নিশুতি অন্ধকারেও যেই মশালের ফুলকি জ্বলছে তাতে রানির দুর্বল হওয়া মুখাবয়ব স্পষ্ট ও সবচেয়ে অসাধারণ। এমন যত্ন করে কারো রূপ স্রষ্টা তৈরি করেছেন কি-না তা ভেবে ভেবেও হয়তো মানুষ ভাবুক হয়।
রানি আবার বললেন,
“আমাকে অস্ত্র ধরতে দাও। আমি অস্ত্র ধরতে না পারলে আমার মৃত্যু তোমাদের জন্য চির জীবন লজ্জার হয়ে থাকে।”
মানুষটার কণ্ঠে মোটেও আকুতি নেই। বরং বেশ স্পষ্ট সাহস তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন ছুটে বেড়াচ্ছে।
মুখ ঢাকা লোকগুলো একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। তার ভেতর একজন বোধহয় রানি সম্পর্কে সামান্যই জ্ঞান রেখেছে। সে-ই আগ বাড়িয়ে বলল,
“দেন দেখি রানিকে অস্ত্র ধরার সময়। দেখি সে কী করতে পারে।”
রানি মুচকি হাসলেন। গা তার ঘেমে-নেয়ে একাকার। ডান হাতটা ব্যথায় কিছুটা অবশ লাগছে। তবুও তিনি বা'হাতে চেষ্টা করলেন অস্ত্র নেওয়ার। তার আগেই আরও একটি হৃদয় বিদারক আঘাত পড়ল তার হাতে।
রানি ব্যথায় কাহিল হয়ে গেলেন তবুও একটা চিৎকারও দিলেন না। শত্রুকে বুঝতে দেওয়া যাবে না নিজের যন্ত্রণা। চিৎকার করলেই তার বুঝে যাবে তারা আঘাত করতে কতটুকু সক্ষম।
আঘাত করেই লোকটা বলল, “তুই বেশি কিছু জানিস না তাই চুপ থাক। নির্বোধের মতন কথা বলিস না।”
রানি যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকলেন ভেতরে। তবুও বাহিরে তার মুখের হাসিটি রইল অমলিন। বললেন,
“তোমরা তো আমাকে ভালো করেই জানো। তার মানে এই আঘাত ইচ্ছেকৃত তাই না? কে করতে বলেছে এই আঘাত গুলো?”
লোক গুলো এবার দমে এলো। একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে বলল,
“এত প্রহারের পরেও উনি বেঁচে থাকছেন কীভাবে?”
আরেকজন ঢোক গিলে বলল,
“তলোয়ারটা ঢুকিয়ে দাও বুকের এফোঁড়ওফোঁড়। উনি বেঁচে ফিরতে পারলে আমাদের মৃত্যু হবে ভয়ঙ্কর।”
লোকটির কথাটা রানির কানে গিয়ে পৌঁছালো ঠিক। রানি দুর্বল শরীর নিয়ে হা হা করে উচ্চশব্দে হেসে উঠলেন। চোখ গুলো নিভু নিভু করছে মানুষটার। মাথার এক দিক থেকে গলগল করে পড়ছে র ক্ত। হাতগুলোতে সামান্য পরিমাণ জোর নেই। শরীরটাও ঢুলছে। তবুও সেই হাসির কী শক্তি! কাঁপন ধরিয়ে ফেলেছে সামনের ছয়জন পুরুষের বুকেও।
একজন তো অপলক তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“এত সুন্দর কেন উনি? কী দিয়ে গড়েছেন তাকে!”
বাকিরা চোখের ইশারায় থামিয়ে দিল।
রানি হাসতে হাসতে বললেন, “হে দস্যুবাহিনী, তোমরা আমাকে মৃত্যু দিতে এসেও নিজেরা মৃত্যু ভয়ে তটস্থ? তাহলে ভাবতে পারছো কত বড়ো দুঃসাহসিকতার কাজ করেছো? আজ যদি আমার মৃত্যু হয় সেটা অবশ্যই আমার জন্য দুর্ভাগ্যের এবং তোমাদের জন্য সৌভাগ্যের। আর যদি আমি বেঁচে যাই তাহলে সেটা হবে তোমাদের কেবল একটি জনম না, বরং সাত সাতটি জনমের দুর্ভাগ্য। এমন যন্ত্রণা পাবে যে নিজেদের মৃত্যু কামনা করবে নিজেরা। কিন্তু মৃত্যু তোমাদের কাছ অব্দি আসবে না। মৃত্যুর জন্য এই পৃথিবীতে কেউ হাহাকার করেছি কি-না জানা নেই। তবে এই গোটা রাজ্য দেখবে মৃত্যুর জন্য তোমাদের তড়পাতে। আমি, রানি কামিনীকাঞ্চন, আজ, এই নিশিতে কথা দিলাম- যদি আমি বেঁচে থাকি এই পৃথিবীর কোনো কোণাতেও, তাহলে তোমরা নিজেদের মৃত্যু দেখবে জীবিত অবস্থায়। এটি আমার প্রতিজ্ঞা। এই রাজ্যের মহারানি, কামিনীকাঞ্চনের প্রতিজ্ঞা।”
রানির এই হুংকারে সবাই কেঁপে উঠল। একজন তো শেষমেশ সহ্য করতে না পেরে অস্ত্র তুলে নিলো। তার পা কাঁপছে। তবুও আঘাত করতে এগিয়ে এলো। এই ভয়ঙ্কর কাজ যেহেতু করবে বলে ঠিক করেই নিয়েছে তাহলে পুরোপুরিভাবে করবে। নয়তো রানি ঠিক বেঁচে ফিরলে তার কথা রাখবেন। অবশ্যই রাখবেন।
—————
রাজপ্রাসাদ জুড়ে চাপা কথোপকথন চলতে লাগল। রাজপ্রাসাদ থেকে রানি উধাও আজ দু'দিন। কোথাও তার দেখা নেই।
রানি রাজপ্রাসাদে নেই এই কথাটি ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসেরও আগে। বৈঠকখানায় শোনা যাচ্ছে হ্যাব্রোর উচ্চকণ্ঠ। এর আগে কখনো হ্যাব্রোর এত উঁচু কণ্ঠ কেউ শুনেছে বলে মনে করতে পারছে না। রীতিমতো সবাইকে শাসাচ্ছে। একটিবার রানির খোঁজ পেলে রাজপ্রাসাদের সকলকে দেখে নিবে বলে হুমকি দিচ্ছে।
মন্ত্রীমশাই বসে আছেন একটি কেদারায়। কিছুটা বিরক্ত কণ্ঠে বললেন,
“রানি কি ছোটো শিশুটি? কোথাও গিয়েছেন। অনেক সময় তো উনি নিজের কিছু ব্যক্তিগত কাজ আমাদের না জানিয়েই করেন। তেমন কিছুই হবে।”
মন্ত্রীর এমন কথায় হ্যাব্রে রেগে উঠল,
“না জানিয়ে উনি কোথাও যান না। হয় আপনাকে, নয়তো আমাকে, নয়তো উনার সখী… কাউকে ঠিক অবগত করে যান। এতটা বোধবুদ্ধিহীন তিনি নন। তাছাড়া দু'টো দিন হতে চলল তিনি নেই। এতদিন না জানিয়ে দূরে থাকবেন? রানির ফিরে আসার কথা নয় কি এখনো?”
“আপনি বোধহয় বেশি ভাবছেন।”
হ্যাব্রো এবার রাগ সংবরণ করতে না পেরে তেড়ে এলেন। চেপে ধরলেন মন্ত্রীর টুটি। ছেলেটা উন্মাদ হয়ে গিয়েছে বোধহয়।
দ্রুত রাজ পুরোহিত, রাজ কবি ছুটে এসে থামালেন তাকে। টেনে সরালেন। হ্যাব্রোর শক্তি সে-যে সামান্য শক্তি নয়।
কাশতে আরম্ভ করলেন মন্ত্রী। ভয়ে, বিস্ময়ে গুটিয়ে গেলেন। যামিনী দ্রুত ছুটে এলো জল নিয়ে। সেও ছিলো কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে।
মন্ত্রীকে জল এগিয়ে দিতেই ঢকঢক করে জলটুকু গিলে নিলেন মন্ত্রী।
হ্যাব্রো ক্রোধে ভরা কণ্ঠে গর্জে ওঠে বলল, “প্রত্যেককে হত্যা করব আমি। রানির ছায়ায় থেকে রানির প্রতি প্রত্যেকের এত হেলা তাই না? নিমকহারাম একেকজন। বেইমানেরা।”
যামিনী রুখে দাঁড়াল মন্ত্রীর বিপরীতে, “আপনি এখন বেশি বেশি করছেন না? রানি কি আপনাকে মন্ত্রীর গলা অব্দি ধরার ক্ষমতা দিয়েছিলেন?”
যামিনীর কথায় আরও দ্বিগুণ রাগলো হ্যাব্রো। ছাড়া পেলে যেন যামিনীকেও মেরে ফেলবে এমন করে তাকালো। পাগলের মতন চেঁচিয়ে বলল,
“আপনি হলেন আরও বড়ো স্বার্থপর। পথ থেকে তুলে এনে রানি আপনাকে রাজপ্রাসাদ দিয়েছেন, সুখী জীবন দিয়েছেন, বানিয়েছেন সখী। আর সেফ বেইমান আপনি রানির জন্য এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালেন। এক বিন্দু ভাবলেন না।”
যামিনীরও আজ কণ্ঠ উঁচুতে, “খবরদার। আপনার আস্পর্ধা দেখে হয়রান আমি। রানি ফিরলে এর বিচার ঠিক করাবো।”
“এই পৃথিবীতে আমার হাতে যদি কেউ প্রাণ হারায় তা হবেন আপনি। মিলিয়ে নিবেন।”
বৈঠকখানা নীরব হয়ে গেলো। যামিনী কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। হ্যাব্রো এতটা উন্মাদনায় মেতেছে আজ!
মন্ত্রীমশাই ভেতর ভেতর রেগে অগ্নিশর্মা হলেন। এই রানি আর রানির সেনাপতি তাদের জীবনটা নরক করে দিয়েছেন যেন!
তাদের এই কথোপকথনের ভেতরই রাজ সচিব ছুটে এলেন। তড়িঘড়ি স্বরে বললেন,
“আজ রানির দফতরের কাগজ ঘাঁটতে গিয়ে এই পত্রখানা পেলাম। এখানে রানির নিজস্ব রাজ মুদ্রার ছাপ রয়েছে। কোনো বিশেষ পত্র তিনি সেখানে রেখে গিয়েছেন বোধহয়। আপনারা দেখুন দ্রুত।”
হ্যাব্রো আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ছুটে গেলো। এবং পত্রের উপরে ও ভেতরে রাজমুদ্রার রাজচিহ্ন স্পষ্টই। সাথে রানির স্বাক্ষর ও টানা লিখা।
পুরো পত্রটিতে চোখ উল্টে হ্যাব্রো হতভম্ব হয়ে গেলো। পায়ের নিচের ভিটেটা যেন নড়বড়ে লাগলো।
যামিনী ছুটে এলো উৎকণ্ঠা নিয়ে। কী হয়েছে, কী হয়েছে বলে ছিনিয়ে নিলো পত্রটা।
—————
সূর্যের প্রখর আলো তীব্র ভাবে এক টানা চোখে লাগাতে আর চোখগুলো বন্ধ রাখতে পারলেন না রানি। শরীরের ভেতর অনুভব করলেন তীব্র ব্যথা। চোখগুলোও খুলছে না ব্যথায়।
তবুও বহুক্ষণ জোর করে চোখ খুললো। নাকে এসে ঘ্রাণ লাগলো জংলী ফুলের। মাথা তীব্র ভার। শরীরে শক্তি নেই এক ফোঁটা।
চোখ মেলতেই রানি দেখলেন একটি মাটির ঘরে, কাঠের উপর শুয়ে আছেন তিনি। ঘরটিতে একটি মাত্র মাটির জল রাখার পাত্র।
আরেকটু চোখ ঘুরাতেই দেখলেন কালো রঙে ভেতর সোনালী কারুকাজের একটি পাঞ্জাবি পরনে দাঁড়িয়ে আছে একজন সুঠাম দেহী, সুন্দর পুরুষ। সেই ঘোলাটে চোখ মানুষটির। মুখে একটি শান্ত ছায়া।
রানি অবাক হোন। কথা বের হয় না কণ্ঠ দিয়ে। কেবল ভীষণ কষ্টে উচ্চারণ করেন,
“হেমলক পিয়ার্স…”
বাকি কিছুই বলতে পারলেন না। তার আগেই কানে ভেসে এলো ঢাকের শব্দ। বেশ অনেকটা দূরের শব্দ। হাঁক ছেড়ে কে যেন কিছু একটা বলছেন। সাধারণত রাজ্যে কোনো ঘোষণা হলে এমন করে ঢাকা বাজে, হাঁক ছাড়ে।
রানি বুঝে উঠতে পারলেন না কোন রাজ্যে আছেন কিংবা কীসের ঘোষণা হচ্ছে। হেমলকও বা এখানে কেন তা বুঝতে পারলেন না।
রানির প্রশ্নাত্মক দৃষ্টির ভাষা হেমলক বুঝল। এগিয়ে এসে দাঁড়াল রানির বরাবর। মুচকি হেসে বলল,
“এটা আপনারই রাজ্য। তবে রাজ্যের শেষ সীমানায় আছেন আপনি। এবং এই ঘোষণা আপসার রাজ্যেরই হচ্ছেন।”
রানি বিস্মিত হলেন। তিনি ছাড়া রাজ্যে ঘোষণা দেওয়ার অনুমতি কে দিলো? কীইবা হচ্ছে ঘোষণা?
হেমলক রানির ভাবনার ইতি টেনে বলল,
“আজ এ্যাজেলিয়া রাজ্যের রাজ আসনে নতুন রানি বসছেন। সেই অভিষেক হচ্ছে। রানি যামিনীর অভিষেক।”
রানির মনে হলো তিনি ঘোরে আছেন। হয়তো মারা যাচ্ছেন তাই ভুলভাল শুনছেন, দেখছেন। নয়তো সখী কী আর এমন করতে পারে? বন্ধুত্বের ধর্ম তাহলে পৃথিবীর বুকে আর থাকবে? লজ্জায় আত্মাহুতি দেবে না?
·
·
·
চলবে……………………………………………………