আধো আলো ছায়াতে - পর্ব ১০ - মৌলী আখন্দ - ধারাবাহিক গল্প

          আজকে তনিমার মেহেদি অনুষ্ঠান। তনিমার আব্বু তফাজ্জল সাহেবের কাছে এসব অনুষ্ঠান আদিখ্যেতা বলে মনে হলেও একমাত্র মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে কোনো কমতি রাখতে চাননি তিনি।
বাড়ির কাছের কমিউনিটি সেন্টারে বুকিং দিয়ে রেখেছিলেন অনেক দিন আগেই। বাড়ির কাছের কমিউনিটি সেন্টার বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবার অবকাশ নেই।
এর সুনাম আছে ভালোই। তারপরেও দুশ্চিন্তা তো থেকেই যায়।
সৌরভ তার বাসায় কী বলে কীভাবে রাজি করিয়েছে জানা নেই, তবে একটা থমথমে ভাব রয়েই গেছে। ওদের বাসা থেকে সকালেই ড্রাইভার এসে দিয়ে গেছে মেহেদির ডালা, সেখানে চারটা টিউব মেহেদি, সৌরভের পরিবারের সাথে গিয়ে তনিমার নিজের পছন্দ করে কেনা হলুদ রঙের জামদানি শাড়ি, কাচের চুড়ি, আলতা থেকে শুরু করে মেহেদি গাছের পাতা পর্যন্ত আছে।
তবে সৌরভের বাসা থেকে ওর ছোটো ভাই সৌমিক আর বোন সৌমির আসার কথা ছিল বন্ধু সহ, ওরা জানিয়েছে আসতে পারবে না অথবা আসবে না। বোঝাই যাচ্ছে এ বিয়েতে মন থেকে সায় নেই কারো।
শুধু সৌরভের কথা রাখতেই হচ্ছে এই বিয়ে। শুধু তনিমা নয়, সেই পাষাণভারটা চেপে বসেছে তফাজ্জল সাহেবের বুকের ওপরও।
গতকাল অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিল তনিমা। গ্রুপ এসাইনমেন্টের জন্য কাজ এগিয়ে রেখেছে। আজ ঘুম থেকে উঠেছে বেলা করে।
সাধারণত এমন সময়ে হবু বড় কনে রাত জেগে চ্যাটিং করে, কথা বার্তা বলে। সেই সব কথায় আসন্ন অনুষ্ঠানের উত্তেজনা থাকে, অনাগত জীবনের জন্য আগ্রহ ও আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা থাকে।
কিন্তু তনিমার পক্ষ থেকে এমন কোনো আগ্রহ বা উৎসাহ অবশিষ্ট ছিল না আর। বারোটা চল্লিশের দিকে সৌরভ একবার মেসেজ করেছিল বটে।
“ঘুমিয়েছ?” সেই মেসেজের উত্তরে কিছু লিখতে ইচ্ছে করেনি বলে মেসেজটা সিন করেনি তনিমা।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে চারটা মিসড কল উঠে আছে সৌরভের। জরুরি কিছু হবে মনে করে তড়িঘড়ি কল ব্যাক করল তনিমা।
“হ্যালো” বলতেই বিনা ভূমিকায় প্রশ্ন করে বসল সৌরভ, “গতকাল রাতে অনেক রাত পর্যন্ত অনলাইন ছিলে দেখলাম?’
প্রশ্নের ধরণ শুনেই গা জ্বলে গেল তনিমার। শুষ্ক স্বরে বলল, “হ্যাঁ, কেন?”
“না, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম আর কী! আমার মেসেজ সিন করনি তো!”
“আমি কাজ করছিলাম, আমার গ্রুপ প্রেজেন্টেশনের!”
“ও আচ্ছা!”
“আর কিছু বলবে?”
“নাহ, আর কিছু বলব না!”
“রাখব?”
“হ্যাঁ, রাখো! আচ্ছা শোনো, রেডি হয়ে একটা ছবি তুলে পাঠাবে?”
“কেন?”
“দেখতে ইচ্ছা করছিল আর কী! তোমার তো আর ছবি তুলতে কোনো সমস্যা নেই! নাকি আছে?”
সৌরভের কথায় কি অন্য কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে ছিল? তনিমার সারা গায়ে যেন বিছুটির জ্বলন শুরু হয়ে গেল।
এটা কি কোনো ডাবল মিনিং কথা ছিল, তনিমার তোলা খোলামেলা ছবির প্রতি ইঙ্গিত করে? অথবা স্বাভাবিক কথাকেই তনিমার অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে?
আজকে সকালের নাস্তা ছিল সবজি খিচুড়ি। বেলা করে ঘুম থেকে ওঠার কারণে অল্পই অবশিষ্ট আছে।
খিচুড়ি সবটুকু নিয়ে পাতিলের শেষটুকু চেঁছে পুছে টেবিলে বসল তনিমা। সামনে খোলা ল্যাপটপ।
তুহিন এসে হন্তদন্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, “আপু, আজকে কীভাবে চুল বাঁধবি? খোঁপা করবি? নাকি বেণী?”
তনিমা নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলল, “জানি না…এগুলো নিয়ে চিন্তা করিনি আসলে! কিন্তু কেন?”
“ঊর্মি জানতে চাচ্ছিল! তোর প্রোগ্রামের হেয়ার স্টাইলের থিম কী রকম?”
“আমি আসলে কিছুই ঠিক করিনি!”
“কখন ঠিক করবি?”
“পার্লার থেকে যেভাবে বেঁধে দেবে সেভাবেই বাঁধব! তখন জানিয়ে দেবো!”
ব্যস্ত ভঙ্গিতে আবারও বেরিয়ে গেল তুহিন। অনেক কাজ তার।
বাসার কাজ ছাড়াও ভাইবোন, কাজিনদের সাথে নাচের প্র্যাকটিস আছে। মনে মনে ইচ্ছা আছে ঊর্মিকে সাথে নিয়েও একটা নাচ করার।
ঊর্মি রাজি হবে কিনা কে জানে। গতকাল পর্যন্তও এই অনুষ্ঠান নিয়ে ঊর্মির তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি।
আজকেই আচমকা মেসেজ দিয়ে বলল, “আপুকে একটু জিজ্ঞেস কর না, আপুর চুল বাঁধার থিম কী?”
কিন্তু আপু তো দেখা যাচ্ছে কিছুই ঠিক করেনি। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে নীরস ভঙ্গিতে খিচুড়ি চিবুচ্ছে।
আপুর চিন্তিত মুখ দেখে কে জানে কেন খানিকটা মায়া হলো তুহিনের। নিচু গলায় বলল, ‘আপু, আই এম স্যরি!’
“কেন?”
“একটা অচেনা লোক তোর ওপর ট্রাস্ট রাখতে পারল, কিন্তু আমরা পারলাম না! এট লিস্ট আমার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল যে কী হয়েছিল আসলে!’
মাছি নাড়ার ভঙ্গিতে হাত নাড়ল তনিমা। “আর কিছু বলবি?’
“না।’
“তাহলে এখন ভাগ সামনে থেকে। ব্যস্ত আছি, দেখতে পাচ্ছিস না?”
তুহিনের বোধ হয় আরো কিছু বলার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বলার মতো আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল সে।
আম্মু এসে তাড়া দিয়ে বলল, “এখন আবার ল্যাপটপ খুললি কেন?”
“কাজ ছিল।” সংক্ষেপে উত্তর দিলো তনিমা।
কথা বাড়ানোর ভয়েই ল্যাপটপ বন্ধ করে প্লেটের খিচুড়ি শেষ করে ফেলল চটপট। অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল সাড়ে চারটায়।
তনিমা যখন গোসল সেরে বের হয়েছে তখন ঘড়ির কাঁটা বারোটা বেজে চল্লিশ মিনিটে। কিন্তু মমতাজ মহলের অস্থির লাগছে এখনই।
আম্মুর উপর্যুপরি তাড়ায় শান্ত স্বরে বলল তনিমা, “এখনো অনেক সময় আছে! কফিটা খেয়ে যাই?”
”কফি খাওয়া লাগবে না!”
কিন্তু কথা শুনল না তনিমা। সৌরভের কথাটা শোনার পর থেকেই প্রচণ্ড মাথা ধরেছে তার।
গোসল সেরে সেটা অনেকখানি কমে গেলেও খানিকটা চিনচিনে যন্ত্রণা এখনো আছে। স্ট্রং একটা কফি না খেলে সারবে না এটা।
আম্মু তাড়া দিচ্ছিল বলেই আম্মুকে দেখিয়ে দেখিয়েই কফি মেকারে কফি বানাল তনিমা। ল্যাপটপ ধরতে দেখে আম্মু বিরক্ত হচ্ছিল বলে ইচ্ছে করেই ল্যাপটপ ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে নিল।
সবকিছু গুছিয়ে নামতে নামতে লাগল আরো চল্লিশ মিনিট। ওর কাজিনরা সবাই চলে এসেছে বাসায়, পাশের ঘরে পূর্ণ উদ্যমে প্র্যাকটিস হচ্ছে নাচের।
মমতাজ মহল তনিমার সাথে কাউকে পার্লারে যেতে বলেছিলেন, কিন্তু না করে দিলো তনিমা। ওর এখন কিছুটা মি টাইম প্রয়োজন।
পাশে বসে কেউ বকবক করতে থাকলে হবে না সেটা। গাড়িতে ওঠার পর দীর্ঘদিনের ড্রাইভার একটা গল্প জুড়ে দেওয়ার চেষ্টায় ছিল।
“বিয়ার কইন্যার কি মন খারাপ? মুখে হাসি নাই ক্যান?”
তনিমা রুক্ষ স্বরে বলল, “শামসু ভাই, আমি খুব জরুরি একটা এসাইনমেন্টের কাজ করছি। আপনি কোনো কথা বলবেন না। আমার কনসেন্ট্রেশন নষ্ট হবে।”
“আচ্ছা, বলব না!”
বেশি কড়া হয়ে গেছে ভেবে গলার স্বর নরম করে বলল তনিমা, “আপনি চাইলে গান দিতে পারেন।”
“কোন গান দিব আপা?”
“আপনার যেটা ইচ্ছা! সফট যে কোনো গান, ধুমধাড়াক্কা না!”
“বিয়ার গীত দিব আপা?’
তনিমা কঠিন স্বরে বলল, “না!”
শামসু ভাই ওর স্বরের কাঠিন্যে তাকাল অবাক হয়ে। তনিমা নিজের ভুল বুঝতে পেরে স্বর নরম করে বলল, “আচ্ছা, দেন!”
উৎসাহ পেয়ে শামসু ভাই সরাসরি “নয়া দামান” গান চালিয়ে দিলো। প্রতিবাদ করতে গিয়েও করল না তনিমা।
থাক। বেচারা আনন্দ করতে চাইছে করুক।
ল্যাপটপ খুলে মুখের সামনে ধরল তনিমা। কাজটা যতদূর এগিয়ে রাখা যায়।
সবকিছুই ঠিকঠাকমতো চলছে। শুধু তনিমার বুকের ওপর থেকে সরছে না ব্যাখ্যার অতীত সেই পাষাণভারটা।
গাড়ী চলছে হাতির ঝিলের জ্যামের ভেতর দিয়ে ঢিমে তেতালে। একটা ছোট্ট মেয়ে এসে জানালায় টোকা দিয়ে বলল, “ফুল নিবাইন আফা?”
তনিমা কিছু বলার আগেই ধমক দিয়ে উঠল শামসু ভাই, “এই সর, সর, যা, আপা কাম করতেছে, ত্যাক্ত করিস না একদম!”
তনিমা বাধা দিয়ে বলল, “আহা, থাক না শামসু ভাই! এই তোমার মালা কত করে?”
মেয়েটা ভয়ে ভয়ে বলল, “বিশ টাকা!”
শামসু ভাই আবারও ধমকে উঠল, “এই, কীসের বিশ টাকা? দশ টাকার বেশি একটা পয়সাও না!”
“আহা, শামসু ভাই! এই তোমার এখানে কয়টা মালা আছে?”
মেয়েটা ভয়ে ভয়ে একবার শামসু ভাই আরেকবার তনিমার দিকে তাকাচ্ছে। তনিমা পার্স খুলে একটা পাঁচশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “সবগুলো মালা দিয়ে যাও!”
মেয়েটা ভয়ে ভয়ে বলল, “ভাঙতি নাই!”
“ভাঙতি লাগবে না, যাও!”
শামসু ভাই বলল, “আপা খুশি হইয়া দিছে তরে, বুঝছস? আজকে আপার বিয়া, এই জন্য খুশি হইয়া দিছে!”
মেয়েটার ভয় কেটে গেছে। সে ফিক করে হেসে ফেলল।
পাঁচশ টাকার নোটটা হাতে নিয়ে ছুটতে ছুটতে চলে গেল ফুটপাথের দিকে। সেখানে পা ছড়িয়ে বসে আছে এক মহিলা।
সামনে একটা লাল রঙের বালতি। সেখানে আরো অজস্র ফুল।
বড়ো বড়ো ফুলের দোকান থেকে চুরি করে অথবা কুড়িয়ে আনা। হয়ত সেখানে বসে বসে মালা গাঁথে ওর মা।
মাকে গিয়ে কি পাঁচশ টাকার নোটটা দেখাচ্ছে মেয়েটা? তনিমার চোখে আচমকাই জল এসে গেল।
কিছুক্ষণ পর অবাক হয়ে লক্ষ্য করল শামসু ভাই, মুখের সামনে ল্যাপটপ মেলে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে তনিমা। টিস্যু মুখে চেপে ধরে প্রাণপণ চেষ্টা করছে যেন কান্নার শব্দ বাইরে না আসে।
কেন কাঁদছে? মা বাবাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে, এই কষ্টে?
নিজের মেয়ের বিয়ের সময় থাকতে পারেনি শামসু মিয়া। মেয়ের মামাবাড়ি থেকে বিয়ে দিয়েছিল।
এর আগে চারবার বিয়ে ভেঙেছিল মেয়ের। এরপর যখন বিয়ের কথাবার্তা ঠিকঠাক হয়েছে, কেউ আর লাগানি ভাঙানির ঝুঁকি নিতে চায়নি।
শামসু মিয়া ঢাকা থেকে গিয়ে দেখে বিয়ে পড়ানো শেষ হয়ে গেছে, মেয়ে তারা তুলে নিয়ে গেছে। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে মেয়েকে দেখে এসেছিল পরে।
নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে শামসু মিয়ার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। মেয়েমানুষের জীবনটা এমন কেন? সে মনে মনে বলল, “আহারে! আহারে!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp