আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৩৭ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          আষাঢ়িয়া দ্বিতীয় দিবস। গত সন্ধ্যায় অনেকক্ষণ মুখ গোমড়া করে থেকে মধ্যরাতে আরম্ভ হয়েছিল আকাশের সেকি প্রলয়ংকারী কান্না! অভিমানিনী কিশোরীর মতো সমস্ত দেহ কাঁপিয়ে, প্রকৃতিকে অস্থির করে, গুমরে উঠা ওই কান্না দেখে গিয়াসউদ্দিনের মনে পড়ে যাচ্ছিল শাহিনূরের ছেলেবেলার কথা। সাতটা ছেলে আর পাঁচটি মেয়ের গর্বিত পিতা গিয়াসউদ্দিন। ছেলেমেয়েদের তিনি মানুষ করেছেন কঠিন নিয়মের মধ্যে রেখে। কারো অকারণ অভিমান কোনোদিন দেখতে হয়নি তাঁকে। সকলেই আপন খেয়ালে, আপন জীবনযুদ্ধ সামলে বড় হয়েছে। তারমধ্যে একমাত্র শাহিনূর ছিল বড় অভিমানিনী। বাবার প্রতি, ভাইয়েদের প্রতি, বোনেদের প্রতি কতশত অভিমান তার! বাবা-মা মাত্রই তার কোমল সন্তানের প্রতি দুর্বল হয়। গিয়াসউদ্দিন প্রকাশ না করলেও ছোট মেয়ে শাহিনূরের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল প্রবল। গোপনে তার কত ইচ্ছেই যে তিনি পূরণ করেছেন! মাঝরাতে ঘুমন্ত মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার সময় হুহু করে উঠেছে বুকের ভেতর। শুধু তিনিই নন। ভাইয়েদেরও দুর্বলতা ছিল শাহিনূর। গিয়াসউদ্দিন বহুদিন সদর থেকে ফিরে এসে দেখেছেন মেজো ছেলে মঈনুল ছোটবোনকে কোলে বসিয়ে তার অভিমানী কান্না দেখছে। মাথায় হাত বুলিয়ে অভিমান ভুলাচ্ছে। অথচ তখন শাহিনূর কলেজে পড়া ডাঙর মেয়ে। আর মঈনুল আর্মির কমিশন্ড অফিসার। প্রশস্ত চোয়ালে দৃঢ় গাম্ভীর্য ঝুলিয়ে রেখেও মায়া মায়া চোখে সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকেছে বোনের ক্রন্দনরত মুখের দিকে। সেই বোন, সেই শাহিনূর ভালোবাসল পাশের গ্রামের এক ভ্যাবাগন্ড ছেলেকে। গিয়াসউদ্দিনের বাকি ছেলেমেয়েদের কেউ যে কাজটা করবার সাহস করেনি; শাহিনূর তা করল। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে সে জানাল তার ভালোবাসার কথা। দশ গ্রামে প্রসিদ্ধ গিয়াসউদ্দিন জানতেন মেয়ে ভুল করছে। ছেলেটি অভিজাত পরিবারের সন্তান হলেও তার হৃদয়ে আভিজাত্য নেই। ধন-দৌলত, সম্পত্তি হলেই মানুষ ধনবান হয় না। ওই বংশ ক্ষমতায় প্রসিদ্ধ হলেও হৃদয়ের দিক থেকে বড় দরিদ্র্য। তাঁর কোমল মেয়ে ওই পরিবেশে, ওই ছেলেটির সঙ্গে জীবন কাটাতে পারবে না। কিন্তু শাহিনূর তাঁর কথা শুনলেন না। গিয়াসউদ্দিন মেয়ের বেয়াদবিতে রুষ্ট হয়ে তার অন্যত্র বিয়ে ঠিক করলেন। শাহিনূর বিয়ে করল। তবে বাবাকে শাস্তি দিতে বিয়ের প্রথম রাতে বরের ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল প্রেমিকের হাত ধরে৷ বহু বছর ধরে লালিত স্নেহে কী ভয়ংকর আঘাত পেয়েছিলেন সেদিন গিয়াসউদ্দিন! মেয়েকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু যেদিন তার কোলজুড়ে ছেলেটা এলো! বাড়ির পুরোনো চাকর মোহন তাকে কোলে করে আনল তার দরজায়৷ সেদিন তিনি আর কঠিন হয়ে থাকতে পারেননি৷ ছেলের ঘরের নাতি-নাতনীদের নিজের ছত্রছায়ায় বড় করলেও মেয়ের ঘরের সন্তানদের নিয়ে কখনওই তেমন মাথা ঘামাননি গিয়াসউদ্দিন। কিন্তু শাহিনূরের প্রথম সন্তানকে তিনি এনে রাখলেন নিজের ছত্রছায়ায়। নাম রাখলেন, নাহিদ অর্থাৎ শুকতারা। ভেবেছিলেন, নামের মতোই একদিন জ্বলজ্বল করে জ্বলবে এই ছেলে৷ গিয়াসউদ্দিন রক্ত ধারাকে মিথ্যে করে দিয়ে প্রমাণ করবেন পরিবারিক শিক্ষাই হলো একমাত্র শেকড়। গিয়াসউদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আকাশে সোনা ঝরা রোদ উঠেছে। দিঘীপাড়ের সিঁড়িতে উদোম গায়ে বসে আছেন তিনি। সত্তোর্ধ বয়সেও সুঠাম, সুঘঠিত তার শরীর। মজিদ নামের মধ্যবয়স্ক এক চাকর সরিষার তেল মাখিয়ে দিচ্ছে তার শরীরে। তেল মাখানো শেষ হলে তিনি দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল সারবেন। গিয়াসউদ্দিন বার দুয়েক আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘাটে তার পোশাক আগলে দাঁড়িয়ে থাকা মতিনকে ইশারায় ডাকলেন। গম্ভীর স্বরে বললেন,

‘ নাহিদকে ডেকে আন তো ছোকরা। দৌঁড়ে গিয়ে দৌঁড়ে আসবি।’ 

মতিন মাথা নাড়ল। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে, ‘ জে আইচ্ছা’ বলেই ধীর পায়ে পিছিয়ে গেল কয়েক পা। গিয়াসউদ্দিনের থেকে সম্মানজনক দূরত্বে পৌঁছে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল বাড়ির পথে। গায়ে তেল মাখানো শেষ করেও দীর্ঘক্ষণ নীরবে বসে থেকে নাহিদের জন্য অপেক্ষা করলেন গিয়াসউদ্দিন। নাহিদ এলো একটু সময় নিয়ে। চুলগুলো হাতের আঙুলে আঁচড়ে কিছুটা ভদ্রস্থ করার চেষ্টা করে গিয়াসউদ্দিনের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। সালাম দিয়ে শুধাল,

‘ ডেকেছেন নানাজান?’ 

গিয়াসউদ্দিন চোখ তুলে নাহিদের দিকে তাকালেন। তাঁর বিশাল সংখ্যক নাতিদের মধ্যে নাহিদ সবথেকে সুদর্শন। মায়ের অভিমানী মুখটা যেন কেউ কেটে এনে বসিয়ে দিয়েছে তার অবয়বে। বড় বড় ছলছলে অভিমানী চোখ, চিবুকের কাছে সর্বদা ঝুলে থাকে সুতীব্র অহং। ঠোঁটের কোণায়, সুঠাম দেহের প্রতিটি হেলনে ঝলসে ওঠে তার আভিজাত্য। অথচ সবই এখন মলিন। গালের রুক্ষ দাড়ির আড়ালে ঢাকা পড়েছে তার সর্বক্ষণ সঙ্গী অহংকার। সর্বদা পোশাক সচেতন নাহিদের উপরের দুটো বোতামও বেপরোয়াভাবে খোলা। আস্তিন দুটো গুটিয়ে রেখেছে কনুই পর্যন্ত। মাথার চুল বড় হতে হতে এসে পড়েছে প্রায় চোখের ওপর। গিয়াসউদ্দিনের সম্মানার্থে চুলগুলোকে সে বারবার ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইছে পেছনের দিকে। গিয়াসউদ্দিন দীর্ঘ সময় তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বছর পঁচিশেক আগে এই ছেলেটির মা জনসম্মুখে বড় নগ্ন অপমান করেছিল তাঁকে। বোন অন্তঃপ্রাণ ভাইয়েরা পর্যন্ত রুষ্ট হয়েছিল তার আচরণে। এই পঁচিশ বছরেও সেই দাগ শুকাইনি। নাহিদকে তার মামারা ভালোবেসেও যেন ভালোবাসতে পারে না। কিছুদিন পর পর শাহিনূরের দাম্পত্য কলহ, বোনের এমন অভব্য ব্যবহার তাদেরকে আরও বিতৃষ্ণ করে তুলেছে। গিয়াসউদ্দিনের বিশাল সম্মানের আকাশে শাহিনূর একটা কালো দাগ। নাহিদও রক্ত গুণে সে পথেই এগিয়েছে। ওমনই গোঁয়ার, লম্পট হয়েছে এমনই গিয়াসউদ্দিনের ছেলেদের বিশ্বাস। শাহিনূরের ছেলের জন্যই সমগ্র গাঁয়ে আবারও নগ্নভাবে অসম্মানিত হয়েছেন তিনি। ছেলেরা গিয়াসউদ্দিনের অসম্মান সহ্য করতে না পেরে নাহিদকে চড় থাপড়া দিয়েছে। অপমান করেছে। গিয়াসউদ্দিনের পাঁচ নম্বর ছেলেটা বড় রগ চটা। নাহিদকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা পর্যন্ত সে করেছিল। শেষ পর্যন্ত, মঈনুল সামলে নিয়েছে। পঁচিশ বছর আগে মেয়ের প্রতি খুব রুষ্ট হয়েছিলেন গিয়াসউদ্দিন। কিন্তু নাতির প্রতি রুষ্ট হতে পারলেন না। বরং মামাদের ব্যবহারে অভিমানী ছেলেটা কতটা কষ্ট পেয়েছে ভেবে হুহু করে উঠল বুকের ভেতর। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু স্বাভাবিক বাঁধা পেরিয়ে অতোদূর এগুতে পারলেন না। কোমল কণ্ঠে বললেন,

‘ খেয়েছিস সকালে?’ 

নাহিদ চোখ তুলে নানাজানের দিকে তাকাল। সে খায়নি। শুধু আজ সকালে নয় কাল রাতেও সে কিছুই মুখে তুলেনি। এই বাড়ি থেকে আর একটা দানা গ্রহণ করাও তার পক্ষে সম্ভব না। তারপরও বলল,

‘ খেয়েছি নানাজান।’ 

গিয়াসউদ্দিন বুঝলেন, নাহিদ খায়নি। মায়ের মতোন অভিমানী হলেও ওই পশুর বংশে থেকেও মায়ের মতো অভব্য, রুচিহীন হয়ে সে গড়ে ওঠতে পারেনি। আত্মগরিমায় সে হয়েছে গিয়াসউদ্দিনের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী। এতো অপমানের পর এই বাড়িতে যে সে অন্নগ্রহণ করবে না তা তিনি ভালো করে জানেন। গিয়াসউদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন,

‘ আয় নানা, এক সঙ্গে গোসল করি।’ 

নাহিদ প্রতিবাদ করল না। নানাজানের কথায় তারা প্রতিবাদ করতে শিখেনি। গায়ের জামা খুলে সে নানাজানের সঙ্গে নেমে গেল দিঘীতে। গিয়াসউদ্দিন ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা মতিনকে হাঁক দিয়ে বললেন,

‘ ঘর থেকে নাহিদের জামা আনার ব্যবস্থা কর তো, ছোকরা।’ 

নাহিদ এর মধ্যেই সাঁতরে অর্ধেকটা দিঘি ঘুরে এসে বলল,

‘ তার দরকার হবে না নানাজান। আমি ঘরে ফিরে জামা বদলে নিব।’ 

গিয়াসউদ্দিন আর কথা বাড়ালেন না। হেসে বললেন, 

‘ তুই তো সাঁতারে বেশ ভালো! অলম্পিকে নাম লেখাতে পারবি দেখছি।’ 

নাহিদ হাসল।

‘ আপনার সঙ্গে পারলেই আমার অলম্পিক জেতা হয়ে যাবে। আপনি এই বয়সে একবার দিঘি পাড় করতে করতে যদি আমি তিনবার ঘুরে আসতে পারি তাহলে বুঝব যৌবন এখনও আছে। ঝরে যায়নি।’ 

গিয়াসউদ্দিন হেসে ফেললেন,

‘ ওরে ছোকরা! তোর যৌবন তো এখনও এসেই পৌঁছাতে পারল না। দুইদিন আগে সবগুলোকে এক সঙ্গে ধরে খতনা করানো হলো। এখনই ঝরে যাওয়ার চিন্তা করছিস।’ 

নাহিদ আঁতকে উঠার ভান করে বলল,

‘ কী বলেন নানাজান! সেসবের বারো বছর কেটে গিয়েছে। মিস্টার জহিরুল্লাহকে বলুন আপনার তথ্য ভান্ডারকে আপডেট করতে। যাদের সেদিন একসঙ্গে আনুষ্ঠানিকতা সেরেছেন। তাদের প্রত্যেকেই এখন যৌবনের যাতনায় রাতে নিঃসঙ্গ বিছানায় হু হু করে কাঁদে।'

নাহিদের রসিকতায় হেসে উঠল দিঘি পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মজিদ আর মতিন। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল সেরে দিঘি থেকে উঠে এলেন গিয়াসউদ্দিন। নাহিদ বাড়ির দিকে রওনা দিতেই শুকনো কাপড়ের পকেট থেকে কিছু টাকা নিয়ে গুঁজে দিলেন নাহিদের হাতে। গম্ভীর গলায় বললেন,

‘ চুল-দাড়ি ছেঁটে একটু মানুষ হয়ে আয়। দুপুরে আমার সঙ্গে খাবি।’ 

কলেজ পাশের পর ঈদ ছাড়া গিয়াসউদ্দিন কখনও কাউকে টাকা-পয়সা দেন না। এই অসময়ে তাঁর এমন দয়ায় কিছুটা আশ্চর্য হলো নাহিদ। ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে চলে গেল বাড়ির দিকে। ভেজা কাপড় ছেড়ে নানাজানের কথা মতো চুল কাটাতে গেল বাজারে। গিয়াসউদ্দিন দুপুরে খেতে বসে নাহিদের খোঁজ করলেন। জানতে পারলেন, নাহিদকে শেষবার দেখা গিয়েছিল গ্রামের বাজারে। বাজারের নাপিতের কাছে চুল কাটার কথা থাকলেও চুল না কেটে তাকে টমটমে করে শহরের দিকে যেতে দেখা গিয়েছে। তারপর আর ফিরেনি। 

—————

‘এই মেঘলা দিনে একলা 
ঘরে থাকে না তো মন। 
কাছে যাব কবে পাব, 
ওগো তোমার নিমন্ত্রণ?’

জাদুর শহরে আজ শীতল বর্ষার নৃত্য। মৌনি যখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল তখন আকাশের মেদুর গায়ে ছড়িয়ে ছিল মোলায়েম রোদ। মৌনি বাসা থেকে বেরিয়ে ভেবেছিল হাতিরঝিলের দিকে যাবে। হাতিরঝিলে দুটো কামরা ভাড়া করে নিজের অফিস শুরু করেছে মিথি। স্ক্রিপ্ট নিয়ে কিছু আলোচনা করার জন্য মৌনিকে অফিসেই ডেকেছিল সে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একেবারে নিজের বাসায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে বসল মিথি। মৌনির যদিও কারো বাসায় যেতে বড় বিরক্ত লাগে। কিন্তু আজ তাকে খুব একটা বিরক্ত দেখাচ্ছে না। অলস মৌনির জন্য হাতিরঝিল থেকে কলাবাগানে যাওয়াই অধিক সুবিধার হবে ভেবে বরং আনন্দ হচ্ছে । সেই আনন্দকে আরও একটু আনন্দময় করে দিতে নামল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। মৌনির কাছে ছাতা নেই। বৃষ্টিতে ভিজে বিরক্ত হওয়ার বদলে হেসে ফেলল সে। একটা রিকশা নিয়ে গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে পৌঁছাল মিথির কলাবাগানের বাসায়। ততক্ষণে গোধূলি নেমেছে। বৃষ্টিটা একটু নিভে এসে আকাশে মেলেছে রংধনুর রঙ। মৌনি দরজায় কড়া নেড়ে উদাস মনে রংধনু দেখছিল। তখনই দরজা খুলল সাব্বির। দরজার বাইরে ভেজা কাপড়ে মৌনিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খুব আশ্চর্য হলো। মৌনি অবশ্য ঘাড় ফিরিয়ে সাব্বিরকে দেখে মিষ্টি করে হাসল। খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,

‘ কেমন আছেন, সাব্বির ভাই? বলুন তো আমি কে? যদি আমার নাম বলতে পারেন তাহলে আপনাকে একটা প্রাইজ দিব। বলুন বলুন। ওয়ান, টু, থ্রী…’ 

সাব্বির কলের পুতুলের মতো বলল,

‘ মৌনি।’ 

মৌনি অবাক হয়ে বলল,

‘ আরে! আপনি তো দেখি পাশ করে ফেলেছেন। আপনাকে যতটা বোকা ভেবেছিলাম ততটা বোকা আপনি নন। দেখি, ভেতরে ঢুকতে দিন। নাকি ঢুকতে দিবেন না?’ 

সাব্বির নিজের বাসায় মেয়েদের যাতায়াত খুব একটা পছন্দ করে না। মিথির সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগে এই বাসায় রমণী বলতে কেবল বুয়ারই আনাগোনা ছিল। বেশির ভাগ সময়ই ওই সময়টাতে নিজের ঘরে দোর দিয়ে রাখতো সাব্বির। আর এখন…! দীর্ঘশ্বাস ফেলল সাব্বির। দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলল,

‘ আসুন।’ 

মৌনি ভেতর ঢুকে চপল কণ্ঠে বলল,

‘ আপনার প্রাইজটা তো এখনও দেওয়া হলো না। আসলে আমি ভেবেছিলাম, আপনি আমার নাম বলতে পারবেন না। হুট করে বলে ফেলে আমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছেন। এখন আমি আপনাকে কী প্রাইজ দেই বলুন তো?’ 

সাব্বির সাবধানে দরজা আটকে মৌনির দিকে তাকাল। বলতে ইচ্ছে হলো,

 ‘ প্রাইজের কোনো দরকার নেই।’ 

কিন্তু বলতে পারল না। মেয়েটা যা চঞ্চল! যদি উত্তরে ভয়ংকর কিছু বলে বসে? তাছাড়া অযথা কথা বাড়াতেও ইচ্ছে হচ্ছে না। মৌনি তার কাঁধে ঝুলানো সুদৃশ্য পাটের ব্যাগটায় কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে বের করে আনল সুতায় কাজ করা সুন্দর কিছু চুড়ি। সাব্বিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

‘ নিন। আপনার প্রাইজ।’ 

সাব্বির বোকার মতো মৌনির হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। চুড়িগুলো হাতে নিয়ে বলল,

‘ এগুলো আমার?’ 

মৌনি মাথা নাড়ল,

‘ হু। তবে আপনাকে পরার জন্য দেইনি। এগুলো আপনি মিথি আপাকে উপহার দিবেন। আমরা হলাম জাতে মাতাল তালে ঠিক প্রজাতির মানুষ। নিজেদের লাভ ছাড়া কিছু বুঝি না। এইযে আপনাকে প্রাইজটাও দিলাম বেশ টেকনিক খাটিয়ে। এই চুড়িগুলোও এখন ঘুরেফিরে যাবে আমার বোনের কাছেই। আমরা বাইরের লোকের জন্য টাকা-পয়সা খরচ করতে পছন্দ করি না। আপনি তো আর আমাদের নিজের লোক না।’  

সাব্বির প্রত্যুত্তর করার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পেল না। কলের পুতুলের মতো চুড়িগুলো ট্রাউজারের পকেটে রাখল। মৌনি আশেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে সমবেদনার কণ্ঠে বলল,

‘ আপনাকে বাইরের মানুষ বলেছি বলে আবার কষ্ট পাবেন না, সাব্বির ভাই। কয়েকদিনের তো কথা, সামি এলেই আপনি হয়ে যাবেন আমাদের প্রাণের মানুষ। প্রসেস হতে যতদিন লাগে আরকি।’ 

সাব্বির সরল কণ্ঠে শুধাল,

‘ সরি, সামি কে?’ 

মৌনির অকপট জবাব, 

‘ কেন? আপনাদের ছেলে। সাব্বিরের “সা” আর মিথির “মি”, সামি। মেয়ে হলে অবশ্য “মি” এর জায়গায় “থি” বসাতে হবে। তখন হবে, সাথি। আচ্ছা, মিথি আপা কোথায়?’ 

সাব্বির ঘামতে লাগল। বিড়বিড় করে বলল, 

‘ সামি, সাথি!
ও মাই গড!’ 

————— 

মিথির বিছানায় বাবু হয়ে বসে কাজ গোছাচ্ছে মৌনি। বাইরে এমন আষাঢ়, এই আষাঢ়ে ব্যাকুল হয়ে থাকে মন। কাজ করতে ইচ্ছে হয় না। তারওপর এই ছাইপাঁশ কাজে মৌনির আগ্রহও নেই। অথচ মিথি নির্বিকার। চোখে-মুখে কঠিন গাম্ভীর্য এঁটে রেখে ফাইল থেকে পড়ে চলেছে একের পর এক ছোটগল্প। সব মৌনির লেখা। যেগুলো পছন্দ হচ্ছে সেগুলো আবার সরিয়ে রাখছে আলাদা করে। আলাদা করে রাখা গল্পগুলো আবারও পড়ছে নতুন করে। এতো ধৈর্য এই মেয়েটার! উফ! রুষ্ট হলো মৌনি। কাগজপত্রের উপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকাল। ঝমঝমিয়ে ঝরতে থাকা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে গুনগুনিয়ে গাইল, 

‘ এমন দিনে তারে বলা যায় 
এমন ঘনঘোর বরিষায়। 
এমন দিনে মন খোলা যায় –
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়।।’

 মৌনির পায়ের আঘাতে মিথির হাতের ফাইলটা ছিটকে পড়েছে তখন। মিথি নিচু হয়ে নীরবে ফাইলটা তুলে নিল। গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে মৌনির এই ছেলেমানুষিতে বিরক্ত হতে গিয়েও থমকাল। মৌনির গুনগুন কণ্ঠে বিবশ হয়ে চেয়ে রইল তার উদাসী মুখের দিকে। মনে হলো, কেবল এই কিন্নরী কণ্ঠের জন্যই এই মেয়েটিকে ক্ষমা করে দেওয়া যায় শত সহস্র বার। মৌনি গান থামিয়ে মিথির দিকে ফিরে শুলো। মাথার নিচে একহাত রেখে অনুযোগ করে বলল,

‘ তুমি তো দেখি ভারি আনরোমান্টিক মেয়ে মিথি আপা! এতো সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে। কোথায় বরের কোলে গিয়ে বসে থাকবে। রোমান্টিক রোমান্টিক গল্প করবে। রবিবাবুর গানে মত্ত হয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলবে। তা না এমন সিরিয়াস মুখ করে কাজ করতে বসে গেছ!’ 

মিথি উত্তর দিল না। সেকেন্ড কয়েক মৌনির দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে নতুন ফাইল টেনে নিল। মৌনি তা দেখে হতাশ কণ্ঠে বলল,

‘ দাদাজান যে কবে আমাকেও সাব্বির ভাইয়ের মতো কারো সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে!’ 

মৌনির দীর্ঘশ্বাসের বাহারে চোখ তুলে তাকাল মিথি। সরু চোখে চেয়ে শুধাল,

‘ সাব্বির সাহেবকে মনে হয় তোর খুব পছন্দ?’ 

মৌনি এবার উঠে বসল। ঠোঁট উল্টে বলল,

‘ নাহ। সাব্বির ভাই পছন্দ হওয়ার মতো তেমন কোনো লাড্ডু নন। তবে তোমার প্রতি তার ভালোবাসাটা আমার পছন্দ। এই যুগে এসে কোন পুরুষ শয়নেস্বপনে বউয়ের নাম ঝপে বলো?’ 

মিথি সন্ধিগ্ধ চোখে তাকাল,

‘ কবে তাকে শয়নেস্বপনে বউয়ের নাম ঝপতে দেখলি?’ 

মৌনি মনে মনে শিষ বাজাল, ‘এমন দিনে তারে বলা যায় ; এমন ঘনঘোর বরিষায়।’ ঠিক এই রকম একটা প্রশ্নই চাচ্ছিল মৌনি। কৃত্রিম বিস্ময় নিয়ে বলল,

‘ শুধু আমি? পুরো দুনিয়া দেখে বসে আছে।’ 

‘ মানে?’ 

ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো মিথির। মৌনি আয়েশ করে বলল,

‘ মাস দুয়েক আগে যে সাব্বির ভাই অসুস্থ হলেন? তখনই তো ঘটনাটা ঘটল৷’ 

‘ কী ঘটনা?’ 

অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করল মিথি। মৌনি রসিয়ে রসিয়ে বলল,

‘ সাব্বির ভাইয়ের সেইবার ডেঙ্গু টেঙ্গু হয়ে মরার দশা। একলা পড়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করল ইশতিয়াক ভাই। কেবিনে শিফট করার কয়েক ঘন্টার মাথায় সিচুয়েশন চলে গেল হাতের বাইরে। সাব্বির ভাইকে নেওয়া হলো আইসিইউতে। আজরাইল আর সাব্বির ভাইয়ের মুখোমুখি অবস্থান। ইশতিয়াক ভাই আমাদেরকে গ্রুপে জানালেন, সাব্বির ভাই সম্ভবত ঘন্টাখানেকের মধ্যে মারা যাবেন। আমরা যেন সকলেই আসি। দাদাজানকে খবর দেওয়া হলো। আমরা সকলে তাকে শেষ বিদায় দিতে এলাম। শুধু তুমি এলে না। অথচ বেচারা মরার ঘোরে কেবল তোমার নামই ঝপে চলেছে। তার এই অবস্থা দেখে নাহিদ তো একবার ভেবেছিল, তোমাকে তোমার বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসবে। কিন্তু দাদাজান কঠিন ধমক দিয়ে সাব্বির ভাইকে নিয়ে চলে গেলেন ময়মনসিংহ। ইশতিয়াক ভাইয়ের কাছে পরে গল্প শুনেছি, সাব্বির ভাইয়ের নাকি শেষ ইচ্ছেও ছিল শুধু তোমাকে দেখা। কী রোমান্টিক তাই না? ভাবতেই আদর আদর লাগে। কে এভাবে মরার আগেও শুধু আমাকে দেখতে চাইবে, বলো তো!’ 

কথাটা বলে ঠোঁট উল্টাল মৌনি। সাথে সাথেই চোখের তারায় ভেসে উঠল শাওনের ছবি। শাওন! মৌনির কেন যেন মনে হলো, এই পাগল ছেলেটা হয়তো মৃত্যুর আগেও তাকেই দেখতে চাইবে এক নজর। প্রতিবারের মতো মুগ্ধ হয়ে সে তাকিয়ে থাকবে প্রাণ চলে যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত। তার মতো ওমন মুগ্ধ হয়ে পৃথিবীর আর কেউ বোধহয় কোনোদিন তাকাতে পারবে না তার দিকে। মৌনির মেরুদণ্ডের কাছাকাছি অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল। মিথি মৌনির কথাগুলো হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ তুই কী এসব ফাউল কথাবার্তা ছাড়া সিরিয়াস কথা বলতে পারিস না? তোর এইসব বানানো গল্প শুনে ঋতির মতো সবাই বোকা বনে থাকবে এসব আজগুবি কল্পনা নিয়ে থাকিস না।’ 

মৌনি আর্তনাদ করে বলল,

‘ আরে! সত্যি বলছি। বিশ্বাস না হলে ইশতিয়াক ভাইকে জিজ্ঞাসা করো।’ 

মিথি এই বিরক্তিকর মেয়েটির সঙ্গে অযথা তর্কে না গিয়ে অপ্রসন্ন চোখে তাকাল। নীরস কণ্ঠে বলল,

‘ আমার কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করার ইচ্ছে নেই।’ 

মৌনি হতাশ কণ্ঠে বলল,

‘ না থাকলে নাই। এতো বড় ঘটনা জানানোর জন্য আমাকে এটলিস্ট এক কাপ চা খাওয়াও। এতো কৃপণ কেন তুমি?’ 

মিথি বিরক্ত হলো। এই মেয়েটা এতো অসহ্য! ফাইলটা হাত থেকে নামিয়ে রেখে চোখ-মুখ শক্ত করে সে চায়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। মিথি চলে গেলে, মৌনি কিছুক্ষণ মন খারাপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ তাকে অপছন্দ করলে তার মন খারাপ হয়। তারপর তাকে সে ফেলে দেয় নিজের অভিধানের বাইরে। মৌনি মনে মনে মিথিকে ফেলে দিল তার সমগ্র জীবনের বাইরে। মিথির কাছে আর কখনও আসবে না সে। মিথির প্রতি মৌনির এই সাহায্যটা একেবারেই অযথা। মিথি নিজের স্বার্থ ছাড়া কারো উপকার করে না। অন্যদিকে মৌনি স্বার্থ, নিঃস্বার্থ কোনোভাবেই কারো উপকার করে না। মৌনি উপকার করে তার ইচ্ছানুযায়ী। বিনিময়ে কিছুই ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশা রাখে না। মিথির থেকেও কিছু পাওয়ার আশা নেই মৌনির। এক মিথিকে জীবন থেকে অদৃশ্য করে দিলে কিচ্ছু যাবে আসবে না তার। মিথিকে কল্পনায় ঝরা পাতার মতো উড়িয়ে দিয়ে আনন্দিত হলো মৌনি৷ কিছুক্ষণ গুনগুনিয়ে শিষ বাজিয়ে ধীরে ধীরে গলা ছেড়ে গান ধরল- 

‘ এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়…’ 

—————

শহরের বুকে সন্ধ্যা নেমেছে। ক্লান্ত পাখিরা অনেক আগেই ফিরে গিয়েছে নীড়ে। রাজধানীর একটা পার্কে শান বাঁধানো বেঞ্চিতে একলা, নীড়হীন শুয়ে আছে নাহিদ। একটু আগেই আকাশ ভেঙে বর্ষা নেমেছে। তখনও এখানেই নির্বিকার শুয়ে থেকেছে সে। এখন বৃষ্টি নেই; পূর্ব দিকের আকাশে মস্ত বড় চাঁদ। শহরের কৃত্রিম আলোয় চাঁদের আলোটা যদিও খুব স্পষ্ট নয়। তারপরও নাহিদের মনে হলো, আজ বুঝি পূর্ণিমা। নাহিদ পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট খুঁজল। বৃষ্টির পানিতে ভিজে ন্যাতনেতে হয়ে গিয়েছে সব সিগারেট। একটাও খাওয়ার যোগ্য নয়। নাহিদ বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। ভেজা প্যাকেটটা রাস্তার পাশে ছুঁড়ে ফেলে হেঁটে গেল কোনো দোকানের খোঁজে। পার্ক থেকে বেরিয়ে একটা দোকান থেকে দুটো সস্তা সিগারেট কিনল। দোকানে ঝুলিয়ে রাখা গ্যাসলাইট থেকে আগুন ধরাতেই পাশ থেকে ভেসে এলো একটা কণ্ঠ,

‘ বেনসন ছাড়া আর কোনো সিগারেট যে ছুঁয়ে দেখে না। সে আজকাল এসব সস্তা সিগারেটও খাচ্ছে তাহলে!’ 

নাহিদ সিগারেটটা ধরিয়ে পাশ ফিরে তাকাল। জ্বলন্ত শলাকায় এক টান দিতেই দুইদিনের না খাওয়া পেটে যেন মোচড় দিয়ে উঠল। বিকৃত হয়ে গেল মুখ। তারপরও নির্বিকার কণ্ঠে শুধাল,

‘ তুই এখানে কী করছিস?’ 

সৌধ জবাব দিল না। নাহিদ বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ তুই কী সামহাউ আমাকে ফলো করছিস?’ 

এবারও জবাব নেই সৌধর। নাহিদ সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে কঠিন কণ্ঠে বলল,

‘ যদি করে থাকিস তাহলে ডোন্ট। আমাকে আমার মতো থাকতে দে। আর আমার চোখের সামনে থেকে বিদেয় হ। প্লিজ!’ 

সৌধ বিদেয় হলো না। তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হলো, এতো সহজে সে নাহিদের পিছু ছাড়বে না। নাহিদ এবার ভয়ংকর চটে গেল। সৌধর শার্টের কলার চেপে ধরে বলল, 

‘ শালা! বলেছি না? আমার পিছু ছেড়ে দে? কেন পিছু পিছু আসছিস? হোয়াই!’ 

সৌধ নাহিদকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে দ্বিগুণ রাগ নিয়ে বলল,

‘ এই রাস্তা তোর বাপের? আমি যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাব তোর কী?’ 

প্রত্যুত্তরে সৌধর নাক বরাবর কঠিন এক মুষ্ট্যাঘাত করে বসল নাহিদ। সৌধও পিছিয়ে নেই। সে-ও মারল নাহিদের চোয়াল সই করে। কুৎসিত গালিগালাজ আর প্রায় রক্তারক্তি কান্ড ঘটিয়ে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ল দু'জনেই। ফুটপাতে পা ছড়িয়ে বসে পড়ে নাহিদ তাকাল সৌধর দিকে। ঠোঁটের কোণের রক্তটুকু বুড়ো আঙুলে মুছে ফেলে আশালীন একটা গালি দিল। বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ আমি তোর জামাই লাগি? আমার পিছে পিছে ঘুরিস কেন শালা? সত্যি করে বল, তোর উদ্দেশ্য কী? দেখ, আমি কিন্তু স্ট্রেইট।’ 

সৌধ দাঁত কটমট করে তাকাল,

‘ বান্দি* পুত! মুখ খারাপ করাবি না আর। চুপচাপ বাসায় চল। তোকে রেখে আমি যাব না।’ 

নাহিদ ফুটপাতেই লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

‘ আমার যখন বাসায় ফেরার হবে আমি ফিরব। তোর আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।’ 

তারপর একটু থেমে বলল,

‘ দেখ, সৌধ। আমি আর কোনোভাবেই চাই না তুই আমার কাছে আছিস। আমাদের যোগাযোগ থাকুক। আমি আমার মতো থাকতে চাই। নিজেকে নিজের হালে ছেড়ে দিতে চাই। এই পৃথিবীর কেউ আমাকে নিয়ে না ভেবে আমার প্রতি অনেক বড় উপকার করেছে। সেখানে তুই কেন বাঁধা হচ্ছিস বল তো? প্লিজ ভাই, ছেড়ে দে আমার পিছু। আমি কাউকে চাই না। কাউকে না। এতটুকু ফেবার তো তুই আমাকে করতেই পারিস?’ 

সৌধ দু'হাতের উপর ভর দিয়ে নিশ্চুপ বসে রইল। দুই বন্ধু এক সঙ্গে নীরবে তাকিয়ে রইল আকাশে। অনেকটা সময় চুপ থাকার পর সৌধ শুধাল,

‘ মিষ্টিকে তুই এতো ভালোবাসতি নাহিদ? তার চলে যাওয়ায় তোর গোটা পৃথিবীটাই মিথ্যা হয়ে গেল?’ 

নাহিদ মাথার নিচে দু'হাত রেখে আরাম করে শুয়ে ছিল। সৌধর প্রশ্নে আকাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে বলল,

‘ মিষ্টি কোনো বিষয় না সৌধ। মিষ্টি কোনো বিষয় না।’ 

‘ তাহলে বিষয়টা কী?’ 

নাহিদ উত্তর দিল না। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

‘ জানিস? বাবুনও আমার সঙ্গে রাগ করেছে।’ 

সৌধ প্রশ্ন নিয়ে তাকাল। শুধাল,

‘ বাবুন! কে? তোর ওই স্বপ্ন পাওয়া ছেলে?’ 

নাহিদ যেন প্রশ্নটা শুনল না। বলল,

‘ ওকেও আমি খারাপ কথা বলেছি।’ 

সৌধ শুধাল,

‘ কী বলেছিস?’ 

‘ ওর মাকে খারাপ মেয়ে বলেছি।’ 

সৌধ কিছু বলল না৷ নাহিদের দু'চোখ ফেঁটে যেন জল বেরুতে চাইল। ধরা কণ্ঠে বলল, 

‘ ও এতো কাঁদছিল!’ 

‘ কে কাঁদছিল? বাবুন?’ 

নাহিদের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল এবার, 

‘ আমিও তো জানি ও খারাপ মেয়ে না। এই পৃথিবীর সবাই জঘন্য হলেও ও পবিত্র। পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর ফুল। আমার এতো আদরের! তারপরও ওকে নিয়ে এতো খারাপ কথা কী করে বলে ফেললাম আমি সৌধ? আমি এতো নীচ! এতো জঘন্য!'  

কথা বলতে বলতে সৌধকে অবাক করে দিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল নাহিদ,

‘ বাবুন বলেছে আর কখনও সে আমার কাছে আসবে না। ওর মাকেও আসতে দিবে না। বেশ হবে আসবে না। আমার মতো জঘন্য মানুষের সঙ্গে কারো থাকা উচিতও না।’ 

তারপর আচমকা বলল,

‘ আমি ওকে ভালোবাসি সৌধ। অনেক ভালোবাসি। ’ 

বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল নাহিদ। সৌধ বন্ধুর এই রূপে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। বুঝল, ছেলেটা স্বাভাবিক বোধশক্তি হারিয়েছে। শান্ত কণ্ঠে বলল,

‘ কাকে ভালোবাসিস দোস্ত? বল আমাকে? পৃথিবী খুঁজে হলেও তাকে তোর পায়ের কাছে এনে দিব আমি। আই প্রমিজ বন্ধু।’ 

নাহিদ উত্তর দিতে পারল না। কেবল কাঁদল। কী করুণ সে কান্না! কান্নার ফাঁকে ফাঁকে অস্পষ্ট স্বরে বলল,

' আমি ওকে ভালোবাসি৷' 

সৌধ ওকে টেনে ফুটপাত থেকে তুলতে গিয়ে বুঝল, জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে নাহিদের গা। সৌধ তাকে টেনে তুলতেই দু'পা হেঁটেই হড়হড় করে বমি করল নাহিদ। ক্লান্ত গলায় বিড়বিড় করে বলল,

‘ ও আমাকে আর কক্ষনো ভালোবাসবে না।’ 

সৌধ ওকে ধরে একটা গাড়ির সন্ধান করতে করতে বলল,

‘ না বাসুক। পৃথিবীতে মেয়ের অভাব আছে?’ 

নাহিদের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। চোখে টলটলে জল নিয়ে অবুঝ বালকের মতো বলল,

‘ কেন ভালোবাসবে না?’ 

সৌধ উত্তর দিতে পারল না। বন্ধুকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে নিষ্ফল ক্রোধে ভেতরটা ঝলসে গেল। বেঈমান নারীজাত! আগুনে ঝলসিয়ে মারা উচিত এদের। নাহিদকে নিয়ে গাড়িতে উঠার আগে আরও দুইবার বমি করে একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেল নাহিদ। সৌধ বন্ধুকে ঝাপটে ধরে অসহায় মুখে বসে রইল। সিদ্ধান্ত নিতে পারল না, কোথায় নিয়ে যাবে নাহিদকে? বাসায় নাকি হাসপাতালে? কিন্তু ভুলেও কাউকে জানানোর আগ্রহ হলো না সৌধর। অচেতন বন্ধুর পক্ষ থেকে সমগ্র পৃথিবীর প্রতি অভিমান করার দায়িত্বটা যেন নিজ দায়িত্বে নিয়ে নিল নিজের কাঁধে। এই পৃথিবীতে ছেলেটার সব থেকেও কিচ্ছু নেই। কেউ নেই। মানসিক অশান্তি ছাড়া কেউ তাকে দুদন্ড শান্তি দিতে পারেনি। এই বিশাল পৃথিবীতে কী এমন কেউ নেই যে স্বস্তি হয়ে নামবে তার বুকে? আরাম হয়ে মিশে যাবে জীবনের সাথে? বন্ধুর দুঃখে ধীরে ধীরে অভিমানী হয়ে উঠল সৌধর দু'চোখ। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp