দেওয়াল ঘড়িতে এগারো কি বারোটা বাজে। নিঝুম রাত। সন্ধ্যা থেকে টানা বর্ষণের পর প্রকৃতি এখন কিছুটা শান্ত। রাতের অল্প আলোয় লনের পথটা চকচক করছে জলে। কোথাও আবার কাদা হয়ে আছে। মিথি কাদা হয়ে থাকা পথটুকু পেরিয়ে এলো খুব সাবধানে। সারাদিনের বর্ষণে ধুয়েমুছে গিয়েছে গ্রীষ্মের গরম। নারকেল গাছের মৃদু দুলনিতেও কেমন শীত শীত করছে। মিথি খুব সাবধানে দরজায় চাবি দিল। সাব্বিরের ছোট্ট বসার ঘরে তখনও অল্প আলো জ্বলছে। রোজই জ্বলে। একে অপরের সঙ্গে দিনের পর দিন দেখা না হলেও, বাক্যবিনিময় না হলেও এই আলোটুকু সাব্বির রোজ মধ্যরাত পর্যন্ত জ্বালিয়ে রাখে। এই আলো দিয়েই বোধকরি সে মিথিকে তার অস্তিত্বের কথা জানাতে চায়। রাতে বাড়ি ফিরে আলো নেভানো দেখলেই মিথি বুঝে যায়, সাব্বির শহরের বাইরে। বাড়িটা আজ শূন্য।
মিথি খুব সাবধানে নিজের পাম্প শু জোড়া খুলে রাখল। সাব্বিরের শোবার ঘরের দরজাটা বেড়ানো। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। পাছে সাব্বিরের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে এই শঙ্কায় খুব হালকা পায়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল মিথি। শোবার ঘরের দরজার কাছাকাছি আসতেই মিথিকে চমকে দিয়ে খুন্তি নাড়ার আওয়াজ ভেসে এলো রান্নাঘর থেকে। মিথি হাতঘড়িতে সময় দেখে ভ্রু কুঁচকে একবার রান্নাঘরের দিকে তাকাল। হাতের ব্যাগ, নানান ডকুমেন্টস ফাইল সঙ্গে নিয়েই সে এগিয়ে গেল কৌতূহল নিবৃত্ত করতে। রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে উঁকি দিতেই দেখল চুলোয় কড়াই বসিয়ে সেদিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে সাব্বির। চোখে-মুখে কী অপরিসীম সারল্য! মিথি সেই মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারল না। কৌতুহলী কণ্ঠে শুধাল,
‘ এতোরাতে রান্নাঘরে কী করছেন, সাব্বির সাহেব?’
সাব্বির ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। সুইস কটনের একটা ঢিলেঢালা শার্ট জড়িয়ে আছে মিথির মেদহীন, পেলব শরীরে। তার সঙ্গে সফেদ লেডিস প্যান্ট। অনাবৃত পা। মাথার উপর এলোমেলো করে বাঁধা চুড়ো খোঁপার নিচে ঢলঢলে মুখখানা ক্লান্ত, বিষণ্ণ। সেই লাবণ্যময়ী মুখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু জোড়া শিথিল হয়ে এলো সাব্বিরের। মুখে অনাবিল হাসি নিয়ে বলল,
‘ খিচুড়ি রাঁধছি মিথি।’
‘ খিচুড়ি!’
চোখ কপালে উঠল মিথির। হাতঘড়িতে আরও একবার সময় দেখে নিয়ে বলল,
‘ এতোরাতে খিচুড়ি দিয়ে কী হবে!’
সাব্বির একবার মিথির দিকে তাকাল। আজ মিথির চোখে সেই দিনের মতো ঘৃণা নেই দেখে কিছুটা স্বস্তিবোধ করল। মিথিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে দেখে অস্ফুট আনন্দ নিয়ে বলল,
‘ বুয়া আসেনি আজ। ভেবেছিলাম ফেরার সময় খাবার কিনে আনব। কিন্তু এতো বৃষ্টির মধ্যে খাবারের কথা খেয়াল ছিল না। এখন এতো ক্ষুধা পেয়েছে! আপনিও নিশ্চয় ক্ষুধার্ত? নাকি বাইরে থেকে খেয়ে এসেছেন?’
পাছে মিথি বাইরে থেকে খেয়ে ফেরার কথা বলে বসে এই ভয়েই যেন একটু তড়িৎ কণ্ঠে বলল,
‘ আমি আপনার জন্যও রান্না বসিয়েছি।’
মিথি রান্নাঘরের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেভাবেই সাব্বিরের দিকে গভীর চোখে তাকাল। সাব্বির আর বৃষ্টির ব্যাপারটা নিয়ে সেদিনের পর অনেক ভেবেছে মিথি। সাব্বিরের জীবনে মিথির আগমনের আগেই বৃষ্টির আগমন হয়েছে। তাদের বিয়ের আগেই যদি তারা একে-অপরের প্রণয়প্রার্থী হয়ে থাকে, তাহলে দাদাজানের জবরদস্তিতে মিথিই তাদের প্রেমের অন্তরায়। বৃষ্টির জায়গায় নিজেকে রেখে ভাবলে, একজন প্রেমিকার জন্য বিষয়টা বড় মর্মান্তিক। ঠিক ততটাই মর্মান্তিক সাব্বিরের জন্যও। হুট করে হয়ে যাওয়া বিয়েটা সাব্বিরের কাঁধে এজন্যই বোধহয় আরও ভারী। আরও দ্বিধার। হয়তো মিথির সাথে বিবাহবিচ্ছেদের পর বৃষ্টিকে বিয়ে করে নতুন সংসার বাঁধাই তাদের পরিকল্পনা। হয়তো এজন্যই এখনও তাদের যোগাযোগ আছে। সেই অধিকারেই বোধকরি সেদিন অসুস্থ সাব্বিরের ঘরে এসেছিল বৃষ্টি। স্ত্রী হিসেবে এ দৃশ্য খুব পীড়াদায়ক হলেও প্রেয়সীর জায়গায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি খুব একটা ভুল নয়। অসুস্থ সময়ে প্রিয় নারীকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্খাকেও বোধকরি খুব দোষ দেওয়া যায় না৷ মিথির মনের কোণে শঙ্খের মতো বেজে উঠল ইংরেজি একটি কোট, ‘Everything is fair in love and war.’ মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সহজ গলায় বলল,
‘ ধন্যবাদ, সাব্বির সাহেব। আমিও যথেষ্ট ক্ষুধার্ত।’
কথাটা বলে ফেলেই চমকাল মিথি। বৃষ্টির সাথে সাব্বিরের সম্পর্কের ব্যাপারটা নিজের মনে উলোটপালোট করার পর সাব্বিরের থেকে সহজ দূরত্ব বজায় রাখার কথাই ভেবেছিল মিথি। বৃষ্টি সাব্বিরের মনে থাকলেও সাব্বিরের চোখের কোথায় যেন বারবার নিজের প্রতিবিম্বই ভাসতে দেখে মিথি। সত্যটাকে ঠিক সত্য বলে ভরসা হয় না। এই ভাসাভাসি নিশ্চয় মিথির দুর্বলতার প্রতিফলন? এই ভাসাভাসি থেকে দূরে যেতেই মিথি ভেবেছিল, এবারও কৌশলে এড়িয়ে যাবে সাব্বিরকে। কিন্তু সাব্বিরের ওই সরল মুখের দিকে তাকিয়ে মিথির কণ্ঠনালি কী ভীষণ বেঈমানীই না করে বসল! অন্যদিকে মিথির সপ্রতিভ উত্তরে উজ্জ্বল হলো সাব্বিরের মুখ। মৃদু হেসে বলল,
‘ আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমার আর বেশি সময় লাগবে না।’
মিথি কুণ্ঠিত কণ্ঠে বলল,
‘ সেকি! আপনি একা একা সব কাজ করবেন নাকি? আমাকে বলুন, আমিও সাহায্য করছি। খিচুড়ির সাথে আর কিছু করার পরিকল্পনা আছে? আপনি চাইলে আমি ঝটপট কিছু বেগুন ভাজা করে দিতে পারি।’
সর্বক্ষণ মিথির থেকে দূরে দূরে থাকতে চাওয়া হৃদয়ের এক কোণে মিথির সঙ্গ পাওয়ার যে তৃষ্ণা সেই তৃষ্ণাকে দমন করতে পারল না সাব্বির। একই ছাদের নিচে থাকার পরও কত দূরের মিথি। বাক্যবিনিময় তো দূর, সপ্তাহান্তে তাদের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত হয়ে উঠে না। সেই বহুদূরের মিথি অল্প সময়ের জন্য কাছে থাকবে। পাশে থাকবে। তার সুগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে থাকবে চারপাশ, সে যে কী অপরিসীম প্রাপ্তি সাব্বিরের! সাব্বির সেই প্রাপ্তির লোভ সংবরণ করতে না পেরে সম্মতি দিল। জবাবে সেই ঘোর লাগা, অপার্থিব হাসিটা হাসল মিথি।
রাত বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাইরে আবারও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জু্ঁই ফুলের ডালে ভারী বর্ষণে প্রাণোচ্ছল তরুণীর মতো নৃত্য করছে সফেদ জুঁইয়ের দল। দুই একটা ঝরে পড়ছে মাটিতে। সাব্বির বুকে দুইহাত বেঁধে রান্নাঘরের কেবিনেটে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে মিথির কাজ দেখছে। মিথির হাতে তখন মশলা মাখা। পুরোদমে বেগুন ভাজার আয়োজন চলছে। এই আয়োজনে দু'জনেই নিশ্চুপ। কেউ কোনোরূপ কথা বলছে না। অথচ মনে মনে তাদের কত কথা! সাব্বির তাকে জানাতে চায়, গত সপ্তাহে ভিজিট করে আসা এতিমখানার সবচেয়ে বিশেষ বাচ্চাটির কথা। রাস্তায় কোনো বিলবোর্ড দেখলে মিথির কথা মনে পড়ার কথা। মিথি জানাতে চায়, তার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা। তার শুটিং ক্রুর নানান বোকামোর কথা। কীভাবে শেষ হলো শুটিং। কত ভালো কাজ হয়েছে তার, কতটা আশাবাদী সে। কিন্তু সেসকল কথা সাব্বির কেন শুনবে মন দিয়ে? সাব্বিরকে বলাই বা যায় কী করে! সে অন্যের পুরুষ। আহারে! এই পর্যায়ে এসে মিথির মনে হয়, জীবনে গল্প করার মতো একজনও বোধকরি থাকা চায়। এই দীর্ঘ জীবনে তার একটা গল্প করার মানুষ নেই। তার থেকেও আশ্চর্যের বিষয়, মিথি তার দীর্ঘ জীবনে কখনও কারো সঙ্গে নিজের দুটো কথা বলেনি। প্রাণভরে গল্প করেনি। শুধু একটুখানি কথা সেদিন বলেছিল মৌনিকে। কী আশ্চর্য জীবন তার! ভেবে আশ্চর্য হয় মিথি। তার জীবনে কী বলার মতো কোনো গল্প ছিল না কোনোদিন?
—————
‘আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ বৃষ্টি
তোমাকে দিলাম
শুধু শ্রাবণ সন্ধ্যাটুকু তোমার থেকে চেয়ে নিলাম
আমার সারাটাদিন…’
মৌনির এক রুমের সাবলেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে কোমল, কিন্নরী কণ্ঠ। বৈদ্যুতিক চুলায় চায়ের পানি ফুটতে শুরু করেছে। মৌনি তাতে চা পাতি ছেড়ে দিতেই চারদিক সুবাসিত হয়ে উঠল চায়ের মিষ্টি খুশবু। মিষ্টি মৌনির বেতের সোফায় বাবু হয়ে বসে ছিল। চায়ের সুবাসে মুখ তুলে তাকিয়ে বলল,
‘ তোর চায়ে এতো খুশবু কী করে হয় বল তো? কোনো স্পেশাল কিছু মেশাশ নাকি চায়ে?’
মৌনি চুলার সামনে থেকে সরে জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে দিয়ে পেছন ফিরে তাকাল। মিষ্টি করে হেসে বলল,
‘ জাদু!’
মিষ্টি টেবিলের উপর পড়ে থাকা মৌনির ফোনটা তুলে নিয়ে হাসল। স্ক্রিনটা মৌনির দিকে ঘুরিয়ে দুষ্টুমি করে বলল,
‘ তোর জাদুর চোটে তোর পেয়ারের মাহিমের কল চলে এসেছে দেখ। আহারে, বেচারা ভাইটি তোকে মাঝরাতে কতই না মনে করছে মৌনি! ইশ!’
প্রত্যুত্তরে বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকাল মৌনি। কাপে চা ঢেলে নিঃশব্দে গিয়ে বসল নিজের চেয়ারে। মিষ্টির দিকে একটা কাপ এগিয়ে দিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
‘ ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখে দে। এই পর্যন্ত একবারও এই ছেলের ফোন রিসিভ করিনি। তারপরও এই নাছোড়বান্দা ছেলে ফোন করবেই। তাও টানা দশ থেকে বারো বার।’
মিষ্টি ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
‘ হি ইজ ডায়িং ফর ইউ। ফোনটা ধরে তার দহনটা একটু কমিয়ে দিলেই তো পারিস, মৌনি ডার্লিইইইং!’
মৌনি চোখ গরম করে তাকাল। প্রসঙ্গ বদলে বলল,
‘ তোদের এবারের ঝামেলাটা কী নিয়ে?’
সঙ্গে সঙ্গেই মুখ কালো হয়ে গেল মিষ্টির। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসল। চায়ের কাপটা দুই হাতের তালুর মধ্যে নিয়ে বলল,
‘ খুবই নান্দনিক ঝামেলা।’
মৌনি ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
‘ যেমন?’
‘ আমাদের খুবই সুইট মোমেন্টে ও আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, মিষ্টি তোমার কাছে কে বেশি ইম্পোর্টেন্ট? আমি নাকি তোমার বন্ধু মৌনি? আমি বললাম, আমাদের জীবনে সবার আলাদা আলাদা জায়গা থাকে। একজনের সাথে আরেকজনের তুলনা করা যায় না। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা, তারপরও বলো। ধরো, আমাদের মধ্যে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো, তোমার আমাকে অথবা মৌনির মধ্যে যেকোনো একজনকে বেছে নিতে হবে। তুমি কাকে বেছে নিবে? ওর জোড়াজুড়িতে একসময় বাধ্য হয়েই বললাম, মৌনিকে। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ কালো। বাড়ি ফিরে কিছুতেই আমার ফোন রিসিভ করে না। দুইদিন পর ফোন তুলে সেকি কান্না!’
‘ কান্না!’
এই পর্যায়ে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল মৌনি। অবাক হয়ে বলল,
‘ আসলেই কেঁদেছে নাকি?’
মিষ্টি মাথা নাড়ল। ঠোঁট উল্টে বলল,
‘ আমিও হতভম্ব হয়ে গিয়েছি ভাই। ও যে এই ছোট্ট একটা বিষয় নিয়ে এমন রিয়েক্ট করবে ভাবতেই পারিনি আমি। আমি তো আগেই বলেছিলাম, তুলনা না করতে। কেনো জোর করল?’
মৌনি কয়েক সেকেন্ড মিষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে উছলে পড়ল চা। মৌনিকে হাসতে দেখে হেসে ফেলল মিষ্টি। মৌনি বলল,
‘ পাগল তুই! কেন বলতে গিয়েছিস আমার কথা?’
মিষ্টি অবাক হয়ে বলল,
‘ তবে মিথ্যা বলতাম? ও তো নিজেও জানে, তুই আমার জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ। এতো বছরের বন্ধুত্ব আমাদের৷ তোকে যতটা বিশ্বাস করি অতটা বিশ্বাস আর কাউকে করি না আমি।’
মৌনি উঠে গিয়ে মিষ্টির সোফার হাতলে বসল। প্রিয় বন্ধুকে শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
‘ তুই একটা পাগল, জানিস! এখন তোর প্রেমিকের মান কী করে ভাঙাবি? আগে আমি একা তাকে সহ্য করতে পারতাম না। এখন দেখি সেও আমাকে সহ্য করতে পারবে না। আমাদের দু'জনের দেখা হলে কী একটা ফাটাফাটি লেগে যাবে ভাবতে পারছিস?’
বলতে বলতে দুইজনই হেসে উঠল আবার। বহুদিন পর দুই বন্ধুর চায়ের কাপে ঝড় উঠল। গল্প করতে করতে রাত গড়াল মধ্য রাতে। বাইরে তখন জোরালো বৃষ্টি। মিষ্টি চা খেতে খেতে বুক সেল্ফের পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো ক্যানভাসটির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। উঠে গিয়ে ছবিটা নিজের কোলের উপর নিয়ে বলল,
‘ এ কাকে এঁকেছিস রে মৌনি? চোখদুটো কেমন চেনা চেনা লাগছে।’
মৌনি উত্তর না দিয়ে হাসি হাসিমুখে তাকিয়ে রইল। মিষ্টি অনেকক্ষণ ধরে ছবিটা পরখ করে বলল,
‘ শাওন! এটা তোর কাজিন শাওন না?’
মৌনি খুশি হয়ে বলল,
‘ বাহ! চিনতে পেরেছিস! তারমানে আঁকাটা খুব খারাপ হয়নি, তাই না?’
‘ দারুণ হয়েছে। তুই পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর শাওনের সাথে আমার মাঝে মাঝে কথা হতো। তারপর অনেকদিন কথা হয়নি। কয়েকদিন আগে আবার নক করেছে। ছেলেটা এতো দুষ্ট! ওর ধারণা, আমি বোধহয় ওর জন্য পাগল হয়ে বসে আছি।’
মিষ্টির কথায় হেসে ফেলল মৌনি। বলল,
‘ ও আমাকেও বলেছে, তোকে পটানো ওর জন্য কোনো ব্যাপার না। আরেকটু চেষ্টা করলেই গলে জল হয়ে যাবি। ওর এখন প্রেম টেম করার ইচ্ছে নেই বলেই তুই ওর গার্লফ্রেন্ড নোস।’
মিষ্টি অবাক হয়ে তাকাল। রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলে বলল,
‘ কেমন ফাজিল দেখেছিস!’
মৌনি হাসল। চোখ টিপে বলল,
‘ তুই চাইলে কিন্তু ওই কালাচাঁনকে ছেড়ে শাওনের কাছে আসতেই পারিস। তোর কালাচাঁনের থেকে শাওন কিছুটা ফরসা ঠিক। তবে কাছাকাছি। সবথেকে বড় কথা, একেবারে গ্রীন ফ্ল্যাগ।’
‘ আরও কিছু!’
মৌনি হাসতে হাসতেই একবার ছবিটির দিকে তাকাল। মিষ্টি ছবিটিকে আবারও সেল্ফের পাশে যত্ন করে রেখে এসেছে। ওই ছবিতে, ওই আশ্চর্য জীবন্ত চোখদুটো এখনও চোখ ভর্তি মুগ্ধতা নিয়ে মৌনিকেই দেখছে। মৌনির মানসপটে হঠাৎ করেই সেদিন বিকেলের ওই মুগ্ধ মূর্তিটির ছবি ভেসে উঠল। ওই শাওন, ওই দৃষ্টি মনে পড়ে বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে গেল মৌনির। কোথাও একটা সুতীব্র তাড়না বোধ করল। প্রিয় বন্ধুর গল্প ছেড়ে নির্জনে বসে ওই দৃষ্টিজোড়া নিয়ে একান্তে আকাশ-পাতাল ভাবতে ইচ্ছে হলো। শাওনকে সে ভালোবাসে না। কিন্তু ওই দৃষ্টিকে তুচ্ছ করার অক্ষমতাও যে বড় স্পষ্ট! এই কয়েকদিনে সময়ে অসময়ে বহুবার ওই দৃষ্টির কথা মনে পড়ে থমকে গিয়েছে মৌনি। শাওনকে সে ভেবেছে। জীবনসঙ্গীর মতো করে ভাবার চেষ্টা করেছে। এ কথা সত্য, শাওনের মতো সহজ আর কারো কাছে হতে পারেনি মৌনি। শাওন তার ব্যক্তিগত নোটবুকের মতো সর্বদা উন্মুক্ত। ওকে বলা যায় না, এমন কথা মৌনির জীবনে নেই। পুরো পৃথিবীর কাছে চারদিকে দেওয়াল তুলে ঘুরে বেড়ায় মৌনি। কিন্তু শাওনের কাছে এসে আহ্লাদে গলে যেতে পারে সহজেই। কোনো ভয় থাকে না। আশঙ্কা থাকে না। শুধু থাকে মৌনি। ভাবতে ভাবতে তরল হয়ে আসে মৌনির হৃদয়। টেবিলের উপর থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে তৎক্ষনাৎ ম্যাসেজ পাঠায় শাওনকে। একেবারে আহ্লাদে গলে যাওয়া মৌনি হয়ে ডাকে,
‘ এইইই ছেলেএএ!’
এক.. দুই..তিন সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর আসে,
‘ ইয়েস ম্যাডাম।’
মৌনি হাসে। অদ্ভুত এক আনন্দে শিহরিত হয় মন।
—————
ইলেকট্রেসিটি নেই। খাবার টেবিলে দুটো মোম স্বমহিমায় জ্বলছে। মিথি খাবার পাতে নিয়ে অভ্যাসবশত ফোনে একটু ঢু দিতেই সামনে এলো নাহিদের পোস্ট। পাজি নাহিদ তার টাইমলাইনে খুব অদ্ভুত একটা গান পোস্ট করেছে। রসিয়ে রসিয়ে লিখেছে,
‘ ওরে ঘুমাইয়া থাক বালিশ বুকে নিয়া
ও আব্দুল মিয়া
ঘুমায় থাক বালিশ বুকে নিয়া।
তোর কপালে এই বছরে নাই বুঝি আর বিয়া
ঘুমাইয়া থাক বালিশ বুকে নিয়া।’
পোস্টের কমেন্টে আবার এক বুক বেদনা নিয়ে লিখেছে, ‘আমিই সেই আব্দুল মিয়া। আমার কপাল নাই রে আর বিয়া।’ নাহিদের বেদনা অবশ্য কাউকেই তেমন একটা স্পর্শ করতে পারেনি। ‘হা-হা’ রিয়েক্টের বন্যা দেখে এতটুকু ধারণা করা যায় নাহিদের বেদনায় সকলেই যথেষ্ট উচ্ছ্বসিত। নাহিদ এদের উচ্ছ্বাসে আরও মর্মাহত। সে নাটকের চূড়ান্ত করতেই কমেন্টে ম্যানশন করেছে, মিস্টার জহিরুল্লাহকে। ম্যানশন করে লিখেছে,
‘মিস্টার জহিরুল্লাহ? এই পোস্টটা দয়া করে গ্রুপে শেয়ার করুন। চাইলে নানাজানকে এখানেও ম্যানশন করতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না।’
নাহিদের এক বন্ধু মন্তব্য করেছে,
‘ তুমি বন্ধু বালিশ বুকে ঘুমাবা কেন? তোমার সৌধ আছে না?’
নাহিদ সেখানে উত্তর দিয়েছে,
‘ তোর তো ঘরে বউ আছে। আয় ভাই, দুইজনের বউ অদলবদল করি। আমি দিব সৌধ, তুই দিবি তোর বউ। বিনিময় করতে চাইলে এক চাপুন।’
মৌনি মন্তব্য করেছে,
‘ ভাই, পোস্টটা দাদাজানের চোখে পড়লে আমার নামও নিস ভাই। অনেক হয়েছে। বর ছাড়া ঘুমানো আমার পক্ষে আর সম্ভব না।’
নাহিদ উত্তর দিয়েছে,
‘ পঞ্চাশ হাজার টাকা কমিশন দিস তাইলে।’
সৌধ নামের ছেলেটা আবার মৌনির মন্তব্যে গিয়ে লিখেছে,
‘ নাহিদ মাঝেমাঝেই আমাকে শালা বলে ডাকে। চলুন না, বিয়েটা সেড়ে ফেলি।’
মৌনি সেখানে রেগেমেগে অস্থির।
দিব্য মন্তব্য করেছে,
‘ নাহিদ ভাইয়ের ঘুম আসে না সারারাত ধরে
বুকের ভেতর কেবল বউ বউ করে।
ভাই তোমার পাশে আছি, ছিলাম, থাকব। বউ পেলে আমাদেরও একটু দিও।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অহেতুক সময় নষ্টের ব্যাপারে মিথি সবসময়ই শীতল আচরণ করে। নাহিদ-মৌনির সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে এতো লাফালাফিতে সে বরাবরই বিরক্ত হয়। কিন্তু আজ হেসে ফেলল। মিথির হাসি বড় দুর্লভ বলেই কি-না কে জানে, তার সামনের চেয়ারে বসে থাকা সাব্বির অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মিথি সাব্বিরের প্রশ্ন বুঝে হাসতে হাসতেই নাহিদ ও তার ভাইবোনদের নানান গল্প ফেঁদে বসল। মিথি যে এক সঙ্গে এতো কথা বলতে পারে, এই বিস্ময়েই কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল সাব্বির। তারপর হেসে বলল,
‘ আপনাদের কাজিনদের মধ্যে বেশ ভালো বন্ডিং। সবাই সবার থেকে দূরে থেকেও যেন খুব কাছে।’
মিথির যেন এতোক্ষণে চেতনা ফিরল। এতোক্ষণ এতো কথা বলে ফেলায় নিজেই কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলো। ভাই-বোনদের নিয়ে কোনোদিনই তেমন কোনো আবেগ বোধ করেনি মিথি। তারপরও তাদের নিয়ে এতো গল্প কী করে জমল মিথির? মিথি আনমনা হয়ে মাথা নাড়ল। বলল,
‘ হ্যাঁ। আমরা একসাথে বড় হয়েছি সবাই।’
সাব্বির শুধাল,
‘ আপনার গ্রামের বাড়িটা আপনার খুব পছন্দ তাই না? আমি খেয়াল করেছি, আপনি এই বাসাতেও সবসময় ওই বাড়ির ছায়া খুঁজে বেড়ান।’
খাবার গ্রাস তোলা হাতটা মাঝপথেই থেমে গেল মিথির। নিজের সম্পর্কে এই তথ্য তার জন্য নতুন। আসলেই কী সে সর্বদা ওই বাড়ির ছায়া খুঁজে বেড়ায়? সাব্বির তাকে এতো গভীরভাবে খেয়াল করেছে! মিথি একটু অপ্রস্তুতবোধ করল। হাসার চেষ্টা করে বলল,
‘ হবে হয়তো। আপনার গ্রামের বাড়িটা যেন কোথায়?’
পরের প্রশ্নটা মিথি করল কেবলই প্রসঙ্গ বদলানোর অজুহাতে। কিন্তু সেই প্রশ্নে গম্ভীর হয়ে গেল সাব্বিরের মুখ। একটু থেমে থমথমে কণ্ঠে বলল,
‘ আমার গ্রামের বাড়ি নেই, মিথি।’
মিথি তখনও সাব্বিরের পরিবর্তন টের পায়নি। চোখ তুলে তাকিয়ে অবাক হয়ে শুধাল,
‘ গ্রামের বাড়ি নেই! আপনারা তবে ঢাকার স্থানীয়? আপনার দাদিবাড়ি, নানিবাড়ি সব এখানেই?’
সাব্বির মিথির দিকে তাকিয়ে থেকে শক্ত কণ্ঠে বলল,
‘ আমার দাদি অথবা নানিবাড়ি নেই, মিথি।’
‘ নেই!’
অবাক হলো মিথি।
‘ একেবারেই নেই? কী আশ্চর্য! তাহলে আপনার বাবা-মা?’
সাব্বির এবার উত্তর না দিয়ে শীতল চোখে মিথির দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টির সামনে কেমন গা ছমছম করে উঠল মিথির। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, পাল্টে গিয়েছে সামনে বসে থাকা সাব্বিরের চেহারা। এই সাব্বিরকে সে চেনে না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………