আলতা রাঙা - পর্ব ০৩ - জান্নাত মায়া - ধারাবাহিক গল্প

- 'অনেক তো ধৈর্য ধরেছি, আর কত ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে? অপেক্ষা করছি। খাইয়ে দাও।'

শুভ্রা হতবাক। চোখ তুলে তাকাতেই আবারও সেই তীক্ষ্ণ চোখের সম্মুখীন হয়। অদ্ভুত নেশায় আচ্ছন্ন চোখগুলো যেন এক অচিন ভাষা বক্ত্য করছে। সে ভাষা তার অজানা। মাত্র কয়েক ইঞ্চির ব্যবধানে প্রভবের উতপ্ত নিশ্বাসগুলো শুভ্রার সমস্ত মুখে আছড়ে পড়ছে। তবে সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল না দিয়ে সে সরল মনে বলে উঠল,

- 'আপনারে খাওয়ামু কেন? আপনে কেডা?'

প্রভব এবার বাকরূদ্ধ। কয়েক মুহুর্ত স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দু'পা পিছিয়ে গিয়ে দমফাটা হাসিতে মেতে উঠল। ভারি রহস্যময় সে হাসি। এদিকে, শুভ্রা কেবলার মতো অবাক চোখে সে হাসি উপভোগ করছে। এতো সুন্দর কারো হাসি হতে পারে তা আগে জানা ছিল না। প্রভব তার হাসি থামিয়ে আবারও শুভ্রার পানে চাইল। যে কিনা তার হাসিতেই মগ্ন। প্রভব রসিকতা করে বলল, 

- 'যাকে ঔষধি খাওয়াতে এসেছো তাকেই চেনো না?'

প্রভবের প্রশ্নে শুভ্রা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। আসলেই তো! যাকে ঔষধি খাওয়াতে এসেছে, তাকেই তো সে চেনে না। প্রশ্নের উত্তরে সে আমতা আমতা করে বলল,

- 'না মানে, ছোট বাবু তো আমাগো গেরামে বেশি আহে না। হের লেইগ্যা....'

প্রভব ঠোঁট চেপে হাসল। আজকাল কার সময়ে এমন সরল মেয়েও হয়! নিজের অজান্তেই ভাবছে সে। ভাবতে ভাবতে রকিং চেয়ারের পাশে ধূসর রাঙা রেলিঙে হেলান দিয়ে শুভ্রার দিকে শীতল চোখে তাকালো। মাথা সামান্য বামে কাত করে রাশভারী কন্ঠে জানালো,

- 'আমি-ই তোমার সেই ছোট্ট বাবুটা।'

ওমনি শুভ্রার চোখ বিষ্ময়ে ছানাবড়া। আকাশ থেকে পড়ল যেন। শুভ্রার এমন হতবাক চাহনি দেখে প্রভব আবারও ঠোঁট চেপে হাসছে। শুভ্রা নড়েচড়ে দাঁড়ালো। আশেপাশে সতর্ক চোখ বুলিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়ালো,

- 'আসলেই?'

শুভ্রার সরলতা দেখে প্রভব মুগ্ধ। প্রশ্নের উত্তর স্বরূপ চোখের ইশারায় সম্মতি জানালো। পরক্ষণে সে কিছু একটা বলার জন্য উদ্বুদ্ধ হতেই পাশে থেকে অপরিচিত কারো উৎসুক কন্ঠ ভেসে এলো,

- 'আরে মামা.. কে এই শ্যামকণ্যা মায়াবতী?'

মুখে বাঁকা হাসি নিয়ে খোলা বারান্দার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে আরেক যুবক। শুভ্রা আগন্তুকের দিকে একবার চেয়ে দেখল। বলিষ্ঠ লম্বা চওড়া দেহধারী মুখে অদ্ভুত ধরনের হাসি তার সুবিধার ঠেকলো না। সে চটজলদি প্রভবের দিকে তাকালো। মুহূর্তেই খেয়াল করল প্রভবের মুখ ভঙ্গিমায় গুরুতর পরিবর্তন। কিছুক্ষণ পূর্বের হাস্যউজ্জ্বল মুখে ভয়াবহ গম্ভীধার্য ভাব। শক্ত চোয়াল তলোয়ারের ন্যায় ধারালো দেখাচ্ছে। তীক্ষ্ম চোখজোড়া তীক্ষ্ণতর রূপ ধারণ করেছে। প্রভব আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

- 'কি চাস?'

আগন্তুক তার ত্রিশ পাটি দাঁত কেলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। হাতে আধুনিক নকশা করা একটা কাঁচের গ্লাস। গ্লাসে এক ধরনের রঙিন তরল পানীয় যা প্রতি পদক্ষেপে ঢেউ খাচ্ছে। আগন্তুক ভাবলেশহীন ভঙ্গিমায় হেলেদুলে শুভ্রার ঠিক পাশ ঘেঁষে হেঁটে এলো। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে শুভ্রা মৃদু কেঁপে উঠেছে। যা প্রভবের চোখ এড়ালো না। তবুও সে নিজেকে শিথিল রাখলো। আগন্তুক শুভ্রার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কুৎসিত হাসল। এরপর শুভ্রার দিকে হাত এগোতে এগোতে কামুক গলায় বলল,

- 'তোদের গ্রামে এমন মায়াবতীর বাস আগে বলবি না? আগে জানলে তো তুলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে আসতাম....'

কথা শেষ হওয়ার আগেই গগন কাঁপানো শব্দে আগন্তুকের গালে কষা এক চড় স্থান পেল। যার ফলস্বরূপ সে ছিটকে মেঝের উপড় পরেছে। চোখের সামনে এমন হঠাৎ আক্রমণে আঁতকে ওঠে শুভ্রা। আতঙ্কে হাত থেকে বাটি পড়ে গিয়ে ঝনঝন আওয়াজ তোলে। মুহুর্তেই হন্য হয়ে ছুটে এলো আরও এক যুবক। 

চড়ের প্রকট আওয়াজ আর ঝনঝন শব্দে উপস্থিত সকলের গায়ে কাঁটা দিলেও প্রভব ঠায় দাঁড়িয়ে। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে তার। রাগান্বিত চেহারায় রক্তিম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেঝেতে ছিটকে পরা ব্যক্তিকে পিষে মারছে।

শ্যামলা গড়ন, লম্বা দেহধারী, কালো শার্ট পরনে দৌড়ে আসা যুবকটি হলো শেখর আনসারি। সে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কপালে ভাঁজ ফেলল। বাটিটা এখনো মেঝের উপড় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার পাশেই গালে হাত দিয়ে বেসামাল হয়ে পড়ে আছে রিয়াদ। শেখর প্রশ্ন করল, 

- 'কি হয়েছে প্রভব? রিয়াদ কি করেছে?'

প্রভব প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। সে সোজা শুভ্রার দিকে তাকালো, যে কিনা আতঙ্কিত ভঙ্গিমায় মাথা নিচু করে কাঁচুমাঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো ঔষধি ফেলে দেওয়ার ভয়। হয়তো কারো বিশ্রী স্পর্শ গায়ে লাগার আতঙ্ক। প্রভব চোখ বন্ধ করে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত করে নিল। লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

- 'বাড়ি যাও, পরে আবার ঔষধি নিয়ে এসো।'

শুভ্রা মাথা তুলে তাকালো। চোখে পানি টলমল করছে। সে বেশ বুঝতে পারছে জমিদার নাতি রেগে আছে। তবে তার সরল মন বুঝতে পারলো না যুবকের রাগান্বিত হওয়ার কারণ। এটা কি রাগ নাকি বিরক্ত। ঔষধি নষ্ট করার জন্য সে কি বিরক্ত? সে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই মাথা কাত করে সম্মতি জানিয়ে দৌড়ে পালালো। থমথমে পরিবেশ। শুভ্রার প্রস্থানের পর কেউ একটা টু শব্দ করেনি। রিয়াদ মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালো। রাগে গজগজ করছে। সে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

- 'ওই দুই পয়সা মেয়ের জন্য তুই আমাকে চড় মারলি....'

ফের একবার বাক্য শেষ হবার আগেই প্রভব রিয়াদের গলা চেপে ধরল। শেখর এগিয়ে এসে প্রভবের পাশে দাঁড়াল। কিন্তু প্রভবকে থামানোর চেষ্টা করলো না। সে জানে তার চেষ্টা বৃথা যাবে। 

- 'মুখ সামলে কথা বল। ওর জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও, আমি তোকে ঠিক এভাবেই চড় মারতাম। তুই আমার সামনে একটা মেয়ের দিকে নোংরা হাত বাড়িয়েছিস, তোকে আমি সামান্য চড় মেরে ছেড়ে দিয়েছি এটাই তোর সাত জন্মের ভাগ্য!'

প্রভব হুহুঙ্কার স্বরূপ বলে গলা ছেড়ে দিল। ছাড়া পেয়ে রিয়াদ অনর্গল কাশছে। সেদিকে বিশেষ খেয়াল না দিয়ে প্রভব চলে যেতে নিল, কিন্তু হঠাৎ পথিমধ্যে পা থমকে দাঁড়ালো। তবে পেছনে ফিরল না। কেবল স্থির দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে আওয়াজ তুলল,

- 'মেয়েটি আমার রক্তে মিশে আছে, আমার অংশস্বরূপ। সে কারো না। এমনকি, স্বয়ং নিজেরও না। সে আমার রক্তজবা। তার প্রতিটি হৃৎস্পন্দনের উপড় শুধুমাত্র আমারই অধিকার। তাই সময় থাকতে সুধরে যা, চৌধুরী প্রভব আহসান তার রক্তজবার দিকে বাড়ানো পাপী হাতগুলো দেহচ্যুত করতে দ্বিতীয় বার ভাববে না। আশা করি তোরা এটা ভালো করেই জানিস।'

প্রভব স্পষ্ট বাক্যে কথাগুলো বলে গম্ভীধার্য মুখ নিয়ে হনহনিয়ে বেড়িয়ে গেল। প্রভবের প্রস্থানের পর, রিয়াদের পাশে দাঁড়ানো যুবকটি তার গলায় আটকে থাকা অদৃশ্য কাটাটি লম্বা নিশ্বাসের মাধ্যমে ঝেরে ফেলল। নিজের কাশি নিয়ন্ত্রণে এনে রিয়াদ গর্জে উঠল,

- 'দেখেছিস শেখর! দুই পয়সা রাস্তার মেয়ের জন্য প্রভব আমার গায়ে হাত তুলল। এই রিয়াদ তালুকদারের গায়ে!'

রিয়াদ রাগে রীতিমত কাঁপছে। প্রভবকে কিছু বলতে না পারলেও এবার আর নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সামনে থাকা রকিং চেয়ারে এক লাথি মেরে বসল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেখর রিয়াদকে ঠান্ডা মাথায় দেখছে। একেই বলে "বাঘের গর্জন, কাজের বেলায় মিয়াঁও"। রিয়াদকে দেখে কিছুটা ওমনই লাগে। প্রভবের সামনে কিচ্ছুটি করতে না পারলেও, পেছনে হুহুঙ্কার ঠিকই ছাড়বে। সে কাঠ কাঠ গলায় পাল্টা বলল,

- 'রাস্তার মেয়ে কাকে বলছিস? যাকে চিনিস না, তার সম্পর্কে বাজে বকিস না। যা করতে এসেছিস তাই কর। প্রভবকে তো চিনিস-ই। শুধু শুধু মেয়ের পাল্লায় পরে নিজেকে ঝামেলায় জড়াস না। প্রকৃতি উপভোগ করে বিদায় হ, মেয়ে উপভোগ করতে যাস না।'

রিয়াদের কাঁধ স্পর্শ করে সান্ত্বনা দিয়ে শেখরও চলে গেল। পুরো বারান্দা জুড়ে নিস্তব্ধতা। মাথা উপর খোলা আকাশ। ঝিরিঝিরি বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছে। রিয়াদ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে মেঝেতে লেপ্টে থাকা ঔষধির দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর একাই বিড়বিড়িয়ে বলল,

- 'এই অপমানের মাশুল তোমাকে দিতে হবে মায়াবতী, তৈরি থেকো।'

রাগে তার গায়ে জ্বালাপোড়া করছে। প্রভবকে কিছু না করতে পারলেও, তার সহজ সরল গেয়োভূত রক্তজবার গায়ে কালি মাখাতে বেশি পরিশ্রম হওয়ার কথা না। ভাবতেই সে কুৎসিত হাসিতে মেতে উঠল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp