আহারের স্থান জুড়ে মাধুর্যতা ছড়িয়ে গেলো হেমলকের যত্ন। নব্য বধূর প্রতি তার এই টান, মায়া, মোহ যেন সমস্ত জগতকে আশ্চর্য করে তুলল। রাজমাতা স্বয়ং তাজ্জব। তিনি তার পুত্রের এই কোন রূপ দেখছেন! এ কেমন রূপ!
—————
বাইজি নাচের আসর আজ হাস্য ঠাট্টায় মগ্ন। বাহিরে নিশুতি রাত। চাঁদ উঠেছে কি-না ঠিক জানা নেই যামিনীর। সে নেশায় বুঁদ। ক্ষণে ক্ষণেই ঢলে ঢলে পড়ছে পশ্চিমা রাজ্যের রাজার গায়ে। রাজাও বেশ কায়দা করে যামিনীর দেহের এই ভঙ্গিমা উপভোগ করছে।
নারীর স্বেচ্ছায় সঁপে দেওয়া নারীত্ব কোন পুরুষই বা অবহেলা করবে? কোন পুরুষই বা গ্রহণ না করে থাকবে?
এতটা সংযম দিয়ে খুব কম সংখ্যক পুরুষকেই যে পাঠিয়েছেন স্রষ্টা।
বাইজি আসরে মুদ্রার ছড়াছড়ি।
যামিনীর ঘনিষ্ঠতা বাড়লো সেই রাজার সঙ্গে। নৃত্য দর্শনের সমাপ্তি ঘটিয়ে সে রাজাকে নিয়ে গিয়ে বেরিয়ে গেলো কক্ষ ছেড়ে। নেশার ঘোরে দাঁড়াতেও পারছে না ঠিক করে। রাজা তাকে ধরে রেখেছে শক্ত হাতে। সে রানি কামিনীকাঞ্চন হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় মদ্যরসকেও ছাড় দেয়নি। কিন্তু রানি কামিনী সারাদিন মদ্যরস পান করলেও কখনো নেশায় ডুবেননি। ঘেষে বসেননি কোনো পুরুষ মানুষের শরীরের সাথে। বরং সব পুরুষ নিজ ইচ্ছায় রানির পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়তো। একটু সঙ্গের লোভে কত কী না করতো? কেবল রানির মুখ দর্শনের জন্য কত কত রাজ্যের রাজারা পত্রের পর পত্র, উপহারের পর উপহার পাঠিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু সেই সমস্ত কিছুই অবজ্ঞা করে গেছেন রানি।
অথচ যামিনী তার এক অংশ বোধহয় করতে পারেনি। যখন যে রাজাকে পেয়েছে তখন তার সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। তার শরীরে ঢলে ঢলে পড়ছে। রানি কামিনীকাঞ্চন পুরুষের যেই কামকে ঘৃণা করে প্রবল অবজ্ঞায় মুখ ঘুরিয়ে নিতেন, যামিনী নিজেকে সেই কামেই সঁপে দিয়েছে বারংবার স্বেচ্ছায়। রানি কামিনীকাঞ্চন পুরুষকে নিয়ে কেবল দাবার গুটির মতন খেলেছেন খেলোয়াড় হয়ে কিন্তু কখনো কেউ তাকে দাবার গুটি বানাতে পারেনি। অথচ যামিনী জানেও না সে খেলোয়াড় হতে গিয়ে হয়ে গিয়েছে দাবার গুটি। রানি কামিনী হওয়ার চেষ্টায় সবচেয়ে বড়ো হার তার এখানেই।
যামিনী হেলতে দুলতে যেই প্রাসাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল কক্ষ- রানি কামিনীকাঞ্চনের কক্ষে প্রবেশ করতে নিবে তার আগেই তার দ্বার রোধ করল সেনাপতি হ্যাব্রো।
যামিনী ঘোলাটে চোখে হ্যাব্রোর দিকে তাকালো। স্পষ্ট মুখটি সে দেখতে পারছে না। মাথা ঘুরছে তার অনবরত। এলোমেলো ভঙ্গিতে বলল,
“তুমি, তুমি আমার পথ আটকেছো কেন? সরে যাও।”
যামিনীর কথায় হেলদোল হলো না হ্যাব্রোর। সে দাঁড়িয়ে রইল ঠাঁই। শক্ত হয়ে। কণ্ঠে তার তীব্র জোর,
“এই কক্ষে আপনি প্রবেশ করতে পারবেন না।”
হ্যাব্রোর কঠিন নিষেধাজ্ঞায় ভ্রু কুঁচকে এলো যামিনী। উপস্থিত অন্য রাজ্যের রাজাও কপাল কুঁচকে ফেলল।
যামিনী কথাটি ঠিক বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
“প্রবেশ করতে পারব না? কেন!”
প্রশ্ন করার পর যামিনীর মাথায় একটি ভাবনা খেলে গেলো। তার মনে হলো হয়তো হ্যাব্রো তাকে পছন্দ করে। মনে মনে হয়তো তার জন্য দুর্বল। তাই অন্য পুরুষের সাথে সে ঘনিষ্ঠ হোক তা চাচ্ছে না।
কিন্তু মুহূর্তেই যামিনীর ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে হ্যাব্রো বলল,
“এই কক্ষে কিছু অপরিচিত পোকা প্রবেশ করতে দেখেছিলাম। এখন জানি না সেগুলো বিষাক্ত কি-না। যদি আপনাদের কামড়ে দেয়! এরচেয়ে বরং আপনারা পশ্চিমের কক্ষে যান। সেটা আমি সুন্দর করে গুছিয়ে দিয়েছি দাসীদের দিয়ে।”
নিজের আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে যামিনী ব্যথিত হলো। তবে কি হ্যাব্রো তাকে নিয়ে বিন্দুমাত্রও কিছু অনুভব করে না?
আর বেশিকিছু না বলে যামিনী রাজাকে নিয়ে পশ্চিম দিকের কক্ষে যাওয়ার জন্য হাঁটা আরম্ভ করল। যামিনী সরতেই হ্যাব্রো দ্রুত হাতে কক্ষটির দরজা বাহির থেকে আটকে দিলো। বিশাল মোটা শিকল দিয়ে বেঁধে দিলো দরজার চারপাশটা শক্ত করে। মনে মনে বলল,
“এই কক্ষ একমাত্র রানি কামিনীকাঞ্চনের। আপনার মতন নোংরা মানুষ এই কক্ষে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই কক্ষের পবিত্রতা নষ্ট করতে পারবের না। আমি থাকতে তা হতে দিবো না।”
যামিনী পশ্চিম দিকের কক্ষটিতে প্রবেশ করতে নিয়েও আবার দাঁড়ালো। পিছু ফিরে তাকালো। বিদ্রুপ হাসলোও। সে কি এতটাই বোকা যে হ্যাব্রোর মতি বুঝবে না? অবশ্যই বুঝে। কিন্তু কখনো কখনো বুঝেও অবুঝ হতে হয়।
মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করল। রানির ঐ কক্ষ সে দখল করবেই। রানি পুরো রাজ্য, রাজসিংহাসন দখল করে নিলো আর সামান্য কক্ষ দখল করতে পারবে না? এতটাও বোকা যে সে নয়।
—————
ক্যামিলাস রাজ্যের ভেতর তিনদিনের উৎসব আয়োজিত হয়েছে। রাজ্যে নতুন বধূ আসার আনন্দ উপলক্ষে।
রানি কামিনী তার কক্ষে বসে আছেন। পরনে লাল রঙের রাজকীয় পোশাক। মাথার ওড়নাটা মেঝে ছুঁইছুঁই। হাতে পায়ে জড়োয়া গহনার কমতি নেই। রাজ্যের নতুন বধূর সাথে প্রজাদের পরিচয় করাতে হবে বলেই এত তোড়জোড়।
রানির একজন খাসদাসী হয়েছে নাম- গিরি। সে ব্যস্ত পায়ে কক্ষে প্রবেশ করল। তবে অনুমতি নিতে ভুললোও না মোটেও।
তড়িঘড়ি করে প্রবেশ করেই কুর্নিশ করল। নিচু স্বরে বলল,
“রানি ইথুন এসেছে আপনার সাথে দেখা করার জন্য। আসতে বলবো?”
রানি কামিনী ঘোমটার আড়ালেই মুখ ঢেকে অনুমতি দিলেন। গিরি গিয়ে অনুমতির কথা জানাতেই নিজের খাসদাসীর সাথে প্রবেশ করল রানি ইথুন।
রানি ইথুন যেন সৌন্দর্যের আরেক মহিমা। গায়ের উজ্জ্বল বর্ণ, টানা চোখ, দেহের ভঙ্গি.. সবকিছুই তাকে অনন্য করে তুলেছে।
রানি কামিনী সেই রূপের দিকে তাকিয়ে রইলেন এক ধ্যানে। তার আজও বেশ মনে আছে যেদিন তিনি প্রথম এলেন ক্যামিলাস রাজ্যে, ইথুনের রূপ দেখে আশ্চর্য হয়েছিলেন। এত মায়াময়, অপরূপ, আকর্ষণীয় নারী সহজে দেখা যায় না বলে। তবে ভেতর ভেতর আবার অহং বোধও তীব্র জয়ে ছিলো এই ভেবেই যে, ইথুন অনেক সুন্দরী হলেও রানি কামিনীর রূপের কাছে তার রূপ ফিকে হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু আজ? আজ কোথায় সেই অহংবোধে? কোথায় সেই রূপ! তবে রানি নিজেকে সামলে নিয়েছেন। এই রূপ, জৌলুশ তো তিনি তৈরি করেননি। সৃষ্টিকর্তা দু-হাত উজাড় করে দিয়েছিলেন৷ আজ সৃষ্টিকর্তা তা নিয়ে গিয়েছেন। এই রূপ, জৌলুশ তো তিনি নিয়ে আসেননি তবে তার আক্ষেপও বা কীসের? এই রূপ ছাড়াও তিনি রানি। তার সৌন্দর্যতা কেবল বাহ্যিক না। অভ্যন্তরীণও।
রানির এই ভাবনার ভেতরই ইথুন এগিয়ে এলো। আন্তরিক ভঙ্গিতে বলল,
“তৈরি হয়েছো তো, হেমলক বধূ? রাজমাতা তোমাকে উপস্থিত হতে বলেছে নিচে।”
রানি ধীর স্বরে উত্তর দিলেন, “হয়েছি। চলুন।”
রানির কণ্ঠ পেতেই হাস্যোজ্জ্বল ইথুনের হাসিতে কিছুটা ভাটা পড়ল। সন্দিহান মুখে তাকিয়ে থেকে বলল,
“তোমার কণ্ঠটা কোথাও শুনেছি মনে হচ্ছে। তুমি কি আমাদের প্রাসাদে কখনো এসেছিলে? আমাদের কি কখনো দেখা হয়েছিলো এর আগে?”
ইথুনের একের পর এক প্রশ্নে ভড়কালেন না রানি। ধীরে ধীরে তিনি নিজের আত্মবিশ্বাসে যে ফিরে এসেছেন। দৃঢ়তার সঙ্গে তাই জবাব দিলেন,
“না, আমাদের এর আগে কখনোই দেখা হয়নি।”
ইথুন আর বেশি গভীরে গেলো না এই কথোপকথনের। বরং মনে হলো সে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই মেনে নিয়েছে কথাটি।
উভয়ই রওনা হলো। ইথুন ও তার দাসী হাঁটছে সামনে। তাদের ঠিক পেছনেই রানি কামিনী। এবং তার একটু পেছনে তার খাসদাসী ও কিছু প্রহরী।
রানি হাঁটার তালে তালে চারপাশে ভালো করে তাকাচ্ছিলো। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অত্যন্ত তীব্র ভাবে কোনো কিছু খুঁজছে যেন। এবং হাঁটতে হাঁটতে তিনি সত্যিই একটি কক্ষের সামনে থেমে গেলেন। কক্ষটির ভেতর থেকে পরিচিত ঘ্রাণ ভেসে এলো যেন। রানির বেশ পরিচিত মনে হলো ঘ্রাণটি।
কিন্তু তিনি সেই ঘ্রাণের রহস্য উদঘাটন করার আগেই ইথুন তাড়া দিলো। রানি নিচে আসতেই দেখলো বিভিন্ন রাজ্যের রাজা-রানিদের সমাগমে পরিপূর্ণ চারপাশটা। রানি তীক্ষ্ণ নজর চারপাশে বুলাতেই অনেক পরিচিত রাজাদের দেখল। কিন্তু তার চোখ থেমে গেলো গাঢ় গোলাপি রঙের পোশাকের একটি নারীর দিকে। ঝকঝকে লাগছে নারীটির দেহ। রানির দমবন্ধ লাগল। নিজেকে লাগলো ভীষণ একা।
ঠিক তখনই তার হাতটি কারো শক্ত হাতের মুঠোয় আটকে গেলো। পাশ ফিরে তাকাতেই তিনি দেখলেন হেমলক পিয়ার্স দাঁড়িয়ে আছে রাজবেশে। চোখগুলোতে অগাধ মায়া, স্নেহ।
রানি জোরে শ্বাস ফেললেন। অস্ফুটস্বরে বললেন,
“যামিনী, হ্যাব্রো… এখানে!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………