সন্ধ্যায় অফিস ছুটির ট্র্যাফিক জ্যাম ঠেলে যখন বাসায় ঢুকল তনিমা তখন ঘড়ির কাঁটা সাতটা বেজে চল্লিশের ঘর ছুঁই ছুঁই। বাসায় ঢুকতে ঢুকতেই মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল বসার ঘরে অপেক্ষারত সৌরভের সাথে।
“তুমি কি প্রতি দিনই এমন দেরি করে বাসায় ফেরো?” ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল সৌরভ।
সৌরভের প্রশ্ন, জিজ্ঞেস করার ভঙ্গি কোনোটাই পছন্দ হলো না তনিমার। সেও কঠিন মুখে কাটা কাটা গলায় বলল, “এখানে কেন এসেছ?”
তনিমার আম্মু মমতাজ মহল বিরক্ত হয়ে বলল, “এটা কী রকম কথা বলার স্টাইল তনু?”
“প্রশ্ন যেমন করবে, উত্তরও সেই রকমই পাবে!”
আম্মু কিছু বলতে যাচ্ছিল। সৌরভ বাধা দিয়ে বলল, “আমি দেখছি আন্টি! ওর মনে হয় মন মেজাজ ভালো নেই! আপনি আরেকটু চা দিতে বলেন ওকে!”
আম্মু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেল ভেতরে। কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে সৌরভের সামনে বসতে বসতে বলল তনিমা, “স্পষ্ট করে বল, কী চাচ্ছো তুমি?”
ওর মুখোমুখি বসল সৌরভও, “তুমি আমার সাথে এমন রেগে রেগে কথা বলছ কেন? আমি তো প্রবলেমটা সর্ট আউট করতেই চাচ্ছি!”
“সেটাই তো আমি বুঝতে পারছি না, কেন? আমার কাছে তো তোমার কোনো দায় নেই! তোমার সাথে তো আমার কোনো প্রেম হয়নি। রাত জেগে আমি তোমার সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলিনি। চ্যাট করিনি। রেস্টুরেন্টে বসিনি। তোমার ফ্যামিলি আমার ফ্যামিলিকে পছন্দ করেছিল। দ্যাটস ইট।”
“দেখো, তোমাকে, তোমার পারসোনালিটি আমার পছন্দ হয়েছিল। আর বিয়ে ভাঙলে নেক্সট টাইম তুমি অথবা তোমার ফ্যামিলি কিছু হলেও প্রবলেম ফেস করবে। আমার মনে হয়েছে তুমি অনেস্ট। তুমি যদি অনেস্টলি আমাকে বল যে তোমার এর আগে অন্য কোথাও কোনো পছন্দ ছিল না, তাহলে আমি আমার বাসায় কথা বলতে পারি…”
“সেটা করতে আমার মন সায় দিচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে এভাবে যদি বিয়ে হয় তাহলে তোমার ফ্যামিলির সাথে স্টে করতে আমার প্রবলেম হবে!”
“এটাই কি তোমার শেষ কথা?”
তনিমা জোর দিয়ে বলল, “হ্যাঁ!”
“তাহলে তো আর বলার কিছু থাকে না।”
“না। আর বলার কিছুই থাকে না।”
“আমি চললাম তাহলে।”
“যাও।”
সৌরভ বেরিয়ে যাওয়ার পথে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল মমতাজের সাথে। মমতাজ তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, “কোথায় যাচ্ছ?”
“আন্টি, তনিমা বোধ হয় কোনো কারণে বিয়েটা করতে চাচ্ছে না। ঠিক আছে, আমি চললাম। আপনাদের সাথে পরিচয় হয়ে ভালো লাগল। ভালো থাকবেন।”
“তনু, এসব কী ধরণের কথা? সব গেস্ট বলা হয়ে গেছে…”
“গেস্টদের মানা করে দাও!”
“কমিউনিটি সেন্টারের বুকিং…”
চুপ করে রইল তনিমা। সৌরভ বলল, “আন্টি আমি যাচ্ছি!”
“এক মিনিট। তনু, তুই যদি এখনো বাগড়া বাধাস তাহলে আমি বুঝব সত্যি সত্যিই তোর অন্য জায়গায় সম্পর্ক ছিল!”
“আম্মু!” চিৎকার করে উঠল তনিমা, “তুমি জানো আমি মিথ্যা বলি না!”
“তাহলে কী সমস্যা তোর? একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, সৌরভ সেটা ঠিক করতে চাচ্ছে, এখানে তোর প্রবলেম কী?”
“আম্মু তুমি কি কিছুই বুঝতে পারছ না? এভাবে জোরাজুরি করে উনাদের রাজি করিয়ে পরে যে ওদের বাসায় আমাকে মাথা নিচু করে চলতে হবে না তার কী গ্যারান্টি?”
সৌরভ বলল, “আমি তো বলতে চাচ্ছিলাম, সেটা আমি দেখব! তুমি তো আমাকে সুযোগ দিলে না।”
“তনু, তোর আব্বুর শরীরটাও ভালো না…”
“আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে! আমি রাজি। কিন্তু এরপর কোনো সমস্যা হলে…”
সৌরভ দৃঢ় স্বরে বলল, “বললাম তো, সেটা আমি দেখব!”
একটা শ্বাস ফেলে বলল তনিমা, “ঠিক আছে! তোমরা যা ভালো বোঝো কর। আমি আছি।”
কেন কে জানে, বুকের ওপর চেপে বসা পাথরটা সরল না তনিমার। বিয়ে নিয়ে যত আনন্দ, আগ্রহ, উচ্ছ্বাস, জল্পনা কল্পনা অবশিষ্ট ছিল, তার কিছুই বাকি নেই আর।
·
·
·
চলবে……………………………………………………