আধো আলো ছায়াতে - পর্ব ০৬ - মৌলী আখন্দ - ধারাবাহিক গল্প

          ঊষার আজকাল এ বাসায় ভালো লাগে না আর। কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসে। এ বাসার সবার চিন্তা ভাবনা অনেক সংকীর্ণ। নিজেদের বাঁধা ধরা গণ্ডির বাইরে কোনো কিছু ভাবতেই পারে না। অল্প বেতনের পার্ট টাইম চাকরিগুলো না করায় আপু তার ওপর অসন্তুষ্ট, বুঝতে পারে ঊষা। কিন্তু ওরা এটা বুঝতে পারে না যে ঊষার শ্রম ঘন্টার একটা প্রত্যাশিত মূল্য আছে।
সেই প্রত্যাশিত মূল্য না পেলে নিজের শ্রম ব্যয় করে শুধু শুধু ক্লান্ত হবে কেন ঊষা?
গত সাড়ে চার মাস ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রোগ্রাম প্রেজেন্টার হওয়ার জন্য একটা ট্রেনিং নিয়েছে ঊষা। বাসায় এখনো বলেনি কিছুই।
বললে আপু আবার বাগড়া দেবে এটা সেটা বলে।
কিছুদিন আগেই ঊষাকে একটা পার্ট টাইম চাকরির জন্য কনফার্ম করা হয়েছে চ্যানেল আলফাতে। যদিও ছোটোখাটো চ্যানেল, তেমন ভিউ নেই।
কোনো জয়েনিং লেটারও পায়নি এখনো, আর ওর ওয়ার্ক ডেস্ক্রিপশনও স্পষ্ট না। ঊষা নিজেও জানে না কী কী কাজ ওর করতে হবে। ঘন্টা হিসেবে পে করা হবে, এমনটাই বলা হয়েছে।
কনফার্ম হওয়ার পর প্রতিদিনই অফিসে এসে বসে থাকছে ঊষা। সবার জন্য আনা গণ নাস্তা আর ছোটোখাটো দুএকটা প্রোগ্রাম পাওয়া ছাড়া আর তেমন কোনো লাভ হয়নি ওর।
অল্প স্বল্প পেমেন্ট যা পেয়েছে তা খরচ হয়ে গেছে যাতায়াত ভাড়া আর আউটফিট কেনাতেই। তবুও আশাবাদী ঊষা, প্রথম দিকে এমন ছোটো খাটো কাজ করেই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয় সবাইকে।
পরে একটা সময় সে বড়ো কোনো ব্রেক পাবে নিশ্চয়ই। মনে মনে আশা আছে, নিয়মিত এলে কোনো না কোনো দিন নিশ্চয়ই চোখে পড়বে কিবরিয়া ভাইয়ের। হয়ত পেয়ে যাবে ভালো একটা সুযোগ।
অবশেষে বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে। আজকে একটা লাইফ স্টাইল প্রোগ্রামে ওর এংকরিং করার কথা।
চারজন অতিথি আসবেন। এদের মধ্যে তিনজনকে চেনে ঊষা।
মিডিয়া জগতের পরিচিত মুখ। চতুর্থজনের নাম অপরিচিত।
ছবি দেখেও মনে পড়ছিল না ওর।
আজকের অনুষ্ঠানের জন্য ড্রেস কিনেছে ইয়েলো থেকে।
ওর জমানো টাকা থেকে খরচ হয়ে গেছে পাক্কা সাড়ে চার হাজার টাকা। টাকাগুলো দিতে গা জ্বালা করলেও কিছু করার নেই।
মিডিয়ার মডেলদের সামনে ওকে নিষ্প্রভ লাগলে চলবে না।
যদিও আমন্ত্রিত অতিথিরা কেউই খুব একটা নামী দামী কেউ নন। খুব বেশি ভিউ হবে না।
এ ধরণের অনুষ্ঠানের একটা নাম আছে। এগুলোকে বলা হয় “ফিলার”।
বড়ো বড়ো অথবা ভালো ভালো অনুষ্ঠানের মাঝের ফাঁকা সময়গুলোতে এ ধরণের অনুষ্ঠান প্রচার করে সময়টা পার করা হয় শুধু। এগুলো সাধারণত এমন সময়ে প্রচার করা হয়ে থাকে যখন অধিকাংশ মানুষই অফিসে থাকে অথবা বাসায় থাকা মানুষগুলো ব্যস্ত থাকে সাংসারিক কাজে।
ফলে ভিউ খুব বেশি হবে না তা বলাই বাহুল্য। 
নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই চলে এসেছে ঊষা। বাসা থেকে যে ড্রেস পরে এসেছিল সেটা চেঞ্জ করে অনুষ্ঠানের জন্য আনা ড্রেস পরে মেক আপ করে বসে আছে ঊষা। বার বার আত্মস্থ করছে ওকে কী করতে হবে আজকে।
চারজনের সাথে গল্প করা, ছোটোখাটো গেম খেলা এইসব। চল্লিশ মিনিটের অনুষ্ঠান।
মাঝে বিশ মিনিটের বিজ্ঞাপন ঢুকবে। মোট এক ঘন্টা।
অনুষ্ঠান শুরু হতে এখনো চল্লিশ মিনিট সময় বাকি আছে। অতিথিদের মধ্যে তিনজন চলে এসেছেন।
চতুর্থজনের দেখা নেই এখনো। খুব হালকা দুশ্চিন্তা হচ্ছে ঊষার।
বাকি তিনজন মেক আপ নিচ্ছেন। প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে।
দুশ্চিন্তা কমাতে ভেন্ডিং মেশিনের দিকে এগিয়ে গেল ঊষা। এই অফিসের একটা জিনিস ভালো, ভেন্ডিং মেশিনে ফ্রি চা কফি পাওয়া যায়।
পেপার কাপে কফি নিয়ে ছোটো ছোটো চুমুক দিচ্ছিল ঊষা, এমন সময় খুলে গেল গ্লাস ডোরটা। হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে এসে ঢুকল এক তরুণী।
বয়স অনুমান করা যায় না, ছাব্বিশ থেকে ছত্রিশের মধ্যে যে কোনো কিছুই হতে পারে। খুব উগ্র মেক আপ করা বলে প্রথম দর্শনেই মেয়েটাকে অপছন্দ করে ফেলল ঊষা।
পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে তার গায়ের ধাক্কায় কফির কাপটা প্রায় ঊষার গায়ে পড়েই যাচ্ছিল। কিছু বলবে না বলবে না করেও মুখ ফসকে বলে ফেলল ঊষা, “হেই, ওয়াচ ইট!”
থমকে দাঁড়াল মেয়েটি। ঘুরে তাকাল ঊষার দিকে।
চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “মে আই নো হু দ্যা হেল আর ইউ?”
ততক্ষণে জেদ চেপে গেছে ঊষারও, “দ্যাটস নান অফ ইওর বিজনেস!”
ঊষাকে হতভম্ব করে দিয়ে ওর হাত থেকে কফির কাপটা নিয়ে নিল অচেনা মেয়েটা। তারপর কফিটা ছুঁড়ে মারল ওর দিকে।
সময়মতো সরে যেতে পারল বলে গরম কফিটা পড়ল না ওর গায়ে। কিন্তু নতুন কেনা অফ হোয়াইট ড্রেসটা রক্ষা পেল না ছিটে ছিটে কফির দাগ থেকে।
“ইউ বিচ!” শব্দ দুটো ছিটকে বেরিয়ে এল ঊষার মুখ থেকে।
একই সাথে হাতও উঠে গেল চড় মারার ভঙ্গিতে, কিন্তু ঠিক সেই সময় পেছন থেকে ভেসে এল কারো কন্ঠ।
“মাশিয়াত ম্যাম!”
মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল ঊষার। ইনি মাশিয়াত ম্যাম?
তার অনুষ্ঠানের চতুর্থ অতিথি?
নিজেকে সামলে নিয়ে হাত নামাল ঊষা। তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে ভেতরে ঢুকে গেল মাশিয়াত।
আর ঊষা গেল ওয়াশরুমে তার নতুন ড্রেস থেকে কফির দাগ তুলতে পারে কিনা দেখতে। অনুষ্ঠানের আর মাত্র বিশ মিনিট সময় বাকি আছে।
ওকে দেখেই উত্তেজিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়ল মাশিয়াত, “হোয়াট দ্যা হেল ইজ শি ডুইং হিয়ার?”
সালাম দিয়ে নম্র ভঙ্গিতে বলল ঊষা, “ম্যাম আমার নাম নিশাত রহমান ঊষা…”
ওকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে ক্যামেরা ম্যানকে বলল মাশিয়াত, “এইসব আবর্জনা বের কর আমার সামনে থেকে!”
ক্যামেরা ম্যান বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, “ম্যাম উনি আমাদের আজকের প্রোগ্রামের হোস্ট!”
“হোয়াট দ্যা হেল! এইসব ট্র্যাশের সাথে কাজ করব না আমি!”
মাশিয়াতের চেঁচামেচি ক্রমেই বাড়তে লাগল। লজ্জায় মাথা কাটা যেতে লাগল ঊষার।
লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে মন চাইছে ওর। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে এক পর্যায়ে বেরিয়ে এলেন কিবরিয়া ভাই।
“কী হয়েছে, মিশু?”
রাগে কাঁপছে ততক্ষণে মাশিয়াত, “যতসব গার্বেজ রেখেছ তোমার এখানে… এরা নাকি আবার এংকরিং করবে…”
ঊষার মনে হতে লাগল সে এখানে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে এই মুহূর্তে।
“কী হয়েছে?”
“কী হয়েছে, সেটা তোমার স্টাফকে জিজ্ঞেস কর! সে কেন বেয়াদবি করল আমার সাথে?”
“এই মেয়ে, কী করেছ তুমি মাশিয়াতের সাথে?”
ঊষা তখন ঝড়ে পড়া বাঁশপাতার মতো কাঁপছে, জবাব দিতে পারল না কোনো।
“স্যরি বল!”
ঊষা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, “স্যরি!”
মাশিয়াতের দিকে তাকিয়ে হাসলেন কিবরিয়া ভাই। “হ্যাপি? এবার প্রোগ্রামটা শুরু করতে পারি আমরা?”
“না, মোটেও না! আগে তুমি এইসব ট্র্যাশ বের করবে এখান থেকে, তারপর!”
কিবরিয়া ভাই ঊষার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বের হও!”
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না ঊষা, “জি?”
“এই মেয়ে তুমি কি কানে কম শোনো নাকি? বেরিয়ে যাও! গেট লস্ট!”
“কিন্তু…আজকের প্রোগ্রাম…”
“এই, কে ফ্রি আছে এখন? রিংকিকে বল দশ মিনিটের মধ্যে মেক আপ নিয়ে রেডী হতে! তাড়াতাড়ি, সময় নেই! কুইক!”
কিছুক্ষণ পর ঊষাকে দেখা গেল একটা বহুতল ভবনের নিচে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে। প্রাণপণে চোখের পানি আটকে রাখতে চেষ্টা করছে সে।
কতক্ষণ সফল হবে বুঝতে পারছে না। তার মুখের ভারি মেক আপ এখন তাকেই ব্যঙ্গ করছে যেন।
পথচলতি মানুষ ঘুরে ঘুরে দেখছে তাকে।
এমনকি মেক আপ তুলে ড্রেস চেঞ্জ করে বের হওয়ার সময়টুকু পর্যন্ত দেওয়া হলো না তাকে…
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp