বর্ষা পেরিয়ে শুরু হয়েছে শরৎ কালের লীলাখেলা। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘ ভেলার ছড়াছড়ি দেখা যায়। দেখতে দেখতে প্রকৃতির রানী বর্ষা বিদায় নিচ্ছে। প্রকৃতিতে শুভ্র-সাদা মেঘমালা ও কাশ ফুলের কোমল ডানা মেলে উঁকি দিচ্ছে অপরূপা শরৎ। ঋতু বৈচিত্র্যের পরিক্রমায় বর্ষার শেষ সময় চললেও তার রেশ এখনো রয়েই গেছে। এখনো প্রায়শ আকাশে দেখা মেলে কালো মেঘের ঘনঘটা, হঠাৎ করে নামতে শুরু করে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। যেমনটা হয়েছিল গতরাতে। তবে আজ ভোর থেকেই চারিদিকে তৃপ্তির রোদ উঁকিঝুঁকি চালাচ্ছে।
জমিদার বাড়ি থেকে ফিরে বৃদ্ধ ঔষধি বানাতে বসে পড়েছেন। এদিকে, পুকুর পাড়ে বসে আলতায় নিজের পা সাজাতে ব্যস্ত শুভ্রা। শরতের শুভ্রতাকে বরণ করতে রক্তজাবার ন্যায় রাঙাচ্ছে তার কোমল পা দুটিকে। আনমনে গুনগুনিয়ে উঠেছে দু'একবার।
হঠাৎ,খানিক দূর থেকে দাদুর ডাক কানে যেতেই হকচকিয়ে উঠল সে। জমিদার বাড়ি যাওয়ার কথা একেবারেই মাথা ছেড়ে পালিয়েছিল। দাদুর ডাক কানে যেতেই ইন্দ্রিয় সজাগ হলো তার। মুখ থুবরে ঝুঁকে পরা এলোমেলো চুলগুলো ব্যস্ত হাতে কানের গোড়ায় গুঁজে, সে ছুটলো বাড়ির দিকে। উঠোনে পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
- 'আমারে ডাকছিলা?'
- 'হ ডাকছিলাম। কাছে আয়, এডা ধর।'
আদেশ পেয়ে শুভ্রা নম্রপায়ে এগিয়ে গেল। বৃদ্ধ একটা স্টিলের বাটি তার হাতে দিয়ে খানিক আদেশের সুরে বললেন,
- 'বাটিডা দিয়া আয়। এর মধ্যে জমিদার নাতির লেইগ্যা ঔষুধি আছে। সাবধানে লইয়া যাবি।'
শুভ্রা মাথা কাত করে সায় জানালো। এরপর খুব সতর্কতার সহিত বাটিখানা হাতে নিয়ে, গুটিগুটি পায়ে রাস্তার দিকে হাঁটা ধরল। উদ্দেশ্য জমিদার বাড়ি।
—————
জমিদার বাড়ি পৌঁছাতে শুভ্রার বেশ অনেকটা সময় লাগল। অন্যসময় হলে এক দৌড়ে পেরিয়ে যেত জমিদার বাড়ির সেই সোনালি রঙের বিশাল গেট। তবে এবার দাদুর কড়া আদেশ। মান্য করা চাই। ধীর পায়ে সাবধানতার সাথে হেঁটে, একপর্যায়ে জমিদার বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে পৌঁছালো। সুবিশাল এই গেট, দেখে মনে হবে সোনায় মোড়ানো। মাঝে মধ্যে শুভ্রা সরল মনে ভেবে ফেলে, 'এইডা কি আসলেই সোনার!'
বর্ণীল কারুকাজ করা সোনালি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শুভ্রা আশেপাশে একবার সতর্ক চাওয়া চেয়ে দেখল। কেউ নেই। এইদিকে তেমন কেউ আসে না। শুধুমাত্র পথচারী ছাড়া। গেটের বাম পাশে সাদা দেওয়ালে খোদাই করে বড় বড় অক্ষরে লেখা 'চৌধুরী মহল'। সে নাক কুঁচকে আকাশ পানে একবার চোখ বুলালো। সূর্য কিছুটা বামে হেলে আছে। মধ্যপ্রহর সন্নিকটে। হতাশ হলো সে। পিঁপীলিকার ন্যায় হেঁটে এর চেয়ে দ্রুত আসা সম্ভব নয়।
শুভ্রা সোনালি দরজা পেরিয়ে সুবিশাল উঠোনে পা রাখলো। ছোট ছোট কদম ফেলে বাড়ির বড় দরজার দিকে যেতেই, গলায় গামছা পেঁচানো মনাকে দেখতে পেল। মনা বাগানের আগাছা পরিষ্কারে ব্যস্ত। শুভ্রার উপস্থিতি টের পেয়ে সে চোখ তুলে তাকালো। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
- 'কিরে শুভ্রা, তুই এনে কেন?'
- 'দাদু ঔষুধ লইয়া পাঠাইলো মনা ভাই।'
- 'ও আইচ্ছা, তাইলে ভেত্তরে যা। সোজা যাইয়া দ্বোতলায় হাতের ডাইনে তিন নম্বর রুমে জমিদার নাতি হুইয়া আছে, দেখ গিয়া।'
শুভ্রা মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। মনার কথামতো ধীরে সুস্থে জমিদার বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। এর আগে কখনো সে জমিদার বাড়ির দোরগোড়া পেরোয় নি। বিশাল চওড়া বারান্দা, সুবিশাল রুম, বড় বড় সিঁড়ি, সুসজ্জিত গেট দৃষ্টিগোচর হতেই তার চোখের তব্দা মেরে এল। দ্বোতলায় উঠে ডান পাশের তিন নম্বর রুমে পা বাড়াতেই চোখগুলো বড় বড় হয়ে যায় তার। বিস্ময়ে ছানাবড়া। পুরো রুম রাজকীয় আসবাব দিয়ে সুসজ্জিত। সে অবাক চোখে রুমের আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। রুমে উপস্থিত সবকিছুই নজর কাড়া। তবে সোনালি রঙের পালঙ্কটা তার দৃষ্টি কেড়েছে বেশ। পালঙ্কে সোনালি মখমল চাদরে আবর্তিত কোনো সুঠাম দেহধারীর উপস্থিতি লক্ষ্য করতেই জিভে কামড় বসায় সে। রুমের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে ঔষধির কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। মুহূর্তেই কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে মৃদু গলায় আওয়াজ তুলল,
- 'ছোড বাবু, দাদু আপনের লেইগ্যা ঔষধ পাডাইছে।'
নিজ বক্তব্য শেষ করে শুভ্রা ক্ষণিক অপেক্ষা করল। কিন্তু অপর পক্ষের কোনো সাড়া শব্দ এল না। তাই সে আবারও কিছু একটা বলার জন্য উদ্বুদ্ধ হচ্ছিল। হঠাৎ মখমল চাদর ভেদ করে একটা পুরুষালী হাত বেরিয়ে এল। হাতটি তার তর্জনী আঙুল দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো একদিকে নির্দেশ করছে। আঙুলের নির্দেশনা অনুসরণ করে শুভ্রা চোখ ফেরাতেই রুমের সাথে আরও একটা ছাদবিহীন রুম আবিষ্কার করল। যার চারপাশ ধূসর রঙের গ্রীলে আবর্তিত। ছোট ছোট ফুলগাছের টব, মাথার উপড় শরতের খোলা আকাশ দেখতে বেশ লাগছে। কৌতূহল বশত সেদিকে পা বাড়াতেই থমকে দাঁড়ায় শুভ্রা।
কাঠের রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে শুয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন এক পুরুষালী দেহ। সুগঠিত শরীর, ফর্সা মুখ। প্রশস্ত কাঁধ এবং পেশিবহুল হাত। হাতে একটা বই অর্ধখোলা অবস্থায় উল্টো করে আঁকড়ে ধরে আছে। লম্বাটে মুখ, ঘুমে আচ্ছন্ন চোখ। মোটা ভ্রু আর ভরাট ঠোঁট। সাদা শার্ট পরিহিত, গায়ে কালো রঙের কাশমেরি শাল জড়ানো। পোশাকে তার আভিজাত্যের ছাপ!
রমণী বিমোহিত। এমন সুদর্শন পুরুষ পুরো গ্রাম জুড়ে দ্বিতীয়টি দেখেনি। নিদ্রারত পুরুষকে অদ্ভুত রকম আকর্ষনীয় লাগছে। শুভ্রা যেন চোখই ফেরাতে পারছে না। সে তার দিন দুনিয়া ভুলে অচেনা পুরুষকে নিগরে যাচ্ছে। বারবার তার চোখ গিয়ে ঘুমন্ত পুরুষের ভরাট বাদামি ঠোঁটে আটকাচ্ছে। হঠাৎ,
- 'সকালে নাস্তা খাওনি? চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছো কেনো?'
ঠোঁট জোড়া কম্পিত হয়ে গম্ভীর পুরুষালি আওয়াজের সৃষ্টি করল। শুভ্রা আঁতকে উঠল। চোখ চলে যায় অচেনা পুরুষটির তীক্ষ্ণ চোখে। তার বাদামি চোখজোড়া শুভ্রার পুরো শরীরে কম্পন সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট। চোখে চোখ পরতেই শরীরে কেমন যেন জ্বালাপোড়া শুরু হলো। ওমন বাজপাখির ন্যায় চোখের দিকে কি আর বেশিক্ষণ চোখ টিকিয়ে রাখা যায়? সে চট জলদি মাথা নিচু করে থুতনি গলায় ঠেকালো। অপরিচিত নারীর নিশ্চুপ ভাবমূর্তি দেখে পুরুষটি ফের প্রশ্ন করল,
- 'কিছু জিজ্ঞেস করেছি। আমার প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া আমি একদম পছন্দ করিনা।'
আবারও সেই ভারী গলার কণ্ঠস্বর কানে যেতেই দু'একবার শুকনো ঢোক গিললো শুভ্রা। হাত পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। নেহাতি র্নিলজ্জের মতো কাজ করেছে সে। এভাবে কেউ লজ্জা শরমের বালাই ভুলে পর পুরুষের দিকে চেয়ে থাকে? কি উত্তর দেবে সে?
এক হাতে বাটি অন্য হাতে শাড়ির আঁচল খামচে অচেনা এক যুবতীকে কাচুমাচু করতে দেখে বেশ বিরক্ত হলো চৌধুরী প্রভব আহসান। খানিক ঝুঁকে থাকায় তার লতানো চুলগুলো কপালের দুপাশে এলোমেলো ভাবে দুলছে। তীব্র অস্বস্তি, ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। মেয়েটা ভয় পাচ্ছে। ভাবতেই লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করল প্রভব। স্বভাবতই গম্ভীর কণ্ঠে খুব একটা পরিবর্তন আনতে না পেরেই বলল,
- 'কে তুমি?'
শুভ্রা ধীর গতিতে মাথা তুলে তাকালো। সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে ঠিক মতো খেয়াল না করলেও এবার সুষ্ঠু মস্তিষ্কে শুভ্রাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য দম আটকে গেল প্রভবের। ডাগর ডাগর চোখে স্পষ্ট ভীতিকর চাহনি। শ্যামলা ত্বকে রক্তজবার ন্যায় লাল আভাময় ওষ্ঠজোড়া কাঁপছে। যা ছুঁয়ে দেয়ার দারুণ ইচ্ছে হচ্ছে তার। অস্বস্তি আর লজ্জায় গালদুটো হালকা লালচে দেখাচ্ছে। শুভ্রাকে দেখে তার মন গহীনে সবচেয়ে কঠোর প্রাচীরটা আচমকা নেড়ে উঠল। কিন্তু এই মুহুর্তে সে তা প্রকাশ করতে চাইছে না। নিজেকে সংযত রেখে আবারও বলল,
- 'আমি ভয় পাওয়ার মতো কিছু বলিনি। বিনা অনুমতিতে রুমে প্রবেশ করেছো কেনো সেটার উত্তর দাও।'
শুভ্রাকে বেশ অপ্রস্তুত লাগছে। সরল মনে রুমে চলে এসেছে সে। কখনো ভাবেনি এভাবে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। সে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
- 'ঔষধি দিতে আইছিলাম। মনাভাই কইলো তিন নম্বর রুমে যাইতে।'
প্রভব ভ্রু কুঁচকালো। শুভ্রার হাতে বাটির দিকে নজর গেল তার। প্রভব বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। গায়ের শাল সরিয়ে চেয়ারের উপড় রাখলো। এরপর বুকের ওপর হাতজোড় আড়াআড়ি ভাঁজ করে এক কদম শুভ্রার দিকে এগিয়ে এল। ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল,
- 'ঔষধি কে পাঠালো?'
শুভ্রা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। সে অনড়। নড়তে চেয়েও যেন নড়তে পারছে না। অবশেষে, হাসফাঁস করতে করতে সে অস্পষ্ট গলায় আওড়ালো,
- 'আমার দাদু পাডাইছে। জমিদার নাতিরে খাওয়াইতে কইছে।'
এমন উত্তর শুনে প্রভবের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটল। সে আরও এক কদম এগিয়ে এলো শুভ্রার কাছে। তারা পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রা জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। কোনো পুরুষ তার এতোটা কাছে দাঁড়িয়ে। তাও আবার এমন অসম্ভব সুদর্শন সৃষ্টি। শুভ্রার দম আটকে যাওয়ার উপক্রম। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রত্যেকটি উষ্ণ নিশ্বাস প্রভবের বুকে ঢোল পিটাচ্ছে। প্রভব তার হাসি আরও প্রসারিত করে ভরাট কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,
- 'অনেক তো ধৈর্য ধরেছি, আর কত ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে? অপেক্ষা করছি। খাইয়ে দাও।'
·
·
·
চলবে……………………………………………………