আধো আলো ছায়াতে - পর্ব ০৮ - মৌলী আখন্দ - ধারাবাহিক গল্প

          ঊর্মির সাথে তুহিনের পরিচয়টা হয়েছিল অনেক অদ্ভুতভাবে। অফিসে সেদিন পোস্টার প্রেজেন্টেশন ছিল। ঊর্মির পরনে ছিল শাড়ি, হাতে ছিল চব্বিশ ইঞ্চি বাই ছত্রিশ ইঞ্চির পোস্টার। প্রতিদিন বাসে রিকশায় ভেঙে ভেঙে অফিসে গেলেও সেদিন উবার নিয়েছিল, যাতে বেশি হাঁটতে না হয়। 
কিন্তু ভাগ্যের ফেরে উবারের গাড়িটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে খুব দ্রুত হেঁটে গেলেও কমপক্ষে চল্লিশ মিনিট সময় লাগবে। আর শাড়ী পরে তো অত দ্রুত হাঁটা সম্ভবই নয়।
কোনো রিকশা, সিএনজি পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখছিল না ঊর্মি। অথচ আজকের এই প্রেজেন্টেশনের জন্য পাক্কা বিশ দিনের প্রস্তুতি নিয়েছিল সে।
কান্না পেলেও কান্না আটকে শাড়ির কুচি সামান্য ওপরে তুলে এক হাতে পোস্টার আরেক হাতে শাড়ির কুচি ধরে হাঁটার প্রস্তুতি নিয়ে হাঁটা শুরু করতে যাবে এমন সময় ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল তুহিনের বাইক। হেলমেটের ঢাকনা তুলে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, “কোথায় যাবেন?”
ধড়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল ঊর্মি, “আপনি কি পাঠাও?”
“সেই রকমই! যাবেন কোথায়?’
অফিসের ঠিকানা বলার পর ঠিক বিশ মিনিটে ওকে নামিয়ে দিয়েছিল তুহিন। ভাড়া কতো হয়েছে জিজ্ঞেস করায় বলেছিল, “আড়াইশ টাকা!”
পার্সে থাকা দুশ টাকার দুটো নোটই ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঊর্মি বলেছিল, “থ্যাংক ইউ!”
“আচ্ছা, আপনার ভাড়া তো এত না! আড়াইশ দিলেই চলবে!”
“আমার কাছে ভাঙতি নেই! রেখে দেন আপনি।”
“আমি বকশিস নেই না!”
“ধ্যাত্তেরি, আমার লেট হয়ে যাচ্ছে, সময় নেই!”
পেছন থেকে তুহিনের ডাকে কর্ণপাত না করে ছুটে ভেতরে চলে গিয়েছিল ঊর্মি। অনুষ্ঠান শুরু হতে দশ মিনিট বাকি ছিল তখনো।
কিছুক্ষণ পর স্ন্যাক্স ব্রেকে স্যান্ডউইচ আর কফি নিতে স্ন্যাক্স কর্নারে এসে দাঁড়ানোর পর তাদের বয়সী এক লোক ঊর্মির দিকে দেড়শ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এই যে আপনার ভাঙতি!”
ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল ঊর্মি। “আমার ভাঙতি মানে?”
আকর্ণবিস্তৃত হাসি হেসে বলেছিল লোকটা, “মনে নেই? কিছুক্ষণ আগে পাঠাওতে করে আসলেন যে?”
হাসবে না কাঁদবে ভেবে পেল না ঊর্মি।
লোকটা হাসিমুখে বলে যাচ্ছে, ‘আসলে হেলমেট পরে থাকলে চেহারা অন্য রকম মনে হয়!”
“আপনি এই ভাঙতি ফেরত দেওয়ার জন্য সাড়ে চার ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছেন?”
“না, আসলে প্রোগ্রামটা ভালোও লাগছিল!”
“সত্যি? প্রোগ্রাম দেখছিলেন আপনি?”
“হ্যাঁ, খুব ইন্টারেস্টিং টপিক তো!”
“আর আপনার পাঠাও ড্রাইভিং? সময় নষ্ট হচ্ছে না আপনার?”
“না তো!”
“কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে এই প্রোগ্রামের কথা?”
কাঁধ ঝাঁকাল লোকটা। “আপনার হাতে দেখলাম পোস্টার। পরনে শাড়ী। দেখে মনে হচ্ছিল প্রতিদিন শাড়ী পরে অভ্যাস নেই। নিশ্চয়ই প্রোগ্রামের জন্য পরেছেন। টাকা ভাঙতি করে নিয়ে এসে নিচে রিসেপশনে দেখলাম ডিরেকশন। চারতলায় পোস্টার প্রেজেন্টেশনের প্রোগ্রাম হচ্ছে। ভিজিটর কার্ড নিয়ে লিফটে করে চারতলায় উঠে চলে এলাম। খুব বেশি অসুবিধা হয়নি কিন্তু!”
“আপনি অদ্ভুত!”
“আপনার প্রেজেন্টেশন সুন্দর হয়েছে কিন্তু!”
“সত্যিই বলছেন?”
“হ্যাঁ! আপনার শেষ হয়ে গেলে চলুন বাসায় নামিয়ে দিই?”
চোখ সরু করে বলেছিল ঊর্মি, “আপনার ব্যাপারটা কী বলুন তো?”
“তেমন কিছু না।”
“আমি তো এখন যাব না। লাঞ্চের পর জাজ প্যানেল কমেন্ট করবেন। মার্কিং করবেন। ফিডব্যাক দেবেন। প্রাইজ গিভিং সিরেমনি আছে। পার্টিসিপ্যান্টদের জন্য সার্টিফিকেট আছে।”
“বাপরে এত কিছু ফেলে যাবেন কীভাবে?”
“আপনি কি আমার সাথে ফাজলামি করছেন?”
“মোটেও না! আচ্ছা লাঞ্চের ব্যবস্থা কি ভিজিটরদের জন্যেও থাকবে?”
ঊর্মি শীতল স্বরে বলেছিল, “আপনি যদি এখনই এই মুহূর্তে বেরিয়ে না যান। আমি সিকিউরিটি গার্ড কল করে আপনাকে বের করে দিতে বাধ্য হব!”
“আরে কী আশ্চর্য! নাহয় আমি আপনাদের মতো এত শিক্ষিত না। নাহয় পাঠাও চালাই। তাই বলে আমার কি দুইটা ভালো ভালো কথা শোনারও অধিকার নাই?”
বিশ মিনিটের স্ন্যাক্স ব্রেক শেষ হয়ে গিয়েছিল তখন। লোকটার দিকে শেষ বারের মতো বিষ দৃষ্টি হেনে নিজের জায়গায় অর্থাৎ নিজের পোস্টারের সামনে ফিরে গিয়েছিল ঊর্মি।
রানার্স আপের পুরস্কার পেয়ে মনটা সামান্য খারাপ হয়ে গেলেও মুখে প্লাস্টিক হাসি ঝুলিয়ে রেখে ফটোসেশনের পালা শেষ করে নিচে নেমেছিল ঊর্মি। গেট দিয়ে বের হয়ে খালি রিকশার সন্ধানে এদিক সেদিক তাকাতেই পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল তুহিনের বাইক।
‘আপনি!”
“বললাম যে, প্রোগ্রাম শেষ হলে নামিয়ে দেবো?”
এবার সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গিয়েছিল ঊর্মি। কে এই লোক?
কোনো বদ মতলবে পিছু নেয়নি তো?
“দেখুন, এবার কিন্তু আমি সত্যি সত্যিই সিকিউরিটি ডাকব!”
ঠিক সেই সময় ফিন্যান্সের হারুন ভাই ডেকেছিল পেছন থেকে, “আরে, তুই যাসনি এখনো?”
লোকটা হাসিমুখে বলেছিল, “না, আপুটার সাথে আলাপ করছিলাম!”
“পরিচয় হয়েছে?” বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল হারুন ভাই, “ঊর্মি আপু, ও হচ্ছে আমার ফ্রেন্ড তুহিন! আর তুহিন, উনি হচ্ছেন আমাদের এসেট ঊর্মি আপু।”
ঊর্মি হতভম্ব হয়ে বলেছিল, “মানে?”
“মানে, আমি আজকে ওকে দাওয়াত করেছিলাম। ওর সাথে আমার একটা কাজও ছিল ছোটোখাটো। ও আবার আজকে ছাড়া ফ্রি ছিল না। তাই…”
“ছি ছি, আমি উনাকে…”
তুহিন বাধা দিয়ে বলেছিল, “ভিলেন মনে করেছিলেন, তাই তো?”
হারুন ভাই সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিল, “কী করেছিলি তুই ঊর্মি আপুর সাথে?”
“কিছুই না! একেবারেই কিচ্ছু না! প্রমিস!”
“তাহলে একটা মানুষ শুধু শুধু ভিলেন মনে করতে যাবে কেন আরেকজনকে?”
“তার আমি কী জানি? নারীর মন…”
ঠিক এই মুহূর্তে একটা খালি রিকশাকে এদিকেই এগিয়ে আসতে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল ঊর্মি। “আচ্ছা, আজকে চলি?”
বিদায় নিয়ে রিকশাটায় উঠে পড়েছিল ঊর্মি দরদাম না করেই। বাসায় ফিরে এসে ওর নোটবুকের ভেতর খুঁজে পেয়েছিল একটা ছোট্ট চিরকুট।
“আমার নাম্বার ০১………
কখনো পাঠাও রাইড লাগলে স্মরণ করবেন।”
চিরকুট পড়ে হেসে ফেলেছিল ঊর্মি। ফেলে দিতে গিয়েও কী মনে করে তুলে রেখেছিল একটা মোটা বইয়ের ভেতর।
কখনো ওই নাম্বারে কল দেবে বলে ভাবেনি ঊর্মি। কিন্তু দিতে হলো।
প্রায় সাড়ে চার মাস পর। কী একটা কারণে যেন শহরজুড়ে অবরোধ চলছিল সেদিন।
শেষ হয়ে গিয়েছিল আব্বুর ইনহেলার। ইনহেলার এমন একটা জিনিস, পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার আগে থেকে টের পাওয়া যায় না।
বাসার কাছের ফার্মেসি থেকে কিনতে গিয়ে বিফল হয়ে ফিরেছিল ঊষা। নিচে নেমে কোনো খালি রিকশা পায়নি ঊর্মি।
উবার, পাঠাও কোনো এপে কোনো রাইডার আসতে রাজি হচ্ছিল না এদিকে। অগত্যা ব্যর্থ মনোরথে আবার বাসায় ফিরে এসে শুকনো মুখে বসেছিল ঊর্মি।
তখন চোখ পড়েছিল বুক শেলফে রাখা মোটা বাংলা অভিধানটার দিকে। খানিকক্ষণ দ্বিধা করে তারপর কল করেই ফেলেছিল নাম্বারটাতে।
আর কী আশ্চর্য, একবার কল করতেই রাজি হয়ে গিয়েছিল তুহিন। নিয়ে গিয়েছিল ঊর্মিকে লাজ ফার্মায়।
এরপর অনেক দিন ধরে ভয়ে ভয়ে কাটিয়েছে ঊর্মি, তুহিন তার নাম্বার জেনে রাত বিরাতে বিরক্ত করে কিনা ভেবে।
কিন্তু ঊর্মির যাবতীয় আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণিত করে দিয়ে রাতে তো দূর, সকাল দুপুর বিকাল সন্ধ্যা কোনো সময়ই ওকে আর কল করেনি তুহিন। বরং ঊর্মিই উচাটন মনে বার বার ভেবেছে তুহিনকে কল করার কথা।
তৃতীয়বার কথা হয়েছিল ঊর্মির জন্মদিন উপলক্ষ্যে। জন্মদিনে অফিসে মোমো খাইয়েছিল ঊর্মি।
লজ্জা দ্বিধা একপাশে সরিয়ে রেখে আগের দিন কল করে বলেছিল তুহিনকে, “কাল আমার জন্মদিন। আপনি আসবেন?”
“কোথায়?”
“আমার অফিসে।”
“আসলে ভালো লাগবে আপনার?”
“জানি না” বলতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জায় ফোনের এপাশে রক্তিম হয়ে উঠেছিল ঊর্মি।
“না জানলে আমি আসব না যে?”
এবার স্পষ্ট করেই বলেছিল ঊর্মি, “হ্যাঁ, ভালো লাগবে! আসুন!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp