প্রকৃতি যেন অলীক আতঙ্কে নিমজ্জিত! আনমনে বুঝিয়ে দিল চর্তুদিকে ভয়! করুণ ভয়! এই ভয় থেকে নিস্তার নেই। বাঁচা নেই। উদ্ধারও তালব্য শ দিয়ে শূন্য। বুকের ভেতর দুরুদুরু তীব্র কাঁপুনি নিয়ে বাঁশের দুয়ার খুলল সে। ধীরে ধীরে, মন্থর লয়ে, চোরের মতো তাকাল শ্রেষ্ঠা। এখনো মনে হচ্ছে আতঙ্কের ঢেউ কমেনি, হামলার বর্বরতা যায়নি, যেন ভয়াল গ্রাসে অপ্রত্যাশিত কিছু মুখিয়ে রয়েছে। পেছন থেকে ফিসফিস স্বরে তেমনি ভীতকণ্ঠে বলে উঠল রোজা,
- শ্রেষ্ঠা সাবধান! খবরদার দরজা ওভাবে খুলিস না। ওরা দেখে ফেলবে.. ওরা দেখে ফেলবে আমাদের! তাড়াতাড়ি ওটা বন্ধ কর, বন্ধ কর জলদি!
শ্রেষ্ঠা কথাগুলো শুনল না। ও তেমনি দরজা খুলে সামান্য ফাঁক করা জায়গাটা দিয়ে চোখদুটো এঁটে দিল। একেবারে নিঃশব্দে, প্রায় দম বন্ধ করে দূরের ধূঁ ধূঁ অন্ধকারে সবকিছু দেখতে লাগল। লোকগুলো আশপাশে নেই। ওদের উপস্থিতি হয়তো টের পায়নি! এদিকটা ছেড়ে অন্যদিকে নির্মম তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে। ওরা চারজন এখন বসে আছে সেলিমের কুটির থেকে সামান্য দূর, এক ভগ্ন জীর্ণ পরিত্যক্ত ঘরে। যে ঘরে অব্যবহৃত জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঘরটা মূলত স্টোর রুম। এখানে কেউই মূলত আসে না। সেলিম ভালো করেই জানতো, এমন ভগ্ন দুর্বল ঘরে দুর্বৃত্তরা পা মাড়াতে যাবে না। বরং বাইরে থেকে সুরতহাল পর্যবেক্ষণ করে কুটিরগুলোতে ধ্বংসলীলা চালাবে। আর হয়েছেও তাই। কানে রীতিমতো আছড়ে ফেলার শব্দ, তীব্র ভাঙচুরের আওয়াজ, হৈ হৈ গলাগুলো শুনতে পাচ্ছে সবাই। ভয়ে হৃৎপিণ্ডের মাঝ বরাবর কামড় বসে যাচ্ছে! পিঠের শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঠাণ্ডা শীতালু স্পর্শ! এমন সময় জিদান আরো সতর্ক স্বরে ফিসফিস করে বলল,
- শ্রেষ্ঠা, শ্রেষ্ঠা কথা শোন। দরজাটা বন্ধ কর। এভাবে বিপদ ডাকিস না। ওরা টের পেলে কুকুরের মতো জবাই করে যাবে! রেসোর্টের ম্যানেজার আমাদের ছেড়ে পালিয়ে গেছে শ্রেষ্ঠা। এই মুহুর্তে জান বাঁচানো ছাড়া আর কিচ্ছু দেখছি না! দরজাটা প্লিজ বন্ধ কর।
সরু ফাঁকে নজর বুলিয়ে ভারি বিরক্ত হয়। মুখ ভরে ভরে গালি আসে। কিন্তু পরিস্থিতির জন্য মুখ ফুটে কিছু বলে না শ্রেষ্ঠা। এদের মতো নিমোকহারাম, গর্দভ, রাম ছাগলদের সাথে একদণ্ড থাকতে ইচ্ছে করছে না। কেমন মানুষ এরা? তিনটে ব্যক্তি এখনো মৃত্যুর কার্নিশে ঝুলে আছে, সেখানে ওরা চিন্তা করছে 'নিজে বাঁচলে বাপের নাম'? চরম আক্রোশে বুঁদ বুঁদ করে ওঠা ক্ষোভ দমিয়ে নেয় শ্রেষ্ঠা। ভারি একবুক দম ছেড়ে আবারও চাইল দরজার ফাঁকে। যেভাবেই হোক এই মৃত্যুপুরী থেকে বেঁচে ফিরতে হবে! বাঁচাতেই হবে ওদেরকে!
—————
রেসোর্টের উত্তরপ্রান্তের রাস্তাটায় সজোড়ে গাড়ি থামিয়েছে পার্থ। আকস্মিক ব্রেকে প্রচণ্ড ভড়কে গেছে রাফান। পেছনের সিট থেকে ধমকে ওঠার কথাটুকু মনে নেই তার। অতল বিস্ময়ে চোখদুটো স্থির করে ফেলেছে! সরাসরি তাকিয়ে আছে সামনের রিয়ার-ভিউ মিররে। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শোয়েবের পাষণ্ড মুখ। কী বীভৎস কঠিন! বুকটা ধ্বক করে উঠল রাফানের। ঢোক গিলে দৃশ্যটা হজম করার জন্য ধীর গলায় ডাকল,
- স্যা. .স্যার,
ফোন ধরা মুঠোটা পকেটে পুড়ল শোয়েব। মাথা ঘুরিয়ে সরাসরি চাইল রাফানের দিকে। চোখের জান্তব দৃষ্টি, ঠোঁটের কাঠিন্যতা সেভাবেই অটল রেখে বলল,
- রাফান, ঠাণ্ডা মাথায় সমাধান করো। তুমি এখনি গাড়ি থেকে বের হবে। ওয়াকি টকি সেটে বেস এরিয়ায় যোগাযোগ করবে। আমার মনে হচ্ছে স[ন্ত্রা] সী হামলা। জানি না হতাহত হয়েছে কতজন। নাযীফ ছেলেটা হয়তো একা আঁটকা পরেছে। আমাদের হাতে সময় কম। বেরোও!
কথা শুনে রাফান আর পার্থ দুজনই চমকে উঠল। দুজনই কপালে ভাঁজ ফেলে শোয়েবের দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত একটা তথ্য শুনে পার্থই প্রশ্নটা করে ওঠে,
- স্যার? শিয়োর কীভাবে হচ্ছেন নাযীফ ছেলেটা একা আঁটকা পরেছে? ওরা দলে তো সাতজন। একা তো না!
গা থেকে সিটবেল্ট খুলতে খুলতে জবাবটা দিল শোয়েব,
- জাস্ট অ্যান আইডিয়া। একা না থাকলে 'আমরা', 'আমাদের' এই ওয়ার্ডগুলো জোর দিয়ে বলতো। কিছুই বলেনি। একা আছে বলেই ভয়টা বেশি পাচ্ছে! বের হও এক্ষুণি।
কথা শুনে পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করল রাফান আর পার্থ। ওইটুকু কথার মধ্যেও পরিস্থিতির বর্ণনা ছিল? ওরা তো কিছুই বুঝতে পারেনি! এমনকি ঠাহরও করতে পারেনি নাযীফ সম্পূর্ণ একা! অথচ, উনি ফোনকলে মাত্র দুটো কথা শুনেই একা নাকি দলবল, এই ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে! কী ভয়ংকর কারবার! গাড়ির বাঁদিকের দরজা খুলে নির্জন রাস্তায় বেরুল শোয়েব। চাঁদের তরল জোৎস্নায় ভালো করে চারিদিকটা দেখে নিচ্ছে। রাফান ও পার্থ গাড়ির সেফজোন থেকে তিনসেট ওয়াকি টকি, তিনটে নাইন এম এম বস্তু, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে বেজ এরিয়ায় দ্রুত খবর পাঠাল। বুলেট ছোঁড়ার শব্দ এখন পাচ্ছে না শোয়েব। তবু চোখের চশমাটা ডানহাতে খুলে গাড়িতে রেখে এল সে। এই চশমা এখন তার লাগবে না। পার্থ কিছু একটা বুঝতে পেরে তখুনি ওয়াকি টকি সাইডে রেখে বলল,
- আপনি কী করতে চাইছেন স্যার? কোথায় যাচ্ছেন আপনি? ফোর্স এখনো আসেনি স্যার। আসতে কিছুটা সময় লাগবে।
নিজের ওয়াকি টকিটা কোমরের সঙ্গে আঁটকে একপলক তাকাল শোয়েব। ভণিতা না করে সরাসরি উদ্দেশ্যটা বলে ফেলল,
- আমি আগে যাচ্ছি। ভেতরে কী পরিস্থিতি হয়েছে জানা যাচ্ছে না। এভাবে হাতে হাত রেখে বসে থাকাটা আমার পক্ষে কষ্টকর। আমি এগোচ্ছি। তোমরা পেছন থেকে ব্যাকআপ নিয়ে এগোও। যদি দেখো আমার ফিরতে দেরি হচ্ছে, আমার জন্য তোমরা অপেক্ষা করবে না। সরাসরি বাড়ি ফিরে যাবে।
আকাশ থেকে ঠাস করে পরার মতো আশ্চর্য হলো পার্থ! ঠোঁটের সামনে থেকে ওয়াকি-টকি সরিয়ে অবাক কণ্ঠে শুধোল,
- আপনি কোন রুট দিয়ে এগোবেন? এন্ট্রেন্স রুট তো সম্পূর্ণ কলাপজ্। ওখান দিয়ে ঢোকা যাবে না স্যার। টু রিষ্কি। ওটা সরাসরি ওপেন ট্যাকেল!
- জঙ্গল দিয়ে ঢুকব। ওখানে কারোর চোখ পরবে না। আশা করছি পাঁচ মিনিটের ভেতর পেট্রল টিমটা এসে পরবে। তুমি রাফানকে নিয়ে ওদের যতজনকে পারো, রেস্কিউ করে ফিরে যাবে। দাঁড়াবে না। রাতের অন্ধকারে ফুল গিয়ারে না বের হলে সমস্যা পার্থ। রেসোর্টের মালিক আর ম্যানেজার কোথায় পালিয়েছে সেটাও খোঁজ করা জরুরি। আমি গেলাম সামনে, ওকে?
- ওকে স্যার।
বাড়তি প্রশ্ন না ছুঁড়ে সদা প্রস্তুত ভঙ্গিতে কাজে লাগল পার্থ। রাফান দূরে গিয়ে নেটওয়ার্ক সিগন্যাল পাবার জন্য কথা বলে যাচ্ছে। মূলত তথ্যগুলো জানাচ্ছে সেনাবাহিনীর নিকট। যেন দ্রুততম সময়ে বিচ্ছিন্ন পরিস্থিতিটা ওদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসুক।
রাতের অন্ধকারে কালো টেকটিক্যাল হুডি, হুডির নীচে সাদা টিশার্ট। মাথাটা হুডির টুপিতে ঢেকে রাখা। কমব্যাট ট্রাউজারের রাইট পকেট থেকে ধারাল ছুরিটা বের করে এগোতে লাগল শোয়েব। বাঁহাতে খুব দক্ষভাবে কাঁটাযুক্ত ঝোঁপঝাড় হটিয়ে এগোতে লাগল। বহুদিন পর এরকম সার্ভিলেন্স ভঙ্গিতে কাজ করছে সে। চোখদুটোও রাখছে ক্ষিপ্র, উদ্যম, সদা সতর্ক ভঙ্গিতে। শুকনো পাতার মচমচ শব্দ এড়াতে খুব সাবধানে ভেজা জায়গার উপর পা ফেলছে শোয়েব। এই স্বল্প জোৎস্নার মাঝেও এমনভাবে এগোচ্ছে, যেন চারপাশ দিনের মতো ফকফকে, সবকিছু তার নখদর্পণে। কোমরের বাঁদিকে আঁটকানো ওয়াকি-টকি থেকে যান্ত্রিক মৃদু শব্দ বেজে উঠল। খুব ক্ষীণ ভলিয়মে অ্যাডজাস্ট করে নেয়ায় ঘড় ঘড় জাতীয় শব্দটা চারপাশ সচকিত করেনি। আস্তে করে বাঁহাতটা চোখের সামনে থেকে সরিয়ে কোমরের বাঁদিকে নামালো শোয়েব। ডানহাতের অস্ত্রটা দিয়ে অতিরিক্ত বাড়বাড়ন্ত কাঁটার ডালগুলো সরাতে সরাতে ওয়াকি-টকিটা ঠোঁটের কাছে ধরল। তেমনি সতর্ক, তেমনি কায়দাবাজের মতো নীচুস্বরে বলল শোয়েব,
- আলফা ওয়ান। রিড ইয়্যু। বলো।
ওয়াকি-টকি থেকে আবারও যান্ত্রিক শব্দ ভেসে এল,
- ব্রাভো, দিস ইজ আলফা ওয়ান। টিম পৌঁছে গেছে। অবস্থা জানিয়ে অর্ডার দিন।
- আলফা ওয়ান, মুভ। ওভার অ্যাণ্ড আউট।
ঠোঁটের কাছ থেকে ওয়ারলেস যন্ত্রটা নামিয়ে কোমরে চালান দিল শোয়েব। স্ট্যাণ্ডার্ড রেডিয়ো ল্যাঙ্গুয়েজে কথা চালাতে হয়েছে। তার সমস্ত দেহ টেকটিক্যাল হুডিতে ঢেকে থাকায় ঝোঁপের কাঁটাগুলো চামড়া পর্যন্ত যেতে পারছে না। খুব ধীরে ধীরে অতি সন্তপর্ণে জঙ্গলাবৃত জায়গাটা শেষ করল শোয়েব। চাঁদের ফিকে আলোয় বুঝতে পারল রেসোর্টের পূর্বদিকে চলে এসেছে সে। মূল প্রবেশপথটা পূর্বদিক থেকে আরো সামনে, বলা বাহুল্য ওটা দক্ষিণদিকে। বাঁহাতে শেষ ঝোঁপটা আস্তে আস্তে সরিয়ে সামনের সুনশান জায়গাটা দেখল শোয়েব। কেউ নেই। দূরে কয়েকটি নিস্তব্ধ কুটির অখণ্ড নীরবতায় দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের ওপর মেঘের আড়ালপনায় জোৎস্নাটা ম্লান হয়ে এসেছে। মানুষ সেখানে আছে কিনা, নাকি জ বাই করে গিয়েছে, তা একটুও বোঝা যাচ্ছে না। কান পাতলে অনেকগুলো বীভৎস কণ্ঠের আওয়াজ পাওয়া যায়। তবে সেটা দূরে দূরে। দাঁড়িয়ে না থেকে কুটিরের জন্য পা চালাল শোয়েব। চারিদিকটা এমন ভূতুড়ে অন্ধকার, এতো গাছগাছালি, সেই গাছের ফাঁকফোঁকর দিয়ে সূর্যের আলোও যেন ঢুকতে পারবে না। নিঃশব্দ জন্তুর মতো এগোতে এগোতে একটা উঁচু কুটিরের অবস্থা দেখে কাঠের সিঁড়ি ধরে উঠল। কয়েক সেকেণ্ড অপেক্ষা করে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। তার টানটান নার্ভ জানান দিচ্ছে এ ঘরে কেউ নেই, তবু সতর্কতার খাতিরে কয়েক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঢুকল ঘরটায়। ট্রাউজারের পকেট থেকে পেনসিন টর্চ বের করে গোল বৃত্তটা ফেলল। ঘরে কেউ নেই! ঘরের ভেতর সবকিছু পরে আছে, কিন্তু মনুষ্য অস্তিত্বই শূন্য। কুটিরটা থেকে বেরুতেই বুঝল, দুর্বৃত্তের দল এদিকটায় হয়তো আসেনি। অথবা আসলেও তেমন সুবিধে করতে পারেনি। বিশাল বড় রেসোর্টের এপাশটা ভয়ানক নিরিবিলি। কুটিরগুলোও কেমন যেন দশ বিশ হাত দূরে দূরে। রাফানরা কী করছে কে জানে, গোলাগুলিটা কেন বন্ধ তা বুঝতে পারছে না শোয়েব। চাঁদের ফ্যাকাশে আলোয় আবারও অন্য কুটিরের দিকে নিঃশব্দে ছুটল শোয়েব। এবার আপনা-আপনি সতর্ক হয়ে উঠল! কুটিরের ভেতর থেকে হালকা আওয়াজ আসছে। খুবই ক্ষীণ, মৃদু, অস্ফুট ভাবে! সুক্ষ্মভাবে কান না পাতলে শোনাই যায় না! ঘরে কী নাযীফ ছেলেটা? নাকি নৃশংসদের কেউ? কে রয়েছে?
—————
ভয়ে বুকের ভেতরটা এটুকু হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে গেলে প্রচণ্ড ভয় হচ্ছে! যেন এই নিঃশ্বাসের শব্দ বুঝি বাইরে চলে যাবে। এরপরই দলবল ওই দুর্বৃত্তরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে যাবে। সমস্ত শরীর ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে। ঝিমঝিম করছে হাতের তালু, পায়ের পাতা। এমন সময় দুকানে স্পষ্ট কথাগুলো শুনতে পেল সোহানা। কে যেন বিচ্ছিরি গালিতে রামধমক দিয়ে উঠল,
- না না, এই ধরণের ফাউ তইথ্য দেওন যাইব না। সবগুলারে খুঁজন মারা। পলায়া যাইব কই? রেসোর্ট এইটা বড় দেইখা এনে ওনে হান্দায়া আছে। মাগার পলাইতে হালারা পারতো না। আমার লগে তেড়িবেড়ি মারাইস না খা . . পোলা। খুঁজ ওদিরে!
আরেকটি পুরুষ কণ্ঠ তেমনি খ্যানখ্যানে গলায় বলে উঠল,
- আঁতকা পলাইলো ক্যামনে কন ভালা? আমি পুরা ছাঁকনির মতো ছাঁইকা ছাঁইকা দেখছি। আঠারোটা কুটিরের মইদ্যে এগারোটা দেহা শ্যাষ। বাকি আছে ওইদিকে কয়ডা, আর এইদিকে কয়ডা। তয় এগারোটার মইদ্যে নাকি উঠছে। এইডা নিয়া ম্যানেজারের ওই টিকটিকিরে জিগাইছিলাম। হেই টিকটিকি তো কইছিল প্রথম কয়ডাত নাকি বোঁচকা নিয়া উঠছে। তাইলে সামনের এই কুটিরগুলি খালি ক্যান? গেছে কোনহানে?
- ওই টিকটিকিরে সামনে পাইলে সত্যি সত্যি ওর লেজটা আমি কা ই ট্টা দিতাম। হালায় গিট্টু একটা মাইরা গেছে। এহন কাউরেই লাগুর পাইতাছি না।
আচমকা সিগারেটের কড়া গন্ধ পেল সোহানা। আতঙ্কে সারামুখ আরো বির্বণ হয়ে গেল। লোকদুটো ধূমপান করছে। ধূমপানের গন্ধ ও সহ্য করতে পারে না। ঠাণ্ডা হাতদুটো মুঠো করে একদম চুপ করে রইল। ভুলেও খুক করে কাশি দেওয়া যাবে না। তাহলেই বিপদ! চরম বিপদ! লোকদুটো ওকে দেখতে পায়নি এখনো। শব্দ টব্দ না করলে এ যাত্রা বোধহয় বেঁচে যেতে পারে। চার ফুটের দুটো সাউণ্ড বক্সের পেছনে লুকিয়ে আছে ও। জায়গাটা ওরা একবার চেক করে গেছে। তখন অবশ্য সোহানা এখানে ছিল না। সোহানা ছিল কলপাড়ের বাঁধানো জায়গাটার দিকে। বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি নলকূপ ঘেরা জায়গাটায় ভাগ্যক্রমে একটা বেড়া ভাঙা ছিল। সেই বেড়ার ওপাশে একচিলতে পা রাখার মতো জায়গা, তারপর ঢালু হয়ে যাওয়া খাদ। ভাঙা বেড়া দিয়ে আড়াল হয়ে ওইটুকু একচিলতে জায়গায় প্রাণটুকু বাঁচায় ও। লোকগুলো যখন বাঁধানো জায়গাটায় নজর বোলাল, তখন কাউকে দেখতে পায়নি তারা। তবে সোহানা জানে নাযীফ ওকে ফেলে যায়নি। ও নিশ্চয়ই আশেপাশে আছে। এমন সময় লোকগুলো হন্যে হয়ে আরেকদিকে দৌড় দিলে সাবধানে তাকাল সোহানা। অবস্থা সুনশান দেখে তাড়াতাড়ি একছুট দিয়ে বাঁদিকের কুটিরগুলোতে পৌঁছে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে হাতের উল্টোপিঠে ঘর্মাক্ত কপাল মুছল। ঘরে ঢুকল সে। অন্ধকারে কিছুই দেখতে না পেয়ে ডাকল ছাড়ল সোহানা। মৃদু, হালকা, অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল,
- না..নাযীফ? নাযীফ, তুমি কোথায়?
ভয়ে দুরু দুরু করে বুক কাঁপছে। চোখে আতঙ্কের ছাপ লেগে অসহায় দেখাচ্ছে। আরো এক কদম এগোতে গিয়ে হঠাৎ খসমস শব্দ পেল ও! সঙ্গে সঙ্গে সটান দাঁড়িয়ে স্তব্ধ বনে গেল। কে যেন পেছনে দাঁড়িয়ে আছে! ধুপ . . ধুপ করে সিঁড়ি ভেঙে উঠছে। প্রবল ভয়ে সমস্ত শরীর হিম হয়ে গেলে ঢোক গিলে পিছু ফিরল সে। মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখার মতো আতঁকে উঠতে যেয়ে তৎক্ষণাৎ ফুপিয়ে উঠল সোহানা! নীচের ঠোঁট কাঁপাতে কাঁপাতে বলে উঠল সে,
- শ. . শোয়েব স্যার! ওরা.. রাতে. . আমরা . . গ্রিল পার্টি. .
পেনসিল টর্চটা বন্ধ করে এগিয়ে এল শোয়েব। মাথায় আশ্বস্তের হাত রেখে হালকা ভাবে বলল,
- বাকি ছ'জন কোথায়? তুমি ঠিক আছ সোহানা? এসো। বেরিয়ে এসো। শব্দ কোরো না।
চোখের পানি হাতের উল্টোপিঠে মুছে নীচে নামল সোহানা। গলায় কান্নার ডলাটা আঁটকে এলেও সামলে নিল সে। শোয়েব বুঝতে পারছে না এরা এমন বিচ্ছিন্ন কেন। আলাদা হয়ে কেন একেকজন একেকদিকে ছড়িয়ে গেছে। একটা মোক্ষম জায়গা পেয়ে সেখানে কাভার নিয়ে ওকে বসতে বলল। একে একে জিজ্ঞেস করল সবাই আলাদা কেন, বাকিরা কোথায়, ওরা একসঙ্গে কী করছিল। সোহানা স্ববিস্তারে আস্তে আস্তে সবকিছু বলে চলল। যতক্ষণ ফিসফিস করে বলছিল, ততক্ষণ শোয়েব সমস্তই শুনতে শুনতে অন্যত্র সতর্কও থেকেছে।
- আমরা সবাই যার যার মতো ঘরে ছিলাম স্যার। সন্ধ্যার একটু পর রোজা বলল সুইমিং পুলের ওদিকটায় বেস্ট হয়। ওখানে গ্রিল বসিয়ে খাওয়া দাওয়া করলে মন্দ হয় না। জাস্ট ফিশ, চিকেন আর বিফ স্টেক। সব আয়োজন নিয়ে ছেলেরা তখন ভালোই ব্যস্ত। ওরাই মিলেমিশে কাঠ, কয়লা, মশলা এসব বুঝে বুঝে আনছে। আমরা মেয়েরা স্পটে বসে সবকিছু গোছগাছ করে দিচ্ছি। রেসোর্টের ম্যানেজার হঠাৎ এসে জানালো, আজ নাকি কারেন্ট থাকবে না। আটটা কী নয়টার পর কারেন্ট চলে যাবে। কোথায় নাকি কী যেন শর্ট সার্কিট দেখা দিয়েছে, তা নিয়ে কাজ চলবে। আমরা কিছুক্ষণ হম্বিতম্বি করলেও ব্যাকআপ হিসেবে হারিকেন, মোমবাতি এসব তখন জোগাড় করে নিই। আমাদের রান্নাও সবে শুরু। আপনি তো জানেন, আমাদের দলের একজন হসপিটালাইজড ছিল। অসুস্থতার কারণে। ওর নাম জানা। জানা এসব কয়লার ধোঁয়া সহ্য করতে পারে না। ওর কাছে দম বন্ধ লাগে। জানা যখন কুটিরে যেতে চাইল, তখন ওকে রেখে আসার জন্য নাযীফ উঠে। নাযীফ তখন আমাকেও বলে সঙ্গে আসতে। একা একা ফিরে আসতে ওর ভালো লাগবে না। তখন আমিও ওদের সঙ্গে যাই। রেসোর্টটা অনেক বড় আর বিশাল। আমরা চাচ্ছিলাম না কোনো বাজে ইনসিডেন্ট হোক। মানে জানেন তো স্যার, রেসোর্টের লোকগুলো অনেকসময় বদ, বদমাশ হয়ে থাকে। এই ভয়ে আমি আর নাযীফ জানার সঙ্গে যাচ্ছিলাম। আমরা চাচ্ছিলাম না একা একা পাঠিয়ে কোনো স্টাফ দ্বারা আক্রান্ত হোক। ওকে কুটিরে পৌঁছে দিয়ে আমি আর নাযীফ একত্রে ফিরি। হঠাৎ তখন মনে পড়ে, সয়া সসের বোতলটা আনা হয়নি। সেলিম ওটা আনতে বলেছিল। বেমালুম ভুলে যাওয়ায় নাযীফ নিজেই আনার কথা বলে। আমাকে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে ও সস আনতে চলে যায়। এরপরই মেইন গেট দিয়ে গোলাগুলি শুরু! আমি কিছু বুঝতে না পেরে দৌড়ে পালাই। এরপর কে কোথায় চলে গেছে, কোথায় আছে, তারপর কিছু জানি না স্যার। এটাও জানি না, ওরা কী আমাকে একা ফেলে গেছে কিনা।
সব শোনার পর সোহানার দিকে তাকাল শোয়েব। মেয়েটা বড্ড ভয় পেয়েছে। মাথার উপর হঠাৎ বাজ পরার মতো ঘটনাটা ঘটেছে। যারা কোনোদিন কখনো বিপদে পরেনি, তারা আঁচও করতে পারবে না এর অনুভূতি কতটা ভয়ানক। শোয়েব ওকে নির্ভার করার জন্য নিজস্ব অনুমানটা জানিয়ে দিল,
- তোমার বন্ধুদল কেউ পালায়নি। সবাই এখানেই আছে সোহানা। হয়তো কেউ কাছে লুকিয়েছে, কেউ হয়তো দূরে। পালিয়ে যে যায়নি এটা শুনে ঠাণ্ডা হও। তোমার আরেক বন্ধু, যে তখন কুটিরে ফিরছিল, তার কুটিরটা কতদূর? এই বাগান থেকে কোনদিকে?
কূর্তির একপ্রান্ত তুলে চোখ মুছছিল সোহানা। এখন বসে আছে ঘাসের উপর, বাগানের মধ্যে। চোখদুটো মুছতে মুছতে আশেপাশে দেখে নিয়ে বলল,
- এখান থেকে ভালোই দূর। ও সবার থেকে দূরের কুটিরটা বেছে নিয়েছে। আমরা চারজন কাছাকাছি ছিলাম। দুজন ছিল মাঝের দিকে। আর জানা ছিল সবার দূরেরটায়। ওই যে,
সোহানা ডানহাত তুলে তর্জনী উঁচু করে দেখাল,
- ওই রাস্তাটা দিয়ে এগোলে আপনি কুটিরে পৌঁছুতে পারবেন। শুনেছি ওই কুটির থেকে দূরের পাহাড়গুলো আবছা আবছা দেখা যায়। মূলত পাহাড়ের লোভেই ও কুটিরটা পছন্দ করেছে। এখন ওই রাস্তা দিয়ে . . .
বলতে বলতে সোহানা হঠাৎ কেন যেন আঁটকে গেল। কথাগুলো আর বলতে পারল না। শোয়েবের ওই স্থির চাহনির দিকে চেয়ে সোহানাও সেদিকে লক্ষ করে তাকাল। এরপরই ভয়ে ' ও খোদা ' বলে আতঁকে উঠল সে। কালো মুখোশ পরা একটা লোক সরাসরি বন্দুক উঁচিয়ে আছে। বন্দুকের নল শোয়েবের বুকে তাক করা। ট্রিগারে আঙুল!
—————
কান ফাটানো শব্দে চারধার গমগম করে উঠল! ওই শব্দের জোর এতোই বেশি ছিল যে, গাছের পাখিরাও যেন উড়াল দিয়েছে। ভীত হয়ে দিগ্বিদিক দিশাহারার মতো পালাচ্ছে। বুলেটের আওয়াজ যেন একের পর এক গর্জন করে উঠছে। মুহুর্তের ভেতর রাতের অন্ধকার যেন এক অনামা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। জোৎস্নার আলো মিইয়ে গেছে। চর্তুদিকে নিশ্চিদ্র আঁধার। সেই আঁধারকে সঙ্গী করে উদভ্রান্তের ছুটে পালাচ্ছে সেলিমরা। পায়ে পায়ে প্রচণ্ড শব্দে মুখর হয়েছে রেসোর্ট। অন্যদিকে রাফানরা ঢুকে পরেছে কুটিরে। একের পর এক কুটিরে চালিয়ে যাচ্ছে অভিযান। যে বা যারা কালো মুখোশ পরে দুর্বৃত্তের মতো ঢুকেছিল, তারাও যেন অতর্কিত ঘটনায় স্তব্ধ! বুঝতেই পারছে না আইন শৃঙ্খলা বাহিনি কীভাবে খবরটা পেল! সবার শেষে যে কুটিরগুলোর অবস্থান ছিল, সেদিকে দৌড় লাগিয়েছে সেলিমরা। হঠাৎ মাঝপথে গতি থামিয়ে বাঁদিকে চাইল। রোজা হাঁপাতে হাঁপাতে ঘর্মাক্ত মুখে বলল,
- এটাই নাযীফের! নাযীফের কুটির!
কথাটা ওদের দিকে বলেই চেঁচাতে লাগল রোজা। জোরে জোরে নাযীফকে গলা ফাটিয়ে ডাকল,
- নাযীফ, নাযীফ তুমি শুনতে পাচ্ছ? নাযীফ এক্ষুণি বেরোও, জলদি করো! আমরা তোমাকে নিতে এসেছি।
শ্রেষ্ঠা ততক্ষণে দৌড়ে উঠে গেছে। ধপ ধপ করে সিঁড়ি ভেঙে উঠতেই পেছন থেকে জিদানও ছুট দিয়েছে। কী ভেবে সেলিমও দাঁড়াল না। নাযীফের কুটির বরাবর দৌড় লাগাল সে। একা একা রোজা কী করবে ভেবে না পেয়ে নিজেও ছুটে গেল। শ্রেষ্ঠা ভেতরে ঢুকে দেখল, নাযীফ মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে বসে আছে। ওর পাশে অজ্ঞাত এক লোক! বোধহয় লোকটা খোঁজ পেয়ে ঠিকই এ ঘরে এসেছিল, কিন্তু মোক্ষম সময়ে লোকটাকে আহত করে নাযীফ। কিন্তু এর বিপরীতে মাথায়ও প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে বসে। লোকটা নিজে আহত হবার আগে নাযীফকেও রক্তাক্ত করে গেছে। শ্রেষ্ঠা ছুটে এসে নাযীফের মাথাটা তুলে ধরল। গলায় মাফলারের মতো প্যাঁচানো ওড়নাটা খুলে ওর মাথায় বেঁধে বলল,
- চল বন্ধু। কিছু হয়নি। সামান্য আঘাত পেয়েছিস। ছোটবেলায় এসব ছোটখাট আঘাত পেয়েছিস নাযীফ। উঠে পড়।
লোকটাকে ঠেকাতে গিয়ে শরীরে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে নাযীফ। মূলত ফোনটা করার মাঝেই ধরাটা খেয়েছে সে। জোরে জোরে কথা বলতে গিয়ে বাইরে থেকে একজনকে বুঝিয়ে ফেলে। সেই অজ্ঞাত হামলাকারী ঘরে ঢোকে ঠিকই, কিন্তু একজন হয়ে ঢোকে। দলবল বা সঙ্গী-সাথী না থাকায় তেমন ভয়াবহ কিছু ঘটেনি। নাযীফ উঠে দাঁড়ালে জিদান আর সেলিম এসে ধরল। ডানহাতটা তুলে নিল সেলিম, বাঁহাত বুঝে নিল জিদান। দুদিক থেকে দুজন ধরে ওকে ঝটপট ঘর থেকে বের করে আনল। এমন সময় শ্রেষ্ঠা আবারও ছুটে যেতে নিতে হাতটা খামচে ধরল কেউ। শ্রেষ্ঠা মুখ ঘুরিয়ে পিছু চাইলে রোজাকে দেখতে পেল। রোজা মাথাটা ডানে বামে নাড়িয়ে 'না' ভঙ্গিতে ইশারা করছে। দলের বাকিরা তখন রোজার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রেষ্ঠা যেন অন্ধকারে ডুবল। ওরা কী আরেকজনকে বাঁচাতে চাইছে না? শেষ কুটিরে যে মানুষটা বন্দি আছে, তাকে উদ্ধার করবে না? এ কেমন নিষ্ঠুরতা? কেমন স্বার্থপর ভঙ্গি? শ্রেষ্ঠা হাত ঝাড়া দিয়ে ছাড়াতে চাইলে রোজা কঠিন গলায় বলল,
- ওকে ওর মতো ছাড়। যে আমাদর সঙ্গ ছেড়ে একাই থাকতে ভালোবাসে, তাকে আমরা টেনেটুনে নিয়ে আসব কেন? নিজের ইচ্ছে হলে নিজেই উদ্ধার হয়ে যাবে। নিজের ইচ্ছে না হলে না।
শ্রেষ্ঠা অবাক হয়ে ভাষাই যেন হারিয়ে ফেলে। বাকরুদ্ধ কণ্ঠে কিছুই বলতে পারে না। গলায় কাঁটা বিঁধার মতো অসহায়ত্ব নিয়ে বলল,
- আমি বিশ্বাস করতে পারছি না . . . আমি বিশ্বাস করতে পারছি না তোদের আচরণ এতো নিকৃষ্ট! বিপদের দিনে এইভাবে তোরা মানুষকে ঠেলে দিবি!
চূড়ান্ত সীমার আশ্চর্য নিয়ে ঢোকটা গিলে ও। এই মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে মানুষের চেহারা যেন দেখতে পেল। যে চেহারা মানুষের মতোই, কিন্তু আসলে মানুষ নয়। রাগে, ক্ষোভে, প্রচণ্ড আক্রোশে হাতটা ঝাড়া দেয় শ্রেষ্ঠা। ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে। এমন সময় পেছন থেকে শাওলিন ডেকে উঠল,
- দাঁড়াও শ্রেষ্ঠা,
মাথা ঘুরিয়ে পিছু তাকায় শ্রেষ্ঠা। শেষ মাথার ওই কুটির থেকে মুখটা দেখা যাচ্ছে ওর। হালকা গোলাপি রঙের জামা। সাদা ধবধবে পাজামা। ডানকাঁধ ছুঁয়ে ওর সাদা ওড়নাটা ঝুলছে। শাওলিন কী বুঝতে পেরেছে ওরা ওকে ছেড়ে যাচ্ছে? ও কী অতোদূর থেকে আঁচ করেছে, ওকে নেওয়া হচ্ছে না? সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসছে শাওলিন। ওকে ছুটে আসতে দেখে পেছন থেকে রোজা বলে উঠল,
- আমি বলেছিলাম, নিজের ইচ্ছে হলে নিজেই উদ্ধার হয়ে যাবে। এখন ও নিজেই এসে পরেছে। আর দাঁড়িয়ে থাকিস না, চল!
তাগাদা দিয়ে সবাই দৌড় লাগাল। শ্রেষ্ঠার ডান কবজিটা খামচে ধরে দৌড় দিল রোজা। বারুদের গন্ধ মিলেমিশে বাতাস ভারি হয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না। ধোঁয়ায় ঢেকে পরেছে চারপাশ। সেই ধোঁয়ার মাঝ দিয়ে বেদম ছুটতে ছুটতে আচমকা একঝলক পিছু ফিরল শ্রেষ্ঠা। যে দৃশ্যটা দেখতে পেল, তাতে শিরদাঁড়া বরাবর কেঁপে উঠল ওর! চিৎকার করে কিছু বলে ওঠার পূর্বেই রাফানদের হাত ওদের টান দিয়ে ফেলল!
Page 2
শ্রেষ্ঠার গলা যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে! চিৎকারটা গলা দিয়ে ফুটল না! শেষ দৃশ্যটা দেখার পর থমকে গেছে শ্রেষ্ঠা। রাফানের মুষ্টিবদ্ধ হাত ওর কবজির ওপর কড়াভাবে বসেছে। এক ঝটকায় টান দিয়ে জায়গা থেকে সরিয়ে ফেলেছে সে। শ্রেষ্ঠা নির্বাক, স্তব্ধ, পুরোপুরি হতভম্ব! ঢোক গিলে আতঙ্কিত মুখে সামনে সবকিছু দেখতে পাচ্ছিল। দেখতে পেল ওর বন্ধুরা সবাই রেস্কিউ টিমের দ্বারা নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে। চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে একদল সশস্ত্র বাহিনী। রাতের আঁধার মিলেমিশে কালো ধোঁয়ায় নিমজ্জিত। চোখে কিচ্ছুটি দেখা যাচ্ছে না। বারুদের বিষাক্ত পোড়া গন্ধে চারপাশটা দমবন্ধকর! শ্রেষ্ঠা আর কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই রাফান ওকে টান মেরে রেসোর্টটা থেকে বের হল। ডানহাতে শ্রেষ্ঠার কবজিটা তখনো খামচে ধরে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে বলল,
- তুমি পেছন ফিরে চ্যাঁচাচ্ছিলে কেন? কী দেখে পিছিয়ে যাচ্ছিলে? তোমার সব বন্ধু নাগালের ভেতর পৌঁছে যাচ্ছে, আর তুমি চিৎকার দিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলে? মাথা কী নষ্ট হয়ে গেছে?
শ্রেষ্ঠা যেন অনুভূতিহীন রোবটের মতো হয়ে গেছে। মুখে কোনো রা নেই, সাড়া নেই, প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত শূন্য। শূন্য চোখে সমস্ত ঘটনা বোঝার জন্য চেষ্টা করছিল। পাদুটো দৌড়ের জন্য ছুটছে ঠিকই, কিন্তু তাতে ওর হুঁশটুকুও নেই। বারবার মনে হচ্ছিল কী হলো? কী হলো ওটা? শেষ মুহুর্তে কী হল ওর সাথে? বুকটা আবারও মোচড়ে উঠল শ্রেষ্ঠার। রাফানের মুঠোর ভেতর কেঁপে উঠল ওর হাত। রাফান যেন সহসা বুঝতে পেরে দৌড়তে দৌড়তে একপলক পিছু ফিরল। ঠিক তখনই শ্রেষ্ঠা দুচোখের পানি ছেড়ে কাঁপা গলায় বলল,
- আমার এক ছোটবোন আঁটকা পরে গেছে। ওকে কেউ নিয়ে আসেনি। ওকে উদ্ধার করুন রাফান সাহেব! ওকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছে . . ওকে উদ্ধার করুন!
আচমকা পাদুটো থামিয়ে দাঁড়িয়ে পরল রাফান। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠা শ্রেষ্ঠার দিকে চেয়ে রইল সে। এতোটা আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে আছে যে, প্রথম ক'মিনিট কিছুই বলতে পারল না। শুধু টের পেল পেছনে একটি মেয়েকে এরা ফেলে এসেছে, যার কপালে ঝুলছে নির্মমতার ঘোর আঁধার!
—————
টপ টপ করে চোখের পাপড়ি চুয়ে পানি নামছে। মাথার পেছনে অসহন যন্ত্রণা। চুলের প্রতিটি গোড়ায় গোড়ায় দুর্বোধ্য ব্যথা চোখের অশ্রু নিংড়ে আনছে, তবু দুঠোঁট খুলে আর্তস্বরে কোঁকাচ্ছে না। তুলোর মতো নরম কবোষ্ণ ঠোঁটের উপর সর্বোচ্চ শক্তিতে দাঁত চেপে রেখেছে ও। উপরপাটির দাঁতের দংশনে ঠোঁটের শুষ্কতা চিড়ে নোনারক্ত জিভে লাগছে, তবু লোকগুলোর সামনে নতমুখ করল না। কালো কুচকুচে রোমশ হাতটা ওই নরম গাল বরাবর সর্বোচ্চ শক্তিতে ঠাস করে আঘাত করল। এক মুহুর্তের জন্য মনে হল মাথার ভেতরটা ঝিঁ ঝিঁ করে উঠেছে। সবকিছু বোধহয় অসাড়, নিষ্প্রাণ। বন্ধ দুচোখের কোল ঘেঁষে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে অশ্রুশিশির, পরছে মেঝেতে গোল গোল বিন্দু হয়ে। দুটো ফর্সা উজ্জ্বল গাল রক্তবর্ণে ফোলা। নরম ত্বকের উপর পাঁচটি আঙুলের ছাপ লালবর্ণে ফুলে ওঠেছে। একমুঠো চুল পেছন থেকে খামচে ধরায় মাথাটা সেই তখন থেকে পেছনে হেলানো। এই যন্ত্রণাটা আর সহ্য করতে পারছে না শাওলিন। শুধু বারবার মনে হচ্ছে আজ পর্যন্ত ওর গায়ে হাত তুলেনি মণি। একটা বাজে ভাষায় কথা অবধি বলেনি। ওর মনেও পড়ে না জীবনে এমন কোনো ভুল করেছে কিনা, যার দরুন আজ এতোটা কষ্ট তাকে পেতে হচ্ছে। চোখ খুলে বহুক্ষণ পর চারপাশটা দেখতে পেল শাওলিন। আধো আঁধার, আধো আলোতে বুঝতে পারল ও কুটিরে বন্দি। লোকগুলো কড়া পাহারায় রেখে বাইরে অপেক্ষা করছে। বোধহয় অপেক্ষা করছে কখন নিরাপত্তা বাহিনীকে ধূলো মেরে এখান থেকে চম্পট দেবে। মুখে নিকাবের মতো গামছা প্যাঁচানো এক লোক ঘরের ডানদিকের মেঝেতে বসে আছে। তার গা সংলগ্ন এলএমজি রাইফেল রাখা। মুখের গামছাটা সামান্য ঢিল করে চ্যাপ্টা একটা কাঁচের বোতল খুলতে খুলতে বলল,
- আর কতক্ষণ এইভাবে বইসা থাকা লাগব? আর তো ভাল্লাগতাছে না। তাড়াতাড়ি এই কেচ্ছা ফিনিশ দিয়া এই ছেড়িরে লইয়া চোপাট দেওন দরকার।
মাথার পেছনে চুল খামচে ধরা লোকটা ফোঁস করে উঠল। গভীর শ্বাস ফেলে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
- সবুর কর। অতো উতলা হইলে চলব ক্যান? এমনেই আর্মি ডাইকা পুরা প্ল্যানডা ভেস্তে ফালায়া দিছে, আর এহন যদি রাস্তা দেইখা না বাইর হই, তাইলে বিরাট ঘাপলা বাঁধব। জুত কইরা বই থাক। কতা কইস না।
কাঁচের বোতলটা দুঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরল সে। মুখের গামছাটা এবার পুরোপুরি সরিয়ে নিয়েছে। তৃপ্তির একটা ঢেঁকুর তুলে গলা ভিজিয়ে বলল,
- আমার মনডায় কয় এই দলটার মইধ্যে বিরাট ঘাপলা আছে। নাইলে সাধারণ একটা জিনিসের পিছে ওস্তাদ ওমনে পরব ক্যা? আমার ক্যান জানি বিরাট সন্দেহ লাগতাছে ভাই। ছোডো মোডো জিনিসের পিছে এমনে কুত্তা পিডা করতো না। তয় এই ছেড়িরে দেইখা আমার পল্টিগিরি মনে হয় নাই। এহনো কমু ছেড়ির হাত দুইটা খুইলা দেন। একটু জুত কইরা এই ছেড়িও বহুক। চাইলে কিন্তু এই ছেড়ি চিল্লায়া বাড়িঘর মাথায় তুলতে পারতো। ওইডা আরো পেরেশানির কারবার। মাগার এই ছেড়ি এক্কেরে ঠাণ্ডা মাইরা পইরা আছে। যেই কয়ডা থাবড়া খাইছে, জুততে সব গিলছে। মিঁউ মিঁউ শুদ্ধা করে নাই।
কথাগুলো শুনে কেন যেন হাতের মুঠিটা ধীরে ধীরে শিথিল করল। দ্বিতীয় লোকটা বোধহয় বুঝতে পেরেছে এই মেয়ে আর করুক, চিৎকার করে হল্লা হইচই বাঁধাবে না। শান্ত চুপচাপ এককোণে পরে থাকবে। বরং কিছুক্ষণের জন্য ছেড়ে দেওয়াই হয়তো ভালো। চুলটা ছেড়ে দিতেই চালের বস্তার উপর মেয়েটাকে আছড়ে ফেলল। তাতেও কোনোপ্রকার 'উহঃ' শব্দটুকুও বেরুল না। দ্বিতীয় লোকটা মনের সুখে একটা সিগারেট ধরিয়ে গভীর এক টান দিয়ে বলল,
- কতা অবশ্য ভুল কস নাই। ছেড়ি এইডা আসলেই চুপচাপ আছিল। দশ মিনিটের এইডারে ছাইড়া দিলাম। একটু আরামে থাউক। ওস্তাদ আইলে আবার হেসালা মুঠঠি খামচায়া ধরুমনে। তয় একটা ব্যাপার আমি বুঝবার পারতাছি না। ওই বন কর্মকর্তার ব্যাডাটায় এইহানে ক্যামনে? কেডায় হেরে খবরটা দিছে? এই দলের লগে কী উনার ভালা সম্পর্ক?
প্রথমজন আরেক ঢোক তেঁতো পানিটা ঢিলে চোখমুখ কুঁচকে ফেলল। এখনো দেশি জিনিসে জিভ অভ্যস্ত হয়নি। তাই কোঁচকানো চোখ মেলে দ্বিতীয়জনের দিকে বলে উঠল,
- আপনে মনে হয় এই লাইনে নতুন। নাইলে এই কতাডা কইতে পারতেন না। আমরা যারা খুঁজ খবর লইয়া এইহানে আইছি, তারা এইডা ভালা কইরাই জানি ওই ব্যাডার লগে এই দলের কুনো সম্পর্ক নাই। সম্পর্ক যে ক্যামনে হইছে খোদা তায়ালা জানে। তয় হাছা কইলে একটা কতা কমু। উনার নাম মনে হয় শোয়েব। পুরা নাম শোয়েব ফারশাদ। এই এলাকার প্রত্যেকটা নামীদামী লোক হেরে এক নামে চিনে। উনি এই এলাকায় জয়েন করার পর আগের যেই অফিসারডায় আছিল, পুরা মাঞ্জা মাইরা গেছে। এহন বিলে ডরে ডরে থাহে। কেউ এই নয়া অফিসাররে ঘাঁটানের সাহস দেহায় না।
কথাটার ভেতর নতুনত্বের গন্ধ পেয়ে কেমন যেন কৌতুহলী হলো। চোখদুটো প্রশ্নের ছাপে চকচক করে উঠলে দ্বিতীয়জন আস্তে করে মেঝেতে বসে বলল,
- আমি লাইনে নতুন এইডা সইত্য। তয় বনের মইধ্যে এমন কড়া শাষণ কইত্থিকা আইলো? আমি কইলাম আসলেও আচ্চায্য হইছি। ওস্তাদে সাজায়া গুছায়া পুরা চার-ছক্কা প্ল্যান বানাইছে, হেইনে দ্যাখতাছি কোনকার কোন বাহিনী আইয়া উদ্ধার কইরা লাইতাছে। যা বুঝলাম, ঢাকা আর চট্টগ্রাম এক না।
- ঢাকায় সবকিছু চক্ষে চক্ষে থাহে, চট্টগ্রাম থাহে ভাসা ভাসা। দুই বিভাগের মইধ্যে যেই ডিসটেন্স, হেইডা দিয়াই সবডা বুইজা যাওনের কতা। দেশের পরিস্থিতি এহন যেইদিহি আগ্গাইতাছে, হেইডা কইলাম সুবিধার না। এইলিগাই ওস্তাদ ওমনে উইঠা পইরা লাগছে। তাত্তাড়ি সবকিছু গুছায়া আনতাছে। কহন কী ঘইট্টা যায় কওন যায় না।
কথার ভেতর এখনো যেন একটা সুক্ষ্ম ফাঁক রয়ে গেছে। যে ফাঁক সাদা চোখে ধরা যায় না। সিগারেট দু টান দিয়ে ভুরভুর করে ধোঁয়া ছেড়ে কপালটা খানিক কোঁচকাল সে। একটু ভেবে পুনরায় প্রশ্ন করে উঠল,
- ওস্তাদ কী কোনোভাবে এই অফিসাররে ডরায়? এই কারণেই কী উনার মুখোমুখি পরতে চাইতাছে না?
প্রথমজন একপলক স্থির দৃষ্টিতে তাকায়। ঠোঁটের উপর স্যাভনলের বোতলের মতো তেমনই একটা কাঁচের বোতল চেপে ধরে। ঢকঢক করে দুঢোক বিশ্রী পানীয়টা গিলে কিছুটা নীচু, কিন্তু গম্ভীর গলায় বলে,
- ওই অফিসারের সামনে পরন ঠিক না মোছলেম। বিপদ হয়। এর আগের অফিসারডা সাক্ষাৎ জল্লাদ আছিল, অথচ হের মতো জল্লাদ এনার নাম হুনলেই দশ হাত পিছায়। ওস্তাদ কোন কারণে ডরায় এইটা নির্দিষ্ট কইরা জানোন যায় নাই। কিন্তু মনে হয় বহুত ডরায়। আজকা রাইতে কী ঘটব খোদাই জানে। এই ছেড়িরে আঁটকায়া রাখছে হুনলে ঘটনা ভালা কিছু ঘটব না।
আচমকা ওই কথার মাঝে কেমন যেন গা শিরশিরে অনুভূতি সঞ্চার করল। দ্বিতীয়জন জানে না অমন অদ্ভুত কথার মানেটা কী। সে এই লাইনে ভালোই নতুন। আগে টুকটাক রংপুরের দিকে হাত টান করেছে, কিন্তু এই প্রথম ভিন জায়গায় এসে ভিন্ন কাজে ঢোকা। হাতের সিগারেটটা শেষ হয়েছে দেখে উঠে দাঁড়াল মোছলেম। জিভে নিকোটিনের পিপাসা জেগেছে। বাইরে কারো কাছ থেকে এক্সট্রা এক প্যাকেট আনার জন্য পা বাড়াল মোছলেম। দরজার চৌকাঠে পা থামিয়ে মুখ ঘুরিয়ে শামীমের দিকে বলল,
- আমি বাইরে আছি। প্যাকেট শ্যাষ। প্যাকেট লইয়া আসি।
শূন্য বোতলটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে উত্তর করল শামীম,
- ওই জলদি করিস। তুই আইলে আমি বাথরুমে যামু। চাপ আইছে!
বাইরে যেতে যেতে সিঁড়ি থেকে জবাবটা ছুঁড়ে দিল সে,
- আইচ্ছা ঠিকাছে! আইতাছি আমি!
বোবা আঁধারে ছেয়ে আছে ঘর। চারিদিকে অখণ্ড নৈঃশব্দ্য। রেসোর্টের একেবারে শেষ সীমানায় গা ঢাকা দিতে আশ্রয় নিয়েছে ওরা। বাকিরা এখনো নিজ নিজ জায়গায় রাইফেল বাগাচ্ছে। কেউ জানে এই রাত্রি প্রহরে নিরাপত্তা বাহিনী কী করে খবর পেয়েছে! কীভাবে জেনেছে তাদের এখানে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর কথা! মেয়েটাকে পালাতে গিয়ে একেবারে শেষ মুহুর্তে ধরে ফেলেছে মোছলেম। এরপরই ধরে বেঁধে এই কুটির এনে রেখে দেওয়া। কিন্তু প্রথম দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে ভালোই নির্যাতন চালিয়েছে ওস্তাদ। কিন্তু পরক্ষণে পালানোর রাস্তা সাফ সুতরো করতে তিনি নিজেই দলেবলে যোগ দিয়ে ছুটে গিয়েছেন। কানে খবর এসেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর যে দল সেই দলে স্রেফ ছয় জন সদস্য। এখনো পুরো একটা ব্যাটালিয়ন এখানে পৌঁছুয়নি। তবে খবর পেয়ে আসতে আসতে যতক্ষণ! তিঁতকুটে পানিটা গেলার পর তলপেটে প্রচণ্ড চাপ শুরু হয়েছে। বাথরুমের দর্শনটা করে আসা জরুরি, কিন্তু খালি ঘরে মেয়েটাকে রেখে যাওয়ার ভুল করবে না। লাল পানির জোরেই বোধহয় চোখদুটো ঢুলে ঢুলে আসছিল শামীমের। মেঝেতে বসে পিঠ ও মাথা দেয়ালে হেলান দিয়ে তন্দ্রা মতো ডুবে গিয়েছিল। হঠাৎ চড় চড় করে তীক্ষ্ম কিছুর শব্দে জেগে উঠল সে! মনে হলো এখানে কেউ আছে! কাছেপিঠে কে যেন রয়েছে! দ্রুত বসা থেকে দাঁড়িয়ে যেতেই ঘরের চর্তুদিকে অস্থিরভাবে দৃষ্টি বুলাতে লাগল! একটু দূরে খোলা জানালা, বাঁদিকে চালের বস্তা, সেই বস্তার উপর মাথা রেখে মেয়েটা পরে আছে। না, কিছু তো নেই। তাহলে ওটা কীসের শব্দ হলো? শামীম আধ ভেজানো দরজা থেকে সবে দৃষ্টি ফেরাতে নিচ্ছিল, হঠাৎ চোখের কোণে কীসের একটা নড়াচড়া টের পায়। চোখটা সেদিকে ফেরাতেই শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা কনকনে হিম স্রোত বয়ে গেল! চোখদুটো চরম আশ্চর্যে বিহ্বল! নিঃশ্বাস যেন নিতে পারল না! আগাগোড়া কালো হুডিতে ঢাকা। চাঁদের উল্টোদিকে থাকায় চেহারা স্পষ্ট না। অস্পষ্ট আলোতেও বুঝতে পারছে লোকটার ভয়ানক দৃষ্টি তার দিকে বিদ্ধ। বোধহয় তক্কে তক্কে অনুভব করছে সুযোগটুকু। লোকটার ডান মুঠোতে ধারালো রামদা। চাঁদের আলো লেগে ভীষণ চকচক করে জ্বলছে। লোকটা জানালার বাইরে থেকে ভীষণ গাম্ভীর্যের গলায় আজ্ঞা ছুঁড়ল,
- কথা বোলো না। চুপ!
শামীম ঢোক গিলে বিস্ফোরিত নেত্রে তাকিয়ে রইল। মুখে আপনা থেকেই বোল ফুটল না। নিঃশব্দ পায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল সে। কেমন যেন অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে চালের বস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। শামীম চাইলে ওই কিয়ৎক্ষণের ভেতর জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধাতে পারতো। কিন্তু কেন যেন সাহসে কুলাল না। লোকটা এক কদম এগিয়ে ঠোঁটের উপর বোধহয় তর্জনী রেখে বলল,
- চুপ। সামান্য শব্দ করলে তোমার গলা থেকে শ্বাসনালী কেটে দিব। মৃদু একটা শব্দ হবে, এর বাইরে কোনো শব্দ হবে না। বুঝতে পারছ?
ভয়ে, আতঙ্কে, তুমুল শঙ্কায় থরথর করে কাঁপছে শামীম। গলা দিয়ে আওয়াজ বের করতে চাইছিল, কিন্তু শেষমুহুর্তে ওই কথা শুনে সামান্যতম দুঃসাহস দেখাল না। লোকটা অন্ধকারে মিলেমিশে জান্তব অবয়ব ফুটিয়ে বজ্র-কঠোর স্বরে বলে উঠল,
- মেয়েটাকে কী করেছ? মেরে ফেলেছ তোমরা!
আঁতকে ওঠতে গিয়ে কেঁপে উঠল শামীম। জলদি জলদি দুহাত করজোড় করে আতঙ্কিত সুরে বলল,
- না না, বেঁচে আছে তো, মেয়েটা বেঁচে আছে। আপনি ডাকেন, ও উঠবে। ওস্তাদ শুধু সামান্য কয়টা চড় মেরেছে . . উনি আর কিছু করেনি।
আতঙ্কিত শামীমের দিকে চেয়ে মেঝেতে ঝুঁকে বসলো লোকটা। যেমন বুক কাঁপানো স্বরে শামীমকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তার চেয়ে কয়েক স্কেল নীচুতে কণ্ঠ নামিয়ে ডাকল,
- শুনতে পাচ্ছেন? মিস শুনতে পেলে চোখ খুলুন। চোখ খোলার চেষ্টা করুন! তাকান আপনি!
সারামুখ এলোচুলে ঢেকে আছে মেয়েটার। শামীম দেখল, লোকটা একটু একটু করে মেয়েটার মুখ থেকে সবকটা চুল সরিয়ে দিল। হালকা করে গালটা ধরে কী যেন অপলক দৃষ্টিতে দেখল। বোধহয় গালের ওই ফুলে ওঠা করুণ দুর্দশা লোকটার চোখ এড়ায়নি। কিন্তু শামীম কল্পনাও করতে পারেনি ওইটুকু দৃশ্য দেখে কী তাণ্ডব চালাবে এই লোক! হঠাৎই লোকটা বসা থেকে দাঁড়িয়ে শামীমের খুব কাছে চলে এল। সম্পূর্ণ অন্য মেজাজী সত্তায় একদম হালকা কণ্ঠে শুধাল,
- কবার গালটায় আঘাত করা হয়েছে?
প্রশ্নকর্তার ঠাণ্ডা সুরে শামীম কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। বোকা বোকা দৃষ্টিতে একবার মেয়েটার দিকে তাকাল, পরক্ষণে দৃষ্টি ফিরিয়ে চাইল লোকটার দিকে। কী যেন একটা বুঝতে গিয়েও খানিকটা জড়তা নিয়ে বলল,
- দু-দু-দুই গালে আটবার। মানে, একনাগাড়ে আটবার।
- তক্তা দিয়ে কিছু করা হয়েছে?
কিছুক্ষণ ভাবনার মধ্যে পরে আস্তে করে বলল,
- না না, তক্তা দিয়া মারে নাই। উনারে ধইরা আইনা এই ঘরে বন্দি কইরা রাখছে। বাইরে রাস্তা সাফ হইলে হেরপর নিয়া যাইতো গা।
কথার টানে আবারও আঞ্চলিক ভাষাটা চলে এসেছে শামীমের। বেচারা বুঝতেই পারেনি, হঠাৎ লোকটার উপস্থিতি দেখে তার মস্তিষ্ক চট করে শুদ্ধ ভাষায় বলে ফেলেছিল। লোকটা হঠাৎ আরো এক কদম এগিয়ে এসে শামীমের নিকটবর্তী হলো। শামীম ভ্রুঁ কোঁচকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা আচমকা মুখ চেপে ধরে! রন্ধ্রে রন্ধ্রে টের পায় কিছু একটা অনর্থ ঘটবে! আর হলোও তাই! নড়চড় করার নূন্যতম সেকেণ্ডটাও না দিয়ে খচ্ করে আওয়াজটা হল! অভূত বিস্ময় নিয়ে থমকে গেল শামীম। ঘোলাটে চোখ হয়ে গেল স্থির। গলা ফাঁক হয়ে তখনই মৃত। মেঝেতে আস্তে করে নামিয়ে অন্যদিকে ছুটল লোকটা। তড়িৎগতিতে মেয়েটার মাথা ডানহাতে তুলে ডাকতে লাগল সে,
- মিস, চোখ খুলুন! আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? শুনতে পেলে চোখ খুলুন।
দূর থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসছে। বোধহয় কেউ এখানেই এগিয়ে আসছে। দ্রুত লোকটা মেয়েটার গাল ধরে ঝাঁকাতে লাগল, কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে ডাকতে লাগল সে। এমন সময় বন্ধ দুচোখের পাতা মেলে নিভু নিভু চাইল শাওলিন। শারীরিক দুর্বলতায় সামান্য অচেতন হয়েছিল সে। মুখের উপর কালো হুডি পরা কাউকে দেখে শিউরে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু তখনই লোকটা একনিঃশ্বাসে বলে উঠল ওকে,
- কথা বলবেন না। উঠে পড়ুন। আমি শোয়েব। আপনাকে উদ্ধার করতে এসেছি। উঠুন।
মাথা তুলে শোয়া থেকে দাঁড় করাল শোয়েব। চর্তুদিকে একবার নজর বুলিয়ে তৎক্ষণাৎ জানালার পথে এগোল সে। শাওলিন দেখতে পেল জানালা বাইরে একটা মই। মইটা খুব সাবধানে একদম নীচ পর্যন্ত দাঁড় করানো। মাথাটা একবার জানালার বাইরে, পরক্ষণে হুডি পরা লোকটার দিকে ফেরাল। ঢোক গিলে কিছু বলতে উদ্যত হবে, তার আগেই লোকটা তাড়া দিয়ে বলল,
- এখন প্রশ্ন নয়। আগে নামুন। এখানে এক সেকেণ্ড দেরি করা সম্ভব নয়।
মাথাটা 'হ্যাঁ' বোধকে নাড়িয়ে তখুনি মই ধরে নামতে থাকে শাওলিন। মাথাটা টলছে, হাতদুটো খুব কাঁপছে। তবু প্রাণ বাঁচাবার দৈবগুণে শেষপর্যন্ত নীচে নামল সে। উপরে থাকা শোয়েব নিজেও তখন ত্রস্তহাতে নামতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঘরের দরজাটা হাঁট করে খুলে যাওয়ায় তাকে দেখে ফেলে মোছলেম। দু সেকেণ্ড সম্পূর্ণ স্থির! অবস্থা বেগতিক বুঝে ঝড়ের গতিতে নামতে লাগল শোয়েব। ধাপ্ ধাপ্ করে কাঠের মইতে শব্দ তুলে ঝাপ দিয়ে মাটিতে পড়ল। অন্যদিকে হই হই করে এক জটলা অস্ত্রধারী ছুটে আসছে। শব্দটা সুলক্ষণ নয়! শোয়েব কোনোমতে শাওলিনের ডান কবজিটা বজ্রমুষ্টিতে আঁকড়ে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগাল। রাতের আঁধার তেড়েফুঁড়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে শাঁই শাঁই করে ছুটল শোয়েব। ডানহাতের ভেতর মজবুত বলে সরু কবজিটা ধরে রেখেছে। যেন সামান্য একটু ঢিল দিলেই হাতটা ফসকে ছুটে যাবে! বন বাঁদাড় মাড়িয়ে শন শন শব্দে কতক্ষণ ওভাবে দৌড়েছিল তা আর জানা নেই, হঠাৎ বজ্রমুষ্টিতে টান পরায় সতর্ক হলো। দৌড়ের একফাঁকে মাথাটা পিছু ঘুরিয়েছিল শোয়েব। এরপর আচমকাই গতি থামিয়ে মেয়েটার দিকে শুধাল,
- ঠিক আছেন আপনি?
প্রশ্ন শুনে মাথা উপরে তুলল শাওলিন। দম ফুরিয়ে ঠোঁটদুটো গোল হয়ে গেছে। ক্রমাগত অক্সিজেন টানতে ভীষণ পরিশ্রান্ত গলায় বলল,
- আর পারব না . . আমি দুঃখিত।
একটু থেমে আবারও দম নিল শাওলিন। গলাটা ঢোকে ভিজিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
- নিঃশ্বাস পারছি না। পাদুটো ছিঁড়ে আসছে। আপনার দৌড়ের সঙ্গে তাল মেলাতে অক্ষম।
বলতে বলতে মাথা নীচু করে দম নিল ও। সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে। এতোক্ষণ দেহের শেষ তলানিতে থাকা জোরটুকু দিয়ে দৌড়েছে, তবে আর নয়। আর পারছে না। মনোবল যত দৃঢ়ই হোক, এই শরীরে কুলোচ্ছে না। মাটিতে প্রায় বসে পরতে চাচ্ছিল ও। কিন্তু লোকটার বজ্রমুঠো ওকে ভেজা স্যাতস্যাতে মাটিতে বসতে দিল না। লোকটা ওর হাত তেমনি অধিকারসুলভ ধরে মার্জিত গলায় বলল,
- কষ্ট হচ্ছে জানি। কষ্টটা সহ্য করুন। জায়গাটা শিশিরে ভেজা। পাদুটো আরো ক'কদম চালিয়ে ওদিকটায় আসুন।
আধো অন্ধকারে একদিকে তর্জনী দেখাল শোয়েব। পরিশ্রান্ত দৃষ্টিতে ভালো দেখল না শাওলিন। তবু লোকটার প্রতি ভরসা রেখে শেষ চেষ্টাটুকু করল।
—————
ভুবন ভুলানো প্রকৃতি ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। চারিদিকে ছড়িয়েছে রূপোলি ছটা। রাতের আঁধার চিড়ে ফুঁড়ে ফটফট করছে তরল জোৎস্নায়। বাঁশবনে ঝিরঝির পাতার শব্দ, দূরে ঝিঁঝি পোকার ডাক, সমুখে ছলাৎ চলাৎ পানির ঢেউ ভাঙা সুর, দূরে কোথায় যেন ডাকছে নিশি কাক। শুকনো গাছের উপর পা ছড়িয়ে বসে আছে মেয়েটি। ভীষণ হাঁপড়ের মতো শ্বাসটুকু টানছে। অশ্বত্থ বৃক্ষের তলায় শরীর ছেড়ে পিঠ ও মাথা হেলে রেখেছে। মেয়েটার কাছে যক্ষের ধনের মতো একটি টোটব্যাগ আছে। ব্যাগটা বুদ্ধি করে কোমরের একপাশে বেঁধে রেখেছিল। যেমনটা শীতের সময় পরনের সোয়েটারটা খুলে কোমরে বেঁধে রাখে। ওয়াকি-টকি সেটে উদ্ধারের তথ্যটুকু জানিয়ে ফিরে আসে শোয়েব। কাছাকাছি খানিকটা দূরত্বে সেও বসে পড়ে। দুজনের ভেতর কোনো কথা নেই। কেউ কারোর দিকে তাকাচ্ছে না। একজনের চোখ ব্যথায় বোজা, অন্যজন দূর আকাশের পানে স্থির। ব্যথাতুর মানুষটি চোখ মেলে দূরের লোকটাকে খানিক দেখল। একবুক চাপা হতাশা থেকে শূন্য গলায় বলল,
- একটা দলে সাতজন মানুষ। তাদের ভেতর পাঁচজন মানুষ সুস্থ। একজন নিখোঁজ, অন্যজন চোখের সামনে জলজ্যান্ত। সেই পাঁচজন জলজ্যান্ত মানুষটাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমি এই দৃশ্যটা হয়তো আমৃত্যু ভুলতে পারব না।
আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পিছু তাকাল সে। কালো হুডির কারণে মুখ স্পষ্ট নয়। একপলক নিরুত্তাপ চোখে চেয়ে খানিকটা স্বান্তনার স্বরে বলল,
- কিছু দৃশ্য আপনাকে শেখাবে, কিছু দৃশ্য বোঝাবে কষ্ট। আপনার এখানে বুঝে নিতে হবে কোনটা আপনার জন্য যোগ্য। মন খারাপ করবেন না। কিছুক্ষণ শান্ত মনে বসুন। নিজেকে রিল্যাক্স করুন।
লোকটার কথায় কিছুক্ষণ চুপ রইল শাওলিন। গাছের গায়ে মাথা এলিয়ে তাকিয়ে রইল। ওর ওই নির্বাক চাহনি দেখে শোয়েব কিছুই বলতে পারল না। শুধু বুঝতে পারল ওই বড় বড় মায়াবী চোখদুটোতে বিষাদ ছাপা। বিষাদে মাখামাখি হয়ে সরল মুখটা পাণ্ডুর হয়ে গেছে। এখনো ঘন ঘন করে লম্বা দম টানচে, হাঁপানোর টানটা এখনো কমেনি। খুব কী বেশি দৌড়ে ফেলেছে? গতিটা কী বেশি ছিল? ঠিক তখনই শোয়েব দেখতে পেল মেয়েটার পা রক্তাক্ত। পায়ে কোনো জুতা নেই। জঙ্গলের জঘণ্য পথটা ওভাবেই ছুটে এসেছে। অথচ, একবারও বলেনি আপনার পায়ে বুট, আমার পা খালি। চোখ তুলে ওই ব্যথাতুর মুখে তাকাল শোয়েব। হাঁটু গেড়ে এই প্রথম কোনো নারীর সমুখে নিজেকে সমর্পণ করল। পাদুটো নিজের কোলে তুলে নেয় শোয়েব। মাথা থেকে ডানহাতে হুডিটা নামিয়ে শাওলিনের পানে চাইল। পায়ে উষ্ণ হাতের স্পর্শ পেয়ে দৃষ্টি ছুঁড়ে তাকিয়েছে শাওলিন। সহসা বৈদ্যুতিক শক লাগার মতো সমস্ত শরীর ঝিমঝিম করে উঠল! বুকের ভেতর প্রচণ্ড জোরে ধ্বক্ ধ্বক্ করছে ওর। গলার কাছে কাঁটার মতো বিঁধে ঢোক গিলতে পারল না। ঠিক তখনই কানে শুনতে পেল লোকটার ভরাট-স্বর,
- ইয়ং লেডি, পাশের টোটব্যাগটা টাচ করতে পারি? একটা ন্যাপকিন প্রয়োজন। এটা এখুনি ক্লিন করা দরকার।
খট করে কানে 'ইয়ং লেডি' সম্বোধনটা বাজল ওর। সুতীব্র ঝংকারের মতো ঝনঝন করে উঠল! শাওলিন কেমন একটা অবস্থার ভেতর পড়ে গেল, তা নিজেও ঠাহর করতে পারল না। শুধু বুঝতে পারল, হেলিপ্যাড থেকে এই লোকটাকেই দেখেছে। এই লোকটাই তবে সাক্ষাৎ মৃত্যুকূপ থেকে উদ্ধার করেছে! কী অদ্ভুত, কী ভয়ংকর অদ্ভুত . . !
·
·
·
চলবে……………………………………………………