আধো আলো ছায়াতে - পর্ব ০৩ - মৌলী আখন্দ - ধারাবাহিক গল্প

অফিসের ক্যান্টিনটা মাত্রই খুলেছে বোধ হয়। তনিমা আজকের প্রথম কাস্টোমার।
অর্ডার নেওয়ার সময়ই ছেলেটা বলে গেছে, “বসেন, একটু সময় লাগব! মাত্র চুলা ধরাইছি।”
তনিমা হাসি মুখে বলেছে, “সমস্যা নাই, বসলাম!”
সকালে বাসার নাস্তা জোটেনি আজকে। অবশ্য জোটেনি শব্দটা ব্যবহার করা ঠিক হলো না।
খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলেই জুটত। সময়ও ছিল তনিমার হাতে।
কিন্তু বাসার কারো মুখোমুখি হতে চায়নি বলেই কারো ঘুম থেকে ওঠার আগেই অফিসে চলে এসেছে। ভালোই হয়েছে অবশ্য।
রাস্তায় জ্যামে পড়তে হয়নি। অফিসে ক্যান্টিনেও ভিড় নেই কোনো।
কোনো ঘরে আটকা পড়ে গেলে বন্ধ দরজায় বার বার মাথা ঠুকে নিজের মাথা রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত করে লাভ হয় না কোনো। তার চেয়ে বরং কীভাবে নতুন কোনো জানালা কেটে বেরিয়ে আসা যায় সেই চিন্তা করা ভালো।
যে কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত হলে মানসিক চাপ থেকে বের হওয়ার জন্য ব্যাক আপ প্ল্যান নিয়ে চিন্তা করা ছোটোবেলা থেকে তনিমার অভ্যাস। বরাবরের মতো খানিকটা অলস সময় পেয়েই তার মস্তিষ্ক বাসার পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য প্ল্যান বি নিয়ে ভাবতে শুরু করে দিলো নিজের অজান্তেই।
আচ্ছা কী হবে যদি তার এই বিয়েটা ভেঙে যায়?
আম্মু আব্বুর মন খারাপ হবে। তার চেয়ে বড়ো ব্যাপার তুহিন চেঁচামেচি করবে।
তুহিনের সাথে একটা মেয়ের সম্পর্ক আছে অনেক দিন ধরেই। ঠিক এই কারণেই তুহিন তার বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে আছে বলে তনিমার ধারণা।
তনিমা ঠিক করে ফেলল, আজকেই ফিন্যান্সের লিজাকে একটা মেয়েদের সাবলেট বাসা দেখতে বলবে। বাসায় বেশি সমস্যা হলে লিজার সাথেও উঠে যাওয়া যায়।
যে পরিমাণ টাকা সে মাসের শুরুতে এই বাসায় দেয়, মেসে অথবা সাবলেটে থাকতে তার চেয়ে বেশি টাকা খরচ হবে না নিশ্চয়ই। মেসে অথবা সাবলেটে থাকবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়ার সাথে সাথেই তার মানসিক চাপ কমে অর্ধেক হয়ে গেল।
তুহিনকেও বলে দেবে, তার যাকে পছন্দ তাকে যেন বিয়ে করে আনে। সব সমস্যার সমাধান বের করে তনিমার মন ফুরফুরে হয়ে গেল।
“আরে আপু, আপনি এখানে যে?”
লিজা এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। তনিমা হাসি মুখে বলল, “তোমার কথাই ভাবছিলাম মনে মনে।”
“আমার কথা? আরে কী সৌভাগ্য আমার!”
“কেন?”
“আপনার মতো এত বড়ো একজন মানুষ আমার কথা ভাবছেন, এটা সৌভাগ্য না?”
লিজা কি তার প্রশংসা করছে নাকি খোঁচা দিচ্ছে, ঠিক বুঝতে পারছে না তনিমা। মনে মনে খানিকটা দমে গেল সে।
নাস্তা চলে এসেছে। আর কিছু না বলে পরোটার এক কোণা ছিঁড়ে ভাজিতে ডোবাল তনিমা।
রাত থেকে খাওয়া হয়নি কিছুই। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে।
কিন্তু পরোটা মুখে দিয়ে খিদে মরে গেল তনিমার। কেমন যেন রাবারের মতো লাগছে।
হাত ইশারা করে ছেলেটাকে ডেকে এনে এক প্যাকেট এনার্জি প্লাস বিস্কিট দিয়ে যেতে বলল তনিমা। চা দিয়ে বিস্কিট খাওয়া যাক।
“কী হলো আপু, পরোটা খাবেন না?”
“নাহ, থাক। ইচ্ছা করছে না।”
“অবশ্য আপনার কি আর ক্যান্টিনের নাস্তা ভালো লাগবে?”
“মানে?”
“মানে কিছু না। আপনি ক্যান্টিনে নাস্তা করতে এসেছেন দেখেই তো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আপনার মতো এত বড়ো বাড়ির মেয়ের তো ক্যান্টিনে নাস্তা করতে আসার কথা না। আপনি তো বাসা থেকেই নাস্তা করে আসেন। বাসায় নাস্তা করেননি যে আপু? আপনাদের শেফ কি ছুটিতে গিয়েছে?”
মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তনিমা। নাহ, এর সাথে থাকা যাবে না!
“আমাদের কোনো শেফ নেই লিজা!”
“ওমা, সে কি কথা! সেদিন যে দেখলাম আপনাদের বাসায়?”
“এই নিয়ে আমি তোমাকে অনেকবার বলেছি, আবারও বললাম। তোমাদের যেদিন দাওয়াত করেছিলাম সেদিন একজনকে এনেছিলাম যাতে বাসার কারো কোনো কষ্ট না হয়, আমি তোমাদের সাথে গল্প করতে পারি। সে ওই একদিনের জন্যই রান্না করতে এসেছিল। বাসার রান্নাবান্না আমরা নিজেরাই করি।”
“কাজের মেয়ে নাই?”
“সেটা আছে। সে তো সবার বাসাতেই থাকে। তোমাদের বাসাতেও আছে নিশ্চয়ই?”
লিজার উত্তরের অপেক্ষা না করে ব্যাগটা তুলে নিয়ে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল তনিমা। বিল দিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে দ্রুত।
লিজার সাথে বসে থাকলে তার মাথা ব্যথা বাড়বে বই কমবে না।
কিন্তু লিজার সাথে তার দ্বিতীয়বার দেখা হয়ে গেল উইকলি মিটিংয়ে। উইকলি মিটিংগুলোতে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
লিজা তাকে হাত ধরে নিয়ে বসাল তার পাশের সিট। মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলতে পারল না তনিমা।
গলা নামিয়ে বলল, “আমার কথা মনে মনে কেন ভাবছিলেন, সকালে বললেন না তো?”
“বাদ দাও!”
“বাদ দেবো কেন আপু? বলেন না!”
তনিমা খানিকটা ইতস্তত করে বলল, “তুমি যে সাবলেট থাকো, তোমার প্রতি মাসে কত টাকা খরচ হয় লিজা?”
“কেন আপু?”
“না, আমি ভাবছি আমিও থাকব!”
লিজা চোখ কপালে তুলে বলল, “সে কী কথা আপু? আপনাদের এত বড়ো আর এত সুন্দর বাসা ছেড়ে আপনি সাবলেটে থাকবেন কেন!”
মিটিং শুরু হয়ে গেছে। খোরশেদ ভাই স্লাইড শো প্রেজেন্টেশনে গত এক সপ্তাহের কার্যক্রম দেখানো হচ্ছে।
সামনের সারি থেকে ওর সেকশনের সিনিয়র সাবিনা আপা চোখ গরম করে তাকালেন। তনিমা লিজাকে ইশারায় চুপ করতে বলে সামনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
ভালো লাগছে না, আজকে মন বসছে না কিছুতে। রাতে ঘুম ভালো হয়নি, এখন চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।
মুখের সামনে হাত রেখে ছোটো একটা হাই আটকাল তনিমা। প্রেজেন্টেশন শেষ, এখন প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে।
এই মিটিং শেষ হলে বাঁচা যায়। অনেক কাজ পেন্ডিং পড়ে আছে।
পাশ থেকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিলো লিজা। ধড়মড় করে সজাগ হলো তনিমা।
লিজা গলা নামিয়ে বলল, “আপু, সাবিনা আপা আপনাকে দাঁড়াতে বলছেন!”
এই সেরেছে! সর্বনাশ!
সাবিনা আপার কাজই এটা। দেখেছে তার আজকে মিটিংয়ে মনোযোগ ছিল না।
দিয়েছে ফাঁসিয়ে। বুক ধড়াস ধড়াস করলেও হাসিমুখে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল তনিমা।
চেয়ার পারসন হাসিমুখে বললেন, “ওকে ইয়াং স্টার, আ ফিউ মিনিটস বিফোর উই হ্যাভ গট টু নো দ্যাট ইউ আর সাপোজড টু টেল মি দ্যা প্রবলেমস ইউ আর ফেসিং এট ওয়ার্ক অন বিহাফ অফ ইওর সেকশন!”
কী যন্ত্রণা! এই মিটিংয়ে যার যার ওয়ার্ক স্টেশনের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার কথা। কিন্তু তনিমা তো কিছুই গুছিয়ে নিয়ে আসেনি, কী বলবে?
সাবিনা আপা কি তাকে ইচ্ছা করে এই বিপদে ফেললেন? কী এমন ক্ষতি করেছিল সে তার?
চ্যালেঞ্জটা নিল তনিমা। গলা পরিষ্কার করে বলল, “স্যার এজ ফার এজ আই নো, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের কাজ প্রোডাকশনের সাথে রিলেটেড, সব গুডস অর্ডার করা, কালেক্ট করা, সময়মতো সাপ্লাই দেওয়া এনশিওর করা, কোয়ালিটি মেইনটেইন করা, ডেলিভারি চার্জ এবং প্রাইস কীভাবে মিনিমাম রাখা যায়, অবশ্যই কোম্পানির প্রফিটের প্রাধান্য রেখেই, সেগুলো সর্ট আউট করা। কিন্তু আনফরচুনেটলি আমাদের সেকশনে যে চারটা ডেস্কটপ প্রোভাইড করা হয়েছে প্রতিটাই আগের মডেলের, চরম স্লো। আইটি সেকশন আমাদের সাথে একমত হবেন যে আমাদের দিনে কয়েকবার করে তাদের কল করতে হয়। এতে আমাদের কাজের গতি যেমন কমে যাচ্ছে তেমনি কোয়ালিটিও নেমে যাচ্ছে। এ ব্যাপারটা একটু কনসিডার করলে মনে হয় সবারই প্রোডাক্টিভিটি বাড়ত!”
চেয়ার পারসন বললেন, “নোটেড! আমি আইটি সেকশন থেকে একজনকে এ ব্যাপারে প্রোপার ইনভেস্টিগেশন আর প্রয়োজনীয় স্টেপস নেওয়ার অথোরিটি নিতে অনুরোধ করছি। এনিথিং এলস?’
“নাথিং এলস ফর দিস উইক স্যার! হোপিং টু গিভ সাম গুড ফিডব্যাক টু ইউ নেক্সট উইক!”
সাবিনা আপার চুপসে যাওয়া মুখটা হয়েছিল দেখার মতো। মিটিং শেষ করে স্ন্যাকস কর্নার থেকে স্যান্ডউইচ আর কফির কাপটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিলো তনিমা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp