের ঘরে ফিসফাস কতা কওনের আওয়াজ। আমি ভাবলাম, আপনে বোধহয় আইসেন। কিন্তু ঘরে ঢুইক্যা দেহি..’ 

বুয়া কণ্ঠে একটা ভৌতিক আবহ এনে বলল,

‘ ঘরে ঢুইক্যা দেহি এই ছুঁড়ি স্যারের বিছনাত গিয়া উঠছে। খালি বিছানা কী গো আপা! স্যারের উপরে উইঠ্যা বইসা রইছে এই ডাইনী। আল্লাহ মাফ করো। আমি তো তাজ্জব বইন্যা গেছি আপা।’ 

মিথির চোখ-মুখ ভাবনাতীত গম্ভীর হয়ে গেল। সুন্দর মুখে জেমেছে আষাঢ়ে মেঘ। 

‘ আপনার স্যার কী করছিলেন?’ 

বুয়া কণ্ঠে দুঃখ ফুটিয়ে বলল,

‘ স্যার কী আর তহন চেতনে আছিল আপা? চেতনে থাকলে কী আর অপ্সরার মতোন বউ রাইখ্যা এই ছুঁড়িরে নিজের ছাতির উপর উইঠ্যা বইতে দেয়? স্যার তো অসুখের মধ্যে আপনেরে খুঁজতেছিল। আপনে ভাইবাই ওই ডাইনিরে কাছে টানতাছিল। সময় মতো আমি গেলাম বইল্যাই না স্যারের ভুল ভাঙল?’ 

মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল মিথির মুখ। মাথার ভেতর বোলতা উড়ার মতো ভো ভো আওয়াজ হচ্ছে। কান দিয়ে বেরুচ্ছে গরম ধোঁয়া। সর্বনাশা পদ্মার মতো ভাঙছে হৃদয়। বুয়াকে বলতে ইচ্ছে হলো, 

‘ আপনি ভুল জানেন বুয়া। ভুল জানেন। আপনার স্যার বৃষ্টিকেই কাছে টেনেছিল। আমাকে ভাবলে ছিটকে সরিয়ে দিতো দূরে। এমনই করে সে প্রতিবার।’  

নগ্ন সত্যের বিতৃষ্ণায় তেঁতো হয়ে গেলো মিথির মুখ। বিয়ের প্রথম দিন থেকে সাব্বিরের ব্যবহার নিয়ে নানান রকম চিন্তা মিথি করেছে। বৃষ্টিকে নিয়ে ঈর্ষাও করেছে। কিন্তু এতোটা! এতোটা নীচে সাব্বির নামতে পারে কখনও কল্পনাতেও কল্পনা করেনি মিথি। সাব্বিরের সকল অপমান একপাশে রেখেও সাব্বিরকে মিথি ভেবে এসেছে বড় সরল, বড় স্বচ্ছ, বড় পবিত্র। এই পবিত্র মানুষটির এহেন সত্যে বুকের ভেতরটা অরুচিতে ভরে গেল মিথির। বৃষ্টির সাথে তার যদি একটা সম্পর্ক থেকে থাকেই, মিথি যদি তাদের মধ্যে ভুল করে চলে এসেও থাকে তারপরও সাব্বির কী তাদের বিচ্ছেদ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারত না? মিথি একসময় ভাবতে চেষ্টা করেছিল, হয়তো সাব্বিরের মধ্যে নারীদের নিয়ে কোনো ভীতি আছে। হয়তো সে মিথিকে অনুভব করে কিন্তু কাছে আসায় বড় ধরনের কোনো গন্ডগোল আছে। সাব্বিরের দৃষ্টি তাকে এ কথায় ভাবিয়েছে বারবার। কিন্তু আজ সত্যের উন্মোচনে দেখা গেল, সাব্বিরের নারী প্রীতি যথেষ্ট। সমস্যা শুধু মিথিতে। ওই চোখের ভাষা মিথ্যা। নয়তো, বৃষ্টিকে সে নিজের ঘরে, নিজের বিছানায় এনে তুলতে পারত না। মিথি বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চাপ টের পায়। চায়ের কাপ ধোয়ার মিথ্যা ব্যস্ততা দেখিয়ে নিজেকে সামলায়। আজ তার কাজে যাওয়ার তাড়া ছিল না। বুয়ার রান্না খেতে সাব্বিরের কষ্ট হয়। ভেবেছিল, সকালের খাবারটা আপাতত সে যত্ন নিয়ে রাঁধবে। অথচ কোথা থেকে কী হয়ে গেল! মিথি নীরবে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিজের ঘরের যাওয়ার পথেই দেখা হয়ে গেল সাব্বিরের সাথে। সাব্বির নিজের ঘর থেকে বেরুচ্ছিল। মিথিকে এই সময় বাসায় দেখে সে খুবই আশ্চর্য হয়ে তাকাল। আন্তরিক কণ্ঠে বলল,

‘ কেমন আছেন, মিথি? আজ আপনার ছুটি বুঝি?’ 

সাব্বিরের আন্তরিক কণ্ঠও মিথির কাছে গরলের মতো ঠেকল৷ সাব্বিরের চশমায় ঢাকা চোখ, যে চোখের দিকে তাকালেই মিথির তাকে সরল শিশু বলে বোধ হয়, সেই চোখের দিকে তাকিয়ে মিথির বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো চোখের ভাষাও মিথ্যা হয়! না চাইতেও ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মৃদু তাচ্ছিল্যের হাসি। সহজ কণ্ঠে বলল,

‘ এইতো ভালো। আপনি কেমন আছেন সাব্বির সাহেব?’ 

সাব্বির উত্তর দিতে পারল না। মিথির চোখের দৃষ্টিতে প্রচ্ছন্ন ঘৃণা আর ঠোঁটের কোণের তাচ্ছিল্যে নিজের মনেই গুটিয়ে গেল। যারা সর্বক্ষণ নিজের চতুর্দিকে দেওয়াল তুলে ঘুরে বেড়ায়। তারা অল্প হাওয়ার দেখা পেলেও হয়ে পড়ে তটস্থ। এই বুঝি ঝড় এলো। এই বুঝি ভেঙে গেল দেওয়াল। প্রকাশ হয়ে গেল সত্য। মিথির ওই তাচ্ছিল্য সাব্বিরের বুকের ভেতরও আশ্চর্য এক ভয় ধরিয়ে দিল। তবে কী সব সত্য জেনে গেল মিথি? কী করে জানল? ভেতর ভেতর লজ্জায় মিইয়ে গেল সাব্বির। মিথির চোখে চোখ রাখতে না পেরে সরিয়ে নিল দৃষ্টি। সাব্বিরের এই স্নায়বিক দুর্বলতা চোখ এড়াল না মিথির। মনে মনে নিজের উপরই হাসল সে। সাব্বিরকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরে দোর দিল। কাজের জন্য রেডি হতে গিয়ে এই কয়েক সপ্তাহে আজই প্রথম শাড়ি ছেড়ে কুর্তি আর জিন্স পরল মিথি। এই পরিত্যাগে কতখানি অভিমান মিশে ছিল, পৃথিবী কী তা জানল? 

 ভগ্ন হৃদয় আর হতাশ মুখ নিয়ে মিথি যখন এফডিসিতে পৌঁছাল তখন দুপুর। একটা স্টুডিও সাউন্ড স্টেজে আজ তাদের শুটিং শুরু হবে। ছোট্ট একটা কাজ অথচ মিথির মাথার উপর আকাশসম বোঝা। এর আগে এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হয়ে কাজ করা হয়েছে কয়েকবার। এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর থেকে ডিরেক্টরের পদে বহাল হতেই মাথার উপর কত দায়িত্ব আর দুশ্চিন্তার পাহাড় এসে স্থির হয় তা এখন বুঝতে পারে মিথি৷ শুটিং ক্রু সামলিয়ে, শুটিং পরিকল্পনা, শট পরিচলনা, আর্টিস্টদের নানান ঝামেলা মেটাতে মেটাতে মাথা ফেঁটে যাওয়ার জোগাড়। এর মধ্যে শুটিং শুরু হওয়ার ঘন্টাখানেক পর মিথিকে অবাক করে দিয়ে স্টুডিওতে এসে উপস্থিত হলো সাফাত। হাল আমলের জনপ্রিয় মুখ সাফাতের আকস্মিক এই আগমনে হৈচৈ পড়ে গেল সেটের অভ্যন্তরে। সকলের মধ্যে দারুণ উন্মাদনা। কৌতুক, প্রশ্ন, ফিসফাস। সাফাত সকলের উত্তেজনা পাশ কাটিয়ে মিথির পাশে গিয়ে দাঁড়াল৷ হেসে বলল,

‘ উপরের ফ্লোরে আমার শুটিং চলছিল। ফেরার পথে ভাবলাম, আপনার কাজ দেখে যাই। শুটিং দেখতে এলাম চা খাওয়াবেন না মিথি?’ 

মিথি সাফাতের হঠাৎ আগমনের বিস্ময় কাটিয়ে প্রোডাকশনের এক ছেলেকে চা আনতে বলল। হেসে বলল,

‘ আপনি নিজ পায়ে হেঁটে আমাদের সেটে এসেছেন, কী সৌভাগ্য আমাদের!’ 

সাফাত একটা চেয়ার টেনে আরাম করে বসল। এখানে সে কী করে চলে এসেছে তা তার নিজের জন্যও এক বিস্ময়। মিথির কাজ দেখতে আসার পরিকল্পনা তার কস্মিনকালেও ছিল না। আজকে এফডিসিতে তার কাজ ছিল – এটাও আংশিক মিথ্যা কথা। এখানে তার একটা সিনেমার শুটিং চলছে ঠিক। কিন্তু তার নিজের কোনো শট ছিল না। স্কয়ার গ্রুপের এমডি পুত্র সাফাতের বন্ধু। সে যাচ্ছিল গাজীপুর একটা সিনেমার কাজে। বন্ধুর থেকে কথায় কথায় মিথিদের শুটিংয়ের শিডিউল শুনে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে এসেছে এফডিসিতে। তার এসিস্ট্যান্ট আরিফ ব্যাপারটাতে এখনও হতভম্ব। সাফাত নিজেও কিছুটা স্তম্ভিত। সে মুখ গম্ভীর করে তার আসাটাকে নিজের কাছেই যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত করার চেষ্টা করল। বলল,

‘ স্কয়ার গ্রুপের এমডি, আমার বন্ধু হাসানের বাবা। যদিও তারা আপনাকে যাচাই করেই কাজ দিয়েছেন। তারপরও তার কাছে আপনাকে রিকমেন্ড করেছি আমি। আপনার কাজের উপর আমার মানসম্মান নির্ভর করছে। কাজটা ঠিক করে না হলে আঙ্কেলের কাছে আমার রুচির ইমেজ খুব খারাপ হবে। তাই দেখতে এলাম। আমি আবার আমার রুচিবোধ নিয়ে খুবই কনসার্ন।’ 

মিথি মাথা ঝাঁকাল,

‘ বুঝতে পারছি। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার রুচিবোধের খুব একটা অপমান সম্ভবত হবে না।’ 

কথাটা বলে হাসল মিথি। সাফাত সেই হাসির দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল,

‘ আপনার মন খারাপ কেন মিথি?’ 

সাফাতের প্রশ্নে চমকে তাকাল মিথি। এতো সরাসরি এর আগে কেউ কোনোদিন তার মন খারাপের কথা জিজ্ঞাসা করেনি। এই পৃথিবীতে সবসময় ভুল মানুষেরা ভুল প্রশ্ন করে কেন?

—————

মেঘ মেদুর দিন।
 মৌনির কাঁধে ইজেল ক্যানভাসের ভারী ব্যাগ। হাতে একটা ওয়ানটাইম চায়ের কাপ। চায়ের কাপ হাতে সে দাঁড়িয়ে আছে বেইলি রোডের একটা থিয়েটারের সামনে। আজ মৌনির ঘুম ভেঙেছে খুব ভোরে। রাতে ভারি বর্ষণের পর কোমল সকালটা দেখেই মৌনির শখ হয়েছে ধানমন্ডির লেকের কাছে গিয়ে একটা লাইভ ল্যান্ডস্কেপ আঁকবে। সকালের চা খেয়ে, দুটো স্যান্ডউইচ প্যাক করে মৌনি তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে পড়েছিল ধানমন্ডির উদ্দেশ্যে। মাঝপথে কী মনে করে পরিকল্পনা পাল্টে সে চলে গিয়েছে নীলক্ষেত। সেখানে পুরোনো বই ঘাটতে গিয়ে দেখা এক তরুণ কবির সঙ্গে। কবি সাহেব মৌনিকে চেনেন। সংবাদপত্রের অফিসে আসা-যাওয়ার ফলাফলস্বরূপ পরিচয়। তিনি মৌনিকে দেখে খুব আন্তরিকতা দেখালেন। বই নিয়ে গল্প করতে করতে সেই গল্প কী করে কী করে যেন এসে ঠেকল থিয়েটার বিষয়ক কথাবার্তায়। মৌনির এক লেখায় থিয়েটার বিষয়ক কিছু তথ্য দরকার শুনে তিনি জানালেন, তিনি একটা থিয়েটার দলের সক্রিয় সদস্য। আজ তাদের রিহার্সাল আছে। চাইলে মৌনি তার সাথে যেতে পারে। অলস মৌনির হাঁটতে চলতে আলসেমি লাগলেও নতুন কিছু জানার আগ্রহে দু'চোখ চকচক করে উঠল। নীলক্ষেত থেকে কিছু বই সংগ্রহ করে কবি সাহেবের সাথে চলে গেল বেইলি রোড। থিয়েটার দলের সঙ্গে ঘন্টা দুই কাটিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো। কবি সাহেব মৌনিকে এগিয়ে দিতে এলেন বাইরে পর্যন্ত। বেইলী রোডের বইয়ের দোকানগুলোতে একবার চক্কর দিয়ে ধানমন্ডির উদ্দেশ্যে রওনা দিবে বলে পরিকল্পনা করছিল মৌনি। কবি সাহেব বারবার করে জিজ্ঞাসা করছিলেন, আসন্ন মেলায় তার একক বই আসার কোনো সম্ভবনা আছে কিনা? একদিন সময় করে মৌনির ছবি আঁকা দেখার দাওয়াত পাওয়া যাবে কিনা? ছটফটে, সুদর্শন এই তরুনের সাথে কথা বলতে বলতে রাস্তায় বেরুতেই রাস্তার ওপাশের একটা দোকানে নাহিদকে চোখে পড়ল মৌনির। নাহিদ দোকান থেকে সিগারেট কিনছে। একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে দোকানদার থেকে দেশলাই নিয়ে সিগারেট জ্বালাল। চোখ দুটো ছোট ছোট করে ধোঁয়া ছাড়তেই রাস্তার ওপাশে মৌনিকে চোখে পড়ল। এক সেকেন্ডের জন্য চোখাচোখি হলো। হাতের নতুন সিগারেটটার প্রতি মায়া হলেও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেটটা পায়ের নিচে মাড়িয়ে দিল নাহিদ। তারপর রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে গেল মৌনির দিকে। নাহিদকে এগিয়ে আসতে দেখেই চোখ-মুখ কঠিন হয়ে গেল মৌনির। নাহিদের সম্পর্কে কখনওই খুব একটা ভালো খবর বাতাসে ভাসে না। মৌনি যে সে সকল খবরের সব বিশ্বাস করে তেমনও না। কিন্তু চোখের সামনে আজ যে নাহিদকে দেখতে পাচ্ছে সে নাহিদ সম্পর্কে যেকোনো খবর বিশ্বাস করা যায়। রাস্তার ছেলেদের সাথে মেলামেশা, মদ-গাঁজা খাওয়া এখন আর খুব একটা অবিশ্বাস্যকর মনে হচ্ছে না। মৌনি খবর পেয়েছে নাহিদ পড়াশোনাতেও ইস্তাফা টেনেছে। সুতরাং, নাহিদকে বর্তমানে মোটামুটি রাস্তার ছেলে বলে চিন্তিত করা যায়৷ নাহিদ এগিয়ে এসে হাসিমুখে শুধাল, 

‘ আরে মনমন। কী অবস্থা? এখানে কী?’ 

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণের মৌনির এই গম্ভীর হয়ে যাওয়া চোখ এড়াল না। নিচু কণ্ঠে শুধাল,

‘ আপনার পরিচিত?’ 

মৌনির মধ্যে একটা নীরব জাত্যভিমান আছে। উঁচু বংশে জন্মানোর অহংকার না করলেও রুচিহীন মানুষের সাথে কথা বলতে তার ব্যক্তিগতভাবে খুব আপত্তি। নাহিদ এখন যাদের সঙ্গে মিশে তারা অত্যন্ত রুচিহীন, কদর্য। অতএব, নাহিদও তাদেরই একজন। মৌনি একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,

‘ আমার কাজিন।’ 

তরুণ কবি আড়চোখে একবার নাহিদের দিকে তাকিয়ে বিদায় নিল৷ মৌনি নাহিদের দিকে তাকিয়ে প্রচ্ছন্ন বিরক্তি নিয়ে বলল,

‘ অবস্থা ভালো। তুই এখানে?’ 

নাহিদ মৌনির মুখের বিরক্তি ধরতে পেরেই মৃদু মৃদু হাসছিল। হেঁয়ালি করে বলল,

‘ বন্ধুদের সাথে এসেছি। এখানে তো আমি রোজই আসি।’ 

মৌনি ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল, 

‘ রোজ কেন আসিস? গার্লস স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ে দেখার জন্য?’ 

নাহিদ বাচ্চা মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য বেইলী রোড আসে মৌনির এই অদ্ভুত ধারণায় ভেতর ভেতর বেশ বিস্মিত হলো নাহিদ। মৌনির অভিযোগের বিপরীতে কোনো প্রত্যুত্তর না করে হেসে ফেলল। সেই হাসিতে মৌনির বিরক্তি বাড়ল বৈ কমল না। নাহিদের সামনে থেকে দ্রুত সরে পড়ার চেষ্টা করতেই নাহিদ কণ্ঠ নিচু করে বলল,

‘ তোর কাছে কিছু টাকা হবে মৌনি?’ 

নাহিদের প্রশ্নে চমকে নাহিদের মুখের দিকে তাকাল মৌনি। মৌনির বিস্মিত চাহনি যে কথাটা ভাবছে নাহিদ ঠিক সেরকম একটা কথাই বলল এবার। নিচু কণ্ঠে বলল,

‘ সিগারেট কিনব। টাকা নাই। বাসা থেকে টাকা দিচ্ছে না। কী যে একটা বিপদের মধ্যে আছি।’ 

নাহিদের কথায় স্তম্ভিত হয়ে গেল মৌনি। সবসময় আস্ত একটা ব্র্যান্ড হয়ে ঘুরে বেড়ানো নাহিদ, যে নাহিদকে মৌনি ভাবত প্রবল আত্মসম্মান সচেতন, সেই নাহিদের মুখে এই ধরনের রুচিহীন কথা শুনে মৌনির মুখ থেকে বেরিয়ে এলো একটাই শব্দ, 

‘ ছিঃ!’ 

নাহিদ সহজ কণ্ঠে শুধাল,

‘ একশো টাকা দিলেই হবে।’ 

মৌনি তীব্র চোখে নাহিদের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘৃণায় বিকৃত হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরটা। একটা মেয়ের জন্য এতো অধঃপতন! নিজের জীবনের জন্য কোনো ভালোবাসা নেই? প্রেম-ভালোবাসায় সব? মৌনি কঠিন স্বরে বলল,

‘ আমার কাছে কোনো টাকা পয়সা নেই।’ 

‘ একশো টাকাও না?’ 

‘ না।’ 

কঠিন কণ্ঠে উত্তরটা ছুঁড়ে দিয়েই উল্টো পথে হাঁটা দিল মৌনি। মৌনির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে ফেলল নাহিদ। কেউ তাকে ভালোবাসতে পারছে না আবার পুরোপুরি ঘৃণা করতে পারছে না — এই ব্যাপারটা বিব্রতকর। এসপার-ওসপার হওয়া দরকার। নাহিদ মৌনিকে ওসপারে গিয়ে সকলের সাথে মিশে যেতে সাহায্য করল। এইবার মেয়েটা শান্তিতে থাকবে। নাহিদ কিছুক্ষণ মৌনির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মৌনির উল্টো পথে হাঁটতে লাগল। কণ্ঠে গুনগুনিয়ে বাজছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান, 

‘ এই পথ যদি না শেষ হয় 
তবে কেমন হতো তুমি বলো তো? 
যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয় 
তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?’ 

—————

ধানমন্ডির লেকের পাড়ে আজ সুন্দর আবহাওয়া। ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। মৌনি ইজেলে ক্যানভাস লাগিয়ে থম ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নাহিদের সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে মনটা খুব বিষণ্ণ। আঁকাআঁকিতে মন বসছে না। মৌনি কিছুতেই বুঝতে পারছে না, নাহিদের এই ধ্বংসের পেছনে দায় কার? মিষ্টির নাকি স্বয়ং নাহিদই এর জন্য দায়ী? মানুষের জীবনে ভালোবাসা এতোটা গুরুত্বপূর্ণ কেন হবে যে নিজেকে ভুলতে সে দু'বার পরোয়া করবে না? মৌনির বিরক্ত লাগে। একবার মনে হয় মিষ্টিই ঠিক। যে এই সামান্য ঝড় সইতে পারে না সে কী করে মিষ্টির দায়িত্ব নিতো? মৌনি ইজেল ক্যানভাস গুছিয়ে বাড়ির পথ ধরে। আজ আর আঁকাআঁকি কিছু হবে না তার। কিন্তু বাসায় পৌঁছানোর আগেই তার কাছে পৌঁছে আরও একটি দুঃসংবাদ। মা ফোন করে আকুল হয়ে জানান,

‘ মৌনি? জানিস শাওন কী করেছে?’ 

মৌনি নিরাসক্ত কণ্ঠে শুধাল, 

‘ কী করেছে?’ 

‘ ট্রেনিং ফেলে একাডেমি থেকে পালিয়ে এসেছে। তোর খালামণি তো কান্নাকাটি করে অস্থির। আমি যাচ্ছি তোর নানুবাড়ি। ছেলেটা কেন যে এমন কান্ড করে বসল!’ 

মৌনির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে কিছুক্ষণ নীরব থেকে বিস্মিত কণ্ঠে শুধু এটুকু বলতে পারল,

‘ কী!’ 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp