চিরপরিচিত এক রমণীর চিৎকার কানে যেতেই নিজ চলমান সাইকেলের চাকা থামালেন পোস্ট মাস্টার কাশেম সরকার। সাইকেলে বসেই সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন ফিরে তাকালেন। বাসন্তী রঙের শাড়ি পরিহিতা এক অষ্টাদশী ধেয়ে আসছে তারই পানে। খালি পায়ে গাঢ় আলতার প্রলেপ। হাতে কাঁচের চুড়ি। কোমর সমান লতানো খোলা চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো উড়ছে। হাতের চুড়ি প্রতি পদক্ষেপে ঝনঝন আওয়াজ তুলে মাতাচ্ছে গোধূলির আঙ্গিনা। মেয়েটা দৌড়ে এসে সাইকেলের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়ালো। তাকে দেখে কাশেম মাস্টার প্রাণবন্ত হেসে শুধালেন,
- 'কিরে শুভ্রা, তুই আমার পেছন পেছন এমনে দৌড়াইতেছিস ক্যান?'
শুভ্রা হাঁপাচ্ছে। অনেকক্ষণ যাবত দৌড়ানোর ফলস্বরূপ শ্বাসের গতি বেড়েছে। বুক ধুকপুক করছে অনবরত। বার কয়েক লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে শিথিল করল সে। তারপর অভিমানী কন্ঠে আওড়ালো,
- 'কিগো কাশেম চাচা, তুমি আইজ আমার চিঠি না দিয়াই চইল্লা যাইতাছো?'
রমণীর ডাগর ডাগর চোখগুলো সুপ্ত অভিমানে পরিপূর্ণ। এখনি কেঁদে ফেলবে ভাব। মেয়েটা বড্ড অভিমানী। কাশেম সরকার মুচকি হেসে বললেন,
- 'আরে বাঁদর মাইয়া, এমনকি কহনো হইছে যে আমি তোর চিঠি না দিয়াই চইল্লা গেছি?'
- 'তাইলে আইজ দিলা না যে?'
- 'আইজকা তোর নামে কোনো চিঠি আহে নাই। হের লেইগ্যা দেই নাই'
শুভ্রা অবুঝ দৃষ্টিতে পোস্ট মাস্টারের পানে চেয়ে আছে। বুকে তোলপাড়। কেউ যেন স্বজোড়ে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। চিঠি আসেনি? এমনটা তো হবার কথা না। কাশেম সরকার অযৌক্তিক রসিকতা করার মানুষ নন। তবুও তিনি এমনটা কেনো বললেন, সে বিষয় শুভ্রার বোধগম্য হলো না। সে নিজের মনকে আশ্বস্ত করে আবারও দৃঢ় কন্ঠে বলল,
- 'ইয়ারকি কইরো না গো চাচা, চিঠিডা দেও দেহি।'
কাশেম সরকার মলিন হাসলেন। তিনি সত্যিই আজ শুভ্রার নামে কোনো চিঠি পাননি। তবে, এই অবুঝ মেয়েকে এখন কিভাবে বুঝাবেন সেটাই ভাবছেন। তিনি শুভ্রার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে স্নেহভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,
- 'আমি জানি প্রতি সাপ্তায় তোর চিঠি আয়। কিন্তু বিশ্বাস কর, আইজ সত্যিই তোর নামে কোনো চিঠি আহে নাই।'
শুভ্রার মন খারাপ হয়ে গেল। মন কেমন যেন বিষিয়ে আসছে। চারিদিকে বিষন্নতা ঘিরে ধরেছে তাকে। শুভ্রার এলোমেলো মন আর মলিন চেহারা কাশেম মাস্টারের চোখ এড়ালো না। তিনি শান্তনা দিয়ে বললেন,
- 'মন খারাপ করিসনে পাগলি, হইতে পারে ব্যস্ত আছে।'
শুভ্রা জোরপূর্বক হাসল। চোখে জমেছে সুপ্ত অভিমান। সে মাথা হালকা কাত করে সায় জানালো। তারপর শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় দিয়ে, ফের হাঁটা ধরল বাড়ির পথে।
—————
তিন মাস পূর্বে। রাত্রি প্রহর। ঘন কালো মেঘে আচ্ছাদন জগৎ ধাত্রী। কিছুক্ষণ আগেই মুশলধার বৃষ্টি হচ্ছিল। বর্ষার সমাপ্তি আর শরৎ আগমনের পূর্বাভাস। এখনো ঝিড়ি ঝিড়ি বর্ষণ গায়ে কাটা দেওয়া হিমশীতল অনুভূতির কারণ হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে বৃষ্টি যেন চারিদিকে আমাবস্যার চাদর মেলে দিয়েছে। এমন সময় হঠাৎ,
- 'ডাক্তার দাদা, আরে ও ডাক্তার দাদা? ঘুমাইয়া গেছেন নি?'
উত্তেজিত কন্ঠে কারো ডাকা ডাকির শব্দ শুনে পুরনো টিনের দ্বোচালা ঘর থেকে একজন প্রৌঢ়বয়সী বেরিয়ে দোরগোড়ায় দাঁড়ালেন। মুখে সাদা পাক দাড়ি। গায়ে গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরিহিত। হাতে হারিকেনের হলদেটে আলোয় মুখাবয়ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। উঠোনে গলায় গামছা পেঁচানো এক যুবককে চিনতে পেরে বৃদ্ধ উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
- 'কিরে মনা, কি হইছে রে? এই রাইতের বেলা তুই এইহানে কি করস?'
- 'আসলে হইছে কি দাদা, জমিদার বাড়ির নাতি হেগো বন্ধু বান্ধব লইয়া শহর তে বেড়াইতে আইছে। খোলা মেলা পুহুইর পাইয়া গত কাইল উনারা মেলা ডুবাইছে। মানা করছিলাম কিন্তু কেডা শোনে কার কতা! পুহুইরে ডুবাইয়া অহন জমিদার নাতি কিছু খায় না, গাও মেলা গরম। কি হইছে বুঝতাছি না। গিন্নিমাও বাড়ি নাই। হের লেইগ্যা এই রাইতে আপনের ধারে আইলাম। আপনে যদি যাইয়া একটু দেখতেন, উনার কি হইছে। আপনে ছাড়া তো এই গেরামে ভালা কোনো ডাক্তার কবিরাজ নাই।'
গলার স্বর খাঁদে নামিয়ে খানিক চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলে শেষ করল মনা। হাতে টর্চলাইট। মুখে সহসা চিন্তার রেশ। কপাল জুড়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা আর ঘামের কণা মিলেমিশে একাকার।
- 'আইচ্ছা খাঁড়া এইহানে। আমি আমার পোটলা লইয়া আইতাছি।'
বৃদ্ধ ঘরের ভেতরে গিয়ে তার ডাক্তারি ব্যাগ হাতে নিলেন। পাশের রুমের টিনের দরজা আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্রা। সরল চোখে নিজ দাদুকে পর্যবেক্ষণ করছে। একটা সাদা কুর্তা গায়ে চেপে ব্যাগ হাতে দাদুকে বেরিয়ে যেতে দেখে, শুভ্রা ব্যস্ত কন্ঠে শুধালো,
- 'দাদু? কই যাও?'
বৃদ্ধ পেছন ফিরে তাকালেন। তারপর মোলায়েম কন্ঠে বললেন,
- 'জমিদার নাতির বলে অসুখ। মনা আইছে। যাইয়া দেইখ্যা আই গিয়া। তুই দুয়ার লাগাইয়া দিস, আমি ডাক না দিলে খুলবি না।'
উত্তরে শুভ্রা মাথা নাড়ালো। বৃদ্ধ তার ব্যাগ হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করলেন। সেদিন রাতে বৃদ্ধ বাড়ি ফেরেন নি। শুভ্রার মা-বাবা মারা যাবার পর, সে তার দাদুর সাথে এই পুরানো বাড়িতে একা থাকে। রেঁধে খেয়ে হাসি খেলায় পার হচ্ছে তার একাকী জীবন।
—————
পরদিন সকাল। আকাশে একরকম ধোয়া ধোয়া স্বচ্ছতা। চারপাশের গাছপালায় জলের বিন্দু জমে আছে। পাতার প্রান্তে ছোট ছোট মুক্তোর দানার মতো জমেছে। যা কাঁপছে হালকা বাতাসে। রোদ উঠেছে ঠিকই, তবে সেটা কড়াকড়ি নয়। এমন সময় বৃদ্ধ বাড়ি ফিরলেন। উঠোনে পা রাখতেই জোর গলায় ডাকলেন,
- 'শুভ্রা রে, কই তুই?'
দাদুর কন্ঠ কানের যেতেই উচ্ছ্বসিত নয়নে ধেয়ে আসল শুভ্রা। ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি মেখে আওড়ালো,
- 'দাদু তুমি আইছো! আমি চিন্তায় মইরা যাইতেছিলাম।'
বৃদ্ধ কিঞ্চিৎ হাসলেন। মুখে বললেন,
- 'আরে পাগলি! এত চিন্তার কি আছে। দেখ আমি ছহি ছালামত বাড়ি ফিরছি।'
দাদুকে দেখে শুভ্রার বুক চিঁড়ে এক চিলতে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। সে ব্যস্ত হাতে বৃদ্ধের কাঁধের ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
- 'জমিদার নাতির কি খবর দাদু?'
বৃদ্ধ হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘামের কণা মুছে নিলেন। উঠোনে রাখা বেতের মোড়ায় বসতে বসতে বললেন,
- 'আর বলিসনে, পুহুইরে ডুবাইয়া জ্বর বাঁধাইছে। ঔষুধি বানাইতে হইব। তুই একটু যাইয়া দিয়া আবি। এই শরীর লইয়া বারে বারে দৌড় কুলায় না।'
শুভ্রা আবারও বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। ব্যাগ নিয়ে ঢুকে গেল ঘরের ভেতর। এরপর হাতে পানির গ্লাস ও বাটিতে করে খুরমা নিয়ে বেরিয়ে এল। বৃদ্ধের দিকে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
- 'লও পানি খাও দেহি, হয়রান হইয়া গেছো একেবারে।'
বৃদ্ধ হাসিমুখে পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে একটানে সবটুকু পানি পান করে ফেললেন। শুভ্রা এবার বাটিটা এগিয়ে দিল। বৃদ্ধ কয়েকটা খুরমা হাতে নিয়ে শুভ্রার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে, চলে গেলেন ঔষুধি বানাতে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………