আধো আলো ছায়াতে - পর্ব ০৫ - মৌলী আখন্দ - ধারাবাহিক গল্প

          অফিস থেকে বের হয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপে এদিক ওদিক হাঁটছিল তনিমা। বাসায় ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। ফিরে গেলেই তো সেই একই অশান্তি। মনটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে আছে। সামনে গ্রুপ এসাইনমেন্ট, বাসাটা ছাড়তে হবে, নতুন বাসা খুঁজতে হবে, নানান দুশ্চিন্তা…
এলোমেলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতেই অনুভব করল তনিমা, ব্যাগের ভেতর ভাইব্রেট করছে ফোনটা। প্রথমে ভাবল ধরবে না।
বাসা থেকে ফোন করছে নাকি? বাসা থেকে কেউ কল করলে ধরবে না সিদ্ধান্ত নিয়ে ফোনটা ব্যাগ থেকে বের করল তনিমা।
নাহ, বাসা থেকে কল করেনি কেউ। অচেনা নাম্বার।
অফিসের কেউ? কল রিসিভ করে কানে ঠেকাল তনিমা। 
“হ্যালো?”
“কেমন লাগল আমার সারপ্রাইজ?”
“কে?”
“এক্স বয়ফ্রেন্ডকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে চলবে?”
“অপু!”
অশ্লীল হাসি হাসছে অপু ফোনের ওপাশ থেকে। হাসির শব্দে মনে হচ্ছে কানে ছ্যাঁকা লাগছে তনিমার।
“এই তো চিনতে পারছিস!”
“বয়ফ্রেন্ড তো দূর, তুই আমার ফ্রেন্ড হওয়ারও যোগ্যতা রাখিস না!”
“তাই?”
“তুই আমার ছবি পেলি কোথায়?”
“সুস্মির ল্যাপটপ ধার নিয়েছিলাম একদিনের জন্য। তোর ছবি পেয়ে যাব ভাবিনি। দেখলাম সব মাস্টারপিস! পরে কোন সময় কী কাজে লাগে ভেবে রেখে দিয়েছিলাম! এখন চমৎকার কাজে লেগে গেল।”
শিট! আফসোসে নিজের কপাল নিজেই চাপড়াল তনিমা।
“এতদিন পর এই কাজটা তুই করলি কী মনে করে? কী এমন ক্ষতি করেছিলাম আমি তোর?”
“মনে নেই?”
মনে করার চেষ্টা করল তনিমা। কিছুই মনে পড়ছে না ওর।
“তনু, আমি তোর ওই থাপ্পড় ভুলে যাইনি। আর কোনো দিন ভুলতে পারবও না!”
“কোন থাপ্পড়?”
কথাটা বলেই বিদ্যুৎ চমকের মতো সবকিছু মনে পড়ে গেল তনিমার। ভার্সিটির পিকনিকে ট্রুথ অর ডেয়ার খেলায় সবার সামনে তনিমাকে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেছিল অপু।
ডেয়ারটা ছিল সবার সামনে ভালোবাসার মানুষকে প্রপোজ করতে হবে এরকম কিছু। সত্যি কথা বলতে, অপুর সাথে তখন সম্পর্ক মোটামুটি ভালোই যাচ্ছিল তনিমার।
শুধু অপু নয়, ওর প্রণয়প্রার্থীর তালিকায় আরো অনেকেই ছিল তখন। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো একজনের সাথে জড়িয়ে পড়ে ভার্সিটি লাইফের মজা নষ্ট করার মতো বোকা মেয়ে ছিল না তনিমা।
নির্দিষ্ট করে একজনের সাথে জুটি বেঁধে ঘোরার মানে গণ্ডি ছোটো করে ফেলা। তাছাড়া ছেলেগুলো বড্ড খবরদারি করে।
“এখানে গেলে কেন, ওখানে যাওনি কেন, ওর সাথে কথা বললে কেন, এর দিকে তাকিয়ে হাসলে কেন, অমুক স্যার তোমাকে এত নাম্বার দিয়েছে কেন, এত রাত পর্যন্ত ফ্রেন্ডের বাসায় কী, অমুক কাজিন তোমার সাথে দেখা করতে এলো কেন” সিনিয়র আপু আর বন্ধুদের প্রেম করার পর ইত্যাদি ইত্যাদি নানান ফ্যাকরা দেখে প্রেম করার শখ মিটে গিয়েছিল তনিমার।
তাছাড়া আম্মু আব্বুর মনে কোনো রকম কষ্ট দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না ওর। সারা জীবন যার সাথে কাটাতে হবে, তার যেসব দোষ গুণ যা ওর চোখে পড়বে না, আম্মু আব্বুর অভিজ্ঞ চোখের ফিল্টারে সেই সব দোষ গুণ ঠিকই ধরা পড়বে, এমনটাই বিশ্বাস ছিল তনিমার।
তারপরও তনিমা তখন জীবনের সেই সময়টা পার করছিল, যখন মন তরল থাকে। একটু জোরে বাতাস বইলে, আকাশে মেঘ করলে, সুন্দর কোনো গান শুনলে, সুন্দর কোনো কবিতার লাইন চোখে পড়লে মনটা একটু হলেও কেমন কেমন করে।
ভ্যালেন্টাইনস ডে অথবা নববর্ষের উদযাপনে জুটি বেঁধে ঘোরার মতো মানুষ যাদের আছে, তাদের আয়োজন আর ছবি দেখে মাঝে মাঝে উদাস উদাস লাগে। অপু যদি সেই সন্ধ্যায় সুন্দর কোনো কবিতার লাইন বলে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রেমের কথা বলত, হয়ত রাজি হয়ে গেলেও হতে পারত তনিমা।
কিন্তু বেরসিক অপু সেসবের ধার দিয়েও যায়নি সেদিন। সবার মধ্যে থেকে উঠে তনিমার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “আই লাভ ইউ!”
অপু যে অমন কিছু বলতে পারে, এক মুহূর্ত আগেও ঘুণাক্ষরে টের পায়নি তনিমা। ওর সবিস্ময় দ্বিধার এক মুহূর্তের নিরুত্তর ভাষাহীনতার সুযোগ নিয়ে ওকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে তনিমাকে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেছিল অপু।
সম্বিত ফিরে পেয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অপুর গালে নিজের পাঁচ আঙুলের ছাপ ফেলে দিয়েছিল তনিমা সেদিন। আড্ডা ভেঙে দিয়ে চলে গিয়েছিল সশব্দ পদক্ষেপে।
ভেঙে গিয়েছিল ওদের বন্ধুদের গ্রুপ সেদিনের পর থেকে। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল তনিমা।
ক্লাস শেষ করে সরাসরি লাইব্রেরিতে চলে যেত তনিমা। প্রয়োজনের বেশি একটা মুহূর্তও থাকত না ভার্সিটিতে।
আর এই সুযোগে অপু রটিয়ে দিয়েছিল, ভীষণ খারাপ মেয়ে তনিমা, ওকে এতদিন ধরে ঘুরিয়ে এখন অস্বীকার করছে সব। এসব কথা তনিমার শুভাকাঙ্খী কেউ কেউ ওর কানে দেওয়ার চেষ্টা করলেও পাত্তা দেয়নি ও।
প্রতিবাদ করে সময় নষ্ট করারও প্রয়োজন বোধ করেনি। এড়িয়ে গেছে শুধু।
এখন মনে হচ্ছে ভুলই করেছিল হয়ত। হয়ত অপুকে আরেকটু গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
সেই সময় একটা কঠিন শিক্ষা দিলে আজ আর এই দিন দেখতে হতো না।
“কী ভাবছিস?”
চমকে উঠল তনিমা। ফোনের অপর প্রান্তে অপুকে রেখেই অতীত স্মৃতি চারণায় হারিয়ে গিয়েছিল সে।
নিজেকে সামলে নিয়ে কঠিন গলায় বলল, “ভাবছি, মাত্র একটা চড় সেদিন কম হয়েছিল তোর জন্য!”
আবারও অশ্লীল ভঙ্গিতে হাসতে শুরু করল অপু। কল্পনার চোখে দেখতে পাচ্ছে তনিমা, গা দুলিয়ে কুৎসিতভাবে হাসছে ও।
“কোনো লাভ হবে না মামা! সাত ঘাটের পানি খাইয়া আমার এই ঘাটেই তোকে আসতে হবে চান্দু!”
“তুই নিজেকে কী মনে করিস? হু দ্যা হেল ডু ইউ থিংক ইউ আর?”
“একই প্রশ্ন যদি আমি করি তোকে? কীসের এত অহংকার তোর? বাবার টাকা আছে বলে ধরাকে সরা জ্ঞান করিস?”
“তুই আগেও একটা হারামি ছিলি! এখনো তাই আছিস! তোর মতো হারামির সাথে আর একটা কথাও বলতে চাই না আমি!”
ফোন কেটে দিয়ে হাঁপাতে লাগল তনিমা। একটা মানুষ কত নোংরা মানসিকতার হলে এতদিন আগের রাগ এখন পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে?
এর কারণ কী? শুধুই প্রতিশোধ?
নাকি আরো কিছু আছে?
ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসতে চাইছে। শারীরিক অবসন্নতার চেয়ে মানসিক শ্রান্তিই বেশি বোধ হয়।
কেমন যেন অসাড় হয়ে আছে মনটা। এতদিন পর কেন মনে পড়তে হলো এসব তিক্ত স্মৃতি, যা সে ভুলেই গিয়েছিল!
ভীষণ কড়া বাবার মেয়ে ছিল বলে চোখে পড়ার মতো সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও ভার্সিটির আগে কোনো প্রেমের প্রস্তাব পায়নি তনিমা। অপুর বলা সেই ক্লেদাক্ত “আই লাভ ইউ” শব্দত্রয়ীই আসলে ওর জীবনে পাওয়া প্রথম প্রেমের প্রস্তাব।
আচমকাই ভীষণ কান্না পেতে লাগল তনিমার। তার জীবনে কি একটা ভালোবাসা আসতে পারত না যা কবিতার মতো স্নিগ্ধ, গানের লাইনের মতো সুন্দর?
কেন জীবনে প্রথম বার ভালোবাসার কথা শোনার মুহূর্তটা হয়ে রইল শরীরসর্বস্ব বিশ্রী একটা স্মৃতি হয়ে?
সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসছে ক্রমশ। তনিমার মনে হতে লাগল, ওর জীবনেও বুঝি সামনের দিনগুলোতেও ঘনিয়ে আসছে ঘোর আঁধার।
বাসায় ফিরতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু ইচ্ছা না করলেও ফিরে যেতেই হবে।
সারা রাত ধরে তো আর রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো যাবে না। আবার দেরি করে ফিরলেও চোখা চোখা কথা শুনতে হবে অজস্র।
ফোন বাজছে আবারও। ফোনটা ধরে রাখা ছিল ওর হাতেই।
স্ক্রিনের ওপর আম্মুর নাম। আচমকাই আম্মুর জন্য মায়া হতে লাগল তনিমার।
শুধুমাত্র একজন মানুষকে গর্ভে ধারণ করার অপরাধে তার জীবনের সকল ঘটনা দুর্ঘটনার জন্য দায় নিতে হবে, কথা শুনতে হবে আরেকজন মানুষকে, এর কোনো অর্থ হয় না।
তনিমা মনে মনে ঠিক করল, ফোন ধরে আম্মুকে বলবে, “আম্মু যারা তোমাকে বলবে তুমি আমাকে ঠিক করে মানুষ করতে পারোনি বলে এমন হয়েছে তাদের সবাইকে বলে দাও তো, আমার মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক, তার সবকিছুর জন্য সে নিজেই দায়ী!”
সাজানো কথাগুলো কিছুই বলা হলো না। ফোন ধরার সাথে সাথেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল আম্মু, “তুই কোথায়, বাসায় আয় তাড়াতাড়ি!”
ক্লান্ত গলায় বলল তনিমা, “কেন?”
“সৌরভ এসেছে বাসায়! তোর সাথে কথা বলবে!”
“কী কথা? আর কথা বলতে চাইলে তো ফোনেই বলা যায়! বাসায় কেন?”
“তুই আয় তাড়াতাড়ি!”
আর কিছু বলার আগেই কল কেটে দিলো আম্মু।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp