রাইহা সর্বদা নাভেদের সান্নিধ্য খুঁজে বেড়ায়।আজ তার সাহসের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। বসে আছে কি না নাভেদের প্রিয় ঘোড়ার পিঠে! অনেকক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরে নাভেদ নিজের হাতে লাগাম ধরে ঘোড়াটিকে আস্তে আস্তে হাঁটিয়ে ফিরে আসছে বাড়ির দিকে। রাইহার মুখজুড়ে ভয়ের ছায়া দোলা দিলেও ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি।
নাভেদ মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখছে আর মৃদু হেসে বলছে, "ভয় নেই রাইহা, আমি আছি।"
তাতেই রাইহার বুকের ধুকপুকুনি একটু একটু করে শান্ত হচ্ছে। সে শুধু রাইহাকেই নয়, মনির ও সিদ্দিককেও ঘোড়ায় চড়িয়েছে। তার এই আন্তরিক ভালোবাসায় বাড়ির দাসদাসী থেকে জমিদার সবাই মুগ্ধ।
রাইহাকে ঘোড়ায় চড়তে দেখে জুলফার অন্তর জ্বলে যাচ্ছে৷ সে জানালার পর্দার আড়াল থেকে নীরবে দেখছে সবকিছু। রাইহাকে তার শিলপাটায় ফেলে মরিচ দিয়ে পিষে ফেলতে ইচ্ছে হয়। হায়! যদি সেও রাইহার মতো নাভেদের সান্নিধ্যে যেতে পারত, তার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠতে পারত, তাহলে কতই না ভালো হতো।
জুলফা মনে মনে ভাবে, "যদি রাইহা বাড়ির হবু বউ হয়ে পর পুরুষের সঙ্গে এতো হাসাহাসি করতে পারে, আমিও তো যেতে পারি নাভেদের কাছে। নিশ্চয়ই সবার মতো উনি আমার সঙ্গেও হেসে কথা বলবেন। আমার সঙ্গেও গল্প করবেন। আমার জন্য এইটুকুই তো যথেষ্ট।"
এই চিন্তায় তার মনে সাহস জেগে ওঠে। তৎক্ষণাৎ সে নিজেকে একবার আয়নায় দেখে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।
তার পরনে একটি হালকা নীল রঙের শাড়ি, আঁচল মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। সে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে বারান্দা ধরে হাঁটতে থাকে। হঠাৎ কানে আসে কারো কান্নার শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে পা থমকে যায়। কান্নার উৎস খুঁজতে থাকে। বারান্দা ধরে হাঁটতে হাঁটতে খালি ঘরগুলোর দিকে চলে আসে। একটা ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। ঘরের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। কে কাঁদছে? কেন কাঁদছে? সন্তর্পণে জুলফা দরজার কাছে এগিয়ে যায়। তারপর আস্তে করে উঁকি দিয়ে ভেতরে তাকায়। যা দেখে তাতে সে হতবাক হয়ে পড়ে। ঘরের মাঝখানে একটি জায়নামাজ পাতা। তার উপর উবু হয়ে বসে আছেন সুফিয়ান। তার শরীর কাঁপছে, চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে। তিনি বারবার সেজদায় লুটিয়ে পড়ছেন। প্রতিবার মাথা তুলে কাতর কণ্ঠে বলছেন, "ইয়া আল্লাহ। ইয়া আল্লাহ। ক্ষমা করো।"
সুফিয়ানের আকুতি দেখে জুলফার বুক টনটন করে ওঠে। যিনি সবসময় নিজেকে সামলে রাখেন, সবাই যাকে মান্য করে, ভয় পায় তাকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখা জুলফার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকে। সে নিঃশব্দে সেখান থেকে কেটে পড়ে।
সিঁড়ির কাছে জাওয়াদের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতেই তাড়াতাড়ি আঁচল তুলে মাথা ঢেকে নেয়। জাওয়াদকে দেখলেই কেন জানি তার গা ছমছম করে। ছেলেটা সারাক্ষণ কী যেন ভাবে। বয়সে অনেক ছোট হলেও, সম্পর্কে জুলফা কাকিমা হয়। অথচ জাওয়াদের ব্যবহারে কোনো আপনজনের স্নেহ কিংবা আগ্রহ নেই। শুধুই কঠোর শীতলতা। শব্দর দুইবার জাওয়াদের কাছে গিয়েছে কথা বলতে। জাওয়াদ তেমন কোনো সাড়াই দেয়নি। এই ছেলে নাকি হঠাৎ এমন পাল্টে গেছে। আগে এমন ছিল না। জুলফা সৌজন্যবোধ থেকে একটু হেসে কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই জাওয়াদ তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায়। যেন জুলফাকে সে দেখেইনি। জুলফা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। জাওয়াদের চেহারাটাই কেমন রাগী রাগী, মারমুখো গোছের।
ওদিকে নাভেদের চেহারাটা কী সুন্দর! সবসময় হাসি হাসি মুখ করে থাকে।
বাড়ির বারান্দায় পা রাখতেই তার চোখে পড়ে, একপাশে মোটা থামের গায়ে হেলান দিয়ে একটি চেয়ারে বসে আছে নাভেদ। তার পাশেই দাঁড়িয়ে রাইহা। দুজনের মুখেই হাসি, মুখে কথার ফোয়ারা।
জুলফার সারা শরীরে একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। বুকের ভেতরটা যেন আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। কেন? কেন রাইহা সবসময় নাভেদের আশেপাশে থাকবে?
সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় ওদের দিকে।কণ্ঠস্বরকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করলেও একটু কাঠখোট্টা শোনায় যখন মিথ্যা করে বলে, "এইযে, তোমাকে জাওয়াদ ডাকছে।"
রাইহা ভুরু কুঁচকে তাকায়। বিস্ময় নিয়ে বলে, "জাওয়াদ? কিন্তু আমি তো দেখলাম ও এইমাত্র বেরিয়ে গেল।"
জুলফা মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। মুখ দিয়ে কথা বের হয় না।
"আসলে..." সে আমতা আমতা করতে বলে, "মানে... আমি ভুল বলেছি। জাওয়াদ নয়, ভাবিজান ডাকছেন। তোমার শ্বাশুড়ি।"
রাইহার চোখে এবার বিস্ময়ের সাথে সন্দেহও উঁকি দেয়। বলে, "আমার শ্বাশুড়ি? এই চার দিনে উনি আমার দিকে তাকালেনও না, এখন হঠাৎ ডাকছেন যে!"
জুলফা এবার সত্যিই অস্বস্তিতে পড়ে যায়। বলে, "আমি... আমি ঠিক জানি না।।তবে মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবে।'
রাইহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর নাভেদের দিকে ফিরে বলে, "সরি, আমাকে যেতে হবে। পরে কথা হবে।"
নাভেদ মৃদু হেসে মাথা নাড়ায়, "নিশ্চয়ই, তুমি যাও। আমি এখানেই আছি।"
রাইহা আবার জুলফার দিকে ফিরে, 'আচ্ছা, কোথায় যেতে হবে?"
"দোতলায়। বাঁদিকের ঘরে।"
রাইহা মাথা নেড়ে চলে যাওয়ার পর জুলফার মাথায় যেন বাজ পড়ে। সে বিড়বিড় করে বলে, "ও মা! এ যে বাংলায় কথা বলছে!"
নাভেদ জবাব দেয়, "ওর দাদা ইংল্যান্ডবাসী হলেও দাদি বাংলাদেশের। দাদা-দাদীর বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর রাইহার আব্বুকে নিয়ে ওর দাদি দেশে চলে আসেন। তখন ওর আব্বুর দুই বছর বয়স।"
সঙ্গে সঙ্গে যেন জুলফার হৃদয়ের ভেতর একটা ফুলের কুঁড়ি ফুটে ওঠে। নাভেদ তার সঙ্গে কথা বলছে! সে ঘাড় ঘুরিয়ে নাভেদের দিকে তাকায়। সূর্যের আলো এসে পড়েছে নাভেদের চোখের উপর। দৃশ্যটা দেখে জুলফার শরীরে একটা শিহরণ বয়ে যায়। মাথার ভেতর হাজার মৌমাছি ভন্ভন্ করে উড়ছে। একটা অদ্ভুত জড়তা তাকে গ্রাস করে নেয়।
নিজেকে সামলাতে দ্রুত থামের আড়ালে সরে যায়। সেখান থেকে সে কোনোমতে বলে, "ওহ্, আচ্ছা।" তারপর নিজের অস্বস্তি ঢাকতে জিজ্ঞেস করে, "একটা প্রশ্ন ছিল।"
"জি, বলুন।"
"আপনি আর বেহালা বাজান না কেন?"
"জাওয়াদ সাহেব নাকি রাতে কোনো শব্দ হলে ঘুমাতে পারেন না। তাই আর বাজাই না।"
জুলফা মনে মনে রাগে গজগজ করতে থাকে। জাওয়াদকে বেশ কয়েকটা কড়া গালি দিয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই নাভেদ ওপাশ থেকে বলে উঠে, "ক্ষমা করবেন বেগম, আমাকে একটু যেতে হবে।"
কথাটি জুলফার হৃদয়ে ছুরির মতো বিঁধে। সবার জন্যই নাভেদের সময় আছে, শুধু তার জন্যই নেই। এমনকি তার অনুমতি নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করে না। ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। সেদিকে তাকিয়ে থেকে জুলফার মনে হয়, তার জীবনের সব আলো নিভে যাচ্ছে। সে চাইলেও নাভেদকে ডেকে দাঁড়াতে বলতে পারবে না। তার সেই অধিকার নেই।
জমিদার বাড়ির প্রাচীন পুকুরের কাছে, বিশাল গাছের ছায়ায় ঢাকা নিরিবিলি কোণে একটা পুরনো দোলনা ঝুলছে। সেই দোলনায় আরাম করে শুয়ে আছে জাওয়াদ। চোখ বন্ধ করে সে উপভোগ করছে শীতল বাতাসের স্পর্শ। মাথার ওপরের পাতার ফাঁক দিয়ে বিকালের সূর্যের কোমল আলো এসে ছড়িয়ে পড়ছে তার মুখজুড়ে। মনির কয়েকটা ডাব নিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে জাওয়াদ চোখ মেলে ডাবের জল পান করছে। চোখ খুলে একসময় জিজ্ঞেস করে, "তোদের ছোট জমিদার বিয়ে করলেন কবে?"
"দেড় দুই মাস হবে হুজুর।"
জাওয়াদের দৃষ্টি তখন জমিদার বাড়ির দিকে নিবদ্ধ হয়। বিশাল বাড়ির বারান্দায় একা বসে আছে জুলফা, তার নতুন কাকিমা।
"বুড়ো বয়সে এসে বিয়ের নেশা চাপল!" জাওয়াদ বিদ্রুপের সুরে বলে। তারপর আবার জিজ্ঞেস করে, "বয়স কত?"
মনির একটু ইতস্তত করে বলে, "কার বয়স, হুজুর?"
"তোদের নতুন ছোট বেগমের।"
মনির একটু ভেবে নিয়ে বলে, "যতদূর শুনছি, বিশ-একুশ বছর।"
"আর একটু হলেই আমার হাঁটু বয়সী হয়ে যেত!" বলেই উঠে দাঁড়ায় জাওয়াদ। বলে, "চল, একটু ঘুরে আসি।"
সামনে বিশাল প্রাসাদোপম জমিদার বাড়ি। লাল সুরকির রঙে আগাগোড়া মোড়া, সামনে বিশাল বারান্দা, উঁচু উঁচু থাম। বাড়ির চারপাশে সুন্দর করে সাজানো বাগান। নানা রকমের ফুলগাছ আর ফলের গাছে ভরা। জাওয়াদ আর মনির ধীরে ধীরে বাড়ির চারপাশে ঘুরতে থাকে।
ষাট বিঘা জমির বিস্তৃতিতে ছড়িয়ে থাকা এই সম্পত্তি স্বপ্নরাজ্যের মতো। একদিকে মখমলের মতো নরম সবুজ ঘাসে ঢাকা বিশাল মাঠ, অন্যদিকে ছোট ছোট খামারবাড়ি আর পশুশালার সারি।
দূরে গরু-ছাগলের আস্তাবল থেকে ভেসে আসা হাম্বা রব আর কর্মব্যস্ত মানুষের কলরব মিলেমিশে একাকার। তবে এসব কোলাহল বাতাসে মিলিয়ে যায় বাড়ির মূল অংশে এসে। চারদিকে উঁচু ইটের প্রাচীর, তার ওপর লোহার কাঁটাতারের বেড়া যেন কোনো দুর্ভেদ্য দুর্গ। খামারের দিকে একটা গেট আছে যেটা দিয়ে কর্মচারীরা যাতায়াত করে। অন্যদিকে, যেখানে মাঠ শেষ হয়ে শুরু হয়েছে নিবিড় বন, সেখানে আরেকটি প্রবেশপথ। সাহসী শিকারী ছাড়া কেউ সে বনে পা বাড়ায় না। জাওয়াদ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় খামারবাড়ির দিকে। সেখানে কর্মরত মানুষগুলোর সাথে গল্প জুড়ে। এখান থেকে তাকিয়ে দেখা যায় তাদের বাড়িটা। দুই তলা লাল ইটের বিশাল অট্টালিকা, যা প্রায় ছয় বিঘা জমি জুড়ে বিস্তৃত। বাড়িটার জটিল গঠন গোলকধাঁধার মতো। এত ঘর, এত বারান্দা যে নতুন কেউ এলে পথ হারিয়ে ফেলবে নিঃসন্দেহে। একসময় এই বাড়ি ছিল জীবন্ত, মানুষের কলরবে মুখর। দাস-দাসীর ভিড়ে গমগম করত প্রতিটি কোণ। এখন, জাওয়াদের দাদার আমল থেকেই বাড়ির অধিকাংশ অংশ নীরব।
বর্তমানে যারা আছে, তারা সিঁড়ির কাছাকাছি কয়েকটি ঘরে সীমাবদ্ধ। বাকি সব ঘর খালি। মহলের পাশেই বিশাল অতিথিশালা। যেখানে বিশের বেশি ঘর। দুটো দরজা, একটা বাইরে যাওয়ার, অন্যটা খাসমহলে প্রবেশের। বারান্দা একই। অথচ এই বিশাল অতিথিশালায় এখন মাত্র দুজন থাকছে। নাভেদ পাটোয়ারী আর তার একজন কর্মচারী। বাকি সব ঘর খালি।
গোধূলির আলো-আঁধারি মুহূর্তে, জাওয়াদের পা যখন বাড়ির পেছন দিকের পথ ধরেছে, তখনই আকাশ থেকে খসে পড়ে একটি কাগজের বিমান। সন্ধ্যার মৃদু বাতাসে ভেসে এসে নরম ঘাসের উপর নামে সেটি। জাওয়াদ অবাক হয়ে উপরের দিকে তাকায়। ছাদে কারও ছায়াও নেই। কে এমন শৈশবসুলভ কাণ্ড করেছে? কে বানিয়েছে এই কাগজের বিমান? ধীরে ধীরে সে কাগজটি কুড়িয়ে নেয়। ছোট্ট ছোট্ট অক্ষরে কী যেন লেখা। অস্পষ্ট আলোয় চোখ কুঁচকে দেখার চেষ্টা করে। বাল্যকালে সেও এমনি করে কাগজের বিমান বানিয়ে উড়াত মনের কথা লিখে। সেই স্মৃতি তাকে উৎসাহিত করে কাগজটি খোলার জন্য।
যখন কাগজটি সম্পূর্ণ খুলে তখন সন্ধ্যার শেষ আলোটুকু ঠিক তার হাতের উপর এসে পড়েছে। সেই ক্ষীণ আলোয় জাওয়াদ ধীরে ধীরে পড়ে লেখাগুলো...
প্রিয় অজানা,
আজ তোমাকে লিখছি আমার অন্তরের গহন থেকে, যেখানে আলো আর অন্ধকার নিরন্তর দ্বন্দ্বে মগ্ন থাকে। তুমি কে, জানি না। তবে জানি, তুমি বুঝবে এই হৃদয়ের ব্যথা!
আমার সঙ্গী আছে একজন, তার নাম দুঃখ। সে আমার ছায়ার মতো, কখনো পিছনে, কখনো সামনে। নিজের শ্বাসের শব্দেও তাকে শুনতে পাই। সে আমার রক্তের প্রতিটি কণায় মিশে আছে, আমার চিন্তার প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে।
জানো, যখন হাসি ফোটে আমার ঠোঁটে, তখন দুঃখের চোখে জল নামে। সে ভয় পায়, পাছে আমি তাকে ভুলে যাই। কিন্তু কেমন করে ভুলব তাকে? সে যে আমার অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে।
মাঝে মাঝে ভাবি, কেন এমন হলো? কেন দুঃখ আমাকে এত ভালোবাসে? আমি কি তার এতই আপন? নাকি আমিই তাকে এত আপন করে নিয়েছি? উত্তর খুঁজে পাই না, শুধু অনুভব করি তার উষ্ণ নিঃশ্বাস আমার কানের পাশে।
তুমি কি কখনো অনুভব করেছো এমন ভালোবাসা? যা তোমাকে গ্রাস করে, তোমাকে শূন্য করে, আবার তোমাকেই পূর্ণ করে? দুঃখের ভালোবাসা এমনই। সে আমাকে এত ভালোবাসে যে, আমার সুখের মুহূর্তগুলোকেও সে নিজের রঙে রাঙিয়ে নেয়।
আমি চাই না তাকে। আমি চাই মুক্তি। কিন্তু সে আসে, বার বার আসে। প্রতিটি আগমনে আমার হৃদয় কেঁপে ওঠে, আমার আত্মা চিৎকার করে ওঠে। তবুও, তার স্পর্শে আমি অদ্ভুত এক শান্তি খুঁজে পাই। এ কেমন বিরোধাভাস, বলো তো?
কখনো কখনো ভাবি, দুঃখ ছাড়া আমি কে? সে না থাকলে আমার অস্তিত্বের অর্থ কী? তার অনুপস্থিতিতে আমি কি সত্যিই সুখী হতে পারব? নাকি তখন আমি হারিয়ে যাব, নিজেকে খুঁজে পাব না?
তুমি হয়তো ভাবছো আমি পাগল। হয়তো তাই। কিন্তু এই পাগলামিতেই আমি খুঁজে পেয়েছি জীবনের অর্থ। দুঃখের মাধ্যমেই আমি শিখেছি সুখের মূল্য। তার কালো রঙের মাঝেই আমি দেখেছি আলোর ঝিলিক।
আজ রাতে, যখন চাঁদ আকাশে হাসবে, আমি জানি দুঃখ আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমি তার হাত ধরব, তার চোখের দিকে তাকাব। হয়তো একদিন আমরা দুজনে মিলে এক হয়ে যাব, হয়তো একদিন আমরা দুজনে আলাদা হয়ে যাব। কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে, আমরা এক সাথে আছি দুই প্রেমিকের মতো, দুই শত্রুর মতো।
তুমি কি অনুভব করতে পারছো আমার হৃদয়ের স্পন্দন? আমার আত্মার আর্তনাদ? যদি পারো, তবে আমাকে জানিও। আর যদি না পারো, তবে এই চিঠিকে উড়িয়ে দিও বাতাসে। হয়তো কোথাও, কেউ একজন এটা পড়বে, আর বুঝবে দুঃখের সাথে ভালোবাসার কী অদ্ভুত খেলা।
তোমার অজানা,
এক ক্লান্ত আত্মা।
জাওয়াদের মনের প্রতিটি কোণ মুগ্ধতার রঙে রাঙা হয়ে ওঠে। কারো দুঃখের কথা শুনে কি কেউ এভাবে মুগ্ধ হয়?
সে আবার ছাদের দিকে তাকায়। কে ছিল সেখানে? কে লিখেছে এই হৃদয়স্পর্শী চিঠি? যার হাতের লেখা এত সুন্দর, যার কথার বুনন এত মনোমুগ্ধকর, সে কে? এত গভীর অনুভূতি, এত সূক্ষ্ম আবেগ, এ কি কোনো পুরুষের লেখা হতে পারে? জাওয়াদের মন বলে, এমন আবেগময় ভাষা, এমন সুন্দর প্রকাশভঙ্গি শুধুমাত্র একজন নারীরই হতে পারে। সে দ্রুত পায়ে ছাদে চলে যায়। পথে ললিতা তাকে ডেকে কথা বলতে চায়। জাওয়াদের কানে সেই ডাক পৌঁছায় না। তার সমস্ত মন জুড়ে তখন শুধু সেই অজানা লেখিকার চিন্তা। ছাদে পৌঁছে তার আশা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ছাদ ফাঁকা, কেউ নেই সেখানে। শুধু সন্ধ্যার হালকা বাতাস বইছে আর দূরের আকাশে তারারা একে একে জ্বলে উঠছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………