মাঘ মাস শেষের পথে। ঋতুর শরীরে ইতোমধ্যেই ফাগুনের নরম ছোঁয়া লেগেছে। বাতাসে শীতের শেষ নিঃশ্বাস, তার সঙ্গে মিশে আছে আগত গরমের অদৃশ্য পূর্বাভাস। সকালের কুয়াশা এখন আর ঘন হয় না, রোদেও আর সেই কাঁপুনি ধরানো শীত নেই। মনে হয় প্রকৃতি নিজেই ধীরে ধীরে পুরোনো চাদর গুটিয়ে নতুন ঋতুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
সেদিন গাড়ি চালিয়ে কোথাও যাচ্ছিল ইরফান। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ, মাঝেমধ্যে শুকনো পাতার ঝরে পড়া, আর মৃদু বাতাসে উড়ে যাওয়া ধুলোর রেখা সবকিছুই যেন নির্বিকার।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল রাস্তার ধারে হাঁটতে থাকা এক নারীর দিকে। মুহূর্তেই ব্রেক কষল ও। সিনথিয়া। অনেকদিন পর। গাড়ির কাঁচ নামিয়ে ধীর গলায় ডাকল,
'সিনথিয়া।'
পরিচিত কণ্ঠ শুনে থমকে দাঁড়াল সিনথিয়া। ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল। ইরফানকে দেখে তার চোখে প্রথমে বিস্ময়, তারপর এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা খেলে গেল। ইরফানও তাকিয়ে রইল।
সময় দুজনকেই বদলে দিয়েছে। একসময় নিজের সৌন্দর্য নিয়ে অহংকার করা মেয়েটির মুখে এখন আর সেই তীব্র মোহ নেই। তবু আশ্চর্যের বিষয়, তাকে আগের চেয়েও শান্ত আর সুন্দর লাগছে। মুখে এক ধরনের প্রশান্ত আলো, যেন অনেক কান্না পেরিয়ে মানুষ একসময় আর কান্না করতে জানে না, শুধু নীরবে বাঁচতে শেখে।
অন্যদিকে ইরফানের চোখের নিচে কালি, মুখে ক্লান্তির রেখা, চেহারার সেই পুরোনো দীপ্তি অনেকটাই নিভে গেছে। সে এগিয়ে এসে মৃদু স্বরে বলল,
'কেমন আছো?'
সিনথিয়া এক মুহূর্ত ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
'আলহামদুলিল্লাহ। খুব ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?'
ইরফানও হালকা হাসল।
'আল্লাহ ভালো রেখেছেন।'
কয়েক মুহূর্ত নীরবতায় কাটিয়ে সিনথিয়া বলল,
'আজকাল কী করছো?'
'একা মানুষ। যখন যা মন চায় করি। সুযোগ পেলেই ঘুরতে বের হয়ে যাই।'
'ভালো।'
'আর তুমি?'
সিনথিয়ার চোখে এবার যেন অন্যরকম একটা আলো জ্বলে উঠল।
'আমি একটা অনাথ আশ্রমে চাকরি করছি।'
ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
'আমার জানামতে জবা তোমাকে অনেক বড় অঙ্কের টাকা দিয়েছিল। তাহলে চাকরি করার প্রয়োজন কী?'
সিনথিয়া শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
'টাকার জন্য না। নিজের জন্য। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে আর হয়তো নিজের ভেতরের মানুষটাকে একটু বাঁচিয়ে রাখতে।'
ইরফান চুপ। সিনথিয়া ধীরে ধীরে বলল,
'জানো, সারা জীবন আমি টাকার পেছনে ছুটেছি। মনে করতাম অর্থ থাকলেই সুখ পাওয়া যায়। অথচ সবচেয়ে বেশি অর্থ হাতে আসার পর বুঝেছি, টাকা বিছানা কিনে দিতে পারে ঘুম নয়। ওষুধ কিনে দিতে পারে শান্তি নয়।'
হালকা হেসে সিনথিয়া আবার বলল,
'এখন এতিম বাচ্চাগুলোর সঙ্গে সময় কাটাই। ওরা যখন ছোট্ট হাতে জড়িয়ে ধরে বলে, আপু কিংবা খালামনি, অনেকে মামনি ডাকে, তখন যে শান্তিটা পাই সেটা কোটি টাকাও কোনোদিন আমাকে দেয়নি।'
কথাগুলো শুনে ইরফান যেন কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে গেল। এই কি সেই সিনথিয়া? লোভ, বিলাসিতা আর অর্থের মোহে ডুবে থাকা মেয়েটি? এত আমূল পরিবর্তন তার! নাকি জীবনের নিষ্ঠুর শাস্তি তাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে?
সিনথিয়া ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
'আচ্ছা, যাই। আমার একটু জরুরি কাজ আছে।'
ইরফান শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
সিনথিয়া ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু ইরফানের চোখ তার পিছু ছাড়ল না।
তার ভেতরে অদ্ভুত এক সন্দেহ জন্ম নিল।
এত বড় পরিবর্তন কি সত্যিই সম্ভব?
নাকি এই শান্ত মুখের আড়ালেও লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গল্প?
গাড়িতে উঠে বসেই সে নিজের ফোন বের করল। সংক্ষিপ্ত গলায় শুধু বলল,
'লোক লাগাও। সিনথিয়ার সব খোঁজ চাই। কোথায় যায়, কার সঙ্গে দেখা করে, কী করে একটাও তথ্য যেন বাদ না পড়ে।'
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
'জি স্যার।'
কল কেটে গেল। রাস্তার ওপারে তখন সিনথিয়ার ছোট্ট অবয়বটা ধীরে ধীরে মানুষের ভিড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। আর ইরফান জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল সন্দেহ, কৌতূহল আর অজানা এক অস্বস্তি নিয়ে।
—————
মৌন বিকেল। বৈশাখের দাবদাহে সারাদিন যেন শহরটা আগুনে পুড়েছে। সূর্য পশ্চিম আকাশে একটু ঢলে পড়তেই উত্তপ্ত বাতাসে সামান্য কোমলতা নেমে এসেছে। সেই মৃদু হাওয়াতেই ছাদের কর্ণারে রাখা কাঠের ডিভানে আধশোয়া হয়ে আছে জবা।
হাতে বরফকুচি দেওয়া ফলের রসের গ্লাস। কিন্তু বরফ অনেক আগেই গলে গেছে। যে শীতলতা নিয়ে জুসটা এসেছিল, তা অনেকক্ষণ আগেই হারিয়ে ফেলেছে নিজের অস্তিত্ব।
ঠিক যেন মানুষের জীবনও এমনই। একসময় শীতল, স্বচ্ছ, প্রশান্ত। তারপর সময়ের তাপে ধীরে ধীরে বদলে যায় সবকিছু।
গভীর চিন্তায় ডুবে আনমনে এক চুমুক দিতেই মুখটা বিকৃত হয়ে গেল জবার। বিরক্ত হয়ে গ্লাসটা পাশে রেখে আকাশের দিকে তাকাল।
দূরে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা নীড়ে ফিরছে। দিনের সমস্ত ক্লান্তি শেষে তাদের গন্তব্য একটাই, নিজের মানুষ, নিজের ঠিকানা।
হঠাৎই দলছুট হয়ে একজোড়া ঘুঘু এসে বসল ছাদের কার্নিশে। দুজন পাশাপাশি। মাঝে মাঝে ঘু-ঘু শব্দ করছে। একটা পাখি ধীরে ধীরে অন্যটির কাছে এগিয়ে যাচ্ছে, আর অন্যটি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অভিমানী ভঙ্গিতে। আবার প্রথমটি একটু একটু করে কাছে আসছে।
জবা অপলক তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য একটুকরো হাসি ফুটে উঠল। জবার মনে হলো এদের মান অভিমানের খেলা চলছে। ভালোবাসারও নিজস্ব নীরব শব্দ আছে, যা মানুষ বোঝে না, অথচ পাখিরা ঠিকই বোঝে।
দৃশ্যটা জবার এত ভালো লাগল যে ফোন খুঁজতে লাগল। এমন মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করতে পারলে বেশ হবে। কিন্তু ফোন নেই।
মনে পড়ল, নিচেই ফেলে এসেছে।
ঠিক তখনই পাখি দুটো যেন অন্য কারও উপস্থিতি টের পেয়ে ডানা মেলে উড়ে গেল।
জবা পেছনে ফিরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
'দিলে তো পাখি দুটোকে উড়িয়ে। ওরা জোড়া ছিল। কেমন মান অভিমানের পালা চলছিল ওদের মাঝে। দেখতে বেশ লাগছিল।'
পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন জুঁই সুলতানা। তিনি ধীরে ধীরে এসে মেয়ের পাশে বসলেন। খুব আদর করে জবার মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বললেন,
'পাখিদেরও জোড়া আছে রে মা। তবে তুই কেন নিজের জোড়া নিজেই হারিয়ে বসে আছিস?'
জবা হাসল। শান্ত, নিঃশব্দ, বিষণ্ন এক হাসি। বলল,
'ভয় করে মা৷ আর একবার ঠকে যাওয়ার সাহস নেই। আয়না প্রয়োজনের বেশি ভাঙলে সে আর আলো দেয় না। শুধু ধারালো টুকরো হয়ে মানুষকে রক্তাক্ত করে।'
জুঁই সুলতানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
'ফারিস আর কতকাল অপেক্ষা করবে? একটা ছেলে সারাজীবন ধরে শুধু তোকে ভালোবেসেই গেল। তুই কি কোনোদিন তার ভালোবাসার মূল্য দিবি না?'
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিল না জবা।
বাতাসে শুধু দুজনের চুল উড়ছে।
সূর্যের শেষ আলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে।
অবশেষে নিচু গলায় বলল,
'মা, এখন আমি আমার জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত জারার অনুমতি ছাড়া নিতে পারি না।'
জুঁই সুলতানা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললেন,
'কেন ও কি তোর জীবনের মালিক? তোর মুখে এমন কথা মানায় না জবা। তুই-ই তো সবসময় বলিস মানুষ যার যার জীবনের মালিক সে। তাহলে তোর জীবনের সিদ্ধান্ত জারা কেন নিবে? তুই কেন নিজের জীবন অন্য কারও হাতে তুলে দিচ্ছিস?'
জবা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
'মা আমি সেটা বলিনি। আমি বোঝাতে চেয়েছি আমি এখন যে সিদ্ধান্ত নিব তার সরাসরি প্রভাব জারার মনের উপর, ওর ভবিষ্যতের উপর পড়বে। আমি চাই না ওর মনে আমাকে নিয়ে খারাপ বাজে কোনো ধারণা তৈরি হোক। কিংবা ওর ভবিষ্যতে কোনো প্রভাব পড়ুক।'
জুঁই সুলতানা স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
'সে কারণেই বুঝি তুই তোর মনকে এমন শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিস?'
জবা এবার মাথা নিচু করে ফেলল। চুপ হয়ে গেল। একদম চুপ। কিছু নীরবতা ভাষার চেয়েও বেশি কথা বলে। জুঁই সুলতানা ধীরে ধীরে বললেন,
'তোর কাছে তোর মেয়ের খুশি যেমন জরুরি, আমার কাছে তেমন তোর খুশি জরুরি। তুই জারার সাথে কথা বলতে না পারলে, আমাকে কথা বলতে দে।'
জবা প্রায় অনুনয়ের সুরে বলে উঠল,
'না মা প্লিজ।'
'তোর কথা শুনতাম, যদি কাল রাতে তোকে ফোনে ফারিস আর তোর কিশোর বেলার ছবি দেখে মুচকি হাসতে না দেখতাম।'
জবা চমকে তাকাল যেন ওর চুরি ধরা পড়ে গেছে। জুঁই সুলতানা মৃদু হেসে বললেন,
'যে ছেলের একটা পুরোনো ছবি আজও তোর মুখে হাসি এনে দেয়, সে তোকে কতটা ভালো রাখতে পারবে, সেটা বুঝতে আমার ভুল হয় না।'
একটু থেকে তিনি বললেন,
'তাছাড়া ফারিস ঘরের ছেলে। ছোটোবেলা থেকে চোখের সামনে বড়ো হয়েছে। ওর চেয়ে ভালো তোকে কেউ বাসতে পারবে না।'
তারপর ভারী আর সিক্ত কণ্ঠে বলল
'তোর ফুপুকে আমি অনেক ভালোবাসতাম। কিন্তু তোর সাথে যা হয়েছে, তার জন্য সেও অনেকটা দায়ী। না সে ফারিসের বিষয়ে তোর কাছে মিথ্যা বলতো আর বা তোর জীবনে ইরফান আসত। আজ এত কষ্টও তোকে পেতে হতো না। এই কারণে তার প্রতি আমি নারাজ। যদি পরপারে তার সাথে দেখা হওয়ার সুযোগ হয়, আমি তাকে জিজ্ঞেস করব সে কেন তোর আর ফারিসের এত কষ্টের কারণ হলো?'
জবা ম্লান হেসে বলল,
'এখন এসব বলে লাভ নেই মা।'
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
'লাভ লস আমি দেখব। আমি নিজেই জারার সঙ্গে কথা বলব।'
জবা আবারও মিনতির সুরে ডাকল,
'মা... প্লিজ।'
জুঁই সুলতানা এবার ধমক দিয়ে বললেন,
'চুপপ। একদম চুপ। হতে পারিস তুই জবা চৌধুরী। সবাই তোকে ভয় পেতে পারে, কিন্তু আমি পাই না। এবার তুই সেটাই করবি যা আমি বলবো। অনেক শুনেছি তোর কথা।
কথা শেষ করে তিনি ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে নেমে গেলেন। জবা একা বসে রইল।
ততক্ষণে প্রকৃতির বুক জুড়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশের শেষ আলোর রেখাটুকুও মিলিয়ে গেছে। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে এলো মাগরিবের আজান।
শীতল বাতাসে ওড়নার আঁচল উড়ল।
আর জবা অনুভব করল মানুষের জীবনে সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটা বাইরের কারও সঙ্গে নয়, নিজের হৃদয়ের সঙ্গেই।
—————
লোক লাগিয়ে সিনথিয়ার সম্পর্কে খোঁজ নিতে বেশি সময় লাগল না ইরফানের। কিন্তু রিপোর্ট শুনে ইরফান যেন কিছুক্ষণের জন্য ভাষা হারিয়ে ফেলল। লোকটা শান্ত গলায় বলছিল,
'স্যার, মেয়েটা সত্যিই বদলে গেছে। ও এখন একটা অনাথ আশ্রমে চাকরি করে। ওর পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। একাই থাকে। জবা চৌধুরী যে টাকা দিয়েছিলেন, তার প্রায় অর্ধেকই অনাথ আশ্রমে দান করে দিয়েছে।'
ইরফান কিছু বলল না। লোকটা আবার বলল,
'বেশির ভাগ সময় বাচ্চাদের সঙ্গেই কাটায়। অফিস শেষে নিয়ম করে এক মহিলা শিক্ষকের কাছে কোরআন শেখে। ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করে। আশ্রমের সবাই বলে, নিজের প্রয়োজনের বাইরে একটা টাকাও খরচ করে না।'
রিপোর্ট শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ইরফানের ভেতরে যেন এক নতুন প্রশ্নের শুরু হলো। ও ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়ল। মনে পড়ল সেই পুরোনো সিনথিয়ার কথা।
যে মেয়েটা দামি পারফিউম ছাড়া বাইরে বের হতো না। যে এক পোশাক দ্বিতীয়বার পরতে চাইত না। যে মানুষের চরিত্রের আগে ব্যাংক ব্যালেন্স দেখত। যে অর্থের জন্য সম্পর্ক বদলাতে, মিথ্যা বলতে, এমনকি অন্যের সংসার ভাঙতেও পিছপা হয়নি।
সেই মানুষটাই আজ নিজের কোটি টাকার অর্ধেক অনাথ শিশুদের দিয়ে দিয়েছে? নিজে সাধারণ জীবন কাটাচ্ছে? ইরফান ফিসফিস করে নিজেকেই প্রশ্ন করল,
'মানুষ কি সত্যিই এতটা বদলে যেতে পারে?'
কেউ উত্তর দিল না। নিস্তব্ধ ঘরে নিজের শ্বাসের শব্দই কেবল ফিরে এলো। হঠাৎ তার নিজের কথাও মনে পড়ল। একসময় সেও টাকার পেছনে ছুটেছে। লোভের কাছে হার মেনেছে। বিশ্বাস ভেঙেছে। সংসার ভেঙেছে। আজ সেই মানুষই দিনের পর দিন জবা আর জারার একটা হাসির জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিতে প্রস্তুত।
তাহলে কি সত্যিই মানুষ বদলায়? নাকি জীবন এমনভাবে আঘাত করে যে পুরোনো মানুষটা মরে যায়, আর তার জায়গায় জন্ম নেয় সম্পূর্ণ নতুন একজন?
জানালার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইরফান। অদ্ভুত এক উপলব্ধি তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে জমাট বাঁধতে লাগল।পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আদালত হয়তো মানুষের আদালত নয়। সবচেয়ে বড় আদালত মানুষের নিজের বিবেক।
সেখানে একবার সাজা শুরু হলে কোনো কারাগার লাগে না, কোনো শিকল লাগে না।
মানুষ নিজেই নিজের শাস্তি হয়ে বেঁচে থাকে।
আর হয়তো...! হয়তো সিনথিয়া সেই শাস্তি পেরিয়ে প্রায়শ্চিত্তের পথে হাঁটতে শিখেছে।
—————
পারিবারিক অনুষ্ঠানের বিশাল হলঘর আলো, ফুল আর মানুষের কোলাহলে মুখর। কোথাও হাসির ঝর্ণা, কোথাও গল্পের আসর, কোথাও আবার ক্যামেরার ফ্ল্যাশে মুহূর্তগুলো বন্দী হচ্ছে।
কিন্তু এত শব্দের মাঝেও কিছু মানুষের চারপাশে এক ধরনের নিঃশব্দ বৃত্ত তৈরি হয় যেখানে কোলাহল ঢুকতে পারে না। আজ বহু বছর পর সেই নীরব বৃত্তের মধ্যে মুখোমুখি হলো জবা আর কথা।
প্রথম দেখাতেই দুজন দুজনকে চিনে ফেলল। অথচ দুজনের কেউই এগিয়ে এল না। যেন দুজনেই সমান বুদ্ধিমান, সমান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। আর তাই পরস্পরকে এড়িয়ে যাওয়ার সূক্ষ্ম শিল্পটাও সমান দক্ষতায় জানে।
একবার চোখাচোখি হলো।
দুজনের ঠোঁটেই ভদ্র, মাপা, কৃত্রিম একটুকরো হাসি ফুটল। তারপর আবার অন্যদিকে তাকিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত নিজের কৌতূহল আর সংযমের লড়াইয়ে হার মানল জবা।
ধীর পায়ে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল।
'হ্যালো মিসেস নিহাদ।'
কথাও মৃদু হেসে হাত মিলিয়ে বলল,
'হ্যালো।'
'অনেক বছর পর আমাদের আবার দেখা হলো।'
'হ্যাঁ। কেমন আছেন?'
'আলহামদুলিল্লাহ। আপনি?'
কথা হেসে বলল,
'আলহামদুলিল্লাহ।'
কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর জবার ঠোঁটে হালকা রহস্যময় হাসি ফুটল। বলল,
'আপনার হ্যাজবেন্ড কোথায়?'
কথার চোখ অনেক কথা বললেও, মুখে স্বাভাবিক হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল,
'ছেলেকে নিয়ে বাইরে ঘুরছে। এত লোকের ভীরে ছেলেটা বিরক্ত হচ্ছে খুব।'
জবা মুচকি হেসে বলল,
'ও। তা ছেলে কি মায়ের বুদ্ধি পেয়েছে নাকি বাবার?'
প্রশ্নটা শুনে কথা খানিকটা অবাক হলো। বুঝতে পারল না প্রশ্নের আড়ালে কী লুকিয়ে আছে। জবা একটু ঝুঁকে এসে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
'ভালোই খেল দেখিয়েছিলেন। তবে আপনার স্বামীকে ক্ষমা করে আপনি ভালো করেছেন। কিছু মানুষ দ্বিতীয় সুযোগ ডিজার্ভ করে। আর নিহাদ সাহেব তাদের মধ্যে একজন। চমৎকার মানুষ। শুধু ফাঁদে পড়ে ভুলটা করেছিলেন।'
কথা স্তম্ভিত হয়ে জবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এসব কথা তো জবার জানার কথা নয়। পরোক্ষণে কী ভেবে হেসে বলল,
'আপনাকে যতটা ভেবেছিলাম আপনি তার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমতী। আই অ্যাম ইমপ্রেসড।'
জবাও হেসে উত্তর দিল,
'আপনিও তুখোর বুদ্ধির অধিকারিনী। খেলার পুরো মোড় ঘুরিয়ে, যে খেলা আপনার খেলার কথা ছিল সে খেলা আমাকে দিয়ে খেলালেন।'
'কিঞ্চিৎ ভুল বললেন। আপনাকেও খেলাটা খেলতে হতো। আমি শুধু সময়টা কিনে দিয়েছিলাম। আমি না বললে আপনি তাড়াহুড়োয় খেলতেন, আর খেলার সৌন্দর্য নষ্ট হতো। আমি বলায় সময় নিয়ে গুছিয়ে যেমন খেলতে পেরেছেন। কিন্তু আপনি আমার বলা কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে নিজেই ইনভেস্টিগেশনের মাধ্যমে সব জেনেছে। সো যার যার স্থান থেকে খেলা আমরা নিজেরাই খেলেছি এবং জিতেছি।'
জবার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মলিন হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস বুক ভেঙে বেরিয়ে এলো। বলল,
'জিতেছি এবং সেই বিজয়ের মূল্য প্রদান করতে গিয়ে হারিয়েছি অনেক কিছু।'
এবার কথা কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কিছু বিজয় থাকে, যার ট্রফি হাতে নিয়েও মানুষ নিজেকে বিজয়ী মনে করতে পারে না। পরিবেশের ভারী নীরবতা কাটাতে কথা প্রসঙ্গ বদলে বলল,
'আপনাকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আর ছোটো ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দি। ওরাও আজ এখানে আছে।'
কথা দূরে তাকিয়ে হাত নাড়তেই গোলাপি রঙের শাড়ি পরা এক তরুণী এগিয়ে এল। তাকে দেখে জবা অনিচ্ছাসত্ত্বেও কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। এত সৌন্দর্য সত্যিই বাস্তবে সম্ভব! যেন চোখে আটকে স্থায়ী হয়ে যায় এমন সৌন্দর্য।
মনে হচ্ছিল যেন যত্ন করে কাচের আলমারিতে সাজিয়ে রাখা কোনো গোলাপি ভেলভেটের পুতুল হেঁটে চলে এসেছে। যেন এক বাটি দুধের শুভ্রতার মধ্যে শিল্পীর হাতে মিশে গেছে কয়েক ফোঁটা কোমল গোলাপি আভা। মেয়েটি এসে হেসে বলল,
'বল কথা।'
'পরিচয় করিয়ে দি। ওনি জবা চৌধুরী।'
তূবা হাত মিলিয়ে বেশ অবাক হয়ে বলল,
'দ্যা গ্রেট বিজনেস ওমেন জবা চৌধুরী?'
জবা হেসে বলল,
'শুধু জবা চৌধুরী। ডোন্ট মাইন্ড একটা কথা জিজ্ঞেস করি?'
'শিওর।'
'আপনি ন্যাচারাললী এত সুন্দর না কি নিখুঁত মেকাপের ফল।'
কথা বলল,
'ও ন্যাচারাললী এত সুন্দর।'
জবা মুগ্ধ হয়ে বলল,
'সুবহানাল্লাহ মহান রবের সৃষ্টি কত নিখুঁত।'
তূবা লজ্জা পেলো।'
ঠিক তখনই এক তরুণ এগিয়ে এসে বলল,
'আপু ভাইয়া জিজ্ঞেস করল খাবি কখন?'
'কিছুক্ষণ পর।'
শ্রাবণ বলল,
'তূবা তুমি কখন খাবে? আমাদের তো জলদি যেতেও হবে।'
তূবা হেসে বলল,
'কথার সাথেই খাবো। তুমি এখানে তুষার কোথায়?'
'তুষার মায়ের সাথে।'
কথা জবার দিকে তাকিয়ে পরিচয় করিয়ে দিল,
'আমার ছোটো।'
শ্রাবণ ভদ্রভাবে সালাম করল। জবা সালামের উত্তর দিয়ে তাকিয়ে রইল। এরপর একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শ্রাবণ তূবার হাত ধরে বলল,
'ঐ দিকে চলো কথা আছে।'
প্রায় টেনেই নিয়ে যেতে লাগল। যাওয়ার সময় দুষ্টুমিভরা হাসিতে আলতো করে তূবার কোমরে চিমটি কাটতেই তূবা লজ্জা মিশ্রিত বিরক্তিতে ওর দিকে তাকাল। দৃশ্যটা জবার চোখ এড়াল না। কৌতূহলী গলায় সে কথার দিকে তাকিয়ে বলল,
'আপনার বান্ধবী আর ছোটো ভাইয়ের মধ্যে কোনো কিছু চলছে নাকি?'
কথা এবার হেসে উঠল। সেই হাসিতে ছিল আপনজনের উষ্ণতা। বলল,
'চলছে না। চলে গেছে। ওরা স্বামী স্ত্রী।'
জবার ভ্রু বিস্ময়ে উঁচু হয়ে গেল।
'সিনিয়র জুনিয়র লাভ স্টোরি?'
'হ্যাঁ। ওদের একটা ছেলেও আছে।'
জবার চোখে শিশুসুলভ কৌতূহল ফুটে উঠল। বলল,
'ওয়াও। সময় থাকলে ওনাদের লাভ স্টোরি শুনতাম।'
'একদিন অবসর করে বসব আমরা। তখন শুধু গল্পই না, পুরো ইতিহাস শুনাব। বিশ্বাস করুন, শুনে আপনারও মনে হবে, ভালোবাসা মাঝে মাঝে সব হিসাব-নিকাশকে হার মানিয়ে দেয়। বেহিসেবী ভালোবাসার কাছে সকলে হার মানে।'
জবা বলল,
'হ্যাঁ জানি।'
হলঘরের আলো তখনও ঝলমল করছিল।
মানুষের ভিড়ও কমেনি। তবু সেই মুহূর্তে দুই প্রখর বুদ্ধিমতী নারীর চোখে যেন একই সত্যের প্রতিফলন ছিল। জীবনে সবচেয়ে কঠিন খেলাগুলো জেতা যায়, কিন্তু তার মূল্য কখনো কখনো এতটাই বড় হয় যে, বিজয়ের আনন্দটুকুও নীরবে কোথাও হারিয়ে যায়।
—————
রাত অনেক আগেই গভীর হয়েছে।
বাড়ি ফিরে তূবা শাড়িটা পর্যন্ত না পাল্টেই নিঃশব্দে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। সারাদিনের ক্লান্তি যেন চোখের পাতায় জমে ছিল বহুদিনের ঋণের মতো। গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়া ছোট্ট তুষারকে শ্রাবণ খুব যত্ন করে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর তূবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
'শাড়িটা পাল্টে শোও।'
তূবা আধো ঘুমে চোখ না খুলেই বিড়বিড় করে বলল,
'একটু পর।'
শ্রাবণ আর কিছু বলল না। নিজে কাপড় পাল্টে ফিরে এসে দেখল, তূবা ইতোমধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। মুখে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল ওর। ফিসফিস করে বলল,
'বাবু হওয়ার পর মেয়েটা এত ঘুম কাতুরে হয়েছে।'
আস্তে করে ডাকল,
'তূবা...! শোনো কাপড়টা বদলে নাও। এত ভারী শাড়ি পরে ঘুমালে গায়ে দাগ বসে যাবে।'
তূবা ঘুমঘুম কণ্ঠে অস্পষ্ট কিছু একটা বলল। কথাগুলো বোঝা গেল না। শ্রাবণ ধীরে ধীরে ওকে তুলে নিজের বুকের সঙ্গে ঠেকিয়ে বসাল। এমন সাবধানে, যেন কাঁচের কোনো পুতুল হাতে তুলে নিয়েছে। তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক যত্নে ওর শাড়ি আর ব্লাউজ বদলে আরামদায়ক নাইট ড্রেস পরিয়ে দিল। আবার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আলতো করে কপালে হাত বুলিয়ে হেসে বলল,
'কে বলবে এ মেয়ে আমার চেয়ে বড়ো! কান্ড কারখানা তো ছোটো বাচ্চাদের মতো।'
তূবার শাড়িটা সুন্দর করে ভাঁজ করে রেখে এবার শ্রাবণ তুষারের দিকে মন দিল। ছোট্ট ছেলেটার হিসুতে ভেজা ন্যাপি বদলে নতুন ন্যাপি পরিয়ে দিল। আধো ঘুমের মধ্যেই তাকে দুধ খাইয়ে আবার নিজের ছোট্ট জগতে ফিরিয়ে দিল।
সব কাজ শেষ করে তূবার পাশে শোয়া মাত্রই ঘুমের মধ্যেও তূবা অবচেতন অভ্যাসে সরে এসে শ্রাবণের বুকের মধ্যে আশ্রয় নিল। চোখ না খুলেই আলতো করে ওর বুকে একটা চুমু এঁকে দিল। শ্রাবণ মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
'বেশি ক্লান্ত লাগছে?'
তূবা আবারও অস্পষ্ট কিছু একটা বলল। কথাগুলো বোঝা গেল না, কিন্তু তার প্রয়োজনও ছিল না। শব্দের চেয়ে অনুভূতি অনেক সময় অনেক বেশি স্পষ্ট হয়।
শ্রাবণ নিঃশব্দে ওকে আরও গভীরভাবে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছরের পুরোনো দিনগুলো।
একটা সময় ছিল, যখন তূবাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতেও ভয় পেত ও। মনে হতো, এত সুন্দর স্বপ্ন মানুষের জীবনে সত্যি হয় না। কত বাধা, কত ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে একদিন সেই অসম্ভব স্বপ্নই বাস্তব হয়ে এসেছে।
যে মেয়েটাকে একদিন দূর থেকে দেখেই বুকের ভেতর অকারণ ঝড় উঠত, আজ সেই মেয়েটাই নিশ্চিন্তে ওর বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে।
আর ওদের ভালোবাসা? সে তো এখন আর শুধু দুজন মানুষের গল্প নয়। সে ভালোবাসা ছোট্ট দুটি হাত, নিষ্পাপ দুটি চোখ আর শান্ত ঘুমে ডুবে থাকা তুষারের রূপ নিয়ে তাদের মাঝখানে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
বাইরে রাত আরও গভীর হচ্ছিল। আর ঘরের ভেতর, পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে দূরে, একটি ছোট্ট পরিবার নিশ্চিন্ত ঘুমে জড়িয়ে ছিল। ভালোবাসার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে।
—————
বাড়ি ফেরার পথটা সেই রাতে খুব অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল। শহরের আলো ঝলমল করছিল, কিন্তু গাড়ির ভেতর যেন এক আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছে৷ নীরব, ব্যক্তিগত, আর খুব গভীর এক ঘনিষ্ঠতার জগৎ।
নিহাদ স্টিয়ারিংয়ে চোখ রাখলেও বারবার পাশের সিটের দিকে তাকাচ্ছিল। কথার মুখে তখনো অনুষ্ঠানের হাসির হালকা ছাপ রয়ে গেছে, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে কোথাও যেন এক ধরনের চাপা অতীত লুকিয়ে ছিল। যেটা নিহাদ সহজে ধরতে পারছিল না।
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর নিহাদ ধীরে বলল,
'অনুষ্ঠানে দেখলাম জবা চৌধুরীর সাথে তুমি অনেক কথা বললে। তোমরা তো একে অপরকে ঠিকভাবে চেনোও না, তাই না?'
কথা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। শহরের আলো তার চোখে ভেঙে পড়ছিল। তারপর ধীরে মাথা ঘুরিয়ে মৃদু হাসল।
'বেশ ভালো করেই চিনি আমরা।'
নিহাদ একটু ভ্রু কুঁচকাল।
'কীভাবে?'
কথা এবার তার দিকে তাকাল। চোখে হালকা দুষ্টুমি, হালকা গাম্ভীর্য।
'তাকে চেনার কারণটা তুমি।'
গাড়ির ভেতরে এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো। নিহাদ গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
'আজও তুমি আমাকে সেই কারণটা বলোনি।'
কথা এবার হাসল। এমন হাসি, যেটা খুব বেশি কথা না বলেও অনেক কিছু বলে দেয়। বলল,
'শুনতে চাও?'
'অবশ্যই।'
'বাড়ি গিয়ে বলবো।'
নিহাদ হালকা মাথা নাড়ল।
'ওকে।'
কিন্তু পরক্ষণেই সে একটু এগিয়ে এসে মৃদু গলায় বলল,
'এখন একটু কাছে আগাও তো। তোমার গালে কিছু লেগে আছে।'
কথা স্বাভাবিকভাবেই মুখ একটু এগিয়ে দিল।
এই ছোট্ট মুহূর্তটার ভেতরেই নিহাদ যেন পৃথিবীর সব যুক্তি ভুলে গিয়ে টুপ করে একটা চুমু খেল। একেবারে হালকা, কিন্তু গভীরভাবে অনুভব করা।
কথা এক ঝটকায় পিছিয়ে গেল কথা। চোখে বিস্ময় আর লজ্জা একসাথে ভেসে উঠল।
'কন্ট্রোল স্যার।'
নিহাদ হেসে ফেলল। সেই হাসিতে ক্লান্তি নেই, দায়িত্ব নেই। শুধু ভালোবাসার সরলতা।
'আমি এখন আর তোমার স্যার নই। হ্যাজবেন্ড।'
কথা এবার সত্যি হেসে ফেলল। লজ্জা মিশ্রিত সেই হাসিতে চোখ একটু নিচু হয়ে গেল, কিন্তু মুখে আনন্দ স্পষ্ট।
কথার কোলে ওদের ছেলে নীর গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। ছোট্ট বুক ওঠানামা করছে শান্ত নিঃশ্বাসে। যেন তার চারপাশের পৃথিবী কতটা বদলে গেছে, সে টেরও পাচ্ছে না।
গাড়ি চলতে থাকল আপন গতিতে। বাইরের শহর পেরিয়ে ভেতরে ভেতরে যেন আরও এক শহর তৈরি হচ্ছিল। যেখানে অতীতের ভুল কম, ভবিষ্যতের ভয় কম, আর ভালোবাসার উপস্থিতি বেশি।
নিহাদ একবার কথার দিকে তাকাল। এবার আর তাড়াহুড়া নয়, শুধু স্থির এক অনুভব।
কথাও তাকাল। দুই চোখের মাঝখানে কোনো শব্দ ছিল না। শুধু এক ধরনের নিশ্চয়তা।
এই যাত্রার গন্তব্য আর রাস্তা নয়; গন্তব্য এখন একসাথে থাকা। একে অপরকে খুব ভালোবাসা।
তূবা-শ্রাবণ, নিহাদ-কথার কাহিনি পড়তে অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে অমানিশায় আলো বইটি।
—————
জুঁই সুলতানা ধীর পায়ে জারার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ছোট্ট টেবিলটায় মাথা নিচু করে মন দিয়ে হোমওয়ার্ক করছে মেয়েটা। ছোট্ট কপালে ভাঁজ ফেলে তার কী মনোযোগ!
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত শুধু তাকিয়েই রইলেন তিনি।
কী অদ্ভুত! এই ছোট্ট মানুষটার কাঁধেও যেন সময় বয়সের চেয়ে একটু বেশিই দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। মৃদু হেসে এগিয়ে এসে মাথায় আলতো করে হাত রেখে বললেন,
'কী করছো নানুমনি?'
জারা মুখ তুলে মিষ্টি করে হাসল।
'এই তো, হোমওয়ার্ক শেষ করলাম কেবল।'
'গুড গার্ল।'
জুঁই সুলতানা পাশে বসে ওর গালটা আলতো চেপে ধরে আদুরে ভঙ্গিতে বললেন,
'তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?'
জারা চোখ বড় বড় করে বলল,
'হ্যাঁ, করো না।'
'তোমার যদি কোনো বন্ধু না থাকত, তাহলে তোমার কেমন লাগত?'
এক মুহূর্তও না ভেবে জারা মুখ ছোট করে বলল,
'খুব বোরিং লাগত। একদমই ভালো লাগত না।'
'কেন?'
'কারণ বন্ধুদের সঙ্গে খেলি, গল্প করি, হাসি। স্কুলে যেতে আমার এত ভালো লাগে শুধু ওদের জন্য। বাসায় যখন থাকি, অনেক সময় একা একা খুব বিরক্ত লাগে।'
জুঁই সুলতানা গভীরভাবে মেয়েটার দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
'তাহলে ভাবো তো তোমার মায়ের তো কোনো বন্ধু নেই।'
জারার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। ও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,
'সত্যিই তো...।'
কিছু একটা যেন ওর ছোট্ট মনকে নরম করে দিল। মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
'মা সারাদিন কাজ করে। রাতে কখনো কখনো আমি দেখি, চুপচাপ জানালার পাশে বসে থাকে। মাঝে মাঝে কাঁদেও।'
একটু থেমে আবার বলল,
'আমি দেখেও না দেখার ভান করি। কারণ মা চায় না আমি বুঝি।'
জুঁই সুলতানার বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি আস্তে করে জারাকে নিজের বুকে টেনে নিলেন। জারা বলল,
'আমার খুব খারাপ লাগে নানু। কিন্তু আমি তো ছোট। আমি বুঝতে পারি না মাকে কীভাবে খুশি করব?'
জুঁই সুলতানা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
'হয়তো তোমার মা একা বলেই এমন কষ্ট পায়। মানুষের জীবনে একজন ভালো বন্ধু থাকলে অনেক কষ্টই হালকা হয়ে যায়।'
জারা হঠাৎ মুখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো কৌতূহলে চকচক করছে।
'তাহলে আমরা মায়ের জন্য একটা বন্ধু এনে দিই না?'
জুঁই সুলতানার ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য হাসি ফুটে উঠল। তিনি স্বাভাবিক গলায় বললেন,
'সেটা তো খুবই ভালো হয়।'
জারা এবার সত্যিই ভাবনায় পড়ে গেল। ছোট্ট আঙুল ঠোঁটে ছুঁইয়ে বলল,
'কিন্তু কোথায় পাব?'
আরও একটু ভেবে বলল,
'আগে তো বাবা ছিল মায়ের বন্ধু। এখন তো তারা কাট্টি করে নিয়েছে। আর ভাবও করবে না।'
ওর নিষ্পাপ কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু শিশুসুলভ সত্য। বলল,
'এখন নতুন বন্ধু কোথা থেকে আনব?'
জুঁই সুলতানা মৃদু হেসে বললেন,
'আমার কাছে একজন আছে।'
জারার চোখ গোল হয়ে গেল।
'কে?'
'ফারিস আঙ্কেলকে তোমার কেমন লাগে?'
জারার মুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
'ওই হ্যান্ডসাম আঙ্কেল?'
'হুম।'
'উনি তো খুব কুল! আমাকে অনেক ভালোবাসেন। আমার সব কথা শোনেন।'
জুঁই সুলতানা একটু ঝুঁকে এসে বললেন,
'তাহলে যদি উনার সঙ্গে তোমার মায়ের বন্ধুত্ব করিয়ে দেওয়া যায়?'
জারা দুহাত তালি দিয়ে প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল,
'দারুণ হবে!'
তারপর আবার গম্ভীর হয়ে বলল,
'কিন্তু মা রাজি হবে?'
'তুমি যদি বলো?'
জারা আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাথা নাড়ল।
'আমি বলব। মা আমার কথা শুনবে। আমি বলব, মা তুমি আর একা থেকো না। তোমারও একটা ভালো বন্ধু দরকার।'
কথাগুলো শুনে জুঁই সুলতানার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। তিনি শক্ত করে নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মুখে হাসি থাকলেও চোখের কোণে অদৃশ্য জল চিকচিক করছিল।
মনে মনে শুধু একটাই প্রার্থনা করলেন,
'হে আল্লাহ, এই নিষ্পাপ মেয়েটার ছোট্ট ইচ্ছেটুকু যেন একদিন সত্যি হয়। অনেক কষ্ট তো দেখল ওরা। এবার একটু সুখ তাদের দুয়ারেও আসুক।'
—————
অনেকদিন যাবত জবার সাথে কোনো কথা হয় না ফারিসের। কোনো ঝগড়া হয়নি, কোনো অভিযোগও নয়। তবু দুজন মানুষের মাঝখানে কখনো কখনো এমন এক নীরবতা জন্ম নেয়, যার শব্দ সবচেয়ে বেশি কানে বাজে।
বাংলাদেশ থেকে আসার পর একটা সূক্ষ্ম অভিমান ফারিসের ভেতরে বাসা বেঁধেছে। সে নিজেও আর ফোন করে না। আর জবা তো সেই আগের মতোই। চাপা স্বভাবের মহারানী।
নিজের অনুভূতিগুলো বুকের সবচেয়ে অন্ধকার ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা মানুষ। যে কাঁদলেও নীরবে কাঁদে, ভালোবাসলেও মুখ ফুটে বলে না।
লন্ডনে ফারিসের দিনগুলো অবশ্য খারাপ যাচ্ছে না। বরং ব্যবসা আগের চেয়ে আরও বড় হয়েছে। সম্প্রতি বিশাল এক আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট সফল হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের লাভও হয়েছে অভাবনীয়। সবাই উদযাপনের কথা বলছে, পার্টির কথা বলছে, নতুন বিনিয়োগের কথা বলছে।
কিন্তু সাফল্যের মাঝেও মাঝেমধ্যে ফারিসের মনে হয়, মানুষের জীবনে কিছু শূন্যতা থাকে, যেগুলো কোটি কোটি টাকা দিয়েও পূরণ করা যায় না।
সেই শূন্যতার নাম জবা। হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিল, এবার আবার সুইজারল্যান্ড যাবে। ইতিপূর্বে আরও একবার সুইজারল্যান্ড গেলেও সে সময় কিছু দূর্গম স্থানে যাওয়া বাকি ছিল।
এবার ভেবেছে Aletsch Glacier এ যাবে। এটি আল্পস পর্বতমালার সবচেয়ে বড় হিমবাহ। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ কিলোমিটার। কোথাও কোথাও বরফের পুরুত্ব ৮০০ মিটারেরও বেশি।
এমন একটি জায়গা, যেখানে দাঁড়ালে মনে হতে পারে যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। বরফ, আকাশ আর পাহাড় তিনটিই এখানে এমনভাবে মিশে গেছে যে বাস্তবের চেয়ে স্বপ্ন বলেই বেশি মনে হয়। শুধু বরফ, আকাশ আর পাহাড় মিলে নিঃশব্দে আল্লাহর সৃষ্টি-সৌন্দর্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
ফারিস লাস্ট টাইম সেখানে যেতে পারেনি। এবার মন স্থির করেছে সেখানে যাবে। এবার আর সেই অপূর্ণতা রাখতে চায় না ফারিস।
আগস্ট মাস। আকাশ পরিষ্কার। হাইকিংয়ের জন্য বছরের অন্যতম সেরা সময়।
এয়ারপোর্টে হ্যারি নিজে এসে পৌঁছে দিল ওকে। ফিরনাসকে বলেছিল আসতে, কিন্তু সে জানিয়েছে জরুরি কাজ আছে। ফারিস আর জোর করেনি। সন্তানদের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার মানুষ সে কখনোই ছিল না।
এয়ারপোর্টে নেমে হ্যারি ইংরেজিতে বলল,
'ফারিস এবারের ভ্রমণ তোমার জীবন পাল্টে দিবে আশা করি।'
ফারিস হেসে বলল,
'কেন?'
হ্যারি কথাটা খানিক ঘুরিয়ে বলল,
'বেশিরভাগ ভ্রমণই মানুষের জীবন পাল্টে দেয়।'
ফারিস হেসে বলল,
'হ্যাঁ তা ঠিক। ওকে বাই। ইমিগ্রেশনের সময় হয়ে গেছে।'
'টেইক কেয়ার।'
'ইউ টু।'
তারপর স্যুটকেস টেনে ইমিগ্রেশনের দিকে হাঁটতে লাগল।
—————
বিমান নির্ধারিত সময়েই উড়ল।
নিজের সিটে এসে দেখল, পাশের সিটে একজন ভদ্রমহিলা পুরো শরীর কম্বলে মুড়িয়ে নিশ্চুপ বসে আছেন।
ফারিস সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ভদ্রভাবে নিজের জায়গায় বসে পড়ল।
টেকঅফের কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুমে গেল।
ফিরে এসে থমকে দাঁড়াল। মহিলাটি এবার তার সিটে বসে আছেন। ফারিস ভ্রু কুঁচকে নরম গলায় বলল,
'এক্সকিউজ মি। দ্যাটস মাই সিট।'
কম্বলের আড়াল থেকেই উত্তর এল,
'নো এটা আমার উড বি হ্যাজবেন্ড এর সিট।'
কণ্ঠ শুনে ফারিস চমকাল। বুকের ভিতর কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে কম্বলটা নামিয়ে দিল মেয়েটি। ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা মৃদু হাসি। জবা। ফারিস শুধু তাকিয়ে রইল। যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
ওর ঠোঁট কাঁপল। বিস্ময়ে তাকিয়ে বলল,
'তুই....!'
জবা দুষ্টু মেয়েদের মতো হেসে বলল,
'আমাদের দুজনার পরিবার, কাজী আর মিষ্টি নিয়েই প্লেনে উঠেছি। এমনকি ফিরনাসও এই প্লেনে।'
ফারিস সামনে পিছনের সিটগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখল পরিবারের সবাই আছে। এমনকি হ্যারি আর ফিরনাসও। ওর বুঝতে বাকি রইল না ব্যাপারটা।
জবা একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
'বিয়ে প্লেনে করবেন না কি সুইজারল্যান্ড গিয়ে?'
ফারিসের মুখে কোনো শব্দ এল না। শুধু দুটো চোখ ধীরে ধীরে জলে ভরে উঠল। হয়তো মানুষ সব কান্না দুঃখে কাঁদে না। কিছু কান্না আসে এমন আনন্দে, যার জন্য সে বহু বছর ধরে নিঃশব্দে অপেক্ষা করে।
জবা তাকিয়ে রইল। আলতো করে ফারিসের হাত ধরল। আজ তার চোখেও সেই পুরোনো দীপ্তি।
অনেক বছরের ক্লান্তি, কষ্ট, বিশ্বাসঘাতকতা আর অভিমানের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া আলোটা যেন আবার ফিরে এসেছে। মনে হচ্ছিল, কেউ খুব যত্ন করে একটা ভাঙা আয়না কুড়িয়ে নিয়েছে। প্রতিটি ভাঙা টুকরো ধৈর্য ধরে আবার জুড়ে দিয়েছে।
ফাটলের দাগগুলো মুছে যায়নি। কিন্তু সেই দাগের ওপর এমন নিপুণ ভালোবাসার সাজসজ্জা বসিয়েছে, যে এখন আর সেখানে ভাঙনের চিহ্ন দেখা যায় না।
বরং প্রতিটি ভাঙা অংশ থেকেই আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। আর সেই আলোয় ফারিস প্রথমবারের মতো স্পষ্ট করে দেখল, তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষাটা বৃথা যায়নি।
এবার জবা ফারিসের বুকে মাথা রাখল।
·
·
·
সমাপ্ত……………………………………………………