হাওয়াই মিঠাই - পর্ব ২৪ - তামান্না ইসলাম শিমলা - ধারাবাহিক গল্প

হাওয়াই মিঠাই - তামান্না ইসলাম শিমলা
          লাল টুকটুকে বউ সাজে বসে আছে তনয়া, অপ্সরা থেকে কম লাগছে না তাকে। প্রীতি আর রাফা মিলে তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে, গা ভর্তি গহনা। হাতে আছে তার শাশুড়ির দেওয়া সেই চুরিগুলো,

“নে দেখে নে এবার কেমন লাগছে! “

রাফার কথায় তনয়া হাসিমুখে বিছানা থেকে উঠে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, পা থেকে মাথা পর্যন্ত নিজেকে পর্যবেক্ষণ করে। সত্যিটা কি সুন্দর লাগছে, আজ তার বিয়ে, নিজের অজান্তেই নিজের শব্দকে দিয়ে যাকে ভালবেসে ছিল আজ তার সাথেই তার বিয়ে। অজানা কারণে তার খুব লজ্জা লাগছে, করবেই বা না কেন? 

তেহরাব যে নির্লজ্জ, দেখা যাবে সবার সামনে কিছু একটা আবার বলে ফেলবে, লজ্জায় পড়তে হবে তনয়াকে।

“আপু দুলাব্রো কল করেছে!”

মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে তানহা ঘরে প্রবেশ করে, তানহাদার কথায় রাফা ও প্রীতি হেসে ওঠে। তনয়া লজ্জা পায় , এই লোকটা কেন ফোন দিতে হবে? একটু পর তো আসবেই তারা, তানহা এবার তাড়াহুড়ো করে ফোনটা তনয়ার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়। 

“থাক আর লজ্জা পেতে হবে না, কথা বল!”

তনয়া রিসিভ করে না, উল্টো ফোন বন্ধ করে রেখে দেয়। আজ যে তারিখে বেশি লজ্জা করছে, কিভাবে কথা বলবে সে? 

রাফা এসে তনয়াকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল, 

“তোকে যা লাগছে না, তেহরাব ভাই তো পাগল হয়ে যাবে!”

“তা আর বলতে? সে তো এমনি তেই পাগল আর এখন এই রূপে দেখলে, এহুম এহুম!”

প্রীতি আর রাফা তাকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিচ্ছে, তনয়া দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলে। হেসে উঠে দুজনে,এমন সময় ঘরে প্রবেশ করে তানিয়া। তার যে আজ বহু কাজ, মোটামুটি কাজ শেষ। এখন শুধু প্লেট গুলো ধুয়ে টেবিলে সাজাবে, সেগুলোই নিতে এসেছে তিনি! অন্যদিকে তাকানোর সময়ই পাইনি সে, এদিকে তার মেয়েটা যে লাল টুকটুকে বউ সেজে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে কি তার নজর আছে? 

“আরে কাকি, তনয়ার দিকে একবার তাকাও তো, দেখো কেমন লাগছে!”

তানিয়া পিছন ফিরে তাকাল, তনয়াকে দেখে কিছু মুহূর্তের জন্য তিনিও থেমে গেলেন। মেয়েটা তার সত্যি বড় হয়ে গেছে, আজ মেয়েটার বিয়ে। চলে যাবে শ্বশুর বাড়ি সারা জীবনের মতো, চোখের কোণে জমা হলেও মৃদু অশ্রুকণা। কোনরকম নিজের কান্না আজকে তনয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো, 

“মাশাল্লাহ, আমার মেয়েটাকে একদম পরীর মতো লাগছে! কারো নজর না লাগুক, থু থু থু!”

তানিয়ার শেষ কার্যক্রম দেখে হেসে উঠল তনয়া নিজেও, তার মা তার শরীরে থুতু ছিটিয়ে দিচ্ছে যাতে করে তার নজর না লাগে। তানিয়া করো চোখে তনয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,

“হাসবি না, ভালোর জন্যই করছি! খুব সুন্দর লাগছে!”

“কিগো মা প্লেট গুলো দাও, ধুয়ে আমিও রেডি হব!”

তানহার কথায় তার টনক নড়ে, সে তো এসেছে শোকেস থেকে প্লেট নিতে। দ্রুত শোকেসের কাছে গিয়ে প্লেট গুলো বের করল, তানহার হাতে দিয়ে বলল, 

“ধর, ভালো করে ধুবি। ভাঙেনা যেন! আমি দেখি তোর বাপে তৈরি হলো কিনা!”

তানহা চলে গেল প্লেট নিয়ে, বেচারা আজকে পড়েছে ফেশাদে। কমবেশি সব কাজে যে আজ তারই করতে হচ্ছে, তনয়ার ছুটি!

—————

থমথমে মুখ করে সকলেই নিজের নিজের কাজ করছে, তেহরাব বিরক্ত সাথে খারাপও লাগছে। কালকের বিষয়টা নিয়ে সকালে ছোট মোটো টর্নেডো বয়ে গিয়েছিল, সেটা এখন রূপ নিয়েছে নিরবতায়।

তেহরাবের সাথে কেউ কথা বলছে না, এমনকি তার বাবাও না। সে রেগে আছে, গতকাল মানা করা সত্ত্বেও কেন তেহরাব গেল? গতকাল যদি না যেত আজ তো তাহলে তার পা এরকম ক্ষত হতো না! ছেলেটা ইালো মতো হাঁটতে পারছে না, আজ একটা শুভ কাজে যাচ্ছে তারা!

তেহরাব ইরার রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, পার্লার থেকে লোক এসেছে। তারা সাজাচ্ছে ইরাকে, বাড়িতে অনেক লোক। ঘরোয়া বিয়ের নমুনা এটা, চোদ্দ গুষ্টি এসে হাজির, তেহরাবের এত মানুষ পছন্দ না।

তেহরাব কিছু না বলে ইরার কাছে আসল, ভাইকে দেখে ইরাও মুখ ঘুরিয়ে নিল। তেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল, গতকাল যাওয়াটা সত্যি ঠিক হয়নি!

“তুই অন্তত রাগ করিস না, আজ তো আমারও বিয়ে। অথচ কেউ পাত্তায় দিচ্ছে না, আমি কি ইচ্ছে করে ব্যথা পেয়েছি?”

ইরা আড় চোখে তাকাল তেহরাবের দিকে, নাক টেনে বলল,

“চোখের সামনে থেকে সর, কথা বলবি না।”

তেহরাব পকেট থেকে একটি ছোট্ট বক্স বের করে ইরার দিকে এগিয়ে দেয়, ইরা কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বক্সটা হাতে নেই। দ্রুত খুলে দেখে ভেতরে শ্যানেলের পারফিউম, মুখটা আপনাআপনি হা হয়ে যায় ইরার।

চট করে উঠে দাঁড়ায়,

“তোর মনে আছে?”

তেহরাব ইরার মাথায় টোকা মেরে বলে,

“আমার স্মৃতিশক্তি কি তোর মত দুর্বল নাকি? নাকি ভেবেছিস আমার মাথায় তোর মতোই গোবর? কথামতো তোর বিয়ের দিন তোর ফেভারিট ব্র্যান্ডের পারফিউম, এখন ধন্যবাদ দে! “

ইরাতো খুশিতে আকাশে উড়ছে, স্প্রে করে নিজের শরীরে। তেহরাব ভ্রু কুঁচকে বলে,

“ধন্যবাদ দে!”

“দেব না!”

ইরা কথাটা বলার সাথে সাথে তেহরাব ইরার হাত থেকো পারফিউমটা ছো মেরে নিয়ে নেয়, ইরাকে নকল করে বলে।

“আমিও দেব না!”

ইরা গাল ফোলায়,

“ভাইয়া!”

তেহরাব হাত উঠিয়ে মারার ভাব ধরে বলে,

“নে ধর, গিল। ধন্যবাদ দিলে তো মুখে গু পরবে!”

ইরা পারফিউমটা নিয়ে বসে পরে, পার্লারের মেযে দুটো আবারো সাজানে আরম্ভ করে। ইরা বলে,

“ওইটা তোর মাথায়!”

তেহরাব আড়ালে হাসে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, 

“শাঁকচুন্নি একটা!”

খুড়োতে খুড়োতে নিজের রুমে আসে তেহরাব, ভেতরে যেতেই অবাক হয়। ইউসুফ বিছানায় তেহরাবের পাঞ্জাবী ইস্ত্রি করছে, তেহরাব মুখ টিপে হাসে। তার বাবা যে তার বন্ধু, সে কি রাগ করে থাকতে পারবে?

তেহরাব পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল ইউসুফকে,

“ কিগো লিটনের নাতি, রাগ পরেছে?”

তেহরাবের মুখে নিজের দাদার নাম শুনে অবাক হয় ইউসুফ, নিজেকে ছাড়িয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তুই আমার দাদার নাম জানলি কীভাবে?”

তেহরাব বিছানায় বসল, পাঞ্জাবীটা হাতে নিয়ে দেখল।

“তোমার বড় বোন বলেছে, মানে আমার একমাত্র ফুপু!”

ইউসুফ আবারও নিজেকে কঠিন রূপে প্রদর্শন করে বলল,

“রেডি হয়ে জলদি নিচে আসো, দ্রুত যেতে হবে। বউ নিয়ে বাড়ি এসে ইরাকে বিদায় দিতে হবে, আমারই ভুল হয়েছে এক দিনে দুটো বিয়ে ফেলা। এখন বুঝতে পারছি সমস্যাটা।”

“ আমিও ভাবছিলাম, সেদিনি বিয়েটা করে নিলে ভালো হতো। শুধু শুধু দুদিন লেট করালে, যাও যাও গাড়ি স্টার্ট দাও। আমি রেডি!”

ইউসুফ পেছনে তাকাতেই দেখে তেহরাব পাঞ্জাবী পায়জামা পরে একদম ফিটফাট। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুলো ঠিক করছে, এ মানুষ নাকি জীন? নাকি বিয়ে করার জন্য এত দ্রুত? 

“চুলটা কাটবি তো? বাবরি চুল নিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছিস, লোকে কি বলবে?”

তেহরাব হাতে ঘড়ি পরতে পরতে বলে,

“এটা ফ্যাশন বাবা, আমার সিগনেচার ফ্যাশন। তুমি বুঝবে না, চলো গাড়ি বের কর। তেহরাব সরকার গেট রেডি টু বি সাদি, এখন দ্রুত চল শশুর বাড়ি। তোমার না, আমার!”

তেহরাব ইউসুফকে রেখেই বরুম থেকে বেরিয়ে যায়, ইউসুফ হাসে। বিয়ের এক্সাইটমেন্টে পায়ের ব্যথাও ঠিক হয়ে গেছে ছেলের, সেও নিচে চলে আসল।

এবাড়ি থেকে দশ জনের মতো লোক যাবে, তেহরাবের মামা, খালু, ফুপা, ফুপাতো ভাই,ফাহিম,রিমু, তেহরাব, ইউসুফ আর তার কিছু বিশেষ অতিথি!

বেরোনোর সময় তাসলিমা তেহরাবকে দুধ খাইয়ে দিয়ে বলে,

“আমার বাড়ির জন্য মেয়ে নিয়ে আসিস, নতুন সম্পর্কে জড়াচ্ছিস। নিজের দায়িত্ব কর্তব্য সঠিক ভাবে পালন করবি, নিজের স্ত্রীকে সম্মান ও ভালো বাসবি! “

তেহরাব ফট করে বলে উঠে,

“ঘরটা সুন্দর করে সাজিও, আর তোমার জন্য মেয়ে আনতে পারব না। ছেলের বউ আনব, আমার বউ এমনিতেও আমাকে ভাই ডাকে!”

“আজকের দিনটা মার খাস না তেহরাব!”

মায়ের হাসি মুখের কথা শুনে তেহরাবও হাসে, সালাম করে বেরিয়ে যায় সে। বাইরে এসে তেহরাবকে গাড়িতে না বসে গ্যারেজের দিকে যেতে দেখে ভ্রু কুঁচকায় ইউসুফ, তেহরাবের মামা ইখলাস ডাকে তেহরাবকে।

“কিরে ওইদিকে কোথায় যাচ্ছিস?”

তেহরাব কিছু জবাব না দিয়ে পায়ের ব্যথা নিয়েই দৌড় লাগায়, ফিরে আসে মিনিট পাঁচেক পর বাইকে চরে। বাইক এসে থামে সবার সামনে,

“তুমি বাইকে কেন?”

ফুপার কথায় তেহরাব সানগ্লাসটা পরতে পরতে বলে,

“আমার বউকে আমি বাইকে করেই আনব, গাড়িতে করে তোমরা যাও। আমি আসছি।”

“আঙ্কেল তোমরা গাড়িতে যাও, আমি আর তেহরাব বাইকেই আসছি।”

ফাহিমের কথায় কেউ আর কোনো কথা বাড়ায় না, তেহরাবকে কিছু বলেও লাভ নেই। যা বলেছে সেটাই করবে, সবাই গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। ফাহিম বাইকের সামনে এসে বলল,

“তুই নাম আমি চালায়, পায়ে না ব্যথা!”

তেহরাব হেলমেটটা ফাহিমের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলে,

“ আমি পারব, তুই হেলমেট পর, ফাটা মাথা আবার ফাটলে আর বাঁচবি না!”

ফাহিম চোখ মুখ কুঁচকে পেছনে উঠে বসে,

“সোহেলের মতো মাথা ফাটলে কি আর আমি এখানে সুস্থ দাঁড়িয়ে থাকতাম? যা অবস্থা করেছিস, কেস না করে বসে।!”

তেহরাব বাঁকা হাসে, আয়নাটা সোজা করে বলে,

“কেস করলে ওই নিজেই জেলে যাবে, রিলাক্স ডুড! ওয়ান, টু, থ্রি!”

বলেই বাইক স্টার্ট দেয় তেহরাব, সাধারণের তুলনার অধিক স্পিডে শো শো করে চলে যায় বাড়ুর গাড়িকে পেছনে ফেলে। গাড়ি থেকে ইউসুফ চেঁচিয়ে উঠে,

“তেহরাব, এত স্পিডে চালাচ্ছিস কেন? এই ছেলেটাও না কোনো দিন সুধরাবে না!”

তেহরাবের কান অব্দি কথাটা আর পৌঁছাল না, তার আগেই তার বাইক সকলে দৃষ্টি সীমানা পেরিয়ে গিয়েছে!

—————

“তোর জামাই এস পরেছে, এবার আমার জামাইযের ব্যবস্থাটা করে দে।”

তনয়া মাথা তুলে চাইল তানহার মুখপানে, আসে আশে পাশে এত মানুষ অথচ এই মেয়ে নিজের বিযের কথা বলছে। এর কি বুদ্ধি শুদ্ধি হবে না?

তানহা এসে বিছানায় তনয়ার পাশে বসল, ফোনে কিছু একটা বের করে তনয়াকে দেখাল।

“এইযে তোর জামাই, দেখ লুকিয়ে লুকিয়ে তোর জন্য তুলে এনেছি। এর বিনিময়ে হলেও আম্মুকে বলে বিয়েটা দিয়ে দে!”

তানহার কোনো কথা শুনল না তনয়া, শুধু তাকিয়ে রইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে। ফর্সা দেহে শুভ্র পাঞ্জাবী, কলারের ভাজে সানগ্লাস, ওলফকাট চুল গুলো কপালে পরে আছে, ঠোঁটে ক্রুর হাসি। মারাত্মক লাগছে লোকটাকে, তনয়ার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল, ছবিটা দূর থেকে তোলায় তেহরাবের মুখটা ভালো মতো বোঝা যাচ্ছে না তারপরেও মারাত্মক লাগছে!

গলা শুকিয়ে গেল তনয়ার, তানহা ফোনটা বন্ধ করে দিল।

“তোকে কিছু বলেছি?”

তনয়া তাকায় তানহার দিকে, ঠোঁট উল্টে বসে আছে। রাফা গাট্টা মেরে বলে,

“এত বিয়ের শখ? দাঁড়া আমাদের হাই স্কুলের দপ্তরির সাথে তঁকে দিয়ে দেব। বয়স একটু বেশি, কিন্তু সিংগল। দারুণ মানাবে!”

“আহ রাফা আপু!”

উপস্থিত সব কাজিনরা হোসে উঠে, তাতে অবশ্য যায় আসে না তানহার। মনে মনে পন করল এই মাসেই সে বিয়ে করবে, কি করে করবে জানা নেয়। কিন্তু করবেই!

বাইরে খাওয়া দাওয়ার আসর বসেছে, মেহমানদের খাওয়া শেষ হতেই তনয়ার কাজিনদের জন্য খাবার নিয়ে আসে তানহা আর তানিয়া, তাদের হেল্প করছে প্রীতি ও রাফা। মেহমানদের বসানো হয়েছে বসার ঘরে, তারা মোহরানা থেকে শুরু করে যাবতীয় সকল কথা বার্তা নিয়ে আলোচনা করছে। বিয়েতে যেমনটা হয় আরকি!

এদিকে তনয়ার গলা দিয়ে খাবার নামছে না, সারাদিন হাসি খুশি থাকলেও এখন তার কষ্ট হচ্ছে। সে তার বাড়ি থেকে চলে যাবে, সবাইকে ছেড়ে। কি করে থাকবে? প্রীতি, রাফা জোর করেও খাওয়াতে পারেনি তনয়াকে, তানিয়া খাবারের প্লেট নিয়ে তনয়ার সামনে বসে। তার চোখ টলমল করছে, তা লক্ষ্য করল তনয়া। তার যে আরো বেশি কান্না পাচ্ছে, তানিয়ার জোরাজোরিতে দু তিন লোকমা পোলাও খেয়ে আর খেল না! গলা দিয়ে নামছে, বুকের ভেতর ধুকধুক করছে!!

সময় পেরোলো, বিয়েও পরানো হলো। কবুল বলতে গিয়েও সেকি কান্ড। কেঁদে কেটে একাকার তানিয়া, তনয়াও মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না, আধঘন্টা এসব চলল। তারপরে গিয়ে না কবুল বলল, আল্লাহর ইচ্ছায় বিয়ে সম্পন্ন হলো, দুজনে যুক্ত হলো বিবাহ নামক বন্ধনে। এ বন্ধন পবিত্র বন্ধন, এ বন্ধন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এক সাথে থাকার, এই বন্ধন বিশ্বাসের, ভালোবাসার, সম্মানের।

—————

আছরের আযান দিয়েছে, এবার বের হওয়া উচিত। তেহরাব উতলা, সে যে এখনো তার সদ্য বিয়ে করা বউয়ের মুখটা দেখতে পারেনি। নিয়ম অনুযায়ী দুজন দুঘরে, তর সয়ছে না তেহরাবের। নিজের এলোকেশীকে এক নজর দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে, এই বন্ধন যেন তেহরাবকে ছন্নছাড়া করে তুলছে।

বারবার তাকাচ্ছে তনয়ার রুমের দিকে, ভেতরে অনেক মানুষ। এ ঘরে বসে কি ওঘরে থাকা তার এলোকেশী মকে দেখা যায়? শুধু শুনতে পাচ্ছে কিছু মানুষের কান্নার শব্দ!

“বেয়াই সাহেব এবার বিদায় নেওয়া উচিত, আমার বাড়িও তো মেয়েটা অপেক্ষা করছে।”

ইউসুফের কথায় শফিক মাথা নাড়লেন, তার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। সে তো আর মেয়েদের মত কাঁদতে পারছে না, কিন্তু মেয়ের জন্য তো তারও কষ্ট হচ্ছে। তার প্রথম সন্তান, বাবা হওয়ার প্রথম অনুভুতি, প্রথম বাবা বলে ডাকা সব তো তনয়াকে দিয়েই শুরু হয়েছিল। এই তো সেদিন তার ছোট্ট মেয়েটা কোলে করে ঈদের মাঠে নিয়ে যেত, সেই মেয়ে আজ তার ঘর খালি করে অন্য বাড়ির বউ হয়ে চলে যাবে।
চোখ জোড়া ভিজে আসল, বুকটা ব্যথা করছে। কোনোরকম নিজেকে সামলে তনয়ার ঘরের দিকে পা বাড়াল, 

“মা, আর কাঁদিস না।সব মেয়েকেই তো স্বামীর ঘরে যেতে হয়, কাঁদছিস কেন? তুই তো নতুন বাড়িতে যাচ্ছিস, তোর নিজের সংসার,কত দায়িত্ব! এভাবে কাঁদলে চলবে?”

বাবার কন্ঠস্বর পেয়ে মাকে ছেড়ে দৌড়ে আসে বাবার কাছে, জড়িয়ে ধরে শফিককে। মেয়েটা চোখের পানি নাকের পানি এক করে ফেলেছে কাঁদতে কাঁদতে, কি অবস্থা।

“আব্বু আমি যাব না, তোমাদের ছেড়ে আমি যাব না!”

শফিক মেয়ের মাথায় হাত রাখে, নিজেকে যে শক্ত রাখতে হবে।

“কীসব বলিস, ছেড়ে যাবি কেন? আসবি তো, যখন খুশি আসবি। এটা তো তোরই বাড়ি! বাইরে যে তেহরাব বাবা অপেক্ষা করছে, ছেলেটাকে আর কত সময় দাঁড় করিয়ে রাখবি?”

তনয়া ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে,

“আমি যাব না, ওনাদের চলে যেতে বলো, আমি কোথায় যাব না আব্বু!”

তানিয়া বিছানার উপর মুখে আঁচল গুঁজে কাদছে, সবার চোখেই পানি। শফিক কোনো রকম মেয়েকে নিয়ে বাইরে আসে, সকলেই উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে।
তনয়া এখনো তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে আছে, মেয়েদের প্রথম ভালোবাসা তার বাবা। এই মানুষটার জন্যই তো সে তার ভালোবাসাকে পাচ্ছে!!

রফিক এগিয়ে আসলেন, তনয়াকে শফিকের থেকে ছাড়িয়ে তেহরাবের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। রফিক তনয়ার হাত তেহরাবের হাতে তুলে দেন,

“আমাদের বাড়ির মেয়েকে আমরা ভরসা করে তোমার হাতে তুলে দিলাম, আশা করব আমরা যেভাবে যত্নে রেখেছি তুমিও সেভাবেই রাখবে।”

তেহরাব শক্ত করে তনয়ার হাতটা ধরে, তার খুব ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে মেয়েটাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে। তনয়া রফিকের বুকে মুখ গুঁজে রেখেছে, তেহরাব বড় করে শ্বাস নিয়ে তনয়ার কান্নামিশ্রিত চেহারার দিকে তাকিয়ে বলে,

“আপনাদের মেয়ে এখন আমার স্ত্রী, আপনাদের থেকে হাজরগুণ বেশি যত্নে আমি তাকে রাখব। আপনাদের মেয়ে যে আমার খুব শখের, তাকে অযত্ন রাখি কি করে?”

শফিক নিজেকে আর আটকাটাতে পারলেন না, গড়িয়ে পরল চোখের পানি। ইউসুফের সাথে কোলাকুলি করে বলল,

“মেয়েটাকে দেখে রাখবেন, আপনাদের উপর আমার ভরসা আছে!”

ইউসুফ আস্বস্ত করেন, 

“আপনার মেয়ে আমার মেয়ে হয়ে থাকবে, চিন্তা করবেন না।”

অতঃপর তনয়াকে নিজের বাহুতে আগলে নেয় তেহরাব, পিঠে হাত দিয়ে তনয়ার দিকে তাকায়। চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলে,

“কেন কাঁদছিস? আমি আছি তো!”

তেহরাব ভ্রু উচিয়ে স্মিত হাসে, তনয়া নিজেও আকড়ে ধরে তেহরাবের পাঞ্জাবী। পিছন ফিরে তাকায় বাড়ির দিকে, নিজের রুমটার দিকে, নিজের চিরচেনা মানুষগুলোর দিকে, বারান্দার খাম ধরে কান্না করা তার বোন ও মায়ের দিকে। আজ তানহাও কাঁদছে! 

অতঃপর গেট পেরিয়ে পা বাড়ায় নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্য, তার আপন ঠিকানায়। এটাই তো শুনে এসেছে, স্বামীর বাড়ি নাকি আপন বাড়ি, আজ সে তার আপন বাড়ি পেয়েছে। যেখানে আছে তার নতুন পরিবার, তার জন্মান্তরের সঙ্গী তার স্বামী, তার ভরসার শেষ আশ্রয়। তার মাথা রাখার খাম!!
মনে মনে আওড়াল,

“সব কিছুর জন্য আল্লাহ আপনার নিটক আমি কৃতজ্ঞ, ধন্যবাদ!”

ঠিক একই সময় তেহরাবও মনে মনে আওড়াল,

“আমার শখের নারী, আমার এলোকেশী, আপনাকে আমার জীবনে আসার জন্য ধন্যবাদ৷ আর আপনাকে আমার করার জন্য আল্লাহ্ কে ধন্যবাদ! “

অতঃপর দুজনের নতুন জীবনের সূচনা হলো, বাঁধা পরল দুজনে এক সুতোই। তেহরাব তনয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, বিড়বিড়াল,

“ এবার যে আর পালানোর পথ নেই আপনার, আপনি শুধু আমার। শুধু আমার!!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp