আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৩৬ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। মিথি বিছানার উপর এক গাদা কাগজপত্র ছড়িয়ে ল্যাপটপ কোলে বসে আছে৷ স্কয়ার গ্রুপের কাজটা শেষ করার পর মিথির হাতে এখন অফুরন্ত অবসর। ছেলেবেলা থেকে পড়াশোনা, কাজ, স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকা মিথির কাছে অবসর হলো চিনি ছাড়া চায়ের মতো। মিথি অবশ্য চায়ে চিনি দেওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে একটা প্যাকেজ নাটক পরিচালনা করার। মিথির বাবা নির্বিবাদী, উদাসীন মানুষ হলেও মিথির ব্যবসায়ী বুদ্ধি চমৎকার। পরিচালনায় তার মেধা থাকার সঙ্গে সঙ্গে লাভের অঙ্ক কী করে কষতে হয় সে বিষয়েও সে শতভাগ সচেতন৷ দাদাজানের কথা মতো সাব্বিরকে বিয়ে করে এই খাতে টাকা ঢালার প্রথম উদ্যোক্তা সে ধরে রেখেছে হাতের মুঠোয়। মোখলেসুর আলমের সঙ্গে কয়েক বছর কাজ করার সুবাধে চলচ্চিত্র জগতের ছোট-বড় সকল তারকাদের সঙ্গেই তার একটা পরিচয় গড়ে উঠেছে। কাজ করার প্রস্তাব দিলে একেবারে নাকচ হওয়ার সম্ভবনা তার নেই। এখন কেবল প্রয়োজন ভালো শুটিং ক্রু আর ভালো গল্প। শুটিং ক্রুয়ের ব্যবস্থা মিথি করছে। তার ডিপার্টমেন্টের গ্রুপে বিস্তারিত জানিয়ে একটা নিয়োগ পোস্ট করা হয়েছে দিন কয়েক আগে। ডিপার্টমেন্ট জুনিয়রদের অনেকেই মিথির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। মিথি জহরি দৃষ্টিতে যাচাই-বাছাই করে তাদের মধ্যে থেকে কর্মঠ, আত্মপ্রত্যয়ী, পরিশ্রমী, সেই সঙ্গে কাজ শেখার তীব্র আগ্রহ দেখে একজনকে সহযোগী হিসেবে নির্বাচন করেছে। ফটোগ্রাফি গ্রুপগুলো থেকে বেছে বেছে নবীন অথচ দক্ষ একজনকে নিয়োগ দিয়েছে চিত্রনাট্যকার হিসেবে। মেক-আপ আর্টিস্ট, স্ক্রিপ্ট রাইটার, শুটিং ক্রু সদস্য প্রায় সকল কিছুরই ব্যবস্থা করে ফেলেছে মিথি। এখন শুধু প্রয়োজন একটা ভালো গল্প। গল্প নির্বাচনেও বেশ চতুরতা দেখিয়েছে সে। সকল প্রবীণ লেখকদের পাশ কাটিয়ে মিথির নজর এবার মৌনির দিকে। মৌনি পেশাদার লেখক নয় কিন্তু লেখে ভালো। পূজো অথবা ঈদ সংখ্যায় তার লেখা বেরুলে তীব্র আলোচনা এবং কট্টর সমালোচনা দুইয়ের মুখেই পড়তে হয় তাকে। মিডিয়া পাড়ায় তার লেখার ধার নিয়ে মাঝেমধ্যে টুকটাক আলোচনাও হয়। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় মৌনির ভক্ত কূলের সংখ্যা লক্ষাধিক। কেউ তার আঁকার ভক্ত, কেউ তার সেন্স অব হিউমার অথবা কার্টুনের। কেউ আবার ভক্ত তার লেখার। কারো কারো মনে তার জন্য চির বিদ্বেষ। মৌনিকে দেখে মিথি বুঝতে পারে, ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে জীবনে ঘৃণাও কত দরকার! এইযে বিদ্বেষকারীদের জন্যই মৌনি প্রায় সবসময়ই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে থাকছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মৌনি তার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে উদাসীন হলেও মিথি জানে মৌনিকে ভালোবাসা যায়, ঘৃণা করা যায় কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। মৌনির লেখা গল্প নিয়ে পরিকল্পনা মাফিক কাজ করা গেলে সেটা সৃষ্টির দিক থেকে হবে চমৎকার। অন্যদিকে মৌনি নামের ট্যাগটির জন্য পাওয়া যাবে হিউজ পরিমাণ দর্শক। দর্শকদের একটা বড় অংশ মৌনির জন্য নাটক দেখলেও কাজের মান ভালো হলে মিথি তাদের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে দ্রুত। আস্থা অর্জন করতে পারবে সহজেই। নিজের প্রয়োজনে এইটুকু ব্যবহার সে মৌনিকে করবে। কিন্তু সমস্যা হলো, মৌনির সঙ্গে গল্প নিয়ে কথা বলা। মৌনি অলস প্রকৃতির মানুষ। ক্যারিয়ার নিয়ে তার খামখেয়ালিপনা আছে। এই পর্যন্ত দুই একজন পরিচালক যে তাকে নাটক সিনেমার প্রস্তাব দেয়নি এমনও নয়। দিয়েছে এবং মৌনি তা আদবের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে। মিথির অবশ্য প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভবনা কম। তবে একেবারেই যে নেই সেরকমও না। মৌনি পৃথিবীর সবথেকে জটিল সমীকরণ। মাঝেমধ্যে ওর ব্যবহার দেখলে মনে হয়, ভাই-বোনদের প্রতি সে অন্তঃপ্রাণ। ওরা চাইলে সে নিজের প্রাণটাও দিয়ে দিতে পারে নির্দ্বিধায়। আবার পরমুহূর্তেই সে কাউকে পরোয়া না করা নিষ্ঠুর তরুণী। তখন মনে হয়, কারো জীবন বায়ু বেরিয়ে গেলেও মৌনি সেদিকে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজনবোধ করবে না। মৌনি কারো মন যোগীয় চলার ধার ধারে না। সে চলে নিজের নিয়মে। তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেবল তার মন। বুদ্ধির দিক থেকেও ক্ষুরধার মৌনির মস্তিষ্ক। মিথি তার সঙ্গে গল্পের ব্যাপারে আলোচনা করা মাত্র মৌনি ধরে ফেলবে, মিথির তাকেই কেন চায়। অপরিচিত হলে এই ধরে ফেলায় তেমন কোনো সমস্যা ছিল না মিথির। এই জগতে নিজের লাভ ছাড়া কেউ এক পা পর্যন্ত এগোয় না। অতএব মিথির এই প্রস্তাব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু মৌনির মতো আত্ম অহংকারী মেয়ের কাছে গল্প চাইতে, বিনয়ী হতে অহং-এ লাগছে মিথির। এমনিতেই অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না তার। মিথি গল্প চাইলে না জানি কী মনে করে বসবে সে নিজেকে! তবে এ কথাও সত্য, পূর্ব পরিচিত না হলে মৌনির কাছে পাত্তা পাওয়া মুশকিল হতো মিথির। আর এখানে এসেই আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে মিথির তীব্র অহংবোধ। ব্যাপারটা ভাবতেই বিরক্তিতে তেতো হয়ে গেল মিথির মুখ। 

‘ চা লইয়াইছি, আপা।’ 

মিথি অন্যমনস্ক চোখে দরজার দিকে তাকাল। গা ভর্তি বাহারি মশলার গন্ধ নিয়ে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে কমলার মা। মিথিকে তাকাতে দেখে পর্দা সরিয়ে ভেতরে এলো। মিথির ছড়ানো ছিটানো কাগজপত্রের দিকে একবার আগ্রহী চোখে তাকিয়ে এগিয়ে দিল চায়ের কাপ। বিছানার পাশে মেঝেতে পা গুটিয়ে বসে শুধাল,

‘ আইজ আপনের অফিস নাই আপা?’ 

মিথি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ের কাপে চুমুক দিল। বলল,

‘ না বুয়া। কয়েকদিন আমার ছুটি। বাসায় বসেই কাজ করব। আপনার রান্না শেষ?’ 

প্রশ্নটা করে ল্যাপটপে মগ্ন হলো মিথি। কমলার মা আগ্রহ নিয়ে বলল,

‘ জ্বে না। তয় সকালের নাস্তা রেডি। দুপুরের খাওন রাইন্ধ্যা চইলা যামু। গায়ে গতরে কেমন মেজমেজ করতেছে। কয়দিন যাবৎ শরীরডা ভালা না আপা। খাওনে রুচি পাই না। ভাবতেছি, স্যারের থেইকা ঔষধ লেইখা নিমু। স্যার অতবড় ডাক্তর। ঘরত ডাক্তর থাকতে টেহা দিয়া ডাক্তর দেহানোর কী দরকার?’ 

মিথি অন্যমনস্ক হয়ে শুনছিল। এবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে অবাক হয়ে শুধাল,

‘ স্যার?’ 

পরমুহূর্তেই মনে পড়ল, তার বর ডাক্তার বটে! চাইল্ড কার্ডিওলজি এন্ড নিউট্রিশন স্পেশালিষ্ট, সাব্বির সারোয়ার জাহিদ। মিথির মনে অদ্ভুত এক ভালো লাগা খেলে গেল। জানালা গলে আসা সকালের রোদটুকু হঠাৎ করেই খুব মিষ্টি ঠেকল। শুধাল,

‘ আপনার স্যার বেরিয়ে গিয়েছেন?’  

‘ জ্বে না। টেবিলে খাওন দিছি৷ আপনের কতা জিগাইলো।’ 

মিথি কী মনে করে কাগজপত্রগুলো গুটিয়ে, ল্যাপটপের শাটার নামিয়ে রেখে চায়ের কাপ হাতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সাব্বির তখন মাত্রই টেবিলে এসে বসেছে। চমৎকার একটা ফর্মাল শার্ট তার পরনে। চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। ডানহাতের কবজিতে বড় ডায়ালের ঘড়ি। মিথির শোবার ঘরের দরজা খুলে যেতেই শার্টের আস্তিন গোটাতে গোটাতে সরল চোখদুটো তুলে দরজার দিকে তাকাল। মিথি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে মুগ্ধ হয়ে সাব্বিরের আস্তিন গুটানো দেখল। মাপা মাপা, কী শৈল্পিক তার কাজ! মিথি এক মুহূর্তের জন্য ঝড়, বৃষ্টি, আইলা, সিডর সমস্ত কিছু ভুলে কেবল স্বামী সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর অচেনা এক অনুভূতি কিশোরী আহ্লাদ নিয়ে ঘুরে বেড়াল কিছুক্ষণ। কী জানি কী হলো মিথির! মনে হলো, প্রেমিক যারই হোক। স্বামী সাব্বির তো কেবলই তার। মিথিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সপ্রতিভ হাসল সাব্বির। তাকে সম্ভাষণ জানিয়ে শুধাল,

‘ নাস্তা করেছেন মিথি? এমনিতে তো এই সময়ে আপনাকে পাওয়া যায় না। আসুন। একসাথে নাস্তা করি।’ 

মিথি জড়বস্তুর মতো এগিয়ে এসে সাব্বিরের মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে বসল। সাব্বির মিথির প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে নিজের পাতে নিতে নিতে শুধাল,

‘ আজ আপনার কাজে যাবার তাড়া নেই?’ 

মিথি সে কথার উত্তর না তীর্যক কণ্ঠে শুধাল,

‘ আপনার কী আরও কোনো বউ টউ আছে সাব্বির?’ 

মিথির মুখে দ্বিতীয়বারের মতো নিজের নাম শুনে পুলকিত হতে গিয়েও প্রশ্ন শুনে বিস্মিত হলো সাব্বির। অবাক হয়ে বলল,

‘ জি?’ 

মিথি থমথমে কণ্ঠে শুধাল,

‘ বউয়ের কথা জিজ্ঞাসা করছি। আমি একাই নাকি আরও দু-তিনটে আছে?’ 

সাব্বির কয়েক মুহূর্ত মিথির দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শুধাল,

‘ আপনি কী ঠিক আছেন মিথি? এদিকে আসুন তো, জ্বর টর এসেছে কিনা দেখি।’ 

কথা বলতে বলতেই বাম হাতটা বাড়িয়ে দিল সাব্বির। মিথিও অভিমানী শিশুর মতো কপাল এগিয়ে আনল। সাব্বির আলতো করে মিথির কপাল ছুঁয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

‘ জ্বর তো নেই। তাহলে এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করছেন কেন?’ 

মিথি সে কথার জবাব না দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,

‘ দণ্ডবিধি ১৮৬০- এর ৪৯৪ ধারা মোতাবেক স্বামী যদি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ব্যতিত দ্বিতীয় বিয়ে করে তাহলে স্ত্রী চাইলে ফৌজদারি মামলা করতে পারে। স্বামীর অপরাধ প্রমাণিত হলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।’ 

মিথির এই নতুন অবতারে হেসে ফেলল সাব্বির। আশ্চর্য হওয়ার ভান করে বলল,

‘ তাই নাকি! আপনি ফিল্মমেকার হলেও আইন সম্পর্কে তো আপনার দারুণ নলেজ মিথি!’ 

মিথি আড়চোখে সাব্বিরের দিকে তাকাল। মুখের গাম্ভীর্য ধরে রেখে বলল,

‘ এজন্যই বলছি৷ এখনও সময় আছে সাব্বির, এই রকম চিন্তাভাবনা থাকলে আমাকে বলে দেন। আমাকে বললে আমি অনুমতি দিয়ে দিতেও পারি৷ কিন্তু পিঠ পিছে লুকিয়ে চুরিয়ে করলে মামলা আমাকে করতেই হবে। আমি তো আর এতো বড় অপমান মেনে নিতে পারব না।’ 

মিথি গম্ভীর হয়ে থাকলেও হাসছে সাব্বির। তাকে হাসতে দেখে শীতল কণ্ঠে ধমক দিলো মিথি, 

‘ হাসবেন না একদম। আমি খুবই সিরিয়াস ব্যাপার নিয়ে কথা বলছি। বলুন, আপনি শুধু আমার বর? নাকি আরও অনেকের বর?’ 

সাব্বির এবার হাসি থামিয়ে মিথির দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্তের জন্য জীবনের কোনো জটিলতা নিয়েই আর ভাবতে ইচ্ছে হলো না। মিথির চোখের দিকে তাকিয়ে গাঢ় কণ্ঠে বলল,

‘ আমি শুধু আপনার বর, মিথি।’ 

সাব্বিরের স্পষ্ট উত্তরে জীবনে প্রথমবারের মতো নারীসুলভ লজ্জা পেল মিথি। সোনারঙা গালে দেখা গেল গোলাপি আভা। সেদিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল সাব্বির। জানালা দিয়ে আসা ঝুরি ঝুরি রোদ্দুরে একে অপরের চোখে ডুবে গিয়ে সাব্বিরের মনে হলো, সকালের এতো রূপ আগে কখনও দেখেনি সে। সকল সত্য মিথ্যে হয়ে যদি এই রূপবতী সকালেই থমকে থাকা যেত! তাহলে এই পৃথিবীতে সাব্বিরের থেকে আর কে বেশি সুখী হতো? 

—————

আষাঢ়িয়া প্রথম দিবস। অথচ আকাশজুড়ে রোদের মেলা। মৌনির আষাঢ় পছন্দ হলেও রোদের সঙ্গে আজন্মের বিদ্বেষ। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলে যেমন কোমল হয়ে আসে মৌনির মন। ঠিক তেমনই আকাশে রোদ বাড়তে থাকলে বাড়তে থাকে তার মেজাজের পারদ। বিজ্ঞ পাঠক মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন, আজ মৌনির মেজাজ তপ্ত লাভার মতো উত্তপ্ত। এই দগদগে মেজাজ খারাপের মধ্যেই মিথি ফোন দিয়ে নাটকের জন্য একটা গল্প চেয়ে বসল। মৌনি একবার ভেবেছিল নিষেধ করবে। কিন্তু দেখা গেল, হ্যাঁ বলার থেকে না বলা যথেষ্ট মুশকিল। মৌনি সাধারণত তার মতের বিরুদ্ধে যাওয়া কোনো আলোচনায় অংশগ্রহণ করে না। দৃষ্টিকটুভাবে এড়িয়ে যায়। কিন্তু আপন মানুষকে চাইলেও সেভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। মৌনিকে তাই বাধ্য হয়েই মিথির বক্তব্য শুনতে হয়েছে। অপ্রস্তুত মুখে রাজি হতে হয়েছে। রাজি হওয়ার পর থেকেই তার মেজাজ ভয়ংকর খারাপ। নিজের লেখা নিয়ে তার অসন্তুষ্টির শেষ নেই। দুনিয়ার যাবতীয় গাঁজাখুরি ব্যাপার সে জুড়ে দেয় লেখায়। গাঁজাখুরি কল্পনা গোঁজামিলের বাহার মিলেমিশে কী যে অখাদ্য সে তৈরি করে! সেটা নাকি আবার মানুষ পড়েও। তার থেকেও আশ্চর্যের ব্যাপার, সে নিয়ে নাটক সিনেমা বানানোর আগ্রহও নাকি জাগে মানুষের মনে! এমনিতেই মৌনি ভয়ে তটস্থ থাকে কোথায় কোন বিষয় নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে যায়। কোথায় কার চোখে তার লেখার ফাঁকফোকরগুলো ধরা পড়ে যায়। তারওপর এরা নাটক ফাটক বানানোর জন্য অস্থির হয়ে বসে আছে। এরা কী চায়? যাদের চোখে মৌনির লেখা পড়েনি তাদের চোখেও লেখাগুলো পড়ে মৌনি একেবারে সমালোচনায় সমালোচনায় ভেসে যাক? মুখ তেতো করে রাস্তা পেরোয় মৌনি। সারাটাদিন আজ ব্যস্ততায় কেটেছে তার। ডিপার্টমেন্টে কী সব প্রেজেন্টেশনের ব্যবস্থা করে দু'দিন পর পর। তারপর খাওয়া-ঘুম বাদ দিয়ে স্লাইড তৈরি করতে বসো। মাঝে মাঝে ভার্সিটিটাকে এক লাথি দিয়ে জীবন থেকে একশো হাত দূরে ফেলে দিতে ইচ্ছে হয় মৌনির। এখন আবার মিথির নাটকের গল্পের যাতনা। উফ! নাটকের জন্য এখন গল্প কোথায় পাবে মৌনি? নাটকের গল্প কেমন হয় তাই তো জানে না সে। উফ! উফ! উফ!  

মৌনির এতো যন্ত্রণার মধ্যে টেলিফোন করল শাওন। শাওনের সঙ্গে মৌনির কথাবার্তার ধরণ এই কয়েকদিনে কিছু বদলেছে। শাওনের কাছে মৌনি বরাবরই আহ্লাদী কন্যা এখন আহ্লাদটা সম্ভবত ইঞ্চিখানেক বেড়েছে। শাওন সামনে বসে থাকলে তার দিকে তাকিয়ে থাকার সময়টাও সম্ভবত কিছু ভারী হয়েছে। এই কয়েকদিনে মৌনি এ-ও আবিষ্কার করে ফেলেছে, শাওন যথেষ্ট সুপুরুষ। চাইলে, শাওনকে নির্দ্বিধায় ভালোবেসে ফেলা যায়। দিনদিন মৌনি আরও একটা জিনিস উপলব্ধি করেছে, শাওন একটা পাগল। এতো চেষ্টা করার পরও মৌনির প্রতি পাগলামো সে লুকাতে পারছে না। অনেক বছর আগে শাওন তাকে আর ভালোবাসবে না বলে কথা দিয়েছিল। কিন্তু মৌনির ধারনা, শাওন তার কথার বরখেলাপ করে তাকে ছাড়া আর সবাইকেই ভালোবাসতে ভুলে গিয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত মেয়েদের প্রতিই সে একটা নির্বিকার কৌতুক নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই পাগল ছেলেকে ছাগল বানাতে মৌনি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ছেলেটাকে সে ভালোবাসার চেষ্টা করবে। ইচ্ছে হলে বিয়েও করে ফেলতে পারে। মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন ওঠাল। সারাদিনের সমস্ত ঝাঁঝ ঢেলে ধমক দিল, 

‘ তোমার এতো বড় সাহস! তুমি আমাকে কল করো!’ 

শাওন একটুও ভড়কাল না। নির্বিকার কণ্ঠে বলল,

‘ তোমাকে ফোন করব না, এমন কোনো কথা ছিল নাকি?’ 

‘ কথা না থাকলেই ফোন দিতে হবে? তোমার ধারণা, আমি সারাদিন তোমার ফোন ধরার জন্য বসে থাকি। তোমরা, পৃথিবীর বেয়াদব মনুষ্য কী মনে করেছ আমাকে? খবরদার শাওন, ফারদার আমাকে কল করার সাহস তুমি করবে না।’ 

শাওন বলল,

‘ করব।’ 

মৌনি ধমক দিয়ে বলল,

‘ না।’ 

শাওন হেসে ফেলে বলল,

‘ কে কী করেছে বলো তো? সব রাগ আমার উপর ঝাড়ছ। রাগ ঝাড়ো আর যাই করো। তুমি খুব ভালো করেই জানো, তোমাকে ফোন আমি করবই। পৃথিবী উলোটপালোট হয়ে গেলেও করব। তোমার সঙ্গে কথা না বললে আমার ভালো লাগে না।’ 

শাওনের সরল স্বীকারোক্তিতে সারাদিনের সমস্ত বিরক্তি যেন পানি হয়ে গেল মৌনির। রাগ থেকে সরে তারা চলে এলো প্রতিদিনকার ঘটনাপ্রবাহে। যার যার জীবনের আপডেট, নানান অপ্রাসঙ্গিক আলাপ, রাগ, দুঃখ, হতাশা সমস্ত কিছু নিয়ে আলোচনা করতে করতে মৌনি এক সময় তার আপ্যার্টমেন্টে পৌঁছে গেল। রাস্তার ক্লান্তিটুকু এতো হালকা, দূরত্বটুকু বড় অল্প বলে বোধ হলো যেন। 
বাসায় পৌঁছে ফোন কাটার পর দেখা গেল, কল ডিউরেশন এক ঘন্টা চল্লিশ মিনিট। মোবাইল ফোনে কথা বলা নিয়ে নাক সিঁটকানো মৌনি নিজেও অবাক বনে গেল। এতো কথা জমে ছিল তাদের! কিন্তু রোজই তো কথা হচ্ছে! এতো কথা বলার পরও প্রতিদিন অতো কথার বাহার কোথায় পায় ওরা? 

—————

আকাশ ভেঙে বর্ষা নেমেছে। মৌনির বারান্দার দরজাটা ঠা করে খোলা। বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজে যাচ্ছে মেঝে, বেতের সোফা আর খোলে রাখা বই। দমকা হাওয়ায় উদাসীন তরুণীর আঁচলের মতো উড়ছে দরজার সফেদ পর্দা। বৃষ্টি কন্যার ঝমঝম ধ্বনির সঙ্গে বাজছে জন লিজেন্ডের গান,

‘How many times do I have to tell you
Even when you're crying you're beautiful too? 
The world is beating you down
I'm around through every mood
You're my downfall, you're my muse 
My worst distraction, my rhythm and blues
I can't stop singing
It's ringing in my head for you.’

গানের একমাত্র শ্রোতা ল্যাপটপের কিবোর্ডে মাথা ঠেকিয়ে মগ্ন হয়ে আছে গভীর নিদ্রায়। ইলেক্ট্রিসিটি কখন চলে গিয়েছে কে জানে! বিজলিসুন্দরীর আলোয় হঠাৎ হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে মৌনির আঁধারে ঢাকা এক চিলতে ঘর। বর্ষাপ্রিয়ার ঘুম ভাঙাতে যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড। থেকে থেকে পৃথিবী কাঁপিয়ে আর্তনাদ করে উঠছে আকাশ। অথচ মৌনি নির্বিকার। সমস্ত দিনের ক্লান্তি চেপে ধরেছে তার দু’চোখ। ঘুমের ঘোরে একটুখানি উষ্ণতা খুঁজতে গিয়ে হালকা হলো তার মরণ ঘুম। তন্দ্রা চোখে উঠে বসতেই টের পেল আঁধার ঘরে একমাত্র আলো হয়ে জ্বলছে তার মুঠোফোন। কেউ একজন বিরামহীন কল করে চলেছে। মৌনি নামধাম না দেখেই কল রিসিভ করল। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ব্যাটারির আলো জ্বেলে দিতেই ওপাশ থেকে ঋতির কণ্ঠ ভেসে এলো। ফিসফিস করে বলল,

‘ আমি একটা ভয়ংকর বিপদে পড়ে গিয়েছি মৌপু।’ 

মৌনি ভ্রু কুঁচকাল। শুধাল, 

‘ বিপদ! কী রকম বিপদ?’ 

‘ আমি ট্রেনে করে চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ যাচ্ছি। আমার পাশের সীটে একজন ভদ্রলোক বসেছে।’ 

মৌনি সচেতন হলো। কণ্ঠটা সঙ্গে সঙ্গে তপ্ত হয়ে গেল। গম্ভীর গলায় শুধাল,

‘ লোকটা কী তোর সাথে কোনোরকম নোংরামো করার চেষ্টা করেছে?’ 

ঋতি থমথমে কণ্ঠে বলল,

‘ না।’ 

একটু থেমে মন ভার করে বলল,

‘ ভদ্রলোক খুব মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। কঠিন ইংরেজি বই। সম্ভবত সৌরজগত সংক্রান্ত বই।’ 

মৌনি বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ ভদ্রলোক সৌরজগত সংক্রান্ত বই পড়লে তোর বিপদ হতে যাবে কেন? সৌরজগৎ তো আর তোর পৈতৃক সম্পত্তি না।’ 

ঋতির মন আরও ভার হলো। সে কণ্ঠ নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে শুধাল,

‘ ভদ্রলোক আমার দিকে তাকাচ্ছে না কেন আপু?’ 

মৌনি অবাক হয়ে বলল,

‘ ভদ্রলোক তোর দিকে কেন তাকাবে? তুই কোন দেশীয় ঐশ্বরিয়া?’ 

ঋতি এবার কেঁদে ফেলার মতো করে বলল,

‘ তারমানে তুমি বলতে চাইছ, আমার চেহারা খারাপ?’ 

মৌনি মেঝেতে জমে থাকা পানি মাড়িয়ে খুব সাবধানে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাচ্ছে গা, ভিজুক। মৌনি নির্বিকার কণ্ঠে বলল, 

‘ তোর চেহারা খারাপ না। এভারেজের থেকে সুন্দরী। তাছাড়া তোর চেহারায় কিছুটা ইরানি ব্যাপার আছে। চমৎকার হাইট। তারমানে এই নয় যে পৃথিবীর সমস্ত পুরুষ তোর দিকে হা করে তাকিয়ে থাকবে।’ 

ঋতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

‘ আমার ধারণা ভদ্রলোকের বউ আছে। বউ না থাকলেও প্রেমিকা আছে। এমন সুপুরুষ লোকের প্রেমিকা থাকবে না, এমন হওয়ার কথা না।’ 

‘ থাকলে আছে। পুরুষ মানুষের বউ থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। এতে এতো আশ্চর্য হওয়ার মতো তো কিছু নেই। বউয়ের জায়গায় বর থাকলে নাহয় অবাক হওয়ার মতো কিছু হতো। তুই ভদ্রলোকের বউয়ের কথা শোনানোর জন্য আমাকে ফোন করেছিস?’ 

ঋতি এবার কেঁদে ফেলল। ফুপিয়ে উঠে বলল,

‘ তার বউ থাকলে আমি কিন্তু ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে মরে যাব আপু।’ 

মৌনি আশ্চর্য হয়ে বলল,

‘ তার বউ থাকলে তুই কেন মরবি? তার বউয়ের জীবন আর তোর জীবন কী বিপরীত ব্যস্তনুপাতিক?’ 

ঋতি হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

‘ তার বউয়ের জীবনের সঙ্গে আমার জীবনের কোনো যোগ নেই। আমার মরতে ইচ্ছে করেছে তাই মরব।’ 

মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

‘ তাহলে তো আর কথা থাকে না। ইচ্ছে যখন হচ্ছে তখন মরতেই পারিস। এমনিতে তুই মরে গেলে সম্ভবত আমি খুবই কষ্ট পাব। কিন্তু আমার কষ্টের কথা চিন্তা করে তো আর আমি তোর ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারি না? আচ্ছা যা, লাফিয়ে পড়। আল্লাহ হাফেজ।’ 

ঋতির কান্না থেমে গেল। বিষাদ কণ্ঠে বলল, 

‘ তুমি এতো খারাপ মৌপু! এমনিতে আমি এতো দুঃখে আছি। তারওপর তুমি আমার সাথে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করছ। ওদিকে নাহিদ ভাইও ওমন একটা ঘটনা ঘটাল। তোমরা সব দিনদিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছ।’ 

মৌনি ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল। ঋতির কণ্ঠে রহস্যের সন্ধান পেয়ে শুধাল, 

‘ নাহিদের ঘটনা মানে? ও আবার কী করল?’ 

মৌনির কৌতুহলী কণ্ঠে ঋতি কিছুক্ষণের জন্য তার প্রথম প্রেমের বেদনা থেকে বেরিয়ে এলো। ভারি আশ্চর্য হয়ে বলল,

‘ কোন দুনিয়ায় থাকো তুমি মৌপু? বাড়িতে মোটামুটি একটা কেয়ামত ঘটে গেল আর তুমি কিছুই জানো না?’ 

‘ জানানোর হলে শর্টকাটে জানা। নয়তো ফোন রাখ। এতো ভূমিকা দিয়ে বাড়ির সিডর, আইলার খবর শোনার আগ্রহ আমার নেই।’ 

ঋতি মুহূর্তেই শটকার্ট পন্থায় চলে এলো। কণ্ঠ নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল,

‘ বাড়িতে নাহিদ ভাইকে নিয়ে বড়সড় একটা ঝামেলা হয়েছে। মেজো চাচা নাহিদ ভাইকে নাকি অগুনিত থাপ্পড় মেরেছে।’ 

মৌনি অবাক,

‘ মেরেছে! কেন?’ 

‘ নাহিদ ভাই কিছুদিন আগে বাড়িতে গিয়েছে। বাড়িতে তো ওই সিদ্দিক, মোবারকদের সঙ্গে মেলামেশা করে। সেদিন সন্ধ্যায় নাকি মোবারকরা অন্য পাড়ার এক মেয়ের সঙ্গে ফাজলামো করছিল বাজারে। মেয়ে প্রতিবাদ করায় ভরা বাজারে মেয়ের ওড়না টেনে নিয়েছে গা থেকে। এই নিয়ে দুই পাড়ার মানুষের মধ্যে ভয়ংকর ঝামেলা। মাথা ফাটাফাটি পর্যন্ত হয়েছে। সেই ঝামেলার সময় নাহিদ ভাই নাকি ওই মোবারকদের সঙ্গেই ছিল। আশেপাশে দশ গ্রামে দাদাজানের এতো মান্যিগন্যি তার নাতি হয়ে নাহিদ ভাই এই কাজটা কেমন করে করল বলো তো? আমার তো এখন বাড়ি ফিরতেই লজ্জা লাগছে। শুধু দাদাজান? আমাদের মানসম্মানই বা কোথায় থাকল?’ 

মৌনি কেবল শুনে গেল। কোনেরকম উত্তর দিল না। ঋতি বলল,

‘ নাহিদ ভাইয়ের দাদাও তো এলাকার সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। নাহিদ ভাইটা না তার দাদার মতো না হয়ে হয়েছে তার বাবার মতো৷ ফুপার ভাই-বোনদের মধ্যে ফুপাই একমাত্র গোঁয়ার, সভ্যতা বিবর্জিত। আর আমাদের ভাইবোনদের মধ্য হলো নাহিদ ভাই। আম্মু তো আমাকে ফোন করে আগেই সাবধান করে দিয়েছে, আমি যেন নাহিদ ভাইয়ের থেকে দূরে দূরে থাকি।’ 

এই পর্যায়ে কথা বলল মৌনি। দীর্ঘ একটা হাই তুলে দায়সারা গলায় বলল,

‘ গুড। দূরে থাকতে বলেছে যখন দূরে থাকবি। এখন ফোনটা রাখ। বৃষ্টির রাত। সারাদিন খুব পরিশ্রম গিয়েছে। এখন আমি আরাম করে ঘুমাব।’ 

ঋতি অবাক হয়ে বলল,

‘ ঘুমাবে! এই খবর শোনার পরও তুমি আরাম করে ঘুমাবে! তুমি খবরটা শুনে একটুও অবাক হওনি মৌপু?’ 

মৌনি নির্বিকার কণ্ঠে বলল,

‘ না, হইনি।’ 

‘ হওনি! কেন?’ 

‘ কারণ, আমি জানি নাহিদ কাজটা করেনি।’ 

‘ তুমি কী করে জানলে করেনি?’ 

‘ তুই কী করে জানলি যে করেছে?’ 

‘ সবাই বলছে। এতোগুলো মানুষ তো আর মিথ্যে বলবে না।’ 

মৌনি দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

‘ এতোগুলা মানুষ মিথ্যে না বললেও গুজব ঠিকই ছড়াচ্ছে। নাহিদ কাউকে খুন করেছে, ডাকাতি করেছে, পৃথিবীর যাবতীয় নেশা করেছে, পতিতালয়ে গিয়েছে পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করব। কিন্তু নাহিদ কোনো মেয়ের গা থেকে ওড়না টেনে নিয়েছে অথবা ওড়না টেনে নিতে দেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে মজা নিয়েছে। কোনো মেয়েকে অসম্মান করেছে এটা শুধু তুই কেন? পুরো পৃথিবী এসে বললেও আমি বিশ্বাস করব না। নাহিদ যদি নিজে এসে বলে, তারপরও না। নাহিদকে আমি খুব কাছ থেকে জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, এই ধরনের হীন কাজ সে মরে গেলেও করতে পারবে না। এটা তার বৈশিষ্ট্যের বাইরে ঋতি।’ 

ঋতিকে দ্বিধান্বিত দেখাল, 

‘ কিন্তু…’ 

‘ কিন্তু কী ঋতি? অন্যের কথা কেন তোদের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ? কেন অন্যের কথায় নিজের মানুষদের জাজ করার জন্য উঠেপড়ে লাগিস? নাহিদকে তুই চিনিস না? নাহিদ দুষ্ট, নাহিদ ফাজিল, নাহিদ বেয়াদব, নাহিদের মেয়েবন্ধু অসংখ্য এই সবকিছু সত্য। কিন্তু নাহিদকে কখনও আমি লম্পট হতে দেখিনি। নাহিদকে কখনও আমি কোনো মেয়ের শরীরের দিকে লালায়িত চোখে তাকাতে দেখিনি। নাহিদকে আমি সবসময় চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে দেখেছি। যে ছেলে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে তার গায়ে এই ধরনের কালিমা বেমানান৷’ 

ঋতি প্রত্যুত্তরে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করল। মৌনি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

‘ তোর সঙ্গে আমি তর্কে যেতে চাই না ঋতি। অন্যের বিষয় নিয়ে অতো তর্ক করার সময় আমার নেই। চিন্তার ক্ষেত্রে তুই আমি সকলেই স্বাধীন। তোর যা ইচ্ছা চিন্তা করতে পারিস। এখন ফোন রাখ, ঘুমাব।’ 

ঋতি মন খারাপ করে বলল,

‘ এমন হলে তো, নাহিদ ভাইয়ের প্রতি খুব অন্যায় হলো।’ 

মৌনি নির্বিকার কণ্ঠে বলল,

‘ হলে হলো।’ 

‘ মেজো চাচা ওকে মারল। সারা গ্রামে সম্মানহানি হলো। এই বয়সে মার খাওয়ার মতো অপমান আর কিছুতে আছে? সবাই কী করে এতো সহজে সব বিশ্বাস করে ফেলল?’ 

‘ তুইও তো বিশ্বাস করেছিস।’ 

ঋতি উত্তর দিতে পারল না। মন খারাপ করে বলল,

‘ আমরা কী নাহিদ ভাইয়ের জন্য কিছু করতে পারি না আপু?’ 

মৌনি বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ তোরা করতে পারিস কি-না জানি না। তবে আমাকে এসবে টানবি না। আমি ভাই শান্তিতে দুই দন্ড ঘুমানোর সময় পাচ্ছি না। অন্যের কেচ্ছায় জড়িয়ে নিজের ঘুম নষ্ট করার সময় আমার নেই।’ 

‘ তুমি খুব নিষ্ঠুর মৌপু।’ 

মৌনি হেসে ফেলল,

‘ আমি একা না। এই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই খুব নিষ্ঠুর। নিষ্ঠুর মানুষেরা সমাজের জন্য অতোটা ক্ষতিকর না। সমাজের জন্য সবথেকে ক্ষতিকর হলো, তোর মতো আবেগপ্রবণ মানুষ। যাদের মানুষের কথায় অন্ধবিশ্বাস। একটু আগে তোর বিশ্বাস ছিল একরকম। আমার কথায় তোর বিশ্বাস বদলে হয়ে গেলো একেবারে অন্যরকম৷ একটু আগে তুই নাহিদকে ঘৃণা করছিলি। এই মুহূর্তে প্রবল মায়া অনুভব করছিস৷ এরপর অন্যকেউ অন্যকোনোভাবে বুঝালে সেটাও বিশ্বাস করবি। ক্ষণে ক্ষণে অনুভূতির এই রদবদলটা খুব বিপদজনক। মানুষকে তীব্র কষ্ট এই ধরনের মানুষই বেশি দেয়।’  

ঋতি হঠাৎ করেই ভাবুক হয়ে গেল। মৌনি নীরবে ফোন কেটে রেলিংএ থুতনি ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার উজ্জ্বল মুখখানা বৃষ্টির জলে ধুয়ে যেতেই সে খেয়াল করল তার বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা দীর্ঘদেহী যুবক। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মৌনির বারান্দার দিকেই। ভারী বর্ষনের দাপটে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না তার মুখ। কিন্তু মৌনির মনে হলো, এ যেন শাওন! মৌনিও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওই অস্পষ্ট পুরুষটির দিকে । ঘরের ভেতরে তখনও বাজছে জন লিজেন্ডের গান। মৌনির এই মুহূর্তের জন্য মনে হলো ওই গানটি যেন একান্তই শাওনের। প্রতিবার মৌনির দিকে তাকালে তার দৃষ্টি এই কথাই তো বলে। প্রবল আবেগ নিয়ে গাইতে চায়, 

‘How many times do I have to tell you
Even when you're crying you're beautiful too?’ 

মৌনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, শাওনকে সে ভালোবাসবার প্রাণপণ চেষ্টা করবে। সেই চেষ্টাটা কী শুরু হয়ে গিয়েছে? সে কী শাওনকে ভালোবাসতে শুরু করেছে? বিভ্রান্ত দেখায় মৌনিকে। বুকের কোথাও ভালো লাগা আছে। কিন্তু ভালোবাসার থেকেও গাঢ় হয়ে বাজছে বেদনার ধ্বনি। মৌনির চোখে জল চলে এলো হঠাৎ! উফ! আষাঢ়িয়া প্রথম দিবসে, বৃষ্টিস্নানে মত্ত হয়েও কীসের এতো দুঃখ তার!  
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp