নবোঢ়া - পর্ব ১৮ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

নবোঢ়া - ইলমা বেহরোজ
          সোনালি রোদে ঝলমল করছে জমিদারবাড়ির চারপাশের মাঠ। দূরে দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট খামারবাড়ির সারি, ছবির মতো সাজানো। ঘাসের সবুজ গালিচায় মোড়া মাঠের শেষে কাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা গোয়াল। দক্ষিণের খামারবাড়ির পেছনে আছে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ঘরটি হাওয়ার একটা ঝাপটায় ভেঙে পড়বে। কিন্তু দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। নরম তুলোর মতো গদিতে মোড়া একটা বিশাল খাট, দেয়ালজুড়ে টাঙানো দামি ছবি, আর কোণায় একটা ছোট্ট কিন্তু সুসজ্জিত বইয়ের আলমারি। 

গদির মাঝখানে বসে আছে জাওয়াদ। জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে অদ্ভুত শূন্যতা। সে এখানে থাকলেও তার মন অনেক দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে। হাতে একটা বই, অনেকক্ষণ ধরে পাতা ওল্টানো হয়নি। মাঝে মাঝে দূরে জমিদার বাড়ির দিকে তাকাচ্ছে, তারপর আবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ওখানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা আর অনিচ্ছার দ্বন্দ্বে ছটফট করছে হৃদয়। 

দুই দিন ধরে সে এখানেই লুকিয়ে আছে। জমিদাররা যখন খামারবাড়ি পরিদর্শনে আসে, তখন এই ঘরে বসেই কর্মচারীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে। 

বাড়ির বিশাল ইট-পাথরের অট্টালিকায় তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তার উপর গুলনূরের সঙ্গে করা অন্যায়টা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। অথচ অহংকার তাকে কারো কাছে ক্ষমা চাইতে দিচ্ছিল না। তাই নিজেকে শান্ত করতে, নিজের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে চুপিচুপি এখানে চলে এসেছে। এখানে সে বই পড়ে, মাঝেমধ্যে বনে গিয়ে শিকার করে। কখনো বা শুধু বসে থেকে নিজের ভাগ্যের কথা ভাবে।

ক্ষুধায় যেন পেটের ভেতর ইঁদুর দৌড়াচ্ছে৷ ঝুড়ি থেকে তিনটে পাকা কলা নিয়ে সে খেতে শুরু করে। খাওয়া শেষে অলস ভঙ্গিতে উঠে কলার খোসাগুলো ঘরের বাইরে ফেলে দেয়। সাদা রঙের ফতুয়া পরে ঘর থেকে বের হতেই চোখ কপালে উঠে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে মনির আর গুলনূর!

দুজন হাতে খাবারের ঝুড়ি নিয়ে খামারে এসেছে। তারাও জাওয়াদকে দেখে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠেছে। জমিদার পুত্রকে খুঁজে বের করার জন্য বাড়িতে হৈ চৈ পড়ে গেছে, আর সে কিনা নির্বিকার চিত্তে উল্টো ফতুয়া পরে খামারবাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে! চারপাশে কত গরু-ছাগল আর বিষ্ঠার দুর্গন্ধ! 

মনির, গুলনূর তৎক্ষণাৎ মাথা নত করে সম্মান জানায়।

জাওয়াদ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সে গলা পরিষ্কার করার ছলে একটা কাশি দেয়। তখন একটা গরু এসে জাওয়াদের ফতুয়ার এক কোণা চিবোতে শুরু করে। জাওয়াদ হকচকিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠে, "হুর, হুররর।"

সে তাড়াহুড়ো করে গরুটাকে তাড়াতে গেলে নিজের ফেলা কলার খোসায় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। মনির ছুটে এসে তাকে ধরতে চায়, তার আগেই জাওয়াদ কোনোমতে নিজের ভারসাম্য ধরে রেখে হাত তুলে মনিরকে থামিয়ে দেয়।

গুলনূর ঠোঁট টিপে হাসে। 

জাওয়াদ চেষ্টা করে নিজেকে গম্ভীর দেখাতে। বলে, "কী ব্যাপার? তোমরা এখানে কী করছ?"  
তার চোখ না চাইতেও বার বার গুলনূরের দিকে যাচ্ছে।

মনির জবাবে বলে, "হুজুর, কর্মচারীদের খাবার দিতে এসেছি। কিন্তু আপনি এখানে কেন? আপনাকে তো সবাই খুঁজছে...বেগম..."

জাওয়াদ তখন একটা মহাজ্ঞানীর ভঙ্গি করে বলে, "আমি? আমি এখানে একটা তদন্তে এসেছি।" 

তখন একটা দুষ্টু বকরি পেছন থেকে এসে জাওয়াদের ফতুয়ার পকেট থেকে ঝুলে থাকা রুমালটা টেনে নেয়। জাওয়াদ ঘুরে তাকাতেই বকরিটা তার দিকে তাকিয়ে "ভ্যাঁ ভ্যাঁ" করে ডেকে উঠে। 

জাওয়াদের মনে হলো বকরিটা বলছে, "জমিদার ছেলে একটা আস্তো মিথ্যুক!"

গুলনূর মুখ ফিরিয়ে হেসে ফেলে। জাওয়াদ লজ্জায় লাল হয়ে যায়। সেইসাথে মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্য করে, গুলনূরের হাসি সুন্দর! প্রাণ আছে! চোখের তারায় আনন্দের ঝিলিক খেলে বেড়াচ্ছে। গোলাপি গাল দুটোতে হাসির ছোঁয়ায় লাবণ্য ছড়িয়ে পড়েছে। হাসিখুশি এই মেয়েটিকেই কি না সেদিন সে অন্যায়ভাবে ধমকে, রাগের মাথায় গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছিল! 

গুলনূর যখন হাসি থামিয়ে জাওয়াদের দিকে তাকায়, তখন চার চোখ এক হয়ে কিছু একটা যেন বদলে যায়। 

রাইহা তখনও নাভেদকে আঁকড়ে ধরে আছে। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে, চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু বাঁধ ভেঙে পড়ছে। সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে নাভেদের চোখে চোখ রেখে বলে, "কাকিমা আমাকে চলে যেতে বলেছে। আমার সব..." কান্নার প্রবল দমকে তার কথা অসমাপ্ত রয়ে যায়। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে বর্ষার ধারার মতো। 

নাভেদ ভ্রু কুঁচকে বলে, 'কেন চলে যেতে বলেছে?' 

হঠাৎ করেই রাইহার নজর পড়ে জুলফার দিকে। সে দ্রুত পিছিয়ে যায় নাভেদের আলিঙ্গন থেকে। অপরাধী সুরে বলে, 'সরি, আমি জানতাম না যে তুমি কারও সঙ্গে আছো।'

জুলফার চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছে। সে প্রাণপণে চেষ্টা করছে সেই অশ্রু আটকে রাখতে। তার ঠোঁট কাঁপছে না বলা কথার ভারে।  

"আমি... আমি যাই।" বলেই সে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে। 

নাভেদ রাইহার কাঁধে হাত রেখে স্বান্তনা দিয়ে বলে, "কান্নাকাটি করো না। চোখের জল মুছে ফেলো। আমি তোমার পাশে আছি। শান্ত হয়ে বলো, ঠিক কী ঘটেছে?"

রাইহা লম্বা করে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। তারপর বলে, "জাওয়াদ... বাড়ি নেই। আমি ওর কোনো খবর দিতে পারছি না। এই অজুহাতে কাকিমা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছেন। নাভেদ, তুমি তো জানো আমার অবস্থা। আমি কোথায় যাব? কী করব?"

নাভেদ একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে। সে জানে রাইহার বিপদের কথা। বলে, 'শোনো, আমরা এখন বন্ধু। আর বন্ধুই তো বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়। তোমার নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন থেকে আমারও। তুমি জমিদার বেগমকে বলো, দুই দিনের মধ্যে তুমি চলে যাবে।"

"কিন্তু কোথায় যাব আমি? আমার হাতে তো এখনও পাসপোর্ট আসেনি।"

"সেটা নিয়ে তুমি ভেবো না। আমি তোমার থাকার ব্যবস্থা করব। যতদিন না তোমাকে তোমার মায়ের কাছে নিরাপদে পৌঁছে দিতে পারি, ততদিন তুমি আমার আমানত৷ এটা আমার প্রতিশ্রুতি।"

রাইহা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে নাভেদের দিকে। বলে, "তুমি... তুমি সত্যিই এতটা করবে আমার জন্য? একটা অচেনা মেয়ের জন্য?"

"অবশ্যই করব। রাইহা, তুমি আর অচেনা নও। আমরা এখন একসাথে এই লড়াইটা লড়ব। আমি তোমার পাশে আছি, আর থাকব। বিশ্বাস রাখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।"

রাইহার চোখ থেকে দুফোঁটা কৃতজ্ঞতার অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে আবেগে আপ্লূত হয়ে বলে, "থ্যাংক ইউ, নাভেদ। তুমি না থাকলে আমি জানি না কী করতাম।"

"এখন যাও, জমিদার বেগমের কাছে যাও। তাকে বোঝাও, অন্তত দুইদিনের জন্য তোমাকে থাকতে দিতে।"

রাইহার চোখে সংশয়, "আমি কি উনাকে বুঝাতে পারব? উনি তো আমার কথাও শুনতে চান না।"

"নিশ্চয়ই পারবে। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো।আমি যেতাম তোমার সঙ্গে, কিন্তু দেখো, আমি এখানে একজন অতিথি। জমিদার বেগমের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলা আমার উচিত হবে না। এটা তোমাকেই করতে হবে।"

রাইহা একটু ভেবে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলে, "ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করব।"

নাভেদ উৎসাহের সাথে বলে, "এই তো চাই। যাও, আমি এখানেই আছি।"

রাইহা যেতে যেতে একবার ফিরে তাকায় নাভেদের দিকে। নাভেদ ইশারায় উৎসাহ দেয়৷ রাইহার পদশব্দ মিলিয়ে যেতেই নাভেদের চেহারার রং পাল্টে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় বিছানার দিকে, যেখানে জুলফার দেওয়া ছোট্ট রুমালটা পড়ে আছে। নাভেদ ধীর গতিতে এগিয়ে যায় সেদিকে। হাত বাড়িয়ে তুলে নেয় রুমালটি। রুমালের ওপর সুতোর কাজে আঁকা বেহালাটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

ফিসফিসিয়ে আওড়ায়, "জুলফা... তুমি জানো না তুমি কী। তুমি আমার সবচেয়ে মূল্যবান গুটি। এই দাবার ছকে তুমিই হবে আমার রানি।"

এমন একটা মুহূর্তের জন্যই সে এতবছর অপেক্ষা করেছিল, এমন একটা সুযোগই চাচ্ছিল বহুদিন ধরে। 

সে আবার বলে। দাঁত কিড়মিড় করে "খেলা শুরু হয়েছে, শব্দর ভুঁইয়া। এই খেলায়... তোর হৃদয়ের সম্রাজ্ঞী আমার মাস্টার স্ট্রোক।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp