ল্যাম্পপোস্টের আলোর নিচে জমাট বাঁধছে অন্ধকার। মৌনি অলস রমণী। নীড়ে ফেরা পাখির মতো সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফিরে চুলোয় চা বসানো তার প্রিয় কাজ। কিন্তু আজ সেই নিয়মে কিঞ্চিৎ হেরফের হয়েছে। ধূসর আকাশে আঁধার নামার পরও তার রিকশা ফার্মগেট পৌঁছাতে পারেনি। ঘরে কেউ অপেক্ষা করে নেই, ফিরবার তাড়া নেই, তারপরও অস্থির লাগছে মৌনির। সে মিষ্টিকে ফোন করে বিরক্তি ভরে বলল,
‘ বুঝলি, এই লোক হলো আমার জন্য চূড়ান্ত ব্যাডলাক। এই লোকের সঙ্গে দেখা হলো আর আমি জ্যামে ফেঁসে গেলাম। আজ আমি আছিই ফাঁসাফাঁসির মধ্যে।’
মিষ্টি ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ কোন লোক?’
‘ ওইযে ওই প্রফেসর।’
মিষ্টি কৌতূহলী হয়ে শুধাল,
‘ ওই লোকের সঙ্গে তোর দেখা হয়েছে নাকি আবার!’
‘ হয়েছে মানে! এমনিতে আমি ক্লাস ফাস করি না। আজ ডিপার্টমেন্টের গ্রুপে দেখলাম তিনটায় একটা ক্লাস আছে। ভাবলাম, বাসায় ভাল্লাগছে না। যাই, ক্লাসটা করে আসি। গিয়ে দেখি এই লোকের ক্লাস৷ কেমন লাগে বল!’
মিষ্টি হাসল। আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল ,
‘ ভদ্রলোক তোকে খেয়াল করেছে?’
‘ খেয়াল করবে না! আমি ক্লাসে যেতে যেতেই লেইট। লেকচারের মাঝে দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি। একবার ভেবেছিলাম ইউটার্ন নিবো। তার আগেই জলদগম্ভীর কণ্ঠে বলল, আসুন!’
হো-হো করে হেসে উঠল মিষ্টি। টিপ্পনী কেটে বলল,
‘ আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, এই লোকের সঙ্গে তোর প্রেম-টেম হয়ে যাবে। হি ইজ গুডলুকিং দো!’
মৌনি হতাশ কণ্ঠে বলল,
‘ কিন্তু আমার মনে হয়, লোকটা সনাতন। সব সুন্দর ছেলের হাতেই দেখবি সুতা টুতা বেঁধে একাকার! যদিও এই লোকের হাতে এইরকম কিছু নেই। তবে আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে সে নন-মুসলিম। সবথেকে আতঙ্কের ব্যাপার ভদ্রলোক আমাকে চিনে ফেলেছে।’
মিষ্টি অবাক হয়ে বলল,
‘ তোকে চিনে ফেলেছে মানে?’
মৌনি মন খারাপ করে বলল,
‘ আমি ক্লাস থেকে বেরুচ্ছি। ভদ্রলোক আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার নাম মৌনি? আমি মাথা নাড়লাম। উনি তারপর বোম ফাটালেন। বললেন, mouniz এর মৌনি?’
মিষ্টি গলা ছেড়ে হাসল। বলল,
‘ হোয়াট আ ক্লাইম্যাক্স! এই লোক তোর ফ্যান নয় তো আবার!’
মৌনি দুঃখে মরে যাওয়ার ভান করে বলল,
‘ ছাতার ফ্যান! ভাই, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার অন্যরকম একটা ব্যাক্তিত্ব আছে। আমার ফলোয়াররা যদি জেনে যায় আমি বাস্তব জীবনে ছেলেদের দেখে খারাপ কথা বলি, তাহলে কী ভাববে?’
মিষ্টি হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে বলল,
‘ তোর যে চোখ খারাপ, সেটা ওরাও জানে। কিছু মনে করবে না দোস্ত। চিল!’
ততক্ষণে বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে রিকশা। এদিকের গলিটা বেশ ভেতরে। সন্ধ্যার আলো জ্বলতেই নীরব হয়ে যায় চারপাশ। মৌনি একটু মন খারাপের নাটক করবে বলে ভেবেছিল। তার আগেই রাস্তার ওপাশে জামরুল গাছের ছায়ায় একটা পুরুষ ছায়া চোখে পড়ল। ঝিম ধরা রাস্তায় ছেলেটা মুখ তুলে তাকিয়ে আছে মৌনিদের বিল্ডিংয়ের দিকে। মৌনির কেন যেন মনে হলো সে তাকিয়ে আছে ঠিক মৌনির ফ্লোরের দিকেই। মৌনি মিষ্টিকে বিদায় জানিয়ে রিকশা থেকে নামল। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে বার দুয়েক সন্দিহান চোখে তাকাল ছেলেটির দিকে। দূর থেকে মুখ বুঝা যাচ্ছে না। কিন্তু মনে হচ্ছে, মৌনি তাকে চিনে। মৌনি ভাড়া মিটিয়ে গেইটের ভেতরে ঢুকতে গিয়ে দারোয়ানকে শুধাল,
‘ রাস্তার ওপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে রোস্তম ভাই? আমাদের বিল্ডিংয়ে থাকে নাকি?’
দারোয়ান একবার বাইরে দেখে বলল,
‘ এই বিল্ডিংয়ের না আপা। অল্প বয়স্ক ছেমড়া। সন্ধ্যা থেকে দুই তিনবার চক্কর দিয়ে গেল। গিয়ে ধরব?’
মৌনি আরেকবার পেছন ফিরে তাকাল। কী মনে করে নিজেই ফিরে গিয়ে ছেলেটার সামনে দাঁড়াল। কিছু জিজ্ঞাসা করবে বলে তার মুখের দিকে তাকাতেই অস্ফুট কণ্ঠে বলল,
‘ ইমতি!’
ছেলেটি এবার চোখ ফিরিয়ে মৌনির দিকে তাকাল। লম্বায় মৌনিকে ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে যাওয়া ছেলেটির দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল মৌনি। একবার আশেপাশে তাকিয়ে সঙ্গে আর কেউ আছে কি-না দেখে বলল,
‘ তুই..’
পরমুহূর্তেই থামল। সদ্য গোঁফ গজানো শক্ত চোয়ালের ছেলেটির দিকে তাকিয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। সম্বোধন পরিবর্তন করে একটু ইতস্তত করে বলল,
‘ এই বিল্ডিং-এ তোমার পরিচিত কেউ থাকে? কার সঙ্গে এসেছ?’
ইমতি উত্তর দিলো না। নিজের প্রশ্নে কিছুটা অপ্রতিভ হলো মৌনিও। টেকনিক্যালি সে নিজেও তো ইমতির পরিচিত! কিন্তু ইমতি নিশ্চয় তার কাছে আসেনি। তাহলে? মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ এই বিল্ডিংয়ে আমি থাকি। আমার বাসায় যাবে ভাইয়া?’
ইমতি প্রত্যত্তুরে কিছুই বলল না। তবে মৌনির পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। মৌনি কিছুক্ষণ বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে রইল। আটতলায় নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলে ইমতিকে বসতে দিল। চা বানানোর ফাঁকে আড়চোখে তাকাল ইমতির দিকে। ইমতি মুখ গম্ভীর করে আশেপাশে দেখছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে মনে হয়, এ যেন কেবল দেখা নয়, চোখের দৃষ্টি দিয়েই অদৃশ্য কিছু তলাশ করছে। চেহারায় বড় ভাইয়ের চেহারার ছাপ স্পষ্ট। তবে অনেক চাপা তার গায়ের রঙ। মৌনি তার দিকে একটা চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে সামনের চেয়ারে বসল। ইমতি চায়ের কাপটা নিল মৌনির দিকে না তাকিয়ে। মৌনি এবার অসহায়বোধ করল। ইমতি তার পরের জেনারেশনের ছেলে। তাদের বাড়ির বাস্তব চিত্রানুযায়ী হিসেব করলে ইমতির সঙ্গে তার ভাব হওয়ার কোনো কারণ নেই। দেখা হওয়াটাও বেশ আশ্চর্যের ব্যাপার। ইমতি যখন স্কুলে তখন মৌনি নাহিদরা বেরিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে। এর আগে যখন তাকে দেখেছিল তখন সে বেশ বালক ছিল। মৌনি দারুণ গল্প জমাতে জানতো। প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ির ছোটদের নিয়ে মৌনি গল্পের আসর বসাতো। সেই গল্পের একজন মনযোগী শ্রোতা ছিল ইমতি। সেই ছেলে এই কয়েক বছরে কত বড় হয়ে গিয়েছে! ক্যাডেট কলেজে পড়ে। এই বয়সেই চেহারায় চাপা গাম্ভীর্য। বুদ্ধিদীপ্ত চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, আশেপাশের সবকিছুকেই সে উপহাস করছে। এমন বুদ্ধিমান ছেলের সঙ্গে কী কথা বলবে মৌনি? তাকে নিশ্চয় ভূতের গল্প বলে আশ্বস্ত করা যাবে না? রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে কথা বললে হয়তো-বা সে আগ্রহী হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো এই সম্পর্কে মৌনি আজকাল খুব একটা খোঁজখবর রাখছে না। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে একটু সহজ হওয়ার চেষ্টা করল মৌনি। সামনের টেবিল থেকে রুবিকস্ কিউব এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘ এটা সল্ভ করে দিতে পারো ইমতি?’
ইমতি চায়ের কাপ নামিয়ে কিউবটা হাতে নিলো। একবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মৌনিকে হতবাক করে দিয়ে পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় কিউবটা সল্ভ করে মৌনিকে আবার ফিরিয়ে দিলো। মৌনি এবার চূড়ান্ত হতাশ হলো। এই ছেলে তো দেখা যায়, তার ভাবনার থেকেও দ্রুত। বড় চাচীর সবগুলো ছেলে হয়েছে তার মতো, ইন্টেলেকচুয়াল। এদের সঙ্গে কথা বলতে হয় ভেবেচিন্তে। মৌনি মুখ গম্ভীর করে বলল,
‘ তোমার ছুটি চলছে?’
ইমতি এবার উত্তর দিল,
‘ হ্যাঁ।’
‘ ক্যাডেট কলেজে খুব নিয়ম করে চলতে হয় তাই না?’
ইমতি উত্তর দিল না। মৌনি শুধাল,
‘ ঢাকায় কবে এসেছ?’
‘ পরশু।’
‘ ইশতিয়াক ভাইয়ের বাসায়?’
ইমতি মৌনির দিকে তাকাল। মৌনি শুধাল,
‘ ইশতিয়াক ভাই তো থাকে সেই মহাখালী! কী বিপদের কথা, তুমি এই সন্ধ্যায় এইদিকে কেন এসেছিলে?’
ইমতি মুখ গম্ভীর করে বলল,
‘ এমনি।’
‘ এমনি!’
মৌনি যেন অথৈ সাগরে পড়ল এবার। এমনি এমনি এই ছেলে মহাখালী থেকে ফার্মগেট চলে এলো? এই অচেনা শহরে এই রাতের বেলা তাকে মৌনি একলা ছাড়বে কী করে? নিজের কাছে রাখারও তো উপায় নেই। এই বাসায় একটি মাত্র ঘর নিয়ে মৌনি থাকে। এখানে রাতের বেলা এতো বড় ছেলেকে রাখা অসম্ভব। মৌনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধাল,
‘ ইশতিয়াক ভাইকে বলে এসেছ তুমি?’
ইমতি বলল,
‘ ভাইয়া হাসপাতালে ছিল।’
মৌনি এবার কড়া চোখে তাকাল। কঠিন গলায় বলল,
‘ ভাইয়া হাসপাতালে ছিল! ভাইয়া হাসপাতালে থাকলেই তুমি তাকে না বলে এই সন্ধ্যায় বেরিয়ে আসবে বাসা থেকে? ঠিক করে চিনো তুমি ঢাকা শহর?’
ইমতি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
‘ আমি বাচ্চা নই।’
মৌনি এবার শাসন করে বলল,
‘ তুমি আমার কাছে বাচ্চাই ইমতি। একদম বড়দের মতো বিহেভ করবে না।’
দেখা গেল, ইমতিকে যতটা শান্ত মনে হয়েছিল ততটা শান্ত সে নয়। মৌনির দিকে তাকিয়ে সে রুক্ষ কণ্ঠে বলল,
‘ তুমিও তো ওমন বিহেভ করছ।’
মৌনি অবাক হয়ে বলল,
‘ কেমন বিহেভ করছি?’
‘ ইউ আর বিহেভিং লাইক ইউ নো নাথিং!’
‘ মানে?’
‘ তুমি আমার মায়ের মতো দেখতে। তুমি কেন আমার মায়ের মতো দেখতে হবে?’
এইবার একেবারে শান্ত হয়ে গেল মৌনি। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে চাপা কণ্ঠে বলল,
‘ আমরা কাজিন। কাজিনদের চেহারার আদল কাছাকাছি হতে পারে ইমতি। এটা স্বাভাবিক।’
‘ ফালতু লজিক। তাহলে তোমার উচিত ছিল আমার বাবার মতো দেখতে হওয়া। বাবার সঙ্গে তুমি জেনেটিক্যালি কানেক্টেড হতে পারো। লুক এট ইউ! তোমার সঙ্গে বাবার কোনো মিল নেই। তুমি কানেক্টেড মায়ের সঙ্গে। কীভাবে! কেন! হু দ্যা হেল আর ইউ?’
মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দীর্ঘক্ষণ ইমতির দিকে তাকিয়ে থেকে শীতল কণ্ঠে বলল,
‘ আমি মৌনি, ইমতি। শুধু মৌনি। তোমার মায়ের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি এখন ইশতিয়াক ভাইকে ফোন করব। সে এসে তোমাকে নিয়ে যাবে।’
ইমতি চোয়াল শক্ত করে উঠে দাঁড়াল। জেদ নিয়ে বলল,
‘ আই ক্যান গো অন মাই ওন।’
মৌনি শীতল কণ্ঠে বলল,
‘ থাপ্পড় না খেতে চাইলে চুপ করে বসো। আমি যা বলেছি তাই হবে। তুমি একা যাবে না।’
মৌনি ভেবেছিল ইমতি তার কথাকে তোয়াক্কা না করে বেরিয়ে যাবে। এই বয়সের ছেলেরা নিজের উপর অন্যের খবরদারি পছন্দ করে না। কিন্তু মৌনিকে অবাক করে দিয়ে ইমতি কিছু বলল না। অভিমানী বালকের মতো মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল। মৌনির হঠাৎ করেই খুব ক্লান্ত লাগল। চেয়ারে গা ছেড়ে উদাস চোখে সে তাকিয়ে রইল ছাদের দিকে। এভাবে কতক্ষণ কাটল কে জানে? মৌনির ঘোর কাটল মায়ের ফোনে। মৌনি ফোন তুলে মায়ের কুশল জিজ্ঞাসা করল। এক সময় মা খুব আনন্দ নিয়ে জানালেন,
‘ শাওন যে সপ্তাহখানেক হলো ফিরে গিয়েছে জানিস?’
মৌনি ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,
‘ জানতাম না মা। এখন জানলাম।’
মা খুব দায়সারা কণ্ঠে বললেন,
‘ ওহ!’
তারপর উৎসাহ নিয়ে বললেন,
‘ সৌমি মেয়েটার জন্যই সম্ভব হলো বুঝলি। মেয়েটা তো খুব সুন্দরী। গুণী। কী মিষ্টি করে কথা বলে! ঠিক বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে ছেলেটাকে। আপা তো খুব খুশি…’
বোনের ছেলের আনন্দে মায়ের আনন্দ ধরতে পারল মৌনি। অথচ তার বুকের ভেতর তখন অপমানের ঢেউ। কেন যেন তার মনে হলো, মা তার থেকেও বেশি ভালোবাসে শাওনকে। শাওনের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা যখন চারদিকে চাওড় হয়েছিল। মা তাকে বলেছিল, শাওনের থেকে দূরে থাকার জন্য। খালামণি তাকে পছন্দ করেন না। মৌনি খুব অপমানিত হয়েছিল। গর্ব ভরে বলেছিল, তারা খুব ভালো বন্ধু। কারো কথায় সে তার বন্ধুত্ব ভাঙবে না। আজ সেই বন্ধুত্ব ভেঙে চৌঁচির। শাওনের ন্যূনতম খবরগুলোও ঘুরেফিরে সবার পরে পায় মৌনি। মায়ের দিকের আত্মীয়দের এই নিয়ে উৎসাহের শেষ নেই। সকলে জোর করেই মৌনিকে দাঁড় করাতে চায় সৌমির প্রতিপক্ষ করে। সৌমি শাওনের সাথে কতটা ভালো, মৌনি কতটা নয়, তার একটা মাপকাঠি ঠিক করে সর্বদা তা নিয়ে জল্পনা কল্পনার ফোয়ারা ভাসায়। মায়ের কথাতেও সেই একই সুর টের পায় মৌনি। অথচ মায়ের মৌনির ব্যথা বুঝার কথা ছিল। মৌনি কক্ষনও কারো দয়া চায় না। কারো ভালোবাসা প্রত্যাশা করে না। নিজের জন্য সে একাই যথেষ্ট। কিন্তু আজ তার প্রথম মনে হলো সে খুব একা। এই পৃথিবীতে সে সকলের মন বুঝার চেষ্টা করে। কারো মন খারাপে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় অকৃত্রিম স্নেহ নিয়ে। কিন্তু নিজের বেলায়? নিজের চারপাশে একটা মিথ্যা আনন্দের বলয় তৈরি করে রাখে সর্বক্ষণ। সেই বলয় ভেঙে ভেতরে এসে কেউ কোনোদিন মৌনির মাথায় হাত রাখেনি। একবার বলেনি,
‘মৌনি, তুমি ভালো থেকো।’
মৌনি চেয়ারে পা তুলে দুই হাঁটু বুকে জড়িয়ে নিশ্চুপ বসে থাকে। সবার নিজের জন্য মৌনিকে দরকার। মৌনির জন্য মৌনিকে দরকার এমন কেউ নেই কেন পৃথিবীতে?
—————
টিক টিক করে ঘড়ির কাটাটা এসে থামল এগারোর ঘরে। মিথি ঘড়ির দিকেই তাকিয়ে ছিল। রাত অনেক হয়েছে, বাড়ি যাওয়া দরকার। কিন্তু কোন বাড়ি যাবে মিথি? সাব্বিরের কলাবাগানের বাসায় যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। সাব্বির এই মুহূর্তে মানসিকভাবে খুব ক্লান্ত। মিথিকে দেখলে নিজের অজান্তেই কেমন সংকোচিত হয়ে যায়৷ মিথির উপস্থিতিতে সে বিরক্ত হয়। অধৈর্য হয়। তার এগিয়ে যাওয়া সাব্বিরকে আরও অপ্রস্তুত, আরও অসহায় করে তুলে। সে পালিয়ে যেতে চায়। জীবন থেকে, বাস্তবতা থেকে। কখনও কখনও কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে যায় বাড়ি থেকে। তার এই অস্থিরতার কথা মিথিকে মুখ ফুটে না বললেও বুঝে মিথি। এতো বড় ট্রমা বয়ে বেড়ানো ছেলেটাকে আর ক্লান্তি দিতে ইচ্ছে হয় না। স্বস্তি কী করে দেওয়া যায়, সে কথাও ভেবে পায় না। তার থেকে নিজের পৃথিবীতে নিজের মতো করেই ভালো থাকুক সে। মিথি যাবে না সেখানে। তার নিজস্ব পৃথিবীতে আঘাত করবে না। কিন্তু কোনোদিন, কোন এক গোধূলিতে সাব্বিরের যদি কখনও ওই অন্ধকার পৃথিবী থেকে মুখ তুলে তাকাতে ইচ্ছে করে মিথিকে সে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে সেই একই রাস্তার মোড়ে। মনের ভেতর কেউ যেন প্রশ্ন করে উঠল হঠাৎ,
‘ কিন্তু তারপর? এভাবে কী জীবন চলে?’
সেই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই মিথির।
‘ বাসায় যাবেন না আপু?’
হৃদয়ের প্রশ্নে দেওয়াল ঘড়ি থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকাল মিথি। ছদ্ম ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল,
‘ হ্যাঁ, এইতো বেরুবো।’
‘ আমি বেরুচ্ছি আপু। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি?’
মিথি হেসে বলল,
‘ আরে দূর! অতো দেরীও হয়নি। তুমি যাও, আমি একটু পরই বেরিয়ে যাব।’
হৃদয় উত্তর না দিয়ে চুপ করে এক কোণায় দাঁড়িয়ে রইল। মিথি তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
‘ কী ব্যাপার? তুমি বেরুবে বললে না? দাঁড়িয়ে আছ কেন?’
হৃদয় মৃদু কণ্ঠে বলল,
‘ একটু পরেই বের হই আপু। আমারও একটু কাজ ছিল।
মিথি প্রত্যুত্তর না করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। বহুদিন পর ক্লান্ত লাগছে তার৷ মনে হচ্ছে, সব ছেড়েছুড়ে এখানেই নিশ্চুপ বসে থাকতে। আর কোথাও যাবার নেই তার। আর কিছু ভাবার নেই, পাবার নেই। এইবার সে ক্লান্ত। একটু বিশ্রাম দরকার।
·
·
·
চলবে……………………………………………………