কামিনী - পর্ব ২৮ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          বিষাক্ত তীর রানির বা'হাতে সূচালো হয়ে গেঁথে গিয়েছে। ব্যথায় কুঁচকে গিয়েছে মুখটি। তার চেয়ে বেশি বোধহয় অবাক হয়েছেন সামনের লোকটিকে দেখে। লোকটি আর কেউ নন ইনান ণেকিতান। বেশ সম্ভ্রান্ত রাজ্যের রাজা। যার প্রাণ মূর্ছা যায় রানির নামে। 
হ্যাব্রো কালবিলম্ব না করেই অভিজ্ঞ হাতে তলোয়ার ঘুরিয়ে ইনান ণেকিতানের গলার কাছটায় ধরল। একটু এদিক-ওদিক হলেই মাথাটি আলাদা হয়ে যাবে শরীর থেকে। 
রানি থামালেন। ব্যথায় ক্ষীণ হয়ে যাওয়া কণ্ঠেই বললেন,
“আপনি আমার রাজ্যে প্রবেশ করে আমাকে আক্রমণ করেছেন। এর শাস্তি কী হতে পারে জানেন?”

ইনান ণেকিতানের চোখে বেদনার ছাপ স্পষ্ট। কণ্ঠও কাঁপছে। কিছুটা উন্মাদ লাগছে তাকে। সে তবুও কণ্ঠে দাপুটে ভাব আনলো। বলল,
“আমি সকল নিয়ম-কানুন ভুলেছি। আমি কেবল জানি, আমার আপনাকেই লাগবে, রানি কামিনী।”

 রানিসহ বিস্মিত হলো উপস্থিত সকলে। যাকে পাওয়ার এত তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে আঘাতই বা করলো কেন? 
ইনান ণেকিতান তীর নামিয়ে ফেলেছে। রানি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুধালেন, 
“আমাকে লাগবে মানে কী? আমি কি কোনো বস্তু?”

 “আপনি বস্তু নন। আপনি দেবী। স্বর্গের সবচেয়ে সুন্দরী অপ্সরা। যাকে পাওয়ার জন্য এমন কেউ নেই যে তড়পাচ্ছে না। কিন্তু আমি আপনাকে অন্যের হতে দিবো না। হয় আপনি আমার হবেন, নয়তো…”

রানি নিজের হাতটা চেপে রাখা অবস্থাতেই শক্ত কণ্ঠে বললেন,
“নয়তো?”

ইনান ণেকিতান রূঢ় হয়ে উঠল। মুহূর্তেই তার রূপ বদলে গেলো। বলল,
“নয়তো আপনার এই রাজ্য ধূলিসাৎ করে দিবো। মাটিতে মিশিয়ে দিবো আপনাকে।”

রানি তার সকল নরম, কোমল রূপ বিসর্জন দিলেন। নিমিষেই যেন ভুলে বসলেন হাতের ব্যথাটি। ক্রুর স্বরে বললেন,
“তবে তা-ই হোক। আমিও দেখি কেমন ধূলিসাৎ আপনি করতে পারেন আমার রাজ্য।”

ইনান ণেকিতান এবার পরাস্ত সৈনিকের মতন বসে পড়লেন। আকুতি জড়ানো কণ্ঠে বললেন,
 “আপনি আমার হলে এই সমস্ত ক্ষমতা আমি আপনার পায়ের কাছে অর্পণ করবো। আমার কোনো যুদ্ধ চাই না। কেবল চাই জিতে নিতে আপনাকে।”

রানির ঠোঁটে ফুটল এবার হাসি। 
তার পায়ের কাছে নত হবে না এমন পুরুষ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আছে কি? থাকলেও তা সীমিতই। যখন তিনি দেখেন বড়ো বড়ো, ক্ষমতাসীন রাজারা তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েন তার কতই না আনন্দ হয়। অহংকারে ফুলে উঠে বুক। 

 “রাজা ইনান ণেকিতান, জয়ের হিসাব হয় যুদ্ধে। ভালোবাসাতে জয়-পরাজয় কী?”

“আমি সেসব বুঝি না, রানি। আমি কেবল বুঝি- আপনাকে আমার হতে হবে। কেবল আমার।”

 “বললাম তো, না হলে কী করবেন?”

ইনান ণেকিতান চোখ-মুখ টানটান করে আগের মতন উত্তেজনাপূর্ন স্বরে বলল, “যুদ্ধ।”

রানি আর সময় অপচয় না করে নির্দেশ ছুঁড়লেন সেনাপতি হ্যাব্রোকে। এই মুহূর্তেই কারাগারে নিক্ষেপ করার আদেশ দিলেন। 
 রানির এই নির্দেশের জন্যই বোধহয় সেনাপতি অপেক্ষা করছিলো। নির্দেশ পেতেই ছুটে এসে আটকে ফেলল ইনান ণেকিতানকে। সঙ্গে ছিলো আরও চারজন দেহরক্ষী। সবাইকেই আটকে ফেলল। 

ইনান ণেকিতানের প্রেমময় চোখ, কণ্ঠে নিমিষেই বদলে গেলো অসীম ক্রোধে। ধিক্কার জানিয়ে বলল,
“রানি কামিনী, তোমার ঐ গর্ব খর্ব করে তোমাকে আমার বিছানাতেই আসতে হবে। আমাকে আটকানোর ফল ভালো হবে না। তোমার রাজ্যের অধঃপতনের দরজা তুমি খুলে দিলে। অপেক্ষা করো।”

রানি এগিয়ে এলেন সেই তীরের আঘাত পাওয়া হাতটি নিয়েই। ডান হাতের আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিলেন ইনান ণেকিতানের গাল। ঠোঁট জুড়ে হাসি তখনো বিরাজমান। 
চোখে চোখ রাখলেন। রহস্য জড়ানো কণ্ঠে বললেন,
 “আমি কার বিছানাতে যাবো তা পরেও ভাবা যাবে। আপনি ততদিন অব্দি বেঁচে থাকবেন না সেটাই দুঃখের।”

রানির শীতল এই হুমকিতে শিহরণ বয়ে গেলো ইনান ণেকিতানের শরীরে। আঁতকে উঠল সে। রানির মনে মায়াদয়া একেবারেই সীমিত তা সে জানে। এবং তার এই মুহূর্তে মনে হলো, জীবন আয়ু ফুরিয়ে আসার একদম দারপ্রান্তে সে দাঁড়ানো। আর যাই হোক, রানি যুদ্ধের ভয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে না। রানির যে কোনো কিছুর ভয়ই নেই হৃদয়ে। 
 বড্ড ভুল করে ফেলল সে। কিন্তু ভুল সময়ের আফসোস অবেলার বাতাসের মতনই বড়ো অকালীন বস্তু। 

হেমলকের চোখ পুরোটা সময় রানি কামিনীকাঞ্চনের দিকেই ছিলো। সে ভেবে ভেবে অবাক হলো যে, একটি মাত্র মেয়ে কীভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজ্যজুড়ে! কোনো ভয়, সংশয়, দ্বিধা নেই। পীড়াকেও বেপরোয়া গতিতে উড়িয়ে দিতে জানে। 
 মনে মনে নিজের ভাইয়ের বুদ্ধিমত্তাকে প্রশংসা করল। তার ভাই আর যা-ই করুক না করুক, এমন একজনকে শত্রু বানিয়েছে যার সাথে সহজে রাজনীতির দ্বন্দ্ব শেষ হওয়ার নয়। 
তবে তার অবশ্য এসবে মাথা ব্যথা নেই। রাজনীতি নোংরা বিষয়। আর সে নোংরা থেকে দূরে থাকে।

 —————

বাহিলে আঁধার নেমেছে। আকাশের বুকে থাকা এক ফালি চাঁদের আগমন ঘটেছে বহুক্ষণ হলো। রানির প্রাসাদে আজ বাইজি নৃত্যে মুখরিত। তার রাজ প্রাসাদের সমস্ত মন্ত্রী, বণিকেরা ডুবে গিয়েছে নারী ও নেশার ঘোরে। তবে আজ তাদের সাথে সেই নৃত্যের আসনে নেই রানি। তার শরীরটি বিশেষ ভালো নেই। অবনতি হয়েছে দেহের। একেতো নিজেই নিজের শরীরে আঘাত করেছিলেন তার উপর গতকালকের ইনান ণেকিতানের ছোঁড়া তীর… সমস্ত মিলিয়েই শরীর ভীষণ খারাপ। উষ্ণতায় পুড়ে যাচ্ছে গা। অথচ বৈদ্যের জড়িবুটিতে তার বিশেষ আগ্রহ নেই। আগ্রহ নেই জ্বর কমানোর। কেবল নীরবে শুয়ে আছেন বিছানায়।
    সকলেই রানির একটি পরিবর্তন খেয়াল করেছেন কয়েকদিন যাবত। পরিবর্তনটি হলো- রানি মদ্যরস পান করেন না এখন। যার সকল হতো লাল পানীয়তে ঠোঁট ভিজিয়ে, সে আজকাল ফিরেও তাকাচ্ছে না সেদিকটায়। 

রানির কপাটের সামনে ঠিক প্রহরীর কণ্ঠস্বর পাওয়া গেলো। গলা কিছুটা উঁচু করে হাঁকছে প্রহরী,
 “রানি, আপনার জন্য উপহার এসেছে। অজ্ঞাত ভাবে। আমি কি কক্ষে নিয়ে আসবো সেটা?”

রানি শুয়ে থেকেই জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাব্রো কোথায়?”

বাহির থেকে সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো, “উনি তো এই মুহূর্তে রাজপ্রাসাদে নেই।”

রানি তপ্ত শ্বাস ফেললেন। উঠে বসলেন। অনুমতি দিলেন উপহারটি ভেতরে আনার। 
 অনুমতি পেতেই দেহরক্ষী একটি বড়ো উপহার নিয়ে এলেন। যা দেখে রানি এক মুহূর্তেই আঁচ করে ফেললেন এটি একটি তৈলচিত্র। আবারও তার জন্য তৈলচিত্র পাঠিয়েছে কেউ! কিন্তু কে? হেমলক পিয়ার্স? সে তো রাজপ্রাসাদেই অবস্থিত। তবে?

রানি তৎক্ষণাৎ উঠে আসলেন। দেহরক্ষীকে বের করে দিয়েই তৈলচিত্রটি হাতে নিলের। বরাবরের মতন মখমলের শুভ্র রাঙা কাপড়ে ঢাকা চিত্রটি। 

কাপড়টি রানি বেশ রয়েসয়ে সরালেন। তার আজকাল এই অজ্ঞাত নামে আসা চিত্রগুলো দেখতে ভীষণ গা কাঁপে। একেকটা চিত্র যেন তার জীবনের রূপক বহিঃপ্রকাশ। যেই স্মৃতিগুলো তিনি বুকে জমিয়ে রেখেছেন পৃথিবী থেকে লুকিয়ে। তিনি নিজেই এই সত্যগুলোর সামনে দাঁড়াতে চান না। কোনো সত্যকে আর চোখ মেলে দেখতে চান না। যা অতীত সে-সকল তিনি মুছে দিতে চান। তবে কে সেসব বারে বারে মন করায়? কেনইবা করায়? তাছাড়া সে এতকিছু জানেও বা কীভাবে? 

অনেক ভেবে রানি কাপড়টি সরানোর জন্য মন স্থির করলেন। তিনি যে রানি। সত্যকে যদি রানি ভয় পায় তবে রাজ্যের প্রজাদের জন্য দুর্ভোগ নেমে আসবে। কোনো সত্য তাকে দুর্বল করে দিতে পারে না। তিনি অদম্য পর্বতশৃঙ্গ। তিনি ছুটন্ত সমুদ্র। তাকে আটকে রাখার সাধ্যি সামান্য সত্যের হতে পারে না। কখনোই না।

 কাপড় সরাতেই রানির হাত কেঁপে উঠল। হাত থেকে পড়ে গেলো স্বচ্ছ কাঁচে মোড়ানো তৈলচিত্রটি। ঝনঝনিয়ে শব্দ হলো। 
তৈলচিত্রে ভেসে উঠল দু'টো মেয়েলি পা। যা গড়িয়ে রক্ত পড়ছে অনবরত। সেই পা দু’টির সামনে বসেই একটি ছোটো শিশু কাঁদছে। শিশুটির চোখে আকুতি, অবিশ্বাস। খুব গাঢ় ভাবে তাকালে দেখা যাচ্ছে ঘৃণা। চিত্রের একটি নিখুঁত নামকরণও করা হয়েছে— “ভ্রুণের দুঃখ একটি জনম”।

 রানির মাথা ঘুরে উঠল। চোখের উপর ঝাপসা হয়ে উঠল কত-শত স্মৃতি। 
শরীর কাঁপতে আরম্ভ করল। 
 ঠিক তখনই ঝাপসা চোখে রানি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো একটি নারী অবয়ব। যেন তারই প্রতিবিম্ব। সুন্দর সেই নারীটি হাসছেন। গা দিয়ে উপচে পড়ছে রূপ। তা দেখে ঝাপসা থেকে আরও ঝাপসা হলো রানির দৃষ্টি। অস্ফুটস্বরে ডাকতে চাইলো নারীটিকে। কিন্তু পারলেন না। 

হড়বড়িয়ে বমি করে দিয়ে জ্ঞান হারালেন। খোলা জানালার ফিনফিনে বাতাসে ছড়িয়ে আছে ফুলের গন্ধ। আবছা আলোয় রানির জ্ঞানহীন দেহটিকে করুণ দেখালো৷ যেন কবিতায় বুনন করা কবির কান্না। 
 
দরজা থেকে সরে গেলো যেন নারী দেহটি। সেই সরে যাওয়ায় শব্দ হলো নূপুরের, দেহের অলঙ্কারের। হাসছেও যেন নারীটি। ধ্বংসাত্মক হাসি। যেন কামিনীর ধ্বংস তার হাতে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp