আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৫২ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

          সাব্বিরের দু-কামরার ভাড়া বাসার আঙিনায় নীরব বালিকার মতোন স্তব্ধ হয়ে আছে ভোর। গাছ, গুল্মে ঢাকা ছায়া ছায়া জানালায় কোমল গলায় ডাকাডাকি করছে কিছু ভোর জাগানিয়া পাখি। জানালার পাশে বসে একমনে টবে লাগানো গাছগুলোর পরিচর্যা করছিল সাব্বির। মাঝে মাঝে দিঘির মতো শান্ত চোখদুটো তুলে তাকাচ্ছে আকাশের দিকে। রাতে বৃষ্টি হওয়ায় সদ্য স্নাত যুবতীর মতো দেখাচ্ছে প্রকৃতি। সাব্বির হাতের কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়াল। হাতের কাদামাটি ধুয়ে নিজের ঘরের জানালাটা খুলে দিতেই দরজা খোলার শব্দ এলো কানে। তার জনমানবশূন্য বাসায় বুয়া বৈ অন্য কারো আসার সম্ভবনা নেই বলেই বুঝল, বুয়া এসেছেন। সাব্বির কয়েক মুহূর্ত জানালার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে বসার ঘরে ফিরে গেল। কিছুক্ষণ আগে আজকের খবরের কাগজ দিয়ে গিয়েছে হকার। সাব্বির খবরের কাগজটা নিয়ে বেতের চেয়ারে বসতেই তার সামনে চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল বুয়া। সাব্বির অনেকক্ষণ সময় নিয়ে খবরের কাগজ পড়ল। কাগজটা রেখে দেওয়ার আগে দুইবার চোখ বুলালো বিনোদন পাতায়। টেলিফিল্ম, তারকা এ সমস্ত বিষয় নিয়ে আগে কখনও সেরকম আগ্রহ ছিল না সাব্বিরের। আজকাল খুব আগ্রহ নিয়ে সেই সকল পৃষ্ঠাগুলোতে চোখ বুলায়। আপনমনে কিছু একটা খুঁজেও বেড়ায় সম্ভবত। সাব্বির খবরের কাগজটা নামিয়ে রেখে হাসপাতালের জন্য তৈরি হতে গেল। তৈরি হয়ে শোবার ঘর থেকে বেরুতেই চোখ পড়ল মিথির ঘরটির দিকে। থমকে দাঁড়াল সে। কিয়ৎকাল বন্ধ দরজাটির দিকে তাকিয়ে থেকে তালা খুলে ভেতরে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে দমকা হাওয়ার মতো উড়ে এলো একটুখানি মিথি মিথি সৌরভ। সাব্বির নীরবে গিয়ে বসল বিছানায়। অনেকদিন হলো মিথি নেই এই ঘরে। নিজের সমস্ত জিনিস গুটিয়ে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে সে। কোথাও একটা সুতাও ফেলে যায়নি ভুলে। মিথি এমনই, কী ভীষণ গোছালো! তবে না চাইতেও একটি জিনিস ফেলে যেতে হয়েছে তাকে, তার গায়ের খুশবু। সাব্বির ওই খুশবুটুকু ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। মিথি চলে যাওয়ার পর একদিনও বুয়াকে এই ঘরে ঢুকতে দেয়নি সে। নিজেই ক'দিন পর পর পরিষ্কার করে। কখনও কখনও বিছানার কাছে ঝিম ধরে বসে থাকে। এভাবে বসে থাকতে ভালো লাগে সাব্বিরের।  

সাব্বিরের ভাবনার মাঝেই এ ঘরে ছুটে এলো বুয়া। দরজায় উচ্চ আওয়াজ তুলে বুয়ার এই আগমনে খুব বিরক্ত হলো সাব্বির। মুখ তুলে প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে রইল। বুয়া উত্তেজিত গলায় বলল,

‘ এইডা আমাদের আপামণি না, স্যার?’

বলে হাতের মোবাইল ফোনটা এগিয়ে দিলো সাব্বিরের দিকে। সাব্বির ভ্রু কুঁচকে একবার ফোনের স্ক্রিনে তাকাল। ঠোঁটে মাপা হাসি আর চোখে আশ্চর্য কঠোরতা নিয়ে নীরবে বসে আছে মিথি। চটপটে উপস্থাপিকা নানান রকম প্রশ্ন করছে। মিথি অল্প কথায় উত্তর দিচ্ছে। কী এক কথায় হঠাৎ একটু হাসল সে। মাপা মাপা পরিমিত হাসি। সঙ্গে সঙ্গেই ক্যামেরায় হাইলাইট হলো সাফাত। এক পলকের জন্য মিথির দিকে অসীম মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়েছে সে। তাতেই বিভিন্ন গান, ট্র্যাক লাগিয়ে রোমান্টিক একটা আবহ তৈরি করে ফেলেছে পোস্টদাতা। সাব্বির মিথির ওই উদ্ভাসিত মুখটির দিকে তাকিয়ে রইল।

 বুয়া খুব গর্ব ভরে বলল,
‘ আপনে না কইলে কী হইবো? আপামণি যে ফিলিম ইস্টার হেইডা আমি তারে পয়লা দেইখাই বুঝছিলাম। ওমন পরির মতোন চেহারা! সে ফিলিমের নায়িকা হইবো না তো কে হইবো? উপরের তলার কাল্লেনী বৃষ্টি আপা?’

সাব্বির প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না৷ সে নির্বাসিত মানুষ। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনোরকম পদচারণ তার নেই। মিথি-সাফাতের ব্যাপারটা সে ঠিক করে বুঝল না। তবে ভিডিওর উপরে এক লাইনের বাক্যটা পড়ে একটু গম্ভীর হলো তার মুখ। বুয়া নিজের মতো বলে চলল,

‘ কাল্লেনীর ঘরের কাল্লেনী। চেহারা নাই এক তুলা কিন্তু নজর হইলো আশি তুলা। ফিলিম ইস্টারের সোয়ামীর দিকে মন।’

বুয়ার কথায় কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখাল না সাব্বির। শান্ত গলায় বলল,
‘ টেবিলে নাস্তা দিয়ে দিন বুয়া। আমাকে বেরুতে হবে।’

সাব্বিরের নিরুত্তাপ গলায় একটু অসন্তুষ্ট হলো বুয়া। তার উত্তেজিত বাক্যস্ফুরনে বাঁধা পড়ায় বেজার মুখে রান্নাঘরের দিকে গেল। সাব্বির খেতে বসে দেখল, বুয়া তার চেয়ারের পাশে মেঝেতে আসন গেড়ে বসেছে। পান চিবাতে চিবাতে খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। বুয়া সাধারণত এই ধরনের কাজ করে না। সাব্বিরকে খেতে দিয়ে সে নিজের কাজ গুছিয়ে নেয়। আজ হঠাৎ এই পরিবর্তনে খুবই অস্বস্তি বোধ করল সাব্বির। বুয়া মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে থেকে বলল,

‘ স্যার, আপামণি আর এই বাসায় আইবো না?’

সাব্বির খাওয়ায় মনোযোগ দিয়ে বলল,
‘ সম্ভাবনা কম।’

বুয়া একটু ভেবে বলল,
‘ তা আইবো কেমনে। এতো বড় ফিলিম ইস্টার। নায়ক সাফাতের সঙ্গে সিনেমা করে। ফেসবুক, টিকটকে সব জায়গায় খালি তার ছবি। মানুষ তারে কী যে পছন্দ করে স্যার! ওমন মানুষ এইখানে থাকবো কেমনে? সে তো থাকবো বড়লোকদের মতো ফ্ল্যাটে। তাইলে কী আপনে এই বাসা ছাইড়া দিবেন, স্যার?’

সাব্বির খাওয়া থামিয়ে কপাল কুঁচকে তাকাল। বলল,
‘ আমি বাসা ছাড়ব কেন?’

বুয়া অবাক হয়ে বলল,
‘ আপামণির লগে থাকবেন না?’

সাব্বির কঠিন গলায় বলল, 
‘ না।’

সাব্বিরের কন্ঠের কাঠিন্যে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল বুয়া। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,

‘ আপামণিরে তো দেখছি, একেবারে মাটির মানুষ। এতোবড় ফিলিম ইস্টার কিন্তু কোনোদিন একটু অহংকার করতে দেহি নাই। আপামণি মানুষ ভালা হইলে কী হইবো। জামানা তো ভালা না। স্যার আপনে এই বাসা ছাইড়া দিয়ে আপামণির কাছে গিয়া থাকেন। স্বামী-ইস্তিরি একসঙ্গে থাকলে মায়া মোহাব্বত বাড়ে। আপনি আশেপাশে না থাকলে নাটক-সিনেমা করতে গিয়ে কার সঙ্গে মন আটকায় যাইব কওন যায়?’

সাব্বির কিছু বলল না। নীরবে খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে গেল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। একটা রিকশা ডেকে আনমনা হয়ে বসে রইল তাতে। হাসপাতালের কাছাকাছি এসে হঠাৎ একটা বিলবোর্ডে চোখ গেল তার। বিলবোর্ডে সাফাতের হাস্যোজ্জ্বল ছবি। ছবিটা দেখেই কেমন একটা মন খারাপ ঘিরে ধরল তাকে। মনে পড়ল মিথির দিকে সাফাতের ওই এক পলকের চাহনি। কী অসীম মুগ্ধতা ছিল তার চোখে! ‘Men in love.’ – কথাটা খুব মিথ্য লিখেনি সেখানে। প্রেমে পড়া পুরুষের দৃষ্টি তো ওরকমই হয়। সাব্বির ঘাড় ফিরিয়ে আরও একবার সাফাতের ছবিটি দেখে। ভীষণ সুদর্শন পুরুষ সাফাত। মিথিও কী এই ছেলেটিকে ভালোবাসে? হয়তো বাসে। সাব্বির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাফাতকে ভালোবাসলে একটুও অন্যায় হবে না মিথির। সাব্বির তো চেয়েছিলই মিথি এগিয়ে যাক। ভালো থাকুক। সাব্বির এই পৃথিবী থেকে চিরতরে মিটে গেলেও মিথির অংশীদার থাকুক৷ এই পৃথিবী কোনোদিন ভুলে না যাক মিথি ছিল। 
 
সাব্বির নিজের চেম্বার গিয়ে বসল। এই পৃথিবীতে একা, স্বজনহীন হয়ে বেঁচে আছে এই রকম অজস্র মানুষ আছে। কিন্তু সাব্বিরের মতো কল্পনাতেও একা, নিঃস্ব কেউ আছে কিনা কে জানে! সাব্বিরের বত্রিশ বছরের সুদীর্ঘ জীবনে ‘কল্পনা’ বলে কিছুর অস্তিত্ব কখনও ছিল না। অবসরে সে মুগ্ধ হয়ে আকাশ দেখতো। জন্মদাতা-জন্মদাত্রী বলে তার কেউ নেই। শুনেছে, বাবা-মা ব্যাপারটা খুব মধুর। সাব্বির ওই মধুর সম্পর্কের কথা কল্পনাতেও ভাবতে পারে না। তার কোনো বন্ধু নেই। কোনো স্নেহের কথা মনে পড়ে না। সাব্বিরের কেবল মনে পড়ে একটা জীবন। যে জীবনে আছে বেঁচে থাকা আর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। সাব্বির খুব আগ্রহ নিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। তার চাইতেও আগ্রহ নিয়ে বেঁচে থাকছে। জনমানবহীন, একলা বেঁচে থাকতে তার খারাপ লাগে না। বরং আশ্চর্য এক স্বস্তি পায়। সেই স্বস্তির জীবনে ভয়ংকর এক অস্বস্তি হয়ে এসেছিল মিথি। একসময় চলেও গেলো। তবে যাওয়ার আগে সাব্বিরকে দিয়ে গেল কল্পনা। সাব্বির জীবনে প্রথম একটা মানুষ পেলো যার কথা অবসরে কল্পনা করা যায়। ঝুম বৃষ্টির বারান্দায় মাধবীলতা ফুল কানে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা অপার্থিব দৃশ্যটুকু কল্পনা করেই সাব্বির কাটিয়ে দিতে পারে ঘন্টার পর ঘন্টা। ওই কল্প দৃশ্যটুকু ছাড়া মিথির কাছে আর কিছুই চাইবার নেই সাব্বিরের। একলা, সঙ্গীহীন হয়ে যেদিন সে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে সেদিন তার চোখ শূন্য থাকবে না। গাঢ় শূন্যতার বদলে সেখানে ভাসবে একটি বৃষ্টিমুখর ছবি। একটা নিষিদ্ধ জীবনে এর চাইতে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে? কিন্তু তারপরও রোগী দেখতে গিয়ে বারবার আনমনা হয়ে পড়ে সাব্বির। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ব্যথা। সাব্বির জানে, এই ব্যথার কোনো ভিত্তি নেই। মিথি এগিয়ে যাবে, অন্য একজনকে ভালোবাসবে, তাদের সন্তান আসবে– এটাই তো চিরন্তন সত্য! যা সত্য তাতে অতো ব্যথা কীসের? তারপরও ব্যথা বাড়ে। থম ধরা আকাশের মতো একঘেয়ে জীবনে বহু কাল পর খুব শীতল একটা কষ্ট উড়ে বেড়ায় ছিন্ন মেঘের মতো। সাব্বির অবাক হয় এই ভেবে, যাদের স্বর্গে যাবার অনুমতি নেই। সৃষ্টিকর্তা তাদের বুকেও কেন দেন স্বর্গ না পাওয়ার আক্ষেপ?
Page 2
          একটা ঝাঁ চকচকে বিকেল। কাচের জানালা ভেদ করে ফরাশের উপর এসে পড়ছে কনে দেখা আলো। মোহাম্মদপুর থেকে সেদিন একটা সেকেন্ড হ্যান্ড টুল কিনে এনেছিল নাহিদ। তার উপর আরাম করে বসে আছে বাবুন। হাতে তার সেই পুরোনো প্লাস্টিকের বল। মুখটা মিইয়ে যাওয়া ফুলের মতোন নিষ্প্রভ। নাহিদ বাবুনকে দেখে মনে মনে উল্লসিত হলো। ছেলেটা তার সঙ্গে অভিমান করে অনেকদিন আসেনি। সে ঠাট্টা করে বলল,

‘ কী রে ব্যাটা! মন খারাপ? মদ খাবি?’

বাবুন উত্তর দিলো না। তার টুলটুলে, মিষ্টি মুখখানা ঠিক নাহিদের মতো দেখতে হলেও তার দিকে তাকালেই নাহিদের মনে হয় ছেলেটা একেবারে তার মায়ের মতো হয়েছে। দু'চোখ জুড়ে মায়ের মতোই অভিমান। বাবুন একটু চুপ করে থেকে বলল,

‘ ভাত খাব।’

তারপর বিষণ্ণ মেদুর চোখ তুলে নীরবে তাকিয়ে রইল নাহিদের দিকে। বাবুনের ভীত বিষণ্ণ চোখ, শুষ্ক ঠোঁট আর মলিন চেহারা দেখে মনে হলো, কত সহস্র দিন ছেলেটার মাথায় কেউ হাত বুলিয়ে দেয় না। নাহিদের বুকের ভেতরটা সত্যিকারের বাবাদের মতোন হাহাকার করে উঠল। বাবুন তার টলটলে চোখদুটো মেলে তাকিয়ে থেকে ভারি মন খারাপ করা গলায় বলল,

‘ বাবা, ভাত খাব।’

বলতে বলতে তার চোখে জল জমলো। কচি ঠোঁট দুটো ভেঙে আসতে চাইলো। তবুও কত দৃঢ় তার ইচ্ছেশক্তি! যেন ঈশ্বরের সঙ্গে প্রতিজ্ঞা তার, কিছুতেই কেঁদে ফেলা যাবে না। নাহিদ গম্ভীর গলায় বলল,

‘ ভাত খাবি! কেন রে? তোর মা তোকে খেতে দেয়নি? তোর মা কোথায়, বাবুন?’

বাবুন অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। ছলছলে চোখে হঠাৎ যেন একটু ভাবুক হলো। তারপর সমস্ত প্রতিজ্ঞা ভেঙে ফুলে ফুলে কেঁদে উঠে বলল,

‘ বাবা, মা দাও।’

ভারি মুশকিলে পড়ল নাহিদ। তার ঘরে ভাত নেই। রান্নাবান্নার সরঞ্জামও নেই। সব চাইতে যে জিনিসের সংকট তা হলো বাবুনের মা। ওই জিনিস কোন বাজার থেকে কিনে আনবে সে? নাহিদ হতাশ গলায় বলল,

‘ মা কোথায় পাবো রে ব্যাটা! তোর মা আমাকে দুই টাকার দাম দেয়?’

বাবুন সে কথায় কান দিলো বলে মনে হলো না। সে হাপুসনয়নে কাঁদছে। বড় বড় অশ্রু ফোঁটায় ওর জামার কাছটা ভিজে যাচ্ছে। নাহিদের ভারি মন খারাপ হলো। বুকে আশ্চর্য এক স্নেহ নিয়ে সে এগিয়ে যেতে চাইল বাবুনের কাছে। বলল,

‘ দূর ব্যাটা! কাঁদছিস কেন? আয় তোকে ভাত খাইয়ে আনি। মা না থাকলেও ভাত পাওয়া যায়। তার জন্য কাঁদতে আছে নাকি বেকুব?’

বলে অস্থির হয়ে বাবুনের দিকে হাত বাড়াতেই বাহুতে সবল এক ধাক্কায় তন্দ্রা ছুটে গেল নাহিদের। চোখ মেলে তাকাতেই দেখল, তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে অসম্ভব রূপবতী এক মেয়ে। নাহিদ মেয়েটাকে চিনলো না। ঘাড় ফিরিয়ে আশেপাশে তাকাল। কোথায় তার ঘর! কোথায় সেই টুল! কোথায় বাবুন? এ তো সুসজ্জিত এক ড্রয়িং রুম। চারদিকে আধুনিক সাজসজ্জা। সামনের টেবিলে চায়ের কাপ। নাহিদের ধীরে ধীরে মনে পড়ল তারা এখন বসে আছে কর্ণেল ফতেহ সিদ্দিকের বসার ঘরে। সেজো মামার সাহায্যে এই ভদ্রলোকের সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়েছে তারা। কর্ণেল সাহেব দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। নাহিদদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত শরীরে কখন যে তন্দ্রা নেমে এলো! নাহিদ সচেতন হয়ে বসল। এভাবে কারো বসার ঘরে ঘুমিয়ে পড়ায় কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করলো। মেয়েটি তাকে বিব্রত না করে বেশ স্বতঃস্ফূর্ত গলায় বলল,

‘ আপনারা চা নিন, প্লিজ।’

সৌধ এতোক্ষণ নাহিদের দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে থাকলেও এবার মুখ ফিরিয়ে সৌজন্যতার হাসি হাসল। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বলল,

‘ ধন্যবাদ। আপনি?’

‘ আমি সুহানা। কর্ণেল ফতেহ সিদ্দিকের মেয়ে। বাবা আপনাদের কথা বলেছিলেন আমাকে। আপনারা সম্ভবত একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন।’

সৌধ একটু হাসল। বলল,
‘ হ্যাঁ। আসলে আমাদের এদিকে একটা কাজ ছিল। কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাওয়ায় ভাবলাম…’

মেয়েটি মাথা নাড়তে নাড়তে একবার নাহিদের দিকে তাকাল। সৌধ খেয়াল করল, ঘুম থেকে উঠার পর থেকে চোখ-মুখ কঠিন করে বসে আছে সে। চায়ের কাপ ছুঁয়েও দেখেনি। সুহানা নামের চমৎকার দেখতে মেয়েটির প্রতিও তার কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

‘ আপনি চা নিচ্ছেন না কেন?’

সুহানা এবার সরাসরি প্রশ্ন করল নাহিদকে। নাহিদ তার প্রশ্ন খেয়াল করল না। মেয়েদের অবজ্ঞা-অবহেলা করা নাহিদের স্বভাবের বিপরীত বলেই তার এই ব্যবহারে কিঞ্চিৎ আশ্চর্য হলো সৌধ। তার বাহুতে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সুহানার দিকে তাকিয়ে হেসে পরিবেশ সহজ করার চেষ্টা করল। নাহিদকে বলল,

‘ কী রে, শুনতে পাসনি? তোর সঙ্গে কথা বলছেন উনি।’

সৌধর ধাক্কায় সম্বিত ফিরে পেল নাহিদ। বন্ধুর কথা শুনে সুহানার দিকে ভ্রু-কপাল কুঁচকে এমন ভাবে তাকাল যেন মেয়েটার প্রতি তার ভীষণ ক্ষোভ। গম্ভীর গলায় বলল,
‘ বলুন।’

মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল সুহানার। নাহিদকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সৌধকে বলল,
‘ বাবার কাছে শুনলাম, আপনারা ম্যাগাজিন নিয়ে কাজ করছেন। সাহিত্য ম্যাগাজিনে কর্ণেলের কী কাজ? লেট মি টেল ইউ, বাবার সাহিত্য জ্ঞান খুব ভয়ানক।’

সুহানার বলার ধরনে হেসে ফেলল সৌধ। বলল,
‘ সাহিত্য না। আমরা আসলে ক্রাইম ম্যাগাজিন নিয়ে কাজ করছি।’

তারপর ম্যাগাজিনের ধরণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলে গেল সৌধ। সুহানা তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে বার কয়েক আড়চোখে নাহিদকে দেখল। নাহিদ নিজের মতো বসে আছে। একটু আগে সুহানা তাকে খুব সূক্ষ্মভাবে অপমান করেছে, সেই নিয়ে তার কোনো ভাবাবেগ নেই। সুহানা বলল,

‘ কোয়াইট ইন্টারেস্টিং! পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে পারলে এটা দারুণ কিছু হতে পারে। আপনাদেরকে আমার সমবয়সী বলেই মনে হচ্ছে। এই বয়সে ফ্যান্টাসী বেশি থাকায় বেশিরভাগ পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় না। এনিওয়ে, আমি কিন্তু ক্রিমিনোলজি নিয়ে পড়াশোনা করছি।’

সৌধ সুহানার উচ্চারণে ব্রিটিশ একসেন্টের প্রভাব লক্ষ্য করে বলল, 
‘ কোথায় পড়াশোনা করছেন? লন্ডন?’

সুহানা মাথা নেড়ে বলল,
‘ হ্যাঁ। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস্।’

ওদের আলাপচারিতার মধ্যেই বসার ঘরে উপস্থিত হলেন মাঝবয়েসী কর্ণেল। সেজো মামার মতোন নায়কোচিত দেহসৌষ্ঠব না হলেও বেশ ফিট তার দেহ। এতোক্ষণ নীরব থাকা নাহিদ তাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। সালাম দিয়ে কুশলাদি বিনিময়ের পর কর্ণেল সাহেব তাদের বক্তব্য পেশ করতে বললেন। এতোক্ষণ আনমনা হয়ে বসে থাকা নাহিদ চোখের পলকে তার রূপ বদলাল। চমৎকার স্বতঃস্ফূর্ত কণ্ঠে সে বলে গেল নিজেদের ম্যাগাজিন, পরিকল্পনা আর কাজ সম্পর্কে। তার সঙ্গে নিজেদের সীমাবদ্ধতাও বলল। তারা যে কেবল কথায় নয় কাজেও একইরকম তা বুঝাতে নাহিদ তাদের চলতি অভিযানের উপর লেখা কিছু ফিচারও দেখাল। কর্ণেল সাহেব অভিব্যক্তিহীন চেহারায় সমস্ত কথা শুনলেন। কপালে অবহেলার ছাপ নিয়ে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে দুটো ফিচার পড়লেন। তারপর আরও অভিব্যক্তিশূন্য চেহারায় সেগুলো ফিরিয়ে দিলেন। নাহিদ-সৌধ একে অপরের দিকে একবার তাকাল। দু'জনেই বুঝল, কাজ হবে না। তারপরও সৌজন্যবশত কর্ণেল সাহেবের মন্তব্যের অপেক্ষা করল। কর্ণেক ফতেহ সিদ্দিক নাহিদের দিকে কিছুক্ষণ বাঁজ পাখির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা ভাবলেন। বললেন,

‘ বিগ্রেডিয়ার মঈনুল আহসান স্যার যখন আপনাদের ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা বলেন তখন তিনি সরাসরি বলেছিলেন, ওরা আসলে কোনো কাজের না। ইউ মাইট জাস্ট এন্ড আপ ওয়েস্টিং ইউর টাইম। আই অ্যাম ট্রুলি সরি এবাউট দ্যাট, সিদ্দিক। এই সময়টুকু তুমি আমার জন্য খরচ করো। স্যারের জন্য এতোটুকু সময় অপচয় করা আমার কর্তব্য ছিল। আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম খুব চাইল্ডিশ কিছুর সাথে ডিল করার জন্য।’

নাহিদ সহজ মুখে বসে রইল। তার সম্পর্কে সেজো মামার বক্তব্যে সে একটুও বিস্মিত হলো না। তিনি যে কর্ণেল সাহেবের কাছে তাকে আরও অপমানজনক কোনো বিশেষণে বিশেষায়িত করেননি তাতেই বরং আশ্চর্য হলো। সৌধ তার কানের কাছে মুখ এনে বিড়বিড় করে বলল,

‘ এটা তোর মামা নাকি কংস?’

নাহিদ প্রত্যুত্তর করল না। কর্ণেল সাহেব বললেন, 
‘ কিন্তু আপনাদের প্রেজেন্টেশন দেখে আমি খুবই চমৎকৃত হয়েছি। যতটা হতাশাজনক হবে ভেবেছিলাম ততটা হতাশাজনক হয়নি বলে সম্ভবত কিছুটা হতাশ হয়েছি। তোমাদের কথার সাথে কাজের মেলবন্ধন থাকলে কাজটা খুব রোমাঞ্চকর হতে চলেছে। রিটায়ার করার পর খুবই সরল জীবনযাপন করছি। জীবনের উপর কিছুটা বিরক্তি চলে এসেছে। তোমাদের কী মনে হয়, তোমরা এই বিরক্তি কাটাতে পারবে? নাকি আরও বিরক্তি ধরিয়ে দিবে?’

নাহিদ খেয়াল করলো কর্ণেল সাহেব ইতোমধ্যেই আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছেন। বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সামান্য আগ্রহও জ্বলজ্বল করছে। সে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

‘ আমরা চ্যালেঞ্জকে চ্যালেঞ্জ করার মতো মানুষই খুঁজছি স্যার। আমার ধারণা, আপনার মতো মানুষেরা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলে শুধু আপনার বিরক্তি না আরও অনেকের বিরক্তিই কেটে যাবে।’

কর্ণেল সাহেব বললেন,
‘ আমার মতো আরও মানুষ যে তোমাদের সঙ্গে যুক্ত হবে তার নিশ্চয়তা কী?’

নাহিদ হেসে বলল,
‘ নিশ্চয়তা নেই। চ্যালেঞ্জে কখনো কোনো নিশ্চয়তা থাকে না, স্যার। বাংলাদেশের মতো একটা দেশে এই রকম একটা ক্রাইম ম্যাগাজিন দাঁড় করানোও একটা চ্যালেঞ্জ। আমার মনে হয়, পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলোর থেকে এটা আরও বড় আর উত্তেজনাপূর্ণ। Why don't you give this challenge a try, Sir?’

কর্ণেল সাহেব নাহিদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। ছেলেটা ভয়ংকর চতুর বুঝতে পেরে বললেন,
‘ আমি শুধু তোমাদের কথাতে হুট করে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছি না। ভাবার জন্য আমার কিছু সময় দরকার হবে। তোমাদের ম্যাগাজিন কোম্পানির কর্ণধারের সঙ্গে সরাসরি আলাপ হলে সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও সহজ হতো আমার জন্য।’

নাহিদ নিরেট গলায় বলল,
‘ আমরা দু'জনও কোম্পানির কর্ণধারদের একজন। তারপরও আপনি চাইলে আদিব হোসেনের সাথে আপনার একটা মিটিং ফিক্সড করতে পারি। সেখানে আমরা দু'জনও উপস্থিত থাকব। আপনার সাথে কোলাবরেট করার দায়িত্ব আমার ছিল। আমার মনে হচ্ছে আমি সফল।’

কর্ণেল সাহেব উত্তর না দিয়ে নাহিদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নাহিদের আত্মবিশ্বাসে পূর্ণ কণ্ঠে তিনি মুগ্ধ হলেন নাকি বিরক্ত বোধগম্য হলো না। 

সৌধ-নাহিদ যখন কর্ণেল সাহেবের বাড়ি থেকে বেরুলো তখন চারদিকে ধূসর সন্ধ্যা। রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টগুলো একবুক হলদে আলো নিয়ে নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে। সৌধ নাহিদের বাইকের পেছনে বসে একটা সিগারেট ধরালো। নাহিদ বাইকে স্পিড তুলতেই বলল,

‘ আর্মি অফিসারদের বউরা রূপবতী হয় জানতাম। মাইয়াগুলোও যে রূপবতী হয় প্রথম জানলাম। তোর বোন মৌনিও তো আর্মি অফিসারের মেয়ে। সুহানাও। মেয়েটা কী সাংঘাতিক রূপবতী! খেয়াল করেছিস?’

নাহিদ উত্তর দিলো না। বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দিলো কেবল। সৌধ নাহিদের এই অদ্ভুত নীরবতা দেখে বলল,

‘ তোর আজ হয়েছেটা কী বল তো? তখনও মেয়েটার সঙ্গে কেমন অদ্ভুত ব্যবহার করলি। তোর জন্য আমি পড়েছিলাম এক বেকায়দা অবস্থায়। মেয়েটা যদি রাগ করে তার বাপকে ক্ষেপিয়ে দেয়?’

নাহিদ বিরক্ত হলো। বলল,
‘ কখন থেকে কী সব মাইয়া মাইয়া লাগাইছিস। চুপ কর তো। সব সময় এক প্যাঁচাল ভালো লাগে না।’

সৌধ অবাক হলো। যে নাহিদের কাছে নারী মাত্রই মনোহর সৃষ্টি। তাদের আলাপ মাত্রই মধুর সময়। তার মুখে নারী নিয়ে বিরক্তি! সৌধ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বলল,

‘ কি হয়েছে? হঠাৎ এমন ক্ষেপে আছিস কেন ভাই?’

প্রত্যুত্তরে নীরবে বাইকের গতি বাড়িয়ে দিলো নাহিদ। তার মেজাজের পারদ টের পেয়ে খুব সাবধানে জিজ্ঞেস করলো সৌধ,

 ‘কোথায় যাচ্ছি?’

‘ জানি না৷ কোনো একটা রেস্টুরেন্টে বসব। ভাত খাব।’

সৌধ অবাক,
‘ এই সন্ধ্যেবেলা ভাত খাবি? কর্ণেলের বাসায় যাওয়ার আগে আমরা বিরিয়ানি খেলাম। কী হয়েছে আজ তোর?’

নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার যে কী হয়েছে, সে কথা সে নিজেই কী জানে? কেবল বুঝতে পারছে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা তাকে ক্রমশ কেমন ক্রুদ্ধ, বিরক্ত করে তুলছে। নাহিদ একটা রেস্তোরাঁর সামনে বাইক থামাল। ভেতরে গিয়ে খাবার অর্ডার দিয়ে একটা টেবিলে দেখে বসতেই মনে পড়ল, অনেকদিন হলো ভাত খায় না নাহিদ। তার এক কামরার ঘরে রান্নাবান্নার সরঞ্জাম নেই। রান্নাবান্নার প্রতি নাহিদের কোনো আগ্রহও নেই। যখন যা ইচ্ছে হয় কিনে খায়। ইচ্ছে না হলে না খেয়ে থাকে। খাবার-দাবার সম্পর্কে তার রুচিবোধ খুব উন্নত। যেখানে সেখানের খাবার সে খেতে পারে না। তাই ভাত সবসময়ই থাকে বাদের লিস্টে। নাহিদ দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে এক গ্রাস ভাত মুখে তুলেই বিকৃত করে ফেলল মুখ। বাবুনকে সে বলেছিল, ‘মা না থাকলেও ভাত পাওয়া যায়।’ কথাটা বদলে তার নতুন করে বলতে ইচ্ছে হলো, ‘মা না থাকলেও ভাত পাওয়া যায়। কিন্তু সেই ভাতে পেট ভরে না বাবুন। তুই তোর মায়ের কাছেই থাক। তোর পেট সবসময় ভরা থাকুক।’

নাহিদের আর খাওয়া হলো না। খাবারগুলো ওমনি ফেলে রেখে যখন রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলো তখন সৌধ ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ তোর কী হয়েছে বল তো? এমন অদ্ভুত আচরণ করছিস কেন?’

নাহিদ উত্তর না দিয়ে একটা সিগারেট ধরালো। সৌধর জেরার মুখে পড়ে একটু হালকা রসিকতা করার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখল বিরক্তিতে তেঁতো হয়ে আছে জিভ। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ঠোঁটের কোণে সিগারেটটা চেপে ধরে ফের বাইকে উঠে বসল নাহিদ। অনেকদিন হলো ময়মনসিংহ যাওয়া হয় না। সে-ই যে ঝামেলা করে বেরিয়ে এলো তারপর আর ফেরা হয়নি সেদিকে৷ মা! হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ে নাহিদের। মা মানুষটা তাকে ভালোই বাসেন। কিন্তু সেই ভালোবাসার মাধুর্যতার চাইতে মায়ের রোজকার চিৎকার-চেঁচামেচি, অশান্তি ক্লান্ত করে দেয় নাহিদকে। ওই বাড়িতে কোনোদিন শান্তিতে এক থালা ভাত খেতে পারেনি নাহিদ। খাবার সময় মা কোনোদিন তার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারেনি। সেখানে সর্বক্ষণ একটা যুদ্ধ চলে। কেউ না কেউ ক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। কারো না কারো সাথে মায়ের ঝগড়া পর্ব চলছে। কখনও সরবে, কখনও নীরবে। নাহিদের দাদী এখনও জীবিত আছেন। ভদ্রমহিলার নাহিদের প্রতি প্রবল স্নেহ। কিন্তু মা দাদীকে সহ্য করতে পারেন না। কেন পারেন না, কে জানে! নাহিদের অনেক বখাটে শ্রেণির বন্ধু আছে। এদের মুখের ভাষা কুৎসিত। তাদের সঙ্গে চলাফেরা করেও নাহিদ মিষ্টভাষী। গালিগালাজ সে একেবারেই করে না। অথচ মায়ের মুখের ভাষা ভয়ংকর। রেগে গেলে তিনি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন। নাহিদ ভেবে অবাক হয়, আজ যার সঙ্গে মায়ের এতো নোংরা ঝগড়া হয়। তার সঙ্গে জীবন কাটাবে বলেই একদিন বাসর ঘর ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছিলেন তিনি। একবারও পেছনে ফিরে তাকাননি। প্রেমিকা হিসেবে তার সাহসে বরাবরই মুগ্ধ হয় নাহিদ। তারপর আবার প্রশ্নও জাগে, যাকে এতো প্রবলভাবে ভালোবাসা যায়। তাকে এমন নিকৃষ্টভাবে ঘৃণাও করা যায় কখনো? ওমন ঘৃণা নিয়ে আবার সংসারও করা যায়? বাড়ির এই দ্বন্দ্ব ফ্যাসাদের কথা মনে করে নাহিদের হঠাৎ মনে পড়ে যায় রিফার কথা। কে জানে, ওই নরক সমতুল্য বাড়িতে কী করে বড় হচ্ছে মেয়েটা। রোজ কত মানসিক দ্বন্দই না পোহাতে হচ্ছে তাকে। নাহিদের মন খারাপ গেল। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল,

‘ সুস্থ একটা পরিবার দিতে না পারলে মানুষ বাচ্চা জন্ম দেয় কেন, কে জানে!’

সৌধ সে কথার প্রত্যুত্তরে কিছু বলার আগেই নাহিদ বলল,
‘ তুই বাইকটা নিয়ে বাসায় চলে যা, সৌধ। আমি একটু ময়মনসিংহ দিয়ে ঘুরে আসি।’

—————

সন্ধ্যা থেকে আকাশের মুখ ভার। ঘন্টাখানেক হলো শীতল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। যেকোনো সময় সমস্ত অভিমানে ইস্তেফা দিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলবে আকাশ। নিজের কোয়ার্টারের নিচে গাড়িটা পার্ক করে দ্রুত পায়ে নেমে এলো ইশতিয়াক। গাড়ির ডিকিতে কিছু ঔষধের কার্টুন আর ডাক্তারি সারঞ্জাম রাখা আছে। ওগুলো খুব শীঘ্রই পাঠাতে হবে গ্রামে, দাদাজানের হাসপাতালে। লাখ টাকার জিনিস। বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হলে হবে আরেক সর্বনাশ। ইশতিয়াক কোয়ার্টারের দারোয়ানকে দিয়ে কার্টুনগুলো উপরে পাঠিয়ে দিয়ে বাদ বাকি সরঞ্জামগুলো তুলে নিলো নিজের হাতে৷ দাদাজানের আশ্চর্য বাড়িতে খুব আশ্চর্য এক নিয়ম আছে। হাসপাতাল, এতিমখানা ও আনুষঙ্গিক সামাজিক কাজের জন্য বাড়ির সকল উপার্জনক্ষম পুরুষদের মাসিক আয়ের কিছু অংশ বাধ্যতামূলকভাবে দান করতে হয় দাদাজানের ট্রাস্টে। কে কত অংশ দেবে সে হিসেবও নির্ধারিত। দাদাজানের পুত্রদের জন্য বরাদ্দ তাদের আয়ের বিশ শতাংশ। নাতিদের জন্য দশ। সে পয়সা আদায়ের জন্যও আছে আলাদা ডিপার্টমেন্ট। সেই ডিপার্টমেন্টকে ফাঁকি দিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ এক পয়সাও হেরফের করতে পারেনি।
ইশতিয়াকের দৃঢ় বিশ্বাস, দুদকের ঈগল দৃষ্টিও দাদাজানের এই ডিপার্টমেন্টের কাছে একশোবার প্রাণ হারাবে। ইশতিয়াক দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। গ্যারেজ থেকে দৌঁড়ে বিল্ডিং পর্যন্ত আসতেই ভিজে গিয়েছে তার চুল আর কাঁধ। ইশতিয়াক তড়িৎ পায়ে চারতলা পর্যন্ত উঠে আসতেই সিঁড়ির গোড়ায় দেখা হয়ে গেল পাশের বাসার মেয়েটার সাথে। মেয়েটার নাম প্রভা। লজ্জা-শরম সম্ভবত কিছু কম। সবসময় ইশতিয়াকের সঙ্গে ফাজলামো করার জন্য মুখিয়ে থাকে। ইশতিয়াক প্রভাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে পা বাড়াল। সঙ্গে সঙ্গে পথ আগলে দাঁড়াল প্রভা। ইশতিয়াকের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে ধমকের স্বরে বলল,

‘ আপনি তো খুবই আনসোশ্যাল মানুষ, ইশতিয়াক। আমি একটা মানুষ এখানে দাঁড়িয়ে আছি। অথচ আপনি একটিবার জিজ্ঞেস করলেন না, আমি কেমন আছি?’

ইশতিয়াক বিস্মিত চোখে তাকাল। এই মেয়ের স্পর্ধা দেখে সে স্তম্ভিত। দুইদিন আগেও সে তাকে ভাইয়া বলে ডাকতো। আজ একেবারে নাম ধরে ডাকছে। ইশতিয়াক কঠিন গলায় বলল,

‘ সামনে থেকে সরো।’

প্রভা নির্বিকার গলায় বলল,
‘ সরব না। আগে আমাকে জিজ্ঞেস করুন, আমি কেমন আছি। জিজ্ঞেস করুন। এক্ষুনি জিজ্ঞেস করবেন।’

প্রভার ধমকে হতবাক হয়ে গেল ইশতিয়াক। অতিষ্ঠ হয়ে জিজ্ঞাসা করল, 
‘ নাম ধরে কেন ডাকছ? আমি তোমার কত বড় জানো?’

প্রভা নির্লিপ্ত গলায় বলল,
‘ আপনাকে আমি নাম ধরেই ডাকব। এখন আপনি ডাকি। দুইদিন পর তুমি করে বলব।’

ইশতিয়াক কিছুক্ষণ স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল,
‘ সরো।’

‘ উঁহু। আগে আমাকে জিজ্ঞেস করুন, প্রভা তুমি কেমন আছো। তারপর সরব। তার আগে নয়।’

দুইহাতে ভারি সারঞ্জাম হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ইশতিয়াক এই অযাচিত ঝামেলা এড়াতে কাঠ কাঠ গলায় বলল,
‘ প্রভা তুমি কেমন আছো?’

প্রভা খুশি হয়ে বলল,
‘ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন ইশতিয়াক?’

ইশতিয়াক কঠিন গলায় বলল,
‘ ভালো। এবার সরো।’

প্রভা বলল,
‘ উঁহু। এবার জিজ্ঞেস করুন, এতো রাতে এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছো প্রভা?’

ইশতিয়াক চোখ গরম করে তাকাল। প্রভা বলল,
‘ জিজ্ঞেস করুন।’

ইশতিয়াক অতিষ্ঠ হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘ কেন দাঁড়িয়ে আছো?’

প্রভা ইশতিয়াকের দিকে কিছুটা এগিয়ে এসে তার সুদর্শন মুখটির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকাল। বলল,
‘ আপনার জন্য।’

ইশতিয়াক কেঁশে উঠল এবার। প্রভা এগিয়ে আসায় দু'পা পিছিয়ে সিঁড়ির রিলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কোনোরকমে বলল,
‘ আমার হাতে খুব ভারী সারঞ্জাম। সামনে থেকে সরো।’

প্রভা ইশতিয়াকের হাতের দিকে তাকিয়ে খুব আশ্চর্য হয়ে বলল, 
‘ আপনি মালামাল টানাটানি করার সময়ও তো আপনাকে দারুণ সুদর্শন লাগে ইশতিয়াক!’

ইশতিয়াক প্রভার দিকে ভয়ংকর একটা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকে পাশ কাটিয়ে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে চলে গেল। প্রভাও এলো পিছু পিছু। পেছন থেকে বলল,
‘ আপনার বোধহয় খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি সাহায্য করব?’

ইশতিয়াক উত্তর দিলো না। দারোয়ান ঔষধের কার্টুনগুলো তার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে নামিয়ে রেখে গিয়েছে। সে হাতের জিনিসপত্রগুলো একপাশে নামিয়ে রেখে নীরবে ঘরের তালা খুললো। প্রভা দরজার পাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে অপলক চেয়ে রইল ইশতিয়াকের লম্বা, সুদর্শন মুখে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

‘ সরকারি মেডিকেলে পড়েছেন বলে আপনার খুব ভাব, তাই না?’

ইশতিয়াক শার্টের আস্তিন গুটিয়ে ঔষধের কার্টুনগুলো ভেতরে নিয়ে রাখছিল। প্রভার মন্তব্যে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সরঞ্জামগুলোও ভেতরে রেখে দরজা বন্ধ করার আগে খুব ধৈর্য নিয়ে বলল,

‘ তোমার সমস্যা কী প্রভা? আমার সঙ্গে এই ধরনের আচরণ কী তোমার শোভা পায়, বল তো? আমি তোমার সমবয়সী নই। তাছাড়া তোমার বাবাকে আমি খুব রেস্পেক্ট করি। তুমি নিশ্চয় চাইছো না, আমি তোমার নামে তার কাছে নালিশ করি?’

প্রভাকে ধর্মের পথে ফিরিয়ে আনার যে প্রচেষ্টা ইশতিয়াক করল সেই প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দিয়ে প্রভা খুব ব্যথিত গলায় বলল,

‘ আপনি সব বললেন। একবারও তো এটা জানতে চাইলেন না, কেন আমি এমন করি।’

ইশতিয়াক প্রভার করুণ মুখখানা দেখে সরল মনে জিজ্ঞাসা করল,
‘ কেন করো?’

প্রভা ততোধিক ব্যথিত হয়ে বলল,
‘ আপনি ঔষধের বাক্সগুলো কী রোমান্টিকভাবে ঘরে নিয়ে গেলেন। অথচ আমাকে নিচ্ছেন না তাই করি।’

ইশতিয়াক হতাশ চোখে তাকাল। দরজা বন্ধ করার আগে ক্ষিপ্ত গলায় বলল,
‘ তুমি অসম্ভব বেয়াদব একটা মেয়ে।’ 

—————

আকাশ থেকে ঝমঝম করে জল গড়াচ্ছে। মৌনি একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে পা তুলে বসে আছে। হাতে চায়ের কাপ। চোখ-মুখ গম্ভীর। একটু পরেই চারদিক অন্ধকার করে সন্ধ্যা নামবে। গত দুইদিন পঞ্চগড় আর তেঁতুলিয়া চষে বেড়িয়েছে সে। রকস্ মিউজিয়াম, মহারাজার দিঘী, ভিতরগড় দুর্গ নগরী, মির্জাপুর শাহী মসজিদ সমস্ত জায়গায় ছুটে বেড়িয়ে সে গিয়েছিল তেঁতুলিয়া। বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, চা বাগান আর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে তার ফিরে যাবার কথা ছিল রংপুর। কিন্তু সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে তেঁতুলিয়া এসেই মৌনি সারাটাদিন ডাকবাংলোয় পড়ে পড়ে ঘুমালো। তার পরের দিনটা ডাকবাংলোর পেছনে দিকে ক্যানভাস পেতে আঁকাআঁকি করলো। দুইদিনের বুকিং ছিল বলে তৃতীয় দিনে তাকে নিতান্তই বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হলো পঞ্চগড়৷ পঞ্চগড় থেকে সে যাবে রংপুর। সেখানে একদিন থেকে শহরের ভেতর একটু ঘুরাফেরা করে ফিরে যাবে ঢাকা। কিন্তু সমস্যা হলো, এই মুহূর্তে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না তার। এখানেই কোনো একটা হোটেল বুক করে নরম কম্বলে গা ঢেকে চমৎকার একটা ঘুম দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু মৌনির বাজেট সীমিত। এখানে অযথা একটা দিন নষ্ট করলে রংপুরে থাকা সম্ভব হয়ে উঠবে না। মৌনি চা শেষ করে উঠে দাঁড়াল। সিদ্ধান্ত নিলো রংপুরের বাসে চড়েই জব্বর একটা ঘুম দিবে। কানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নরম সুর, বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি, বাসের একটু কম আরামদায়ক সিট সব মিলিয়ে হোটেল রুমের থেকে কম উপভোগ্য হবে না। মনে মনে খুশি হয়ে উঠল মৌনি। ঝুম বৃষ্টির মাঝেই একটা বাস থেকে হাঁক ছাড়ল, রংপুর! রংপুর! মৌনি হাতের ইশারা করতেই ছুটে এলো হেল্পার। জানাল, সামনে সিট আছে। ভাড়াও অল্প। মৌনি নির্বিঘ্নে যেতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা খুব একটা নির্বিঘ্নে ঘটল না। মৌনি বাসে উঠে দেখল, বাসে একটি সিটও ফাঁকে নেই। এই ঝুম বৃষ্টিতে নেমে যাওয়ার দুঃসাহস করতে না পেরে মৌনি নিষ্ফল ক্রোধ নিয়ে হেল্পারের দিকে তাকাল। প্রচন্ড ধমক দিয়ে বলল,

‘ কোথায় আপনার সিট! সিট না পেলে এক পয়সাও ভাড়া দেব না আমি। মগের মুল্লুক পেয়েছেন?’

হেল্পার মৌনিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ড্রাইভারের পেছনের সিটে বসালো। জানাল, কিছুদূর গিয়েই সামনের কিছু সিট ফাঁকা হয়ে যাবে। তখন নির্বিঘ্নে বসতে পারবে, কোনোরকম সমস্যা হবে না। মৌনি প্রচন্ড মেজাজ খারাপ নিয়ে বসলেও কিছুক্ষণ পর জায়গাটা তেমন খারাপ বলে মনে হলো না। আরামের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটলেও গান আর বৃষ্টির সম্মিলিত চেষ্টায় ধীরে ধীরে ফুরফুরে হয়ে গেল মন। বাইরে ধীরে ধীরে আঁধার নামছে। কাজলচোখের অশ্রুর মতোন মায়াময় দেখাচ্ছে পৃথিবী। পৃথিবীর এই মায়াময়ী রূপে মুগ্ধ হয়ে মনের সমস্ত অস্বস্তি ভুলে জীবনের প্রথম এই বিস্তর জনসমাগমে খোলা গলায় গান ধরল মৌনি,

‘ ওগো তোমার আকাশ দুটো চোখে, আমি হয়ে গেছি তারা…’

বাসের অল্প আলোয় মৌনির ঘোর লাগানো কিন্নরী কণ্ঠ তৈরি করলো আশ্চর্য এক সম্মোহন। সকলেই নিঝুম নিস্তব্ধতা নিয়ে শুনে গেল তাকে। এক সময় মৌনির কণ্ঠ থামল। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে পেছন থেকে কয়েকজন বলল,

‘ আপু, আরেকটা গান।’

মৌনি গাইল না। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো কিছুতেই মন বসে না তার। মৌনি উদাস চোখে তাকিয়ে রইলো বাইরের অন্ধকারে। ঠিক তখনই ভয়ংকর এক ঝাঁকুনি দিয়ে যাত্রীদের কিছু বুঝে উঠার আগেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটা নেমে গেল কোনো এক খালে। তারপর কী থেকে কী হয়ে গেল কিছুই বলতে পারে না মৌনি। যখন চেতন ফিরলো তখন নিজেকে সে আবিষ্কার করলো গহীন জলে। মৌনি সাঁতার জানে না। নিজেকে পানির নিচে আবিষ্কার করেই হাত-পা জমে এলো তার। হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে বার কয়েক নোংরা পানি ঢুকল গলায়। পানির তলায় কাশতে গিয়ে নাকে-মুখে পানি ঢুকে দমবন্ধ হয়ে এলো একসময়। মৌনি আশ্চর্য হয়ে দেখল তার চোখের আলো নিভে যাচ্ছে। খুব সম্ভবত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মৃত্যু এসে চেপে বসবে তার বুকে। মৃত্যুর কাছাকাছি এসে আরও মরিয়া হয়ে উঠল মৌনি। হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে পৃথিবীকে অন্তিম বিদায় জানানোর প্রচেষ্টা করতেই একটা শক্ত হাত খপ করে চেপে ধরল তার কব্জি। এক টানে মৃত্যুর কব্জা থেকে অক্সিজেনে ভরা পৃথিবীতে দাঁড় করিয়ে বলল,

‘ সোজা হয়ে দাঁড়ান। নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করুন। ভয় পাবেন না। এখানে বেশি পানি নেই।’

মৌনি সে কথা শুনলো না। এতোক্ষণের যুদ্ধের পর তার শরীর ভেঙে আসতে চাইছে। লোকটি তাকে দাঁড় করিয়ে কয়েকটি ঝাঁকুনি দিয়ে বলল,

‘ ওদিকে যান।’

ওদিক কোনদিক কিছুই বুঝল না মৌনি। তার মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আবছা অন্ধকারে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সেই লোকটির মুখের দিকে। ভদ্রলোক তখন ভীষণ ব্যস্ত মৌনিকে ধাক্কা দিয়ে আরেকজনের হাতে তুলে দিয়ে সে উদ্ধার করতে গেল অন্য কোনো মাটি হারানো মানুষকে। পারে উঠে অনেকটা সময় রাস্তার উপর স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো মৌনি। চারদিকে মানুষের স্রোত। বাস উল্টে যাওয়ার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় আশেপাশের গ্রাম থেকে ভীড় করেছে অজস্র মানুষ। অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে নিজের ব্যাগ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলো মৌনি। ফোনটা কোথায় পড়েছে কে জানে! ফোন, ব্যাগ সব হারিয়ে মৌনি বাড়ি পৌঁছাবে কী করে! ততক্ষণে গ্রামের অনেক যুবকরাই নেমে গিয়েছে উদ্ধার কাজে। কারো তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। দুই একজনের হাত-পা ভাঙা ব্যতীত সকলেই অক্ষত। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে নিজের পায়েও ভালো রকম চোটের হদিশ পেলো মৌনি। রাস্তার একপাশে পা ধরে বসে পড়তেই একজন যুবক এগিয়ে এলো কাছে। জিজ্ঞাসা করলো,

‘ পা ভেঙেছে আপু?’

সে কথার উত্তর দিলো না মৌনি। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ব্যথিত গলায় বলল,

‘ আমার ব্যাগটা হারিয়ে ফেলেছি। এখানে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?’

মৌনির ফোন, ব্যাগপ্যাক কিছুই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হলো না। তবে বাসের বক্সে লাগেজ রাখায় সেই লাগেজ উদ্ধার করা সম্ভব হলো। ব্যাগ চুরি হওয়ার ভয়ে বাড়তি সচেতনা স্বরূপ লাগেজে কিছু টাকা রেখেছিল বলে কিছুটা স্বস্তি পেল মৌনি। এই টাকায় নির্বিঘ্নে রংপুর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া যাবে।

এক্সিডেন্টের জায়গা থেকে একটু পরই কমতে লাগল জনসমাগম। বাসের যাত্রীরা বাস, সিএনজি যাই পেলো তাতে করেই রওনা হলো শহরে। মৌনিও বহু চেষ্টায় একটা বাসে উঠে বসল। নিজের সিটে বসে সামনে তাকাতেই চোখ পড়ল একেবারে সামনের সিটটাতে। ভিজে জবজবে শার্টে বসে থাকা এই ছেলেটিই শেষ মুহূর্তে তাকে টেনে এনেছিল মৃত্যুর কোল থেকে। মৌনি সিটে হেলান দিয়ে আগ্রহ নিয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক ছেলে নয়, পুরুষ। তামাটে গায়ের রঙ। দারুণ ফিট শরীর। চুলগুলো ছোট ছোট করে ছাঁটা। কঠিন চোয়াল। একপাশ থেকে দেখে যতটুকু বোধগম্য হয়, তাতে তাকে নির্বিঘ্নে সুদর্শন পুরুষ বলে চালিয়ে দেওয়া সম্ভব। রাতের বাসের অল্প আলোয় স্বপ্ন ও বাস্তবে ঢুলতে ঢুলতে লোকটির মুখখানা দেখার খুব সাধ জাগছিল মৌনির৷ তার সেই সাধ পূরণ করতেই বোধ করি ফোনের স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে একবার পেছন ফিরে তাকাল সেই ভদ্রলোক। বাসের সকলেই তখন ঘুমে ঢুলছে। এতোগুলো ঘুমন্ত মানুষের মাঝে প্রবলভাবে জেগে থাকা এবং তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা চোখদুটোতেই প্রথম দৃষ্টি পড়ল সেই অপরিচিতের। দুই সেকেন্ডের চোখাচোখি। অন্যকেউ হলে হয়তোবা অপ্রস্তুত হতো। লজ্জায় রাঙা হয়ে ফিরিয়ে নিতো মুখ। কিন্তু মৌনি তেমন কিছুই করলো না৷ নির্লিপ্ত মুখে তাকিয়ে দেখল তার ঘন ভ্রুর নিচের ইস্পাত কঠিন চোখ। তারপর খুব সহজভাবে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে তাকিয়ে রইলো জানালার ওপাশের নিকষ কালো অন্ধকারে। 

পরবর্তী পথটুকু ঘুমিয়েই কাটল মৌনির৷ ঘুম ভাঙল রংপুর শহরে পৌঁছে। মৌনির কাছে ফোন, ঘড়ি কিছুই নেই। তবু জনমানবহীন থমথমে শহর দেখে বুঝল তখন মধ্যরাত। আশেপাশে রিকশা-অটোর সংকট। যত্রতত্র দুই একটা জুটে গেলেও কোথায় যাবে সে নিয়ে বাঁধল বিপত্তি। মৌনির কাছে ফোন নেই। রংপুর শহরে সে কখনও আসেনি৷ ভালো মানের কোনো হোটেলের নামও তার মনে নেই। মধ্যরাতে অপরিচিত শহরে একলা সঙ্গীহীন দাঁড়িয়ে থেকে এক মুহূর্তের জন্য যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল মৌনি। নিজেকে শান্ত রেখে দ্রুত কোনো পথ ভাবার চেষ্টা করলো। আশেপাশের কাউকে ভালো কোনো হোটেলের সন্ধান দিতে বললে দেবে কিনা কে জানে! স্বাভাবিক সময়ে হয়তো বা দিতো কিন্তু এই সময়ে...! মৌনি নিচের ঠোঁট কামড়ে আশেপাশে তাকাল। আশেপাশের সকলেই যার যার মতো ফিরে যাচ্ছে নীড়ে। ধীরে ধীরে শূন্য হয়ে যাচ্ছে চারপাশ। মৌনি অস্থিরবোধ করলো। অদূরে একটা অটোরিকশার কাছে দাঁড়িয়ে আলাপ করতে দেখা গেল বাসের ওই লোকটিকে। আরও দু'জন লোককে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করছে সম্ভবত৷ মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোকটির প্রতি অজানা এক মন খারাপে আঁধার হয়ে এলো তার মুখ৷ মৌনির অভিমান বুঝেই কিনা কে জানে লোকটি ভাড়া ঠিক করে অটোতে উঠার আগে একবার ঘাড় ফিরিয়ে মৌনির দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে গমগমে গলায় জিজ্ঞাসা করল,

‘ আপনি কোথায় যাবেন, ম্যাডাম?’

মৌনি একবার আশেপাশে তাকিয়ে খুব আশ্চর্য হওয়ার ভান করে ভ্রু কুঁচকে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল। লোকটি তার মনোভাব বুঝতে পেরে বলল,

‘ আপনাকেই বলছি। কোথায় যাবেন?'

মৌনি নিজের অসহায়ত্ব দেখাল না। তবে আশেপাশের কাউকেই যে বিশ্বাস করতে পারছে না তা প্রকাশ পেলো তার চোখে। ভদ্রলোক আর তার সঙ্গী সাথীদের দিকে সন্দিহান দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

‘ আশেপাশে ভালো কোনো থাকার হোটেলের সন্ধান দিতে পারেন? আমি আসলে আমার ফোনটা হারিয়ে ফেলেছি।’

ভদ্রলোক বলল, 
‘ সামনেই পাবেন। আসুন, নামিয়ে দিচ্ছি।’

মৌনি একবার লোকটিকে আগাগোড়া দেখল। ভীষণ লম্বা দেখতে লোকটির প্রতি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে ভেসে সে নীরবে অটোতে উঠে বসল। ভদ্রলোকের সঙ্গে আরও দু'জন ছিলো। তারা ড্রাইভারের পাশে বসে পেছনের সিটটা ছেড়ে দিলো মৌনির জন্য। ভদ্রলোকও মৌনির পাশে না বসে বসল তার সামনের সিটে, বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে। কিছুদূর এসেই ভালো মানের একটা হোটেলের সামনে নামিয়ে দেওয়া হলো তাকে। হোটেলের রিসিপশনের দিকে ইশারা করে বলল,

' এটা বেশ সুনামধন্য হোটেল। সেফটি ইস্যু হবে না। এখানে আপনি নির্ভয়ে থাকতে পারেন।'

মৌনি অটো থেকে নেমে হোটেলের দিকে তাকিয়ে একটু দ্বিধা, একটু অনিশ্চয়তা নিয়ে বলল,
‘ ধন্যবাদ।’

ভদ্রলোক তার ধন্যবাদ শুনলো কিনা বুঝা গেল না। অটো চলতে শুরু করলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলিয়ে গেল রাস্তার অন্ধকারে। মৌনি হোটেলের ফর্মালিটিস শেষ করে রুমে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সারাদিনের ঘটন-অঘটনগুলো কেমন স্বপ্নের মতো লাগল তার কাছে। ফুলে ঢোল হয়ে থাকা পায়ে মনোযোগ দিতে দিতে তার একবার মনে পড়ল সেই ভেজা চেক শার্ট। ঘন ভ্রুর নিচে ইস্পাত কঠিন চোখদুটোকে। পরমুহূর্তেই পায়ের ব্যথার তীব্রতায় ভুলে গেল তাকে।

 আমাদের জীবনের গল্পে রোজই কত নতুন নতুন চরিত্র আসে। নিজের ভাগের গল্প লিখে হারিয়ে যেতে হয় তাদের সময়ের প্রয়োজনে। মৌনির জীবনে আরও অসংখ্য মানুষ আসবে, আরও অসংখ্য ঘটন-অঘটন ঘটবে বলেই আজ এই লোকটির আগমন। মৌনির জীবনকে আরেকটু এগিয়ে দিতে এই লোকটি সৃষ্টিকর্তার পাঠানো এক উপলক্ষ্য মাত্র। মৌনি এই উপলক্ষ্যকে কেবল একটি উপলক্ষ্য ভেবেই নিশ্চুপে ভুলে গেল। ভয়ংকর একটা রাত কাটিয়ে ভোর হতেই সে ছুটল ঢাকার পথে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp