মানুষের জীবনে নানান রকম লক্ষ্য থাকতে পারে। মৌনির জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো ,সুখে থাকা। অন্যের দুঃখের কারণ না হয়ে আপন গন্ডিতে নিজের মতো করে নিজের সুখের ভাবনা ভাবতেই সে ভালোবাসে। সেই সুখ ভাবনায় দ্বিতীয় কারো অস্তিত্ব থাকে না।
‘যার যার সুখের চিন্তা যার যার নিজস্ব ভাবনা। সেই ভাবনা ভাবার দায়িত্বও তার। কেউ বাইরে থেকে সে ভাবনা ভেবে দিতে পারে না। ’
জীবন সম্বন্ধে এমনই তার বিশ্বাস। বোধ করি সেজন্যই অন্যের দুঃখে সে ব্যথিত হলেও তাদের জীবন নিয়ে অতো ব্যস্ত হয়ে চিন্তা করতে বসে না। বাঙালী মায়েদের মতো হুট করে চোখে জলও আসে না। নিজের এমন হৃদয়হীনতায় মাঝে মাঝেই খুব অপ্রস্তুতবোধ করে মৌনি। আজও সে যথেষ্ট তটস্থ হয়ে বসে আছে। শাওনের আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় মাতুল গোষ্ঠীজুড়ে তীব্র শোকের সয়লাব। মৌনির মা বোনের পুত্রের দুশ্চিন্তায় শয্যা নিয়েছেন। দানাপানি বন্ধ। শাওন মৌনির ভালো বন্ধু। তার আকস্মিক এই সিদ্ধান্তে মৌনি নিজেও কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছে। কিন্তু মায়ের মতো তীব্র দুঃখ তার আসছে না। শাওন নাবালক ছেলে নয়। সে একেবারে অকারণে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে বলে মৌনির বিশ্বাস হয় না। শাওনের সঙ্গে মৌনির শেষ যেদিন কথা হয়েছিল সেদিন শাওন ঠাট্টা করে বলেছিল , পরশু সে চলে আসবে। সেই আসা যে সত্যিকারের আসা তখন একদমই বুঝতে পারেনি মৌনি। তার অর্থ কী এই নয় যে, শাওনের এই সিদ্ধান্ত পূর্বপরিকল্পিত? কিন্তু কেন? চলেই যদি আসবে তাহলে পড়াশোনায় ক্ষতি করে ওখানে যাওয়া কেন? প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হলেও চুপ করে থাকে মৌনি। জানে, এর উত্তর স্বয়ং শাওন ছাড়া আর কারো পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। মৌনি চাইলে শাওনকে টেলিফোনে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেরকম কোনো চেষ্টা করতেও ইচ্ছে করছে না। কে জানে, হয়ত শাওন এই ব্যাপারে আলোচনা করতে প্রস্তুত নয়। মৌনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাওনের ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল। ছেলেটাকে নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য কিছু সময় দেওয়া যাক।
শাওনের ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার পর মৌনি বসল তার বৈষয়িক চিন্তা নিয়ে। অন্যান্য ছেলেমেয়েদের তুলনায় মৌনিদের জীবন আলাদা। বেচেঁ থাকার মৌলিক চাহিদা থেকে শুরু করে নিজেদের ছোটবড় সকল শখ পূরণের দায়িত্বও তাদের বয়ে বেড়াতে হয় নিজের কাঁধে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মৌনির বহুমুখী পরিচিতি আছে। আঁকিবুঁকি, কার্টুন, বই সমালোচনা, লেখালেখি সব মিলিয়ে সে এক হুলস্থুল! এই সকল শখের ভিডিয়ো ধারণ করতে মৌনির দরকার ভালো মানের একটা ক্যামেরা। আপাতত একটা প্যানাসনিক লুমিক্স JSTOO কিনতে পারলে সুবিধা হতো। কিন্তু মৌনির হাতে পয়সা নেই। পেইজ-ইউটিউব চ্যানেল থেকে আসা পয়সা, খবরের কাগজে টুকটাক লেখালেখি, একটা-দুটো প্রচ্ছদ আঁকা, সংবাদপত্রের ফিচার লেখা, কাগজে রম্য কার্টুনের ফরমায়েশ ঠেলা কতকিছুই তো করে মৌনি। তারপরও মাস শেষে একটা কড়ি পর্যন্ত বাঁচে না। বেশিরভাগ সময়ই মাসের শেষে মৌনির হাতে চায়ের পাতি কেনার মতো পয়সাও থাকে না। সেখানে ষাট সত্তর হাজার টাকা দিয়ে ক্যামেরা কেনা বিলাসিতা। অথচ মৌনির বাবা হাল আমলের আলোচিত ব্যবসায়ী। মেয়েকে তিনি চাইলেই সোনার প্রাসাদ গড়ে দিতে পারেন। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো বাবা তাকে এক প্যাকেট চা পাতি কেনার পয়সাও দেবেন না। বাবা দিলেই যে মৌনি নিবে তেমনও নয়। কলেজের গন্ডি পেরুনোর সাথে সাথে দাদাজান তাদের ফেলে দিয়েছেন বাস্তবতা নামক এক আশ্চর্য সমুদ্রে। এই সমুদ্রে মা-বাবা, বটছায়া বলে কিছু নেই। এখানে ভেসে বেড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে কেবল দুটো অস্ত্র — পরিশ্রম আর আত্মসম্মান। তারা প্রত্যেকেই প্রতিনিয়ত হারে, জিতে, অভিজাত পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও মাসের শেষে প্রয়োজনে না খেয়ে থাকে কিন্তু দাদাজানের দেওয়া ওই মন্ত্র, ওই তেজ — কভু মাথা নোয়াবার নয়। এই মন্ত্র তারা ভুলে যেতে পারে না। মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মাসটা সম্ভবত তার খুব টানাটানিতে কাটবে৷ হাতে অজস্র কাজ থাকলেও সে হঠাৎ আবিষ্কার করেছে, কোনো কাজেই তার মন লাগছে না। সৃষ্টিশীল কোনো ভাবনা ভাবতে পারছে না। শব্দ, রং-তুলি সব যেন তাকে ছেড়ে যাত্রা করেছে বহুদূরের পথে। মৌনি একবার ভেবেছিল, সবসময় কাজ করতে হবে এইরকম তো কোনো কথা নেই। কয়েকটা দিন নাহয় বই পড়ে কাটিয়ে দেওয়া যাক। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার বইপোকা খ্যাত মৌনির বইয়ের দিকেও মন টানছে না। মাস্টারপিস সব বইগুলোর একটি দুটো পৃষ্ঠা উল্টিয়ে সরিয়ে রাখছে চোখের সামনে থেকে। মৌনি হতাশ চোখে কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সিদ্ধান্ত নিল, আজ সারাদিন সে শহর ঘুরে বেড়াবে। ইজেল- ক্যানভাস থাকবে সঙ্গে। নতুন কিছু, অনুপম কিছু চোখে পড়লেই চট করে তুলে আনবে ক্যানভাসে। এভাবে যদি কল্পনাশক্তির কিছু কিছু আবার ফিরিয়ে আনা যায়!
মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে মৌনি বেরিয়ে পড়ল তার হন্টন কার্যে। হাঁটতে হাঁটতে পৃথিবী পাড়ি দিয়ে ফেলার মতো একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারলে ভালো হতো৷ সেটা যেহেতু সম্ভব নয় আপাতত মতিঝিলের দিকে যাওয়া যেতে পারে। মৌনি মাথায় নানান কল্প কাহিনি নিয়ে হেঁটে চলল। নিরুদ্বেগ, উদাস তার হেঁটে চলার ভঙ্গি। ফার্মগেইট থেকে পান্থপথের কাছাকাছি আসতেই খেয়াল করল কেউ একজন তার পাশাপাশি হাঁটছে। মৌনি আনমনে পাশ ফিরে তাকাতেই আগুন্তকঃ তার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসল। মৌনি আচমকা থেমে গেল। অবাক বিস্ময় নিয়ে কয়েক সেকেন্ড আগুন্তকের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রায় চিৎকার করে উঠল,
‘ শাওন!!’
শাওনের হাসি আরও বিস্তৃত হলো। মৌনি গলার স্বর একই রেখে বলল,
‘ দুনিয়ার সবাইকে দুশ্চিন্তায় ফেলে তুমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হাসছ! ফাজিল ছেলে, লজ্জা করছে না?’
ডিফেন্সের ট্রেনিং করে সকলেই রোগা পাতলা হয়। শাওনকে দেখে মনে হলো তার স্বাস্থ্য আগের থেকে আরও ভালো হয়েছে। চোখের কোলে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ থাকলেও ঠোঁটে বরাবরের স্বতঃস্ফূর্ত হাসি।
‘ লজ্জা লাগতো না। তবে তোমাদের সকলের অবস্থা দেখে কিছুটা লজ্জা লাগছে। বাড়িটা আত্মীয় স্বজনে উপচে পড়ছে। মা-খালামণিরা দিনরাত গুনগুনিয়ে কাঁদছেন। এতো নাটকের কোনো দরকার আছে বলো তো? এদের দেখে মনে হচ্ছে কত ভয়ংকর পাপই না করে বসেছি৷’
মৌনি চোখ গরম করে তাকাল। কৃত্রিম শাসানি দিয়ে বলল,
‘ পাপের থেকে কম কিছু? সত্যি করে বলো, কোন মেয়ের প্রেমে পড়ে এই আকাম করেছ? কার জন্য একেবারে “তাকে ছাড়া বাঁচে না পরাণ’’ টাইপ অবস্থা! হু হু?’
শাওন ফাজলামো করে বলল,
‘ কেন? তোমার জন্য।’
মৌনি প্রত্যুত্তরে চোখ গরম করে তাকাল। শাওন হেসে বলল,
‘ এমন “চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগণে বাজে বাদল” হাবভাব নিয়েই বা যাচ্ছ কোথায়? আমি তোমার বাসার দিকেই যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে তোমাকে পেলাম। সেই ফার্মগেইট থেকে ফলো করছি অথচ টেরই পেলে না!’
মৌনি এবার হতাশ নিঃশ্বাস ফেলল। মুখে আঁধার নামিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
‘ শব্দ হারিয়ে ফেলেছি। রঙ, তুলি, এক টুকরো আগ্রহ, দুটো রঙিন কল্পনা সব এক সঙ্গে উধাও। তাই ভাবলাম, পথে পথে খুঁজে দেখি। ওদের খুঁজতে গিয়ে তোমাকে পেয়ে গেলাম। চলো কোথাও বসি। দু’মাস হয়েছে গিয়েছ অথচ মনে হচ্ছে বহুদিন পর দেখা।’
শাওন অসম্মতি জানিয়ে বলল,
‘ বসব না। তোমার পরিকল্পনা বদলানোর দরকার নেই। চলো হাঁটি। দেখি, তোমার শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় কি-না!’
মৌনি হাসল। বহুদিন পর সেই পুরোনো দিনের মতো পাশাপাশি হেঁটে চলল দু'জন। এতোদিনের জমিয়ে রাখা সমস্ত কথারা যেন মুক্ত হতে লাগল ধীরে ধীরে। পথচারী, যানবাহন, গন্তব্য সব ভুলে ওরা কেবল মজে রইল নিজেদের গল্পে। এতো কীসের গল্প ওদের ছিল কে জানে? তবে এতটুকু সময়ে মৌনির বারান্দায় ফোটা হলুদ গোলাপের চারাটাতে এ পর্যন্ত ক'টা ফুল ফুটল সে তথ্যও জানা হয়ে গেল শাওনের৷ জানা হয়ে গেল, তার প্রিয় বন্ধুর প্রেমের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা। এই দুই মাসে ঢাকা শহরে মোট ক'দিন বৃষ্টি হলো। ঠিক কোনদিন মৌনি আনন্দ নিয়ে বৃষ্টিস্নান করেছিল। জীবনের সমস্ত হতাশা থেকে শুরু করে দেশের ট্রাফিক, রাজনীতি, ইতিহাস, সিনেমা কোন বিষয়টা বাদ গেল তাদের? কলকলে নদীর মতো প্রাণবন্ত এক সুর ওদের ঘিরে রাখল গোটা সময় ধরে। হাঁটতে হাঁটতে রমনা পার্কের এক বেঞ্চিতে এসে বসল ওরা। মৌনি তার পিঠের ভারী ব্যাগটা বেঞ্চের উপর নামিয়ে রেখে পা দোলাতে দোলাতে বলল,
‘ কতটা পথ চলে এসেছি অথচ বুঝতেই পারিনি! তোমার সাথে হাঁটলে গল্প করতে করতে পৃথিবী পাড়ি দিয়ে ফেলা যাবে শাওন।’
প্রত্যুত্তরে একটুখানি হাসল শাওন। রমনায় যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানো এক ছেলেকে ডেকে দুটো কদম কিনল। ফুলদুটো মৌনির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘ কদমও আমার মতো গুবলেট করে ফেলেছে দেখো। বর্ষায় আসার কথা বৈশাখেই এসে হাজির।’
মৌনি ফুলদুটো হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। কানের পাশে গুঁজে নিতে নিতে বলল,
‘ কদম জানে মৌনি তার জন্য অপেক্ষা করছে। মৌনি ভালোবেসে ডাকবে আর কদম আসবে না, তাই কী হয়?’
কথা শেষ করেই গুনগুনিয়ে গান ধরল মৌনি,
‘ যদিও তখন আকাশ থাকবে বৈরী।
কদম গুচ্ছ হাতে আমি তৈরি…’
শাওন মুগ্ধ চোখে চুলে কদম গুঁজতে থাকা অপরূপার দিকে তাকিয়ে রইল। মৌনি চুলে ফুল গুঁজা সমাধা করে শাওনের দিকে তাকাল। চোখের কাজলে কিছুটা চিন্তা মেখে সে শুধাল,
‘ এইবার ঝেড়ে কাঁশো তো। ঘটনা কী? ট্রেনিং থেকে ওভাবে চলে এলে কেন শাওন? ইজ এভ্রিথিং অলরাইট?’
শাওন দুষ্টু হেসে বলল,
‘ তুমি ডাকলে বলেই তো এলাম, মন। একদম ওই কদম ফুলের মতো।’
প্রত্যুত্তরে চোখ গরম করে তাকাল মৌনি। শাওন সেই চাহনিতে হেসে ফেলে এবার গম্ভীর হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উদাস গলায় বলল,
‘ খুব প্যারা খাচ্ছিলাম। টিকতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল বাড়ি না ফিরতে পারলে দমবন্ধ হয়ে মারা যাব। আর কিছু ভাবতেই পারছিলাম না তখন৷’
মৌনি গাঢ় মমতা নিয়ে তাকাল এবার। শাওন প্রেয়সীর মমতামাখা চোখে আরও একটু দরদ পেতেই কি-না কে জানে? অসহায় কণ্ঠে বলল,
‘ আর এখন কেমন দিশেহারা লাগছে। সবাই যা শুরু করেছে!’
মৌনি অবাক হয়ে বলল,
‘ এতো দিশেহারা হয়ে যাওয়ার মতো কী হয়েছে? তুমি এখনও তোমার ক্যারিয়ার গ্রোথ করতে পারো শাওন। আর্কিটেকচার নিয়ে পড়ছিলে। যেখান থেকে ছেড়েছ সেখান থেকে আবার শুরু করবে। এক সেমিস্টারও লস যায়নি। তোমার রেজাল্ট ভালো। ফটাফট গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে দেশের বাইরে চলে যাবে। লাইফ স্যাটেল। এতো দুশ্চিন্তার কী আছে? শুধু সমস্যা একটাই মধ্যে থেকে একটা গুবলেট করে বসলে। ভবিষ্যতে এটা নিয়ে একটু ক্যাচাল পোহাতে হবে। তবে এটাও সট আউট করে ফেলা যাবে। জীবন তো এমনই। এই ভালো এই খারাপ। এতো প্যারা নেওয়ার কী আছে? জীবনে আপস্ এন্ড ডাউনস্ না থাকলে সে কী আর জীবন হলো, বন্ধু?’
শেষ কথাটা বলে শাওনের দিকে তাকিয়ে হাসল মৌনি। শাওন প্রত্যুত্তরে আনমনা হয়ে বসে রইল। শাওনকে এমন আনমনা বসে থাকতে দেখে কোথাও একটা খুব মায়া হলো মৌনির। শাওনের দিকে একটু সরে বসে গভীর মমতায় একটা হাত রাখল তার কাঁধে। বালক ছেলেকে প্রবোধ দিচ্ছে এই ভঙ্গিতে কয়েকবার চাপড় দিল তার পিঠে। আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল,
‘ কেন অযথা এতো দুশ্চিন্তা করছ বলো তো? সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো। সব। আমি বলছি। ট্রাস্ট মি।’
শাওন এবার চোখ তুলে মৌনির দিকে তাকাল। চোখে তার প্রবল বিস্ময়। এই দীর্ঘ বাইশ বছরের বন্ধুত্বে, নারী-পুরুষ বোধ তৈরি হওয়ার পর এই প্রথম মৌনি তাকে একটুখানি ছুঁয়ে দিল। এই সামান্য ছোঁয়া যে শাওনের জন্য কতটা স্বর্গীয়! কতটা অসামান্য! মৌনি নিজের মতো করে বলে চলল,
‘ আচ্ছা শাওন? একাডেমিতে আবার ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তোমার মতামত কী? বাবার কাছে শুনেছিলাম, ইফ ইউ গো ব্যাক এন্ড এডমিট ইউর গিল্ট দেন…’
‘ দেন?’
‘ তাহলে ব্যাপারটা খুব কঠিন হবে না শাওন। মার্শাল কোর্ট হবে। বিচার হবে। এই একটুখানি শাস্তি পাবে। তারপর সব স্যাট। হাও এবাউট দিস?’
শাওন মৌনির ফুলো ফুলো ভাবুক গালের দিকে তাকিয়ে হাসল। শুধাল,
‘ একটুখানি শাস্তি?’
মৌনিও হাসল। এক চোখ বন্ধ করে দুই আঙুলের ডগা একসাথে করে বলল,
‘ এইতো একটু বেশি শাস্তি।’
এইবার শব্দ করে হেসে ফেলল শাওন। মৌনি বলল,
‘ তোমার কাছে কোনটা বেশি কমফোর্টেবল মনে হচ্ছে শাওন? ফিরে যাওয়া নাকি একটু কমপ্লেক্স সামলে স্টাডি কমপ্লিট করা? দুটোতেই সামান্য ঝামেলা আছে। কিন্তু তাতে ক্যারিয়ার ধ্বংস হওয়ার মতো কিছু হয়ে যায়নি। এবার তোমার মন যা চায় তুমি সেটাই সিলেক্ট করো। অবশ্যই মন যা চাইবে তাই৷ কোনো জোরজবরদস্তি নেই৷ তুমি চলে আসার পর আমি জানলাম ইশরাক ভাই, আমার বড় চাচার ছেলে, যশোরের বিমান বাহিনী একাডেমিতে কর্মরত আছেন। এয়ার মার্শাল ইশরাক মেহবুব।’
শাওন প্রত্ত্যুত্তরে কিছু বলল না। মৌনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে কোমল কণ্ঠে বলল,
‘ শাওন? আমার মনে হচ্ছে, ওখানে ফিরে যাওয়াই তোমার জন্য ভালো হবে। একটু শাস্তি নাহয় ভোগ করলে। নাহয় কিছু অর্থদন্ড হলো। কয়েক মাস কারাদন্ডে থাকতে হলো। পরিশ্রমটা নাহয় একটু বেড়ে গেল। কিন্তু দেখবে দেখতে দেখতে তিনটা বছর কেটে যাবে। তারপরের জীবনটা অন্যরকম। আর ট্রেনিংয়ের এক বছরের মাথায় তো নিয়ম কিছুটা শিথিল হয়ে আসে। তুমি তখন এখনের থেকে বেশি কথা বলতে পারবে বাড়িতে। তোমার একটুও মন খারাপ হবে না দেখো? আমার মনে হচ্ছে, তুমি এবার ফিরে গিয়ে ট্রেনিং-এ সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে। কষ্টটা একটু অসহনীয় হবে। কিন্তু তুমি পারবে। আমি জানি, তুমি পারবে। আমার তোমার উপর বিশ্বাস আছে শাওন।’
বৈশাখের মেঘলা দুপুরে মৌনির বিশ্বাসে ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে শাওনের মনে হলো, সে আসলেই পারবে। মৌনির বিশ্বাসের জোরে সে এই সমগ্র পৃথিবীটাই বোধহয় একদিন জয় করে ফেলতে পারবে। মৌনি শাওনের ফোনটা নিয়ে দ্রুত একটা নাম্বার তুলে শাওনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘ এটা ইশরাক ভাইয়ের নাম্বার। তোমার যদি ইচ্ছে হয় তাহলে কথা বলো। ভাইয়া তোমাকে ভালো সাজেশন দিতে পারবেন। আর যদি ইচ্ছে না হয় তাহলে কথা বলার প্রয়োজন নেই।’
শাওন হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিতেই মৌনি চোখে-মুখে দার্শনিক ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
‘ জীবন একটাই। এই এক জীবনে অনিচ্ছায় পড়ে কোনো কাজ করা যাবে না। না মানে না।’
তারপর আচমকা প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
‘ এই? বাদাম খাওয়াও না?’
শাওনের কাঁধে তখনও কোমল ওমের মতো ল্যাপটে আছে মৌনির সেই ছোঁয়া। সেই উষ্ণ স্পর্শে এখনও কেমন বিবশ লাগছে দেহ। চারদিকে এক অন্যরকম ঘোর। শাওন কলের পুতুলের মতো ফোনটা পকেটে রেখে হাতের ইশারায় এক বাচ্চাকে ডেকে বিশ টাকার বাদাম কিনল। বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে যথাসাধ্য স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
‘ নিজের সকল ইচ্ছে পূরণ করা উচিত বলছ? কিন্তু তুমি তো আমার একটা ইচ্ছে এখনও পূরণ করলে না মন?’
মৌনি ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল,
‘ আমার কাছে তোমার কোন ইচ্ছে?’
' এইযে এতো বছর ধরে বলার পরও, তুমি এখনও আমার একটা ছবি এঁকে দিলে না।'
মৌনি মুখ গম্ভীর করে বলল,
‘ তোমার থিওরিটা বুঝতে ভুল হয়েছে শাওন। আমি বলেছি, সকলের তার নিজ নিজ ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত৷ একজনের ইচ্ছে পূরণের দায় আরেকজনকে নেওয়ার কথা বলিনি৷ তোমার ইচ্ছে পূরণ করতে গিয়ে যদি আমার ইচ্ছে ক্ষুণ্ণ হয় তাহলে তো সমস্যা৷ এই শহরে নানান ধরনের মানুষ আছে। এদের মধ্যে কারো যদি ইচ্ছে জাগে, সে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে। তাহলে আমি নিশ্চয় উড়ে উড়ে তার ইচ্ছে পূরণ করতে চলে যাব না?’
শাওন নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করে বলল,
‘ আমি তো আর তোমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে চাইনি। তুমি চিত্রশিল্পী। চিত্রশিল্পী বন্ধুর কাছে একটা ছবি এঁকে চাওয়া বন্ধু হিসেবে আমার খুবই নিষ্পাপ আবদার৷ তুমি নিষ্ঠুর। এই নিষ্পাপ আবদারটা মেটাচ্ছ না৷ এমনিতেই আমার এতো দুঃখ!’
মৌনি চোখ ছোট ছোট করে শাওনের দিকে তাকাল। বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ দুনিয়াতে তোমার একারই দুঃখ আছে আর কারো দুঃখ নেই এমন ফলিশ ভাবনা ভাববে না তো শাওন।’
পরমুহূর্তেই হতাশ কণ্ঠে বলল,
' আমি পারলে তোমার ছবি নিশ্চয় এঁকে দিতাম। কিন্তু কার্টুন আঁকা আর মুখের স্কেচ আঁকা এক নয় শাওন। আমি একদমই ভালো আঁকতে পারি না।'
শাওন অভিমানী কণ্ঠে বলল,
' বাহানা দিও না মন। আসল কথা তুমি আমার ছবি আঁকতেই চাও না। সত্যি বলতে সমস্যা কোথায়? এমনিতেও তো মুখের উপর ঠাস ঠাস করে সত্য কথা বলে ফেলো।'
মৌনি হতাশ চোখে তাকাল। শাওনকে মুখ ভার করে বসে থাকতে দেখে বলল,
' আচ্ছা যাও। তোমার একটা ছবি পাঠিয়ে রাখো। আমি আঁকার চেষ্টা করব। ভালো হলে দিব নয়তো ভুলে যাও।'
শাওন খুশি হয়ে বলল,
' ছবি দেখতে হবে না। আমাকে সরাসরি দেখে আঁকো।’
মৌনি অবাক হয়ে বলল,
‘ এখন!’
‘ হ্যাঁ, এখন৷ তোমার তো এখন কোনো কাজ নেই। আমিও ফ্রী। এখানে বসে থাকতে ভালো লাগছে। ইজেল, ক্যানভাসও তো তোমার সাথেই আছে। আঁকতে আঁকতে আড্ডা দেওয়াও হয়ে যাবে।'
মৌনি মুখ গম্ভীর করে বলল,
' আড্ডা দেওয়া হবে না। আঁকার সময় কেউ কথা বললে আমি আঁকতে পারি না।'
শাওন উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল,
' ওকে ফাইন। কথা বলব না। তার মানে তুমি আঁকছ?'
মৌনি নিজেকে আশ্চর্য করে দিয়ে রাজি হলো। তার আগে খুব শাসিয়ে বলল,
' কিন্তু তুমি একদম ক্যানভাসের এপাশে উঁকিঝুঁকি দেওয়ার চেষ্টা করবে না শাওন। যদি আঁকতে পারি তাহলে দেখাব নয়তো ফোর্স করাও চলবে না।'
শাওন দুই হাত তুলে স্যারেন্ডারের ভঙ্গি করে বলল,
' এজ ইউ কমান্ড, ম্যাডাম।'
মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইজেল-ক্যানভাস ঠিক করে আঁকতে বসল। ঘন্টা খানেক পর মুখের স্ট্রাকচারটা মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেলে চোখের ডিটেইলে মনোযোগ দিল মৌনি। চোখের ফিনিশিং-এ এসে সমগ্র মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে ভয়ানক চমকাল সে। অদ্ভুত এক বিবশতা নিয়ে সে দেখল, ক্যানভাসে আঁকা চোখদুটোতে ফুটে উঠেছে নিষ্পাপ এক মুগ্ধতা। সমুদ্রের মতো গভীর সে চোখে ঢেউয়ের মতো ভাসছে চাপা হাসি। সেই সঙ্গে ভাসছে সুতীব্র এক তৃষ্ণা আর মুগ্ধতার আনন্দ। মৌনি ক্যানভাস থেকে চোখ তুলে চট করে একবার তাকাল শাওনের দিকে। ছবিতে এতো নতুন, এতো অন্যরকম লাগছে শাওনের দৃষ্টি। মৌনি কী এর আগে কখনও শাওনের চোখের দিকে তাকায়নি? শাওন তখন একমনে মোবাইল ঘাটছে। মৌনি তাকে ডাকল,
‘ শাওন?’
শাওন আনমনে চোখ তুলে তাকিয়ে শুধাল,
‘ হু?’
মৌনি উত্তর দিল না। নীরবে তাকিয়ে রইল শাওনের চোখের দিকে। শাওনের দৃষ্টি এখন স্বাভাবিক। যেমনটা থাকে সচরাচর। কিন্তু এই ছবিতে? এই ছবিতে শাওন অন্যরকম। উন্মুক্ত, বেপরোয়া প্রেমিক। চোখদুটোতে তার সর্বহারা দৃষ্টি। ছবি আঁকার ব্যস্ততায় মৌনি তখন খেয়াল না করলেও এখন তার মনে পড়ছে ছবি আঁকার সময়টাতে ঠিক এভাবেই প্রবল মুগ্ধতা নিয়ে তাকে দেখছিল শাওন। এতো গভীরভাবে, এতো আকুলতা নিয়ে আর কেউ কোনোদিন তাকায়নি তার দিকে। মৌনির বুকের ভেতর অদ্ভুত এক হাওয়া বয়ে গেল। মৌনিকে ওভাবে আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিঞ্চিৎ চিন্তিত হলো শাওন। ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় শুধাল,
‘ কী হয়েছে?’
মৌনি উত্তর দিল না৷ মুখ গম্ভীর করে আবারও আঁকায় মনোযোগ দিতেই খেয়াল করল, শাওন ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে আবারও আগের মতোই তাকিয়ে আছে তার দিকে। পৃথিবীর সবথেকে চমৎকার দৃশ্য দেখার মতো আনন্দ তার চোখে মুখে। মৌনিকে আড়চোখে তাকাতে দেখে শাওন একদম অন্যরকম কণ্ঠে বলল,
‘ তুমি ভীষণ সুন্দর মৌনি! একদম… একদম প্রকৃতির মতো সুন্দর।’
মৌনি এবার আঁকা থামিয়ে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল। শাওনের চোখে কী প্রবল ঘোর! যেন কোথাও একটা হারিয়ে ফেলেছে তার সমস্ত চেতনা। বুদ্ধি। মূল্যবোধ। বৈশাখের ধূসর গোধূলিতে দু'জনের চোখে চোখ পড়ল। কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে থাকার পর শাওনের দৃষ্টির ওই সরল মুগ্ধতা মৌনির কোথাও একটা প্রচন্ড ধাক্কা দিল। খোলে গেল দ্বার। হৃদয়ের অলিগলিতে হুড়মুড় করে ঢুকে গেল বসন্তের হাওয়া। যেন আশেপাশে আর কেউ নেই। কেবল তারা দুটো প্রাণ। একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে ক্লান্তিহীন, অবিশ্রাম। শাওন একসময় বিমুঢ় কণ্ঠে বলল,
‘ সেদিন তোমার ওই সিআর মাহিমের গল্প শুনতে আমার একদম ভালো লাগেনি মৌনি। তোমার প্রতি মুগ্ধ হওয়া কোনো পুরুষের গল্প শুনতেই আমার ভালো লাগে না। তুমি কারো প্রতি মুগ্ধ হয়েছ সে গল্প শুনতেও ভালো লাগে না। তাদের সবাইকে আমি ঘৃণা করি। আমি জানি এটা উচিত না, তারপরও এই পৃথিবীর যে পুরুষই তোমাকে ভালোবাসবে আমি তাকেই আজন্ম ঘৃণা করব। তোমার ভবিষ্যৎ বরকেও ঘৃণা করব। নাহিদ, ইশতিয়াক, আরিফ, দিব্য তোমার কোনো ভাইয়ের কথাও আমাকে বলবে না মন। আই অলসো হেট দেম।’
মৌনি হেসে ফেলল। আবারও ক্যানভাসে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
‘ তুমি এতো পাগল কেন শাওন?’
শাওন দুর্বল কণ্ঠে বলল,
‘ তুমি এতো আদর কেন মন?’
মৌনি উত্তর দিল না। কথাটা না শোনার ভান করে গুটিয়ে ফেলল ইজেল-ক্যানভাস। ঠোঁট উল্টে বলল,
‘ আজ আর আঁকতে ইচ্ছে হচ্ছে না শাওন৷ চলো, তোমাকে ফুচকা খাওয়াই। বহুদিন ফুচকা খাওয়া হয় না।’
এতক্ষণে এই গাঢ় আবেশ থেকে বেরিয়ে এলো শাওন। আচ্ছন্ন কল্পনা থেকে বেরিয়ে বাস্তবতায় ফিরে এসে কিছুটা হকচকিয়ে গেল। এতক্ষণ কী বলেছে, কী করেছে কিছুই ঠিক করে খেয়াল নেই তার। মৌনি ক্ষেপে গিয়েছে কি-না বুঝার জন্য একবার আড়চোখে তার দিকে তাকাল। মৌনির মুখের ভাব বুঝতে না পেরে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
‘ ইট'স ওকে মন। প্রেশার নেওয়ার দরকার নেই। বাকিটা তুমি অন্যদিন এঁকো।’
মৌনি প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। ব্যাগ গুছিয়ে ওরা কিছুদূর হেঁটে একটা ফুচকার ভ্যানের কাছে গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ বাদেই ঈশান কোণ অন্ধকার করে নামল বৈশাখী বর্ষণ। শাওন-মৌনির কেউই কোনো ছাউনি খুঁজতে উঠল না। মৌনি বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই অবশিষ্ট ফুচকা শেষ করল। তারপর আগলা চুলে নীরবে বসে রইল আকাশ পানে মুখ করে। বৈশাখের ঠান্ডা জলে ভিজল তার মেঘবরণ কেশ। কানে গুঁজা কদম। সোনারঙা মুখ। পুরুষ্ট ঠোঁট। সেদিকে তাকিয়ে শাওনের কণ্ঠ শুকিয়ে গেল। বৃষ্টির শীতল স্পর্শে তার বুকের ভেতর পুষে রাখা খা খা তৃষ্ণা আরও গাঢ়, আরও তীব্র হলো। আকাশ পানে মুখ করে রেখেও মৌনি টের পেলো সেই সর্বহারা দৃষ্টি। এই দৃষ্টি এতোদিন কোথায় ছিল? শাওন কী আগেও তার দিকে একই রকম তাকাতো? কই, আগে তো খেয়াল করে দেখেনি। মৌনির এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই আশ্চর্য মুগ্ধ চোখদুটোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য হলেও এই ছেলেটিকে তার ভালোবেসে ফেলা উচিত। এই সুন্দর পৃথিবীতে এই অপার্থিব প্রেমদের বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন।
·
·
·
চলবে……………………………………………………