হাওয়াই মিঠাই - পর্ব ১৬ - তামান্না ইসলাম শিমলা - ধারাবাহিক গল্প

হাওয়াই মিঠাই - তামান্না ইসলাম শিমলা
          দুপ্রহরের কড়া রোদ শরীরে কাটার মতো বিধছে, বিরক্ত নিয়ে চোখ খুলল তেহরাব। মাথা ভার হয়ে আছে, জ্বরের ঘোরে কিছুই খেয়াল নেয় তার। 
সকালে অবশ্য একবার উঠেছিল, ইরাকে সামনে পেয়ে বলেছিল ওষুধ দিয়ে যেতে। কিন্তু সেই মেয়ে আর আসেনি!

দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রীতিমতো অবাক হলো সে, বারোটা বাজ। নিজের মাথায় দুবার চাটি মেরে বিছানা থেকে নামল, জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এমন জ্বর বেঁধেছে বলে মনে নেই তেহরাবের। মাথা তুলে ওয়াশরুম পর্যন্ত যাওয়ার শক্তিটাও পাচ্ছে না, কোনো রকম চোখে মুখে পানি দিয়ে আবারো বিছানায় এসে বসল।

উচ্চস্বরে শব্দ করে ডাকল তার মাকে,

“আম্মু, ওই মা, শোনো না বাল!”

তাসলিমা রান্না করছিল, মেহমানদের খাতির দারিতে কোনো কমতি রাখতে চাই না সে। তাকে সাহায্য করছে ইরা, অবশ্য আজ আর তার মুখে বিরক্তি নেই আছে হাসি। বিষয়টা নজরে পরেছে তাসলিমা, মেয়ের মতিগতি বোঝা মুশকিল।

ওদিকে তেহরাবের ডাক শুনে ইরাকে কাজ ধরিয়ে নিজে চলে আসল উপরে, ছেলে মেযে দুটো তাকে শান্তিতে দুটো কাজও করতে দিবে না। ডাকাডাকি লেগেই থাকে!!

“উঠছিস কেন? ঘুমা আরো, দুপুর বাজে বারোটা এখন উঠে মা মা লাগিয়েছে!”

তাসলিমার কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি, তেহরাব চোখ ডলতে ডলতে বলে,

“,জ্বর এসেছে আমার, ওষুধ দাও। তাকাতে পারছি না! ইরাকে বলেছিলাম সকালে, বা*লটাই কি মরছে নাকি?”

তেহরাবের কথা শুনে তাসলিমা হন্তদন্ত হয়ে তেহরাবের সামনে এসে দাঁড়ায়, মাথায় হাত দিতেই আশ্চর্য হয়। শরীরতো অত্যাধিক গরম, তাসলিমা নিজেও অস্থির হয়ে পরে,

“হাই আল্লাহ, শরীর তো পুড়ে যাচ্ছে। এই জ্বর বাঁধালি কোথা থেকে? আর ইরার বাচ্চা, শয়তানটা আমাকে বলেইনি।”

তেহরাব চোখ মুখ কুঁচকে বিছানায় শুয়ে পরে, কম্ফোর্টারটক গায়ে জড়িয়ে বলে,

“বাঁধায়নি, আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছি! ওর ওটা ইরার নয়, তোমার বাচ্চা।!"

তেহরাবের ত্যারা কথায় তাসলিমা মেজাজ খারাপ হয়,

“বাজে কথা বন্ধ কর, সারাদিন টুটু করে ঘুরতে, জ্বর তো হবেই।”

তেহরাব টিপটিপ করে চোখ খুলে বলে,

“এখন তুমি কি ওষুধ দিবা?”

তাসলিমা দ্রুত খাবার ও নিজের ঘর থেকে ওষুধ এনে তেহরাবের সামনে বসে,

“উঠ, কিছু মুখে দে, খালি পেটে ওষুধ খাওয়া যাবে না।”

তেহরাব চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, মিনমিনে স্বরে বলে,

“খেতে ইচ্ছা করছে না, ওষুধ দাও!”

তাসলিসা জোর করে তেহরবাকে বসায়, কয়েক লোকমা ভাত খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দেয়। তেহরাব আবারও চট করে শুয়ে পরে, তাসলিমার বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে, যে ছেলেটা সারাদিন টুটু করে ঘুরে বেড়ায়৷ সে ছেলে কেমন নিস্তেজ হয়ে পরে আছে, 

“তুই ঘুমা, আমি দেখি রিমুর আব্বা বাড়ি আছে নাকি। আনোয়ারকে ডেকে নিয়ে আসি!”

তাসলিমা যেতে নিলে তেহরাব বলে উঠে,

“দরকার নেই, এমনি ঠিক হয়ে যাব!”

তাসলিমা কি আর তেহরাবের কথা শুনবে? সে রিমুদের বাড়ি গিয়ে দেখল আনোয়ার আজ হাসপাতালে যায়নি, 

“আনোয়ার ভাই তেহরাবটার অনেক জ্বর এসেছে, একটু দেখে যান না!”

তাসলিমান কথায় আনোয়ার থার্মোমিটার নিয়ে তাদের বাড়ি আসে, তেহরাবের ঘরে গিয়ে দেখে তেহরাব ঘুমিয়ে গেছে। আনোয়ার চেক করে দেখে জ্বর ১০৩°, 

“আরেহ ভাবি তেহরাবের তো অনেক জ্বর, আমাকে আগে বলবে তো!”

তাসলিমা অসহায় মুখ করে বলে,

“আমিই জানতাম না, একটু আগে জানলাম।!”

আনোয়ার উঠে দাঁড়াল, 

“চিন্তা করো না, আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।”

আনোয়ার চলে গেল, তাসলিমা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে নিজেও নিচে নেমে আসল। সোজা রান্নাঘরে!

ইরা ফোনে কথা বলছে আর রান্না করছে, তাসলিমা ইরার কাছে আসতেই ইরা কল কেটে দেয়,

“এই বান্দরনি, তেহরাবের জ্বর এসেছে বলিস নি কেন আমাকে? তোর কাছে তো ওষুধও চেয়েছিল, কোনো কাজ করতে পারিস না ঠিক মতো।”

মায়ের ঝাঁঝালো কন্ঠে ইরার টনক নড়ে, সে সত্যি ভুলে গিয়েছিল। সর্বনাশ!

“আরেহ আম্মু আমি সত্যি ভুলে গিয়েছিলাম, দাঁড়াও এখুনি ওষুধ দিয়ে আসছি!

ইরা দৌড় দিতে নিলে তাসলিমা ধমক দেয়,

“ যেতে না এখন আর, আমি দিয়ে এসেছি। এখন ঘরে গিয়ে গোসল করে রেডি হো, একটু পরেই লোকজন চলে আসবে, দ্রুত যা!”

ইরা ঠোঁট উল্টায়, অতঃপর মাথা চুলকাতে চুলকাতে প্রস্থান করে!

—————

দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষে বিদায় নিয়েছে সালমা ও শিহাব, শিহাবের বাবাও এসেছিল। অতঃপর রাফার কথায ঠিক হলো, সামনের শনিবারই বিয়ের ডেট ফিক্স করা হয়েছে। 

তাদের এগিয়ে দিতে রফিক শফিকও গিয়েছে, বাসায় এখন শুধু তনয়া আর তানিয়া!

তনয়া পড়তে বসেছে, আপাতত সবকিছু থেকে মনকে বিরত রাখার জন্যই পড়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া। তবুও কাজ হচ্ছে না, বারংবার মন পুড়ছে তার।

খট করে শব্দ কানে আসতেই ভাবনার জগৎ থেকে বের হয় তনয়া,পাশে তাকাতেই নিজের মাকে দেখতে পায়।
তানিয়া তনয়ার ফোনটা এগিয়ে দেয় তনয়ার দিকে,

“শিহাব কল করলে কথা বলবি, অন্য কারো সাথে কথা বলার জন্য দেয়নি!”

তনয়া চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ ফোনের দিকে, অতঃপর তাকায় তার মায়ের দিকে। তানিয়া গম্ভীর মুখে বলে, 

“কালকে রাতে কেউ একজন কল করেছিল, কথা বলেনি। কে এটা?”

নাম্বারটা দেখায় তানিয়া,তনয়া নাম্বারটা দেখে ঠিকব চিনতে পারে। এটা তেহরাবের নাম্বার, নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলে,

“ফোনটা বরং তোমার কাছেই রাখ, আমাকে যেহেতু ভরসা করছ না তাহলে ফোন কেন দিচ্ছ? কয়েকদিন পরতো বিয়েই, বিয়ের পরেই নাহয় শিহাব ভাইয়ের সাথে কথা বলব!”

তানিয়া শব্দ করে ফোনটা টেবিলে রাখে, গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করে,

“ছেলেটা কে তনয়া?”

তনয়া কিছু বলে না, উল্টো মুখ ফিরিয়ে নেয়। তানিয়া তনয়াকে নিজের দিকে ঘোরায়, তেজী স্বরে বলে,

“আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি।”

তনয়ার কান্না পাচ্ছে, অনেক বেশি কান্না পাচ্ছে। না চাইতেও চোখ দিয়ে পানি পরছে,

“আমি বলেছি তো আমি শিহাব ভাইকেই বিয়ে করব, তাও কেন বারবার এসব জিজ্ঞেস করছ!”

তানিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“কারন আমি জানতে চাই কোন ছেলের সাথে তুই প্রেম করতি, কোন ছেলের জন্য আমার মেয়ে আমাদের কথা না ভেবে সম্পর্কে চলে গেল।”

তনয়া উঠে দাঁড়ায়, শব্দ করে কেঁদে উঠে সে,

“ তোমাদের কথা ভাবি না আমি? তুমি নিজেই আমাকে বিশ্বাস করছ না, নিজেই নিজের মতো ভেবে নিচ্ছ সব। আর কথা শোনাচ্ছ আমাকে।”

“বিশ্বাস? আচ্ছা যা করলাম বিশ্বাস, এবার বল সত্যিটা কি?”

তনয়া ধপ করে মেঝেতে বসে পরে,কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলে,

“আমি কোনো সম্পর্কে জড়ায়নি, না আমি চাই আমার জীবনে কাউকে জড়াতে। তোমাদের কথা ভেবে আমি কোনো ছেলে বন্ধু পর্যন্ত বানাইনি, আর প্রেমিক? ভাবলে কি করে? এই নুপুর, চিঠি, ফুল এসব মানুষ আমাকে দিলে আমি কি করব? এটাও কি আমার দোষ?”

তানিয়ার কোনো পরিবর্তন হলো না, 

“,ঠিক আছে বিশ্বাস করলাম তোকে, আমিই নাহয় ভুল ভেবেছি। তবে বিয়েতে যেন কোনো বাঁধা না আসে বলে দিলাম, তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না। “

তানিয়া প্রস্থান করল, এতকিছু বলার পরেও তার মা তাকে বিশ্বাস করল না।এর থেকে তো ভালো হতো সত্যি কারো সাথে সম্পর্কে যাওয়া, অন্তত নিজের ভালোবাসাটা তো প্রকাশ করতে পারত।

—————

“ দুজনের যেহেতু দুজনকে পছন্দ হয়েই গিয়েছে তাহলে আর দেরি করে লাভ কি!”

রুমার কথায় স্মিত হাসে ইউসুফ, কালকেও মেয়েটা না করছিল আর আজকেই রাজি হয়ে গেল। এমনিকে সাহিলকে সবারই পছন্দ হয়েছে, ওদের পরিবার সম্পর্কেও মোটামুটি ভালোই ধারনা পেয়েছে। 

“ হ্যাঁ তাহলে দেখুন দিনকাল কবে ঠিক করা যায়!”

তাসলিমার কথায় সাহিলের বাবা মুচকি হেসে বলে,

“সপ্তাহ খানিকের মাঝেই করে ফেলি কি বলেন, শুভ কাজে দেরি কীসের।”

“আমার একমাত্র মেয়ে ইরা, একটু বড় করে অনুষ্ঠান করব। এত দ্রুত কি করে হবে?”

ইউসুফের কথায় সায় জানায় তাসলিমা, রুমা বলে,

“আরেহ বিয়াই বিয়ান, টাকা নষ্ট করে অনুষ্ঠান করে কি হবে বলেন দেখি? এর থেকে ভালো ওই টাকা দিয়ে মেয়েকে কিছু দিয়ে দেন।!”

রুমার কথা শুনে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মালেক, ইশারায় চুপ থাকতে বলে। রুমা চুপ হয়ে যায়,ইউসুফ হাসি হাসি মুখ করে বলে,

“তা তো দেবই, আমার মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে আপনাদের হাতে তুলে দেব।!”

“আসলে বিয়াই সাহেব এসব লোক দেখানো অনুষ্ঠান করা আমাদের পছন্দ নয়, আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তার নাম নিয়ে ঘরোয়া ভাবে নতুন সম্পর্কের সূচনা হোক এটাই চাই!”

মালেকের কথা বেশ মনে ধরল ইউসুফের, সাথে তাসলিমারও। মুচকি হেসে সম্মতি জানালেন,

“তবে তাই হোক, আমার কয়েকজন আত্মীয়স্বজন ও আপনাদের কয়েকজন এসে বিয়েটা হয়ে যাক। তাহলে ডেটটা?”

ইউসুফের কথা শেষ হতেই মালেক বলে,

“ শুক্রবারটা শুভদিন, এদিনেই হোক আপনি বললে। সকলের বন্ধও আছে সেদিন!”

“আচ্ছা তবে তাই!”

কথার মধ্যে খানে সাহিল আর ইরা নিচে নেমে আসে, কথা বার্তা শেষ হতেই সকলে বিদায় নেই। তবে তাসলিমার কাছে সাহিলের মাকে সুবিধা জনক লাগে না, মহিলাটা একটু লোভি। অবশ্য তা নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেয়, তার মেয়ে ভালো থাকলেই হলো।

এখন প্রায় সন্ধ্যা, সবকিছু গোছগাছ করছে তাসলিমা। ড্রয়িং রুমে বসে ইউসুফ টিভি দেখছে, তাসলিমা কাজ শেষ করে ইউসুফের পাশে বসল।

“আনোয়ার ভাইকে বললাম ইরার পাকা কথার সময় থাকতে, তা তো কাজের জন্য থাকতে পারলেন না। কাল বরং সবাইকে দুপুরের দাওয়াত দিও, তারপর বিয়ের বিষয়ে কথা বলিও!”

তাসলিমার কথায় মাথা নাড়ে ইউসুফ, অতঃপর জিজ্ঞেস করে,

“তেহরাব কেমন আছে এখন? জ্বর কমেছে?”

তাসলিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, 

“হুম কমেছে, আর কমতেই তোমার গুনোধর ছেলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গিয়েছে, কত করে বললাম জ্বরটা কারুক আজ বাড়িতেই থাক৷ সেকি কথা শুনে? মেহমানদের সামনেও বসল না, এই ছেলেটা বড় কবে হবে কে জানে!”
 
ইউসুফ হাসে, তার ছেলেটা যে এমনি!

“হয়েছে হয়েছে, এবার মেয়ের বিয়ের জন্য লিস্ট বানাও। শপিং-এ যাবে তো?”

তাসলিসা মুখ ভেঙায়,

“ছেলেকে বাঁচাতে কথা ঘুরাচ্ছ?”

ইউসুফ হেসে উঠে, তাসলিমা ঠিকই ধরেছে। 

—————

“মামা কি অবস্থা?”

বাইকে হেলান দিয়ে চারটা সিগারেট ইতিমধ্যে শেষ করছে তেহরাব, হাতে আরেকটা। নদীর পার সাদা বালু মাটির উপর দাঁড়িয়ে সোনালী আকাশ দেখতে ব্যস্ত সে, এর মাঝেই ফাহিম এসে উপস্থিত হয়।

তেহরাব ফাহিমের দিকে তাকায়,

“এইতো চলছে, তোর?”

“আমারও, আজ সারাদিন বের হলি না যে?”

তেহরাব সিগারেট মটা ফেলে দেয়,হায় তুলতে তুলতে বলে, 

“আর বলিস না, সেই লেভেলের জ্বর এসেছিল। আচ্ছা রনি কোথায়? কদিন ধরে খবর পাচ্ছি না!”

ফাহিম ইটের টুকরো নিয়ে পানিতে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে বলে,

“ ওই তো শুনলাম ঢাকা গিয়েছে, ওর বাপে কামে লাগাই দিছে!”

তেহরাব কিঞ্চিৎ হাসে, তনয়াদের বাড়ির পাশেই রনির বাসা। ওর থেকেই তনয়ার খবর নিত কম বেশি, তা এখন তো ওই ছেলেরই খবর নেয়। প্রতিদিন চকপাড়া গেলে লোকে সন্দেহ করবে, আজ বের হয়েছিল চকপাড়ার উদ্দেশ্যে কিন্তু যায়নি। উল্টো বালিয়া এসে ব্রিজের নিচে বসে আছে, একা একা বোর লাগছিল বলে ফাহিমকে ডাকা।

তেহরাব ফোন বের করল, গোটা বিকেল জুরে শতবার কল করেছে তনয়াকে, মেয়েটা ধরেনি। চিন্তা হচ্ছে তেহরাবের, তবে কি করবে সে? কার কাছে জিজ্ঞেস করবে? 

আবারো ডায়াল করল তনয়ার নাম্বারে,রিং হলো। কয়েক সেকেন্ড বাদেই কল রিসিভ হলো, তেহরাবের অধরে ফুটে উঠল প্রশান্তির হাসি। অস্পষ্ট বিড়বিড়াল,

“জান!”

ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলছে না দেখে তেহরাব নিজেই বলল,

“হ্যালো!”

তৎক্ষনাৎ ওপাশ থেকে জবাব এলো,

“ কি হয়েছে? এতবার কল করে বিরক্ত করছেন কেন? বুঝতে পারেন না আমি বিরক্ত হয়!”

অন্যদিন হলে তেহরাব রেগে যেত, উল্টো তনয়াকে শাসাত,তবে আজ তার বিপরীত। উল্টো মৃদু হাসল,

“ বিরক্ত করতেই তো আসি আমি, তোকে বিরক্ত করতে ভালো লাগে!”

ওপাশ থেকে ভেসে আসল তনয়া ঝাঁঝালো কন্ঠস্বর,

“আমাকে আপনি কল করবেন না, আপনার কি একটুও আত্মসম্মান বোধ নেয় বলুন তো? একটা মেয়ে বার বার আপনাকে অবজ্ঞা করছে, প্রত্যাখ্যান করছে, আর আপনি তাও তার পিছে ঘুরঘুর করছেন! নূন্যতম আত্মসম্মানবোধ থাকলে আমাকে আর কল করবেন না!”

এবার তেহরাব নড়েচড়ে বসল, চেহারায় ভর করল গম্ভীরতা। 

“কি হয়েছে তোর? এভাবে কথা বলছিস কেন? ভালো ভাবে কথা বলছি দেখে আকাশে উড়ছিস? “

তেহরাবের গম্ভীর কন্ঠস্বর তনয়াকে ভেঙে দিচ্ছে, তাকে গুলিয়ে দিচ্ছে। নিজেকে যথাসম্ভব কঠিন রেখে বলে,

“আপনি যদি ফারদার আমাকে কল করেছেন আমি আপনার নামে পুলিশ কেস করব, বাংলা কথা বুঝতে পেরেছেন?”

তেহরাব এবার রেগে যাচ্ছে, তার কপালের রগ ফুলে উঠেছে, নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করছে সে। 

“তনয়া আমাকে রাগাস না, তুই এমন বিহেব কেন করছিস?”

“আপনি আসলেই ভালো কথার মানুষ না, রাখছি!”

তেহরাব ক্রুর হাসে,

“কল কেটে দেখ শুধু, আমি তোর বাড়ি চলে আসব তনয়া। আমার উপর রাগ দেখাচ্ছিস তুই?”

“বাড়ি কেন? জাহান্নামে চলে আসুন, যা ইচ্ছা করুন 
আমি বিরক্ত এসবে, মুক্তি দির প্লিজ! আপনার মুখটাও আমি আর দেখতে চাই না!”

বলেই কল কেটে দেয় তনয়া, সাথে সাথে নাম্বারটা ব্লক করে ফেলে। বসে পরে ওয়াশরুমেই, বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। লোকটাকে এতগুলো কথা শোনাতে তার প্রচুর কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু তারও যে কিছু করার নেয়!

এদিকে তনয়া কল কেটে দিতেই ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে তাকে তেহরাব, তার ঘাড় থেকে কপালের প্রতিটি রগ ফুলে উঠেছে। এদিক ওদিক ঘাড় বাকিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু না পরল না। ফোনটা ছুঁড়ে মারল নদীতে, বাইকে লাথি বসিয়ে দিল জোরে৷ চিৎকার করে উঠল,

“মেরে ফেলব, একদম মেরে ফেলব তনয়া। কেন এমন করছিস আমার সাথে? কি সমস্যা কি তোর?আহহহহ!”

বাইকটা এত জোরে লাথি মেরেছিল যে বাইকপা পরে গেছে, ফাহিম তেহরাবের চিৎকার শুনে দ্রুত তাকে জড়িয়ে ধরে পেছন থেকে।

“আরে আরে কি হয়েছে তোর, এমন করছিস কেন? শান্ত হ ভাই! “

কিন্তু তেহরাব কি আর শান্ত হওয়ার ছেলে?রাগে কষ্টে মাথা কাজ করছে না তার, তনয়া তার মানসিক শান্তি অথচ এই মেয়েই তাকে সবচেয়ে বেশি অশান্তি দিচ্ছে।

“ফাহিম আমাকে ছাড়, আমি এক্ষুনি তনয়ার বাড়ি যাব, ছাড় আমায়!”

ফাহিম বুঝতে পারলো তনাকে নিয়েই কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে, তাই আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তেহরাবকে। 

“তেহরাব রিলাক্স মামা, এত পাগলামি কেন করছিস। কি হয়েছে বল আমাকে?”

তেহরাব মাথায় হাত দিয়ে নিজের চুল চেপে ধরল, চিৎকার করে বলতে লাগল,

“ফাহিম, মেয়েটা আমার শান্তি দিচ্ছে না, এক বিন্দু শান্তি দিচ্ছে না। আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছে, এই মেয়েটা কেন এমন করে? আমি কি পাপ করেছি? আমাকে কেন ভালোবাসা যায় না?”

তেহরাব পাগলের মতো করছে, ফাহিম তেহরাবকে নিয়ে নদীর পারে বসায়, এতসময়ে অন্ধকার নেমে এসেছে ধরিত্রীতে! কোনোরকম শান্ত করে বলে,

“এটা তো নতুন না তেহরাব, তনয়া তো আগে থেকেই তঁকে এড়িয়ে চলে৷ ও ভীতু স্বভাবের, সমাজ, পরিবার সব কিছুতেই ওর ভয়, তুই তো জানিস। তাহলে কেন পাগলামি করছিস? পরিক্ষাটা শেষ হোক, তারপর আঙ্কেলকে দিয়ে ওর বাড়ি সম্মন্ধ পাঠাস, আমি নিশ্চিত তারা না করবে না!”

ফাহিমের কথায় কিছুটা শান্ত হয় তেহরাব, মনে মনে ভেবে নেই পরিক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে তনয়াকে নিযে আসবে নিজের কাছে, এই মেয়েকে ছাড়া সে দূরে থাকতে পারবে না।!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp