সদ্য শেষ হওয়া একটা বইয়ের সমালোচনা ক্যামেরাবন্দী করে মাত্রই বালিশে মুখ ডুবিয়েছে মৌনি। জানালার কার্নিশে গোধূলির ভীড়। কখন যে দুপুর গড়িয়ে অপরাহ্ণ এলো দরজায়, টের পাওয়া যায়নি৷ টের পেলো তখন যখন পেটের ক্ষুধা মস্তিষ্কে হানা দিয়ে ঘুমে জড়িয়ে এলো চোখ। আজকাল নিজেকে এতো ব্যস্ত করে ফেলেছে মৌনি! দিন-রাত কিছুই আর হিসেব মতো চলছে না। খাওয়ার সময় ঘুম, ঘুমের সময় কাজ, কাজের সময় খাওয়া। কী এক অদ্ভুত রুটিনে ছুটে চলেছে দিন প্রবাহ। ভুলে গিয়েছে পৃথিবীর আর সমস্ত মানুষের কথা। ভালোবাসার কথা। বন্ধুত্বের কথা। অপমানের কথা। নিজের জীবন দিয়ে মৌনি বুঝেছে, ভুলে থাকাতেই সুখ। ব্যস্ত থাকাতেই শান্তি। কী দরকার অন্যকে নিয়ে ভাবার? ভাবলেই ভাবনা বাড়ে। ভাবনা থেকে বাড়ে প্রশ্ন। যার জীবনে যত কম প্রশ্ন তার জীবনে তত সুখ। মৌনি নিজেকে সুখী দেখতে ভালোবাসে। খুব সম্ভবত এই পৃথিবীর সবার থেকে সুখী। কিন্তু সুখ পাওয়া কী এতোই সহজ? অপরাহ্ণের মতো নেমে আসা বিষণ্ণতাদের পথ ভুলিয়ে দেওয়া কী চারটে খানি কথা? দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৌনি। সারাদিনের পর পেটে অন্ন সংস্থান হওয়ায় ক্লান্তিতে বোজে আসে চোখ। এই আরামদায়ক বিশ্রামে বড় অসুবিধার হয়ে দাঁড়ায় বালিশের পাশে অবহেলায় পড়ে থাকা মুঠোফোন। ক্ষণিক পর পর সে টুন টুন করে বাজছে। হাত বাড়িয়ে মুঠোফোনের ওয়াইফাই কানেকশনটা অফ করতে গিয়েই চোখে পড়ল শাওনের নাম। এক দিঘি আলস্য নিয়ে শাওনের ইনবক্স খুলতেই তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখদুটো কুঁচকে গেল বিরক্তিতে। ছেলেটা আজ আবার তার আর সৌমির যুগল ছবি পাঠিয়েছে তাকে। একটা অথবা দুটো নয় গুণে গুণে বাইশটা ছবি। প্রথমদিকে ব্যাপারটা স্বাভাবিক মনে হলেও রোজ রোজ এই একই যন্ত্রণায় ত্যক্ত হয়ে উঠেছে মৌনি। সে বুঝে উঠতে পারছে না, শাওনের কী মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে? কী চাইছে সে মৌনির থেকে? বারবার নিজেদের যুগল ছবি পাঠালে মৌনি ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে যাবে এমনই কী তার বিশ্বাস? মনে মনে আশ্চর্য হয় মৌনি। এই শাওনকে সে চেনে না। যে দৃঢ়, শান্ত, ব্যক্তিত্ববান শাওনকে সে জানতো তার সঙ্গে এই ব্যক্তির আকাশ-পাতাল তফাত। সৌমির সঙ্গে যে তার কোনো প্রতিযোগিতা নেই, সে কথা কী করে বুঝাবে সে শাওনকে? শাওনের সঙ্গেও কী তার কোনো প্রতিযোগিতা ছিল কোনোদিন? এই দীর্ঘ জীবনে কোনোদিন কী শাওনকে ঈর্ষা করেছে মৌনি? সবসময় শাওনের খুশিতে, আনন্দে, সফলতায় খুশি হয়েছে সে। ছেলেবেলার শিশুসুলভ ঈর্ষাও কখনও হয়নি তার শাওনের জন্য। তাকে সে ভালোবেসেছিল গভীরভাবে। শাওন তার কাছে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো তুলতুলে, নরম। যাকে সে আগলে রাখতে চায় হাওয়ার ঝাপটা থেকে। এইযে এতোকিছু হলো, শাওন তার বন্ধুত্বের গর্বকে ভেঙে চুরমার করে দিল তারপরও কী একটুও রাগ করেছে মৌনি? হৃদয়ের অভ্যন্তরে একটা প্রগাঢ় অপমান আর বিষণ্ণতার কালো দাগ পড়েছে সত্য। কিন্তু তার জন্য কী কখনও শাওনের খারাপ চেয়েছে? একবারও মনে হয়েছে, ছেলেটা কষ্ট পাক? প্রতিবার প্রার্থনায় একটি কথায় উঠে এসেছে, ‘শাওন! শাওন! শাওন তুমি ভালো থেকো।’ কিন্তু ছেলেটা ভালো থাকছে কই? নিজেকে দুঃখী করতে, মৌনির সঙ্গে একপাক্ষিক এক প্রতিযোগিতায় নামতে ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠেছে। অথচ শাওনের সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতায় নামবার কথা কস্মিনকালেও ভাবেনি মৌনি। তার প্রতিযোগিতা তো ছিল নাহিদের সঙ্গে। সারাদিন সকলের দু'চোখের বিষ হয়ে ঘুরে বেড়ানো ছেলেটা যখন সকল পরীক্ষায় তাকে ছাড়িয়ে যেতো। ঈর্ষায় জ্বলে যেতো বুকের ভেতর। কলেজ পাশ করবার আগে পর্যন্ত কখনও নাহিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জিততে পারেনি মৌনি। তারপর কী থেকে কী হয়ে গেল! একটা মেয়েকে ভালোবেসে নাহিদ হারিয়ে ফেলল তার সত্তা, মৌনি হারিয়ে ফেলল তার অদৃশ্য প্রতিযোগিতার একমাত্র সহযাত্রী। হতাশ হয় মৌনি। কী হয়ে গিয়েছে এই ছেলেদের? পৃথিবীতে এতো বস্তু থাকতে তারা কি-না থমকে গিয়েছে সামান্য ভালোবাসার কাছে? ভালোবাসা কী জীবনের থেকেও বড়? এই দু'জনের প্রতি আশ্চর্য এক ক্ষোভে শরীর জ্বালা করে মৌনির৷ এইযে নিজেদের প্রতি তাদের এতো জবরদস্তি, এর জন্য কখনও তাদের ক্ষমা করবে না মৌনি। তীব্র বিতৃষ্ণা নিয়ে মুঠোফোনটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে কিছুক্ষণ নরম বালিশে মুখ ডুবিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেও উঠে বসে। ফোনটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। উত্তর না দিলে শাওন আবার কোন মহাকাব্য ভাবতে বসে এই ভাবনায় ছবিগুলো না দেখেই উত্তর দেয়,
‘ গুড পিকচার্স।
তোমাদের একসাথে খুব মানায় শাওন।’
তারপর বিরক্ত মনে ঘুরে বেড়াতে থাকে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফেসবুকের পাতায় আজ নাহিদের রাজত্ব। এই মেয়ে, ওই মেয়ে, এই বান্ধবী, সেই বান্ধবী তাদের ছবিতে তাকে ট্যাগ করতে করতে ভাসিয়ে ফেলেছে সোশ্যাল মিডিয়া। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে আসে মৌনির। সারাদিন শুধু মেয়ে মেয়ে আর মেয়ে। আচ্ছা, এদের জীবনে কী আর কোনো উদ্দেশ্য নেই? কোনো লক্ষ্য নেই? মৌনির ভাবনার মাঝেই টুং করে একটা নোটিফিকেশন আসে। শাওনের ম্যাসেজ। জিজ্ঞাসা করেছে, ‘কেমন আছো?’ মৌনি বিরক্ত হলো। এই শাওনের সঙ্গে তার কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তার প্রতি ক্রমেই বিতৃষ্ণ হয়ে উঠছে মন। মৌনি শাওনের প্রতি বিতৃষ্ণ হতে চায় না। যে বন্ধু শাওনকে সে সবসময় ধরে রাখতে চাইতো, যে কারণে বন্ধুর প্রগাঢ় অনুভূতি জানার পরও এতোগুলো বছর তাকে দূরে ঠেলে দিতে পারেনি, সেই বন্ধুর প্রতি এমন রুচিহীনতা সহ্য হবে না মৌনির। এই ক্ষণস্থায়ী রুচিহীন, তিক্ত শাওনের জন্য তার আজন্ম লালিত আদুরে শাওন হারিয়ে যেতে পারে না। সেই শাওনকে বাঁচিয়ে রাখতে এই শাওনকে ত্যাগ করা ছাড়া উপায় নেই। মৌনি সিদ্ধান্ত নিলো, শাওনের সঙ্গে আর নয়। তার স্মৃতিতে যে ছেলেটা এখনও মুগ্ধ হয়ে হাসে। গভীর, শান্ত চোখে তাকায়। সেই ছেলেটা হাসতে থাকুক৷ ভালোবাসতে থাকুক। নতুন শাওনের দিকে নজর দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মৌনি ফোনটা বড় অবহেলায় পাশে ফেলে রেখে নিজের কাজে মন দেয়। ফুরফুরে, আনন্দিত মনে গুনগুন করে,
‘ ধূসর গোধূলি এলো
সব আলো নিভে গেলো
কিছুই তো ধরে রাখা গেলো না।।
আমার এই মনটা যে পাথরের মন নয়
তোমাকে তা বলে যাওয়া হলো না…’
—————
সিলেট, মেডিকেল কলেজ রোডের একটা রেস্তোরাঁয় মুখ গম্ভীর করে বসে আছে শাওন। শহরের বুকে সন্ধ্যা নেমেছে। জ্বলে উঠেছে রেস্তোরাঁর বাহারি আলো। সেই আলোর নিচে কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় ঘুরে বেড়াচ্ছে শাওন। চোখে-মুখে চাপা অসন্তোষের ছাপ। সেই অসন্তোষে ইতি টেনে কিছুক্ষনের মধ্যেই চুড়িতে টুংটাং ধ্বনি তুলে সামনে এসে বসলো এক তরুণী। লাল শাড়ি আর হালকা সাজসজ্জায় তাকে লাল গোলাপের মতো উদ্ভাসিত দেখালেও চোয়াল শক্ত করে তাকাল শাওন। বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ আর ইউ আউট অব ইউর মাইন্ড? দুই ঘন্টা ধরে আমি অপেক্ষা করছি তোমার জন্য। সিম্পল সেন্স নেই তোমার? রাত আটটায় আমার বাস। আর তুমি আসতে আসতেই সন্ধ্যা।’
সৌমি মুখ কালো করে বলল,
‘ আম্মুকে ফাঁকি দিয়ে আসতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হলো। বলেছি এক বান্ধবীর জন্মদিনে যাচ্ছি। সরি!’
শাওন ক্রোধে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
‘ বা*র সরি।’
সৌমি ধমক দিয়ে বলল,
‘ খবরদার শাওন! মুখ খারাপ করবে না।’
শাওন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘ ছয়-সাত ঘন্টা জার্নি করে ঘন্টার পর ঘন্টা তোমার জন্য অপেক্ষা করে এর চেয়ে ভালো কথা আমার মুখ থেকে আসছে না, সরি!’
‘ আরে বাবা, সরি বললাম তো। বাসা থেকে বের হওয়া মুশকিল ছিল। আমি কী করব?’
‘ তুমি জানতে না আজকে আমি আসবো? বাসা ম্যানেজ কীভাবে করবা সেটা তোমার সন্ধ্যাবেলায় মনে পড়ে কেন? সারাদিন কোন কাজে ব্যস্ত ছিলে?’
সৌমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। শাওনের রাগ যে বরাবরই বেশি সে কথা সে জানে। তাই কথা না বাড়িয়ে হাত এগিয়ে শাওনের হাতের উপর হাত রেখে বলল,
‘ আচ্ছা, রাগ ছাড়ো। আমার দিকে তাকাও। শাড়িতে আমাকে কেমন লাগছে বললে না তো!’
শাওন সৌমির দিকে ভালো করে তাকাল। সৌমি রূপবতী। রেস্তোরাঁর হলুদ আলো যেন পিছলে পড়ছে তার সোনারঙা গায়ে। শাওন নীরবে তাকিয়ে রইল সৌমির দিকে। দীর্ঘ সময় নিয়ে কী যেন খুঁজে বেড়াল তার মুখে তারপর অস্ফুট একটা হতাশা ফুটে উঠল তার চোখে। এই রূপবতীর রূপে মুগ্ধ না হতে পারার অপরাধবোধে মলিন হয়ে এলো দৃষ্টি। কণ্ঠে কৃত্রিম মাদক নিয়ে বলল,
‘ ইউ আর বিউটিফুল এজ ইউজাল।’
সৌমি মিষ্টি করে হাসল। শাওন চেয়ারে গা এলিয়ে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল সৌমির দিকে। সৌমি লাজুক চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
‘ কী দেখছো?’
শাওন একইভাবে তাকিয়ে থেকে বলে,
‘ তোমাকে।’
লজ্জা আর আনন্দে লাল হলো সৌমির গাল। ছদ্ম বিরক্তি দেখিয়ে বলল,
‘ এভাবে অসভ্যর মতো তাকিয়ে থাকবে না তো! অন্যদিকে তাকাও।’
শাওনের মধ্যে কোনো ভাবাবেগ হলো না। সৌমির শেষ কথাটা তার কর্ণগোচর হলো বলেও মনে হলো না। সৌমি বোধহয় দৃষ্টি অন্বেষণে বড় কাঁচা। নয়তো সে বুঝতো, এ কোনো মুগ্ধতার দৃষ্টি নয়। শাওন তাকিয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে। তার মাথায় চলছে অন্য কোনো ভাবনা। ভাবনার রেলগাড়ী ছুটছে দিন-মাস পেরিয়ে বছরে। প্রায় বছর দুয়েক আগে সৌমির সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল শাওনের। সৌমি তার এক বন্ধুর আত্মীয়া। বন্ধুর ভাইয়ের বিয়েতে এই রূপবতীর রূপের অহংকারে তাদের সকল বন্ধুরাই একটু ফোঁসফোঁস করছিল। বলতে খারাপ শোনালেও, বন্ধুদের সঙ্গে তাকে নিয়ে একটু বাজেভাবেই আলোচনা হচ্ছিল। সবার মধ্যেই টানটান উত্তেজনা কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টী বাঁধবে কে? বিয়ে বাড়িতে প্রেম প্রেম অভিনয় নতুন কিছু নয়। বন্ধুদের বিনোদনের ব্যবস্থা করতে শাওন সৌমির সঙ্গে তার স্বভাবসুলভ চাবুকই চালিয়েছিল। সৌমি পটেনি তবে শাওনের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করার প্রস্তাব হিসেবে তার ফেসবুক একাউন্ট চেয়েছিল। দুই একদিন কথা হওয়ার পর শাওন তাকে জানিয়েছিল মৌনির কথা। মৌনি! তার ভালোবাসা। কী প্রচন্ড ভালো সে বাসে মৌনিকে শুনে অবাক হয়েছিল সৌমি। তখন সৌমিরও ভগ্ন হৃদয়। সদ্য বিচ্ছেদের বিষাদ আর শাওনের একপাক্ষিক ভালোবাসার যাতনা দুইয়ে মিলে ধীরে ধীরে কী করে যেন একই সুরের মতো বাজতে লাগল তারা। শাওন তখন মুভ অন করার চেষ্টা করছে। মৌনিকে সে চায় তবে কেউ যদি মৌনিকে ভুলিয়ে দিয়ে তাকে নিজের করে নিতে পারে তবে নিক, এমনই তার মনোভাব। মৌনির প্রতি তার প্রেম আর সৌমির ভগ্ন হৃদয়ের কথা চলতে চলতে কখন যে বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল টেরই পেলো না। প্রথম কয়েক মাস নতুন প্রেমের উচ্ছ্বাস চললো পুরোদমে৷ শাওন ভেবেছিল এবার বোধহয় মৌনিকে ভুলতে পারবে সে। রূপের মায়ায় ফেলে হলেও মৌনিকে ঠিক ভুলিয়ে দিবে সৌমি। কিন্তু ধীরে ধীরে উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ল। আবারও মাথা জুড়ে দাপিয়ে বেড়াতে লাগল মৌনি! মৌনি! মৌনি! শাওন ভেবেছিল, অন্যান্য প্রেমিকাদের মতো সৌমিও একসময় ছেড়ে দিবে তাকে। কিন্তু হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলো, সৌমি পাগলের মতোন ভালোবাসে তাকে। কত কতবার সৌমিকে ভালোবাসার চেষ্টা করেছে শাওন! এই দেড় বছরে অসংখ্যবার মৌনির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করেছে। কিন্তু দুশমন হৃদয়! শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সামনে বসে থাকা রূপবতী মেয়েটির প্রতি বড়ো মায়া হলো। বলল,
‘ আমার পাশে এসে বসো তো।’
সৌমি উঠে এসে শাওনের পাশে এসে বসল। শাওন টের পেলো সৌমির গা থেকে ভেসে আসা মিষ্টি সুবাস। সেই সুবাস নাসারন্ধ্রে পৌঁছাতেই শাওনের মনে পড়ে গেল মৌনির কথা। মৌনি পাশে বসলে তার আশেপাশে ভেসে বেড়ায় আশ্চর্য এক মৌনি মৌনি সৌরভ। সেই সৌরভের কাছে এই সুবাস বড়ো ফিকে। আবারও বিদ্রোহ করে বসল শাওনের হৃদয়। কাছে বসে থাকা সৌমিকে তার অসহ্য ঠেকতে লাগল। ইচ্ছে হলো এক্ষুনি উঠে যায় দূরে। কিন্তু তাতে যে অপমান করা হবে সৌমিকে। ভেতরে ভেতরে অসহায়ত্ব আর দ্বিধায় ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠল শাওন। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে তীব্র এক জেদে সে সৌমির কাছ ঘেঁষে বসল। হৃদয় ফাঁটছে ফাটুক, বুকের ভেতর সব ধ্বংস হয়ে যাক। নিজেকে ধ্বংসই করবে সে এবার। সৌমির কাঁধের কাছে মুখ নামিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলল,
‘ সৌমি!’
সৌমি মুখ নামিয়ে লাজুক কণ্ঠে বলল,
‘ হু।’
‘ সৌমি আমি মরে যাচ্ছি। তুমি আমাকে দূরে কোথাও নিয়ে চলো প্লিজ। অথবা চলো হারিয়ে যাই। যেখানে তুমি আর আমি ছাড়া কেউ থাকবে না। কেউ না। যাবে? এই দূরত্ব আর যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না।’
কোমল কাঁধের কাছটা পুড়িয়ে দেওয়া তপ্ত নিঃশ্বাসের আড়ালে থাকা হতাশাটুকু ধরতে পারল না সৌমি। বরং রাঙা হলো প্রেমিকের অস্থিরতায়। প্রেমিকের ব্যাকুলতা সে কমাতে চাইল কোমল আদরে। সে আদর শাওনের শরীরে ফুটলো হুলের মতো। হৃদয়ে ছড়ালো বিষব্যথা। শাওন দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল। রক্তিম চোখদুটো আজ ছলকে উঠল না। বিদ্যুৎ চমকের মতো তাতে খেলে গেল বিষাদ। সেই সঙ্গে তীক্ষ্ম এক প্রতিশোধস্পৃহা। নিজের সঙ্গেই যেন অঘোষিত এক যুদ্ধে নামল সে। সেই যুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষ দুই পাশেই একলা দাঁড়িয়ে আছে সে। ঘাত-প্রতিঘাতের প্রতিটি ব্যথা তার একার। এই ব্যথা সে নেবে। নিজেকে চূড়ান্ত আঘাত সে করবে। মৌনি কতটুকু সহ্য করতে পারে তাই সে দেখবে।
—————
আকাশে ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ নিষ্প্রভ আলো ছড়াচ্ছে। ঘড়িতে কয়টা বাজে, কে জানে! মিথি মুঠোফোনের আলোয় একবার ঘড়ি দেখে নিয়ে দরজায় চাবি দিলো। বসার ঘরের আলোটা আজ নেভানো। নেভানো থাকে সপ্তাহখানেক ধরে। সেদিন ছাদে তাদের কথা হবার পর থেকে সাব্বিরের দেখা পায় না মিথি। রাতে বাড়ি ফিরে তার বন্ধ শোবার ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে এতটুকু বুঝে সাব্বির বাড়ি আছে। বাড়ি যদি থাকেই তবে কেন নিভিয়ে রাখে সে বসার ঘরের আলো? সে-ও কী তবে মিথির মতোই হারিয়ে ফেলেছে এই সম্পর্কের সমস্ত আলো? আলো নিভিয়ে সম্পর্কের শেষটাকেই কী নির্দেশ করছে সে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিথি। সুইচ টিপে বসার ঘরের আলোটা সে জ্বালিয়ে দেয় প্রগাঢ় অভিমানে। নীরব প্রতিপক্ষকে জানিয়ে দেয়, সে ফিরেছে। ক্লান্ত মন নিয়ে নিজের শোবার ঘরের দিকে রওনা দিতেই আনমনেই চোখ যায় বইয়ের তাকে৷
সাব্বিরের বিশাল বইয়ের তাকের নিচের দিকে প্রতিদিনের খবরের কাগজগুলো তারিখ মোতাবেক পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখে সাব্বির। মিথির চোখ গেল ওই সংবাদপত্রের ওপর। খেয়াল করে দেখল, ভাঁজ করা খবরের কাগজের কিছুটা অংশ কাটা। মিথি এগিয়ে গিয়ে কৌতূহলবশত তুলে নিলো সেই কাগজ। গাঢ় চোখে তাকাতেই বুঝল, জায়গাটা কাঁচি দিয়ে সমান করে কাটা। কেউ সময় নিয়ে যত্ন করে কেটেছে। তাদের বাড়িতে কাগজ কেটে খেলা করার মতো কোনো শিশু নেই। সাব্বিরের প্রয়োজন হলেও এভাবে এতো যত্ন করে কেটে নেওয়ার তো কথা না। সাধারণত দরকারে অদরকারে এতোটা গোছালো আমরা হয়ে উঠতে পারি না। তবে, সাব্বির ভিন্ন। হতেও পারে সে সবকিছুই গুছিয়ে করতে ভালোবাসে। মনে মনে এমন একটা চিন্তা নিয়ে খবরের কাগজটা আবার আগের জায়গায় রাখতে গিয়ে দেখল, তার আগের দিনের সংবাদপত্রের থেকেও নির্দিষ্ট একটা অংশ কাটা। এবার কিছুটা অবাক হলো মিথি। দ্বিতীয় খবরের কাগজটা ভালো করে নিরক্ষণ করে কী মনে করে একে একে সবগুলো খবরের কাগজ পরীক্ষা করে দেখল। প্রত্যেকটা খবরের কাগজে একই ব্যাপার। খবরের কাগজের কোনো না কোনো অংশ কেটে নিয়েছে কেউ। মিথি কিছুটা অবাক হলো। হয়তো বিষয়টা খুবই সাধারণ কিন্তু বুদ্ধিমতী মিথির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, এর পেছনে নিশ্চয় কোনো প্রশ্ন আছে! সাব্বির এই ব্যাপারটা ঘটিয়েছে ইচ্ছে করে। তবে কী সাব্বির তাকে কিছু জানাতে চাইছে? যা সে মুখে বলতে পারছে না সেগুলোই..? মিথির কপালের ভাঁজ মলিন হলো এবার। খবরের কাগজগুলো সঙ্গে নিয়ে দ্রুত নিজের ঘরে রওনা হলো। কাঁধের ব্যাগটা বিছানায় ফেলে সংবাদপত্রের কেটে ফেলা অংশগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দ্রুত হাতে নিজের ল্যাপটপটা টেনে নিলো কোলের ওপর। ওয়েবসাইটে সংবাদপত্রের কপিগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করলো। তারিখ, পৃষ্ঠা, কলাম মিলিয়ে যখন একে একে কেটে নেওয়া অংশগুলো উদ্ধার করল তখন কিছুটা বিভ্রান্ত দেখাল মিথিকে। বুঝতে পারল না, এই অংশ কেটে নিয়ে কী বুঝাইতে চাইছে তাকে সাব্বির! নাকি কিছুই বুঝাতে চাইছে না, মিথি বৃথা ভাবছে? যদি তার ভাবনা বৃথাও হয় তারপরও একটা প্রশ্ন থেকে যায় মনে, এই কাগজ কাটার পেছনে উদ্দেশ্য কী তার? খবরের কাগজ কাটা নিশ্চয় কারো শখ হতে পারে না?
—————
অন্ধকার রাত। ফার্মগেইটের কাছে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে বাইকের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাহিদ৷ ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। বেপরোয়া চোখদুটো রাত বাতির মতো জ্বলছে। আপাতদৃষ্টিতে ভাবলেশহীন হলেও শকুনের থেকে তীব্র দৃষ্টিতে সে নিরক্ষণ করছে চারপাশ।
জাদুর শহর রাজধানী রাতের আঁধার নামার সঙ্গে সঙ্গে বদলে ফেলে তার রূপ। সুয্যিমামা দিগন্তের ওপারে গা ঢাকা দিলেই ঢাকা শহরের লাল বাতির নিচে জেগে উঠে অন্যরকম এক জগৎ। রাত যত গভীর হয় ব্যস্ত মানুষের কোলাহল থেমে বাড়তে থাকে নীরবতা। নীরব শহরে রাতের চাঁদরে মুখ লুকিয়ে শুরু হয় আসল খেলা। সভ্য মানুষের শহরটির ধীরে ধীরে নগ্নতায় গ্রাস হয়ে যাওয়ার খেলা। সেই নগ্ন শহরে তখন ধূর্ত পায়ে হেঁটে চলে অন্ধকার জগতের মানুষ। হেঁটে বেড়ায় নিশিকন্যা, ছিনতাইকারী, মাদককারবারী এবং নাহিদের মতো ভবঘুরে। দূরে ষোল সতেরো বছরের এক মেয়ে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিল তাদের। নাহিদও তাকিয়ে ছিল তার দিকেই। নাহিদকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাহস করে এগিয়ে এলো মেয়েটি। নাহিদ তাকে দেখে হাসল। ঠোঁটে সিগারেট নিয়েই মেয়েটিকে আগাগোড়া লক্ষ্য করে বলল,
‘ নাম কী?’
মেয়েটি দায়সারা কণ্ঠে বলল,
‘ নাম দিয়ে কাম কী? কামের কথা বলেন।’
নাহিদ কাজের কথায় এলো,
‘ তোমার রেন্ট কতো?’
মেয়েটি নিরুৎসাহিত কণ্ঠে বলল,
‘ দুইশো টাকা।’
সৌধ চোখ গরম করে বলে,
‘ দুইশো! এই তুই তোর চেহারা দেখেছিস? স্বস্তার পাউডার লাগিয়ে কী অবস্থা!’
নাহিদ ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
‘ দুইজনে কত নিবে বলো?’
‘ দুইজনে তিনশো টাকা দিয়েন।’
‘ কিন্তু তুমি তো দেখতে অতো সুন্দর না। আমি তোমার থেকে বেশি সুন্দর। তোমার তো উচিত উল্টো আমাকে টাকা দেওয়া।’
মেয়েটি নাহিদের দিকে তাকাল। বলল,
‘ পঞ্চাশ টাকা কম দিয়েন।’
নাহিদ মুখ গম্ভীর করে দর করল,
‘ দুইজনে পঞ্চাশ টাকা দিবো।’
‘ অতো কমে হবো না।’
‘ তাহলে দরকার নেই। তুমি যাও।’
মেয়েটা এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ আপনারে দেইখ্যা তো মনে হয় টাকা-পয়সা আছে।’
সৌধ খেঁকিয়ে উঠে বলল,
‘ টাকা পয়সা থাকলেই তোকে দিতে হবে? যা এখান থেকে।’
‘ আচ্ছা যান। দুইজনে একশো টাকা দিয়েন।’
সৌধ প্রচন্ড ধমক দিলো,
‘ এক টাকাও দিবে না। যা তো, যা৷’
‘ ওমন করেন কেন? আশি টাকা দিয়েন যান।’
নাহিদ সৌধর মেজাজ আরও বিগড়ে দিতে বলল,
‘ আহা! ধমকাধমকি করছিস কেন? যা না ওর সাথে। তোর মেজাজের যে অবস্থা! তোর দরকার আছে।’
সৌধ বিষদৃষ্টিতে তাকাল নাহিদের দিকে। নাহিদ হাসতে গিয়েও হঠাৎ নজর বদলে গেল তার। সৌধ ওই চোখের ভাষা চিনে। নীরবে নাহিদের সঙ্গে বাইকে উঠে বসল। মেয়েটি বাইকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ চইলা যান কেন? আইচ্ছা, পঞ্চাশ টাকাই দিয়েন।’
নাহিদ মেয়েটির দিকে ব্যথিত চোখে তাকাল। কে বলে টাকা মানুষকে সুখ এনে দিতে পারে না? যে টাকা ষোড়শী এক মেয়েকে মধ্যরাতে রাস্তায় নামিয়ে আনতে পারে সে টাকার যে কত শক্তি সে কথা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো মানুষগুলোর পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব না। নাহিদের কী হলো কে জানে! দয়া-মায়া-নীতি-নৈতিকতা তার বরাবরই কম। ওসব মানবীয় গুণ তার নেই। তারপরও ওয়ালেট থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘ আজকের মতো ঘরে চলে যাও।’
মেয়েটি অবাক হয়ে বলল,
‘ আমাকে সঙ্গে নিবেন না?’
হেসে ফেলল নাহিদ,
‘ তোমাকে সঙ্গে নিয়ে কোথায় যাব?’
‘ আপনের যেখানে ইচ্ছা।’
নাহিদ শুধাল,
‘ দিনে কয়জন খদ্দের পাও?’
‘ পনেরো, বিশ জন।’
‘ ওরে বাপরে! তোমাদেরও তো দেখি দারুণ হার্ড ওয়ার্ক। আজ বরং একটু রেস্ট নাও এবং আমাকে একটু সাহায্য করো। তোমাকে আরও একশো টাকা বাড়িয়ে দিতে পারি যদি তুমি আমাকে কিছু তথ্য দাও। কোনো জোরজবরদস্তি নেই। তোমার ইচ্ছে।’
মেয়েটি মোহগ্রস্তের মতো নাহিদের দিকে তাকিয়ে রইলো। নাহিদ তাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শুধাল,
‘ আমাকে পছন্দ হয়েছে?’
নারীসুলভ লজ্জা খুইয়ে যার বিকিকিনি তার গালেও লজ্জার ছায়া পড়ল এহেন প্রশ্নে। নাহিদ হেসে ফেলে বলল,
‘ ইশ! তাহলে জলদি জলদি বলো তো এখানে মাদককারবারী কেমন চলে? তোমাদের অনেকেই তো যুক্ত এর সঙ্গে। কখন, কীভাবে কাজ চলে তোমাদের?’
মেয়েটা অবাক হয়ে শুধাল,
‘ আপনারা গোয়েন্দার লোক!’
নাহিদ প্রত্যুত্তরে মধুর হাসি হাসল। নিশিকন্যার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা শেষ করে পুরো এলাকাটায় বাইক নিয়ে চক্কর দিলো নাহিদ। কয়েকটা জায়গায় সন্দেহজনক চালচলন চোখে পড়ল। সৌধ তার কানের কাছে ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিল,
‘ পেন ক্যামেরাটা অন রেখেছিস তো? ক্যামেরা দিয়ে কিন্তু কিছু ক্যাপচার করছি না। ক্যামেরা দেখলে ঝামেলা হবে।’
নাহিদ মাথা নাড়ল। কিছুদূর যাওয়ার পর কিছু মানুষের সন্দেহজনক চলাচলে ইচ্ছে করেই বাইকের গতি কমাল নাহিদ। একটা ঝামেলায় না পড়লে ভেতরের ব্যাপারটা ঠিক ঠাওর করা যাচ্ছে না। নাহিদের বাইকের গতি কমতেই অন্ধকার ছায়া থেকে কয়েকজন আটকে দিলো তাদের পথ। নাহিদ জহরি চোখে লক্ষ্য করল একটু দূরেই সাদা পোশাকে দুইজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে কোনো চলিষ্ণুতা নেই। নাহিদদের সঙ্গে কী হচ্ছে সে নিয়ে তাদের আগ্রহও নেই। এই যেচে আনা বিপদে নাহিদকে বড়োই আনন্দিত দেখাল। বাদামি চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে উত্তেজনায়। যাক, আজ রাতটা কিছুটা হলেও ফলপ্রসূ হলো!
·
·
·
চলবে……………………………………………………