ক্যামিলাস রাজ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ। চারপাশে বাজছে বাদ্যযন্ত্র। ঢাক, বাঁশির শব্দে চারপাশটা জমে গিয়েছে আনন্দের মেলায়।
রাজ্যের রাজপুত্র হেমলক পিয়ার্স নতুন রানি নিয়ে প্রবেশ করছে। বুক চওড়া, ফর্সা, ঘোলাটে চোখের রাজপুত্রের সৌন্দর্য সূর্যের আলোয় আরও অধিক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তার পাশেই গাঢ় খয়েরী রঙের রাজকীয় পোশাকে একটি নারী হাঁটছে। হাঁটার ভেতর প্রাচুর্য, শৌখিনতা, দম্ভ উপচে পড়ছে। মুখটি ঢাকা ঘোমটার আড়ালে। রাজপুত্র বধূর গায়ের গহনা সকল শোরগোল ছাপিয়ে ছন্দ, সুর তুলেছে।
প্রজারা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে কেবল একটু রাজপুত্র বধূর মুখদর্শনের জন্য। কিন্তু তা হলো না। রহস্যের আবরণে সুপ্ত নদীর মতন রূপবতী বধূ রইলেন আড়ালেই। নিপুণ ভাবে লুকিয়ে রাখলেন তার শোভা।
—————
মহলের যেই সদর দুয়ার রয়েছে তার বাহিরে দাঁড়ানো হেমলক ও তার বধূ। মহলের ভেতরে রয়েছে হেমলকের মাতা হতে শুরু করে সকল আপন জনা। তাদের বিস্ময়ে মুখ স্থবির। রাজমাতা ভীষণ বিস্ময়ে বললেন,
“তুমি এই হটকারি সিদ্ধান্ত কীভাবে নিলে? আমাদের জানালে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো? আমরা মহা আড়ম্বরে তোমার বিবাহ কার্য সম্পাদন করতাম না?”
হেমলকের গায়ে কালো পাঞ্জাবিটার সোনালি কারুকার্য ঝিলিক দিচ্ছে। সে বিশেষ রা করল না রাজমাতার কথায়। বরং উদাসীন কণ্ঠে বলল,
“বরণ কার্য সম্পাদন করুন, রাজমাতা। রাজ কপাট আলোচনার স্থান নয়।”
রাজমাতা প্রাচী নিজের ছোটো পুত্রের কথায় বিষণ্ণ বোধ করলেন। পুত্রটি তার বড়ো উদাসীন। কথা বলতে দু'বার ভাবে না। হ্যাভেনের মতন মোটেও মিষ্টভাষী নয়। তাই, এমন পুত্রকে আর কিছু বলা মোটেও সাজে না তার।
রাজমাতা পেছনের খাসদাসীর থেকে বরণডালাটা নিলেন। এগিয়ে এলেন দ্বারের কাছে। ডাকলেন রানি ইথুন ও নিজের দেবর বধূকেও। বরণডালা উঠাতেই ঘি-বাতির আলোয় হেমলকের বধূর গায়ের স্পষ্ট দাগগুলো চোখে পড়ল তার। হাত থেমে গেল আচমকা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন তিনি,
“কে এই মেয়ে? কী তার পরিচয়? তার গা এমন কেন? এমন বিদঘুটে, বিশ্রী! ও কি কোনো রাজ্যের রাজকন্যা নয়? কোথা থেকে এনেছো তাকে?”
রাজমাতা প্রাচীর পর পর অসংখ্য প্রশ্নে সকলের দৃষ্টি গেলো হেমলকের বধূর উপর। সারা শরীর রাজকীয়ে পোশাকে ঢাকা থাকলেও যতটুকু উন্মুক্ত ততটুকুতে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য দাগ। হাত, পায়ে হাজার খানেক দাগের ছড়াছড়ি। সকলেই এবার আশ্চর্য হলো। সকলের জানামতে হেমলক ভীষণ রুচিশীল পুরুষ। যেকোনো মেয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ার মতন ওর মানসিকতা নেই। জীবনের বেশিটা সময় সে দিয়েছে নিজের চিত্রকে। নিজের মনের উদাসীনতা, ছন্নছাড়া এবং হঠাৎ রেগে যাওয়া অভ্যাস নিয়ে সে চিরদিন ঘুরেছে। আজ কী এমন হলো যে একটা খুঁতে পরিপূর্ণ মেয়েকে বিবাহ করে নিয়ে এলো তা-ও সকলকে না জানিয়ে?
সকলের মনেই সংশয়, দ্বিধা উদয় হয়েছে। রানি ইথুন রাজমাতাকে শান্ত করার জন্য প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল,
“এসব কেমন প্রশ্ন করছেন, মাতাশ্রী? আপনার ছোটো পুত্রকে জানেন না? যদি রেগে যায়?”
রাজমাতা তার বরণডালা হিংস্র-রাগে ছুঁড়ে মারলেন দূরে। তা ছিটকে গিয়ে পড়ল মাটিতে। ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন,
“ক্যামিলাস রাজ্যে শেষমেশ একটা সাধারণ ঘরের কন্যা বধূ হয়ে আসবে? তাও এমন রূপ, শ্রীহীন মেয়ে! কখনোই না। আমাকে ওর মুখটি দেখাও। আমি ওর বিশ্রী মুখটি দেখে বুঝতে চাই তোমার শেষমেশ কতটুকু অধঃপতন হলো।”
হেমলক এতক্ষণ ধীর-স্থিরে কথা বললেও এবার সে আর স্থির রইল না। উগ্র স্বরে রাজমাতাকে বলল,
“ও কোনো রাজ্যের রাজকন্যা হোক কিংবা পথের ভিখারিনী, ওকে কেউ অপমানসূচক কথা কিংবা অশ্রদ্ধা করার অধিকার রাখে না। কারণ ও এখন আমার স্ত্রী। বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্সের অর্ধাঙ্গিনী ও। আমি কি বুঝাতে পেরেছি আমার কথা? স্পষ্ট ও পরিষ্কার করে সকলে বুঝেছেন? এরপর আর একটা অবজ্ঞাসূচক বাক্য কেউ বললে আমি এই রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হবো। সঙ্গে ত্যাগ করবো রাজ্যের সাথে সকল সম্পর্ক ও বন্ধন।”
কথা শেষ করেই নিজের স্ত্রী'র হাতটি প্রকাশ্যেই মুঠোতে নিলো হেমলক। হনহনিয়ে, কারো তোয়াক্কা না করেই প্রবেশ করল প্রাসাদের ভেতরে। প্রকাশ্যে যেন বুঝিয়ে দিলো কারো কথার ধার সে ধারে না। কিংবা কারো অনুমতি, আদেশ অথবা নির্দেশ তাকে ছুঁতে পারে না।
রাজমাতা প্রাচীও দ্বিগুণ ক্ষিপ্ত হলেন। তবে তার ভ্রাতা নোমান তাকে সামলে নিলেন। দাসদাসীর সামনে আর যাই হোক, রাজ পরিবারের বাকবিতন্ডা শোভনীয় নয়। এটা একদিকে লজ্জাজনক, অন্যদিকে নিন্দনীয়।
—————
এ্যাজেলিয়া রাজ্য..
যার মাথার উপর প্রগাঢ় ভানুর ন্যায় উজ্জীবিত একজন রানি ছিলেন। যিনি দাপিয়ে বেড়াতেন ধরণী জুড়ে। যার রূপের মহিমা, গুণের উপমায় জগৎ ছিলো বিমোহিত, মুগ্ধ ও বিস্মিত। যার হিংস্রতার ভয়ে কাঁপতো গোটা রাজ্য। আজ সেসকলই কেবল গল্প ও অতীত… কিংবা বলা যায় ইতিহাস। কারণ সেই রানি হারিয়ে গিয়েছেন কোন এক ঝড়ে, কোথাও বহুদূরে।
রাজ আসনে বসেছে যামিনী। যদিও সে রানি কামিনীকাঞ্চন হওয়ার সমগ্র চেষ্টায় বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখেনি তবে সে ভুলে গিয়েছে- পৃথিবীতে রানি কামিনীকাঞ্চন কেবল একজন। কেবল একবারই তার জন্ম হয়, একটি রূপেই। বাকিরা কামিনীকাঞ্চন হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টাই কেবল করতে পারবে কিন্তু রানি কামিনীকাঞ্চন হওয়ার ক্ষমতা, ভাগ্য কিংবা জৌলুশ কখনোই যে পাবে না!
যামিনীর শরীরে মাখন ও চন্দনের প্রলেপ বড়ো যত্নে লেপছে যামিনীর খাসদাসী- শশীপূর্ণা।
আরামে যামিনীর চোখ বন্ধ হয়ে এসেছে। তন্দ্রারও ঘোর লেগে গিয়েছে কিঞ্চিৎ চোখে। সে আগেও বেশ আরামে কাটিয়েছে কিন্তু আজকাল যেই আরাম তার ভাগ্য ভোগ করছে, সেই আরাম-আয়েশের কথা সে কেবল চিরজীবন স্বপ্নে ভেবে এসেছে। কখনো কখনো কল্পনা করে শিহরিত হয়েছে।
শশীপূর্ণা গায়ে প্রলেপ লাগাতে লাগাতে বলল,
“কেমন বোধ করছেন, রানি যামিনী?”
যামিনী তন্দ্রাঘোরে আচ্ছাদিত থেকেই উৎফুল্ল স্বরে বলল,
“শশী, শশী, আমার শশী, তোমার হাতে এ কী জাদু রেখেছো? আমার তো শান্তিতে নিদ্রা যাপন করতে ইচ্ছে হচ্ছে!”
যামিনীর আহ্লাদে শশী আপ্লূত হয়ে ওঠে,
“আপনি তবে নিদ্রা যাপন করুন। আমি কাউকে কক্ষে প্রবেশ করতে দিবো না।”
ঘোরগ্রস্তের মতন যামিনী বলল,
“কাউকে না দেও তবে সেনাপতিকে দিও, কেমন?”
কথাটির ইঙ্গিত খুবই প্রাপ্তবয়স্ক ছিলো। যৌনতার লালসা বাক্য উপচে পড়ছে যেন।
তা শুনে হেসে কুটি কুটি হলো শশী। কিঞ্চিৎ মশকরা করে বলল,
“শরীরের এত আয়োজন তো করছেন আজ রাতে আসা লস্কর রাজ্যের রাজার মন বিগলিত করার জন্য। অথচ ভোলাতে চাচ্ছেন আরেকজনকে!”
শশীর কথায় যামিনীর ঠোঁটে ফুটে উঠে নোংরা হাসি। বিড়বিড় করে বলে,
“সেনাপতির জন্য সবকিছুই দীর্ঘস্থায়ী। তার মন ভোলাতে চাওয়া, তাকে পেতে চাওয়া… এগুলো সকলই স্থায়ী। বাকি সব ক্ষণিকের আনন্দ, আগ্রহ কিংবা শারীরিক চাহিদা।”
বাকি কথোপকথন আর আগায় না। শশী আনন্দ মনে প্রলেপ লাগাতে থাকে যামিনীর শরীরে। শশী যেন রানি যামিনীর আপনার চেয়ে আপন জন হয়ে উঠেছে এতদিনে। শশীর সাথে পরামর্শ করা ছাড়া যামিনী একটা সিদ্ধান্তও নেয় না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………