আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৩৯ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          উন্মুক্ত জানালা দিয়ে সকালের রোদ্দুর এসে পড়েছে টবে লাগানো গাছের মাথায়। একটা আরামদায়ক আলস্য ঘরের ভেতর, বইয়ের তাকে। উপরতলার ফ্ল্যাটে বোধকরি আজ বিশেষ রান্নার আয়োজন হচ্ছে। ঘরময় ভেসে বেড়াচ্ছে লোভনীয় খাবারের সুবাস৷ সাব্বির বসার ঘরে বেতের চেয়ারে বসে চোখ বুলাচ্ছে খবরের কাগজে। চারদিকে কেমন ছুটি ছুটি সৌরভ। ছুটির দিনগুলোতে সাব্বির সাধারণত শহরের বাইরে থাকে। আজকের পরিকল্পনাটাও সেরকম। সকালের নাস্তাটা সেড়ে সে বেরিয়ে যাবে টাঙ্গাইলের একটা এতিমখানার উদ্দেশ্যে। ফিরতে ফিরতে পরের দিন ভোর। প্রতি সপ্তাহের অভ্যস্ত রুটিন। তারপরও আজ খুব আলস্য পাচ্ছে তার। এভাবেই অলস বসে থেকে কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে গোটা দিন। এই অলস ইচ্ছের পেছনে একটা সুপ্ত কারণ সম্ভবত, মিথি। অন্যান্য ছুটির দিনগুলোতে মিথি বাইরে বাইরে থাকলেও আজ সে বাড়িতেই আছে। সকালবেলা দু’জনের সাক্ষাৎ না হলেও সাব্বির ঘরে তার চলাফেরা অনুভব করতে পারছে। মিথির গায়ের সুবাস ভূতের মতন ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরের প্রতিটি দেওয়ালে দেওয়ালে। এই সুবাস সাব্বিরের অচেনা নয়। সাব্বির খবরের কাগজ থেকে চোখ তুলে একবার আঁড়চোখে মিথির শোবার ঘরের দরজার দিকে তাকাল। সেদিনের ওমন অবহেলার পর আত্মসম্মানী মিথির সঙ্গে আবারও একটা অস্বস্তিকর দূরত্ব তৈরি হয়েছে তার। দু’জনের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ প্রায় বন্ধ। কথাবার্তাও সীমিত। খুব সম্ভবত মিথি খুব শীঘ্রই বাসাটা ছেড়ে দিবে। এমনটাই হওয়া উচিত। সাব্বিরও তাই চায়। কিন্তু চাওয়ার পরও চাওয়া থাকে। সুপ্ত, অনুচ্চারিত হয়ে গেঁথে থাকে মনের ভেতর। সাব্বিরের অলস ভাবনার প্রহর কাটল কলিংবেলের শব্দে। এই শহরে, বলতে গেলে এই গোটা পৃথিবীতে সাব্বিরের পরম আত্মীয় বলে কেউ নেই৷ এই দীর্ঘ জীবনে তার বাসায় বেড়াতে এসেছে এই রকম কারো কথা সাব্বিরের মনে পড়ে না। বিয়ের আগে এই বাসায় একলা থাকত সাব্বির। দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় বুয়ার আনাগোনা হতো। তারপর এলো মিথি। তাদের সকলের কাছেই ঘরের চাবি আছে। কাউকেই কলিংবেল বাজিয়ে আসতে হয় না। বহুদিন পর এই অকাজের বেলটা বেজে উঠায় প্রথমে খুব চমকাল সাব্বির। একটু বিভ্রান্ত হয়ে শব্দের উৎস বুঝার চেষ্টা করল। সেকেন্ড দুই পর ঘটনাটা পরিষ্কার হতেই উঠে গিয়ে দরজা খুলল। দরজা খুলে যা দেখল তাতে তার বিস্ময় বাড়ল বৈ কমল না। একটা অল্প বয়স্ক ছেলে মাখন রঙের টিউলিপ ফুলের বিশাল একটা বুকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে দরজায় ৷ সাব্বির দরজা খুলতেই ছেলেটা অমায়িক হাসল। সাব্বির ছেলেটিকে খেয়াল করে দেখল। আগে কোথাও দেখেছে কি-না মনে করবার চেষ্টা করল। মনে করতে পারছে না। ছেলেটা সাব্বিরের হাঙ্গামা কিছু কমিয়ে দিতে নিজের পরিচয় দিল। হাসিমুখে বলল,

‘ আসসালামু আলাইকুম স্যার। আমার নাম আশরাফ। জনপ্রিয় অভিনেতা সাফাত স্যারের পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট। স্কয়ার গ্রুপের এমডি স্যারকে ডেকে নিয়ে মিথি ম্যামের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। দর্শকরাও খুব পছন্দ করছে। স্যার ম্যামের মধ্যে চমৎকার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। তাই তিনি মিথি ম্যাডামের প্রথম নাটকের জন্য শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন। মিথি ম্যাডাম কী বাসায় নেই? একটু ডেকে দেওয়া যাবে?’ 

সাব্বিরের আলস্য ভরা সকালটা সাফাতের নামটা শুনে বিতৃষ্ণায় ভরে গেল। মুখে আষাঢ়ের আঁধার 
নিয়ে সে ফুলের বুকেটটির দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে গেল ময়মনসিংহে থাকাকালীন ফরিদা খালার কথা। এমন দামী ফুলের ছড়াছড়ি দেখে তো এখন মনে হচ্ছে, ফরিদা খালার কথাটা খুব একটা মিথ্যা না। সাব্বির শীতল কণ্ঠে বলল,

‘ দুঃখিত, মিথি বাসায় নেই।’ 

এমন স্পষ্ট মিথ্যাটা বলে ফেলে নিজেই যেন চমকে গেল সাব্বির। প্রয়োজনবোধে নীরব থাকলেও অপ্রয়োজনে কখনও মিথ্যা কথা বলে না সে। আজ বলল। কেন বলল, সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না। মনে মনে নিজের প্রতি তীব্র হতাশা নিয়ে আশরাফের হাত থেকে ফুলের বুকেটা নিল। আশরাফ আনন্দে গদগদ কণ্ঠে বলল,

‘ স্যার যদিও বুকেটটা ম্যামের হাতেই দিতে বলেছিল। কিন্তু আপনি নিলেও সমস্যা নেই। ম্যামের সঙ্গে আপনার চেহারার বেশ মিল। আপনি নিশ্চয় ম্যামের ভাই? বিগ ব্রাদার?’ 

সাব্বিরের আঁধার মুখ এবার অমবস্যার রাতের মতো অন্ধকার হয়ে গেল। সে বরাবরই শান্ত মানুষ। সকল সামাজিকতা থেকে দূরে থাকে বলে মানুষের সংস্পর্শে যায় কম। একলা, একা থেকে থেকে রাগ করবার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলেছে সেই ছেলেবেলাতেই। অথবা রেগে যাওয়ার মতো অনুভূতিই তার নেই। কিন্তু আজ ভেতর ভেতর দারুণ অসন্তুষ্ট হয়ে উঠল তার মন। আশরাফের দিকে এমন তীব্র চোখে তাকিয়ে রইল যে কথা না বাড়িয়ে দ্রুত বিদায় নেওয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ মনে করল সে। সাব্বির বুকের ভেতর বিক্ষুব্ধ এক মন খারাপ নিয়ে মিথির শোবার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল। ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে মুখ কালো করে বলল,

‘ এটা আপনার। আশরাফ নামের একজন পৌঁছে দিয়ে গেল। সম্ভবত সাফাত নামের কোনো ভদ্রলোক পাঠিয়েছেন।’ 

মিথি হাতের কাজে সাময়িক ইস্তেফা দিয়ে একবার চোখ তুলে তাকাল। সাফাত তাকে বাড়ি বয়ে ফুল পাঠিয়েছে – এই বিশেষ আপ্যায়নে কিছুটা বিস্মিত হলেও প্রকাশ করল না। আন্তরিক কণ্ঠে বুকেটটা টেবিলের উপর রেখে যেতে অনুরোধ করল। মিথির এতো আন্তরিকতাও এক মুহূর্তের জন্য বিষের মতো লাগল সাব্বিরের৷ ফাজিল মেয়ে, নায়কের থেকে ফুল পেয়ে নিশ্চয় মনে মনে তা তা থৈ থৈ করে নাচছে! বুকেটটা জায়গা মতো নামিয়ে রেখে না চাইতেও মিথির উপর চোখ পড়ল তার। মিথিকে ব্যাগপত্র গোছাতে দেখে গম্ভীর মুখে চাপা কৌতূহল নিয়ে শুধাল, 

‘ কোথাও যাচ্ছেন নাকি আপনি?’ 

মিথি মাথা তুলে তাকাল। সাব্বিরের সঙ্গে আগডুম বাগডুম খেলা যথেষ্ট হয়েছে। এখন তার ক্যারিয়ারের পিক টাইম। এই মুহূর্তে এসব আগডুম বাগডুম খেলে নিজের মানসিক স্থিতিশীলতা হারানোর পক্ষপাতি সে নয়। মিথি সহজ গলায় বলল,

‘ যাচ্ছি না। তবে যাওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছি। হাতিরঝিল আমার অফিসের কাছে ছোট্ট একটা সাবলেট ভাড়া নিয়েছি। ওখানে থাকলে কাজ করতে সুবিধা। ভাবছি পরবর্তী মাসেই উঠে পরবো। আজ হাতে একটু সময় আছে। তাই যতটুকু পারছি গুছিয়ে রাখছি।’ 

খবরটা শুনে সাব্বিরের মিশ্র অনুভূতি হলো। মিথি নিজে থেকে দূরে সরে গেলে তার জন্য খুবই সুবিধা হয়। কিন্তু এই সুবিধাটা কেন যেন তার মন মতো হচ্ছে না। এই ফুলেল শুভেচ্ছার পর আরও বেশি বিরক্ত লাগছে। মুখ শুকনো করে বলল,

‘ ওহ, ওকে!’  

মিথি হাতের কাজ ফেলে সাব্বিরের দিকে গাঢ় চোখে তাকাল। কঠিন কণ্ঠে বলল,

‘ নো, ইট'স নট ওকে।’ 

হঠাৎ মিথির এই কাঠিন্যে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে গেল সাব্বির। বিমুঢ় কণ্ঠে বলল,

‘ সরি?’ 

মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কাপড়ের বহর সরিয়ে বিছানায় সাব্বিরের মুখোমুখি বসল। পা বাড়িয়ে একটা টুল এগিয়ে দিয়ে বলল, 

‘ বলছি। এখনই বলব। আপনার সঙ্গে আমার কিছু জরুরি কথা বলা দরকার। কথাগুলো এখনই সেড়ে ফেলা ভালো। প্লিজ সীট ডাউন।’ 

সাব্বির কলের পুতুলের মতো এগিয়ে গিয়ে টুলের উপর বসল। কিছুটা দ্বিধান্বিত চোখে সে তাকিয়ে রইল মিথির দিকে৷ মিথি তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

‘ সাব্বির সাহেব, আমরা দু'জন স্বামী-স্ত্রী; প্রায় মাস ছয়েক হতে চলল আমাদের বিয়ে হয়েছে। এখন আমরা দু'জন আলাদা বাসায় উঠছি। এবং আমরা দু'জনেই জানি এটাই আমাদের সম্পর্কের শেষের শুরু। আমি বাসা শিফট করেই সর্বপ্রথম আপনাকে ডিভোর্স লেটার পাঠাব। আর আপনি বিনা বাক্যব্যয়ে সেখানে সিগনেচার করে দিবেন। কিন্তু আমি এখনও জানি না, কেন আমাদের সম্পর্কটা শুরু হলো না৷ কারণটা কী আপনি জানেন সাব্বির?’ 

সাব্বির উত্তর দিতে পারল না। ছুটির দিনের ভ্যাপসা গরম নাকি মিথির মুখোমুখি হওয়ার ভয়, জানা নেই। তবে সাব্বির ভেতর ভেতর খুব অস্থির বোধ করতে লাগল। কিছুক্ষণ তার উত্তরের অপেক্ষা করে মিথি নিজে থেকেই বলল,

‘ আমি পার্ফেক্ট কেউ নই, সাব্বির৷ কিন্তু আমি আমার জীবনে যে কাজই করেছি তাতেই নিজের হান্ড্রেড পার্সেন্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তারপরও সাকসেস না পেলে ব্যর্থতার কারণগুলো খুঁজে বের করে দ্বিগুণ পরিশ্রম করে ঘাটতিগুলো শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। দাদাজান আকস্মিকভাবে আমাদের একটি সম্পর্কে জড়িয়ে দিয়েছেন। এই সম্পর্কের জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। তারপরও আমি সম্পর্কটাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। পারিনি। যার ফলে সম্পর্কটা এখন ভেঙে যাওয়ার পথে। দাদাজান আমাদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই এমন আকস্মিক বিয়ে ঘটিয়েছেন। তাদের সম্পর্কগুলো টিকে গিয়েছে। আমারটা টিকল না। কেন টিকল না? নিশ্চয় কোনো কারণ আছে? সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আগে আমি আমার কমতিগুলো জানতে চাই। মানুষের জীবন কোথাও থেমে থাকে না। কথায় আছে না? ‘ দ্য শো মাস্ট গো অন’। আপনার সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার পর আমার জীবন থেমে থাকবে না। এখন ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও জীবনের কোনো এক পর্যায়ে আমি নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবো। সন্তান জন্ম দিব। তখন এই কমতিগুলো যেন আর না থাকে, তাই আমার জানা উচিত, আমার মধ্যে ঠিক কী সমস্যা ছিল?’ 

সাব্বির এই প্রশ্নের উত্তরে কী বলবে ভেবে পেল না। প্রশ্নের উত্তরগুলো তার কাছে থাকলেও সেই উত্তর দেওয়ার মতো আকাঙ্খা তার নেই। মিথিকে কী সে বলবে? আপনার কোনো সমস্যা নেই। সব সমস্যা আমার। সে কথার উত্তরে আবার কী সব প্রশ্ন রেখে বসবে সেই আশঙ্কায় নীরব থাকার সিদ্ধান্তই নিল সে। মিথি কিছুক্ষণ সাব্বিরের ভাবগতি লক্ষ্য করে শীতল কণ্ঠে শুধাল,

‘ ডু ইউ হ্যাভ এনি এ্যাফেয়ার? উইদ..উইদ সামওয়ান এল্স?’ 

একটু থেমে নিচু কণ্ঠে বলল, ‘উইদ বৃষ্টি?’ 

বৃষ্টি! আশ্চর্য হয়ে তাকাল সাব্বির। মিথির এমন অবান্তর চিন্তায় কী রকম প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত বুঝে পেল না সে। বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ বৃষ্টি! আপনি কী পাগল হয়ে গিয়েছেন মিথি? বৃষ্টি বাচ্চা একটা মেয়ে৷ ওর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক কী করে থাকতে পারে?’ 

মিথি স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বলল,

‘ তাহলে অন্য কারো সাথে?’ 

সাব্বির হতাশ চোখে তাকাল। তার চরিত্র সম্পর্কে মিথির এই রকম অশালীন ধারণায় গম্ভীর হয়ে গেল মুখ। মিথির দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে থমথমে কণ্ঠে বলল,

‘ মিথি, আপনার মনে হচ্ছে না আপনি আমাকে খুবই অপমানজনক প্রশ্ন করছেন? আপনি ছাড়া আমার কারো সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। ঘরে বউ রেখে অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়াব এমন মানুষ বোধহয় আমি নই।’ 

সাব্বিরের সাধুসন্ত ধরনের কথায় মেজাজ চটে গেল মিথির। শীতল চোখে তাকিয়ে কঠিন কণ্ঠে বলল,

‘ আপনি ঘরের বউয়ের সঙ্গেও জড়াতে পারেননি বলেই প্রশ্নটা আসছে সাব্বির। যদি আপনার অন্য কোনো পছন্দ না-ই থাকে তাহলে সমস্যাটা কোথায়!’ 

সাব্বির উত্তর দিল না। মিথির জেরার মুখে পড়ে ধীরে ধীরে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিল মন। মিথি গম্ভীর কণ্ঠে শুধাল, 

‘ আপনি যেদিন অসুস্থ ছিলেন। বৃষ্টি আপনার ঘরে এসেছিল। আপনারা খুব ঘনিষ্ঠ সময় কাটাচ্ছিলেন। বৃষ্টির সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক না থাকলে এসব কেন সাব্বির? শিশু বৃষ্টি নিশ্চয় সেদিন আপনার কাছে এ বি সি ডি শিখতে আসেনি।’ 

প্রত্যুত্তরে মিথির দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল সাব্বির। এজন্যই বোধহয় লোকে বলে ঘরের বউ মাত্রই ভয়ংকর। মনে মনে গোবেচারা সাব্বিরের চরিত্রে কত ধরনের দাগ এই রমণী লাগিয়েছে তা চিন্তা করেই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল সে। নিজের নামের সঙ্গে অহেতুক কলঙ্কে ভেতর ভেতর অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। অসন্তুষ্ট কণ্ঠে বলল, 

‘ বৃষ্টির সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠ সময় কাটাচ্ছিলাম! আপনি এতো কিছু ভাবেন কী করে মিথি? নাটক বানাতে বানাতে জীবনটাকেও নাটক মনে হয় আপনার? সেদিন আমি অসুস্থ ছিলাম। আই ওয়াজ নট ইন মাই সেন্সেস্।’ 

সাব্বিরের রাগের বাহারে খানিকটা নিভল মিথি। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

‘ তারমানে আপনি বলতে চাইছেন, বৃষ্টির সঙ্গে আপনার কিছু নেই?’ 

সাব্বির স্ত্রীর দিকে কড়া চোখে তাকাল। মিথি ওই দৃষ্টিকে পরোয়া না করে কাঁধ ঝাঁকাল,   

‘ ওকে!’ 

 কিছুক্ষণ নীরব মুহূর্ত কাটল। দু'জনেই দুই দিকে মুখ ফিরিয়ে নিশ্চুপে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ সাব্বিরের দিকে একটু এগিয়ে এসে মুখের কাছে মুখ এনে মিথি আবদার করল,

‘ আমার দিকে একটু তাকান তো সাব্বির।’ 

সাব্বির তাকাল। অনেক কিছু বলবার থাকলেও ছুটি ছুটি আবেশ মাখানো এই সকালে দুই জোড়া চোখ সমস্ত কথা ভুলে মনের অলিগলি ঘুরে ধীরে ধীরে ডুবে যেতে লাগল অনুভূতিতে নিমজ্জিত অচেনা, অপরূপ কোনো দেশে। মিথি সাব্বিরের মায়া মায়া বিষণ্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেই মিহি কণ্ঠে শুধাল,

‘ আমি কী একদমই সুন্দর নই সাব্বির?’ 

সুন্দরের প্রতিমার মুখে নিজের সৌন্দর্য নিয়ে এমন অবাঞ্ছিত প্রশ্নে কথা বলবার ভাষা হারিয়ে ফেলল সাব্বির। মনের আঁতিপাঁতি খুঁজেও এমন কোনো শব্দ খুঁজে পাওয়া গেল না৷ যার সঙ্গে এই অতুলনীয় সৌন্দর্যের তুলনা করতে পারে সে। কোনো শব্দ খুঁজে না পেয়ে নিজের এই অপারগতায় নিজেই মর্মাহত হলো সাব্বির। এই মর্মাহত ভাব কাটল মিথির করা এক প্রশ্নে। বিদ্যুৎ ঝলকের মতো এক ঝটকায় কেটে গেল সমস্ত ঘোর। মিথি তখনও সাবলীল। সাবলীল কণ্ঠেই সে আবার শুধাল, 

‘ ডোন্ট ইউ হ্যাভ এনি নিডস্?’ 

প্রথমে আশ্চর্য তারপর তীব্র অস্বস্তিতে নিঃশ্বাস আটকে গেল বুকের ভেতর। মরণব্যাধি রোগীর মতো সে কাশতে লাগল অনবরত। তার এই নিরন্তর কাশাকাশিতে সোজা হয়ে বসল মিথি। বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ অযথা কাশবেন না তো সাব্বির। কাশি থামান৷ কেশে টেশে যক্ষ্মা বাঁধিয়ে ফেলার মতো কোনো কথা আমি বলিনি। খুব স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছি। আমরা দু'জনই এডাল্ট। তাছাড়া, আপনি একজন ডাক্তার৷ এসব বিষয়ে লজ্জায় লাল হয়ে শ্বাস আটকে ফেলা আপনাকে মানায় না। সবার চাহিদা থাকে। আমারও আছে। যদি আপনার না থেকে থাকে তাহলে…’ 

শুনতে শুনতে সাব্বিরের কান মাথা গরম হয়ে উঠল এবার। এক হাতে নিজের কপাল চেপে ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,

‘ আপনার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে মিথি। আমরা এই বিষয়ে পরে কথা বলব। আমি এখন আসছি।’ 

কথাটা বলেই দাঁড়িয়ে পড়ল সাব্বির। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র চোখে তাকাল মিথি। ধমক দিয়ে বলল,

‘ চুপচাপ বসুন। যাচ্ছি বললেই তো যাওয়া যায় না সাব্বির। এটা আমার গোটা জীবনের ব্যাপার। হয়তো আপনার সঙ্গে জোরজবরদস্তি হয়েছে। কিন্তু তার জন্য আমি আমার ভাগের জবাবদিহিতা পাব না তা তো হতে পারে না। আজকেই এই বিষয়ে আমাদের শেষ আলোচনা। সোজাসাপটা উত্তর দিবেন, ডু ইউ হ্যাভ অর নট?’ 

সাব্বির অতিষ্ঠ হয়ে তাকাল। মুখ ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে শক্ত কণ্ঠে বলল,

‘ আই হ্যাভ৷’ 

সাব্বিরের উত্তরে চোখ সরু করে তাকাল মিথি। সাব্বিরকে গাঢ় চোখে নিরক্ষণ করে ভ্রু উঁচিয়ে বলল, 

‘ রিয়্যেলি!’ 

সাব্বির কড়া চোখে তাকাতেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

‘ ওকে! তারমানে আপনার চাহিদা আছে। কিন্তু সে চাহিদা আমার থেকে পূরণ হচ্ছে না। অন্য নারী ঘটিত ব্যাপারও নেই। তারমানে আপনার অন্যরকম কিছু পছন্দ। একেক জনের চাহিদা একেক রকম হতেই পারে, আই এ্যাম নট কমপ্লেনিং। বাট..। আর ইউ…’ 

সকাল সকাল দরজায় ওসব ফুল লতাপাতা দেখে এমনিতেই মেজাজ চটে ছিল সাব্বিরের। মিথির কণ্ঠে চাপা ইঙ্গিতে এবার আরও চটে গেল। এই প্রথম সে মিথির দিকে খুব রাগ নিয়ে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

‘ আই এ্যাম কমপ্লিটলি আ ম্যান। ফিজিক্যালি এন্ড ম্যান্টালি৷’ 

সাব্বিরের রাগের বহর দেখে হাসি পেয়ে গেল মিথির। ঠোঁট চেপে হাসি চাপার প্রাণান্ত চেষ্টা করে গম্ভীর হয়ে বসে রইল। মিথির এমন গম্ভীর চেহারা দেখে হঠাৎ খুব অসহায়বোধ করল সাব্বির। এই গাম্ভীর্যকে মনে হলো, মিথির অবিশ্বাস। মিথি তার কথা বিশ্বাস করছে না ভেবে আরও মেজাজ খারাপ হলো। ছেলেমানুষি ক্রোধ নিয়ে বলল,

‘ এখন কী আপনাকে প্রমাণ করে দেখাতে হবে?’ 

না চাইতেও হেসে ফেলল মিথি। সাব্বিরকে কঠিন কিছু কথা শোনানোর পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় কিছুটা মর্মাহত হলেও দুষ্টুমি করার লোভ সামলাতে পারল না। ঠোঁটে সমবেদনার হাসি নিয়ে হতাশ কণ্ঠে বলল,

‘ ইট'স ওকে। আমি বিশ্বাস করেছি। এতোদিনে যখন প্রমাণ করতে পারেননি। তখন আর এই নিয়ে আপনাকে কষ্টে ফেলতে চাইছি না। আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড।’  

মিথির এমন দায়সারা জবাবে ফ্যাকাশে হয়ে গেল সাব্বিরের মুখ। মিথি এই বাসায় থাকবে না, একদিন সাব্বিরকে ভুলে যাবে, নতুন কাউকে বিয়ে করবে সবকিছুই মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু মিথি তাকে নপুংসক ভেবে নিয়ে অন্য লোকের সংসার করবে এই ভাবনাটা কঠিন এবং যথেষ্ট অপমানজনক। সাব্বির থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রইল। মেজাজে তার দাউদাউ আগুন জ্বলছে। মিথির হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে আকস্মাৎ ধমক দিল, 
 
‘ অযথা হাসবেন না। আপনার হাসিটা জঘন্য।’ 

সাব্বিরের ছেলেমানুষি রাগে ঠোঁট টিপে মাথা নাড়ল মিথি। সাব্বির মিথির দিকে একবার তীব্র চোখে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিয়ে আবার কী মনে করে ফিরে এলো। টেবিলের উপর থেকে বুকেটটা শব্দ করে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

‘ আর আপনার নায়ককে বলবেন বাড়িতে ফুল-পাতা না পাঠাতে। এসব ফুলে আমার এলার্জি আছে। আমাদের বাসা কোনো ফুলের দোকান না। যত্তসব!’ 

মিথি জানে না ঠিক কত বছর পর, নাকি জীবনের প্রথমবারের মতো গলা ছেড়ে হো-হো করে হেসে উঠল সে। কথা ছিল, আজ সব প্রশ্নের উত্তর উদ্ধার করে জীবনের তরে সাব্বিরের জীবন থেকে বিদায় নেবে সে। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আবিষ্কার করে ফেলল, বিশাল দেহের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বাচ্চা এক ছেলেকে। দাদাজান শেষমেশ তাকে এমন অবুঝ বালকের গলায় ঝুলিয়ে দিল! 

—————

জীবন আসলে কী? এইযে পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে চারটি করে মানব শিশু জন্ম নিচ্ছে। জন্মানোর পর থেকেই অদ্ভুত এক গোলকধাঁধার পেছনে ছুটে চলেছে। কেন ছুটছে, কী তাদের লক্ষ্য কিচ্ছু তারা জানে না। তারপরও তারা নিরন্তর ছুটে চলেছে। যেন এই ছুটে চলায় তাদের ভবিতব্য। এভাবে ছুটতে ছুটতেই তারা একদিন পেয়ে যাবে জীবনের লুকায়িত সাফল্য। জীবনের সাফাল্যটা আসলে কী? কোথায়, কতটুকু অর্জন করলে মানুষ সফল হয়? বিছানায় একলা শুয়ে এমন কত এলোমেলো চিন্তা করছিল নাহিদ৷ খোলা জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে এক টুকরো ঝকঝকে নীল আকাশ। দুপুরের কড়া রোদটা এসে পড়ছে তার পায়ের কাছে। গরম লাগছে। জানালা বন্ধ না করে রোদ থেকে মুক্ত পাওয়ার কোনো উপায় জানা থাকলে ভালো হতো।  

‘ কী রে? উঠে গেছিস দেখছি। জ্বরটা কী সেরেছে? নাকি ওই একই রকম?’ 

ঘরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে প্রশ্ন করল সৌধ। নাহিদ ঘাড় ফিরিয়ে সৌধর দিকে তাকাল। কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,

‘ ক’টা বাজে রে?’ 

সৌধ হাতঘড়িতে এক পলক তাকিয়ে বলল,

‘ আড়াইটা। কেন রে?’ 

নাহিদ জবাব দিল না। চোখের পলকে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। চোখে-মুখে পানির ছিঁটা দিয়ে ফিরে এসে পোশাক বদলাল। মাথাভর্তি চুলগুলো গুছিয়ে বেপরোয়াভাবে বেড়ে চলা দাড়িতে হাত বুলিয়ে দম্ভ ভরে তাকিয়ে রইল আয়নায়। সৌধ তার আকস্মিক এই প্রস্তুতিতে বিভ্রান্ত হয়ে গেল। দ্বিধান্বিত চোখে চেয়ে থেকে শুধাল,

‘ তোর মাথায় কী চলছে বল তো? জ্বরও তো ছাড়েনি এখনও ঠিক করে। কোথাও যাচ্ছিস নাকি?’ 

আয়নার ভেতর দিয়েই বন্ধুর দিকে তাকাল নাহিদ। হেয়ার ব্রাশটা পেছন দিকে ছুঁড়ে মেরে বলল,

‘ পুরুষ মানুষের আবার জ্বর কী করে? ইডেন কলেজের সামনে গিয়ে কয়েকটা রূপবতী চন্দ্রিমাকে দেখলেই দেখবি জ্বর বাপ বাপ করে পালাচ্ছে। দ্রুত তৈরি হ। শরীরের নারী নামক ভিটামিন হুহু করে কমে যাচ্ছে। বুকটা কেমন ধরফর করছে দেখ! বাসা থেকে বেরিয়ে বেইলি রোড আর ইডেনের সামনে একটা চক্কর দিয়ে যাব কাওরানবাজার। আদিব হোসেনের সঙ্গে আজ দেখা করার কথা।’ 

সৌধ বিস্ফারিত চোখে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য এই নাহিদকে তার অবিশ্বাস্য লাগল। মনে হলো, যে রৌদ্রতপ্ত দুপুরে একটা উদাস বাউলা হাওয়া এলোমেলো করে দিয়েছিল নাহিদকে। কোনো এক দৈব বলে সেই দুপুর থেকেই আবার শুরু হয়েছে নাহিদের জীবন। মাঝের দিনগুলো কখনও আসেনি। সেই দিনগুলোর ব্যথা, হতাশা, বেদনাগুলো ছিল কেবলই দুঃসহ কল্পনা। পুরোনো বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার উচ্ছ্বাসে কিছুক্ষণ কোনো কথায় বলতে পারল না সৌধ৷ নিশ্চল হয়ে বসে থেকে আচমকা লাফিয়ে উঠে ঝাপটে ধরল বন্ধুকে। নাহিদ সৌধকে ছাড়ানোর চেষ্টা না করে আঁতকে উঠে বলল,

‘ তুই কী সত্যি সত্যি আমাকে তোর জামাই মনে করিস? ছি সৌধ! এই ভরদুপুরে, একলা ঘরে এসব কী? ছাড়।’ 

সৌধ নাহিদকে ছেড়ে কড়া চোখে তাকাতে গিয়েও হেসে ফেলল। নাহিদ আবারও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল গোছানোয় মনোযোগ দিল। মৃদু শিষ বাজাতে বাজাতে আয়নার ভেতর দিয়েই বন্ধুর দিকে তাকাল। চোখ টিপে দম্ভ ভরে হেসে বলল,

‘ ঘরের মাঝখানে এমন বেক্কলের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা, তৈরি হ। ইট'স টাইম টু রক, দোস্ত।’ 

সৌধ নাহিদের চেহারায় স্পষ্ট দেখতে পেল সেই পুরোনো সাহস। জ্বলজ্বলে আত্মবিশ্বাস। তীব্র জেদ। সেই সঙ্গে আরও একটা কিছু মিশে আছে তার ঠোঁটের কোণে৷ কী সেটা? নিষ্ঠুরতা? নাকি সন্ধ্যার বিষণ্ণতা? তবে এতটুকু বুঝল, এই নাহিদ আগের নাহিদের থেকেও তীক্ষ্ণ। সদ্য পেটানো তলোয়ারের মতোই তার ধার। যুদ্ধের মাঠে যার প্রধান খাদ্যই হয় রক্ত। নাহিদ আয়নায় নিজেকে শেষবার দেখল। ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি ফুটিয়ে বলল,

‘ রেস্টটা বোধহয় একটু বেশি হয়ে গিয়েছে বন্ধু। বদহজম ঠেকাতে পরিশ্রমটাও একটু বেশি করতে হবে। এমন নাড়া দিব না? এমন আগুন জ্বালাব!...’ 

কথাটা শেষ না করে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখল নাহিদ।  

‘I met this little girlie, her hair was kind of curly….’ 

চোখের তারায় ফুটে উঠা আগুন নিয়েই গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে সৌধকে নিয়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। সৌধ তখনও নীরব। তার বিস্ময়ভাব তখনও কাটেনি। বন্ধুর রাতারাতি এই পরিবর্তন তাকে ক্ষণে ক্ষণে বিহ্বল করে দিচ্ছে। নাহিদ ঘরের বাইরে তালা ঝুলিয়ে কয়েক সিঁড়ি ডিঙোতেই ছয় তলার এক ফ্ল্যাটের দরজায় দেখা হয়ে গেল এক তরুণীর সাথে। কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে উদ্ভাসিত মেয়েটি নাহিদকে দেখে একপাশে সরে গিয়ে লাজুক হাসল। শুধাল,

‘ চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন?’ 

নাহিদ হেসে ফেলল। মেয়েটি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশের দেয়ালে এক হাত রেখে মেয়েটির মুখের কাছে মুখ নামিয়ে চিরাচরিত মিষ্টি বুলিতে বলল,

‘ যাচ্ছি। তা আপনার টিউশনির কী খবর?’ 

প্রত্যুত্তরে মেয়েটি বুকের সঙ্গে চিবুক ঠেকিয়ে মৃদু কন্ঠে বলল,

‘ ভালো।’ 

এই সময় সিঁড়ি দিয়ে উঠে তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন এক ভদ্রলোক। কাঁধে অফিস ব্যাগ। মেয়েটির চমকে উঠা মুখ দেখে বোধ হলো, ভদ্রলোক সম্ভবত মেয়েটির বাবা। নাহিদের মধ্যে তেমন কোনো ভাবাবেগ দেখা গেল না। হাতটা নামিয়ে নিয়ে সহজ গলায় বলল,

‘ গুড! থাকুন তাহলে। আসছি।’ 

ভদ্রলোক তীর্যক চোখে একবার নাহিদকে দেখে নিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। সৌধ এতোক্ষণ দমবন্ধ করে থাকলেও কয়েক সিঁড়ি পেরিয়ে এসে দম ছাড়ল। এই নারী ঘটিত ঘটনায় তার বিহ্বল ভাব কেটে গিয়েছে। সে উপরের দিকে একবার উঁকি দিয়ে চাপা গলায় বলল,

‘ এখনই কেস খেয়েছিলি, শালা! মেয়েটা কে রে? খুব শরম পাইতেছিল দেখলাম৷ ঘটনা কী?’ 

নাহিদ পকেট থেকে বাইকের চাবি বের করতে করতে নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলল,

‘ ঘটনা কিছুই না। মেয়েটা সম্ভবত ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। সেদিন সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় সে আমাকে একটা চিঠি দিয়েছে। তাতে সে লিখেছে, সে আমার সঙ্গে সংসার করতে চায়। আমার তিনটা বাচ্চার মা হতে চায়। আমাকে সে অনেক আদর-যত্ন করতে চায়। অজস্র চুমু খেতে চায়।’

সৌধ চোখ বড় বড় করে তাকাল। ফিচেল গলায় বলল,

‘ তিনটা! কেন? বাকিগুলো কী অন্য কারো থেকে হবে?’ 

সৌধর কথায় হেসে ফেলল নাহিদ। মাথা নেড়ে বলল,

‘ হতেও পারে। স্বাধীন দেশে কার থেকে কয়টা করে বাচ্চা নিবে সেই স্বাধীনতা মেয়েদের থাকা উচিত বৈকি।’ 

সৌধ হাসল। শুধাল, 

‘ হেতে জানে তোর এখনও গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হয় নাই? শুদ্ধতম বেকার?’ 

‘ সম্ভবত জানে। চিঠিতে সে লিখেছে, বিয়ের পর কয়েক বছর আমি দু'একটা টিউশনি করালেই চলবে। তারও টিউশনি আছে। টিউশনি করিয়ে সে মাসে আট হাজার টাকা পায়। তাই জিজ্ঞাসা করলাম, টিউশন চলছে কেমন।’ 

সৌধ ফাজলামো করতে গিয়েও সচেতন গলায় শুধাল,

‘ তুই কী…?’ 

তার আগেই উত্তর দিল নাহিদ,

‘ পাগল নাকি!’ 

ঠোঁট উল্টাল সৌধ। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

‘ তবে মেয়েটা সুন্দরই ছিল। হয়ত তোকে সত্যিই পছন্দ করে।’ 

 নাহিদ উত্তর দিল না। এই পৃথিবীতে কে তাকে পছন্দ করে, কে করে না এসব ফালতু ব্যাপারে তার কোনো যায় আসে না। নির্বিকার মুখে নিচে নেমে বাইক স্টার্ট দিল। তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। কী গভীর তার দৃষ্টি! ঠিক সেই মুহূর্তে সৌধর মনে হলো, এটা সেই আগের নাহিদ নয়, গতকালের নাহিদও নয়, এই নাহিদের জন্ম নতুন। এই নাহিদ ক্রোধান্বিত, ক্ষিপ্ত, জেদি, বেপরোয়া আবার বিষণ্ণ। এই নাহিদ আকাশ দেখতে জানে। গভীরভাবে চিন্তা করতে জানে। কিন্তু কী এতো চিন্তা তার? কাকে এতো ভাবে সে?
 
—————

নামে বর্ষাকাল। অথচ আকাশে গ্রীষ্মের মতো তপ্ত সূর্য। গায়ে জ্বালা ধারানো রোদ্দুরে চামড়া পুড়ে যাওয়ার জোগাড়। মৌনি গায়ের চামড়া পুড়িয়ে রাস্তার ধারে সারি সারি করে রাখা বইগুলোতে চোখ বুলাচ্ছে। সেদিন আলস্য আর ছোট ফুপির যন্ত্রণায় নীলক্ষেতে আসার পরিকল্পনাটা বদলে ফেলতে হয়েছিল। মৌনির কোনো পরিকল্পনা বদলালে সে পরিকল্পনা গড়িয়ে গড়িয়ে বদল হয় প্রায় শ'খানেক বার। বই জাতীয় পরিকল্পনায় অবশ্য বদলা বদলির ঘটনা কিছু সীমিত। তাই মাত্র তিন-চারদিন বদলা-বদলি করেই আজ সে নীলক্ষেতে এসে পৌঁছাতে পেরেছে৷ সারিবদ্ধ পুরোনো বইয়ের মধ্যে থেকে একটা ইংরেজি নভেলের বই হাতে তুলে নিতেই কোথা থেকে কে এসে ঝড়ের বেগে ঝাপটে ধরল তাকে। মৌনি ভয়ংকর চমকে গেল। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা নিতা। নিতা তার মায়ের পক্ষের আত্মীয়া। মৌনির বড় খালার বড় মেয়ের কন্যা। কাছাকাছি বয়স হলেও সম্পর্কে তারা খালা-ভাগ্নী। মৌনিকে তাকাতে দেখে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,

‘ মৌ খালামণি! কতদিন পর!’ 

মৌনি ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও নিতাকে দেখে আশ্বস্ত হলো। ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি নিয়ে সেও জড়িয়ে ধরল তাকে। খুশি হয়ে বলল,

‘ তুমি এখানে কী করে! তোমার তো রাজশাহী থাকার কথা!’ 

নিতা হাসল। মৌনিকে এক পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে রেখেই বলল,

‘ কয়েকদিন আগে পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আপাতত ক্লাস অফ। ময়মনসিংহ যখন এসেছিই ভাবলাম ঢাকা থেকে ঘুরে আসি। নীলক্ষেত থেকে কিছু বইও নেওয়ার ছিল।’ 

মৌনি অভিমান করে বলল,

‘ তুমি ঢাকায় এসেছ তাহলে আমাকে টেলিফোন করোনি কেন? আমার বাসাতেও তো উঠতে পারতে। দেখেছ, আপন মনে করো না আমায়।’ 

নিতা হেসে ফেলল। মৌনি তাকে জোর করে কিছু পছন্দের বই কিনে দিলো। পাশের রেস্টুরেন্টে বসে দুটো কোল্ড কফির অর্ডার দিয়ে বলল, 

‘ তোমার সাবজেক্ট তো ম্যাথ, তাই না? উফ! ম্যাথের মতো কঠিন সাবজেক্ট নিয়ে যে কী করে পড়ো তোমরা! আমার তো অঙ্কের নাম শুনলেই ঘাম ছুটে যায়। তো, এইবার তো তুমি সেকেন্ড ইয়ার?’ 

‘ সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলো কয়েকদিন আগে। এখন ক্লাস শুরু হলেই থার্ড ইয়ার।’ 

মৌনি চোখ বড় বড় করে তাকাল,

‘ কী সাংঘাতিক! এদিকে আমাদের থার্ড ইয়ারের পরীক্ষাটাই হচ্ছে না। একটা জটে পড়তে হবে মনে হচ্ছে।’ 

নিতা শুধাল,

‘ শাওন মামা আর তুমি সেইম ব্যাচ না?’ 

শাওনের প্রসঙ্গ আসায় একটু লাল হলো মৌনি। শাওন, মৌনি, কাব্য, নিতা সকলেই কাছাকাছি বয়সের হাওয়ায় তাদের বোঝাপড়াটা বন্ধুর মতো৷ নানু বাড়িতে শাওন-মৌনি নিয়ে যত হৈ-চৈ হয় তার প্রধান উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিতাও অন্যতম। সুযোগ পেলেই শাওনকে নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলে মৌনিকে অস্বস্তিতে ফেলা তার খুবই পছন্দ। মৌনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

‘ হ্যাঁ। কিন্তু মহাশয় তো এখন বোধহয় আর এটা কন্টিনিউ করবে না।’ 

নিতা মাথা নাড়ল। ততক্ষণে কফি চলে এসেছে। নিতা নিজের কফিতে একটা সিপ নিয়ে সহজ গলায় শুধাল,

‘ শাওন মামার গার্লফ্রেন্ডকে দেখেছ? বেশ সুন্দর। বলতে দোষ নেই, আমি ভেবেছিলাম তোমার আর শাওন মামার মধ্যে বোধহয় কিছু চলছে। শুধু আমি না, আমাদের অনেকেরই এমন ধারণা ছিল। কিন্তু সেদিন উনার গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বুঝলাম তোমরা আসলেই শুধু বন্ধু।’ 

মৌনি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বিভ্রান্ত হয়ে বলল,

‘ শাওনের গার্লফ্রেন্ড!’ 

‘ হ্যাঁ, তুমি দেখোনি?’ 

মৌনি কী রকম প্রতিক্রিয়া দেখাবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। পাত্তা না দিয়ে বলল,

‘ তুমি শিওর? শাওনের কোনো গার্লফ্রেন্ড আছে বলে তো জানতাম না। কবে দেখেছ তুমি? মজা করেছে বোধহয় তোমার সাথে। ও এমন মজা করে।’ 

নিতা কফির কাপটা নামিয়ে রেখে বলল,

‘ আরে না, সত্যিই। হয়ত তোমাকে বলেনি। তুমি মামাকে জিজ্ঞাসা করে দেখো। কাব্য মামাও তো জানে।’ 

শাওনের জীবনে কেউ আছে আর শাওন তা মৌনিকে বলেনি এতো বড় সত্যটা কিছুতেই বিশ্বাস হতে চাইল না মৌনির। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে শুধাল, 

‘ তুমি শিওর? কবে দেখেছ ওর গার্লফ্রেন্ডকে?’ 

‘ এইতো, মামা ট্রেনিং এ যাওয়ার কিছুদিন আগে। কার্জনের সামনে দু'জন হাত ধরে বসেছিল৷ আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর মামী বলে পরিচয় করিয়ে দিল। মামীও সম্ভবত সিলেটে পড়ে। তবে মেডিকেল স্টুডেন্ট। আমাকে খুব আদর করলেন..’ 

শাওনের ব্যাপারে এই তিক্ত সত্যটা বিশ্বাস করতে পারল না মৌনি। মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়লে বোধহয় এমনই ভারী লাগে? যতটা ভারী মৌনির লাগছে এই সত্যটা। শাওনকে সর্বদা নিজের প্রিয় বন্ধু হিসেবেই জানতো মৌনি। জীবনের এমন কোনো চ্যাপ্টার নেই যা শাওনের থেকে গোপন রেখেছে মৌনি। অথচ শাওন তার জীবনের এতো বড় ঘটনা তাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করল না? নিতা জানল, কাব্য জানল অথচ মৌনি জানল না? এটা কী আদৌ বিশ্বাস করা যায়? আশ্চর্য এক বিষাদে মন ভার হয়ে এলো মৌনির। নিতাকে বিদায় দিয়ে বাসায় ফিরেই দেখল লক স্ক্রিনে ভেসে আছে শাওনের মিসড কল। মৌনি কল ব্যাক করল। শাওন ফোন তুলতেই কোনো কুশলাদি না করে সরাসরি শুধাল,

‘ তোমার গার্লফ্রেন্ড আছে শাওন?’ 

শাওন থমকাল। বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড বলার মতো কোনো শব্দ খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ নীরব থেকে শুধাল,

‘ মানে?’ 

‘ মানেটা সহজ। তোমাকে খুব সহজ একটা প্রশ্ন করেছি, তোমার কী গার্লফ্রেন্ড আছে শাওন?’ 

শাওনের কণ্ঠ শুকিয়ে এলো। নার্ভাস কণ্ঠে বলল, 

‘ তোমাকে এসব কে বলল?’ 

‘ কে বলল সেটা বড় কথা নয়। আছে কী নেই? এতো বণিতা না করে সত্য কথাটা বলো।’ 

শাওন কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুখ ফুলিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলল। বলল,

‘ হ্যাঁ, আছে।’ 

স্তব্ধ হয়ে গেল মৌনি৷ জমে আসা কণ্ঠে শুধাল, 

‘ নাম কী ওর?’ 

‘ সৌমি। সৌমি হাসান।’ 

তারপরও..শাওন নিজের মুখে স্বীকার করার পরও যেন বিশ্বাস হতে চাইল না মৌনির৷ এতো বড় ধাক্কা, এমন অবিশ্বাস্য কাজটা শাওন মৌনির সঙ্গে সত্যিই করতে পারে! অবিশ্বাস নিয়ে শুধাল, 

‘ কত দিনের রিলেশনশিপ তোমাদের?’ 

শাওন শুকনো কণ্ঠে বলল,

‘ দেড় বছর।’ 

দেড় বছর! একদিন নয়, দুই দিন নয়, একমাস নয়। দেড় বছর! এইবার, ঠিক এইবার কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল মৌনি। বুকের ভেতর কী একটা ঘটে গেল। কেবল বুঝল, ভেঙে গেল। ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া বুঝি একেই বলে? 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp