নির্জন মধ্যাহ্ন দুপুর। সূর্যের তীব্রতা খানিক কমে এসেছে। সোনালি কোমল আভায় পুকুরের পানি চিকচিক করছে। শান বাঁধা ঘাটে রাখা কলসিটা রোদের তাপে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। হয়তো কেউ কিছুক্ষণ আগে পানি নিতে এসেছিল। পুকুর পাড়ের তালগাছটা নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। শুধু মাঝে মাঝে দু'টো একটা শুকনো পাতা খসে পড়ছে শব্দহীন ভাবে। মাঝে মাঝে হালকা বাতাস এলে পানির ওপর ছোট ছোট ঢেউ খেলে যাচ্ছে। ঘাটে ছাপানো কারও ভেজা পায়ের চিহ্ন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, যেমন দুপুরের এই অলস সময়টাও একসময় মিলিয়ে যাবে বিকেলের দিকে।
গোসল সেরে পুকুর ঘাটে এসে বসেছে শুভ্রা। তার লম্বা ভেজা চুল থেকে পানি টুপটাপ করে মাটিতে পড়ছে। সূর্যের সোনালী রশ্মি তার শরীরকে স্পর্শ করছে। পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে তার মুখের ছবি ফুটে উঠেছে। কিছুটা স্বপ্নিল, কিছুটা রহস্যময়। মৃদু কম্পনে পানি কেঁপে উঠলে, তার প্রতিবিম্বটাও যেন নড়েচড়ে ওঠে। কখনো চোখের আকৃতি বড় হয়ে যায়, কখনো ঠোঁটের রেখা বিস্তৃত হয় এক অদ্ভুত হাসিতে।
গোলাপি রঙের শাড়ি জড়িয়ে শুভ্রা তার দুই পায়ের পাতায় ধীরে ধীরে আলতা দিচ্ছে। কোমল আঙুলের স্পর্শে আলতার লাল আভা পায়ের পাতায় মিশে এক অনন্য শিল্পের সৃষ্টি করছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সদ্য ভেজা মাটির গন্ধ। চারিপাশে পাখির কাকলি সেই পরিবেশকে আরও মোহনীয় করে তুলেছে। সে একবার আলতা রাঙানোর কাজটি খুব যত্ন সহকারে করছে, আবার মাঝেমধ্যে পুকুরে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মৃদু হাসছে। প্রকৃতি তার সুরেলা সঙ্গীত দিয়ে শুভ্রার মুহূর্তগুলোকে আরও রাঙিয়ে তুলেছে।
পুকুর পাড়ে মস্ত বড় এক তালগাছের গোঁড়ায় শেকড় গেঁথে দাঁড়িয়ে আছে প্রভব। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার রক্তজবার পানে। শুভ্রা নিপুণ হাতে আলতার রেখা টানতে ব্যস্ত। আঙুলের ডগা দিয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে লাল রঙের নরম আভা।চোখে একাগ্রতা, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি, সবকিছু যেন যুবককে মোহিত করে রেখেছে। সে অনড় দাঁড়িয়ে আছে, কে জানে কতক্ষণ। হয়তো দশ মিনিট? বিশ মিনিট? ত্রিশ মিনিট? সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে অনুভব করে চলেছে। কিছু কিছু দৃশ্য চোখে নয়, হৃদয়ে গেঁথে যায়।
আলতার টকটকে লাল রঙ শুভ্রার ত্বকের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রক্রিয়া প্রভবের মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি সৃষ্টি করছে। লাল রঙটা কী শুধুই রং? নাকি ভালোবাসার কোনো সুর? প্রভব তার পৌরুষময় দেহভর ছেড়ে দিয়ে তালগাছে পিঠ ঠেসে দাঁড়ালো। এক তপ্ত নিঃশ্বাস ত্যাগ করে নিজের হৃদ পাজরে হাত রাখল। শিথিল চোখজোড়া শুভ্রায় নিবদ্ধ রেখেই অস্ফুটস্বরে আওড়ালো,
- "তার এক ঠুনকো ঝলক আমার নিরেট প্রাচীরে ঠিক কতটা প্রলয় সৃষ্টি করে, সে কি জানে? কিভাবে তার একটুখানি উপস্থিতি আমার অস্তিত্বকে টলিয়ে দেয়, সে কি বোঝে?"
প্রভব ভাবছে, শুভ্রার আঙুলের সেই লাল ছোঁয়া যদি তার হাতেও লাগত! যদি এই মুহূর্তটা থেমে থাকত। যদি সে আমার হতো! যদি শুধু বসে থেকে, প্রিয় মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই জীবন হতো!
এদিকে, আলতায় পা রাঙানো শেষ করে শুভ্রা এক মুহূর্ত নিজের শিল্পকলা দেখে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল। প্রাণবন্ত হেসে দুটো পা ভালোভাবে নেড়েচেড়ে দেখছে। রঙের সৌন্দর্য উপভোগ করছে।হঠাৎ, পাশ থেকে কারো নিশ্চুপ দৃষ্টির চাপ অনুভব করে ঘাড় ঘুড়িয়ে পাশে তাকালো। ওমনি সে প্রভবকে দেখতে পায়। চোখে চোখ পরতেই অক্ষিকোটর বড় হয়ে গেল শুভ্রার। বিষ্ময়ে এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় শরীরের রক্তশির। ধক করে ওঠে বুকে। কেউ যে এখানে উপস্থিত ছিল, সে তা বুঝতেই পারেনি!
মৃদু হাওয়া বইছে। শুভ্রার আঁচল খানিকটা উড়ছে। তার মনে হলো, প্রভবের চোখে কিছু কথা আছে। যা সে মুখে বলছে না। তার বুকের ভেতর অজানা এক শিহরণ খেলে গেল। এই নীরব মুহূর্তে চারপাশের সব শব্দ যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু তাদের চোখের ভাষা কথা বলছে। তাৎক্ষণিক শুভ্রা সামান্য ইতস্তত করে মোলায়েম কন্ঠে আওড়ালো,
- "ছোট বাবু... আপনে এইখানে?"
অকস্মাৎ সম্মোধনে প্রভব একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তবে চটজলদি নিজেকে সামলে নিয়ে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফোটে। সে শুভ্রার পায়ের দিকে তাকিয়ে খুবই স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিল,
- "দেখছিলাম..."
- "কি?"
- "আমার প্রলয়বাণ!"
এমন সংক্ষিপ্ত উত্তরে শুভ্রার গাল লাল হয়ে উঠল। হয়তো লজ্জায়, হয়তো বিস্ময়ে। সে দ্রুত আঁচল টেনে পায়ের ওপর দিল। লুকিয়ে ফেলতে চাইছে নিজের সদ্য রাঙানো পায়ের সৌন্দর্য। কিন্তু তার চোখ বলছিল অন্য কথা। এক ধরনের উত্তেজনা, এক ধরনের নতুন অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে তার মনে। পুকুরপাড়ের গাছে কয়েকটা ফুল বাতাসে দুলে উঠল। হয়তো তারাও এ মুহূর্তের মিষ্টি অনুভূতি টের পাচ্ছে। প্রভব লম্বা পা ফেলে এগিয়ে এসে, ঘাটের কোণায় গা এলিয়ে বসেছে। শুভ্রা সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
- "আপনের না অসুখ? আপনে এইখানে কি করেন?"
প্রভব আরাম করে বসে দু'নয়নে একরাশ শীতলতা জড়িয়ে শুধালো,
- "দেহের অসুখ তো সেরে গেছে, তাই মনের অসুখ সারাতে এলাম! একটু শান্তি আর সমঝোতা চাই।"
শুভ্রা হতবাক। কেবলার মত ডেব ডেব করে চেয়ে আছে যুবকের পানে। প্রবভ হাসলো। রমণীর ডেবডেবা চাহনি ছাড়া বেশি কিছু আশাও করেনি সে। তবে তার ক্ষুদ্র আশাকে মাত দিয়ে বৃহৎ কিছু বলে ফেললো শুভ্রা।
- "মন মাজারে মুর্শিদ বসান, দেখবেন অসুখ হুমড়ি খাইয়া পলাইছে।"
বলেই মুখে হাত দিয়ে দমফাটা হাসিতে মেতে উঠল সে। প্রভব দেখছে শুভ্রাকে। তার চোখ খুঁজে পেয়েছে এক গভীর প্রশান্তি। যুবকের হৃদয়ে অজানা সুখের অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে। চোখে চোখ রেখে, প্রেয়সীর হাসি যেন অমোঘ আকর্ষণ তৈরি করে। যা প্রভবকে মোহিত করে ফেলেছে। প্রভবের অপলক চাহনি দেখে শুভ্রা হাসি থামায়। সামান্য নড়েচড়ে বসে অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল,
- "কহন আইছেন আপনে?"
প্রভব তার হাতঘড়ির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নাক সিকোয় তুলল। আপোষ করে বলল,
- "বেশি না, এইতো পয়তাল্লিশ মিনিট আগে"
শুভ্রা বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ়। চোখগুলো অক্ষিকোটর থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম। বাম হাত মাথায় দিয়ে উঁচু স্বরে বলল,
- "হায় আল্লাহ! আপনে এতক্ষণ খাঁড়াইয়া আছিলেন? আমারে ডাক দিলেন না কেন?"
তবে সেদিকে বিশেষ খেয়াল না দিয়ে প্রভবের চোখ আটকায় শুভ্রার বাম হাতে। কব্জিতে অনেকগুলো চিড়চিড় কাটা দাগ। যা লাল থেকে নীলাভ রূপ নিচ্ছে। চিহ্নগুলো সতেজ। হয়তো গতকাল বা আজ কেটেছে। প্রভব ভ্রু কুঁচকালো। তার রুক্ষ খসখসে হাত দিয়ে শুভ্রার মোলায়েম হাত চেপে ধরে বলল,
- "কাটলো কিভাবে?"
শুভ্রা ঢোক গিললো। সে ইতস্ততবোধ করছে। চিনচিন ঘামছে নাকের ডগা। হাসফাস করছে, বলবে কি বলবে না। বলা কি আদোও উচিত হবে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………