প্রিয়দের কাল্পনিক সাক্ষাৎ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - অনু গল্প

পড়ুন নৌশিন আহমেদ রোদেলা রচিত একটি অসাধারন ছোটো দুষ্টু মিষ্টি সামাজিক ভালোবাসার গল্প প্রিয়দের কাল্পনিক সাক্ষাৎ শুধুমাত্র গল্পের ডায়েরি ওয়েবসাইটে
প্রিয়দের কাল্পনিক সাক্ষাৎ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা
          কুচকুচে কালো কাকটা ছাঁদের ডানপাশের রেলিংয়ের উপর বসে আছে। সকালের মিষ্টি রোদে চোখদুটো কেমন ছলছল করছে। মনে হচ্ছে, সুপ্ত কোনো দুঃখে ভীষণভাবে কাতর সে। চোখ দুটো বোজে নিলেই স্তব্ধতা কাটিয়ে জল গড়াবে। গায়ে লাল সুয়েটার। হাতে-পায়ে মোজা আর মাথায় মস্ত একটা শীত টুপি পরে দুঃখী চোখের কাকটিকেই নিরক্ষণ করছিল কৌতূহলমাখা কচি দুটো চোখ। তার ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটোতে পাউরুটি আর চিপসের প্যাকেট। চিপসের প্যাকেটটা চাচ্চু দিয়েছে। ভাইয়েরা তাদের চিপসের প্যাকেট সাবাড় করে নিলেও শুভ্রতা খাচ্ছে না। মা বলেছে, সকাল বেলা চিপস খেলে পেট ব্যথা হয় তাই ইচ্ছে থাকলেও চিপস খাওয়া যাচ্ছে না। শুভ্রতা হাত বাড়িয়ে কাকটাকে ডাকল,

' কা কা আয়...' 

কাকটা শুভ্রতার আন্তরিকতাটাকে বোধহয় খুব একটা ভালো চোখে দেখল না। কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে উড়ে এসে শুভ্রতার পাউরুটির ওপর হানা দিলো। ছু মেরে পাউরুটিটা নিয়েই ডানা মেলে উড়ে গেল অদূরে। শুভ্রতা চমকে ওঠে বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে রইল। ছাঁদে বামদিকের রেলিংটাতে ঝুলাঝুলি করছিল আদ্র আর রোদ্র। শুভ্রতাকে এমন হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভারি বিরক্ত গলায় বলল রোদ্র,

' তুই খুব বোকা বোন। কাককে কি কেউ পাউরুটি খেতে ডাকে?' 

শুভ্রতা বড় বড় বিস্মিত চোখজোড়া মেলে ভাইদের দিকে তাকাল। রেলিং-এর ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে আদ্র। হাতে সাদা রঙের একটা বাক্স। বক্সটা মূলত বড় দিদার। ঔষধ দিয়ে ঠাসা বক্সটা খুব সকালেই বড় দিদার ঘর থেকে সরিয়ে ফেলেছে দুই ভাই। বক্সটাতে ঔষধগুলো অবশিষ্ট নেই তবে অনেকগুলো লাল পিঁপড়া আছে। এই পিঁপড়াগুলো বাগানের কোণা থেকে অনেক খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করেছে তারা। আদ্র গম্ভীর গলায় বলল,

' বড় দিদা বলেছিল বিড়ালের মধ্যে ভূত থাকে। কাকের মধ্যেও ভূত থাকে। কাকের তো দাঁত নেই। ভূত না হলে অতো বড় পাউরুটি খাবে কি করে?' 

রোদ্র মাথা ঝাঁকাল। কিছু বলার জন্য প্রস্তুতি নিতেই সিঁড়ি ঘর থেকে মায়ের কন্ঠ এলো। সাথে সাথেই রেলিং থেকে নেমে দৌঁড় লাগাল দু'জনে। রোদ্র বোনের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল,

' বোন দৌঁড়া। বোকার মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এখনই মাইর পড়বে।' 

শুভ্রতাও চিপসের প্যাকেট ফেলে ভাইদের পেছনে দৌঁড় লাগাল। কিন্তু লাভ বিশেষ হলো না। মাঝ সিঁড়িতেই মায়ের হাতে ধরা পড়ে গেল শুভ্রতা। 

' আম্মু? বড় দিদার ঔষধের বাক্স নিয়েছ তুমি?' 

শুভ্রতা বড় বড় চোখ মেলে তাকায়। আধো আধো গলায় বলে,

' আমি নিই না।' 

রোদেলা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মেয়ের মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল,

' সত্যি?' 

' ছত্তি।' 

রোদেলা কয়েক সেকেন্ড মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মিষ্টি হেসে মেয়েকে কোলে তুলে নিল। কচি গালে চুমু দিয়ে বলল,

' তাহলে কে নিলো? তুমি জানো কে নিয়েছে? বড় দিদা ঔষধ না খেলে দিদার কষ্ট হয় তো। গায়ে ব্যথা পায়। বড় দিদা তোমায় কত্ত আদর করে। তুমি জানো? কাউকে ব্যথা দিলে আল্লাহ কত্তো রাগ করে?'  

শুভ্রতা ভাবুক গলায় বলল,

' বয়ো দিদা ব্যতা পায়?' 

' হুম। অনেক ব্যথা পায়। এখন বলো তো মা। ঔষধের বাক্সটা কে নিলো? ভাইয়ারা?' 

রুহি রাগান্বিত গলায় বলল,

' ওকে কি জিগ্যেস করছিস? ওই ফাজিল দুইটা ছাড়া এই কাজ আর কে করতে পারে? আজ এদের হাত-পা ভাঙব আমি।' 

শুভ্রতা ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো চোখে মায়ের দিকে তাকাল। বলল,

' মামুনি বাইয়াদেল মাব্বে? ওলা ব্যতা পাবে তো।' 

রোদেলা আদুরে গলায় বলল,

' না মা। মামুনি মারবে না কিন্তু আল্লাহ শাস্তি দেবে। তোমাকে বাবা বলেছে না? আল্লাহ সব দেখতে পান। কেউ যদি কাউকে কষ্ট দেয় তাহলে আল্লাহ তাদের শাস্তি দেয়। কাউকে ব্যথা দেওয়া তো খারাপ কাজ, তাই না মা? বড় দিদা যখন ব্যথায় কাঁদবে তখন আল্লাহ তো রাগ করবেন। তারপর খারাপ কাজের জন্য দুষ্টদের শাস্তি দিবেন।' 

শুভ্রতা বিস্ময় নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। দুইহাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখল। চোখ পিটপিট করে বলল,

' আল্লা অয়েক মাব্বে?' 

' হুম। যারা কাউকে কষ্ট দেয় শুধু তাদের মারবে। ভালোদের তো আল্লাহ অনেক ভালোবাসে। অনেক গিফ্ট দেয়।' 

' আমি কস্ত দিব না। তাওলে গিফ্ত পাব?' 

' হ্যাঁ পাবে।' 

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে শুভ্রতা মায়ের গলা ছেঁড়ে দু'হাতে মোনাজাতের ভঙ্গিমা করল। গম্ভীর মুখে বলল,

' আল্লা, তুমি বাইয়াদেল মেলো না। ওলা কুব বালো। ওলা বয়ো দিদাকে আল কস্ত দেবে না। ওসুতের বক্সও নেবে না। ছত্তি।' 

রোদেলা আর রুহি হেসে ফেলল। মেয়ের কপালে গভীর চুমু দিয়ে বুকে চেপে ধরল রোদেলা। মেয়েটার মুখটা একদম বাবার কার্বন কপি। দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। রোদেলার হঠাৎ করেই খেয়াল হলো তার ভার্সিটির সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটাকে কোল থেকে নামানোই এখন দুষ্কর হয়ে উঠবে। শুভ্র তো সেই সকালেই ভার্সিটি চলে গিয়েছে। রেখে গিয়েছে নিজের মতোই জেদি এক মেয়ে। রোদেলা সন্তপর্ণে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 

বটগাছের পাতার ফাঁক গেলে আসা মিষ্টি রোদেরা মাটির পাটাতনে অদ্ভুত সব ছবি আঁকছে। ঘাসে ঢাকা মাঠে গোল হয়ে বসে আছে বন্ধু-বান্ধব আর প্রেমিক-প্রেমিকার দল। শীতের সকালের প্রথম আলোয় চারপাশটা সোনালি আভা ছড়াচ্ছে। সেদিকে তাকিয়েই একের পর এক চালতার টুকরো সাবাড় করছে চিত্রা। মুখের একপাশে রোদের টুকরো এসে পড়ায় ভীষণ অদ্ভুত দেখাচ্ছে তার মুখ। সামনের রাস্তা দিয়ে গোলাপি রঙের গাউন পড়া ছোট-খাটো মিষ্টি একটি মেয়েকে দেখতে পেয়েই হাত উঁচিয়ে ডেকে উঠল চিত্রা, 

' এই রোদ? আমি এখানে। এদিকে আয়।' 

রোদেলা ফিরে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে এদিক ওদিক তাকিয়ে চিত্রাকে দেখতে পেয়েই মুখে হাসি ফুটল তার। দ্রুত পায়ে চিত্রার পাশে গিয়ে বসল। গায়ের চাদরটা টেনেটুনে ঠিক করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। চিত্রা আচারের টুকরো মুখে দিতে দিতে বলল,

' আমাদের আম্মুটা কই রে?' 

' বাসায়।' 

' নিয়ে আসলেই পারতি। তোর মেয়েটা কি মিষ্টি।' 

রোদ কপাল কুঁচকে বলল,

' পাগল! আমি ভার্সিটিতে এসেছি ক্লাস করব বলে। মেয়েকে এনে কি করব? শুধু শুধু জ্বালাতন করবে।' 

' শুভ্র ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিতি। আর জ্বালাতনের কি? কত্তো মিস্টি একটা মেয়ে। মা যা বলে তাই শুনে। তবুও বলছিস জ্বালাতন?' 

' তুই ওদের বাপ বেটিকে কতদূর জানিস বইন? দুটোই মারাত্মক রকমের ফাজিল। কাল কি করেছে জানিস? বাগানে গিয়ে লাল পিঁপড়ার কামড় খেয়ে সারা শরীর ফুলিয়ে ফেলেছে। এই আদ্র-রোদ্র ওই পিঁপড়া নিয়ে আবার বাক্সবন্দি করেছে বোনকে কামড় দেওয়ার শাস্তিস্বরূপ। ধরতে গিয়ে ওই দুটোও কামড় খেয়েছে। কান্নাকাটি করে সন্ধ্যায় আবার দিদার সুপারি কাটার সরতা দিয়ে হাত টাত কেটে বিশ্রী অবস্থা করেছে। দিদার লাঠিটাও তিনজনে মিলে ছাঁদ থেকে ফেলে দিয়েছে। ঔষধের বক্স নিয়ে ঔষধ ফেলে এসেছে মালি চাচার ঘরের পাশে। সব মিলিয়ে একদম পাগল হয়ে যাচ্ছি। এদিকে মেয়ের বাবা আমাকে বকাবকি। আমি মেয়েকে সামলে রাখি না। এখনও বাচ্চামো করি। হেনতেন। কেমন লাগে বল?' 

চিত্রা খিলখিল করে হেসে উঠল। রোদেলা রাগ নিয়ে বলল,

' একদম হাসবি না। হাসলে ধরে নিয়ে শিশির স্যারের কোলে বসিয়ে দিয়ে আসব। বেয়াদব মাইয়া।' 

চিত্রা হাসি থামাল। সামনের একটা মেয়েকে দেখিয়ে বলল,

' ওই মেয়েটাকে দেখ। এই মেয়েটা সারাদিন শুভ্র ভাইয়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করে। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে হয়ত। সেদিন দেখলাম ডিপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে শুভ্র ভাইয়ের সাথে কথা বলছে।' 

এটুকু বলতেই ফুঁসে উঠল রোদেলা। রোদেলার থমথমে মুখ দেখে চুপসে গেল চিত্রা। ভয়ে ভয়ে বলল,

' তোর আবার কি হলো?' 

রোদেলা উত্তর দিল না। এমন সময় হাতের মুঠোফোনটা কেঁপে উঠল। রোদেলা কিছুক্ষণ থম ধরে বসে থেকে ফোন রিসিভ করল। ধারালো কন্ঠে বলল,

' কি সমস্যা?' 

ওপাশ থেকে হাসিমাখা কন্ঠে জবাব এলো,

' অনেক সমস্যা।' 

' আপনার সমস্যা নিয়ে আপনি বসে থাকুন। আমাকে ফোন দিয়েছেন কেন? ফোন রাখুন। আমি আপনার সাথে কথা বলব না।' 

' ইশ! বউটাকে রাগলে কি কিউট লাগে। রোদপাখি কি খুব রেগে আছে?' 

রোদেলা মুখ ঝামটি দিয়ে বলল, 

' আমি কারো রোদপাখি নই। এবং কারো ওপর রেগেও নেই। আমাকে রোদপাখি ডাকবেন না।' 

শুভ্র অসহায় কন্ঠে বলল,

' কিছুই তো বুঝতে পারছি না। হঠাৎ এতো রাগ কেন? কি করলাম?' 

' কিছুই করেন নি। ফোন রাখুন। আমি আজ বাবার বাসায় যাব। বাসায় ফিরব না।' 

শুভ্র ব্যস্ত হয়ে বলল,

' আরে কিন্তু রাতে.... ' 

রোদেলা কল কেটে দিল। চিত্রা অবাক হয়ে বলল,

' এটা কি হলো?' 

' তোর মাথা হলো। ক্লাসে যাবি নাকি পাবদা মাছের মতো হা করে এখানেই বসে থাকবি?'

চিত্রা ওঠে দাঁড়াল। চাদর দিয়ে নিজের ফুলে ওঠা পেটটা ডেকে নিয়ে বলল,

' আমাদের জুনিয়র পোলাগুলো হেব্বি কিউট বুঝলি? এগ্লা আমাদের থেকে দুই-তিন ইয়ার বড় হলে কি হতো বল তো? সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে বিয়ে করে বিরাট বড় ভুল করে ফেলছি। নয়তো এসব কিউট কিউট জুনিয়র দেখে বিয়ে করে ফেলতাম আমি।' 

রোদেলার বিরক্ত মুখে হাসি ফুটে উঠল। কন্ঠে দুষ্টুমি নিয়ে বলল,

' এক শিশির স্যারকেই সামলাতে পারিস না আবার জুনিয়র। তবে, তুই বললে শিশির স্যারকে ব্যাপারটা জানাতেই পারি আমি। তার বউয়ের যে জুনিয়রের সাথে প্রেম করতে ইচ্ছে করছে তা তো উনার জানা উচিত, তাই না?'

চিত্রা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মুখ ফুলিয়ে বলল,

' তোমাকে এতো মহান হতে হবে না। তার থেকে বরং আরেকটা বেবি নিয়ে ধন্য কর আমায়। আমি একা একা এতো বড় পেট নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বিষয়টা আমার ভাল্লাগে না। তুই প্রেগনেন্ট হলে দু'জনে সেইম সেইম। দারুণ হবে না? 

রোদেলা প্রত্যুত্তরে কিছু বলবে তার আগেই সামনে এসে দাঁড়াল সাকিব। মুখ কাঁচুমাচু করে বলল,

' আসসালামু আলাইকুম, ভাবি।'

' ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাইয়া। কেমন আছেন?' 

সাকিব বোকা হেসে বলল, 

' আলহামদুলিল্লাহ। আসলে একটা কথা বলতে এসেছিলাম ভাবি।'

রোদেলা হেসে বলল,

' কি কথা?'

' ভাই আপনাকে পার্কিং এ যেতে বলল। শুভ্রা মামুনি এসেছে। কান্নাকাটি করছে নাকি। ড্রাইভার দিয়ে গিয়েছে।'  

রোদেলা আৎকে উঠে বলল,

' কখন এলো ও? আশ্চর্য! বাড়িতে এতোগুলা মানুষ থাকতেও ওকে এখানে পাঠানোর মানে কি?' 

কথাগুলো বলতে বলতেই দ্রুত পায়ে পার্কিং-এর দিকে ছুটে গেল রোদেলা। চিত্রা তার পিছু নিতেই পেছন থেকে ডেকে উঠল সাকিব,

' আরে শাশুড়ী আম্মা। আপনি কোথায় যান? সব জায়গায় উঁকিঝুঁকি দেওয়া তো ঠিক না শাশুড়ী আম্মা। আমার হবু বউয়ের জন্য আমার প্রচুর টেনশন হয়।' 

চিত্রা চোখ-মুখ লাল করে বলল,

' আপনি আমাকে শাশুড়ী আম্মা ডাকবেন না তো সাকিব ভাই।' 

সাকিব ভারি ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে বলল,

' সেকি! বউয়ের মাকে শাশুড়ী আম্মা ডাকব না তো কি ডাকব? আচ্ছা, আজকে থেকে একটু স্মার্ট করে ডাকব। শাশুড়ী আম্মা থেকে শাশু আম্মু। এখন ঠিক আছে না শাশুড়ী আম্মা?' 

সাকিবের কথায় রাগী চোখে তাকাল চিত্রা। তার চোখ-মুখের ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে, সাকিব নামক পদার্থটাকে খেয়ে হজম না করতে পারলে তার শান্তি হচ্ছে না। কিছুতেই না। 

পার্কিং-এ সারি সারি গাড়ির মধ্যে শুভ্রতার কান্নার শব্দ কানে আসছে না রোদেলার। রোদেলার চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ। না-জানি কতক্ষণ ধরে কাঁদছে মেয়েটা। এভাবে কাঁদিয়ে রেখে আসাটাই উচিত হয় নি তার। একদিন ক্লাস না করলেই বা কি হতো? রোদেলার চিন্তার মাঝেই কেউ একজন হ্যাচকা টানে গাড়ির আড়ালে নিয়ে দাঁড় করাল তাকে। আকস্মিক ঘটনায় স্তব্ধ রোদেলা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভারী কিছুর নিচে চাপা পড়ল। স্তব্ধতা কাটিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাতেই চোখের পাতায় শুভ্রর ফর্সাটে স্নিগ্ধ মুখটি ভেসে উঠল। ঠোঁটে তার বাঁকা হাসি৷ রোদেলা কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ তাকিয়ে থেকে জ্বলে উঠে বলল,

' এসব কোন ধরনের অসভ্যতা? টিচার হয়ে ছাত্রীর সাথে জবরদস্তি! সরে দাঁড়ান বলছি।' 

শুভ্রর ঠোঁটজোড়া প্রসারিত হলো। শরীরের বাদবাকি ভারটাও রোদেলার ওপর ছেড়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

' ছাত্রী যদি টিচারের বুকের ভেতর এমন আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে যায় তাহলে বেচারা টিচারের কি দোষ?' 

' ছিঃ কি সব অশ্লীল কথা। ছাড়ুন আমায়। মেয়ে কোথায়?' 

শুভ্র ছাড়ল না। বেশ আঁটসাঁট করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। অস্থির রোদেলা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,

' ছাড়ুন। একদম প্রেম দেখাবেন না।' 

' সেই মান্ধাতার আমলে বিয়ে করেছি। এক বাচ্চার বাপও হয়ে গিয়েছে কিন্তু তোমার রিয়েকশন দেখে মনে হচ্ছে আমি তোমাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছি। বিয়ের এতো বছর পর এতো জোরজবরদস্তি ভালো লাগে, বলো?' 

রোদেলা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,

' এখন আমার কিছুই ভালো লাগবে না আপনার। লাগবেই বা কেনো? ভার্সিটিতে এতো এতো সুন্দরী মেয়ে থাকতে ঘরের বউ ভালো লাগবে কেন? পুরাতন হয়ে গিয়েছে না?' 

শুভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাল। হতভম্ব কন্ঠে বলল,

' আরে বাবা কি হয়েছে সেটা তো বলবে। হঠাৎ এতো জ্বলে উঠার কারণ কি? রাতে বকেছি বলে? নাকি অন্যকিছু? কি করেছি?' 

' কিছুই না।' 

শুভ্র হাসল। রোদেলার কপালে কপাল ঠেকিয়ে মৃদু গলায় বলল,

' আচ্ছা সরি। এবার রাগ কি করে ভাঙানো যেতে পারে বলুন ম্যাম। আদর করে?' 

কথাটা বলেই রোদেলার দিকে গাঢ় চোখে তাকাল শুভ্র। তারপর আচমকাই ঠোঁট ছোঁয়াল ঠোঁটে। রোদেলার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে এলো। নিজেকে শুভ্রর বাহুডোর থেকে ছাড়িয়ে নিয়েই উল্টো পথে হাঁটা দিল। যেতে যেতে বলল,

' আমার ক্লাস আছে। এসব লুচুগিরি বাদ দিয়ে ভালো হয়ে যান মাস্টারমশাই।' 

শুভ্র মাথা চুলকে উঁচু গলায় বলল,

' রাতে যেন বাসায় পাই তোমায়। নয়তো বাপের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আসব। তখন আমার দোষ দিতে পারবে না। গট ইট?' 

লাজুক রোদেলা পেছন ফিরে মুখ ভেঙাল। সাথে সাথেই বুকে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুভ্র,

' হায়!' 

ঘড়ির কাটা দশটার ঘর অতিক্রম করেছে আরও ঘন্টাখানেক আগে। বিছানার মাঝ বরাবর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে শুভ্রতা। চোখ পিটপিট করে মাঝে মাঝেই মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। তারপর আবারও চোখ খিঁচে পড়ে থাকছে। এটাকে বলে অজ্ঞান অজ্ঞান খেলা। এই মাঝরাতে চোখের ঘুম বিকিয়ে তার অজ্ঞান অজ্ঞান খেলা খেলতে ইচ্ছে করছে। রাগে-দুঃখে কান্না পাচ্ছে রোদেলার। কাল সকালেই তাকে দু'দুটো এসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে অথচ মেয়ের চোখে ঘুম নেই। মেয়ের বাপের খবর নেই। রোদেলা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

' মা? তুমি কি চাচ্ছো আমি তোমাকে বকা দিই?' 

শুভ্রতা ভং ধরে শুয়ে থেকেই চোখ পিটপিট করে তাকাল। মাকে চোখ-মুখ শক্ত করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,

' বাবা কোতায়?' 

রোদেলার ইচ্ছে হচ্ছে মেয়েকে ঠাটিয়ে দুটো চড় লাগিয়ে বলে তোর বাবাকে কি আমি কোলে নিয়ে বসে আছি? জানব কি করে? বাপের মতো ফাজিলের হাড্ডি হয়েছে। কিন্তু তেমন কিছুই করল না। মেয়ের সাথে উঁচু গলায় কথা বলা পছন্দ নয় শুভ্রর। মেয়ের গায়ে হাত তোলা তো রীতিমতো মহাপাপ। রোদেলা শান্ত গলায় বলল,

' বাবা চলে আসবে মা। তুমি ঘুমাও। কাল সকালে তোমার সাহেল চাচ্চু আসবে। সাদাফ ভাইয়া আসবে। এখন না ঘুমালে তো সকালে উঠতে পারবে না সোনা। প্রিন্সেসদের জলদি জলদি ঘুমিয়ে পড়তে হয়।'

_______________________

রাস্তার ধারের ঝকঝকে ডুপ্লেক্স বাড়িটির দু'তলায় দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। গায়ের লাল শাড়ির আঁচলটা পতাকার মতো উড়ছে। চুলগুলো এসে আছড়ে পড়ছে মুখে। চোখদুটো স্বচ্ছ আকাশে নিবদ্ধ। 

' মিস.ঝগড়ুটে? ঝগড়া করতে করতে কি টায়ার্ড হয়ে গিয়েছ বেবি?'  

মেয়েটা পেছন ফিরে তাকাল। দরজার কাছেই অফিসের পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে আয়ান। চোখে-মুখে ক্লান্তি। হাতে থাকা অফিস ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখেই অদিতির কোমর জড়িয়ে ধরল সে। বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে নিয়ে বলল,

' আজ থেকে সামার ভ্যাকেশন শুরু। আপনার পাগলের ডাক্তার এখন একদম ফ্রি। বলুন হানিমুনে কোথায় যেতে চান? সুইজারল্যান্ড, বালি, প্যারিস, মালদ্বীপ, অস্ট্রোলিয়া অর....' 

অদিতি হুট করেই বলল,

' সিলেট। ' 

অায়ান বেখেয়ালিপনায় বলল,

'ওকে ফাইন। সিলেট।' 

মুহূর্তেই কপাল কুঁচকে বলল,

' সিলেট? সিলেট মানে? বাংলাদেশ?' 

অদিতি মাথা নাড়ল। আয়ান বিস্ময় নিয়ে বলল,

' মানুষ বাংলাদেশ থেকে বাইরের দেশে আসছে হানিমুন করতে আর তুমি হানিমুনে বাংলাদেশ যেতে চাইছ?' 

' জি চাইছি। আমার ছোট থেকেই সিলেটে যাওয়ার খুব শখ। যাব যাব করে আর যাওয়া হয় নি। বিয়ের পর তো ডিরেক্ট আমেরিকা চলে এলাম। হানিমুনে যাওয়ার হলে সিলেটেই যাব নয়ত কোত্থাও না।' 

আয়ান সন্দিহান গলায় বলল,

' আর ইউ সিরিয়াস?' 

অদিতি কপাল কুঁচকে বলল,

' কেন? আপনার কোনো সমস্যা?'

অদিতির চুলে নাক ডুবিয়ে হাসল আয়ান। ডান চোখটা টিপে দিয়ে বলল,

' একদমই না। আমার তো রোমান্স চললেই হলো। পৃথিবীর কোন কোণায় যাচ্ছি সেটা কোনো ম্যাটার না। মধুচন্দ্রিমায় সিলেট গিয়ে সিলেটি মধু খেয়ে আসা যেতেই পারে। নাথিং টু ওয়ারি।' 

অদিতি গরম চোখে তাকিয়ে বলল,

' কি বললেন?' 

আয়ান ফিচেল হেসে বলল,

' নাথিং জানু। ডোন্ট বি, ডোন্ট বি।'
          স্টাডি রুমে আরাম কেদারায় বসে বই পড়ছে ফাহিম। টেবিলের ওপর কয়েক বাণ্ডিল পরীক্ষার খাতা। ক্যাপ খোলা একটা দুটো লাল কলম, এখানে ওখানে ছড়ানো। তারপাশেই ঝকঝকে সাদা চায়ের কাপ। ফাহিম গম্ভীর মুখে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে। নাকের ডগায় রাখা রিডিং গ্লাসে সুন্দর মানিয়েছে তাকে। চোখ-মুখের গাম্ভীর্য চেহারায় একটা শিক্ষক শিক্ষক ভাব ফুটিয়ে তুলেছে। ফাহিমের অখন্ড মনোযোগকে খন্ডবিখন্ড করে দরজার কড়া নড়ল। 

' আপনার মতো বিবেকবর্জিত মানুষ যে পৃথিবীতে দুটো নেই, তা কি আপনি জানেন?' 

ফাহিম মুখ তুলে তাকাল। দরজা আগলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিয়া। কপালে বিরক্তিদায়ক ভাঁজ। চোখে-মুখে অসন্তুষ্টি। ফাহিম রিডিং গ্লাসটা খোলে রাখল টেবিলে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,

' এখনও ঘুমাও নি?' 

রিয়া জবাব দিল না। রাগে সর্বাঙ্গ জ্বালা করছে তার। রিয়া ভারী শরীর নিয়ে কয়েক পা এগিয়ে এল। ফাহিম তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল। রিয়ার ডানহাতটা ধরে তাকে চেয়ারে বসতে সাহায্য করল। রিয়া গমগমে কন্ঠে বলল,

' একদম ছুঁবেন না আমায়। অন্যের হাজবেন্ডরা প্রেগনেন্ট ওয়াইফদের দুই মিনিটের জন্যও চোখের আড়াল করে না। আর আপনি? সেই যে সন্ধ্যায় স্টাডি রুমে ঢুকেছেন আর খবর নেই। বই পেয়ে বউ নাম ব্যক্তিটাকেই ভুলে গিয়েছেন মনে হচ্ছে।'

ফাহিম হাসার চেষ্টা করে বলল,

' আমি ভাবলাম তুমি ঘুমোচ্ছ।' 

' ভাবলেন! কেন ভাবলেন আপনি? আর আমি ঘুমালেই বা আপনাকে নিরুদ্দেশ হতে হবে কেন? আমি ঘুমালেও আপনি আমার পাশে বসে থাকবেন। আমি যদি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বিছানা থেকে পড়ে যাই?' 

ফাহিম অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল। ঘুমালেও পাশে বসে থাকতে হবে? কি আশ্চর্য! বউ প্রেগনেন্ট বলে কি হাজবেন্ডের নিজস্ব কোনো সময় থাকবে না? বসে বসে বউয়ের বিছানা থেকে পড়ে যাওয়া আটকাতে হবে? ফাহিমের মস্তিষ্ক উত্তর দিল, হ্যাঁ হবে। ফাহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিয়ার দিকে তাকাল। মেয়েটা কয়েকদিনেই কেমন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তার বাচ্চা বউ আর বাচ্চার মার মাঝে তেমন একটা মিল নেই। না থাকুক। মিল থাকতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। ফাহিম রিয়ার ডানহাতটা নিজের দু'হাতের মাঝে নিয়ে বলল,

' ঘুমোতে চলো।' 

রিয়া অনড় বসে রইল। ফাহিম কপাল কুঁচকে বলল,

' কি হলো? চলো। আমি তোমার সাথেই ঘুমাব, চলো।' 

এবারও কোনরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাল না রিয়া। ফাহিম এবার বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাল। সন্ধ্যা থেকে ভার্সিটির খাতা কেটে মাথাটা ধপধপ করছে তার। রাতদুপুরে রিয়ার এই পাগলামো অসহ্য ঠেকছে। ফাহিম আলতোভাবে বলল,

' কি সমস্যা?' 

রিয়া মুখ কাঁচুমাচু করে ফাহিমের দিকে তাকাল। দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে টেবিলের ওপর রাখা পেপারওয়েটের দিকে তাকিয়ে রইল, জবাব দিল না। ফাহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিয়ার পাশে চেয়ার টেনে বসল। কন্ঠটা যথাসম্ভব আদুরে করার চেষ্টা করে বলল,

' আমাদের রিয়ামণির কি হলো? রিয়ামণির কি মন খারাপ? ' 

রিয়া চকিতে তাকাল। চেহারায় চাপা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,

' আয়ান ভাইয়ারা সিলেট যাচ্ছে?' 

' হ্যাঁ যাচ্ছে।' 

' ঢাকায় আসবে?' 

' বোঝা যাচ্ছে না। মার সাথে দেখা করতে আসতে পারে কিন্তু এক-দু'দিনের বেশি থাকবে না। কেন বল তো?' 

রিয়া উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,

' চলুন না আমরাও যাই।' 

ফাহিম কপাল কুঁচকে বলল,

' সরি? কোথায় যাব?' 

' কোথায় আবার? সিলেট।' 

ফাহিম যেন আকাশ থেকে পড়ল৷ অবাক হয়ে বলল,

' সিলেট মানে? পাগল নাকি? চলো তো, ঘুমাবে চলো।'

রিয়া মুখ ফুলিয়ে বলল,

' যাব না। আগে বলুন সিলেট নিয়ে যাবেন। আমাদের বিয়ের পর একবারও হানিমুনে নিয়ে গিয়েছেন আমায়?' 

' তাই বলে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হানিমুনে যাবে? জীবনে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হানিমুনে যেতে দেখেছ কাউকে? মানুষ অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সুযোগ খুঁজতে হানিমুনের প্ল্যান করে আর তুমি কিনা?' 

' একদম বাহানা দেবেন না। নিয়ে যাবেন কিনা বলুন। নয়তো আমি ভাইয়াকে বলে আজকেই বাড়ি চলে যাব। আপনি একটুও ভালোবাসেন না আমায়। সিম্পল সিলেটে নিয়ে যাওয়ার জন্য এতো বাহানা! থাকব না আমি।' 

ফাহিম হতাশ গলায় বলল,

' নিয়ে যাব না, সেটা তো বলি নি বউ। আগে বেবি আসুক। তারপর তিনজন একসাথে যাব। প্রয়োজন হলে আসার সময় আরেকজনকে ক্যারি করে আনব। সমস্যা তো নেই। কিন্তু এখন নয়।' 

রিয়া চোখ-মুখ কালো করে বসে রইল। বর্ষাকালের আবহাওয়ার মতো হঠাৎই একগুচ্ছ কালো মেঘ এসে হানা দিল তার চোখে। ফাহিম সেই গভীর চোখদুটোতে চোখ রেখে তৃতীয় বারের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে বুঝে ফেলল, শেষ রক্ষা হবে না। শেষ পর্যন্ত যে ভার্সিটি থেকে ইমার্জেন্সি ছুটি নিয়ে অন্তঃসত্ত্বা বউকে বগলদাবা করে সিলেট ছুটতে হবে তা তো কতদিনের জানা তার । এই মেয়েটাকে কখনই কিছু বুঝাতে পারে না ফাহিম। বিয়ের আগেও না। বিয়ের পর তো আরো না। 

_______________________

বিছানায় বসে মোজা পরছে শুভ্র। তার পাশেই বাবাকে অনুকরণ করে মোজা পরায় ব্যস্ত শুভ্রতা। মাঝে মাঝেই সচেতন চোখে বাবার পায়ের দিকে তাকাচ্ছে। তারপর আবারও নিজের কাজে মন দিচ্ছে। চোখমুখ বাবার থেকেও গম্ভীর, থমথমে। শুভ্র মোজা পরা শেষ করে জুতো পরল। শুভ্রতাও পরল। শুভ্র ডানহাতের কব্জির ওপর থাকা ঘড়িটা দেখে নিয়ে চেঁচিয়ে ডাকল,

' রোদ? তুমি কি আমার সাথে বের হবে?' 

শুভ্রতা বাবাকে অনুকরণ করে প্রথমে ডানহাতের দিকে তাকাল। তারপর চেঁচিয়ে বলল,

' আম্মু? তুমি কি আমাল সাতে বেল হবে?' 

মেয়ের কথায় হেসে ফেলল শুভ্র। বাবার হাসি দেখে শুভ্রতাও খিলখিল করে হেসে উঠল। বাবা-মেয়ের হাসির মাঝেই দরজায় এসে দাঁড়াল রোদ। পরনে কালো শাড়ি। চোখে গাঢ় কাজল। কথা বলার সময় টকটকে লাল ঠোঁটজোড়া কেঁপে কেঁপে উঠছে। শুভ্র সেদিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। বলল,

' বাপরে! ভয়ানক লাগছে। একদম রসগোল্লা।' 

শুভ্রতা বাবার মতো চোখ টেপার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। একচোখ বন্ধ করতে গিয়ে দুই চোখই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কি বিপদ! মেয়ের অবস্থা দেখে শুভ্রর হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাওয়ার জোগার। রোদ কোনরকম হাসি চেপে বলল,

' নিচে সাহেল চাচ্চু এসেছে, মা। সাথে সাদাফ ভাইয়াও এসেছে। তোমাকে খুঁজছে। ছুটে যাও।' 

কথাটা শেষ হতেই ফুড়ুৎ করে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল শুভ্রতা। বড় বড় চোখ মেলে বলল,

' চাচু চক্কেত এনেছে?' 

' হ্যাঁ, এনেছে তো।' 

এই সংবাদ পাওয়ার পর শুভ্রতার আর দাঁড়িয়ে থাকা চলে না। দাঁড়িয়ে অবশ্য সে থাকলও না। উল্কার বেগে দরজা পেরিয়ে নিচে ছুটে গেল। শুভ্র এবার ঠোঁট কামড়ে উঠে দাঁড়াল। মৃদু শিষ বাজিয়ে রোদের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। অদ্ভুত চোখে আগাগোড়া নিরক্ষণ করতেই ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়ল রোদ,

' কি হচ্ছে?' 

শুভ্র হাসল। ডানচোখটা টিপে দিয়ে বলল,

' ইভটিজিং হচ্ছে। সুন্দরী মেয়েদের দেখে ইভটিজিং করতে হয়, জানো না?' 

রোদ ভাব নিয়ে বলল,

' ফুটুন। আমার বরকে তো চিনেন না। হি ইজ আ সুপারম্যান। এক ঘুষি দিবে আর চোখ-মুখ নাই হয়ে যাবে। সো সাবধান।' 

শুভ্র অবাক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,

' তাই নাকি?' 

কথাটা শেষ করেই দু'হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,

' সামনে এমন জ্বলন্ত সুন্দরী দাঁড়িয়ে থাকলে দু'একটা চোখ-নাক উড়ে গেলেও ক্ষতি নেই। সুন্দরীর স্পর্শ পাওয়া যাবে আর সর্বনাশ হবে না, তা কি হয়? আই উইশ আজ আমার সর্বনাশ হোক।' 

রোদ হেসে ফেলল। শুভ্র খানিকটা চেপে এসে ঘন হয়ে দাঁড়াতেই দরজার বাইরে থেকে একটা কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

' আস্তাগফিরুল্লাহ! ভাই? কি করছিস?' 

অভ্রর কন্ঠে বিদ্যুৎ বেগে সরে দাঁড়াল দু'জনে। রোদ লজ্জায় লাল হয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরাল। লজ্জা আর অস্বস্তিতে বোকার মতো হাসি পাচ্ছে তার। শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

' ভাইয়া! তোকে যে কবে আমি গুম করে দেব তা কেবল আল্লাহ মা'বুদ জানে। বিশ্বাস কর, একমাত্র বউমণির মুখের দিকে তাকিয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছি।' 

অভ্র দাঁত বের করে হাসল। বলল,

' সেইম টু ইউ ভাই। একমাত্র আমার বোনটির মুখের দিকে তাকিয়ে মুখবুজে আছি। নয়ত আমার শালিকার সাথে রংঢং করার অপরাধে তোর গর্দান যেত।' 

শুভ্র ঘাড় কাত করে বলল,

' তোর এখানে কি চাই?' 

' নিচে খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি হচ্ছে। ডাকতে এসেছি। কিন্তু তুই যে এখানে আমার একমাত্র শালিকার সাথে ইভটিজিং ফিফটিজিং করে ফেলছিস, কে জানত? মেয়েটাকে একা পেয়ে এতো দুঃসাহস? মিস.শালিকা? চলে এসো।' 

রোদ ঠোঁট চেপে হেসে অভ্রর পিছু নিল। শুভ্র পেছন পেছন আসতে আসতে বলল,

' ভাইয়া? শোধ নিব শোধ। অপেক্ষা।' 

অভ্র ভারি দুঃখী গলায় বলল,

' ভাইরে! অপেক্ষা টপেক্ষার প্রয়োজন নেই। ছেলে দুটো হয়েছে দুনিয়ার বেয়াদব। কিছু হওয়ার চান্স টান্সই নাই। শোধ নিতে হলে বহুত পেরেশানি করতে হবে তোকে। প্রথমে প্রাইভেসি দিতে হবে তারপর শোধ। চেষ্টা করে দেখতে পারিস। আমি মাইন্ড করব না।'

খাবার টেবিলে বসে আছে সাহেল। তার পাশে নাবিলাসহ বাচ্চাকাচ্চা সব। সাহেল রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তেই সিঁড়ির দিকে তাকাল। সিঁড়ির এক কোণায় কালো শাড়িতে মোড়া লাজুক রোদকে চোখে পড়তেই বুকের ভেতর চিনচিন করে উঠল। সোহাল চমকে উঠে নাবিলার দিকে চোখ ফিরালো। ফিসফিস করে বলল,

' এই নাবু?'

নাবিলা বেখেয়ালি ভঙ্গিতে জবাব দিল,

' হু?' 

সাহেল গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলল,

' তওবার দোয়াটা মনে করিয়ে দাও তো। এই মুহুর্তে কিছুতেই মনে পড়ছে না।' 

নাবিলা অবাক হয়ে বলল,

' হঠাৎ তওবার দোয়া প্রয়োজন পড়ল কেন তোমার?' 

সাহেল অধৈর্য কন্ঠে বলল,

' একজন মুসলিম হিসেবে সবসময় তওবার দোয়া মনে রাখা উচিত। আর আমার জন্য তো ডাবল ফরজ। আজ সারাদিন এই দোয়াটাই প্রয়োজন পড়বে আমায়। প্রশ্ন না করে বলো তো!' 

নাবিলা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। কিছু বুঝতে না পেরে মৃদু গলায় বলল,

' আস্তাগফিরুল্লাহ রাব্বি মিন কুল্লি জা...' 

সাহেল মাথা নেড়ে বলল,

' ওহ হ্যাঁ। মনে পড়েছে। মনে পড়েছে। থেংকিউ সুইটহার্ট। তোমাকে একটা চুমু দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এখানে দেওয়া যাবে না। পরে মনে করে দেবে, ওকে?'

নাবিলা যেন এবার আকাশ থেকে পড়ল। কিছুক্ষণ সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,

' আমার মনে হচ্ছে তুমি একটু অদ্ভুত বিহেভ করছ।' 

সাহেল বিরবির করে তওবার দোয়া আওড়াচ্ছিল। শেষবারের মতো দোয়া পাঠ শেষ করে হাসার চেষ্টা করল। বলল,

' আমারও তাই মনে হচ্ছে।' 

সাহেল-নাবিলার কথার মাঝেই টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল রোদ-শুভ্র। শুভ্র সাহেলের কাঁধ ঝাঁকিয়ে উপ্লুত গলায় বলল,

' কি অবস্থা, দোস্ত?' 

রোদ সামনের চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে প্রশ্ন ছুঁড়ল,

' সাহেল ভাইয়া, নাবিলা আপু কেমন আছেন?' 

সাহেল রুটির টুকরোটা মুখে পুড়তে পুড়তে বলল,

' আমি গ্র্যান্ড। তবে নাবিলার নাকে ব্যথা।' 

রোদ অবাক হয়ে বলল, 

' নাকে ব্যথা?' 

নাবিলা হাসল। সাহেলের বাহুতে হালকা থাপ্পড় দিয়ে বলল,

' আরে ধুর! ওর কথা বিশ্বাস করো? ফাজলামো করছে।' 

ওদের হালকা আলাপ-আলোচনায় হঠাৎই গুরুগম্ভীর প্রসঙ্গ টানল অভ্র। ভাবুক গলায় বলল,

' তুমি কি কালই সিলেট যাচ্ছ সাহেল? আমাকেও কি যেতে হবে সাথে?' 

সাহেল কয়েক ঢোক পানি খেল। গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বলল,

' যাওয়া তো উচিত। যারা যারা শেয়ারে আছে সবার উপস্থিতিই কাম্য। ব্যাটা তো সুবিধার না।' 

শুভ্র কপাল কুঁচকে বলল,

' হঠাৎ সিলেট কেন?' 

' তোকে সেদিন একটা ফাইল মেইল করলাম না? পরশু ওটার ফাইনাল মিটিং। তুই যাবি?' 

শুভ্র তৎক্ষনাৎ জবাব দিল,

' নাহ্। ভার্সিটিতে কাজ আছে। তাছাড়া অফিসেও যেতে হবে। তোরা যা।' 

সাহেল ফোঁড়ন কেটে বলল,

' আসল কথা হলো বউ ছাড়া তোর চলছে না। সোজাসাপ্টা বল মিয়া। বুঝি বুঝি, সবই বুঝি।' 

শুভ্র হাসল। সাহেল আবারও বলল,

' তুই চাইলে বউও নিতে পারিস। আমরা বরং একটা ফ্যামিলি ট্যুর দিতে পারি। বাচ্চাদেরও চা বাগান দেখা হয়ে যাবে। আর তোর এক্সট্রা হানিমুন।' 

শুভ্র এবার নিজের পায়ে হাত দিল। রাগী স্বরে বলল,

' জুতো না খাইতে চাইলে চুপ যা। আমার এক্সট্রা মানে কি? নিজের সুপ্ত ইচ্ছে আমার ওপর চাপাস কেন? শালা বাটপার!' 

শুভ্র-সাহেলের কথায় হেসে ফেলল সবাই। নাবিলা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,

' সাহেল কিন্তু খারাপ বলে নি। এই শুভ্র? চল না যাই।' 

শুভ্র ততক্ষণে খাবারে মনোযোগী হয়েছে। প্লেটের দিকে দৃষ্টি রেখেই বলল,

' না রে। হবে না। এই সপ্তাহটা ভীষণ ব্যস্ততায় কাটবে।' 

নাবিলা মুখ ফুলিয়ে বলল,

' আরে চলই না। দু'দিনেরই তো ব্যাপার। সিলেট কত সুন্দর জানিস? এই রোদ?ওকে বলো না একটু।'

শুভ্রর মধ্যে সিদ্ধান্ত পাল্টানোর কোনো লক্ষ্মণ দেখা গেল না। রোদ মৃদু গলায় বলল,

' শুনুন না? চলুন না যাই।' 

শুভ্র গম্ভীর মুখে বলল,

' কাজ আছে। অন্য একদিন নিয়ে যাব।' 

রোদ এবার অদ্ভুত এক কাজ করল। টেবিলের নিচে থাকা শুভ্রর বাম হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। হঠাৎ রোদের স্পর্শে বিষম খেল শুভ্র। অবাক চোখে রোদের দিকে তাকাল। রোদ চোখ-মুখ যথাসম্ভব আদুরে করার চেষ্টা করে বলল,

' প্লিজ। প্লিজ...' 

সাহেল প্লেটের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। শুভ্র সর্বদা নিজের সিদ্ধান্তে অটুট থাকলেও রোদের সামনে তা চলে না। রোদের সব আবদার তার কাছে ভয়ানক রকম গুরুত্বপূর্ণ। সেই হিসেবে শুভ্রর রাজি হয়ে যাওয়ার কথা। হলোও তাই। আগেপিছে না ভেবেই ফট করেই জবাব দিল শুভ্র,

' আচ্ছা।' 

সাথে সাথেই খুশিতে ঝুমঝুম করে উঠল পুরো খাবার টেবিল। আদ্র-রোদ্র সিলেট যাওয়া নিয়ে হৈ-হুল্লোড় বাঁধিয়ে দিল। রুহির হাতে দু' চারটা চড়-থাপ্পড় খাওয়ার পর তাদের এই এক্সাইটমেন্টে খানিক ভাটা পড়ল। সাদাফের চোখে-মুখে কোনো ভাবাবোগ দেখা গেল না। রুটি ছেঁড়ায় ব্যস্ত শুভ্রতা সবার আনন্দের মূল কারণটা বুঝতে পারল কি-না তা ঠিক বুঝা গেল না।
          জুলাই মাস। ক্যালিফোর্নিয়ার সকালটা আজ উষ্ণ, ঝরঝরে। নান্দনিক ডুপ্লেক্স বাড়ির ব্যালকণিতে এসে পড়ছে জুলাইয়ের মিষ্টি, সোনালি রোদ। বাড়ির পাশে নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকা পাম গাছ আর রেডউডের মাথায় ঝিলিক দিচ্ছে উচ্ছল, কিশোরী সূর্য। সেই সাথে ঝিলিক দিচ্ছে আয়ানের চঞ্চল মন। অস্থির পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরো ঘর। 

' আপনার কি শরীর খারাপ করেছে? বাবাও জিগ্যেস করলেন। খাবার টেবিলে কেমন অস্থির দেখাচ্ছিল আপনাকে। আজকের টিকেট কী ক্যান্সেল করে দেব?' 

অদিতির চিন্তিত কন্ঠে ফিরে তাকাল আয়ান। খয়েরী রঙের ঢিলেঢালা কুর্তি আর টাউজার পরে দাঁড়িয়ে আছে অদিতি। হাত খোপা করা চুলগুলোর কিছুটা অগোছালো হয়ে পড়ে আছে কাঁধে। আয়ানের চোখদুটো ঝলমল করে উঠল। দ্রুত পায়ে অদিতির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অদিতিকে কাছে টেনে নিয়ে দাঁত বের করে হাসল। আয়ানের এমন ব্যবহারে সন্দিহান চোখে তাকাল অদিতি। মাথাটা একটু পিছিয়ে নিয়ে ডানহাতটা আয়ানের কপালের উপর রাখল। শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে দ্বিধা নিয়ে বলল,

' পাগলের চিকিৎসা করতে করতে ডাক্তারও পাগল হয়ে যায় এমন কোনো রেকর্ড কী আছে, ডক্টর?' 

' মানে?' 

' আনফরচুনেটলি আমার হাজবেন্ডও পাগলের ডাক্তার। আমি আমার পাগলের ডাক্তার নিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তিত।' 

আয়ান চোখ-মুখ কুঁচকে তাকাল। ডানহাতে অদিতির মসৃণ কোমরে শক্ত একটা চিমটি দিয়ে বলল,

' মিস. সরি... মিসেস. ঝগড়ুটে! তুমি দিন দিন হাই লেভেলের ঝগড়ুটে হয়ে যাচ্ছ। আমার এতো সুন্দর রোমান্টিক মুডটাকে তুমি পাগলামির লক্ষণের সাথে তুলনা করে ফেললে?' 

কথাটা বলে সরে দাঁড়াল আয়ান। ডিভানের উপর বসে বেশ আয়েশ করে বলল,

' তবে আমি অবাক হইনি। একটা রোমান্টিক ইনভায়রনমেন্টকে সাঁড়াশি দিয়ে টেনে হিঁচড়ে ঝগড়ার ইনভায়রনমেন্টে পরিণত করায় ঝগড়ুটেদের প্রধান কাজ। আর তুমি তো তাতে মাস্টার।' 

অদিতি কোমরে হাত দিয়ে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। আয়ানের চিমটি দেওয়া স্থানে জ্বালাপোড়া করছে। কোমরের পাশটায় হাত বুলাতে বুলাতে আয়ানের মতো মুখভঙ্গি করে বলল,

' আমিও অবাক হইনি। এইযে আপনি বার বার আমাকে ঝগড়ুটে বলে প্রমাণ করতে চাইছেন তাতে বিন্দুমাত্র চমকাইনি আমি। পাগলের ডাক্তারদের কাজই হলো উল্টাপাল্টা যুক্তি দিয়ে ভালো মানুষকে পাগল প্রমাণ করা। আমার মতো সুস্থ,স্বাভাবিক মানুষকে ঝগড়ুটে প্রমাণ করা তো তাদের বাম হাতের কাজ। কি আর করা? পাগলের ডাক্তরকে বিয়ে করলে এতটুকু সহ্য তো করতেই হবে। হাহ্ নিয়তি।' 

আয়ান তেড়ে এসে বলল,

' ওহ হ্যালো! এয়ারপোর্টে এসে আধঘন্টা চিপকে থেকে জোরপূর্বক বিয়ে করেছ আমায়। জোরপূর্বক বাসরও করেছ। এখন পাগলের ডাক্তার বলে আন্দোলন? মেয়েরা এমনই, ধান্দাবাজ।' 

আয়ানের কথার প্রত্যুত্তরে তেড়ে এলো অদিতি। দু'জনের মুখোমুখি সংঘর্ষের আগেই দরজায় কড়া নড়ল। দরজার বাইরে থেকে কেউ একজন সবিস্ময়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল, 

' তোমরা কি ঝগড়া করছ নাকি?' 

দুই জোড়া চোখ ঘুরে গিয়ে পড়ল দরজায় দাঁড়ানো মানুষটির ওপর। তারপর পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে অসহায় চাহনী নিক্ষেপ করল। আয়ান ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে ডিভানে গিয়ে বসল। আমতা আমতা করে বলল,

' নো বাবা। উই আর গুড ফেলো অল দ্যা টাইম। অ্যাম আই রাইট ওয়াইফি?' 

অদিতি বাবার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করল। সতর্ক কন্ঠে প্রশ্ন করল,

' কোনো দরকার ছিল বাবা?' 

বাবা সন্দিহান চোখে দুজনকে পর্যবেক্ষণ করলেন। মৃদু হেসে বললেন,

' আমি তোমাদের শী অফ করতে যাচ্ছি, এটাই ইনফর্ম করতে এসেছিলাম। হ্যাভ আ গুড ডে গাইস।' 

অদিতি হেসে বলল,

' থেংকিউ বাবা।' 

বাবা দরজা থেকে সরে যেতেই এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়ল আয়ান। খুশিতে বাক বাকুম করতে করতে অদিতির গা ঘেঁষে দাঁড়াল। অদিতিকে আবারও কাছে টেনে নিয়ে বলল,

' এখন বাংলাদেশে বর্ষাকাল তাই না, সুইটহার্ট? ওয়াও! হাও রোমান্টিক ওয়েদার। আই অ্যাম সো এক্সাইটেড ওয়াইফি। এই খুশিতে তোমার ফালতু কটেজ বুক করার অপরাধটা মাফ করে দেওয়া হলো। ঝড়ো হাওয়ায় অন্ধকার ছনের কটেজে তুমি আর আমি। এমনটা ভেবেই কটেজটা বুক করেছ, তাই না বেবি?' 

এটুকু বলে বামচোখ টিপল আয়ান। অদিতি আয়ানের বাম পা'টা মারিয়ে দিয়ে বলল, 

' জি না। কটেজটার ন্যাচেরাল লুকটা দারুণ। আমি কখনও ওমন পরিবেশে থাকিনি। এসব ফালতু কথা বাদ দিয়ে প্লিজ তৈরি হোন। আমাদের এক ঘন্টার মধ্যে বেরুতে হবে।' 

আয়ান বাম পায়ের ব্যথাটা দাঁত চেপে সহ্য করে কুটিল দৃষ্টিতে তাকাল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে নিয়ে বলল,

' ওকে, চলো। দু'জন একসাথে তৈরি হবো।' 

অদিতি চোখ বড় বড় করে সরে যাওয়ার চেষ্টা চালাল। দৃঢ় আপত্তি জানিয়ে বলল,

' কক্ষনো নয়।' 

অদিতির হাতদুটো শক্ত করে চেপে ধরে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল আয়ান। ভ্রু নাচিয়ে বলল,

' ইট'স ইউর পানিশমেন্ট ওয়াইফি। লেটস গো জান!' 

______________________ 

আকাশে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। পথ-ঘাট পিচ্ছিল, কাদাটে। সেই পিচ্ছিল রাস্তায় পা টিপেটিপে এগিয়ে যাচ্ছে সুন্দরী, চঞ্চলা একটি মেয়ে। মাথার ওপর কালো ছাতা। গায়ে সাদা-গোলাপী রঙের সালোয়ার কামিজ। পাতলা ঠোঁটদুটো অনবরত নড়ছে। রাস্তার মানুষের বিস্মিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে নিজের মনে কথা বলে বলে এগিয়ে যাচ্ছে সে। রাস্তার কাদা, রাস্তা, আকাশ, বাতাস সবার সাথেই তার কতো কথা! কত ভাব! বড় রাস্তাটা পার হয়ে প্রিয়ন্তীদের বাড়ির গলিটার মোড়ে আসতেই থমকে গেল তার ঠোঁট। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা যুবা পুরুষটির দিকে। কালো একটি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কি আয়েশ করেই না সিগারেট টানছে মানুষটা। বিশাল ম্যাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে ধমক দেওয়ার মুখভঙ্গিও কি দারুন! পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদেরকে ভয়ানক বিদঘুটে পরিস্থিতিতেও সুন্দর দেখায়। আরু মুহূর্তেই রাফিনকে সেই দলে যুক্ত করে নিল। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কালো শার্ট পরিহিত চমৎকার সেই মানুষটির দিকে। কিছুক্ষণ চোখ ভরে দেখে নিয়েই দৌঁড়ে রাফিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল আরু। রাফিন নতুন কনস্ট্রাকশনের ম্যাপ দেখছিল। আরুর এমন ছুঁটে আসায় চোখ তুলে তাকাল সে। আরুর ছাতার পানিটুকু ছিঁটকে এসে পড়ল রাফিনের গালে। পানিটুকু এক হাতে মুছে নিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াল রাফিন। গোছানো, সুন্দর ভ্রু জোড়া বাঁকিয়ে চেয়ে রইল আরুর মুখের ওপর। অবশিষ্ট সিগারেটের ধোঁয়াটুকু আরুর মুখের উপর ছেঁড়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল। আরু বার কয়েক খুকখুক করে কেশে নিয়ে নিজের ছাতাটা রাফিনের মাথায় ধরতে ধরতে বলল,

' আরেহ্ মিস্টার ভিলেন! আপনি এখানে একা একা বৃষ্টিতে ভিজছেন? আমাকে বললেই হতো, সঙ্গ দিতাম।'

কথাটা বলে হাসল আরু। পাশ থেকে একজন দরাজ কন্ঠে বলল,

' একা কেন ভিজবে? আমরা দাঁড়িয়ে আছি দেখছ না? মাইয়ার কলিজাটা দেখো! ফুটো এখান থেকে।'

আরু অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। তেড়ে এসে বলল,

' এতো বেশি কথা বলেন কেন? আপনাকে কিছু বলেছি আমি? জানেন না? হাম- তুমের মাঝে থার্ড পার্সোন ঢুকার নিয়ম নেই।' 

আরুর তেজে ছেলেটির চোয়াল ঝুলে পড়ার জোগার। তবে, রাফিনের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পকেট থেকে ছোট্ট একটা চাকু বের করল। চাকুটা উল্টেপাল্টে দেখে ঘাড়টা হালকা কাত করে আরুর দিকে তাকাল। আরুর মুখে তখনও ঝলমলে হাসি। রাফিন হঠাৎ-ই আরুকে নিশানা করে ছুঁড়ে মারল সেই চাকু। চাকুটি আরুর মাথার কাছটা ছুঁই ছুঁই করে গিয়ে বিঁধল সামনের দেয়ালে। আরু চোখ বড় বড় করে একবার রাফিন তো একবার দেয়ালের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থেকে ভয়ের বদলে খুশিতে লাফিয়ে উঠল সে। শিষ বাজিয়ে বলল,

' ওয়াও! ওয়াও! দারুণ ছিল।' 

আরুর আনন্দে বিরক্তি ফুটে উঠল রাফিনের চোখে। আরুর দিকে চেয়ে শীতল কন্ঠে বলল, 

' পরের বার নিশানাটা তোমার চোখ বরাবর হবে। সো, স্টে এওয়ে ফ্রম মি।' 

কথাটা বলেই গাড়িতে উঠে গেল রাফিন। সাঙ্গপাঙ্গদের মধ্যে থেকে ফিসফিসানি ভেসে এলো বাতাসে,

' এতোদিন গুন্ডাদের মাইয়াগো ডিস্টার্ব করতে দেখছি। আইজ প্রথম কোনো মাইয়াকে দেখলাম স্বয়ং গ্যাংস্টাররেই ডিস্টার্ব করতাছে। কলিযুগ। ঘোর কলিযুগ ভাই।' 

আরু আগের জায়গাতেই হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাসি দেখেই বুঝা যাচ্ছে, রাফিনের চোখ রাঙানো, রাগ কোনো কিছুই পাত্তা পায়নি তার চোখে, মুখে এবং ছোট্ট মনে।

___________________

শ্রীমঙ্গলের একটি নান্দনিক কটেজ সপ্তাহ দুইয়ের জন্য ভাড়া নিয়েছে শুভ্ররা। কটেজের বেশির ভাগ ঘরগুলোই খড় আর বাঁশের তৈরি। মনোরম, শান্ত পরিবেশ। সেই শান্ত পরিবেশ ঝাঁপিয়েই ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে আজ। খড়ের চাল নিগড়ে জল পড়ছে উঠোনে। পাহাড়ি মাটি আর খড়ের রঙের মিশ্রণে অদ্ভুত এক রঙ তৈরি হচ্ছে পানিতে। কটেজের ছোট্ট বারান্দায় পাতা কাঠের বেঞ্চিতে বসে আছে রোদ। চোখদুটো বৃষ্টির পানিতে স্থির। মন মেজাজ ভালো নেই তার। ভীষণ অভিমানে বুক ভার হয়ে আছে। রোদের এই তীব্র অভিমানের মাঝেই শুভ্র এসে বসল পাশে। বার দুই কটেজের দরজার দিকে উঁকি দিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,

' এখানে বসে আছো কেন? ইশ! ভিজে যাচ্ছ তো। চলো ঘরে চলো। শুভ্রা ঘরে একা আছে।' 

রোদ নড়ল না। অনড় বসে থেকে চোখদুটো নিবদ্ধ রাখল আবছা হয়ে আসা পাহাড়ী বৃষ্টিতে। শুভ্রর দিকে তাকাল না। শুভ্র অধৈর্য্য কন্ঠে বলল,

' কি হলো? উঠো। সারা শরীর ভিজিয়ে ফেলেছ প্রায়। ঠান্ডা লেগে যাবে। তোমার মেয়ের বয়স এখন আড়াই বছর রোদপাখি। গ্রো আপ নাও। এসব বাচ্চামো কবে যাবে?' 

রোদ তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। মুহূর্তেই টলমল করে উঠল তার চোখ। তেজ নিয়ে বলল,

' কখনোই যাবে না। তাই আমিই চলে যাবো। আপনি আমায় একটা টিকেট করে দিতে পারবেন? না, থাক। লাগবে না। আই ক্যান ম্যানেজ। আমি এক্ষুনি ঢাকা ফিরব। অবশ্যই আমার বাবার কাছে।' 

রোদের চোখে জল দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল শুভ্র। বুকের ভেতর চিনচিন করে উঠল। উৎকন্ঠা নিয়ে বলল,

' তুমি কাঁদছ! কাঁদছ কেন? কেউ কিছু বলেছে?' 

রোদের গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। শুভ্র তার অভিমান বুঝতে পারছে না। কিন্তু আগে পারত! তাহলে এখন কেন পারছে না? চিত্রা ঠিক বলে। পুরুষ মানুষের ঠিক নেই। ধীরে ধীরে ভালোবাসা কমবে তারপর বদলাবে ভালোবাসার ঠিকানা। রোদ ডান হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে অন্যদিকে ফিরে বসে রইল। চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে টপাটপ। শুভ্রর ধৈর্য্যর বাঁধ ভাঙলো এবার। ধমকে উঠে বলল,

' অযথা কাঁদছ কেন? সমস্যাটা কি? মেজাজ খারাপ করাবে না। কান্না থামাও।' 

শুভ্রর ধমকে চমকে উঠল রোদ। তার এখন আরও বেশি কান্না পাচ্ছে। শুভ্র তাকে বুঝার চেষ্টা না করে উল্টো ধমকাচ্ছে। শুভ্র পাল্টে গিয়েছে। রোদ শুভ্রর দিকে না তাকিয়েই উঠে রুমে ঢুকে গেল। চুপচাপ জামাটা চেঞ্জ করে বিছানার এক কোণায় গিয়ে বসল। রাত থেকে পেট ব্যথা করছে তার। ব্যথার মাত্রা সময়ের সাথে সাথে বাড়ছে। রোদ চোখ তুলে চারপাশে তাকাল। রুমটা আবছা অন্ধকারে ঢেকে আছে। বিছানার মাঝ বরাবর শুয়ে আছে তাদের ঘুমন্ত কন্যা। বিছানা হাতড়ে ফোনটা খুঁজে নিয়ে বার কয়েক ভাইকে ফোন লাগাল সে। ফোন রিসিভ না হওয়ায় মেয়ের একপাশে গা এলিয়ে দিল। প্রচন্ড কান্নায় কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল শরীর। দরজায় দাঁড়িয়ে তার সবটাই পর্যবেক্ষণ করছে শুভ্র। রোদকে এভাবে কাঁদতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়ছে মস্তিষ্ক। ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। বিয়ের পর একটা দিনের জন্যও তো এভাবে কাঁদেনি তার রোদপাখি। তবে আজ কেন? কিছুক্ষণের মাঝেই ফোন বাজল। রোদ রুদ্ধ কন্ঠে ভাইকে জানাল, তার ঢাকাগামী বাস অথবা ট্রেনের টিকেট চায় এবং তা কালকের মাঝেই। রাহাত বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল, 

' তুই কাঁদছিস? শুভ্র কোথায়?' 

রোদ জোর দিয়ে বলল,

' আমি কাঁদছি না। তুই আমাকে ট্রেনের টিকেট করে দিবি কি-না বল।' 

' কালই গেলি আর আজই ফিরতে চাইছিস। কি হয়েছে বোন? আমায় বল। শুভ্র কিছু বলেছে?' 

রোদ রুদ্ধ কন্ঠে তেজ নিয়ে বলল,

' এতো জবাবদিহি চাইছিস কেন ভাইয়া? বিয়ে হয়ে গিয়েছে এইজন্য? এখন বাবার কাছে যাওয়ার জন্যও স্ট্যাম্প নিয়ে যেতে হবে? অনেক ধন্যবাদ ভাই। যাব না তোর বাড়ি। লাগবে না তোর টিকিট। ভালো থাক।' 

কথাটা বলেই ফোন কাটল রোদ। ভীষণ অভিমানে চোখ বেয়ে নামতে লাগল জল। কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল ছোট্ট শরীর। রাহাত একের পর এক ফোন দেওয়ায় ফোনটা বন্ধ করে ছুঁড়ে মারল দূরে। পেট ব্যথা করছে করুক। পারলে মরে যাক। কাউকে বলবে না সে। মরে গিয়ে শুভ্রকে আরেকটা বিয়ে করার সুযোগ দেওয়া যেতেই পারে। শুভ্র এবার ধীর পায়ে এগিয়ে এলো কাছে। মেয়েকে একপাশে শুইয়ে দিয়ে রোদের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। মাথায় হাত বুলিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল,

' আমি সরি। শুভ্র তার রোদপাখিকে ননস্টপ সরি বলছে। সব দোষ শুভ্রর। একটু বলো কি করেছি আমি? সব ঠিক করে দেব আমি। এভাবে কেঁদো না। আমার ভয় করছে। তুমি জানো, আমি তোমার কান্না সহ্য করতে পারি না৷ আমার দোষ থাকলে বকো আমায়। মারো। তুমি আমার সাথে কথা বলছ না কেন?' 

রোদ উত্তর দিল না। শুভ্রর হাতটা সরিয়ে দিয়ে উঠে বসল। ব্যথাটা কি আগের রোগের সিনড্রোম বহন করছে? সে কি মারা যাচ্ছে? রোদ ধীরে সুস্থে বিছানা থেকে নামল। লাগেজটা টেনে নিয়ে গুছাতে বসতেই উঠে বসল শুভ্র। রোদের হঠাৎ এমন ব্যবহারে মনটা কু ডাকছে তার। রোদ চলে যেতে চাইছে মানে কি? রোদ কি কোনভাবে ওর থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে? রোদ চলে গেলে তার কি হবে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই যেন পাগল হয়ে গেল শুভ্র। দ্রুত পায়ে রোদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লাগেজটাকে লাথি দিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলল। রাগ, ভয় আর দুশ্চিন্তায় রোদকে শক্ত করে চেপে ধরল। প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে বলল,

' কি সমস্যা তোমার? কখন থেকে একটা প্রশ্ন জিগ্যেস করছি। কানে যাচ্ছে না? সবসময় এমন বাচ্চামো ভালো লাগে না রোদ। মেয়ের সামনে চড় না খেতে চাইলে চুপচাপ গিয়ে ঘুমাও। মাঝ দুপুরে এতো জ্বালা সহ্য হয় না।' 

শুভ্রর ঝাঁকুনিতে মাথাটা ঝিমঝিম করছিল রোদের। শুভ্রর কথাগুলো শুনে টলমলে চোখ তুলে তাকাল সে। একদম অন্যরকম কন্ঠে বলল,

' আমি আপনাকে অনেক জ্বালাই না?' 

রোদের কথাটা যেন বুকে গিয়ে লাগল শুভ্রর। বুকে চিনচিনে ব্যথা করে উঠল। হঠাৎই রোদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শুভ্র। প্রিয়তমাকে নিজের বাহুডোরে পিষে ফেলার চেষ্টা করে ভারি কাতর স্বরে বলল,

' তোমাকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি রোদপাখি। তুমি কাঁদলে নিজেকে আমার পাগল পাগল মনে হয়। তাই বকে দিয়েছি। আমি সরি।' 

' আপনার একটা ম্যাচিউর বউ দরকার ছিলো।' 

' প্লিজ রোদপাখি। সরি। আমাদের আশেপাশের প্রত্যেকেই জানে। ইভেন তুমি নিজেও জানো, তুমি ছাড়া শুভ্র অচল। আমার বাচ্চা আর আমার জন্য তোমার থেকে পার্ফেক্ট কেউ হতে পারত না। আমার দোয়ায় সবসময় তোমাকেই চেয়ে এসেছি। এখনও চাই। ভবিষ্যতেও চাইব। এসব ফালতু চিন্তা কোথা থেকে আসে তোমার মাথায়?' 

রোদ দুর্বল হাতজোড়া শুভ্রর পিঠের উপর রাখল। কেঁদেকেটে ফুলিয়ে ফেলে চোখদুটো পিটপিট করে তাকাল। চোখের পাঁপড়িগুলো ভিজে ল্যাপ্টে আছে। টুলটুলে মুখটা ভীষণ আদুরে আর স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। সেই মায়াভরা মুখটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে কপালে গাঢ় চুমু খেল শুভ্র। বুকের ভেতর উথলে উঠা আবেগ নিয়ে প্রিয়তমার মাথাটা চেপে ধরল বুকে। সাথে সাথেই বুক বেয়ে বেরিয়ে এলো স্বস্তির নিঃশ্বাস। রোদের চুলের ভাজে আরও একটা উত্তপ্ত চুমু দিয়ে নরম কন্ঠে প্রশ্ন করল শুভ্র, 

' এখন বলো, কি করেছি আমি? কাঁদছিলে কেন?' 

রোদ হাতের বাঁধনটা আরও একটু জোড়াল করে মৃদু কন্ঠে বলল,

' আমি কোনোভাবে মারা গেলে খবরদার দ্বিতীয় বিয়ে করবেন না। আমার ঘরে নতুন বউ নিয়ে ঘুমাবেন। ভালোবাসবেন। হাসবেন। তা আমি সহ্য করব না। ভূত হয়ে এসে খুন করব আপনাকে। আর আপনার নতুন বউকে তো একদম টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলব। মাইন্ড ইট।' 

শুভ্র ভাবনাতীত বিস্ময় নিয়ে বলল,

' কি বলছ এসব?' 

রোদ জবাব দিল না। একহাতে নিজের চুলগুলো টেনে ধরে চোখ-মুখ কুঁচকাল। প্রচন্ড ব্যথায় যেন মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। শুভ্রর বুকে মাথাটা চেপে ধরে বিরবির করে বলল,

' খবরদার দ্বিতীয় বিয়ে করবেন না।'  

এটুকু বলেই নিথর হয়ে গেল রোদের শরীর। চুল খামচে ধরা হাতটা গড়িয়ে পড়ল শুভ্রর বুকে। রোদের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নিজের বুকের দিকে তাকাল শুভ্র। রোদের শুকিয়ে যাওয়া ফ্যাকাশে মুখটা টেনে তুলে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদু কন্ঠে ডাকল,

' রোদ? এই রোদ? তোমার মুখটা এতো শুকনো কেন লাগছে? তোমার কী শরীর খারাপ লাগছে? রোদু?' 

রোদের সাড়া পাওয়া গেল না। শুভ্রর গলা শুকিয়ে এলো। রোদের গালে আলতো থাপ্পড় দিয়ে তাকে জাগানোর চেষ্টা করল। চেষ্টা সফল হলো না। শুভ্রর চিন্তা গুলিয়ে যাচ্ছে। কি হলো, কি হচ্ছে কিচ্ছু তার বোধগম্য হচ্ছে না। রোদকে নিজের সাথে চেপে ধরেই সাহেলকে ফোন লাগাল। প্রথমবারেরই ফোন রিসিভ হলো। ফোনের ওপাশে সাহেল সাড়া দিতেই শুভ্র খেয়াল করল সে কথা বলতে পারছে না। সব কথায় গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে। উচ্চারণ করা যাচ্ছে না। শুভ্র বার দুয়েক শ্বাস টেনে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতেই বুঝতে পারল তার শরীর কাঁপছে। 

' হ্যালো? হ্যালো? এই শুভ্র? কথা বলছিস না কেন?' 

সাহেলের প্রশ্নের উত্তরে খসখসে কন্ঠে জবাব দিল শুভ্র, 

' রোদ সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে। ওর সারা শরীর ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। একটা ডাক্তারের ব্যবস্থা কর দ্রুত। এখানে ডাক্তার পাওয়া যাবে?' 

সাহেল চমকে উঠে বলল,

' রোদ সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে মানে কি? কি হয়েছে ওর? তোর বউ সেন্সলেস হয়ে গেছে আর তুই এতো স্বাভাবিক কি করে? তোর কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, হাত থেকে জুসের বোতল পড়ে গিয়েছে। বেয়ারা ডেকে সেটা পরিষ্কার করে দিতে বলছিস।' 

শুভ্র একবার রোদের মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটির চোখ-মুখ এমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন? শুভ্র আগে কেন খেয়াল করেনি? কখন থেকে সাফার করছে মেয়েটা? শুভ্র এতোটা কেয়ারলেস কি করে হলো? কথাগুলো ভেবেই নিজেকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে তার। সবকিছু ভেঙেচুরে শেষ করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। শুভ্র রোদের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে কথা বলার চেষ্টা করল। শুকনো কন্ঠে বার দুয়েক ঢোক গিলে নিয়ে বলল,

' বাজে কথা বাদ দিয়ে ডাক্তারের ব্যবস্থা কর।' 

সাহেল হতভম্ব হয়ে বসে রইল। রোদ সত্যিই অসুস্থ কিনা বুঝতে পারছে না। রোদ অসুস্থ হলে শুভ্রর এতো শান্ত হয়ে বসে থাকার তো কথা না। 

কটেজের নিজস্ব রেস্টুরেন্টে বসে আছে শুভ্রতা। ছোট্ট গালদুটো ফুলে আছে অভিমানে। বড় বড় চোখ মেলে চেয়ে আছে রেস্টুরেন্টের দরজার দিকে। তার পাশের চেয়ারগুলোতেই বসে আছে আদ্র-রৌদ্র, অভ্র- রুহি, নাবিলা-সাদাফ। বাকিরা খেতে আসেনি। রোদকে নিয়ে শহরে যেতে হয়েছে। আদ্র নিজের প্লেটের লেগ পিসটা শুভ্রতার প্লেটে তুলে দিয়ে বলল,

' তোকে আমার চিকেনটাও দিয়ে দিয়েছি। জলদি খা। না খেলে পেট ব্যথা করে।' 

আদ্রর দেখাদেখি রৌদ্রও নিজের পাতের মাংসটা তুলে দিল শুভ্রতার প্লেটে। শুভ্রতাকে বুঝানোর ভঙ্গিমা করে বলল,

' মামণি এসে যদি দেখে তুই খাসনি। তাহলে মামণি অনেক রাগ করবে। তোর সাথে কথায় বলবে না আর। তাই না আম্মু?' 

রুহি রৌদ্রর কপালে চুমু দিয়ে মাথা নাড়ল। ছেলেদুটো দুষ্ট হলেও পরিস্থিতি খুব বুঝে। বোনের প্রতি তাদের কি টান! শুভ্রতার বড় বড় চোখদুটো টলমল করে উঠল। ছোট্ট, পাতলা ঠোঁটদুটো উল্টে দিয়ে বলল,

' আম্মু যাব।' 

নাবিলা শুভ্রতাকে কোলে তুলে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আদর করল। অনেক খেলনা কিনে দেওয়ার লোভও দেখাল। রূপকথার গল্প শোনাল। কিন্তু লাভ বিশেষ হলো না। ততক্ষণে কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে ফেলেছে শুভ্রতা। চোখ থেকে টপাটপ জল গড়াচ্ছে। অভ্র বাধ্য হয়েই শুভ্রকে ফোন লাগাল। শুভ্র ফোন ধরতেই বলল,

' কি অবস্থা? কখন ফিরবি? প্রিন্সেস আমাদের কান্নাকাটি করে হেঁচকি তুলে ফেলেছে। কিছুই মুখে দিচ্ছে না। এতো জেদ।' 

শুভ্র ক্লান্ত কন্ঠে বলল,

' মেয়েকে দাও ফোনটা।' 

অভ্র ফোনটা লাউডে দিয়ে বলল,

' মামনি? বাবা কথা বলে। বাবার সাথে কথা বলো।' 

শুভ্রতা টলমলে চোখে ফোনের দিকে তাকাল। ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলল। শুভ্র ব্যস্ত হয়ে বলল,

' আম্মু? কাঁদে না মা। লক্ষ্মী মেয়েদের কাঁদতে হয় না সোনা। আমার আম্মুটা তো লক্ষ্মী বাচ্চা তাই না? বাবা তোমায় অনেক আদর দেয়। বাবার কথা শুনো সোনা।' 

' আম্মু যাব।' 

মেয়ের কান্না আর হেঁচকির শব্দে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে শুভ্রর। শুভ্র আদুরে কন্ঠে বলল,

' অবশ্যই আম্মু যাবে। আম্মু আর বাবা তোমার জন্য অনেক অনেক মজা কিনছে। অনেক খেলনা কিনছে। তোমার খেলনা চাই না?' 

' আম্মু যাব। আম্মু কোতায়?' 

' আম্মু আছে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। প্রিন্সেসের আম্মু বৃষ্টিতে ভিজলে আম্মুর অসুখ করবে তো সোনা। বৃষ্টিটা কমলেই চলে আসবে আম্মু।' 

শুভ্রতা ডানহাতে চোখ মুছে মায়ের মতোই নাক টেনে অভিমানী কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে, 

' ছত্তি?' 

শুভ্র মৃদু হাসে। 

' একদম সত্যি। বাবা মিথ্যা বলে না। তুমি এখন মামনি আর ভাইয়াদের সাথে খেয়ে নাও। বাবা আম্মুকে নিয়ে জলদি চলে আসবে।'

শুভ্রতা জেদ ধরা কন্ঠে বলল,

' আম্মু সাতে খাব।' 

শুভ্র হতাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেয়েকে বুঝিয়ে লাভ নেই। মেয়ে হয়েছে তার মায়ের মতো জেদী। যা মনে হবে তাই করবে। মায়ের মতো যুক্তিহীন জেদ নিয়ে বসে থাকবে। শুভ্রর অগোচরে মায়ের থেকে দুই-চারটা চড় থাপ্পড় খেয়েও মায়ের জন্যই পাগল থাকবে। মেয়েকে বলেই বা কি লাভ? মেয়ে তো তারই। সেও ওই এক ক্যাটাগরিরই মানুষ। সেও রোদ ছাড়া কিছু বুঝে না। তার মেয়েও রোদ ছাড়া কিছু বুঝবে না, এটাই স্বাভাবিক। শুভ্র ফোন কাটতেই পাশের টেবিল থেকে উঠে এলো মিষ্টি একটি মেয়ে। উজ্জ্বল শ্যামা মেয়েটির মাথায় বিশাল লম্বা চুল। হাসিটা ঝরঝরে, মায়াবী। মেয়েটি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে নিঃসংকোচে বলল,

' হ্যালো বেবি? তোমার সাথে কালই আমার দেখা হয়েছিল, মনে আছে?' 

শুভ্রতা চোখ বড় বড় করে মেয়েটির চুলের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করা হয়েছে বুঝতে পেরে চুল থেকে চোখ সরিয়ে মুখের দিকে তাকাল। 

' তুমি আন্তি।' 

মেয়েটি হেসে ফেলল। রুহি-অভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল,

' আমি রাদিয়ানা আহমেদ রোজা। কাল শুভ্র স্যার আর রোদেলা ম্যামের সাথে দেখা হয়েছিল আমাদের। আমরা ওই পাশের টেবিলেই ডিনার করছি। আপনারা অনুমতি দিলে শুভ্রতাকে আমাদের টেবিলে নিয়ে যেতে পারি? অনেকক্ষণ ধরে কাঁদতে দেখছি, নিজেরই খারাপ লাগছে। বাচ্চারা আমায় খুব পছন্দ করে। আই থিংক, আমি ওকে খাওয়াতে পারব। মে আই?' 

রুহি হেসে বলল,

' চেষ্টা করে দেখতে পারেন।' 

আদ্র-রৌদ্র বাঁকা চোখে তাকাল। তাদের বোনকে অন্যকেউ নিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না। কিন্তু মায়ের ভয়ে কিছু বলাও যাচ্ছে না। শুভ্রতা বাধ্য মেয়ের মতোই রোজার কোলে চড়ে বসল। রোজার লম্বা লম্বা চুলগুলো বিস্ময় নিয়ে দেখতে লাগল। আঙ্গুলে পেঁচাতে লাগল। মন খারাপ, কান্না সব উবে গেল। মৃন্ময় মনোযোগ দিয়ে খাবার খাচ্ছিল। রোজা শুভ্রতাকে নিয়ে চেয়ার টেনে বসতেই চোখ তুলে তাকাল সে। স্বভাবসুলভ হেসে বলল,

' হ্যালো!' 

শুভ্রতা উত্তর দিল না। চুপচাপ মৃন্ময়ের মুখের দিকে চেয়ে রইল। রোজা আদুরে কন্ঠে বলল,

' হিরো সাহেবকে হাই বলো। তুমি জানো? এই হিরো দুষ্টুদের ডিসুম ডিসুম মারে। হিরোর অনেক শক্তি।' 

শুভ্রতা চোখ ফিরিয়ে রোজার দিকে তাকাল। মৃন্ময়কে আড়চোখে দেখে নিয়ে চোখ-মুখ নেড়ে বলল,

' আমাল বাবা ছুপাল হিলো।' 

রোজা অবাক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,

' তোমার বাবা সুপার হিরো?' 

শুভ্রতা গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। রোজার চুলে হাত পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,

' আম্মু বলেচে।' 

শুভ্রতার কথায় হেসে ফেলল মৃন্ময়। শুভ্রতা নিজের মতো বলল,

' আমাল বাবা আমায় কোলে উথায়। আম্মুকেও কোলে উথায়। বাবাল অনেক ছক্তি। সবাল থেকে বেছি ছক্তি।' 

মৃন্ময় হাসি হাসি মুখে আবারও খাওয়ায় মনোযোগ দিল। বাচ্চাটির আধো আধো কথা শুনতে ভালো লাগছে। বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে থাকা কেশবতী কন্যাটিকে আরও বেশি ভালো লাগছে। তীর্থ এতোক্ষণ চুপ থাকলেও এবার কুটিল দৃষ্টিতে তাকাল। ভ্রু নাচিয়ে বলল,

' তোমার আম্মুকে তো আমিও উঠাতে পারব পিচ্চু। তার জন্য তোমার বাবার মতো অতো ফিট হওয়া লাগে নাকি?' 

কথাটা বলে খানিকটা ঝুঁকে এলো তীর্থ। কন্ঠটা খাঁদে এনে বলল, 

' তোমার আম্মু কিন্তু হেব্বি দেখতে পিচ্চু। আজ থেকে তোমার আব্বুকে বাদ দিয়ে আমাকে বাবা বলে ডাকবে। আমাকে বাবা ডাকলে তোমায় অনেকগুলো চকলেট কিনে দেব। দরকার পড়লে, চকলেটের দোকান কিনে দেব। বুঝেছ?' 

তীর্থর কথায় খিলখিল করে হেসে উঠল রোজা। শুভ্রতা কিছু বুঝতে না পেরে গম্ভীর হয়ে বসে রইল। বড় বড় চোখ মেলে দুই একবার তীর্থ-রোজাকে দেখে নিয়ে রোজার চুলের দিকে মনোযোগী হলো। মৃন্ময় অতি সন্তপর্ণে রোজার হাস্যোজ্জল মুখটির দিকে তাকাল। তার হঠাৎ করেই মনে হলো, এই মেয়েটি পৃথিবীর সব থেকে সুখী মেয়ে। এই মেয়ের থেকে সুখী এই দুনিয়াতে দ্বিতীয় কেউ হতে পারে না। এমন করে প্রাণখোলা হাসি হাসা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব।
          ভোর রাত থেকে শুরু হয়েছে আষাঢ়িয়া তান্ডব। কাঁচের জানালাটা ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টিকন্যার চঞ্চল নৃত্যে। হাসপাতালের করিডোরে, এক পাশে দাঁড়িয়ে বাইরেটা খেয়াল করছিল শুভ্র। চোখ-মুখ ক্লান্তিহীন। তবুও কোথায় একটা উদাসী বিষাদের ছাঁয়া। সুন্দর চোখজোড়াতে অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টি। 

' ডিসচার্জের ব্যবস্থা তো হয়ে গিয়েছে। এখনই বেরুবি? দুটো দিন হাসপাতালে থেকে গেলে হতো না?' 

কাঁচের জানালায় লম্বা চওড়া এক যুবকের প্রতিবিম্ব পড়তেই সন্তপর্ণে দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুভ্র। দুই হাত পকেটে গুঁজে রেখেই ঘাড়টা হালকা কাত করে পাশে তাকাল, 

' মেয়ে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে বসে আছে। মাকে ছাড়া খাবে না। কী আশ্চর্য বিষয় বল তো সাহেল, জন্মানোর পর যে মেয়ে শুধু বাবার কোলে কোলে থেকেছে, দীর্ঘ সময় মাকে কাছে পর্যন্ত পায়নি। সেই মেয়ে মায়ের এতো ভক্ত হলো কী করে? টেকনিক্যালি বাবার প্রতি ওর আকর্ষণ বেশি হওয়ার কথা ছিল না?' 

সাহেল হেসে ফেলল। বলল,

' সেদিক থেকে চিন্তা করলে মেয়ে কিন্তু বাবাকেই ফলো করছে। বাবা যার ভক্ত, বাবার মেয়েও তারই ভক্ত। বাবা থেকেই ইন্সপায়ারড বলতে পারিস।' 

শুভ্র হাসল। খানিক ভাবুক হয়ে বলল,

' বাবা! বাবা হয়ে গেলাম। কী সাংঘাতিক ব্যাপার না? আজও মনে হয়, এইতো সেদিন ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। এসব ভাবলেই বাচ্চা বাচ্চা লাগে নিজেকে।' 

সাহেল ঠোঁট টিপে হেসে বলল,

' আরে ধূর! সবচেয়ে ভালো এক্সামপল হলো, এইতো সেদিন ভার্সিটি গেইটে সানশাইনের হাতে চড় খেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলি। আহা! কী দৃশ্যপট! এখনও চোখে ভাসে।' 

শুভ্র ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল,

' তুই শালা আর কোনো স্মৃতি মস্তিষ্কে ক্যাপচার করতে পারিস না? খুঁজে খুঁজে আমার বেইজ্জতির স্মৃতিগুলোই তোর মনে থাকে?' 

' মনে থাকবে না মানে? আরে! এটা তো পুরো পৃথিবীর মনে রাখা উচিত। ভার্সিটি গ্রুপে এখনও এই বিষয়ে চর্চা হয়। বিরাট কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, ভার্সিটি শাইন, মোস্ট ইগোইস্টিক শুভ্র জুনিয়রের হাতে চড় খেয়ে, সেই মেয়েরই বাচ্চার বাবা হয়ে গেল কী করে? কঠিন প্রশ্ন!' 

শুভ্র চোখ গরম করে তাকাতে গিয়েও হেসে ফেলল। তারপর হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

' সাহেল! মিসক্যারেজের ব্যাপারটা চেপে যাস প্লিজ। রোদ প্রেগন্যান্সির ব্যাপারেই জানতো না। সো, মিসক্যারেজের ব্যাপারে জানার প্রয়োজনও তার নেই। আমি চাই না ওর মন খারাপ হোক।' 

সাহেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। হাসার চেষ্টা করে বলল,

' জানবে না। ওহ্ হ্যাঁ, আমি গিয়ে গাড়ি রেডি করছি। তুই সানশাইনের কাছে যা। আই হোপ, ও জেগে গিয়েছে।'

সাহেল দ্রুত পায়ে সরে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুভ্র। সাহেলের যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে থেকে আনমনে বিড়বিড় করল, 'সানশাইন!' রোদের কেবিনের দিকে ফিরে যেতে যেতে সে উপলব্ধি করল, 'সানশাইন' শব্দটা মাথায় ভোঁতা রাগ তৈরি করছে। হঠাৎ মেজাজ খারাপ হচ্ছে। আচ্ছা? সে কী এই ছোট্ট একটা নামের জন্যও ঈর্ষান্বিত হচ্ছে? শুভ্র নিজের উপরই বিরক্ত হলো। আশ্চর্য! এখন কী এসব নিয়ে রাগারাগি করার সময়? মাথার ভেতর দগদগে রাগ নিয়ে কেবিনের দরজাটা ঠেলতেই বিরক্ত চোখদুটো স্নিগ্ধ হয়ে এলো। মাথার ভোঁতা রাগটা সরে গিয়ে মন জুড়ে সুবাস ছড়াল ঐশ্বরিক এক মায়া। একদম ঝুপ করে শান্ত হয়ে গেল সে। শব্দহীন পায়ে ঘুমন্ত মানবীর পাশে দাঁড়াতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো। বিছানার পাশের খাঁড়া টোলটির উপর বসে একদৃষ্টে চেয়ে রইল চোখ বোজা ফ্যাকাশে, তেলতেলে মুখটিতে। মুখের উপর ছড়িয়ে থাকা চুলের গোছা সরিয়ে দিয়ে মাথায় আলতো বিলি কাটতে কাটতে কপালে ঠোঁট ছুঁয়াল। প্রায় সাথে সাথেই চোখ মেলে তাকাল রোদ। দুর্বল অথচ মিষ্টি হাসি হাসল। তার সেই হাসি ছড়াল শুভ্রর ঠোঁটেও। রোদের একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে খুব আলতো আদর করে, মৃদু কন্ঠে বলল,

' মিস ইউ।' 

রোদের হাসি বিস্তৃত হলো। ঠোঁটভর্তি হাসি নিয়ে বন্ধ জানালা ইশারা করে বলল,

' এখন সকাল, বিকাল নাকি রাত? বুঝতে পারছি না।' 

' সকাল।' 

এমন সময় দরজা ঠেলে কেবিনে ঢুকল সাহেল। সাহেলের দিকে এক পলক চেয়ে শুভ্রর দিকে চাইল রোদ। সরল কন্ঠে বলল, 

' আমার কী হয়েছিল? ডাক্তার কী বলেছে? আমার মনে আছে, মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রনা হচ্ছিল। পেটেও ব্যাথা ছিল। আমি কী মারা টারা যাচ্ছি?' 

শুভ্র ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল। তারপর নিঃশব্দে সাহেলের চোখে চোখ রাখল। সাহেল শুভ্রর দিকেই চেয়ে ছিল। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বলল,

' এই মুহূর্তে মারা যাচ্ছ না তবে প্রাণহানির সম্ভাবনাও আছে। মারা যেতে পারো। শুভ্র তোমাকে শ্রীমঙ্গলের পাহাড় থেকে ফেলে দেবে বলে পরিকল্পনা করছে।' 

রোদ অবাক হয়ে বলল,

' মানে?'

শুভ্র গম্ভীর কন্ঠে বলল,

' তুমি যে ঔষধগুলো ঠিকমতো নাওনি তা ধরা পড়ে গিয়েছে। আগের সমস্যাগুলো মাথাচাড়া দিতে চাচ্ছে। তোমার ধারণা তোমাকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে? সুস্থ হও আগে, ঢাকায় ফিরি তারপর বুঝাব শুভ্র কী জিনিস!' 

রোদের মুখটা চুপসে গেল। ভীষণ নিষ্পাপ চোখে চেয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাল। শুভ্র সেদিকে পাত্তা না দিয়ে নার্সকে একটা হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করতে বলে নিচু কন্ঠে বলল,

' এভাবে তাকিয়ে লাভ নেই। এবার আর ঘায়েল হচ্ছি না। তোমার খবর আছে।' 

রোদ বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে মুখ কালো করে বলল,

' হুইলচেয়ার কেন? আমি হুইলচেয়ারে যাব না।' 

শুভ্র উঠে দাঁড়িয়ে রোদের চুলগুলো কাটায় আটকাতে আটকাতে বলল,

' তুমি চাইলে আমি নির্দ্বিধায় পাড় করাতে পারি ভরা দামোদর। এটা তো সিম্পল একটা হসপিটাল কম্পাউন্টার। আমি খুশি মনে কোলে উঠাতে পারি, যদি তুমি লজ্জায় লাল হয়ে গলে না যাও তো। উঠবে নাকি?' 

রোদ মুখ গুজ করে বলল,

' আমি হেঁটে যাব।' 

' বাচ্চাদের যেখানে সেখানে হাঁটতে নেই।' 

' আমি বাচ্চা?'

শুভ্র কোনোরকম অভিব্যক্তি ছাড়া বলল,

' এখানে যারা আছে তাদের তো আপাতত তাই ধারণা। সাহেলকে জিজ্ঞেস করো। ও তোমাকে বাচ্চা ভাবে কী-না?' 

রোদ সাহেলের দিকে তাকাল। সাহেল হেসে বলল,

' আমাকে জিজ্ঞেস করো না। আমি আপাতত বাচ্চা-কাচ্চাদের মন্তব্য দিতে ভরসা পাচ্ছি না। আমি বরং গাড়ির কাছে যাচ্ছি। তোমরা এসো।' 

শুভ্র ঠোঁট টিপে হাসল। রোদ রাগ নিয়ে তাকাতেই কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

' আমার কী দোষ? সাহেল নিজেই তোমায় বাচ্চা বলল। আমি তো বলতে বলিনি, বলেছি?'  

রোদ দুঃখী দুঃখী চোখে চেয়ে মুখ ফুলাল। এদের সমস্যাটা কী? এদের দুই বন্ধুর কী সে ছাড়া মজা করার মতো অন্য কোনো সাবজেক্ট নেই? যত্তসব! 

••••••••••••

বৃষ্টি থেমেছে ঘন্টাখানেক হলো। কটেজের সামনের বাগানটির এক পাশে ঝিরির মতো গড়িয়ে পড়ছে জল। সেই জলে হাত-পা ভিজিয়ে খেলছিল শুভ্রতা। তার পাশেই কাদায় মাখামাখি হয়ে খেলনা বানানোর চেষ্টা করছিল আদ্র-রোদ্র। সাদাফ পরিচ্ছন্ন পোশাকে এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে-পায়ে কাদার ছিটেফোঁটা নেই। শুভ্রতা বড় বড় চোখে সাদাফের দিকে তাকাল। চোখ পিটপিট করে বলল, 

' তুমি খেব্বে?' 

সাদাফ উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শুভ্রতা এগিয়ে গিয়ে আবারও একই কথা বলতেই সাদাফ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ঠোঁট দুটো হালকা ফাঁক করে বলল,

' তুমি পঁচা। পানি দিয়ে খেললে আম্মু বকে জানো না?' 

শুভ্রতা কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে আচমকা ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠল। আদ্র-রোদ্র অবাক হয়ে শুভ্রতাকে দেখল। পরমুহূর্তেই ছুটে এলো কাছে। রোদ্রর রাগ বরাবরই বেশি। সাদাফের দিকে তেড়ে গিয়ে রাগ দেখিয়ে বলল,

' এই তুমি বোনকে কাঁদালে কেন?' 

সাদাফ জবাব দিল না। শুভ্রতার দিকে চেয়ে রইল চুপচাপ। শুভ্রতার কান্না বাড়ল। আদ্র কিছুক্ষণ শুভ্রতাকে কোলে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা চালাল। সে নিজেই ছোট, শুভ্রতার ছোট্ট শরীর বাহুবন্ধন করার শক্তি তার থাকলেও ধরে রাখার শক্তি হয়ে উঠেনি এখনও। কাদামাখা হাতদুটো নিজের জামায় মুছে শুভ্রতার মাথায় হাত বুলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করে বলল,

' কাঁদিস না। কাঁদলে রাক্ষস আসে, দাদু বলেছিল না?' 

রোদ্র উষ্ণ কন্ঠে প্রশ্ন করল,

' কাঁদছিস কেন? সাদাফ মেরেছে?'

রোদ্রের চোখে অসহিষ্ণু। ভাবখানা এই, শুভ্রতা হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেই সাদাফকে সে ঠেঙাবে। শুভ্রতা সেসবের দ্বারে কাছে না গিয়ে ঠোঁট উল্টাল,

' আম্মু যাব। বাবা কোতায়?' 

এটুকু বলতেই দু'ফোঁটা টসটসে জলে মাখামাখি হলো কচি গাল। গোটা দুইদিন, এক রাত বাবা-মাকে দেখে না সে। কোথায় তার আম্মু আর বাবা? আদ্র শুভ্রতার কান্না থামানোর চেষ্টা করতে করতে অসহায় চোখে রোদ্রর দিকে তাকাল। রোদ্র আর সাদাফের চোখেও অসহায় দৃষ্টি। শুভ্রতার কান্না মায়ের কানে গেলে, মা নিশ্চয় বিনা বিচারে তাদের তিনজনকেই লাঠিপেটা করবে? 

•••••••••••••

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পার্কিংয়ের কাছাকাছি এসে দাঁড়াতেই পার্কিংয়ের দিকে ইশারা করে চাপা কন্ঠে প্রশ্ন করল সাহেল,

' আরে! ওটা গ্যাংস্টার রাফিন চৌধুরী না? এই লোক এখানে কেন?' 

পার্কিংয়ে কোট স্যুট পরা ভদ্র জনতার দিকে উৎসুক চোখে তাকাল রোদ। চোখ বড় বড় করে বলল,

' গ্যাংস্টার! সত্যিকারের গ্যাংস্টার? আমাদের দেশেও গ্যাংস্টার ট্যাংস্টার আছে নাকি?'

' কেন থাকবে না?' 

শুভ্র হুইলচেয়ারে হাত রেখে রোদের পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। সাহেলের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাল। ফর্মাল স্যুট পরনে দীর্ঘকায় পুরুষটিকে দেখে ভ্রু বাঁকাল সে। পেছনে তার বডিগার্ডের বহর। 

' হ্যাঁ। রাফিন চৌধুরীই।' 

' তোর সাথে পরিচয় আছে?' 

সাহেলের কথার মাঝেই উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করল রোদ,

' এই লোক কোন ধরনের গ্যাংস্টার? মুভির মতো? যে মেয়েকে পছন্দ হয় সেই মেয়েকেই তুলে নিয়ে যায়। আনকাউন্টেবল রেইপ কেইসেস, মার্ডার কেইসেস। যাকে ইচ্ছে হয় তাকেই মেরে ফেলে, এমন টাইপ? তবে তো সাংঘাতিক!' 

শুভ্র বিরক্ত হয়ে বলল,

' শাট আপ রোদ।' 

রোদ কিছু বলবে তার আগেই রাফিনকে এদিকে আসতে দেখা গেল। রাফিনকে এদিকে আসতে দেখেই চুপ হয়ে গেল রোদ। এই লোক যদি সত্যি সত্যিই গুন্ডা টুন্ডা হয় তাহলে তো বিশাল বিপদ। কিন্তু চোখ-মুখ দেখে তো ছ্যাঁচড়া,ফালতু টাইপ মনে হয় না। ইগনোর করার মতো পার্সোনালিটি অবশ্যই নয়। রাফিনের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে প্রস্ফুটিত অহংকার। হাঁটা-চলায় রাজকীয় গাম্ভীর্য। নিজের সাম্ভ্রাজ্যে ঘুরে বেড়ানো মুক্ত শাসকের মতোই দ্বিধাহীন দৃষ্টি আর আত্মবিশ্বাস। রাফিন হাসপাতালের ভেতরের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ শুভ্রকে খেয়াল করল। ঘাড়টা হালকা কাত করে এদিকে তাকাল। চোখদুটো কালো সানগ্লাসে ঢাকা থাকায় চোখের অভিব্যক্তি বুঝা গেল না। রাফিনের স্থির, কঠোর মুখখানার দিকে এক আধবার আড়চোখে তাকাল রোদ। রাফিন রোদকে খেয়াল করল বলে মনে হলো না। শুভ্রর দিকে চেয়ে বলল,

' মিষ্টার আহমেদ?' 

শুভ্র সৌজন্যতার হাসি হাসল। রাফিন এক পা এগিয়ে এসে সোজা হয়ে দাঁড়াল। শুভ্রও দুই পা এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে বলল,

' হ্যালো, মিষ্টার চৌধুরী।' 

রাফিনের ঠোঁটে তখন কঠোর হাসি। চোখে-মুখে প্রকাশ্য অহংকার। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়াতে জ্বলজ্বল করছে অপ্রতিরোধ্য আত্মবিশ্বাস। এই পৃথিবীর কোথাও মাথা ঝুঁকাবার নয় এমন অবিশ্বাস্য গর্ব তার ঠোঁটের কোণায়। রাফিন হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

' আমার জানা মতে, এবারের তিনটি টেন্ডারই আপনাদের কোম্পানি পেয়েছে। কনগ্রাচুলেশন।' 

শুভ্র হালকা হেসে বলল,

' থেংকিউ।' 

রাফিন আবারও হাসল। অতিরিক্ত কৌতূহল তার স্বভাব বিরুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করল,

' এখানে কেন? আহমেদদের টাকা খরচ করার জন্য ঢাকার হসপিটালই ফার্স্ট প্রায়োরিটি হওয়া উচিত।' 

' ফ্যামিলি ট্যুরে এসেছি। আমার ওয়াইফ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় ডক্টরের এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়েছিল। ' 

রাফিন তার দাম্ভিক হাসি হেসে এক নজর রোদের দিকে তাকাল-কী-তাকাল না বুঝা গেল না। ঠোঁট গোল করে বলল,

' ওহ! ওয়াইফ! আপনিও যে হোম ম্যাটারিয়াল পার্সোন জানতাম না। নিউলি ম্যারেড?' 

শুভ্র হেসে বলল,

' তেমন নয়। আমাদের একটা মেয়ে আছে।' 

রাফিনের ঠোঁটে তখনও সেই দাম্ভিক হাসি। সানগ্লাসে ঢাকা চোখদুটো অভিব্যক্তিহীন। 

' ওহ! দেন ইউ আর কমপ্লিটলি ওয়ার্ল্ডলি পার্সোন। অল দ্য বেস্ট।' 

' থেংক্স। কিন্তু আপনি এখানে?'

রাফিন উত্তর না দিয়ে হাসল। সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতেই হাফ ছেড়ে বাঁচল রোদ। চাপা কন্ঠে বলল,

' এত্তো এটিটিউট! এই লোক সত্যিই গ্যাংস্টার? মানুষ মারে? যদিও প্রচন্ড এটিটিউট ক্যারি করে তবুও খুনাখুনির ব্যাপারটা বিশ্বাস হয় না। স্মোথ চেহারা। চেষ্টা করলে, সিনেমায় নায়ক টায়ক হয়ে যেতে পারত। এতো সুন্দর চেহারার ছেলেরা খুন করে কী করে?' 

শুভ্র ফিরে তাকাল। রাফিন শুভ্রর সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ না করলেও ব্যক্তিগতভাবে লোকটিকে পছন্দ নয় শুভ্রর। রাফিনের 'ডোন্ট কেয়ার' বিহেভিয়ারই তার রেগে যাওয়ার প্রধান কারণ। এবারও তাই হলো। মাথায় দপদপে রাগ নিয়ে সে নিজের জায়গায় ফিরে গেল। ধমকের স্বরে বলল,

' শাট আপ রোদ।' 

ধমক খেয়ে রোদ মুখ ফুলিয়ে তাকাল। সাহেল হেসে বলল, 

' সুন্দর চেহারার সাথে খুন করার কী সম্পর্ক?তোমার বরের চেহারাও যথেষ্ট সুন্দর। সে যে বিনা কারণে মাঝ রাস্তায় হাড়ের ডাক্তারের হাড় ভেঙে গুড়ো করে দিতে পারে সেটাও কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবুও তা ঘটেছে। এমন অনেক কান্ডই আছে যা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নয় তবুও তোমার বর ঘটিয়েছে। তো... '  

শুভ্র চোখ রাঙিয়ে তাকাল। প্রায় সাথে সাথেই সাহেল আর রোদ একসাথে বলে উঠল, 

' শাট আপ সাহেল ।' 

কথাটা বলে শব্দ করে হেসে উঠল দুজনেই। শুভ্র থতমত খেয়ে গেল। পরমুহূর্তেই রাগ নিয়ে বলল,

' ইয়েস! শাট আপ, বোথ অফ ইউ।' 

সাহেল আর রোদ ঠোঁট টিপে হেসে চুপ করে গেল। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে তাদের সামনে আসতেই দৃশ্যপটে নতুন চরিত্রের দেখা মিলল। ছিপছিপে লম্বাটে এক তরুণী গট গট করে হেঁটে হাসপাতালের পার্কিং এ এসে দাঁড়াল। রাগে ফর্সা মুখে লালাভ ভাব। বার কয়েক এদিক ওদিক তাকিয়ে শুভ্রদের দিকে এগিয়ে এলো মেয়েটি। নম্র কন্ঠে বলল,

' এখানে গাড়ি ভাড়া পাওয়া যাবে কোথায় বলতে পারেন?' 

সাহেল কিছু বলবে তার আগেই পেছন পেছন বেরিয়ে এলো ফর্সাটে এক পুরুষ। চেহারা ছবি আহামরি না হলেও চোখে মুখে অন্য রকম এক আকর্ষণ। হঠাৎ ভিড়ে চোখে পড়ার মতো চৌম্বকত্ব। লোকটি কাছে এসে বিনা ভূমিকায় বলল,

' কম অন, নার্সটা আসলেই সুন্দর ছিল। এখন সুন্দরকে সুন্দর বলা যাবে না? মেয়েটা সুন্দর হলে, হোয়াট ক্যান আই ডু?' 

রাগে অগ্নিশর্মা মেয়েটি আরেক ধাপ রেগে গিয়ে বলল,

' আমি কোনো এক্সপ্লেনিশন চেয়েছি? মেয়েটি সুন্দর। ওখানে বসে বসে সুন্দর মেয়েটির সৌন্দর্যের উপর কবিতা লিখেন। মানা করেছে কে? আমি আপনাকে চিনি না। গো টু হেল।' 

কথাটুকু বলেই শুভ্র আর সাহেলের দিকে তাকাল মেয়েটি। মুখ ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল। বলল,

' এক্সকিউজ মি? আপনারা কী আমায় একটু হেল্প করতে পারবেন? আমি কী আপনাদের গাড়িতে লিফ্ট পেতে পারি? আমি ঢাকা যাব। খুব প্রয়োজন৷ আমাকে একটু বাসস্ট্যান্ডে ড্রপ করে দিবেন প্লীজ?' 

শুভ্র ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল। রোদের চোখে কৌতুহল। লোকটি অবাক হয়ে বলল,

' মিস.ঝগড়ুটে? ব্যাপারটা কী এবার বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাচ্ছে না? আমরা কালই এসেছি এখনই ঢাকা ফিরবে মানে কী?' 

অদিতি রাগী চোখে তাকাল। চোখদুটো টলমল করছে তার। আয়ান হতভম্ব কন্ঠে বলল,

' ওহ গড! তুমি কাঁদছ! ডোন্ট ছে, তুমি সেই নার্সের প্রতি জেলাস হয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছ? কম অন... ' 

অদিতির চোখ থেকে টপ করে এক ফোঁটা জল গড়াল। তেজি কন্ঠে বলল,

' আমি কারো প্রতি জেলাস ফেলাস হচ্ছি না। আমি আজই ঢাকা ফিরব এবং এখনই ফিরব। খবরদার আমার বাবার বাড়ির আশেপাশে আসবে না। সেই নার্সকে বিয়ে করে আমেরিকা যাও। সংসার করো। হানিমুন সারো৷ আই ডোন্ট কেয়ার। আমি তোমাকে ডিভোর্স দিব ব্যস।' 

আয়ানের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা দেখা গেল না। অর্থাৎ বউয়ের এমন রাগারাগিতে সে অভ্যস্ত। দুশ্চিন্তার বদলে ঠোঁটে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,

' আহ! তুমি রেগে গেলে এত্তো কিউট করে 'তুমি, তুমি' বলো! ইচ্ছে করে আইসক্রিমের মতো গলে যাই। ইট ওয়াজ সো কিউট। আবার বলো না প্লিজ!' 

অদিতি অধৈর্য হয়ে আয়ানের বাহুতে আঘাত করল। আয়ান কিছুটা সরে গিয়ে হাসি হাসি মুখে তাকাল। অদিতিকে আরও একটু রাগিয়ে দিতে সুর করে গাইল,

'Touch me like you do 
Ta ta touch me like you do. 
তুমি যেভাবেই টাচ করো, সুইটহার্ট। রেগে অথবা ভালোবেসে। আমার কাছে সবই টু মাচ রোমান্টিক মনে হয়। বিলিভ মি, ইট ওয়াজ জাস্ট অসাম।' 

কথাটা বলে চোখ টিপল আয়ান। ঠোঁট টিপে হেসে আবারও ফিচেল গলায় গাইল, 

' বল কবে হবে মিলন, দিন কাটে দিন গুণে 
ভাবছি চাঁদে যাব তোকে নিয়ে হানিমুনে।
এখন এই রাতের রুটিন, লিখছি ছড়া আবারও 
হিজিবিজি কাটিকুটি হারিয়েছি রাবারও.... 
এই সুইটহার্ট? যাবে নাকি আবারও?'

আয়ানের এই লাপাত্তা ধরনের ব্যবহারে রাগে অদিতির কান্না পাওয়ার জোগার। এই লোকটা এমন কেন? নিজের ফিলিংসের প্রতি বিন্দুমাত্র সিরিয়াসনেস কেন থাকবে না তার? অদিতি ধৈর্যহারা হয়ে চোখ বন্ধ করল। হাতের পার্সটা আয়ানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল,

' পাগলের ডাক্তার! গো টু হেল। তুমি যদি আর দুটো মিনিট আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি শিওর, আমি তোমাকে খুন করে ফেলব। ওই নার্সের সাথে গিয়ে হারানো রাবার খুঁজো। চাঁদ, মঙ্গল, বুধে হানিমুন করে বেড়াও, এখানে কী?'

শুভ্র-সাহেল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আয়ান - অদিতির পুরো ড্রামাটা দেখল। কী আশ্চর্য! পাব্লিক প্লেসে দাঁড়িয়ে এডাল্ট দুজন মানুষ টিনেজারদের মতো ঝগড়া জুড়ে দিয়েছে! রোদ শুভ্রর হাতে হালকা চাপড় দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে অনেকটা ফিসফিসিয়ে বলল,

' দেখেছেন! দিস ইজ কল্ড লাভ। বউয়ের জন্য পার্কিং-এ দাঁড়িয়ে গান গাইছে। আর আপনি? জীবনে কখনো রাগ ভাঙিয়েছেন আমার? রাগ ভাঙানোর বদলে উল্টো নিজেই রাগ করে বসে থাকেন। তিল পরিমাণ দয়া আছে আপনার? ভালো টালো তো বাসেনই না। হে খোদা, বাবা এ কেমন ছেলে দেখে বিয়ে দিয়েছে আমায়!' 

কথাগুলো বলেই মুখটা দুঃখী দুঃখী করে ফেলল রোদ। সাহেল শব্দ করে হেসে উঠল। শুভ্র অবাক হয়ে বলল, 

' কী আশ্চর্য! এদের দেখে তোমার মনে পড়ল, আমি তোমায় ভালোবাসি না? ভার্সিটিতে প্রেম করার সময় এসব মনে হয়নি?' 

' প্রেম! প্রেম করলাম কখন? ঠিকঠাকভাবে প্রেমে পড়ার আগেই তো বিয়ে করে ফেললেন। আকস্মিক বিয়ে।' 

' ওহ হ্যালো! বিয়েটা আমার জন্য হয়নি। তোমার জন্য হয়েছে। মনে করে দেখো! মেইন কালপ্রিট কিন্তু তুমি ছিলে!' 

রোদ আর্তনাদ করে বলল,

' কালপ্রিট মানে! মেইন কালপ্রিট আমি? তারমানে আপনি আমায় বিয়ে করতে চাননি? আমি জোর করে বিয়ে করেছি? আমাকে বিয়ে করে এখন আপসোস হচ্ছে? আপসোস তো হবেই। ভার্সিটিতে অল্প বয়স্কা মেয়ে দেখে মন পাল্টে গিয়েছে। এখন আমাকে পছন্দ হবে কেন? অসভ্য পুরুষ মানুষ। খবরদার আমার আশেপাশে আসবেন না।'

রোদের চোখ মুহূর্তেই টলমল করে উঠল। শুভ্র ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে। রোদের চোখ থেকে জল গড়ানোর আগেই আচমকা রোদকে হুইলচেয়ার থেকে কোলে তুলে নিল সে। সাহেলকে গাড়ির দরজাটা খুলতে ইশারা করে বলল,

' গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে আমার সংসারটা বাঁচা দোস্ত। এখানে আর দুই মিনিট থাকলেই আমার সংসার ভেসে যাবে। আমার সহজ সরল বউটা এদের থেকে ঝগড়াঝাটি শিখে যাচ্ছে।' 

সাহেল থেকে চোখ সরিয়ে রোদের দিকে তাকাল শুভ্র। রোদ অগ্নিমাখা চোখে চেয়ে আছে। যার অর্থ, নিচে নামান নয়তো খবর আছে। শুভ্র মৃদু হাসল। রোদের অভিমানী মুখটির দিকে চেয়ে টুপ করে চুমু এঁকে দিল তার কপালে। কপালের সাথে কপাল লাগিয়ে মৃদু কন্ঠে বলল,

' তোমাকে বিয়ে করতে চাইনি মানে? বিশ্বাস করো বউ, তুমি আমাকে বিয়ে করতে না চাইলে আমি তোমাকে তুলে এনে বিয়ে করে ফেলতাম। প্রয়োজনে ধ্বংস করে ফেলতাম এই পৃথিবী। পৃথিবী? এটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? পৃথিবী নয়, ধ্বংস করে ফেলতাম যে তোমাকে বিয়ে করতে আসত তার বাড়ি, গাড়ি এবং জীবন নামক রেলগাড়ী। এটা আমার পক্ষে সম্ভব। আই ক্যান ডু ইট। এবার ঠিক আছে না?' 

শুভ্র ভীষণ স্বস্তি নিয়ে রোদের দিকে তাকাল। শুভ্রর কথা বলার ভঙ্গিতে রাগ ভুলে খিলখিল করে হেসে উঠল রোদ। সাহেল অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে মৃদু হাসল। শুভ্র এবার খুব সিরিয়াস হয়ে বলল,

' আমি ভাগ্যবান যে, জীবনসঙ্গী হিসেবে তুমি আমাকেই বেছে নিয়েছ। আমাকে যদি আবারও নতুন করে প্রেমে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বিশ্বাস করো, আমি আবারও তোমার প্রেমেই পড়তে চাইব। তোমাকেই বিয়ে করতে চাইব। আমাদের প্রেন্সিসের মতো আরেকটা প্রেন্সিসের বাবা হতে চাইব। ' তুমি শুধু আমার' --- এই ভাবনাটাই কত প্রশান্তির! তোমাকে ছাড়া যে আমি আমাকেই ভাবতে পারি না, তা কী তুমি জানো না? অযথা আমায় দোষারূপ করছ রোদপাখি।'

রোদ উত্তর দিল না। ততক্ষণে গাড়ির দরজা খোলা হয়ে গিয়েছে। শুভ্র রোদকে সীটে বসিয়ে দিয়ে সীট বেল্ট লাগাল। নিজে বসতে যাবে ঠিক তখনই নতুন এক জুড়ির আগমন ঘটল। ছোটখাটো একদম অল্প বয়স্কা একটি মেয়ে। ঢোলাঢালা জামায় ভারিক্কি ধরনের পেট দেখে বুঝা যাচ্ছে, মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা। একহাত নিজের কোমরে রেখে অন্যহাতটা পাশে হাঁটতে থাকা লোকটির হাতে। শুভ্রর হঠাৎ মনে পড়ল, রোদের প্রেগ্ন্যাসির সময় তার বয়সও অনেকটা এমনই ছিল। কেমন মিষ্টি লাগত তখন দেখতে। কথাটা ভেবেই মৃদু হাসল শুভ্র। পাশে থাকা লোকটি অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটির অভিমানে ভরা মুখটির দিকে চেয়ে বলল,

' কী আশ্চর্য! আমি তোমাকে মানা করিনি? এই অবস্থায় এতো জার্নি ঠিক নয় বলার পরও কেন শুনলে না? তোমার জেদেই তো আসতে হলো।' 

মেয়েটি জ্বলন্ত চোখে চেয়ে বলল,

' আপনি আমায় বকছেন? শুরু থেকে শেষ সব দোষই আপনার। তবুও আমায় বকছেন?' 

' আমার দোষ? আমি কী করলাম? তোমার পেট ব্যথা হলে আমি কী করতে পারি রিয়া? ডাক্তার তো দেখালাম। এভ্রিথিং ইজ ফাইন।' 

রিয়া নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,

' ফাইন! কীসের ফাইন! আমার পেটে এখনও কেমন ব্যথা করছে জানেন? আপনার ওয়াইফ কত সাফার করছে অথচ আপনার চোখে কোনো দুঃখ নেই। 'ইট'স নরমাল' টাইপ বিহেভিয়ার। আসল কথা আপনি আমায় ভালোই বাসেন না। ভালোবাসলে টেনশন থাকতো। ভালোবাসা নেই বলে টেনশনও নেই। ছাড়ুন।' 

সাহেল শুভ্রর দিকে একটু চেপে এসে চাপা কন্ঠে বলল,

' এটা বোধহয় বউদের ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ তাই না? নাকি কোনো পুরুষই তাদের বউকে ভালোবাসে না?' 

শুভ্র গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল। সাহেলের কথাটা কানে যেতেই মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিরক্ত কন্ঠে বলল,

' কী হচ্ছে এসব সাহেল! টোটাল সার্কাস। এদের সরতে বলে গাড়িটা বের কর তো। বিরক্ত লাগছে।' 

রোদ চোখ বোজে সিটে গা এলিয়ে আছে। শুভ্র ভেতরে উঁকি দিয়েই অস্থির হয়ে উঠল। রোদের এখন বিশ্রাম প্রয়োজন। শরীরটা খারাপ লাগছে নিশ্চয়? শুভ্র গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইল। দৃষ্টি ছটফটে। সাহেল দু'পা এগিয়ে গিয়ে বলল,

' এক্সকিউজ মি? ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আপনারা কী একটু সরে দাঁড়াবেন? আমাদের গাড়িটা বেরুতে পারছে না।' 

সাহেলের কথায় দু'পক্ষই শান্ত চোখে তাকাল। ঝগড়া কিছুটা থেমেছে। শুভ্র অধৈর্য কন্ঠে ডাকল,

' তাড়াতাড়ি সাহেল।' 

' ওহ। সরি, সরি। উই ডিডেন্ট নোটিশ। বাই দ্য ওয়ে, ইউ লুক সো ফ্যামিলার টু মি। কোথায় দেখেছি বলুন তো?' 

পাশে সরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে কথাগুলো বলল আয়ান। সাহেল আয়ানকে খেয়াল করে দেখল। মনে করার চেষ্টা করে বলল,

' আপনি?' 

আয়ান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

' আয়ান চৌধুরী। সাইকিয়াট্রিস্ট অব ক্যালিফোর্নিয়া হসপিটাল। আপনি কী ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিলেন কখনও?'

সাহেল কয়েক সেকেন্ড ভেবে হঠাৎ হেসে ফেলে বলল,

' ডক্টর চৌধুরী! আপনার সাথে বোধহয় চেরি ব্লসম ফেস্টিভ্যালে দেখা হয়েছিল। আমি পিটারের সাথে ছিলাম। লুইস হেনরী পিটার? এন্ড ইউ অয়ার দ্য ডক্টর অব হিজ গ্রেন্ডমাদার? রাইট?'

আয়ান হাসল। তাদের পরিচয় পর্বের মাঝেই শুভ্রদের গাড়ি এসে দাঁড়াল পাশে। সাহেল কটেজের নাম বলে জিজ্ঞেস করল,

' আপনারা কোন কটেজে উঠেছেন?' 

আয়ান উত্তেজিত হয়ে বলল,

' হোয়াট আ কো-ইন্সিডেন্ট! আমরাও সেই কটেজেই উঠেছি। কাল দেখা হলো না কী করে বলুন তো?' 

শুভ্র জানালার কাঁচ নামিয়ে হেসে বলল,

' কারণ আমরা কাল থেকে হসপিটালের করিডোরে বসে আছি। আর আপনারা কটেজের বারান্দায়।' 

আয়ানও হেসে ফেলল। সাহেল শুভ্রর সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর আয়ান ফাহিমদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। রোদ শুভ্রর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে। তার ঘুমিয়ে পড়ার দ্রুততা অনেকটা অবিশ্বাস্য। যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ার ক্ষমতা নিয়ে জন্মানো এক অদ্ভুত মেয়ে। তারওপর ঘুমের ঔষধের প্রভাব! শুভ্র এক হাতে খুব সাবধানে জড়িয়ে আছে তার শরীর। ফাহিম সেদিকে খেয়াল করে বলল,

' ফার্স্ট হানিমুনে এসেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন নাকি ভাবী? অসুস্থ হওয়ারই কথা। ঢাকা থেকে সিলেট কম দূর তো নয়। অনেক ধকল। মেয়েরা ধকল সহ্য করতে পারে কম।' 

ফাহিমের ফোঁড়ন বুঝতে পেরে হাসল শুভ্র, 

' ফার্স্ট হানিমুন? বলতে পারেন। তবে ফ্যামিলি হানিমুন বললে বোধহয় বেশি মানায়। প্রায় পুরো পরিবার চলে এসেছি হানিমুনে। হানিমুন আর হানিমুন নেই ফ্যামিলি গেট টুগেদার হয়ে গিয়েছে।' 

শুভ্র এক নজর ঘড়ির দিকে চেয়ে বলল,

' একই কটেজে যেহেতু উঠেছি চলুন ফেরা যাক। কটেজে ফিরে আড্ডা দেওয়া যাবে। বাচ্চাকে ফেলে এসেছি তো তাই আপাতত ফেরার তাড়া।' 

অদিতি অবাক হয়ে বলল,

' বাচ্চা!' 

' কেন থাকতে পারে না?' 

শুভ্র হাসল। অদিতি থতমত খেয়ে বলল,

' না। তা নয়। তা নয় আসলে....' 

অদিতির কথা কেটে আয়ান বলল,

' তবে আপনারা এগুন। আমাদের গাড়ি পেছনেই আছে। আমরা বরং আপনাদের ফলো করছি।' 

সাহেল গাড়িতে উঠে যেতেই শুভ্র বলল, 

' বেশ! তাহলে কটেজে দেখা হচ্ছে। আজকের ডিনারটা কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে।' 

আয়ান হেসে মাথা নাড়ল। ফাহিম বলল,

' লাঞ্চের দায়িত্বটা তাহলে আমাদের।' 

গোধূলি বিকেল। কটেজের বাইরে, ফাঁকা জায়গায় মাদুর পেতে বসেছে সবাই। সন্ধ্যায় বার্বিকিউ আর গানের আসর বসবে তার প্রস্তুতি চলছে জোরেসোরে। আদ্র-রোদ্র একের পর এক চূড়ান্ত দুষ্টুমি করে চলেছে। শুকনো কাঠের পাশে থাকা কেরোসিনের বোতলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, জাস্ট সেইক অব এক্সপেরিমেন্ট। এক্সপেরিমেন্ট সফল হয়েছে, বেশ ভালোভাবে বিস্ফোরিত হয়েছে কেরোসিনের বোতল। সেই সাথে অগণিত মার পড়েছে পিঠে। মার খেয়ে পাঁচ-ছয় মিনিট যে নীরবতা পালন করেনি তা কিন্তু নয়। ভদ্র ছেলের মতো মিনিট দশেক শান্ত হয়ে বসে থেকেছে তারপর আবারও হৈ-হুল্লোড় করে নতুন কোনো আবিষ্কারে মনোনিবেশ করেছে। নিজের ছেলেদের এমন সব ইউনিক চিন্তা-ভাবনায় হতভম্ব হয়ে বসে আছে অভ্র। এই দুটোকে সামলাতে গিয়ে তার পুরো পৃথিবী ঘুরছে। এতো দুষ্ট! এতোটা দুষ্ট এরা হলো কী করে? শুভ্র হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলল,

' এতো চিন্তা করে লাভ নেই বড় মিয়া। ছোটবেলা যত পাপ করেছিলে সেগুলোই রিপিট হিস্ট্রির মতো প্রকাশ পাচ্ছে। আচ্ছা? তোমাদের রোমাঞ্চের ব্যাপারটা কীভাবে চলে?সেখানে হিস্ট্রি রিপিট হয় না?'

অভ্র দুঃখী দুঃখী চোখে চাইল। শুভ্র দাঁত বের করে হাসল,

' দিজ ইজ কল্ড রিভেঞ্জ অব নেচার। আমার রোমাঞ্চে কম বাগড়া তো দাওনি। হে বিধাতা! সঠিক বিচার। থেংকিউ।' 

' তোর মতো পাপী ছোটবেলায় কেউ ছিল বলে তো মনে হয় না। ঘুমের মাঝে মাথার চুল কামিয়ে দিয়েছিলি আমার, ফাজিল! তোর হিস্ট্রি রিপিট কবে হবে? জাতি দেখুক তোর পাপ সমূহ।'  

সাহেল হেসে বলল,

' ওর হিস্ট্রিও তো তোমার ছেলেদের মাঝেই রিপিট হচ্ছে অভ্র ভাই। রোদ্রর টেম্পার একদম শুভ্রর মতো। সাবধান থাকো! কবে না হিস্ট্রি রিপিট হয়ে টাক্কু হয়ে যাও।' 

সাহেলের কথায় হেসে উঠল সবাই। অভ্র গম্ভীর কন্ঠে বলল,

' শালিকা! এই অভদ্র পুরুষ থেকে সরে বসো। আমাকে এভাবে অপমান করার পরও আমার একমাত্র শালিকা হয়ে তার পাশ ঘেঁষে বসে থাকবে তা তো হয় না। বয়কট অভদ্র পুরুষ। সরে আসো!'

রোদ শুভ্রর পাশে বসেছিল। তার কোলে আত্মমগ্ন হয়ে বসে আছে শুভ্রতা। চকোলেটের প্যাকেটে ছোট্ট ছোট্ট হাতদুটো ভর্তি। শুভ্রতা নিজের মতো খেলছে, মাঝে মাঝে বড়দের মুখের দিকে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকাচ্ছে। অভ্রর কথায় উচ্ছল হাসল রোদ। কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে শুভ্রর দিকে চেয়ে ডান ভ্রু উঁচু করল,

' এই অভদ্র পুরুষ? সরে যান।' 

শুভ্র এবার আরও কাছে ঘেঁষে বসল। ডানহাতে রোদের কোমরের উপর রেখে বলল,

' কীসের শালিকা? শালিকা টালিকা ভুলে যাও। সে এখন আমার রাজ্যে। আমার রাজত্ব। এদিকে তাকাবে না। আমার রাজ্য মানেই মৃত্যু মহাশয়।' 

শুভ্রর বাক ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলল সবাই। শুভ্রতা সবাইকে হাসতে দেখে অবাক চোখে চাইল৷ পরমুহূর্তে, কিছু না বুঝেই খিলখিল করে হেসে উঠল। সাদাফ সাহেলের পাশে বসে ছিল। মোবাইল গেইম থেকে চোখ সরিয়ে সবার দিকে এক নজর চেয়ে নিয়ে আবারও গম্ভীর মুখে মোবাইলের দিকে তাকাল। অদিতি হাস্যোজ্জল কন্ঠে বলল, 

' আপনারা তো খুব মজার মানুষ।' 

আয়ান ফোঁড়ন কেটে বলল,

' সবাই তো তোমার মতো ঝগড়ুটে নয়, মিস ঝগড়ুটে। এই পৃথিবীতে ভদ্র, নম্র, মিষ্টি মেয়েও আছে। এজ লাইক আমাদের রোদ ভাবী। নাবিলা ভাবী এজ ওয়েল।' 

অদিতি রাগী চোখে চাইল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

' সেইম হেয়ার, মিষ্টার পাগলের ডাক্তার। সবাই আপনার মতো পাগল আর ফ্লার্টিং মাস্টার নয়। এই পৃথিবীতে ভদ্র, নম্র, ওয়েল বিহেভড ছেলেও আছে। এজ লাইক আমাদের অভ্র ভাইয়া।' 

অভ্র আপ্লুত হয়ে বলল,

' ওহ থেংকিউ থেংকিউ। থেংক্স ফর কমপ্লিমেন্ট ইয়ং লেডি।' 

অভ্রর কথার ভঙ্গিতে আবারও হাসির হুল্লোড় পড়ল। রিয়া সাদাফকে বেশ খেয়াল করে বলল,

' আপনার ছেলেটা খুব শান্ত সাহেল সাহেব। দেখে মনে হয় বয়সের তুলনায় ম্যাচিউরড। আমার মেয়ে হলে আপনার ছেলেকে পাত্র হিসেবে মনোনয়ন করব।' 

সাহেল মাথা নেড়ে বলল,

' তা তো হচ্ছে না ছোট আপু। ছেলের পাত্রী ঠিক করে ফেলেছি। এতো সহজে বন্ধুর পেছন ছাড়ছি না। মেয়ে তাকে দিতেই হবে। সাদাফ? বড় হয়ে শুভ্রতাকে বিয়ে করবি বুঝেছিস? বাপে না মানলে নিয়ে পালিয়ে যাবি।' 

আবারও হেসে উঠল সবাই৷ সাদাফ এবার মুখ তুলে চাইল। মায়ের দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,

' বিয়ে কী?' 

নাবিলা কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল,

' বিয়ে মানে ফ্রেন্ডশিপ। বিয়ে করলে সবচেয়ে ভালো ফ্রেন্ড হওয়া যায়। তোমার বাবা যেমন আমার পাশে থাকে। আমাকে হ্যাপি রাখে। আমিও চেষ্টা করি। ঠিক তেমন। একসাথে থেকে একসাথে হ্যাপি থাকাই হলো বিয়ে।' 

সাদাফ মনোযোগ দিয়ে শুনল। তারপর শুভ্রতার দিকে এক নজর তাকিয়ে বলল,

' আমি বিয়ে করব না।' 

সাহেল অবাক হয়ে বলল,

' কেন? বিয়ে করতে কী সমস্যা?'

' মেয়েটা এতো কাঁদে কেন? কাঁদলে হ্যাপি থাকবে কীভাবে?' 

সাদাফের উত্তর কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে হাসল সবাই। নাবিলা ছেলেকে কাছে টেনে বলল,

' এভাবে বলছ কেন? সে যদি কাঁদে, তুমি অবশ্যই এমন কিছু করবে যেন সে আর না কাঁদে৷' 

সাদাফ গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল। অর্থাৎ, বিয়ে সে করবে না। এমন সময় শিশিরের সাথে চিত্রা এসে পৌঁছাল। শিশিরের সাথে একরকম যুদ্ধ করে কালকের গাড়িতে এখানে এসে পৌঁছেছে সে। সবাই মজা করবে, পিকনিক করবে আর সে থাকবে না?অসম্ভব। রোদের পাশে নির্দিষ্ট জায়গায় বসতেই সাহেল কথা ছুঁড়ল,

' আরে সুন্দরী! তুমি তো দেখি পিছুই ছাড়ছ না? খাবারের কথা শুনেই ছুটে চলে এসেছ। আহা, বেচারা শিশির ভাই! পেটুক স্ত্রীর যন্ত্রণায় কাহিল!' 

চিত্রা অগ্নিমূর্তি নিয়ে বলল,

' আপনি সবসময় আমার পেছনে কেন লাগেন সাহেল ভাই? আপনার ভাগের খাবার তো খেয়ে নিচ্ছি না।' 

' যদি নাও তখন?' 

চিত্রা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

' শুভ্র ভাইয়ার উচিত ছিল হাড়ের ডাক্তারকে না মেরে আপনাকে দোলায় দেওয়া। আমি উনাকে বলেছিলামও। কিন্তু উনি আমার কথা শুনলেন না। শুনলেন ভুট্টো সাহেবের কথা।' 

' শিশির ভাইয়েরও উচিত ছিল তোমাকে বিয়ে না করে মানসিকভাবে সুস্থ, খাই খাই না করা টাইপ মেয়ে বিয়ে করে সংসার করা। ঠকে গিয়েছে বেচারা! আমিও উনাকে সাবধান করেছিলাম। কিন্তু উনি আমার কথা শুনলেন না। শুনলেন চিত্রা জননীর কথা।'

চিত্রা মুখ ফুলিয়ে বলল,

' মানসিকভাবে সুস্থ মানে কী? আমি মানসিকভাবে সুস্থ নই? আপনি আমায় পাগল বললেন?' 

সাহেল আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বলল,

' আমি! কখন? তুমি নিজেই না বললে? আচ্ছা যাও, আমরা মেনে নিলাম তুমি পাগল।' 

এবারে সবাই হেসে ফেলল। চিত্রা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে চেঁচাল,

' নাবিলা আপু!' 

ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশের কপাল অলংকৃত করেছে বিশাল এক রূপালী চাঁদ। কী মায়াময় তার আলো! জমিয়ে রাখা শুকনো কাঠে আগুন ধরানো হলো। আগুনের রক্তিম আলো আর জ্যোৎস্না মিলেমিশে মোহময় হয়ে উঠল চারপাশ। হঠাৎ থেমে গেল সকল কোলাহল। নিশ্চুপ কল্পনার মতোই স্নিগ্ধ হয়ে গেল সকলের মুখ। ভালোবাসার মানুষগুলোর হাতে হাত পড়ল। লাজুক চাঁদটা এক টুকরো মেঘে মুখ ঢাকতেই কপালে গাঢ় এক স্পর্শ অনুভব করল রোদ। ফিসফিস কন্ঠে বসে এলো একটিই শব্দ, 'ভালোবাসি।' ঠিক একই শব্দ উচ্চারিত হলো আরও কিছু প্রেমীযুগলের ঠোঁটে। খুব গোপনে তারা অনুভব করল হৃদয় ভেজানো কোমল স্পর্শ। লাজুক চাঁদ ঘোমটা তুলল। মোহময় লঘ্নে সম্পন্ন হলো, প্রিয়দের কাল্পনিক সাক্ষাৎ!
.
.
.
সমাপ্ত......................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp